#হারানো_হিয়া (পর্ব ১)
‘গুড়ুমু’ ‘গুড়ুম’ শব্দে সুমন চমকে আকাশের দিকে তাকায়। বাজ পড়ল? ধন্দে পড়ে যায়। একটু আগেও আকাশ পরিষ্কার ছিল, কিন্তু এখন উত্তর কোণে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। আবার সেই গম্ভীর শব্দটা হয়। এবার একটু বেশি সময় ধরে। বৃষ্টি নামবে হয়তো। অক্টোবর মাসেও এবার দুদিন পর পরই বৃষ্টি হচ্ছে। সুমন বাজারে এসেছিল বিকেলের নাস্তা কিনতে। ছুটির দিনগুলোতে সন্ধ্যা বেলা ছোলা, পেঁয়াজু ওর প্রিয় নাস্তা। আর মতি মিয়া দারুণ মচমচে পেঁয়াজু ভাজে। সেজন্যই বিকেল হতেই ও বাজারের উদ্দেশে বেরিয়েছে।
সুমন পা চালায়। নিমতলী বাজারের শেষ প্রান্তে মতি মিয়ার ভাজা পোড়ার দোকান। শীত নেই গ্রীষ্ম নেই বারো মাস একই জিনিস ভাজে লোকটা। আর বিকেল থেকে রাত এগারোটা অব্দি চলে বেচাকেনা।
সুমন কাছে এসে দাঁড়াতেই এক গাল হাসে মতি মিয়া। ছিমছাম গড়নের, গায়ের রঙ ফর্সা। পরনে পুরনো একটা রঙ চটে যাওয়া সবুজ প্যান্ট আর গায়ে হলুদ টি-শার্ট। বড়ো একটা কড়াইয়ে ফুটন্ত তেলে পেঁয়াজু ছাড়ছিল মতি মিয়া। সুমন দমে যায়, এহ, মাত্র পেঁয়াজু ছাড়ল। এদিকে আকাশে মেঘ বাবাজি ওয়ার্নিং সাইরেন বাজিয়ে চলছে। ও একটু অস্থির গলায় বলে, ‘মতি মিয়া, কতক্ষণ লাগবে পেঁয়াজু উঠতে?’
মতি লম্বা একটা লোহার জালিওয়ালা হাতা দিয়ে পেঁয়াজু উলটে দিতে দিতে বলে, ‘পাঁচ মিনিট লাগব। আপনার অন্য বাজার থাকলে সাইরা আসেন।’
সুমন নড়ে না। ইতোমধ্যেই লোক জমে গেছে। সবাই এই সময়টায় আসে গরম গরম ছোলা পেঁয়াজু নিতে। সুমন তাড়া দিয়ে বলে, ‘আমার আর কোনো বাজার নেই। তুমি আগে বিশ টাকার ছোলা দাও। আর পেঁয়াজু উঠলে ত্রিশ টাকার দিও।’
মতি এবার হাতের লোহার হাতাটা নামিয়ে রাখে। তারপর ছোট্ট একটা দাড়ি পাল্লায় ছোলা মেপে সাদা পলিথিনে ভরে। ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসু গলায় বলে, ‘আলুর চপ নিবেন না?’
সুমন মাথা নাড়ে, ‘চারটা দিয়ে দাও। ডিম চপ নাই?’
মতি চারটা চপ দিয়ে বলে, ‘দেরি হইব। পেঁয়াজু নামাইয়া ডিম চপ ছাড়মু।’
সুমন একবার আকাশের দিকে তাকায়। এতক্ষণে পুরো আকাশ কালো হয়ে এসেছে। হালকা ঠান্ডা বাতাস ছেড়েছে। নাহ, বৃষ্টি বুঝি নেমেই যাবে। এর মধ্যে বাসা থেকে ফোন আসে। নাফিসার ফোন, ‘অ্যাই, কই তুমি। বৃষ্টি চলে এল তো। তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসো। পারলে তূর্য আর জুঁইয়ের জন্য ডিম চপ এনো।’
সুমন হতাশ গলায় বলে, ‘দেরি হবে তাহলে। এখনও ডিম চপ ছাড়েনি। আলু চপ নিয়ে আসছি।’
নাফিসা এবার তাড়া দেয়, ‘তাড়াতাড়ি চলে আসো, লাগবে না ডিম চপ।’
ফোনটা ছাড়তে ছাড়তে সুমন খেয়াল করে পেঁয়াজু নামাচ্ছে মতি মিয়া। আর আশেপাশের সবাই হুমড়ি খেয়ে পড়ছে নেবার জন্য। সুমন উঁচু গলায় বলে, ‘মতি মিয়া, আমার পেঁয়াজুটা দাও। আর এই নাও সত্তুর টাকা।’
ছোলা, পেঁয়াজু নিয়ে এবার সুমন ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটে। মাছ বাজার পার হতেই বৃষ্টির একটা বড়ো ফোঁটা কপালে এসে লাগে। ইশ, বৃষ্টি নেমেই গেল। ওর বাসাটা এখান থেকে আর মিনিট পাঁচেকের পথ। সুমন এবার হালকা দৌড়ের ভঙ্গিতে হাঁটতে থাকে। কিন্তু বেশিদূর এগোতে পারে না। জয়িতা বিউটি পার্লারের কাছে আসতেই জোরে বৃষ্টি নামে।
সুমন দৌড়ে পার্লারের পেছনের দিকে শেডের নিচে দাঁড়ায়। টিনশেড দেওয়া একটা মার্কেট। তারই একপাশে এই পার্লারটা। নাফিসা মাঝে মাঝে এখানটায় আসে। সুমন হাত দিয়ে মাথার চুল মুছতে গিয়ে থেমে যায়। একটা মেয়ে শেডের একদম শেষ মাথায় দাঁড়িয়ে আছে। আনমনে বৃষ্টি পড়া দেখছে। মুখটা চেনা লাগে। সুমন ঘাড় ফিরিয়ে ভালো করে তাকাতেই মেয়েটাও তাকায়। আর তখুনি বিকট শব্দে কাছেই কোথাও বাজ পড়ে। মেয়েটা স্পষ্টতই ভয়ে কেঁপে ওঠে। আর সুমন স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। বাজের শব্দ ওর কানে যায়নি। তার আগেই ও স্তব্ধ হয়ে গেছে। মীরা!
কতদিন পর দেখল ওকে? বিশ বছর? আগেরমতোই ছিপছিপে শরীর, কাঠগোলাপের মতো মায়াময় গায়ের রঙ, চোখা নাক, হরিণের মতো চঞ্চল চোখ। চুলগুলো আগেরমতো বেণী করে ঘাড়ের একপাশে রেখে দেওয়া নেই। চুল কমেছে। কাঁধ পর্যন্ত চুল নেমে এসেছে। সুমন চোখ নামায়। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে থাকে। ততক্ষণে বৃষ্টির সাথে সাথে বাতাসের বেগ বেড়েছে। সামনের এক তলা বিল্ডিংয়ের গেটের উপর মাধবীলতা গাছটা ভীষণভাবে দুলে দুলে উঠছে। সেইসাথে সুমনের বুকের ভেতরটাও ভীষণ ভাবে আন্দোলিত হতে থাকে।
মীরা একটু আগেই বাজার থেকে ফিরছিল। ইহানের জন্য খাতা, কলম আর নিজের কিছু টুকিটাকি কেনাকাটা ছিল। কতদিন পর এই এলাকায় এল। সবকিছু কেমন পালটে গেছে। বাজারে তো যাওয়া হয়নি অনেক বছর। ভেবেছিল বেশি সময় লাগবে না। কিন্তু পাঁচশ টাকার ভাঙতি করতে গিয়েই দেরি হয়ে গেল। আর তাতেই এই বিচ্ছিরি বৃষ্টিতে আটকে গেল। ভেবেছিল বৃষ্টিটা একটু ধরে এলেই বেরোবে। তাই এখানে দাঁড়িয়েছিল। একটু আগেই একটা লোক দৌড়ে যখন শেডে ঢুকছিল তখন ইচ্ছে করেই ও এক কোণে সরে গেছে। সন্ধ্যার আগে আগে চারপাশ কেমন অন্ধকার। একটু ভয় করছিল। এর মাঝে ও টের পায় লোকটা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। মীরার কপাল কুঁচকে উঠে। বয়স চল্লিশ হতে চলল কিন্তু পুরুষের কামুক চোখ থেকে আজ অবধি মুক্তি পেল না। মীরা বিরক্তি নিয়ে লোকটার দিকে তাকাতে যেতেই থমকায়। আর ঠিক তখনই ভীষণ জোরে একটা বাজ পড়ে। মীরা কেঁপে ওঠে। সুমন! বুকের ভেতর ধুকপুকটা টের পায়। নিশ্বাস নিতে যেন ভুলে যায়। কতদিন পরে সেই প্রিয় মুখটা দেখল। বৃষ্টিতে কেমন চুল ভিজে এলোমেলো। স্বাস্থ্য ভালো হয়েছে ওর। গায়ের শ্যামলা রঙটা এখন বেশ উজ্জ্বল। চোখে সেই সহজ একটা দৃষ্টি। হাতের দিকে চোখ পড়তেই ওর ভ্রু কুঁচকে ওঠে। ভালো করে খেয়াল করতেই ওর বুক ধরে আসে, চোখ ভিজে যেতে থাকে অজান্তেই। সুমন এখনও পেঁয়াজু ভালোবাসে!
হুট করেই এক ধাক্কায় ও বিশ বছরেরও আগেরকার সময়ে ফিরে যায়।
‘এই ছেলে, তুই কি পকেট থেকে পেঁয়াজু বের করে খাচ্ছিস?’
একটা রিনরিনে কন্ঠে সুমন ঘুরে তাকায়। একটা ছিপছিপে গড়নের মেয়ে, চুলের বেণী সাপের মতো একপাশে রাখা। চোখ দুটো টানা, কাজল দেওয়া। এই মেয়েটা কদিন আগে নিচতলায় ভাড়া এসেছে। মীরা নাম, অনার্স সেকেন্ড ইয়ারে পড়ে। দেখতে সুন্দর বলে এলাকার ছেলেরা ইদানিং এই বাসাটার সামনের রাস্তা দিয়ে ঘোরাঘুরি করে। অনেকে শিস বাজায়, রাতে গানের গলা শোনা যায়। সুমনের সঙ্গে এখনও পরিচয় হয়নি। অথচ মেয়েটা ওকে কেমন অনেক দিনের পরিচিত ভঙ্গিতে ডাকছে। তাও আবার তুই করে!
সুমন ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘এই মেয়ে, তুমি আমাকে ‘তুই’ করে বলছ কেন? আমি বয়সে তোমার চেয়ে বড় বই কম হব না।’
মীরা ফিচেল হাসি হাসে, ‘এহ, তুই বড় হলে অমন পকেটে করে পেঁয়াজু নিয়ে ঘুরতি? তোর পকেটে সত্যিই পেঁয়াজু?’
সুমনের ইচ্ছে করছে কড়া কিছু কথা বলতে। কেমন বেয়াদবের মতো ওকে তুই করে বলছে। ও ডিপ্লোমা পাশ করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং-য়ে ভর্তি হয়েছে। এখন সেকেন্ড ইয়ার চলে। এই মেয়ের চেয়ে সেই হিসেবে ও এক কী দুবছরের বড়। আর এ কি না চেনা নেই জানা নেই তুই করে বলছে।
এখন রোজা চলছে। ইফতারে প্রতিদিন ছোলা, পেঁয়াজু থাকেই। আর আম্মা জানে পেঁয়াজু ওর ভীষণ প্রিয়। অন্য ভাই বোনদের চেয়ে ওর জন্য আলাদা করে দশটা পেঁয়াজু রেখে দেয়। আর সুমন সেগুলো পকেটে নিয়ে ঘোরে। মন চাইলে একটা একটা করে বের করে খায়। কিন্তু এই ফাজিল মেয়েটা তো দেখে ফেলল।
রাগী গলায় বলে, ‘পকেটে পেঁয়াজু থাকলে তোমার কী?’
মীরা নাক কুঁচকে বলে, ‘ছি, পকেটে কেউ পেঁয়াজু রাখে? তুই কী রে। আচ্ছা, আমাকে একটা দে তো, দেখি এমন কী ঘোড়ার ডিম যে যক্ষের ধনের মতো পকেটে নিয়ে ঘুরছিস।’
কথাটা বলে মীরা হাত বাড়িয়ে দেয়। সুমন খেয়াল করে হালকা লালচে হাতের পাতা, সরু আঙুলগুলো শিল্পীদের মতো।
সুমন এবার ধন্দে পড়ে যায়। মেয়েটা আসলেই খেতে চাইছে না মজা করছে?
ওকে চুপ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে, ‘কী রে দিবি না?’
সুমন ইতস্তত করে পকেট থেকে দুটো পেঁয়াজু বের করে ওর হাতের উপর রাখে।
মীরার মুখে হাসি ফোটে। তারপর একটা পেঁয়াজু মুখে পুরে দেয়। তারপর কুড়মুড় করে খেতে খেতে বলে, ‘বাহ, খুব মজা তো! তোর মা বানায় বুঝি?’
সুমন মাথা নাড়ে, গম্ভীর মুখে বলে, ‘হ্যাঁ।’
মীরা আরেকটা পেঁয়াজু মুখে পুরে বলে, ‘কাল থেকে আমার জন্য বেশি করে নিয়ে আসবি। তোর মাকে বলবি তোর বন্ধু খেতে চেয়েছে।’
সুমন কপাল কোঁচকায়, ও বন্ধু হলো কবে এই মেয়ের। নাহ, একে পেঁয়াজু দিয়ে ভুল হয়েছে।
সুমন কড়া গলায় বলে, ‘তোমার খেতে ইচ্ছে করলে তোমার মাকে বানিয়ে দিতে বলো।’
মীরা কেমন একটা বিষণ্ণ হাসে, তারপর বলে, ‘আমার যে মা বেঁচে নেই। থাকলে কি আর তোর কাছে চাই?’
সুমন এবার থমকে যায়। বুকের ভেতর হঠাৎ করেই এই দুষ্ট মেয়েটার জন্য মায়া টের পায়। এখন কী অসহায় লাগছে মুখটা! একটু আগের দুষ্টুমিভরা মুখটা নিমিষেই কেমন রোদ পড়ে যাওয়া বিকেলের মতো বিষণ্ণ।
ও এবার পকেটে থেকে শেষ দুটো পেঁয়াজু বের করে বলে, ‘এই নে ধর। কাল থেকে আরও বেশি করে নিয়ে আসব।’
মীরার মুখ এবার আগেরমতো চঞ্চল হাসিতে ভরে যায়। হাত পেতে নিতে নিতে বলে, ‘তুই আমার পেঁয়াজু বন্ধু। আমার জন্য চুরি করে নিয়ে আসবি প্রতিদিন, বুঝলি?’
সুমন এবার হাসে। মেয়েটার হাসিমুখ দেখে ভালো লাগছে। ও বলে, ‘আচ্ছা নিয়ে আসব। তবে তুই কিন্তু আমার মতোই ছোট, চেয়ে চেয়ে পেঁয়াজু খাস।’
মীরাও এবার হাসে। সুমন মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।
আবার একটা বাজ পড়তেই বৃষ্টিটা ধরে যায়। মীরার সম্বিৎ ফেরে। সুমন সেই যে মুখ ঘুরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে আছে, একবারও আর ফিরে দেখেনি। এখনও অভিমান বুকে চেপে রেখেছে? একটা কষ্ট টের পায় বুকের ভেতর।
বৃষ্টি কমে গেছে। মীরা শেষবারের মতো সুমনকে দেখে। হাতে ধরা ছোলা পেঁয়াজুর ব্যাগটা শক্ত মুঠিতে ধরে আছে যেন কাউকে আজ পেঁয়াজুর ভাগ দেবে না আর। মীরা টের পায় চোখ আবার ঝাপসা হয়ে আসছে। ও আর দাঁড়ায় না, শেড থেকে বেরিয়ে আসে। তারপর কেমন এলোমেলো পায়ে বাসার পথে এগোয়।
সুমন এবার মুখ ফিরিয়ে তাকায়। মীরা চলে যাচ্ছে। মাথার উপর সাদাটে ওড়নাটা টেনে নিয়েছে ততক্ষণে, বৃষ্টি থেকে বাঁচতে। কেমন ক্লান্ত পায়ে হাঁটছে ও। ইচ্ছে করছে একবার ছুটে গিয়ে ওর হাতটা ধরে।
চেয়ে থাকতে থাকতে পথের বাঁকে মীরা অদৃশ্য হয়ে যায়। আর তখুনি নাফিসার দ্বিতীয় ফোনটা আসে, ‘এই, কই তুমি? কোথায় আটকে গেলে?’
সুমন থতমত খেয়ে যায়। তোতলানো গলায় বলে, ‘এই তো বাসার কাছেই। বৃষ্টিতে আটকে গিয়েছিলাম। এখন চলে আসছি।’
নাফিসা উদবিগ্ন গলায় বলে, ‘চলে আসো। বৃষ্টিতে ভিজে আবার না জ্বর বাঁধাও।’
সুমন ফোন রেখে এবার বাড়ির পথে ছোটে। বুকের ভেতর একটা টালমাটাল টের পায়। যে আবেগ অনেক আগেই সমাধিস্থ করে এসেছিল আজ এই ঝোড়ো সন্ধ্যায় কেমন করে মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এল!
(চলবে)