হারানো হিয়া পর্ব-০২

0
129

#হারানো_হিয়া (পর্ব ২)

১.
বাসায় ঢুকতেই তূর্য দৌড়ে আসে, কচি গলায় বলে, ‘বাবা বৃষ্টিতে ভিজে গেছে।’

তূর্য এবার ক্লাশ ওয়ানে। আর মেয়ে জুঁই ক্লাশ সিক্সে। দুজনেই মায়ের স্কুলে পড়ে। মানে নাফিসা এখানকার একটা হাইস্কুলের শিক্ষক। সেই সুবাদে ওদের স্কুলে আনা নেওয়া, পড়াশোনা সব নাফিসাই দেখে।

ততক্ষণে পেছনে জুঁই এসে দাঁড়িয়েছে। হাতে একটা তোয়ালে। সেটা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘বাবা, তাড়াতাড়ি মাথা মুছে নাও। অসুখ করবে তো।’

মেয়ের কথায় বুকটা ভরে যায়। মেয়েরা বুঝি সেই ছোট বেলা থেকেই বাবা অন্তপ্রাণ হয়। মেয়ের হাত থেকে তোয়ালেটা নিয়ে ছোলা মুড়ির পলিব্যাগটা ওর হাতে দিয়ে বলে, ‘তোর মাকে এটা দে।’

নাফিসা মাগরিবের নামাজ পড়ছিল। সালাম ফিরিয়েই জায়নামাজ থেকে উঠে আসে। তারপর উদবিগ্ন গলায় বলে, ‘এই অবেলায় ভিজলে, আবার না জ্বর আসে। কেন ছোলা মুড়িই খেতে হবে। একটা ছুটির দিন অন্য কিছু খেলে কী হয়? যাও, ভেজা জামা ছেড়ে আসো। আমি মুড়ি মাখাচ্ছি।’

সুমন একটু অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাসে। সরাসরি নাফিসার চোখের দিকে তাকাতে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। মনে হচ্ছে নাফিসা ওর দিকে তাকালেই আজ বিকেলের সব ঘটনা বুঝে যাবে। ও দ্রুত নিজের রুমে চলে যায়। ভেজা জামাকাপড় ছেড়ে একটা পরিষ্কার ফতুয়া আর ট্রাউজার পরে। ভেজা জামাকাপড়গুলো বারান্দায় শুকোতে দিতে গিয়ে দেখে আবার বৃষ্টি নেমেছে। মীরা কি ঠিকমতো পৌঁছাতে পেরেছিল? ওর তো আবার ঠান্ডার ধাত আছে। একটু আনমনা হয়ে যায়।

ডাইনিং থেকে নাফিসার গলা ভেসে আসে, ‘অ্যাই, চলে আসো। এখুনি খেয়ে নাও তোমরা। না হলে মুড়ি মিইয়ে যাবে।’

সুমন মাথা থেকে এলোমেলো ভাবনাগুলো তাড়িয়ে বসবার ঘরের সোফায় এসে বসে। নাফিসা মেলামাইনের একটা বড়ো বাটিতে ছোলা মুড়ি মাখানোটা নিয়ে আসে। তাতে তিনটা টেবিল চামচ দেওয়া। জুঁই আর তূর্য গুটিগুটি পায়ে ওর দুই পাশে এসে বসে। ছুটির দিনে এটা একটা পরিচিত দৃশ্য। বাবার পাশে বসে ওরাও ছোলা মুড়ি খায়। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো এরা দুজনেই ওর মতো এগুলো খেতে পছন্দ করে। আর জুঁই ওর মতোই পেঁয়াজু বেশি পছন্দ করে।

সুমন খেতে খেতে বলে, ‘তুমি খাবে না? একটু নাও?’

নাফিসা মাথা নাড়ে, ‘তোমরা খাও। আমি একটা চপ নিয়েছি। চা খাবে তো?’

সুমন মাথা নাড়ে। পাশ থেকে তূর্য বলে ওঠে, ‘মা, আমিও খাব।’

জুঁই আবদারের গলায় বলে, ‘আমিও।’

নাফিসা ইলেকট্রিক কেটলিতে পানি চাপাতে চাপাতে বলে, ‘এইটুকুন বয়সে আবার চা কীসের।’

সুমন হাসে, ‘ওরা তো চা খায় না। মিষ্টি সরবত খায়। আমারটায় চিনি এক চামচের কম দিও কিন্তু।’

নাফিসা কপাল কুঁচকে দুধ, চিনির বয়াম বের করে। তারপর তিনটা কাপ পাশাপাশি রাখে। ও এসব খায় না। চা খেলেই চিনি খাওয়া হবে। আর তাতে মুটিয়ে যাবার ভয় আছে। এই বয়সে একটু খেলেই কেমন মুটিয়ে যায় সবাই। স্কুলে অন্য সব আপারা কেমন মহিলার মতো হয়ে গেছে। ওকে দেখে এখনও সবাই হিংসে করে।

কেটলিতে গরম পানি ফোটার ‘ফড় ফড়’ আওয়াজ হচ্ছে। সুমন একবার তাকায়। নাফিসা কী যেন ভাবছে। একপাশ থেকে ফর্সা মুখটা দেখা যাচ্ছে। অতটা লম্বাচওড়া না হলেও নাফিসা মাঝারি উচ্চতার। চোখ, নাক, মুখ কাটা কাটা। গায়ের রঙ ফর্সা। বড় আপাই পাত্রী পছন্দ করে নিয়ে এসেছিল। সেই অর্থে ও তেমন করে দেখেনি। বিয়ের আগে একবার একটা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে বসেছিল। টুকটাক কথা হয়েছিল। তাতে ওর মনে হয়েছিল মেয়েটা সহজ সরল। ভালো লেগেছিল সুমনের। তাই বাসায় এসে নিজের মতামত জানিয়ে দিয়েছিল। বিয়ের জন্য দশটা মেয়ে দেখার বিপক্ষে ছিল। আর এত বেছে কী হবে? মীরার তো অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল। তাই নাফিসাকে দেখতে গিয়ে ও আর না করেনি। পড়াশোনা জানা মেয়ে তার ওপর ততদিনে স্কুলের চাকরিতে ঢুকেছে।

তাই বাসায় এসে ওর মতামত জানাতেই সবাই খুব খুশি। ও যে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে তাতেই বাসার মানুষ হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। মীরার ব্যাপারটা সবাই আঁচ করতে পারত। আর ওদিকে নাফিসার বাড়ি থেকেও আপত্তি ছিল না। ছেলে ডিপ্লোমা করে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে এখন নিজেই কনস্ট্রাকশন অফিস দিয়ে বসেছে। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ভালোই রোজগার করে। তাই বেশ ধুমধামেই বিয়ে হয়ে যায়৷ অবশ্য বিয়ের পরে নাফিসার সঙ্গে যখন সম্পর্কটা অনেক সহজ হয়ে এসেছিল তখন ও জানতে পেরেছিল প্রথম দেখা হবার দিনে সুমনকে ঠিক অতটা পছন্দ করেনি নাফিসা।

সুমন আশাহত গলায় বলেছিল, ‘কেন?’

সেদিন নাফিসা বলেছিল, ‘তোমাকে প্রথম দেখবার দিন খুব কালো লাগছিল, এখন অবশ্য ভালো লাগে। আম্মাও এই কথাটা বলছিল।’

গায়ের রঙ নিয়ে নাফিসার একটা খুঁতখুঁত আছে। জুঁই এর গায়ের রঙ ওর মতো শ্যামলা। তাই নিয়ে কী মন খারাপ থাকে! তূর্যের গায়ের রঙ মায়ের মতো ফর্সা। নাফিসা প্রায়ই বলে, মেয়েটা যদি ছেলের মত ফর্সা হতো ভালো হতো। এই ব্যাপারটা নিয়ে সুমনের মনে একটু খেদ আছে। নাফিসা আসলে ফর্সা ছেলে পছন্দ করে। ওকে ঠিক অতটা ভালো না লাগলেও ওর আর্থিক সচ্ছলতার জন্য বিয়েতে অসম্মতি জানায়নি। জীবনে কত কত ছোট ছোট অতৃপ্তি থাকে মানুষের।

‘এই নাও চা। আর এই নে তোদের চা। সাবধানে, জিভ পুড়ে যাবে কিন্তু’, নাফিসা তিনটে কাপ সামনের টি টেবিলে রাখতে রাখতে বলে।

সুমন প্রথমে তূর্যের কাপটা মুখের কাছে নিয়ে ফু দেয়। তারপর বলে, ‘গরম কিন্তু, ঠান্ডা হোক। তারপর খাস।’

পাশ থেকে জুঁই বলে, ‘বাবা, আমি গরম চা খেতে পারি। এই যে দেখো।’

কথা শেষ হতেই জুঁই কাপটা মুখের কাছে নিয়ে ফু দিয়ে সাবধানে চুমুক দেয়।

সুমন এবার নিজের কাপ নিয়ে বলে, ‘বাহ! তুই দেখি চা খাওয়া শিখে গেছিস।’

সুমন চায়ের কাপে চুমুক দিতেই মন ভালো হয়ে যায়। নাফিসার হাতের চা খুব ভালো হয়। সত্যি করে বলতে গেলে আর কারও হাতে চা ওর ভালো লাগে না। না ভুল হলো, আরেকজন আছে, মীরা। ওর হাতের চা খেতে মাঝে মাঝে ওদের বাসায় যেত।

‘এই, চায়ে চিনি ঠিক আছে তো?’, নাফিসার ডাকে সম্বিত ফিরে৷ ও মুখ তুলে অপ্রস্তুত গলায় বলে, ‘অ্যাঁ, হ্যাঁ ঠিক আছে।’

নাফিসা ভ্রু কুঁচকে ওর দিকে তাকায়। বাসায় ফেরার পর থেকেই কেমন চোর চোর একটা ভাব। কী হয়েছে? এমন তো কখনও দেখেনি। অন্য লোকদের মতো সুমনের এখন পর্যন্ত মেয়েঘটিত কোনো সমস্যা নেই। মোবাইল আনলক থাকে। কখনও উল্টোপাল্টা ফোন আসেনি। কিন্তু আজ যেন একটু আনমনা লাগছে।

নাফিসা এবার ওর সামনে এসে দাঁড়ায়, ‘রাতে কী খাবে?’

সুমন এবার নিজেকে স্বাভাবিক করে। তারপর বলে, ‘খিচুড়ি আর ডিম করো। বৃষ্টির দিন, ভালো লাগবে খেতে।’

জুঁই পাশ থেকে বলে, ‘আমার জন্য দুটো ডিম কিন্তু।’

তূর্য এতক্ষণে চায়ে চুমুক দিচ্ছে। অনেকটা সরবত খাবার মতো। ও মুখ তুলে বলে, ‘আমিও দুটো ডিম খাব।’

এই দুই ভাই বোনের মধ্যে সবকিছু নিয়ে সারাক্ষণ ভাগজোগ লেগেই থাকে।

সুমন এবার হেসে বলে, ‘আচ্ছা। নাফিসা, ওদের জন্য ডিম বেশিই দিও।’

নাফিসা মাথা নাড়ে, ‘আচ্ছা। তুমি এক কাজ করো, ওদের নিয়ে পড়তে বসো। সামনেই কিন্তু পরীক্ষা।’

সুমন এবার দুজনের দিকে তাকায়, ‘বই খাতা নিয়ে আয় তোরা৷’

নাফিসা এতক্ষণে স্বস্তি পায়। সুমনকে এখন স্বাভাবিক লাগছে। এই বয়সটা আসলে খুব বিপৎজনক। দশ বারো বছর সংসার হয়ে যাবার পর মানুষের একটা একঘেঁয়েমি আসে। তখন অন্য মেয়েদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আর তারপরই সংসারে অশান্তি। ওদের স্কুলের অনেক আপাই তাদের বাসায় এই সমস্যায় ভুগছে।

নাফিসা নিশ্চিন্ত মনে এবার রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। তার আগে ফ্রিজ থেকে ছয়টা ডিম বের করে সিদ্ধ দেয়। এক পট চাল আর একটু ডাল ধুয়ে নিয়ে মশলা দিয়ে ভালো করে মাখে। বসবার ঘর থেকে সুমনের পড়ানোর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। মেয়েটা অংকে কাঁচা। সুমন ওকে অংক বোঝাচ্ছে। অন্যান্য দিনের মতোই সব স্বাভাবিক আছে। নাফিসা গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে খিচুড়ি চড়ায়।

রাতে খাওয়া শেষে ওদের দুই ভাইবোনকে বিছানা করে দিয়ে নাফিসা শোবার ঘরে আসে। সুমন বিছানায় আধশোয়া হয়ে টিভিতে কোলকাতার একটা বাংলা সিনেমা দেখছিল। একটা ট্রেনের কামরায় হঠাৎ করেই পুরনো প্রেমিকার সঙ্গে দেখা। ঋতুপর্ণা আর প্রসেনজিৎ এর ছবি। ছবির নামটা দেখেই কৌতুহল হয়েছিল, প্রাক্তন।

নাফিসাকে রুমে ঢুকতে দেখেই ও চ্যানেল চেঞ্জ করে। এটাতে মার্কিন নির্বাচনের খবর দেখাচ্ছে। চ্যানেল চেঞ্জ করার কাজটা ও মনের অজান্তেই করে ফেলে। তাহলে কি ওর মনের কোণে কোনো পাপবোধ আছে?

নাফিসা এই ঠান্ডার মধ্যেই রাতে গোসল করেছে। এখন মুখে ক্রিম মাখছে। গোসলের পর সারা শরীরে লোশনও মেখেছে। রুমের ভেতর একটা মিষ্টি ঘ্রাণে ভরে যায়। ওর এই ব্যাপারটা খুব ভালো লাগে।

নাফিসা বাতি নিভিয়ে বিছানায় আসতেই সুমন ওকে কাছে টেনে নেয়। গায়ে সুগন্ধি সাবান, লোশনের ঘ্রাণ পায়। ও গলায়, গালে মুখ ঘষতে ঘষতে বলে, ‘ওরা ঘুমিয়েছে?’

নাফিসা ছোট্ট করে বলে, ‘উহু। দুই ভাই বোন গল্প করে তবে ঘুমোবে।’

সুমন ততক্ষণে ওর বুকে মুখ রেখেছে। মুখ তুলে বলে, ‘যদি এসে পড়ে?’

নাফিসা ফিক করে হেসে ফেলে, ‘আসবে না।’

সুমন আদর করতে থাকে। নাফিসা চোখ বুঁজে ওর আদরটুকু নিতে থাকে। আলো আঁধারিতে নাফিসার সুখী মুখটা দেখা যায়। ততক্ষণে সুমন আদরের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। হঠাৎ করেই মীরার মুখটা মনে পড়ে ওর। একটু থমকে যায়।

নাফিসা নিচু গলায় ফিসফিস করে বলে, ‘কী হলো, থামলে কেন? ওরা কেউ এল?’

সুমন মাথা নাড়ে, তারপর আবার আদর করতে করতে বলে, ‘একটা শব্দ হলো। ভাবলাম বাচ্চারা কেউ।’

সুমন এবার জোর করে মীরার মুখটা মন থেকে সরায়। তারপর ধ্যানী যোগীর মতো কাজটা শেষ করে। তৃপ্তির একটা শব্দ বের হয়ে আসে নাফিসার গলা থেকে। কিছুক্ষণ দুজনে নিঃসাড় পড়ে থাকে। তারপর সুমন গড়ান দিয়ে বিছানা থেকে নেমে বাথরুমে যায়। বের হয়ে বারান্দায় বসে। এখন একটা সিগারেট খাবে ও।

নাফিসার সারা শরীর জুড়ে এখন আরামদায় একটা ক্লান্তি। উঠতে ইচ্ছে করছে না। সুমনের আদরটুকু খুব ভালো লাগে। কিন্তু আজ একটু আনমনা ছিল কি ও?

(চলবে)

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর