হারানো হিয়া পর্ব-০৩

0
125

#হারানো_হিয়া (পর্ব ৩)

মীরা গান শুনছিল –

হারানো হিয়ার নিকুঞ্জপথে কুড়াই ঝরা ফুল একেলা আমি।
তুমি কেন হায় আসিলে হেথায় সুখের স্বরগ হইতে নামি।

নজরুল সঙ্গীত। কেমন মন উদাস হয়ে যায় এই গানটা শুনলে। সুমনের সঙ্গে দেখা হয়ে যেতে পারে এটা জানা ছিল। কিন্তু সেটা এত তাড়াতাড়ি জানা ছিল না। আকাশি রঙের জিন্স সঙ্গে খয়েরী টি-শার্টে ওকে খুব ভালো লাগছিল। আগেরমতো শুকনো নেই, স্বাস্থ্য হওয়াতে বেশ ভালো লাগছিল। আচ্ছা, ও একবারও মুখ ফিরিয়ে দেখলও না ওকে, কথা বলা দূরে থাক। এত অভিমান!

বিকেল হয়েছে। ছেলে ইহান এখনও পাশের রুমে ঘুমুচ্ছে। নতুন জায়গায় এসে একা একা বাইরেই বেরোয় না। মীরা ব্যালকনিতে বসে নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে ছিল। এলাকাটা আগে একদম ফাঁকা ছিল। হাতে গোনা এক থেকে দুটো একতলা, দুইতলা বাড়ি ছিল। এখন যেদিকেই তাকায় সবগুলো বাড়ি চার-পাঁচ তলা করে। মামার এই বাড়িটাও পাঁচতলা। ওরা তিন তলায় থাকে। বাসাটা বড়ো, পাশাপাশি দুটো ইউনিট মিলে একটা বড়ো বাসা করা হয়েছে। মামা, মামি অনেক দিন ধরেই এখানে আছেন।

নীচ থেকে বাচ্চাদের হৈহল্লা ভেসে আসছিল। একটু উঁকি দিতেই দেখে একটা ফ্রক পরা মেয়ে সাইকেল চালাচ্ছে, পেছনে একটা ছেলে ধরে রেখেছে যেন পড়ে না যায়। মেয়েটা এঁকেবেঁকে সাইকেল চালাচ্ছে, আর ছেলেটা পিছু পিছু ছুটছে।

হুট করেই মীরার অনেক দিন আগের একটা দৃশ্য মনে পড়ে যায়।

শীতের এক রাতে মীরা জানালার পাশে বসে পড়ছিল। সামনেই পরীক্ষা। ঠিক এমন সময় সুমনকে আসতে দেখে। গেট দিয়ে ভেতরে সাইকেল ঢুকাচ্ছিল। গায়ে বুড়ো মানুষের মতো একটা কালো চাদর জড়িয়ে রাখা। মীরা দ্রুতই সিদ্ধান্ত নেয়। চট করে একবার দেখে নেয়, তারপর বাসা থেকে বের হয়েই সিঁড়ির মুখে সুমনকে ধরে, ‘অ্যাই সুমন, সাইকেল বের কর, কথা আছে।’

সুমন থমকে দাঁড়ায়। সেদিনের সেই পেঁয়াজু দেবার পর থেকে ওর সঙ্গে একটা বোঝাপড়া হয়ে গেছে। মাঝে মাঝেই মেয়েটা ওর কাছে অদ্ভুত সব আবদার করে। সেদিন বলল, তালগাছের মাথায় উঠতে পারবে কিনা? কী দরকার সেটা জিজ্ঞেস করতেই বলে, ‘তালগাছের মাথা থেকে আকাশ ছোঁয়া যায় কিনা সেটা জানতে ইচ্ছে করছিল।’

মেয়েটার মাথায় গন্ডগোল আছে। এখন রাত দশটা বাজে। শীতের রাত মানে অনেক রাত। ও মাত্রই আজকের শেষ টিউশনিটা করে এল। খুব ক্ষুধা পেয়েছে। সেকথা বলতেই ও ষড়যন্ত্রের গলায় বলে, ‘তোর জন্য কেক রেখেছি। আমাকে একটু সাইকেলে করে ঘুরিয়ে আন, তখন দেব।’

সুমন তোতলানো গলায় বলে, ‘তোর কী মাথা খারাপ হয়েছে যে তুই আমার সাইকেলে উঠবি? কেউ দেখলে আর দেখতে হবে না।’

মীরা চোখ পাকায়, ‘তোর সব তাতেই ভয়। অত ভয় পেলে আকাশ ছুঁবি কী করে রে বোকা। চল, রাতের বেলা কেউ দেখবে না। তোর চাদরটা আমাকে দে, আমি মুখ ঢেকে বসব। কেউ বুঝতেই পারবে না।’

সুমন না করতে গিয়েও পারে না। ওকে কড়া করে কিছু বলতে গেলেই কোথায় যেন বাঁধে। মেয়েটার মা নেই, কথাটা ভাবলেই কষ্ট হয়।

ও গায়ের চাদরটা খুলে ওকে বাড়িয়ে দেয়, ‘নে, ভালো করে গায়ে পেচিয়ে নে। মুখ যেন দেখা না যায়।’

মীরার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠে। দ্রুত চাদরটা গায়ে পেচিয়ে নিতে গিয়ে নাক কুঁচকায়, ‘এহ, সিগারেট খাস নাকি?’

সুমন ইদানিং সিগারেট খাওয়া শুরু করেছে। বাসায় জানলে খবর আছে। ও ঠোঁটে আঙুল রেখে বলে, ‘চুপ, কাউকে বলিস না কিন্তু।’

মীরা ষড়যন্ত্রের গলায় বলে, ‘আচ্ছা বলব না। তুই আমাকে মাঝে মাঝে সাইকেলে চড়াস। বিশেষ করে যেদিন আমার মন খারাপ থাকবে।’

সাইকেল বের করতে করতে ও থমকায়। তারপর নরম গলায় বলে, ‘তোর মন খারাপ? কী হয়েছে?’

মীরা ছোট্ট একটা নিশ্বাস ফেলে বলে, ‘আজ সারাদিন মায়ের কথা মনে পড়ছিল খুব। মায়ের মৃত্যুবাষিকী আজ।’

সুমন টের পায় ওর কষ্ট হচ্ছে। কারও মা না থাকাটা ভীষণ কষ্টের। আর এমন ভয়াবহ কষ্টের কথা যখন কেউ বলে তাকে কী করে সান্ত্বনা দিতে হয় ওর জানা নেই।

ও অসহায়ের মতো কথা হাতড়ে বেড়ায়। তারপর কিছু না পেয়ে বলে, ‘সাইকেলে ওঠ। শক্ত করে ধরে বসিস।’

মীরার শরীরটা পাখির মতো হালকা। পেছনে যে কেউ চড়েছে সেটা বোঝাই যায় না। সুমন ধীরে ধীরে প্যাডেল দিচ্ছিল। কুয়াশা পড়া শুরু হয়েছে। সড়কের ল্যাম্পপোস্টগুলোর আলো কেমন থমকে গেছে সাদা কুয়াশায়।

মীরার খুব ভালো লাগছিল। ও পেছন থেকে গলা বাড়িয়ে বলে, ‘এই, তোর তো ঠান্ডা লাগছে।’

সুমন পেছন ফিরে বলে, ‘লাগছে না। তুই চুপ করে বসে থাক, কথা বলিস না।’

সত্যি কথা বলতে সুমনের ভালোই ঠান্ডা লাগছিল। শীতের বাতাস কেমন হিম ধরিয়ে দিচ্ছিল।

একটু সামনে এগোতেই সুমন টের পায় পেছন থেকে মীরা আলতো করে একটা হাত দিয়ে ওর পেটের কাছটায় জড়িয়ে ধরেছে। বুকের ভেতর কেমন অবশ হয়ে আসে, সেই সাথে পায়ে জোর কমে আসে। কোনোমতে বলে, ‘কী করছিস!’

মীরা ওর পিঠের কাছে সরে এসে বলে, ‘তুই চালা ঠিকঠাক। আমি তোরে একটু ধরে বসলাম। না হলে পড়ে যাব। তুই যে বিশ্রী করে সাইকেল চালাস তাতে পেছনে যে থাকবে সে উল্টে পড়ে যাবে।’

ডাহা মিথ্যা কথা। ও খুব সাবধানেই সাইকেল চালাচ্ছে। কিন্তু ওর এই মিথ্যে কথাটা সুমনের ভীষণ ভালো লাগে। একটা নরম মায়া বুকের ভেতর ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

ফেরার পথে ঝামেলাটা হয়। একটা মোড় পেরোতেই মীরার বাবা আশরাফ সাহেবকে দেখতে পায়। ভদ্রলোক নিরীহ গোছের। কোনো চাকরি বা অন্য কিছু করে না। সারাক্ষণ এদিক ওদিক ঘোরাঘুরি করে আর মোড়ের দোকানে বসে চা খায়। ওদের সংসার কী করে চলে কে জানে। মাঝে মাঝে ওর এক মামা আসে। যতটুকু বুঝেছে উনিই সংসার খরচ চালান। দুই বোন ওরা। মীরার বড়ো বোন ইরা আপার বছরখানেক আগেই বিয়ে হয়েছে।

সুমন ভয় পাওয়া গলায় বলে, ‘মীরা, তোর আব্বা এদিকে আসছে। মুখ ঘুরিয়ে বস।’

সুমন মাথা নিচু করে জোরে সাইকেলের প্যাডেল চালায়। আশরাফ সাহেব অবাক হয়ে খেয়াল করেন ওদের বাসার দোতলার ছেলেটা একটা মেয়েকে পেছনে বসিয়ে এই শীতের রাতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আজকালকার ছেলেমেয়েদের এত সাহস বেড়েছে যে চোখের সামনেই প্রেম করছে।

সুমন সরাসরি বাসায় ঢোকে না। বাসা পেরিয়ে সামনে একটা অন্ধকার জায়গায় গিয়ে সাইকেল রাখে। তারপর মীরাকে নামিয়ে বলে, ‘তুই আগে বাসায় যা। তোর আব্বা মনে হয় আমাকে চিনে ফেলেছে। তোকে দেখতে পেলে খবর ছিল।’

মীরা ঠোঁট উলটে বলে, ‘কোনো সমস্যা নেই। আব্বা কিছু বলবে না। মামা দেখলে সমস্যা ছিল। জানিস তো, মামাই আমাদের আসল গার্জিয়ান। মামা এই এলাকায় একটা জমি কিনেছে, পাঁচ তলা বাড়ি বানাবে। আব্বাকে বলেছে দেখশোনা করতে।’

সুমন এবার বুঝতে পারে কেন ও মামার কথা বলল। ও তাড়া দিয়ে বলে, ‘আচ্ছা তুই যা। আর আমার চাদরটা দিয়ে যা।’

মীরা চাদর খুলে ওর হাতে দেয়, তারপর বলে, ‘তোর খুব ঠান্ডা লেগেছে তাই না? এরপর জ্যাকেট পরে বেরোবি। আর চাদরটা আমাকে দিবি। আর আমাকে কিন্তু সাইকেল চালানো শেখাতে হবে।’

মীরা চলে যায়। সুমন চাদর গায়ে জড়াতেই একটা মিষ্টি ঘ্রাণ টের পায়। মীরার গায়ের ঘ্রাণ। বুক ভরে মিষ্টি ঘ্রাণটা নেয়।

এরপর প্রায় রাতেই মীরা জোর করে বের হতো, সাইকেল চালানো শিখতে। সুমন পেছন থেকে সাইকেলের ক্যারিয়ার ধরে রাখত। আর মীরা এঁকেবেঁকে সাইকেল চালাত। এক দুবার পড়ে গিয়ে ব্যথাও পেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাইকেল চালানোটা শিখেছিল।

‘মীরা, সন্ধ্যা হয়ে এল। এবার ভেতরে এসে ছেলেকে ঘুম থেকে উঠা’, ভেতরের ঘর থেকে মামির গলা ভেসে আসে।

মামা মামির কোনো সন্তান নেই। সেই ছোটবেলা থেকেই ওদের দুই বোনকে সন্তানের মতোই দেখে।বিশেষ করে মা মারা যাবার পর থেকে। বাবা কখনোই তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি। কাপড়ের দোকান ছিল কিন্তু তাতে লস খেয়ে একেবারে পথে বসে যাবার অবস্থা। পরে এই মামাই ওদের পুরো সংসারের দায়িত্ব নিল। দুই বোনের বিয়ে দিল।

মীরা বারান্দা থেকে ভেতরে এসে ইহানকে টেনে তুলে, ‘বাবা, হাতমুখ ধুয়ে পড়তে বসো।’

ইহান এবার ক্লাশ এইটে। পুজোর ছুটি চলছে এখন। তারপরও মীরা আসার সময় ওকে বই খাতা নিয়ে আসতে বলেছিল।

ইহান গোমড়া মুখে বলে, ‘ছুটির মধ্যে আমি পড়ব না।’

মামি এর মধ্যে রুমে ঢোকে। তারপর ইহানের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে, ‘ঠিকই বলেছে আমার নানুভাই। ছুটিতে আবার পড়া কিসের? তুই বরং ওকে নিয়ে বাইরে থেকে খেয়ে আয়। এখানে ভালো একটা রেস্টুরেন্ট হয়েছে।’

ইহান লাফিয়ে উঠে, ‘তাই! আমি যাব, কতদিন ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ফ্রাইড চিকেন খাই না।’

মীরা বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘নুডুলস বানিয়ে দিচ্ছি, খাও। বাইরে যেতে হবে না।’

ইহান ঘাড় গুঁজে বলে, ‘আমি বাইরে খাব।’

মীরার মামি ইয়াসমিন এবার রাগত সুরে বলেন, ‘মীরা, তুই বাইরেই যেতে চাস না। সারাক্ষণ বাসায় বসে থাকলে আরও মন খারাপ লাগবে। যা, ওকে নিয়ে একটু ঘুরে আয়, ভালো লাগবে।’

মীরা কিছু বলতে গিয়েও বলে না। বাইরে যেতে ইদানিং ভয় লাগে। আবার যদি সুমনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়!

রেস্টুরেন্টে এসে কিন্তু খুব ভালো লাগে মীরার। এত সুন্দর, চমৎকার ছিমছাম একটা রেস্টুরেন্ট এই এলাকায় হয়েছে ও ভাবতেও পারেনি। ইহান খুব খু্শি। মীরা ওর জন্য ফ্রেঞ্চ ফ্রাই আর চিকেন অর্ডার করে। নিজের জন্য একটা কফি নেয়।

আশেপাশে ইতোমধ্যে সব টেবিল ভরে উঠেছে। কাউকেই চেনে না। কত দিন আগে এই এলাকা ছেড়েছে। সব নতুন মানুষ চারপাশে।

ইহানের খাবার চলে আসতেই ও হাত বাড়ায়। আজ ছেলেটাকে খুশি খুশি লাগছে। এই কদিন কেমন মনমরা হয়ে পড়ে ছিল।

কফি আসে। কায়দা করে কফির মগে একটা পাতা আঁকানো। কফির উপর এই পাতা, বা অন্য যে ছবিগুলো আঁকে তাকে ‘ল্যাতে আর্ট’ বলে। মীরা একটা সময় পেস্ট্রি এন্ড কফির উপর একটা ডিপ্লোমা করেছিল৷ ইচ্ছে ছিল নিজে কিছু করার। করা হয়ে উঠেনি। সে সময় ও কাজটা শিখেছিল। জেনেছিল এই ল্যাতে আর্টের কাজ প্রথম শুরু হয় ইতালিতে। ইতালির লুইগি লুপি এবং আমেরিকার ডেভিড স্কোমার নামের দুজন মিলে এই ভিন্নধর্মী শিল্প সৃষ্টি করে। কফিকে আরও জনপ্রিয় করে তুলতেই এই প্রচেষ্টা। পুরো কাজটা দুধের ফোম দিয়ে হাতেই করা হয়। অনেকে ভাবে এটা মেশিনে করে। কিন্তু এটা হাতে করে।

কত কী মনে পড়ে গেল। মীরা কফিতে চুমুক দিতে গিয়ে থমকায়। সুমন রেস্টুরেন্টে ঢুকছে, সাথে দুটো বাচ্চা। একটা মেয়ে আর একটা ছেলে। সুমন আশেপাশে তাকাচ্ছে, এখন কোনো টেবিল খালি নেই। শুধুমাত্র ওর টেবিলের সামনে তিনজনের একটা সিট খালি। বসতে হলে এখানেই বসতে হবে। মীরা কেমন গুটিয়ে যায়। ইশ, এজন্যই ও আসতে চায়নি।

ঠিক এই সময় সুমন এদিকটায় তাকায়। মীরা মাথা নামায়। সুমন কি আসবে, ওর সামনে এসে বসবে?

(চলবে)