#হারানো_হিয়া (পর্ব ৪)
আজ বিকেল থেকেই জুঁই আর তূর্য পিছে পড়েছে বাইরে খাবে। ছুটির দিন হলেই বাবা শুধু বাইরে থেকে ছোলা, পেঁয়াজু নিয়ে আসে। একই নাস্তা খেতে আর ভালো লাগে না। নাফিসাও তাল মিলিয়ে বলে, ‘শুধু নিজের পছন্দের খাবার নিয়ে আসো। বাচ্চারা যে একটু চিকেন খেতে চায়, ওদের নিয়ে একটু বাইরে যাও না, খেয়ে আসো।’
মায়ের সমর্থন পেয়ে এবার দুই ভাইবোন ওর পিছে পড়ে, ‘বাবা, চলো এখুনি।’
অগত্যা ওদের নিয়ে বেরোতেই হলো। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ভুল হলো বাইরে এসে। মীরা বসে আছে রেস্টুরেন্টে। সাথে একটা ছোট ছেলে। ওর ছেলে?
সুমন চারপাশে আগেই চেয়ে দেখেছে, বসার জায়গা খালি নেই। বসতে হলে মীরার সামনের সিটে বসতে হবে। ও তাড়াহুড়ো করে বলে, ‘বাবা, চলো অন্য কোথাও যাই। এখানে বসার জায়গা নেই।’
এই রেস্টুরেন্টের ফ্রাইড চিকেন খুব মজা। সেই সাথে এখানকার আইসক্রিমটা। লম্বা চোঙা মতো একটা কাচের গ্লাসে আইসক্রিম দেয়। উপরে লাল স্ট্রবেরি বসানো থাকে। জুঁই এর খুব ভালো লাগে এটা। ও ঘাড় গুঁজে বলে, ‘বাবা, এখানেই খাব। আমরা একটু দাঁড়াই তাহলে। সিট খালি হোক।’
ঠিক এই সময় রেস্টুরেন্টের পরিচিত একজন ওয়েটার এসে বলে, ‘ভাইয়া, দাঁড়ায় আছেন কেন? সিট আছে তো। ওই যে ওই টেবিলটায় আপনারা তিনজন অনায়াসে বসতে পারবেন।’
টেবিলের দিকে আঙুল তুলে দেখাতেই জুঁই আর তূর্য ছুটে যায়। তারপর তূর্য চিৎকার করে বলে, ‘বাবা, আসো এদিকে।’
সুমন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়। এখন বসতেই হবে, না হলে শুধু শুধু একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।
টেবিলের এপাশ থেকে মীরা আগ্রহ নিয়ে ওদের দুই ভাইবোনকে দেখছিল। ও আদরমাখা গলায় বলে, ‘তোমাদের নাম কী?’
তূর্য আগ বাড়িয়ে বলে, ‘আমার নাম তূর্য আর ওর নাম জুঁই। তোমার নাম কী?’
ততক্ষণে সুমন এসে বসেছে, মুখ গম্ভীর।
মীরা হেসে বলে, ‘আমার নাম মীরা। তোমার বাবার বন্ধু আমি।’
সুমন ঝট করে মুখ তোলে। আর সাথে সাথে সুযোগটা নেয় মীরা, ‘কেমন আছিস সুমন?’
ইহান ওর চিকেনে কামড় দিতে দিতে সামনে বসা মেয়েটা আর ছেলেটাকে দেখছিল। পিচ্চি ছেলেটা পটপট করে কথা বলছিল। এখন দেখি মা-ও এদের বাবাকে চেনে!
সুমন কেমন এলোমেলো হয়ে যায়। চোখে চোখ রাখতে গিয়েও চোখ সরিয়ে নেয়। অস্বস্তি নিয়ে বলে, ‘ভালো আছি।’
তারপর বাচ্চাদের দিকে ফিরে বলে, ‘তোমরা কী খাবে, অর্ডার দাও।’
জুঁই আগ্রহ নিয়ে সামনে বসা নতুন আন্টিটার দিকে তাকিয়ে ছিল। কী সুন্দর উনি! বলল, বাবার বন্ধু। কিন্তু কই, বাবা তো ভালো করে কথাই বলছে না ওনার সঙ্গে।
তূর্য ইহানের ফ্রেঞ্চ ফ্রাই এর দিকে তাকিয়ে ছিল।তাই দেখে মীরা কয়েকটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ওর হাতে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, ‘তোমার খাবার আসতে আসতে এটা খাও।’
তূর্যকে না করার আগেই ও হাত বাড়িয়ে নেয়। সুমন কটমট করে তাকিয়ে থাকে।
ওয়েটার এসে অর্ডার নিয়ে যেতেই মীরা এবার নিজে থেকেই বলে, ‘এই আমার ছেলে, ইহান। ক্লাশ এইটে। আর দুমাস পরেই নাইনে উঠবে।’
সুমন ইহানের দিকে তাকিয়ে একটু হাসে, ‘বাহ! খুব ভালো তো। আর এই দুজন আমার ছেলেমেয়ে। ও ক্লাশ সিক্সে আর ও ওয়ানে।’
মীরা আদরমাখা গলায় বলে, ‘হ্যাঁ, ওদের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে। তোর আব্বা, আম্মা কেমন আছে? এখানেই ওনারা?’
সুমন মাথা নাড়ে, ‘না, বড়ো ভাইয়ার সঙ্গে ঢাকায় থাকেন। মাঝে মাঝে এখানে এসে থেকে যায়। তোর বাবা কেমন আছে?’
মীরার মুখে বিষণ্ণতা খেলা করে। তারপর মন খারাপ গলায় বলে, ‘নেই। আমার প্রিয় মানুষেরা কেউ বেশিদিন আমার সঙ্গে থাকে না।’
সুমন থমকায়। মীরার বাবা মারা গেছে!
এর মাঝেই খাবার আসে। জুঁই একবার বাবার দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তুমি কিছু নিলে না বাবা? আমার এখান থেকে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাও।’
সুমন মাথা নাড়ে, ‘তোরা খা। আমি একটা কফি নেই।’
তূর্য ওর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই থেকে গুনে গুনে চারটা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই ইহানের দিকে বাড়িয়ে বলে, ‘এই নাও, তোমারটা ফেরত দিলাম।’
ইহান চোখ বড়ো বড়ো করে তাকায়, তারপর মাথা নেড়ে বলে, ‘লাগবে না। তুমি খাও।’
মীরা এবার হাত বাড়িয়ে বলে, ‘আচ্ছা আমাকে দাও। আমি খাব।’
তূর্য খুব মজা পায়। এই আন্টিটা খুব মজার। ও হাত বাড়িয়ে দিতেই মীরা ওর হাত চেপে ধরে। তারপর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে আলতো করে মুখে দেয়। একবার তাকায়, সুমন কেমন মন খারাপ করে বসে আছে। নাহ, ওকে একটু স্বাভাবিক করা দরকার।
মীরা এবার জুঁইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আম্মু, তুমি কোন স্কুলে পড়ো?’
জুঁই লাজুক গলায় বলে, ‘ক্যান্ট বোর্ড স্কুল।’
পাশ থেকে তূর্য বলে, ‘আমিও। ওটা আমাদের আম্মুর স্কুল।’
মীরা চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, ‘ও মা, তাই নাকি। তোমার আম্মু টিচার?’
তূর্য মাথা নাড়ে, ‘হ্যাঁ তো। তুমি পড়বে আমাদের স্কুলে?’
মীরা এবার হেসে ফেলে। তারপর বলে, ‘তোমার এই ভাইয়াটা পড়বে।’
মীরা এবার সুমনের দিকে চোখ তুলে বলে, ‘ইহানকে এখানকার স্কুলে ভর্তি করতে চাই। তোর বউ টিচার? তাহলে তো ভালোই হলো। একটু কথা বলে দেখিস তো ইহানকে যেন ভর্তি করাতে পারি। আচ্ছা থাক, আমিই একদিন তোর বাসায় গিয়ে পরিচয় হয়ে আসব।’
সুমন থমকায়। মীরা কেমন স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে। দেখে মনে হয় কিছুই হয়নি। অথচ বিশ বছর আগে ভাদ্রের এক তালপাকা গরমের দিনে দুপুর বেলা ও যখন নিজের রুমে ঘুমিয়েছিল সেদিন আচমকা মীরা ওর রুমে এসেছিল। ওকে ধাক্কা দিয়ে ঘুম থেকে তুলে আকুল গলায় বলেছিল, ‘মামা আমার বিয়ে ঠিক করেছে, তুই প্লিজ কিছু একটা কর।’
সুমনের তখনও ঘুমটা পুরোপুরি ভাঙেনি। ও অবাক চোখে মীরাকে দেখছিল। ওর চোখমুখ লাল, চোখ ভেজা। ওকে চুপ থাকতে দেখে বলে, ‘কী রে, তুই কিছু করবি না।’
সুমন টের পায় বুকের ভেতর কী একটা হচ্ছে। মীরার বিয়ে হয়ে যেতে পারে এই ভাবনাটা কখনোই আসেনি। ওর বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ হতে আরও এক বছর বাকি। বাবা ছোট একটা চাকরি করত। সবে রিটায়ার করেছেন। বড়ো ভাইয়া এখনও তেমন কিছু করে উঠতে পারেনি। তাই বিয়েও করেনি বড়ো ভাইয়া। এই অবস্থায় নিজের বিয়ের কথা ও বলে কী করে?
ও কোনোমতে বলেছিল, ‘তুই বাসায় যা। আমি দেখছি কী করা যায়।’
মীরা সেদিন ওর হাত খামচে ধরে বলেছিল, ‘প্লিজ একটা কিছু কর সুমন। আমার কিন্তু বিয়ে হয়ে যাবে। বাবা এই সুযোগ ছাড়বে না। মামা নিজে খরচ করে বিয়ে দিতে চাচ্ছে, পরে তো নাও খরচ করতে পারে। তাই বাবা আমার পড়াশোনা শেষ হওয়া পর্যন্তও অপেক্ষা করতে নারাজ। দেরি করিস না সুমন।’
মীরা চলে যায়। সুমন বিহবল হয়ে বসে থাকে। মাথার উপর নীল রঙের ফ্যানটা প্রাণপনে ঘুরছে, কিন্তু তাতে করে ভাদ্রের এই অসহনীয় গরম এতটুকু কমছে না। আসলে এই সামান্য পাখার সেই ক্ষমতাটুকুই নেই। যেমন ওর নেই মীরাকে সাহস করে বিয়ের কথা বলা।
তাও ও বলেছিল। মা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। বড়ো ছেলে এখনও বিয়ে করেনি। সংসারের হাল শেষ পর্যন্ত সুমনকেই ধরতে হবে। ছেলেটার মাথা ভালো। ইঞ্জিনিয়ারিংটা পাশ করে বের হলেই আর চিন্তা নেই। কিন্তু এখন এই সময়ে বিয়ে করলে কী হবে জানা নেই।
মা বড়ো আপাকে নিয়ে মীরাদের বাসায় গিয়েছিল। ওর বাবা, মামা, মামি সবাই ছিল সেদিন। ওরা মায়ের সঙ্গে কোনো খারাপ ব্যবহার করেনি। বুঝিয়ে বলেছিল মীরার এত ভালো একটা বিয়ে এসেছে, বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার। ঢাকায় বাবার নিজস্ব চার তলা বাসা আছে। সেই তুলনায় সুমনরা এখনও ভাড়া বাসায় থাকে। ডিপ্লোমা পাস করে তারপর বিএসসি করছে। বুয়েটের ওই ছেলের কাছে ও কিছুই না।
মীরাও পাশের রুম থেকে সব শুনেছিল। এটুকু বুঝতে পারছিল সব আশা শেষ। কিছুতেই আর কিছু হবার নয়। সুমনের মাকে প্রকারান্তরে অপমানই করে দিল মামা, মামি। পালিয়ে বিয়ে করবে সে উপায় নেই। বাবাকে কে দেখবে? ওর উপর রাগ করে মামা যদি বাবাকে আর না দেখে? কথা ছিল ওর বিয়ের পর বাবা মামা, মামির সঙ্গেই থাকবে। কিন্তু ও যদি এখন মামা, মামির পছন্দের পাত্রকে বিয়ে না করে তাহলে নিশ্চয়ই ওনারা কথা রাখবেন না।
সুমন যখন সব জানল তখন ও ঘর থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। ওর সাইকেলটা নিয়ে অনেক দূরে একটা মাঠে গিয়ে বসেছিল পুরো একটা বেলা। শুধু একটা কথাই মনে হয়েছিল এই জীবনে ওর কাছে অদ্ভুত সব আবদার করার আর কোনো মানুষ রইল না।
যেদিন ওর বিয়ে হয় সেদিন কে যেন হাসানের তখনকার সময়ের জনপ্রিয় একটা গান বাজাচ্ছিল –
চারিদিকে উৎসব
পরিপূর্ণ নিয়ন আলোয়
আমার এ পৃথিবী
ঘিরে আসছে আঁধার কালোয়
সানাইয়ের সুর
নিয়ে যাবে দূর
একটু একটু করে তোমায়
আজকে রাতেই
তুমি অন্যের হবে
ভাবতেই জলে চোখ ভিজে যায়
এতো কষ্ট কেন ভালোবাসায় ?
সত্যিই, এত কষ্ট কেন ভালোবাসায়। সুমনের মনে পড়ে ও একটা মাস ঠিক করে খেতে পারত না। চুপিচুপি প্রায়ই চোখ ভিজে যেত। তারপর আর কারও সঙ্গে এই জীবনে জড়ানো হয়নি।
‘বাবা, আমিও আইসক্রিম খাব’, তূর্যের ডাকে সম্বিত ফিরে পায় সুমন।
ছেলেটার ঠান্ডার ধাত। ও একটু দোনোমোনো করে বলে, ‘খাবি? তোর মা জানলে বকবে।’
তূর্য পাকা গলায় বলে, ‘আমি গরম করে খাব বাবা।’
মীরা হেসে ফেলে, ‘ওরে আমার সোনাটা, কী বুদ্ধি! সুমন, খাক না একটু।’
সুমন মাথা নাড়ে। তারপর তূর্যের জন্য আইসক্রিম অর্ডার করতেই জুঁই বলে, ‘বাবা, আমি একটু খেলতে যাই?’
রেস্টুরেন্টের এককোণে বাচ্চাদের জন্য প্লে জোন। সুমন সম্মতি দেয়, ‘যা।’
তূর্য উঠে দাঁড়ায়, ‘আমিও যাব। ততক্ষণে আমার আইসক্রিম গরম হোক। তুমি যাবে?’
শেষ কথাটা ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে।
ওরা উঠে দাঁড়াতেই ইহান মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, ‘আম্মু আমি যাই?’
মীরা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়।
ওরা চলে যেতেই হঠাৎ করেই ওদের সব কথা ফুরিয়ে যায়। মাথা নিচু করে কফি খেতে থাকে। একটা অদ্ভুত প্রশ্ন ওর মাথায় ঘুরে। মীরার বিয়ে হয়েছে ওর বিয়ের কমপক্ষে পাঁচ বছর আগে। কিন্তু ওর ছেলে এত ছোট কেন? নাকি বাচ্চা হতে দেরি হয়েছিল? সুমন ভেবে অবাক হয় ওর মাথায় এমন অদ্ভুত প্রশ্ন কেন ঘুরছে।
মীরা নীরবতা ভাঙে, ‘সুমন, আমার ছেলেকে এখানকার স্কুলে ভর্তি করাতেই হবে। তুই তোর বউকে একটু বলে রাখিস।’
সুমন ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘হঠাৎ ঢাকা ছেড়ে এখানে কেন? তোর হাসব্যান্ডের কি ট্রান্সফার হয়েছে?’
মীরা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। তারপর নিচু গলায় বলে, ‘কয়েক মাস আগে ওর বাবা একটা কার এক্সিডেন্টে মারা গেছে। তাই এখানে চলে আসা।’
সুমন স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। আচ্ছা, এই মেয়েটার কপাল এমন কেন? সুখের সঙ্গে বুঝি ওর আজীবনের শত্রুতা।
মীরা আকুল গলায় বলে, ‘ইহানের ব্যাপারটা একটু দেখিস। ঢাকায় ওর দাদার বাসায় অনেক ঝামেলা চলছে। ওরা তিন ভাই, দুই বোন। সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে প্রতিদিন ঝগড়াঝাটি হয়। আমি আর একা পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত আবার মামার কাছেই আশ্রয় নিতে হলো। আমি সারাজীবন আশ্রিতই থেকে যাব।’
সুমনের বুকের ভেতরটা হাহাকার করে ওঠে। যদি পারত এই মেয়েটাকে সারাজীবনের জন্য ওর এমন আশ্রিত থাকবার ভয়টা ঘুচিয়ে দিত।
বিদায় নেবার সময় মীরা কুন্ঠিত গলায় বলে, ‘তোর মোবাইল নম্বরটা দিবি একটু? এখানে তো কাউকেই এখন তেমন করে চিনি না। তোকে ফোন দিলে ধরবি তো?’
সুমন ম্লান হাসে, তারপর ফোন নম্বর দিয়ে বলে, ‘কিছু লাগলে আমাকে ফোন দিস। আর ইহানের কথা আজ আমি বাসায় বলব।’
মীরা কৃতজ্ঞ গলায় বলে, ‘খুব উপকার হবে আমার। আমি দুমাস পরে একবারেই চলে আসব। ওর ফাইনাল পরীক্ষা শেষ হলেই।’
মীরা তূর্য আর জুঁইকে আদর করে দিতেই তূর্য বলে, ‘আমাদের বাসায় এসো কিন্তু আন্টি।’
মীরা হাসে। তারপর ইহানকে নিয়ে ওরা বের হয়।
সুমনও জুঁই আর তূর্যকে নিয়ে বের হয়, আলাদা পথে।
বাসায় এসেই তূর্য মায়ের সঙ্গে গল্প জুড়ে দেয়, ‘আম্মু জানো বাবারও একটা বন্ধু আছে। আজ আমাদের সঙ্গে খেয়েছে।’
নাফিসা ভ্রুকুটি করে তাকিয়ে বলে, ‘কে? শরিফ ভাই এসেছিল রেস্টুরেন্টে?’
শরিফ ওর বাল্যবন্ধু। নাফিসা চেনার মধ্যে ওকেই একটু চেনে। অবশ্য চেনার আরেকটা কারণও আছে। শরিফের বউ রিপাও ওর স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক, নাফিসার কলিগ।
সুমন মাথা নেড়ে বলে, ‘আমার অনেক পুরনো একটা বন্ধু, মীরা। হঠাৎ করেই ওখানে দেখা হয়ে গেল। অনেক দিন পর এখানে এসেছে। ঢাকায় থাকত, এখন নাকি এখানেই থাকবে। ওর ছেলের স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে জিজ্ঞেস করছিল। তোমার কথা বললাম, বলল যদি পারো একটু সাহায্য করতে।’
নাফিসা কপাল কুঁচকে কথাগুলো শুনছিল। সুমন হড়বড় করে এত কথা বলছে কেন? গলার সুরে একটা কৈফিয়ত দেবার ভাব। এই মেয়ের সঙ্গে পুরনো কোনো ঝামেলা নাই তো?
নাফিসা একটু গম্ভীরমুখে বলে, ‘তোমাদের আজই দেখা হলো?’
সুমন ভেতরে ভেতরে শংকিত হয়। নাফিসার গলার সুর ভালো লাগছে না। ও একটু বিরক্তি নিয়ে বলে, ‘আজই দেখা হয়েছে। রেস্টুরেন্টে খেতে খেতে বলছিল ওর ছেলে এখন ক্লাশ এইটে। ডিসেম্বরে এখানে এসে পাকাপোক্তভাবে থাকবে। ক্লাশ নাইনে ভর্তি হবে। তুমি স্কুলে আছ শুনেই তোমাকে অনুরোধ করল।’
সেদিনের বৃষ্টির বিকেলে দেখা হবার কথাটা ইচ্ছে করেই বলল না। নাফিসা গম্ভীরমুখে বলে, ‘কিন্তু ডিসেম্বরে তো আমি ওদের নানু বাড়ি যাব। আচ্ছা, অসুবিধে নেই আমি রিপাকে বলে যাব।’
সুমন একটা হাঁপ ছাড়ে। ইশ, নাফিসা এত জেরা করছিল কেন? নাকি ও নিজেই ভয় পেয়ে গেছ?
নাফিসা রান্নাঘরে এসে চুলো জ্বালায়। একটা হাড়িতে চাল ধুয়ে বসিয়ে দেয়। চুলোর চাবি ঘুরিয়ে বাড়িয়ে দিতেই আগুনটা লকলক করে বেড়ে উঠে। সুমনকে আজ বেশ নার্ভাস লাগছিল ওই ওর পুরনো বন্ধুর কথা বলার সময়। আচ্ছা আসল কথাই তো জিজ্ঞেস করা হলো না, ওর বান্ধবী এতদিন পর ঢাকা ছেড়ে এই মফস্বলে কেন আসতে গেল?
(চলবে)
মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর