হারানো হিয়া পর্ব-০৮

0
107

#হারানো_হিয়া (পর্ব ৮)

১.
কয়েকটা দিন বাসায় না থাকলেই সব এলোমেলো। ধুলো, মাকড়সার জালে পুরো বাসা ভর্তি। সুমন মনে হয় একটা বেলাও ঘরদোর ঝাড়ু দেয়নি। আর শীতকালে বুঝি ধুলোবালি আরও বেশিই পড়ে। নাফিসা আজ ছুটির দিনে সেই সকাল থেকে ঘরদোর সাফাইয়ে নেমেছে। কড়া গলায় সুমনকে আজ বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। ফ্যানগুলো মোছার দায়িত্ব ওর।

আসার সময় মা বার বার কান্না করলেন। খুব শিগগিরই যেন ওদের নিয়ে আবার যায়, তাই বলল। মাহিনের সঙ্গে আর দেখা হয়নি। তবে সেদিন ওর ফোন নম্বরটা চেয়েছিল। ভেবেছিল দেবে না, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দিয়েছিল। আর সেটাই বুঝি ভুল হলো। মাঝে মাঝেই হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ করে ক্ষমা চাচ্ছে। এত বছর পর এমন করে ওর সাজানো গোছানো মনের ঘরে এমন করে হানা দেবার কোনো মানে ও খুঁজে পায় না।
আলমারির পাল্লা মুছতে মুছতে ও কান পাতে। সুমনের ফোন এসেছে, কার সঙ্গে যেন নরম গলায় কথা বলছে।

একটু পরেই সুমন আসে। কেমন একটা অপ্রস্তুত গলায় বলে, ‘নাফি, আমার সেই বন্ধুটা আজ বিকেলে তোমার সঙ্গে দেখা করতে আসতে চায়। ওর ছেলের ভর্তির ব্যাপারটা মিটে গেছে। তাই তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে ধন্যবাদ জানাতে চায়।’

নাফিসাকে মাঝেসাঝে সুমন ছোট করে নাফি ডাকে। সেটা সাধারণত যখন মন খুব ফুরফুরে থাকে তখন। পুরনো সেই বন্ধুর জন্যই বুঝি এমন মন ফুরফুরে?

নাফিসা ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘আমাকে ধন্যবাদ দেবার কী আছে? তোমার বন্ধুর জন্য এতটুকু তো করতেই পারি। ধন্যবাদ দিলে তোমাকে দিলেই তো হয়। বাসায় আসার কী দরকার?’

সুমন থমকে যায়। নাফিসা সাধারণত হাসিখুশি থাকে। মানুষের সঙ্গে মিলেমিশেই চলে। কেউ বাসায় এলে ও বরং খুশিই হয়। তাহলে আজ এমন করছে কেন?

ও বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বলে, ‘আরে বোঝ না, তোমার সঙ্গে পরিচয় হয়ে থাকতে চায়। স্কুলের টিচার তুমি, সেজন্যই হয়তো ছেলেকে নিয়ে বাসায় আসতে চাচ্ছে। আমি আসতে বলে দিয়েছি কিন্তু।’

নাফিসা আলমারির পাল্লা মুছতে মুছতে বলে, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’

সুমন মিনমিন করে বলে, ‘বাইরে থেকে কোনো নাস্তা আনতে হবে? আমি তাহলে বিকেলে ওরা আসার আগেই নিয়ে এলাম।’

নাফিসা এবার ঘুরে তাকায়। সুমন মনে হয় ওর বন্ধুর বাসায় আসা নিয়ে বেশি বেশি ভাবছে। ও গম্ভীর গলায় বলে, ‘তোমার কী মনে হয়, আমার বাসায় একটা বাইরের গেস্টের এক বেলা নাস্তার ব্যবস্থা নেই? আমার মনে হয় তুমি তোমার বন্ধুকে নিয়ে বেশি বেশি ভাবছ।’

সুমন তোতলানো গলায় বলে, ‘আরে না, আমি ভাবলাম তুমি এতদিন পর বাবার বাড়ি থেকে এলে ঘরে হয়তো কিছু নেই। আচ্ছা অসুবিধে নেই, তুমি ঠিক সামলে নেবে।’

কথাটা বলে ও আর দাঁড়ায় না। দ্রুত ওর সামনে থেকে কেটে পড়ে। এইটুকুতেই ওর শরীর ঘামে ভিজে গেছে। নাফিসা কি ওর মনের নার্ভাস ভাবটুকু টের পেল?

নাফিসা কপাল কুঁচকে সুমনের দিকে তাকিয়ে থাকে। নাহ, ভালো করে খোঁজ নিতে হবে তো। ওর বন্ধু শরিফ ভাইকে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে এই মীরা নামের বন্ধুটা সুমনের ঠিক কেমন বন্ধু ছিল।

বিকেল নাগাদ নাফিসা অনেকগুলো নাস্তা বানিয়ে ফেলে। সুমন রান্নাঘরের পাশ দিয়ে বার বার ঘুর ঘুর করছিল। আর একটু পর পর বলছিল, ‘আহা, এত কিছু না করলেও হতো। শুধু শুধু তোমার কষ্ট হলো।’

নাফিসা ভ্রুকুটি করে বলে, ‘তোমার বন্ধু বলে কথা। আচ্ছা, তুমি যাও সুন্দর একটা পাঞ্জাবি পরে রেডি হয়ে নাও।’

শেষের কথাটা ও ইচ্ছে করেই বলে। দেখা যাক সুমন কী করে।

সুমন বোকার মত একটা হাসি দিয়ে বলে, ‘সত্যি পাঞ্জাবি পরব? ভালো বলেছ, ছুটির দিন বাসায় পাঞ্জাবি পরেই তো ভালো লাগবে মানে পরা উচিত। তুমিও তাহলে শাড়ি পরে নিও নাফি।’

কথাটা বলে সুমন আর দাঁড়ায় না। নাফিসা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। সুমন ওর বন্ধুর এই বাসায় আসা নিয়ে বেশি উত্তেজিত।

ওরা আসার আগেই নাফিসা গোসল সেরে সুন্দর একটা জামা পরে। তাই দেখে সুমন একটু আপত্তির গলায় বলে, ‘শাড়ি পরলেই পারতে।’

এই সময় বেল বাজতেই ও গিয়ে দরজা খুলে দেয়। মীরা আজ হালকা গোলাপি রঙের জামা পরেছে, চোখে একটু কাজল। ইহান সালাম দেয়, ‘আসসালামুআলাইকুম, আংকেল।’

সুমন হেসে বলে, ‘ওলাইকুম আসসালাম, আঙ্কেল। বাহ, এসে গেছিস তোরা। আয় ভেতরে। জুঁই, তূর্য দেখে যাও কে এসেছে।’

একটু পরেই দুই ভাইবোন এসে হাজির হয়। মীরা ওদের হাতে চকলেটের একটা বক্স দিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করে, ‘কী খবর তূর্য বাবা? কেমন আছ তোমরা?’

তূর্য বড় মানুষের মতো মাথা নাড়িয়ে বলে, ‘আমরা ভালো আছি, আপনি ভালো আছেন আন্টি?’

মীরা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘হ্যাঁ বাবা।’

সুমন ওদের নিয়ে বসবার ঘরে নিয়ে বসায়। বাচ্চারা ইহানকে নিয়ে ওদের রুমে নিয়ে যায়।

সুমন মীরাকে বসতে বলে এবার ভেতরে গিয়ে নাফিসাকে ডেকে নিয়ে আসে।

নাফিসা বসবার ঘরে ঢুকতেই মীরা উঠে দাঁড়ায়। হাসিমুখে বলে, ‘বাহ! সুমন তোর বউ তো খুব সুন্দর। আমার নাম মীরা, তোমার বরের বন্ধু। তোমাকে দেখতে এলাম আর অনেকগুলো ধন্যবাদ জানাতে। ছেলেটার এই স্কুলে ভর্তি না হলেই না।’

নাফিসা খুঁটিয়ে দেখছিল। ওর চেয়ে লম্বা, হালকা গড়নের। চোখ দুটো টানা, গায়ের রঙ মাখনের মতো। পরনের জামাকাপড়ে একটা পরিপাটি ভাব আছে। ছেলেরা খুব সহজেই এমন মেয়েদের প্রেমে পড়ে। কেন যেন ঈর্ষা হয়।

নাফিসা মৃদু হেসে বলে, ‘বসুন না প্লিজ। আর আমাকে ধন্যবাদ দেবার মতো কিছু তো হয়নি। রিপা বলল আপনার ছেলে নাকি খুব ভালো করেছে পরীক্ষায়। ও এমনিতেই টিকে যেত।’

নাফিসাকে মীরার খুব ভালো লাগে। মেয়েটা ছোটোখাটো, সুন্দর। ভদ্রতাবোধ আছে।

মীরা ওর দিকে তাকিয়ে বলে, ‘তোমার ছেলেমেয়ে দুজন খুব লক্ষ্মী। আর তূর্য তো খুব মিশুক। আমার ছেলে ইহান একদমই কথা বলে না। ওদের সঙ্গে এবার যদি মিশে একটু মুখ খোলে।’

নাফিসা এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আপনারা দুই বন্ধু মিলে গল্প করুন। আমি বাচ্চাদের আগে নাস্তা দিয়ে আসি।’

নাফিসা চলে যেতেই মীরা উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, ‘বাহ, কেমন পুতুলের মতো একটা বউ পেয়েছিস। খুব ভালো লাগল ওকে।’

সুমন হেসে বলে, ‘হ্যাঁ, ও খুব মিশুক। বাচ্চাগুলোও ওর মতো হয়েছে। আচ্ছা, ঢাকা থেকে সব জিনিসপত্র নিয়ে এসেছিস? কোনো ঝামেলা হয়নি তো?’

মীরা মন খারাপ গলায় বলে, ‘বিপদে মানুষের আসল চেহারাটা চেনা যায়। যতদিন আমার হাজব্যান্ড বেঁচে ছিল ওর টাকাতেই সংসার চলত। ছোট বোনের পড়াশোনা, বাবা-মায়ের চিকিৎসার খরচ সবকিছু। কিন্তু দেখ ও মারা যাবার পর আমাকে ওই বাসায় থাকতে দিচ্ছিল না। আমার হাজব্যান্ড বাসাটা মায়ের নামে কিনেছিল। এখন শুনছি সেটা নাকি মেয়েকে দিয়ে দিবে। তা দিক, আমার জোর করে কিছু নিতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু আমার বিয়ের সময়ে যে গহনাগুলো ওয়াহিদ গড়িয়ে দিয়েছিল সেগুলো শাশুড়ি মা কিছুতেই দিলেন না। আসার সময় মা মেয়ে মিলে আমার স্যুটকেস চেক করে সব রেখে দিয়েছে। এই লজ্জার কথা কার কাছে বলি।’

মীরার চোখমুখ বিষাদে ঢেকে যায়। সুমন মন খারাপ নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটা সারাজীবন এমন কষ্ট পেয়ে গেল। কিছু কিছু মানুষের জীবন বুঝি এমনই হয়।

এই সময় বড় একটা ট্রেতে করে নাস্তা নিয়ে নাফিসা ভেতরে ঢুকে। সুমন উঠে দাঁড়িয়ে বলে, ‘আমাকে ডাকলেই তো হতো।’

তারপর নাফিসার হাত থেকে ট্রে-টা নিয়ে টেবিলে রাখে। উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, ‘তোরা আসবি বলে ও আজ নিজ হাতে সব নাস্তা বানিয়েছে।’

মীরা চোখ কপালে তুলে বলে, ‘কী সর্বনাশের কথা! এতকিছু করেছে? শুধু শুধু তুই বউকে কষ্ট দিলি। নাফিসা তুমি এখানটায় আমার পাশে এসে বসো তো। আমি এমন হাতি ঘোড়া কী মেহমান হলাম যে আমার জন্য এত কিছু করতে হবে।’

নাফিসা একটু খোঁচা দিয়ে বলে, ‘তা আপনার বন্ধু আপনি আসবেন বলে সকাল থেকে বারবার নাস্তার কথা বলে আমাকে হয়রান করে দিচ্ছিল। বাইরে থেকে নাকি নাস্তা কিনে নিয়ে আসবে।’

মীরা শব্দ করে হেসে ফেলে, ‘সুমন একটু এমনই, অল্পতেই অস্থির হয়ে যায়। কিন্তু তুমি এত কিছু করেছ, সত্যিই একটা গুণী মেয়ে তুমি।’

সুমনকে আর কারও বেলায় এমন অল্পতে অস্থির হতে দেখেনি নাফিসা। মনের কোণে একটা দুশ্চিন্তার মেঘ জমে।

নাস্তা খেতে খেতে নাফিসা হঠাৎ করে জিজ্ঞেস করে, ‘আচ্ছা আপনি ঢাকার স্কুল ছেড়ে হঠাৎ করে ছেলেকে এখানকার স্কুলে ভর্তি করলেন কেন?’

মীরা সবে একটা স্যান্ডুইচে কামড় দিচ্ছিল। ও থমকে যায়। একবার সুমনের মুখের দিকে তাকায়। নাফিসাকে পুরোটা খুলে বলা হয়নি। অবশ্য নাফিসা সেভাবে জানতেও চায়নি এর আগে।

মীরা টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছে বলে, ‘ইহানের বাবা কয়েক মাস আগে একটা রোড এক্সিডেন্টে মারা গেল। ঢাকায় আমরা যে বাসাটায় থাকতাম সেখানে শ্বশুর বাড়ির সবাই ছিলেন। কিন্তু যা হয় আর কী, দিন দিন পরিবেশ বিষাক্ত হয়ে উঠছে। তাই ছেলেকে নিয়ে মামার বাসায় চলে এলাম। আমি মূলত মামার কাছেই মানুষ। বাবা-মা কেউ বেঁচে নেই, তাই শেষ পর্যন্ত আর কী করা।’

নাফিসা থমকে যায়। ওর বাবা, মা বেঁচে আছে। কিছু হলে এখনো মনে হয় এখনও একটা যাবার জায়গা আছে। আচ্ছা বাবা-মা যদি মরে যায় তাহলে নাফিসাও কি এমন অসহায় হয়ে যাবে? হঠাৎ করে সামনে বসা এই মানুষটার জন্য ভীষণ মনে হয়।

ও এবার সামনের সোফা থেকে মীরার পাশে এসে বসে। তারপর হাত ধরে বলে, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত। সুমন আমাকে আপনার ব্যাপারটা খুলে বলেনি। ইহানকে নিয়ে যখনই মন চায় আমাদের বাসায় চলে আসবেন।’

মীরার মন নরম হয়ে যায়। সুমনের বউটা এত ভালো!

মীরা হেসে বলে, ‘তোমাকে ভীষণ ভালো লাগল। অবশ্যই চলে আসব।’

এমন সময় বাচ্চারা হইচই করতে করতে ভেতরে ঢোকে। তূর্য হাতে একটা ড্রয়িং খাতা মা-কে দেখিয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, ‘মা, দেখো ইহান ভাইয়া কী সুন্দর ছবি আঁকে!’

ইহান মাথা নিচু করে লাজুক হাসছিল। জুঁই এবার মুখ খোলে, ‘হ্যাঁ আম্মু, আমার চেয়েও সুন্দর আঁকে।’

নাফিসা চেয়ে দেখে শহরে সন্ধ্যা নেমেছে এমন একটা ছবি। এত সুন্দর এঁকেছে যে চোখ ফেরানো যায় না।

প্রশংসার গলায় বলে, ‘বাহ, খুব সুন্দর এঁকেছ তো।’

মীরা হাসিমুখে বলে, ‘হ্যাঁ, ছেলেটার এই একটা শখ, ছবি আঁকবে।’

নাফিসা এবার ইহানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘তুমি মাঝে মাঝে আমাদের বাসায় এসো। ওদের একটু শিখিয়ে দিও।’

ইহান ছোট্ট করে বলে, ‘আচ্ছা আন্টি।’

বিদায় নেবার বেলায় তূর্য আবদারের গলায় বলে, ‘আন্টি আগামী মাসের বাইশ তারিখে আমার জন্মদিন, তুমি আসবে কিন্তু।’

মীরা চোখ বড়ো বড়ো করে বলে, ‘তাই! তাহলে তো আসতেই হয়।’

নাফিসা এবার বলে, ‘হ্যাঁ, ইহানকে নিয়ে অবশ্যই আসবেন। সুমন ওদের এগিয়ে দিয়ে আসো।’

মীরা এবার বাধা দেয়, ‘না লাগবে না। এইটুকু মোটে পথ, সমস্যা নেই। সুমন তুই থাক বাসায়।’

সুমনের খুব ইচ্ছে করছিল মীরাকে একটু এগিয়ে দিতে। কিন্তু ওর কথায় থমকে দাঁড়ায়। মীরা ইচ্ছে করেই না করেছে। এমন সুখের সংসারে ও বিন্দুমাত্র অসুখের বীজ বপন করতে চায় না।

বিদায় নিয়ে মীরা ইহানকে নিয়ে রাস্তায় নামে। দিনের আলো নিভে গিয়ে সন্ধ্যা নেমেছে অনেক আগেই। ধীরে ধীরে রাত আসে। মীরার মনে হয় সুমন সুখী হয়েছে। আজ ওর সুখের সংসারে উঁকি দিয়ে কেন যেন লোভ হলো। ওরও তো সুমনের সঙ্গে এমন একটা সুখের সংসার হতে পারত। কিন্তু ও যেন কিছুতেই প্রিয় মানুষদের নিজের কাছে ধরে রাখতে পারে না।

(চলবে)

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর