হারানো হিয়া পর্ব-০৯

0
108

#হারানো_হিয়া (পর্ব ৯)

১.
আজ একটানা ক্লাশ নিতে নিতে নাফিসা হাঁপিয়ে উঠেছে৷ সাইন্সের দুজন শিক্ষক ছুটিতে আছেন। এর মধ্যে ক্লাশ টেনে একজনের কাছে মোবাইল পাওয়া গেছে। এই নিয়ে কিছুক্ষণ ঝামেলা গেল। প্রায়ই ধরা পড়ে, মা বাবাদের ডেকে এনে কথা শোনানো হয়, তারপরও এটা বন্ধ হচ্ছে না। নাফিসা শেষ ক্লাশটা করে ক্লান্ত শরীরে টিচার্স রুমে এসে বসে।

রিপা ওকে দেখে হেসে বলে, ‘আজ খুব খাটুনি গেল তোর।’

নাফিসা পানির বোতল থেকে পানি খায়, তারপর মুখ মুছে বলে, ‘আর বলিস না, সবাই ছুটি নিয়ে বসে থাকে আর আমি ছুটি পাই না। কাল ছেলেটার জন্মদিন, ভাবছিলাম একটা দিন ছুটি নেব, সে উপায় নেই। আচ্ছা, ভালো কথা, তুই কিন্তু কাল তোর ছেলেকে নিয়ে সন্ধ্যায় চলে আসিস।’

রিপা এবার উঠে এসে পাশে বসে। তারপর মজা করে বলে, ‘কী খাওয়াবি বল? কারা কারা আসছে অনুষ্ঠানে?’

নাফিসা হেসে বলে, ‘বিরিয়ানি, রোস্ট, আর কেক তো খাবিই। না, বেশি মানুষ না। তূর্য আর জুঁই এর কিছু বন্ধু, আমার দিক থেকে তুই আর ওর কিছু বন্ধু। ওহ, সেই যে নতুন মেয়ে বন্ধুটা উনিও আসবে। আমি কিছু বলার আগেই তূর্য গতমাসে দাওয়াত দিয়ে ফেলেছে।’

রিপা ভ্রু কুঁচকে বলে, ‘ওরা তোর বাসায় এসেছিল?’

নাফিসা এবার পুরো ঘটনাটা খুলে বলে।

রিপা গম্ভীরমুখে বলে, ‘নাফিসা, ওই মীরা মেয়েটা সুমন ভাইয়ের কেমন বন্ধু হয়?’

নাফিসা থমকায়, রিপার গলার সুরে কিছু একটা ছিল। ও দ্বিধান্বিত গলায় বলে, ‘একই এলাকায় থাকত। আমি এতটুকুই জানি। ভেবেছিলাম কাল জন্মদিনে শরিফ ভাই এলে এটা নিয়ে ওনাকে জিজ্ঞেস করতাম।’

রিপা এবার আরও গম্ভীরমুখে বলে, ‘আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম। নিছক কৌতুহল থেকেই। মেয়েটা সুমন ভাইকে ‘তুই’ ‘তুই’ করছিল। তাই জিজ্ঞেস করা। প্রথমে কিছু বলতে চায়নি। পরে যেটা জানলাম ওই মেয়েকে সুমন ভাই অনেক পছন্দ করত। এমন কী বিয়েও করতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটার অন্য জায়গায় বিয়ে হয়ে যায়। তাই বলছিলাম, ওই মেয়ের তুই সবটা জানিস কি-না? তোর বাসায় দাওয়াত দিয়ে খাওয়াচ্ছিস পর্যন্ত।’

নাফিসা অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা ও কী বলছে! সুমনের সঙ্গে ওই মেয়েটার প্রেম ছিল? বিয়েও করতে চেয়েছিল? ওর মাথা যেন ঘুরছে। সেজন্যই বুঝি ওই মেয়েটার ব্যাপারে সেই প্রথম থেকে সুমন একটু বেশি বেশি করছিল। এবার ওর কাছে জলের মতো সব পরিষ্কার হয়ে যায়। পুরনো প্রেম আবার নতুন করে উথলে উঠেছে। কেন যেন রিপার মুখে কথাগুলো শুনে নিজেকে ভীষণ অপমানিত লাগছে।

নাফিসা শুকনো মুখে বলে, ‘রিপা, আমি এসবের কিছুই জানি না। আমি আজ সুমনকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করব।’

রিপা ওর হাত ধরে বলে, ‘তুই মাইন্ড করিস না৷ আমার মনে হয়েছে ব্যাপারটা তোকে জানানো দরকার। মেয়েটাও দেখ কেমন বেহায়া, সব জেনে শুনে তোর বাসায় গিয়েছে।’

নাফিসার চোখ জ্বলে ওঠে, গনগনে গলায় বলে, ‘বাসায় আসা বের করছি। সুমন আজ বাসায় আসুক।’

রিপা অনুনয় করে বলে, ‘ভাইয়াকে আমার কথা বলিস না। তুই এমনিতেই জিজ্ঞেস করে দেখ কী বলে।’

নাফিসা গম্ভীরমুখে বলে, ‘না, তোর কথা বলব না।’
সেদিন বাসায় ফিরে সারাটা সময় নাফিসা গুম মেরে বসে থাকে। কাল তূর্যের জন্মদিন, অথচ কিছুই করতে ইচ্ছে করছে না। ভেবেছিল পায়েসটা আজই রেঁধে রাখবে। কিন্তু কেন যেন শরীরে আজ এক ফোঁটা শক্তি পাচ্ছি না। অনেকক্ষণ বিছানায়া শুয়ে ছিল। জুঁই একবার এসে কপালে হাত দিয়ে দেখে গেছে। নাহ, এবার উঠা দরকার। বাচ্চাগুলোকে শুধু শুধু ভয় পাইয়ে দেবার মানে নেই।

ও উঠে পায়েস চড়ায়। তূর্য আজ পড়াশোনা করছে না। আজ থেকেই নাকি ওর ছুটি। জুঁই একবার চুপিচুপি বলে গেছে ও একটা রঙপেন্সিল বক্স গিফট দিতে চায় ভাইকে। বাবাকে নাকি ফোন করে আনতে বলেছে। নাফিসা দুধ জ্বাল দিতে দিতে ভাবে এই যে আপাত সুখের সংসার তার ভেতর কত চড়াই-উতরাই থাকে। সুমনের মতো কাঠখোট্টা ইঞ্জিনিয়ার মানুষটার জীবনে যে এমন কিছু থাকতে পারে ও ভাবেইনি। পুরনো প্রেমিকার দেখা পেয়ে সেই মানুষটা এখন কী ফুরফুরে থাকে।

ভাবনার এই পর্যায়ে কলিং বেল বাজে।

জুঁই দরজা খুলতেই দেখে বাবা। সুমন ওর হাতে একটা বক্স তুলে দিয়ে ফিসফিস করে বলে, ‘তোর রংপেন্সিল বক্স। লুকিয়ে রাখ।’

জুঁই দ্রুত বক্সটা জামার আড়ালে লুকিয়ে ফেলে।

ততক্ষণে তূর্য চলে এসেছে। সুমন একটা কেকের বাক্স ওর হাতে দিয়ে বলে, ‘এটা আজ রাতের জন্য। কাল বড়ো একটা কেক নিয়ে আসব।’

তূর্য কেকটা হাতে নিয়ে বলে, ‘কাল কিন্তু ব্ল্যাক ফরেস্ট কেক আনবে বাবা।’

সুমন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘আচ্ছা বাবা।’

তারপর একবার রান্নাঘরে উঁকি দিয়ে বলে, ‘কী, পায়েস রান্না চলছে?’

নাফিসা গম্ভীরমুখে বলে, ‘হ্যাঁ। তুমি হাত মুখ ধুয়ে বসো। রাতের খাবার দিচ্ছি।’

সুমন একটু থমকায়, আবার কী হলো। নাফিসাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো ঝামেলা হয়েছে।

সেদিন রাত বারোটা বাজার আগেই তূর্যের কেক কাটা হয়। নাফিসাই জোর করেছে কেকটা কাটার জন্য। না হলে এরা শুধু শুধু রাত জেগে থাকবে।

তূর্য মাকে কেক খাইয়ে দেয়। তারপর সুমন আর জুঁইকে। কিছুক্ষণ গল্প গুজব চলে। তূর্য বার বার জানার চেষ্টা করে এবার জন্মদিনে ওর জন্য কী গিফট কেনা হয়েছে। কিন্তু কিছুতে সেটা আর জানতে পারে না।

রাতে ওরা ঘুমোলে সুমন ঘুমোনোর আয়োজন করে। আজ নাফিসার মধ্যে কোনো তাড়া নেই। ও চুপ করে বিছানায় বসে আছে। সুমন মশারী করে বাতি নিভিয়ে দেবার আগে একবার জিজ্ঞেস করে, ‘কি, ঘুমুবে না?’

নাফিসা মাথা নাড়ে, ‘তোমার সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।’

সুমন থমকায়। নাফিসার গলার সুর ভালো লাগছে না। কী হলো? ও ঘুরে মুখোমুখি বসে, ‘কী কথা বলো তো?’

নাফিসা লম্বা একটা নিশ্বাস নিয়ে বলে, ‘মীরার সঙ্গে কি তোমার প্রেম ছিল? ওকে বিয়ে করতে চেয়েছিলে?’

সুমন টের পায় ওর তলপেট কেমন খালি হয়ে যাচ্ছে। নাফিসা তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। কী বলবে ও?

সুমন একটু চুপ থেকে বলে, ‘হ্যাঁ, একটা সময় সেসব ছিল। তখন আমি ছাত্র, ওর বিয়ে হয়ে গেল। এরপর আর কখনও যোগাযোগ হয়নি।’

নাফিসা টের পায় ওর খুব কষ্ট হচ্ছে। যদিও ঘটনাটা অনেক আগের, ওর বিয়েরও অনেক আগে। তবুও কেন যেন নিজেকে সুমনের প্রথম চাওয়া মানুষ মনে হচ্ছে না। সুমন ওর আগে অন্য কাউকে চেয়েছিল। আর সেই মানুষকে না পেয়ে অনেকটা সমাজের নিয়ম মানতেই ওকে বিয়ে করেছে। নিজের কথাও মনে হয়। ও নিজেও মাহিনকে চেয়েছিল, না পেয়ে মরতেও বসেছিল। কিন্তু তারপরও সুমনের ব্যাপারটা মানতে পারছিল না।

ও গম্ভীরমুখে বলে, ‘তাহলে হঠাৎ করে এতদিন পর যোগাযোগের মানে কী? পুরনো প্রেমিকাকে দেখে বুঝি দরদ উথলে উঠেছে? আর ওই বেহায়া মেয়ের এত বড়ো সাহস যে আমার বাসায় আসে।’

সুমন এবার বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বলে, ‘আরে, তুমি ভুল বুঝছ কেন। বেচারি বিপদে পড়ে আমার কাছে এসেছিল। এর বেশি কিছুই না। তুমি শুধু শুধু ভুল বুঝছ।’

নাফিসা চিৎকার করে বলে, ‘আমি এতদিন ভুল বুঝেছি। ওই মেয়ে যেন আমার বাসায় আর না আসে৷ আর হ্যাঁ, তোমাকে যদি আর কখনও দেখি ওই মেয়ের আশেপাশে আমি কিন্তু আগুন ধরিয়ে দেব এই সংসারে।’

সুমন স্তম্ভিত হয়ে তাকিয়ে থাকে। নাফিসা এমন করবে ও ভাবতেও পারেনি। কিন্তু ওর কানে এই কথাটা কে লাগাল?

সুমন অনুনয়ের গলায় বলে, ‘তুমি একটু শান্ত হও। আমি ওকে না করে দেব যেন আর আমাদের বাসায় না আসে৷’

নাফিসা কঠিন গলায় বলে, ‘তোমাকেও যেন ওর আশেপাশে না দেখি। কথাটা যেন মনে থাকে।’

নাফিসা উলটো ঘুরে শুয়ে থাকে। সুমন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাতি নিভিয়ে দেয়৷ কাল মীরা ছেলেকে নিয়ে ওদের বাসায় আসার কথা। ওকে না করতে হবে। কিন্তু সেটা কী করে ওর জানা নেই।

পরদিন সকালে সুমন ফোন দিতেই মীরা উচ্ছ্বসিত গলায় বলে, ‘খুব ভালো হয়েছে ফোন দিয়েছিস। তোর পিচ্চিকে একটু দে উইশ করি।’

সুমন মন খারাপ গলায় বলে, ‘মীরা, একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। নাফিসা আজ একটু বাবার বাড়ি যাচ্ছে, ওর আম্মার শরীরটা ভালো না। আজ জন্মদিনের অনুষ্ঠানটা হচ্ছে না।’

মীরা আফসোসের গলায় বলে, ‘কী বলিস! আচ্ছা, যা ওদের নিয়ে। আমি ভেবেছিলাম তূর্যের জন্য একটা কেক বানিয়ে নিয়ে আসব। আচ্ছা ওরা ঘুরে আসুক তখন বানিয়ে নিয়ে যাব নে। সাবধানে যাস।’

সুমনের আর বলা হয় না যে মীরার কখনোই এই বাসায় আসা হবে না। আজকেই বলা যেত, কিন্তু পরে মনে হলো সামনাসামনি ব্যাপারটা ওকে খুলে বলতে হবে।

সন্ধ্যেবেলা কেক কাটার আগে জুঁই শুকনো মুখে বলে, ‘আম্মু, ইহান ভাইয়া তো এখনও এল না। বাবাকে বলো না একটা ফোন দিতে।’

নাফিসা কটমট করে তাকিয়ে বলে, ‘এত ফোন করতে হবে না। ওই ছেলের সঙ্গে খবরদার মিশবি না।’

জুঁই অবাক হয়ে আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আম্মুই তো সেদিন বলল ইহানের কাছে ড্রয়িংটা শিখতে।

এবার তূর্য ওর বাবাকে বলে, ‘বাবা, ওই আন্টিটা কই? আমি তো এখন কেক কাটব।’

সুমন অসহায় চোখে একবার নাফিসার দিকে তাকায়। নাফিসা রাগী গলায় বলে, ‘কেক কেটে ফেল তূর্য।’

তূর্য মন খারাপ করে কেক কাটে। আম্মু আজ বকা দিল ওকে!

রিপা, শরিফ ভাই এসেছে। তূর্যের কিছু বন্ধু, জুঁই এর ক্লাশের কয়েকজন। এক ফাঁকে রিপা কাছে এসে বলে, ‘ওই মেয়েটা আসেনি?’

নাফিসা গম্ভীরমুখে বলে, ‘নাহ।’

আর কিছু বলে না নাফিসা। কেন যেন রিপার ওপর রাগ হচ্ছে। ও মজা দেখতে এসেছে আজকে। ভেবেছিল মীরা মেয়েটা আসবে, ও নাটক দেখবে। কিন্তু সেটা দেখতে না পেরে হতাশ।

একটা নিরানন্দময় জন্মদিন কাটে। সুমন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবে শুধু ওর জন্য আজকের দিনটা এমন মন খারাপ করা একটা দিন হয়ে গেল।

সেদিন রাতে সুমনের সঙ্গে খুব একটা কথা হয় না। সব কিছু গুছিয়ে গোসল করে যখন ঘুমোতে আসে তখন রাত বারোটা। সুমন মশারী করে শুয়ে পড়েছে আগেই। মীরা মেয়েটা আসেনি বলে কি ওর মন খারাপ?

ঘুমোতে যাবার আগে হোয়াটসঅ্যাপে একটা মেসেজ আসে। নাফিসা তাকাতেই দেখে মাহিনের মেসেজ, ‘তুমি আবার কবে ময়মনসিংহ আসবে?’

নাফিসা ঝট করে একবার সুমনের দিকে তাকায়। উল্টোদিকে ঘুরে ও শুয়ে আছে। নাফিসা সেদিকে সতর্ক চোখে একবার তাকিয়ে আবার মেসেজটা দেখে। তারপর কী মনে হতে লিখে, ‘কেন, মাহিন?’

ওপাশ থেকে সাথে সাথে উত্তর আসে, ‘তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে।’

নাফিসা এবার মোবাইলটা সুইচড অফ করে দেয়। মাহিন হঠাৎ করে এমন একটা মেসেজ কেন দিল? ওকে দেখতে ইচ্ছে করে মানে কী? কথাটা যতই ভাবে টের পায় মন ভালো হয়ে যাচ্ছে। একটা গোপন সুখ টের পায়। সেই সাথে মনে হয় সুমন যদি ওর পুরনো প্রেমিকার সঙ্গে কথা বলতে পারে ও পারবে না কেন?

(চলবে)

মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান সুবাস
শিমুলতলী, গাজীপুর