#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ১১
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
২৪,
” লুইস ব্রো সু’ইসা’ইডের চেষ্টা করেছে। উনার মম-ড্যাড আপু আর আমাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেছিলো, কাউকে পায়নি। ভাইয়ার কাছে গিয়েছিলো খোজ জানাতে। কিন্তু ভাইয়া উ’গ্র ব্যবহার করায় উনারা ভাইয়াকে শাস্তি স্বরুপ উনাদের লোক দিয়ে মে”রেছে। ভাইয়ার মাথায় আঘাত পেয়েছে গুরুতর। এখনও সেন্স আসেনি। আর লুইস ব্রো তারও অবস্থা খারাপ। তার বাবা মা রে’গে আছে। লুইস ব্রো ঠিক না হলে তাদের সন্তানের ক্ষ’তি করার দায়ে ভাইয়ারও ক্ষ’তি করে ফেলবে৷ ”
হিয়ার উত্তরে তার বাবা-মা কি বলবে ভাষা খুজে পাচ্ছে না। তারা এখানে মেয়ের বিয়ে নিয়ে ব্যস্ত, অথচ ছেলের জীবন-ম’রণের প্রশ্ন উঠেছে। আর উনারা ছেলের খোজ নেওয়ার চেষ্টাই করেননি। মিঃ শাহীন হিয়া প্রশ্ন করলেন,
” কবে হয়েছে এসব?”
” এটা সঠিক জানিনা বাবা। আপুর বিয়ের জন্য ফোন কি! এটাই ভুলে গিয়েছিলাম। ”
হিয়া ভয়ে ভয়ে উত্তর দেয়। মিসেস অন্তরা মেয়েকে জড়িয়ে কেঁদে ফেলেন৷ মিঃ শাহীন কি বলবে, কি করবে বুঝতে পারছেন না৷ মেয়ের ভালো করতে গিয়ে ছেলের জীবন সংকটের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিয়েছেন৷ আচ্ছা রায়ার বিয়ে দিয়ে উনি কি ভুল করলেন! এক পরিবার তাদের সন্তানকে হারাতে বসেছে, বিনিময়ে নিজেও তো সন্তান হারানোর পথে। রায়ার কান্না মাখা মুখটা ভেসে উঠে মিঃ শাহীনের চোখে। তিনি পারছেন না শুধু কাঁদতে। মিসেস অন্তরাকে সামলাতে ব্যস্ত হিয়া। এরমাঝেই মিঃ শাহীন বলে উঠলেন,
” অন্তরা সব প্যাক করো। আমরা কানাডা ফিরছি। আমি টিকিট বুক করে দিচ্ছি।”
মিসেস অন্তরা চোখ মুছে উঠে দাড়ালেন। নিজের রুমে গিয়ে সব গুছানোর জন্য তোড়জোড় শুরু করলেন। মিঃ শাহীন হিয়ার রুমে বসেই অনলাইন এ টিকেট বুকিং করে নিলেন। হিয়াও বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। ওয়ার্ডড্রব খুলে নিজের প্রয়োজনীয় কাপড় বের করে রুমে থাকা সিঙ্গেল সোফায় ঢিবি দেয়। তা দেখে মিঃ শাহীন বলেন,
” তুমি এগুলো বের করছো কেনো হিয়া?”
হিয়া বাবার কথা মানে বুঝতে পারে না। সে বাবাকে উত্তর দেয়,
” কেনো বাবা? আমি কি তোমাদের সাথে ফিরবো না? ”
” না। ”
হিয়া অবাক হয়। সে ফিরবে না, মানে টা কি? সে বাবাকে ফের প্রশ্ন করে,
” মানে? কেনো ফিরবো না আমি?”
” রায়াকে একা রেখে যাওয়া ঠিক হবে না আম্মু। তুমি তোমার আপুর কাছে থেকে যাবে৷ ”
“না আব্বু, আমি যাবো।”
” জিদ কেনো করছো হিয়া?”
” ইউ নো আব্বু তোমরা দুজনই ফিরে গিয়ে আম্মু তার জব আর তুমি তোমার জব নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরবে। আমার ভাইয়ের কেয়ার করার জন্য তোমাদের সময় হবে না।”
” হিয়া? ”
মিঃ শাহীন চি’ৎকার করে উঠেন হিয়ার উপর। হিয়া তাচ্ছিল্য ভরা হাসি ফেরত দেয় বাবার চিৎ’কারে। এরপর বলে,
” ভুল বলেছি কি আব্বু? সেই ছোট্ট থেকে বড় হয়েছি, কখনও ফুফুর কাছে, কখনও বা বাসার মেইডদের কাছে। তোমাদের সাথে তো সেই উইকেন্ড ছাড়া দেখাই হতো না। সকালে আমরা ঘুম থেকে উঠতে লেট করতাম, নয়তো দেখা যেতো রাতে তোমাদের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পরতাম। জীবনটা একটা একঘেয়েমিতে তিক্ত হয়ে উঠেছিলো। তোমরা যে বাঙালি, তোমাদের সংস্কৃতি এক রকম, সেটা ভুলেই গিয়েছিলে। সারাক্ষণ কাজ, কাজ আর কাজ। আর মাস শেষে স্কুলে প্যারেন্টস টিচার মিটিং এ কোনো অবজেকশন পেলেই শুরু হতো তোমাদের বাবা মায়ের শাসন। জীবন টা ঘুম, স্কুল, পড়াশোনায় ভালো গ্রেডিং পয়েন্ট আর রাতের ঘুম এটুকুতেই বেধে দিয়েছিলে। রবিবারে একটু সময় চাইলে সবসময় বলতে সারা সপ্তাহ ছুটোছুটি করেছো এখন একটু রেস্ট দরকার তোমাদের। ছোটো থাকতে তবু সময় দিতে, বড় হতেই তোমাদের যে দরকার আমাদের ভাই বোনদের ভুলেই গিয়েছিলে। ভাইয়া এজন্যই তোমাদের কথা শুনে চলে না, বড় আপুও অন্য ধর্মের একটা ছেলেকে ভালোবেসে ফেললো। ছেলেটা তার পরিবার সহ ধর্ম পাল্টে আপুকে চাইলো, দিলেনা। বিয়ের সময় তোমাদের নিজেদের বাবা মায়ের দায়িত্বের কথা মনে পরলো। সেই জন্যই বলি তোমাদের কাজ ছেড়ে দেশে আসলে কেনো! বড় আপু আর ভাইয়া একটু আকটু সময় দিতো আমায়। তাদেরও দূরে সরিয়ে দিতে চাচ্ছো? মানসিক ভাবে টিনএজ এ একটা স্রোত বয়ে চলে ছেলে-মেয়েদের জীবনে। সেটা ভাবোইনি তোমরা। আমার মা একজন সাইক্রিয়াটিস্ট, উনি সবার ট্রিটমেন্টের জন্য ধৈর্য ধরে কথা শুনেন। শুধু ছেলে মেয়েদের নয়। তুমি তো তুমি, তোমার তুলনা হয় না। ছেলে-মেয়ে কে ভয় ছাড়া কিছু দাও না৷ এই যে দেখো দেশে এসে মাম্মা, তুমি কত সুন্দর সময় দিচ্ছো, মাম্মা সংসার সামলাচ্ছে। আমি সবসময় এমন পরিবার আশা করেছি। কিন্তু তোমরা শুধু টাকার পেছনেই ছুটে গেলে। এখন মেয়ের জীবন ন’ষ্ট করেছো, ছেলেটাও ম’রতে বসেছে। নাউ তুমি হ্যাপি তো বাবা? ”
২৫
মিঃ শাহীন মেয়ের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। হিয়া যা বলেছে ভুল বলেনি। ছেলে মেয়েগুলো বড় হওয়ার পরপরই উনি ধরে নিয়েছিলেন, তারা আত্মনির্ভরশীল হয়েছে, তারা তাদের জীবনে কারোর হস্তক্ষেপ হয়তো পছন্দ করবে না। ছেলে টাও বেপরোয়া স্বভাবের। কখনও কোনো কথা শুনতো না। ভেবেছিলেন মেয়েরাও হয়তো সেরকমই হবে। কিন্তু উনি ভুলে বসেছিলেন, বিদেশের মাটিতে মেয়েদের জন্ম হলেও বাঙালি সংস্কৃতিতে মানুষ করা হয়েছে তাদের। তারা তো বাঙালি সন্তানদের মতোই মা বাবার কাছে আশা রাখবেই। মিঃ শাহীন দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। হিয়ার কাছে গিয়ে মাথায় হাত রাখলেন। হিয়া ওয়ার্ডড্রবের সাথে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে কাঁদছে। মেয়েটা কাঁদে না সহজে। যা হয় নিজে নিজেই সামলানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এতোদিনের চাপা অভিমান উগরে দিয়ে আজ কাঁদছে। মিঃ শাহীন বুঝতে পারেন মেয়েকে কতটা একাকিত্মের মানসিক অশান্তিতে ভুগিয়েছেন। তিনি হিয়ার চোখের পানি মুছিয়ে বলেন,
” তুমিও যাবে আমাদের সাথে? ”
” হুম ফিরবো। ”
হিয়া নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে উত্তর দেয়। মিঃ শাহীন হিয়াকে বললেন,
” কিন্তু আম্মু, তোমার বড় আপুর কথাও একটু ভাবো। তাকে একা ফেলে সবাই যাবো! ওয়াদা করলাম তোমাকে তোমার ভাইয়ের অযত্ন করবো না৷ তুমি প্লিজ আমার কথাটা রাখো। আর অন্তরকে সুস্থ করে আমরা একেবারে চলে আসবো দেশে। প্রমিজ করলাম তোমায়। ”
” না বাবা, ঐদেশ টা আমার জন্মভূমি। নিজের মাতৃভূমিকে যতটা ভালোবাসি, জন্মভূমিকেও ততটাই ভালোবাসি। এইদেশে একেবারে থাকতে চাইনা। বছরে বছরে এসে ঘুরে যাবো এটাই ভালো আমার জন্য। এই দেশে থেকে আপুর মতো তিক্ত যন্ত্র”ণার মুখোমুখি হতে চাইনা। ”
শেষের দিকের কথা হিয়া আস্তেই বললো, যেনো বাবা শুনতে না পায়। এরপর চোখ বন্ধ করে নেয়। ইহসাসের মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠে। সে কি এ কয়দিনেই ইহসাসের উপর দুর্বল হয়ে গেলো! ঝট করে চোখ খুলে নেয় হিয়া। না এসব নিয়ে সে ভাবতে চায় না৷ মিঃ শাহেদ মেয়ের কথার জবাবে বলেন,
” আচ্ছা যেটা ভালো বুঝো। কাপড় গুলো উঠিয়ে রাখো। অল্প কিছু গুছিয়ে নাও। ”
” কেনো? ”
” রায়ার কাছে রেখে যাবো তোমায়। ”
” না বাবা, বোনের শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে থাকতে আমি রাজী নই।”
” কেনো? ”
” নতুন আত্মীয়, তাদের বাসায় গিয়ে থাকা, ব্যাপারট কেমন একটা না। আমি মামাদের কাছে থাকবো। আপুকে ২-১দিন পরপর গিয়ে দেখে আসবো। ”
” আচ্ছা, আমি গিয়ে দেখি তোমার আম্মুর গোছগাছ কতদূর! আগামীকাল দুপুরের পরপর বেরিয়ে পরবো। রাতের ফ্লাইট। সকালে গিয়ে রায়াকে বলে আসবো, আর সাথে দেখেও আসবো। আর হ্যাঁ একটা কথা আম্মু! ”
” কি কথা? ”
” তোমার রাদ ভাইয়া মানুষ টা খারাপ নয়। এতো ভুলের মাঝেও একটা ঠিক কাজ করেছি। তোমার আপু ভালো থাকবে দেখবে। রাদ ছেলে টা বড্ড সহজ সরল আর ভালো। ”
” সহজ সরল পেয়েই আপুর অতীত লুকিয়ে ঠকিয়ে দিলে বাবা। তুমি জানো না তোমার বড় মেয়ে তার অতীত নিয়ে নিজে সাফার করার সাথে সাথে ঐ ভালো মানুষ টাকেও কষ্ট দিচ্ছে।”
মিঃ শাহীন মেয়ের কথায় দীর্ঘশ্বাস ব্যতিত কিছু বলতে পারেন না৷ মেয়ে যা বলছে ভুল কিছু বলেনি। তিনি রুম ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পা বাড়ান। কিন্তু দরজার সামনে মিসেস অন্তরাকে দাড়িয়ে থাকতে দেখেন। মিসেস অন্তরার চোখের জল ঝড়ছে৷ আচ্ছা আজ কি কান্না দিবস! মেয়েও কাঁদে, তার মা-ও কাঁদে। মিঃ শাহীন স্ত্রীকে পাশ কা’টিয়ে চলে যান। যেতে যেতে চোখের কোণে জমা জল বুড়ো আঙুল দিয়ে মুছে ফেলেন। পুরুষ মানুষের নাকি কাঁদতে নেই! আচ্ছা তারা কি পাথর, যে তাদের কষ্ট বলতে কিছু থাকেনা! যার জন্য সবাই বলে পুরুষদের কাঁদতে নেই৷ মিসেস অন্তরা স্বামী চলে যেতেই মেয়ের কাছে যান। হিয়া অনুভূতি শূণ্য, সে দাড়িয়ে আছে পাথরের মতো। মিসেস অন্তরা মেয়েকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলেন,
” তোর বাবা আর তোর সব কথাই আমি শুনেছি। তোর বাবাকে ডাকতে এসে কথাগুলো শুনে ফেলেছি। আমাদের মাফ করে দিস আম্মু। ”
” মাফ চাইছো কেনো মাম্মা! তোমরা তোমাদের দায়িত্ব পালন করে গেছো। আমাদের কোনো কিছু বলার নাই। যাও সব গোছগাছ করে নাও।”
হিয়া মায়ের কথায় ছন্নছাড়া ভাবে উত্তর দেয়। মিসেস অন্তরা হিয়াকে প্রশ্ন করেন,
” আচ্ছা হিয়া! রায়ার বিয়েটা দিয়ে সত্যিই ভুল করে ফেললাম?”
” কিছু বলার নাই আম্মু বিয়ের বিষয়ে। শুধু বলবো, সুন্দর সাজানো গোছানো জীবন এলেমেলো হয়ে গেলো। রোজ তোমার বড় মেয়ে অন্তরদ”হনে পু’ড়বে। ”
মায়ের কথায় উত্তর দিয়ে হিয়া মা-কে ছাড়িয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়৷ মিসেস অন্তরা সেখানেই দাড়িয়ে থাকেন। ভাবেন, এই দ’হনে তার মেয়ে বাঁচতে পারবে তো! হিয়া ওয়াশরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাপটা দেয়। ওয়াশরুমের আয়নায় তাকিয়ে আনমনে ভাবে,
” এইদেশে থেকে আপুর মতো রোজ রোজ ভেতরে ভেতরে শে’ষ হতে পারবোনা। কিছুদিন পর আমিও চলে যাবো। ”
চলবে?
#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ১২
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
২৬,
সকালে ঘুম ভাঙার পর উঠতে ধরে উঠতে পারেনা রায়া। তাকে পেঁচিয়ে ধরে শুয়ে আছে রাদ। এখনও ঘুমন্ত সে। রাদ দুহাতে রায়ার কোমড় পেঁচিয়ে আছে। এক হাত কোমড়ের নিচ দিয়ে, অন্য হাত কোমড়ের উপরে দিয়ে দু-হাতের আঙুলে আঙুল পেচিয়ে শক্ত করে ধরে আছে তাকে । রায়া ছুটার জন্য চেষ্টা করেও পারছেনা। এই লোক ঘুমের মধ্যেও এতো শক্ত করে কিভাবে ধরে আছে! বুঝে আসছেনা রায়ার। সে মাথা ঘুরিয়ে এতোক্ষণ রাদকে দেখছিলো আর হাতের বন্ধন থেকে ছোটার চেষ্টা করছিলো। পারলোনা বলে সে এবার মোচর ঘুরে রাদের দিকে মুখ ফিরে শুয়ে পরলো। দুই বালিশের মাঝে ফোন রাখা দেখে ফোন হাতে নিলো। সময় দেখলো, সাড়ে ছয়টা বাজে। এতো তাড়াতাড়ি তার ঘুম ভাঙলো! ভাবতেই অবাক লাগলো তার নিজের কাছে। সে রাদের গালে আস্তে আস্তে চা’পড় দিলো। রাদ পিটপিট করে চোখ খুলে তাকাতেই রায়াকে তার এতো কাছে দেখে ধরফরিয়ে উঠে বসলো। রায়াও উঠে রাদের পাশেই বসে। বালিশের পাশে রাখা ওরনা গায়ে জড়িয়ে উঠতে উঠতে বলে,
” শুয়ে পরলাম মাঝখানে কোলবালিশ দিয়ে, উঠলাম আপনার হাতের বন্ধনের মাঝে। কখন ধরলেন এভাবে? ”
রাদ রায়ার প্রশ্নে মাথা চুলকায়। আসলেই কখন হলো এটা! সে তো শুধু রায়ার ঘুমন্ত মুখ টা দেখছিলো রাত জেগে। কিন্তু কখন কোল বালিশ সরে গিয়ে সে রায়াকে কোলবালিশের মতো জড়িয়ে ধরে ঘুমালো! তার নিজেরও মনে পরছে না। রাদ তুতলিয়ে উত্তর দেয়,
” আমি জানিনা, মনে পরছেনা৷ ”
” মিথ্যা বলছেন না তো?”
” আপনাকে কেনো মিথ্যা বলবো? আর ধরলেও বেশ করেছি। বিয়ে করা বউ আপনি আমার। জীবনে ২৮টা বছর সিঙ্গেল থেকে বউ পেলে বউকে ধরবো না তো কোলবালিশকে ধরবো?”
রায়া রাদের কথায় ভ্রু কুঁচকে তাকায়। এই লোকের লজ্জা নেই জানে, কিন্তু সবসময়ই এমন নির্লজ্জ হতে হবে! কে বলে রেখেছে এই লোককে। রাদ রায়াকে ওভাবে তাকাতে দেখে বোকা বোকা হাসি দিয়ে জিগাসা করে,
” এভাবে কি দেখছেন আপনি?”
” আপনি আমার ৩বছরের বড়, আমার নাকি স্বামী হোন! তাহলে আপনি আপনি করে সম্মোধন বন্ধ করুন। আম্মু আমায় প্রশ্ন করে এটা নিয়ে। ”
রাদ পুরোই তব্দা খেয়ে যায়। যে বেফাঁস কথা বলেছে! তাতে কোথায় রায়া তাকে ঝা’ড়ি দিবে। সেখানে রায়া তাকে আপনি সম্মোধন নিয়ে কথা বলছে। সে রায়াকে প্রশ্ন করে,
” আম্মু কখন বললো? ”
” কাল যে এসে বললেন, আম্মু ডাকে। গিয়ে কথা বলতে বলতেই আম্মু জিগাসা করেছিলো, আমাদের মাঝে সব ঠিক কিনা! কিছু এবনরমাল কিনা! আপনি আমাকে তুমি না আপনি বলে সম্মোধন করেন এটাও খেয়াল করেছেন উনি।”
” আমাদের মাঝে সব ঠিক কিনা! এই কথার উত্তরে কি বলেছেন আপনি?”
রায়া রাদের এই প্রশ্নে দমে যায়। রাদ আগ্রহ নিয়ে রায়ার প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষা করে৷ কিন্তু তার আগ্রমে এক বালতি পানি ফেলে রায়া চুল বাঁধতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে বসে পরে। রাতে চুল খুলে ঘুমানোর স্বভাব তার। বেণুনী বা খোপা যেটায় করুক, ঘাড়ের নিচে শক্ত শক্ত অনুভব হয় বলে চুল খুলেই ঘুমায় সে। চুলে হালকা জট লেগে গেছে। সে চিরুনি দিয়ে সেগুলো ছাড়াতে থাকে। গত কয়েকদিনের সাজগোজে একদম চুলের দফা রফা করে দিয়েছে পার্লারের মেয়েরা। রায়া রাগে গজরাতে গজরাতে চুলের জট ছাড়াচ্ছিলো। রাদ গায়ের উপর থেকে কাথা সরিয়ে নেমে পরে। স্যান্ডেল পায়ে দিতে দিতে রায়াকে ফের প্রশ্ন করে,
” বললেন তো কি বলেছেন?”
” কি আপনি আপনি করছেন আপনি? আগে তুমিতে নামুন, আমি উত্তর দিচ্ছি। ”
রায়া বিরক্ত হয়ে কোমড়ে হাত দিয়ে রাদের দিকে ফিরে কথাটা বলে৷ রাদ রায়ার বাচ্চাদের মতো বিরক্ত হতে দেখে হাসে। সে রায়ার কাছে গিয়ে দাড়ায়। রায়া সন্দিগ্ধ চাহনীতে রাদকে জিগাসা করে,
” আপনার মতলব কি? হুটহাট এমন সামনে চলে আসেন কেনো দুমদাম? ”
২৭,
রাদ উত্তর দেয়না রায়ার কথার। সে রায়ার দুই গালে হাত রেখে বলে,
” তোমাকে ভালোবাসি বউ। আমার মন ভে’ঙোনা৷ মন ভাঙার কষ্ট-টা তুমি ভালো জানো। সেই কষ্ট আমায় দিও না।”
বলেই রাদ ওয়াশরুমে চলে যায় ফ্রেশ হতে। রায়া স্তব্ধ হয়ে দাড়িয়ে রয়। রাদকে তো সে তেমন ভাবে কিছু বলেনি। শুধু বলেছিলো সে বিয়েতে রাজী ছিলো না। তবে কি রাদ তার ফোন থেকে কিছু বুঝতে পেরেছে! কাল তো রুমে এসে দেখেছে ফোন রাদের হাতে। রায়াকে দেখে ফোন রেখে দিয়েছিলো রাদ। এরপর ডিনার করতে গিয়ে ফোনের দিকে খেয়াল করেনি রায়া। এসে ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে গিয়েছিলো। ফোনের কথা মাথায় আসতেই রায়া ফোন খুজতে থাকে বিছানায়। তখন তো রাদের ফোনে টাইম দেখেছিলো। রাদ ফ্রেশ হয়ে এসে রায়াকে বিছানা হাতরাতে দেখে জিগাসা করে,
” কিছু খুঁজছো?”
” হ্যা। আমার ফোন।”
” ওয়ারড্রবের উপর আছে৷”
রাদের উত্তরে রায়ার হাত থেমে যায়। সে সোজা গিয়ে ওয়ারড্রবের উপর থেকে ফোন টা নেয়। ফোন হাতে নিতেই দেখে বাবার অনেকগুলো মিসড কল,হিয়ার কল আর মেসেজ৷ হিয়ার মেসেজ ওপেন করে দেখতেই রাদের উদ্দেশ্যে রায়া বলে,
” বাবা-মা আজ আসবে এখানে। ”
রাদ টিশার্ট গায়ে জড়াচ্ছিলো। সে ঐ অবস্থাতেই বলে,
” জানি, গতকাল বাবা তোমায় ফোনে না পেয়ে আমায় ফোন করে জানিয়েছে। ”
” একবারও বললেন না তো!”
” আমি ভেবেছিলাম তুমি জানো।”
” ওহ। ”
রায়া ছোট্ট করে উত্তর দেয়। রাদ টিশার্ট পরে ফোন হাতে নিয়ে বাইরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। যাওয়ার সময় বলে যায়,
” ফ্রেশ হয়ে নিচে এসো। ভাবী বোধ হয় একাই নাস্তা বানাচ্ছে সকালের। চাচীর প্রেশার একটু বেড়ে গিয়েছে। আমাদের বাসায় কাজের লোক নেই। যা করার আম্মু, চাচী আর ভাবী মিলেই করে৷ আম্মা একটু দেরি করেই উঠেন উনার পায়ের ব্যথার জন্য। তুমি গিয়ে সাহায্য করতে পারবে ভাবীকে? ”
” আমি কোনো রান্নাই জানিনা। ”
রায়া মাথা নিচু করে উত্তর দেয়। রাদ দরজার কাছে দাড়িয়ে রায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,
” সমস্যা নেই। ভাবীর সাথে থাকতে থাকতে শিখে যাবে। ফ্রেশ হয়ে নিচে আসো। আর ঘুমাতে ইচ্ছে করলে ঘুমাতে পারো। অনেকটা সকালেই উঠে পরেছো আজ। ”
” সমস্যা নেই, আমি ফ্রেশ হয়ে যাচ্ছি।”
রাদ মুচকি হেসে চলে যায়৷ রায়া ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকে পরে। ফ্রেশ হয়ে সেও নিচে নেমে আসে। ড্রইং রুমে রায়ার শ্বশুর মশাই আর চাচা শ্বশুর একসঙ্গে সোফায় বসে চা খাচ্ছিলেন আর পেপারের পাতা উল্টাচ্ছেন। রায়া তাদের সালাম দিয়ে বলে,
” শুভ সকাল বাবা, শুভ সকাল চাচ্চু৷ ”
” শুভ সকাল আম্মু। ”
উনারা সমস্বরে উত্তর দেন। রায়া জাহিদুল সাহেবকে প্রশ্ন করেন,
” বাবা আজকে আব্বু আসবে। কিছু জানেন কি? ”
” হ্যাঁ আম্মু কথা হয়েছে। শাহীন আসবে সে উপলক্ষে রাদ আর ইহসাসকে বাজারেও পাঠিয়ে দিয়েছি। আর সকালেই আসতে বলেছি। এখানে এসে ব্রেকফাস্ট করবে। তুমি ফ্রেশ হয়েছো? ”
রায়া মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ বুঝায়। রুবেল সাহেব পেপার সেন্টার টেবিলে রেখে বলেন,
” এতো সকালে উঠলে কেনো আম্মু? একটু ঘুমাতে! ”
” চাচ্চু! এখন সকাল সকাল ঘুমাতে বলেন। ক’দিন পর বউ পুরাতন হলে আপনিই বলবেন বউ এতো বেলা করে ঘুমায়। ”
আনিকা হাতে কফির মগ নিয়ে আসতে আসতে পিছন থেকে কথাটা বলে। রুবেল সাহেব আনিকায় কথায় হেসে উঠেন। তিনি উত্তরে বলেন,
” আনিকা মামনি তো বিয়ে করে এবাড়িতে এসেছো চারবছর হলো! কখনও এমন বলতে শুনেছো বড় আম্মু? ”
” না, তা শুনিনি। কারণ আমি লেট করে উঠিইনি। মজা করলাম চাচ্চু। কিছু মনে করবেন না। ”
জাহিদুল সাহেব আর রুবেল সাহেব হাসলেন আনিকার কথায়। রায়া ড্রইং রুমের এক কোণায় দাড়িয়ে ওরনা আঙুলে পেচাচ্ছিলো। আনিকা সেদিকে খেয়াল করে রায়াকে বলে,
” ধরো, তোমার কফি৷ সকালে উঠে নিশ্চয় কফি খাওয়ার অভ্যাস তোমার?”
” জ্বি ভাবী। কিন্তু আপনি কেনো আনলেন? আমি কফি বানাতে পারি।”
” সমস্যা নেই, আজ আমি করে দিলাম। কাল তুমি বানিয়ে সবাইকে খাইয়ে দিও।”
রায়া আনিকার কথার উত্তরে মুচকি হাসে। আনিকা তার শ্বশুর মশাইয়ের উদ্দেশ্যে বলে,
” বাবা তাওই মশাইয়ের কাছে ফোন দিন তো। শুনুন উনারা বেরিয়েছেন কিনা? ”
চলবে?
ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।