#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ২৬
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
৫৭,
শুভলং আর্মি ক্যাম্পের পাশে এসে নৌকা থামলো রাদ-দের। নৌকা থেকে নামলো ওরা সবাই। নামার পর শুভলং বাজারে প্রবেশ করে ওরা। বাজারে মাঝ দিয়েই পাহাড়ে উঠার রাস্তা আছে। বাজারে জনসমাগম ততটা বেশি না হলেও, লোকজন আছেই। সবাই একসারি হয়ে হাটছে। রাদ আর ইহসাস দুই ভাই দুপাশে। মাঝখানে রায়া, হিয়া, নাতাশা। পাহড়ে উঠার জন্য প্রথমে সিড়ি আছে। সিড়ি ভেঙে ওরা উপরে উঠতে থাকে। শুভলং পাহাড়ের উচ্চতা ২হাজার ফুট। ওরা সিড়ি ভেঙে উপরে উঠার পর সিড়ি শেষ হলে মাটির রাস্তা শুরু। ওরা হাঁপিয়ে যায় মোটামুটি। হিয়া হাটুতে দুহাত ভর দিয়ে একটু উবু হয়ে জোড়ে শ্বাস নেয়। রায়ার পাহাড় ট্র্যাকিং এর অভ্যাস আগে থেকেই আছপ বিধায় তার একটু কষ্ট কম অনুভব হচ্ছে। নাতাশা তো মাটিতেই ধপ করে বসে পরে৷ ইহসাস ওদের এই অবস্থা দেখে বলে,
“এটুকুতেই হাঁপিয়ে হাপিত্যেশ শুরু করছিস বাতাসা? আরও পথ বাকিই আছে।”
“তুই চুপ কর ভাইয়া।”
“হাঁপিয়ে গেলেও ঝগড়া করার তেজ কমেনি।”
নাতাশা ঠোট ভেঙচি দেয় ইহসাস কে। ইহসাস হিয়ার উদ্দেশ্যে বলে,
বেয়াইন সাহেবার দেখছি তেজ শেষ তেজ শুধু আমার সাথে ঝগড়া করার জন্য।”
হিয়া উত্তর দেয় না। সে বড়ো করে নিঃশ্বাস নিতে ব্যস্ত। ইহসাস নিজের ব্যাগপ্যাক থেকে পানির বোতল বের করে ঠোট লাগিয়ে চুমুক দিয়ে খেতে শুরু করে। তার পানি খাওয়া শেষ না হতেই দেখে হাত থেকে পানির বোতল হাওয়া। সে চোখ ঘুরিয়ে দেখে পানির বোতলে হিয়া চুমুক বসিয়েছে। সে হা করে তাকিয়ে রয়। এটা কি হলো! এই মেয়ে তখন শাঁসালো প্রপোজ করায়। এখন নিজেই পানির বোতল কেড়ে নিয়ে চুমুক বসিয়েছে। হিয়া এক চুমুকে পানির বোতল ফাকা করে ইহসাসের হাতে ধরিয়ে দেয়। এরপর হাটা ধরে সামনের দিকে রাদ আর রায়া ইতিমধ্যে হাটা শুরু করে দিয়েছে৷ রায়া আগে আগে হনহনিয়ে হাটছে, তার পুছু রাদ। নাতাশা হিয়াকে যেতে দেখে সে বসা থেকে উঠে হিয়ার পিছু দৌড় ধরে বলে,
“এই মপয়ে, আমায় ফেলে যাচ্ছো কেনো?”
“তুমি বসে থাকো!”
“তুমি এখনও রেগে আছো আমার উপর? তখনকার ঘটনার জন্য? ”
নাতাশা দৌড়ে এসে হিয়ার পাশে হাটতে হাটতে প্রশ্নটা করে। হিয়া বলে,
“কোম ঘটনার জন্য?”
“আরে আমি যে তোমায় প্রপোজ করলাম সেটা নিয়ে।”
ইহসাসও পিছন থেকে দৌড়ে এসে হিয়ার একপাশে হাঁটা শুরু করেছে। তখনই কথাটা বলে ইহসাস। হিয়া কোমড়ে হাত দিয়ে দাড়িয়ে যায়। তার সাথে সাথে ইহসাস আর নাতাশাও থামে। সে রুঢ় কণ্ঠে বলে,
“আপনি থেকে সেজা তুনিতে নেমেছেন? প্রপোজ করেই এতো উন্নতি?”
“ইহসাস অলওয়েজ ফাস্ট।”
ইহসাস নিজপর শার্টের কলার তুলে ভাব নিয়ে কথাটা বলে। নাতাশা মুখে হাত দিয়ে ভাইকে প”চাতে বলে,
“তুই ফাস্ট না ফা”স। যেখানে সেখানে ফে”সে যাস শুধু। তখন তোদের না থামালে ওখানপই তো যু”দ্ধ শুরু করে দিতি তোরা।”
হিয়া ওদের দুজনের উদ্দেশ্যে বলে,
“তোমরা দুটো মানুষই বেকার। একদম যা তা।”
সে দৌড়ে গিয়ে বোনের পাশে দাড়িয়ে হাটতে শুরু করে। রায়া বোনকে দেখে জিগাসা করে,
“হাঁটতে সমস্যা হচ্ছে কোনো?”
“একটু গরম লাগছে আপু।”
“জ্যাকেট খুলে ব্যাগে তুলে নে। ওরনা পেঁচিয়ে নে গলায়।”
হিয়া লেডিস জিন্স আর কাফতান পরেছিলো বোনের মতোই। এর উপর পাতলা একটা জ্যাকেট পরে নিয়েছিলো সে। হিয়া রায়ার কথামতো জ্যাকেট খুলে ওরনা পরে নেয়। দুজনেই পাশাপাশি হাঁটতে থাকে। হিয়া তখনই ওদের মাঝেই বাংলা বাদ দিয়ে ফরাসী ভাষায় জিগাসা করে,
“ব্রোর সাথে কথা বললি, রাদ ভাইয়ার সামনে। ভাইয়া কিছু বলেনি তোকে? আমার যতোদূর ধারণা রাদ ভাইয়াকে তুমি কিছু বলতে বাকি রাখোনি।”
রায়া বাংলা ভাষাতেই বলে,
“না।”
৫৮,
রাদ, ইহসাস আর নাতাশা খানিকটা ঘাবরে যায় দুবোনের কথা শুনে। হিয়ার মুখে হঠাৎ অন্য ভাষা। তারমাঝে রাদের নাম স্পষ্ট। রাদ বলে,
“তোমার বোনকে আমায় নিয়ে কিছু বললে?”
“না ভাইয়া। এমনিই মজা করছিলাম।”
হিয়া কথাটা এড়িয়ে যায়। রাদ বুঝতে পেরেও চুপ থাকে। ওরা হাটতে হাটতেই শুভলং পাহাড়ের চূড়ায় পৌছে যায়। হিয়া পাহাড়ের ধারঘেষে দাড়ায় দুহাত বিস্তৃত করে প্রকৃতির সান্নিধ্যে হারিয়ে যায়৷ দুচোখ বন্ধ করে প্রকৃতির কোলে বিমোহিত পরে হিয়া। ইহসাস মুগ্ধ দৃষ্টিতে প্রকৃতির মুগ্ধতায় ডু”বে যাওয়া হিয়াকে দেখতে ব্যস্ত। ফোনে হিয়ার কিছু ছবি তুলে নেয়৷ নাতাশা পাহাড়ের চূড়ায় ঘুরে ঘুরে দেখছে। যেদিকে তাকাচ্ছে শুধু কাপ্তাই হ্রদের পানি আর পানি। মাঝে মাঝে ছোটো ছোটো পাহাড়৷ সবুজের সমারোহ আর পানির ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। পুরো প্রকমতি যেনো মাতিয়ে রেখেছে। ইশ সবকিছু এতো সুন্দর কেনো! রায়াও মুগ্ধ হয়ে যায় সবটা দেখে। মানুষ কেনো যে নিজের দেশ রেখে বিদেশে পাড়ি জমায় ঘোরাঘুরি করতে। যতো টাকা খরচ করে বিদেশে যায়, তার অর্ধেকও লাগবেনা দেশের সৌন্দর্য ঘুরে দেখতে । নিজের দেশেই কত সুন্দর সুন্দর জায়গা। সেগুলো দেখা শেষ না করতেই মানুষ ভিনদেশে যেতে তৎপর হয়। রাদ রায়ার পাশে দাড়িয়ে প্রকৃতি আর প্রকৃতির মাঝে মুগ্ধ হওয়া স্ত্রী দুটোই দেখতে ব্যস্ত। রায়া যখন বুকে হাত গুজে চারপাশ দেখতে ব্যস্ত, তখন রাদ বলে,
” রায়া!”
“কিছু বলবেন?”
রায়া না তাকিয়েই কথাটা বলে। রাদ উত্তরে বলে,
“বলুন না আমায়, কাল আপনাদের কি কথা হলো!”
“তেমন কোনো কথাই নয় রাদ সাহেব। শুধু তাকে ভালো থাকতে বললাম।”
“ভালোবাসার মানুষকে না পেয়ে আদৌও ভালো থাকা যায়?”
“যায়না, কিন্তু ভালোবাসার মানুষ টা ভালো আছে বুঝেও ভালো থাকার চেষ্টা করা যায়।”
“কিন্তু আপনি আদৌও ভালো আছেন তো?”
“আছি হয়তো ভালো।”
“রায়া?”
“হ্যাঁ! ”
“আপনাকে ভালোবাসি।”
রায়ার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। আচমকা রাদের মুখে ভালোবাসি শব্দটা তাকে অতীতে ফিরতে বাধ্য করায়। লুইস তো এভাবে বলেছিলো, ‘রেইন!’ সে হু বলতেই লুইস বলেছিলো, ‘লাভ ইউ।’ যেটার জন্য রায়া মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। যেমন টা সে আজকেও ছিলো না। কিন্তু সেদিন তো সময় নিয়ে হলেও লাভ ইউ টু বলেছিলো, আজ কি বলবে! সে তো রাদকে ভালোবাসে না। রায়া চোখ বন্ধ করে নেয়। অতীতের করাঘাত থেকে বের হয়। চোখে অশ্রুকণা ভীড় জমায়। বেরিয়ে আসার জন্য উপচে পরার চেষ্টা করে। কিন্তু রায়া পাত্তা দেয়না তাদের। তার চোখ যে বড্ড অবাধ্য। না চাইতেও কারণে অকারণে জল এসে যায়৷ লুইস সেজন্য তাকে বাংলা ভাষাতেই ছিচকাদুনে বলতো। সে কারণে অকারণে হাইপার হয়ে কেঁদে ফেলতো বলে, তার ফুফাতো বোনের থেকে জেনে নিয়েছিলো, হুটহাট এভাবে কান্না করা মেয়েদের বাংলায় কি বলে! তার কাছে শিখেছিলো লুইস৷ লুইসের কথা মনে আসতেই অজান্তেই মুচকি হাসে রায়া। রাদ রায়াকে নিস্তব্ধ হতে দেখে কিছু বলেনি, কিন্তু হাসতে দেখে বলে,
“আপনি হাসছেন কেনো রায়া?”
“কিছু সুন্দর মুহুর্ত মনে পরলো এজন্য। আমি লুইসকে কি বুঝিয়েছি শুনবেন?”
“বলুন!”
“ভালোবাসার মানুষকে তো চাইলেই ভুলে যাওয়া সম্ভব না। ভুলতে চাইলে, আরও বেশি মনে পরে। সুন্দর মুহুর্ত গুলো মনের কোণায় যত্ন করে রেখে সে যেনো মুভ ওন করে। এলভিনা তার ক্লাসমেট, তার মায়ের পছন্দের মেয়ে৷ তাকে যেনো বিয়ে করে। এলভিনা বড্ড ভালোবাসে লুইসকে। সেটা আমি সম্পর্কে জড়িয়ে যাওয়ার পর বুঝতে পেরেছিলাম। কিন্তু সরে আসতে পারিনি। অন্য কারোর ভালোবাসা কে”ড়ে নিয়ে হয়তো সুখ পাওয়া যায় না। সেজন্য আমিও তাকে পেলাম না। সে যেনো ভালো থাকে। আমায় ভালোবাসলে, সত্যিই যেনো সে এলভিনাকে বিয়ে করে নেয়। আমি জানি এলভিনা ঠিক পারবে লুইসকে ভালো রাখতে৷”
“অন্যের ভালোবাসা কেড়ে নিয়ে ভালো থাকা যায়না বললেন! তবে কি আপনি আমায় কখনও ভালোবাসবেন না রায়া?”
“ঐ যে থাকে না কিছু সংসার, দায়বদ্ধতা থেকে সংসার টিকিয়ে রাখা, মানিয়ে নেওয়া। এভাবে এভাবে চলতেই চলতেই মায়া বসে যায়, কিন্তু ভালোবাসা যায় না। আমার আপনার সম্পর্ক হয়তো এমনই হবে।”
“রায়া! আমার কি অপরাধ! আমি কি আপনার ভালোবাসা পাবো না?”
“বাদ দিন এই টপিক। পরে কথা বলা যাবে।”
রাদ চুপ হয়ে যায়। সে প্রকৃতির মাঝে একটু শান্তি খুজতে ব্যস্ত হয়ে পরে। জীবনটা এমন হলো কেনো! রাদ দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। শুভলং জায়গাটা অনন্য সুন্দর। সৃষ্টিকর্তার এক অপূর্ব সৃষ্টি যেনো। চারদিক দেখলেই মনে হচ্ছে মেঘ হাত দিয়ে ছুয়ে দেওয়া যাবে৷ দুপুরের নামাজের সময় হয়ে গেছে। পাহাড়ের উপর একটা মসজিদ আছে। আজানের সুর ভেসে আসে। সে একটু শান্তির জন্য নামাজ পরতে চলে যায়। মনের অশান্তি রব ব্যতিত কেউ দূর করতে পারবেনা আপাতত। সে ইহসাসকেও ডেকে নেয়।
৫৯,
সময়টা দুপুর, রাদ-রা পাহাড় থেকে নিচে নেমে এসেছে। শুভলং বাজারে ঘুরছে ওরা। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য বাজারের স্থানীয় হোটেলগুলোর একটায় বসার কথা ভাবছে ওরা। কিন্তু কোথায় বসা যায়! ঘুরতে ঘুরতেই ডাব চোখে পরে ওদের। ইহসাস বলে,
“ডাবের পানি খাওয়া যাক?”
“হ্যাঁ চল। ”
রাদ কথাটা বলে। এরপর ওরা সবাই মিলে ডাবের পানি খায়। একটা হোটেলে বসে স্থানীয় লোকের মুখে শোনা ব্যাম্বো বিরিয়ানী আর ব্যাম্বো চিকেন অর্ডার করে। চট্টগ্রাম শহরে বিশেষ ধরণের বাঁশ পাওয়া যায়। তার ভিতর প্রয়োজনীয় সব জিনিস দিয়ে তৈরি করা হয় এই খাবার। ওরা খাবার খেয়ে বের হয়। শুভলং পাহাড়ে পাহাড়িদের তৈরি বিভিন্ন রকম জিনিস পাওয়া যায়৷ পাহারী চাকমা মেয়েদের পোশাক পিনন ও হাদী আর ছেলেদের কাপড় টন্নে হানি, খুবং, ধুতি। নাতাশা জিদ করে সবার জন্য একসেট করে কিনে৷ ইহসাস ধমক দিয়েও নাতাশাকে থামাতে পারেনি। হিয়া তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেছে। কাপড় কিনতে কিনতে ওরা ঠিকও করে নেয় বাড়িতে গিয়ে পড়বে। নাতাশা মনে করে আনিকার জন্যও কাপড় কিনে নেয়। বড়োদের জন্য পাহাড়িদের তৈরি বিশেষ ধরণের গাশের চাদর পাওয়া যায়। সেটা কিনে নেয়। এরপর ওরা রওনা দেয় শুভলং ঝর্ণার উদ্দেশ্যে। রিজার্ভ করা নৌকায় উঠে পরে ওরা। কিছু সময়ের মাঝেই শুভলং ঝর্ণার সীমানায় নেমে পরে। শুভলং ঝর্ণা কাপ্তাই হ্রদের কোলঘেষেই বয়ে চলেছে। এরপর পানি হ্রদে গিয়ে আ’ছরে পরে। হিয়া আগেও সমুদ্র পানি এসব দেখেছে। কিন্তু শুভলং ঝর্ণার সৌন্দর্যই আলাদা৷ শুভলং পাহাড়ের কোলঘেষে বয়ে চলেছে শুভলং ঝর্ণা। ঝর্ণা বয়ে পরার সময় স্বচ্ছ পানি, এরপর কাপ্তাই লেকের পানির সাথে মিলে হয়ে যাচ্ছে সবুজ রঙের। পরা সৌন্দর্যে ফের একদফা মুগ্ধ হয়। বিমোহিত হয়ে শুভলং এর অপার সৌন্দর্য দেখতে ব্যস্ত হয়ে পরে। চারপাশে সবুজ গাছগাছালির ফাকে ২-১টা বানরও নজরে পরে হিয়ার। এরা এই পানির মাঝে সার্ভাইভ করে কিভাবে! হিয়া অবাক হয়। শুভলং ঝর্ণায় অনেক মানুষকে গোসল করতে দেখে হিয়া বলে বসে,
“আমরাও গোসল করবো চলো।”
ইহসাস অবাক হয়ে বলে,
“কিহ?”
“এতে এতো অবাক হওয়ার কি আছে? গোসলই করতে চেয়েছি, আপনাকে খু”ন তো করতে চাইনি!”
ইহসাস হিয়ার কথায় কি বলবে বুঝে পায়না। সে আনমনেই বিরবির করে বলে, ‘খু””ন হলেই শুধু খু”’ন হওয়া বলে! দুচোখ দিয়ে যতোবার তাকাও, তাতেই তো খু”’ন হই।”
“এই আপনার বিরবির করে কথা বলার অসুখ আছে নাকি?”
হিয়া ইহসাসকে বিরবির করতে দেখে কথাটা বলে। রায়া তখুনি চুপ করা থেকে মুখ খোলে। বল,
“হিয়া চুপ, একদম অতিরিক্ত কথা বলবিনা। কেউ গোসল করবেনা। ঘোরাঘুরি করে নৌকায় উঠো ভদ্র মেয়ের মতো। ”
“আপু প্লিজ! শুধুমাত্র ১৫মিনিট। এরপর বেশি নয়, পাক্কা প্রমিজ।”
হিয়া কাতর স্বরে বোনকে অনুরোধ করে। নাতাশাও হিয়ার সাথে তাল মহল মিলিয়ে বলে,
“ভাবী প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ চলো গোসল করি। কাপড় তো আমাদের ব্যাগেই আছে। কোনোভাবে পাল্টে নেবো।”
রাদ তার দুই বোনকে এতো বার রিকুয়েষ্ট করতে দেখে রায়াকে বলে,
“এতো করে বলছে যখন, মেনেই নিন না রায়া।”
ইহসাসও ভাইয়ের কথার সাথে সুর মিলিয়ে বলে,
“হ্যাঁ ভাবী মেনে নাও প্লিজ!”
চলবে?
#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ২৭
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
৬০,
ঝর্ণার পানিতে ভিজে নৌকায় কাপড় পাল্টে নিচ্ছে হিয়া। নৌকাতেই সব ব্যবস্থা করা আছে। রায়া অনুমতি দিয়েছিলো ভেজার জন্য। তবে বেশি নয় ১৫মিনিটের জন্য। কিন্তু হিয়া তো নেমে পানিতে লা”ফালাফি শুরু করেছিলো। ১৫মিনিটের জায়গায় পাক্কা ৪৫মিনিট ভিজে উঠে এসেছে। এখন তো শীতে ঠকঠকিয়ে কাপছে। হালকা ঠান্ডাতেই সর্দি, মাথা ব্যাথা সব এসে হাজির হয় হিয়া। বোনের অবাধ্য হয়ে ভিজলো তো! কিন্তু এখন ঠান্ডা লাগলে বকা দিয়ে কান ঝালাপালা করে দেবে তার। হিয়া নিজের ব্যাগ থেকে থ্রিপিস বের করে পরে নেয়। তার উপরে একটা জ্যাকেট চাপিয়ে দেয়। সে জানে তার ঠান্ডার বাতিক আছে৷ আর ওয়েদারও এখন সকাল সন্ধ্যায় ঠান্ডা ঠান্ডা। সেজন্য নিজের ব্যাগপ্যাকে সব তুলে এনেছে। হিয়া ড্রেস পাল্টে বাইরে বের হতেই ইহসাসের মুখোমুখি হয়। ইহসাস এখনও ভেজা কাপড়ে। সে জানতো না হিয়া ভেতরে আছে। সে হিয়ার দিকে তাকাতেই থমকে যায়। নীল থ্রিপিস পরহিত হিয়াকে দেখে চোখে মুগ্ধতা বিরাজ করছে ইহসাসের৷ অন্য রকম হিয়াকে দেখলো সে। লেহেঙ্গা, জিন্স, টপস, স্কার্ফ, স্কার্ট, শার্টের বদলে সে থ্রিপিস পরিহিত একজন পরিপূর্ণা বাঙালি কিশোরীকে দেখলো সে। যদিও বা হিয়ার কিশোরী বয়স পেরিয়ে গেছপ, তবুও হিয়াকে এই সময়টা ১৬বছরের কিশোরীই মনে হচ্ছে ইহসাসের কাছে। ইশ হিয়া যদি কিশোরী হতো! তার কিশোরীর মনের আঙিনায় ভালো লাগা ছড়িয়ে দেওয়া যেতো। কিন্তু হিয়া তো ২০বছরের একজন যুবতী নারী। হিয়া ইহসাসকে তার দিকে একনাগারে তাকিয়ে থাকতে দেখে অসস্তিতে গাঁট হয়ে দাড়িয়ে আছে। হাতের নখ খুঁটতে ব্যস্ত হয়ে যায়। ইহসাস হিয়ার অসস্তি বুঝতে পেরে বলে,
“ড্রেস পাল্টানো হলে একটু সরে দাড়ান। আমি কাপড় বদলে নিতাম।”
হিয়া চট করে ইহসাসের পাশ কাটিয়ে সরে যায়। হিয়া মাথা চুলকে ভেতরে ঢুকে পরে।
নাতাশা নৌকার দাড়ঘেষে দাড়িয়ে আছে। ভেজা চুলগুলো হাওয়াই মৃদু মন্দ উড়ছে। তার জার্মানি ব্যাক করার সময় হয়েছে। ঘুরতে বসে তার রিটার্ন টিকেটের টাইমই ভুলে বসেছে সে। মন খারাপের মেঘ জমেছে তার মনে। সবাইকে ছেড়ে থাকতে ইচ্ছে করেনা তার। সেই মন খারাপের বিষাদিনীকে ফোনের অপর পাশ থেকে ক্যামেরায় ভিডিও কলে দেখছে একজন৷ দেখাচ্ছে হিয়া নামক মানুষটি। সে ফোনের সামনের ক্যামেরায় সুইচ করে ভ্রু নাচিয়ে বলে,
“কেমন লাগলো?”
“তোর সবকিছুতেই বারাবাড়ি হিয়া।”
বললো ফোনের অপরপাশে থাকা হিয়ার ভাই অন্তর। হিয়া ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
“হ্যাঁ সেই তো। আমার তো বারাবাড়ি। কিন্তু এতো দেখছিলি তো ড্যাব ড্যাব করে।”
“ফোন রাখ ফা”জিল।”
বলার সাথেই ঠা”স করে মুখের উপর ফোন কে’টে দেয় অন্তর। হিয়া ফোন দিয়েছিলো ভাইয়ের সাথে কথা বলার জন্য। অন্তরকে বাসায় নেওয়া হয়েছে, এরপর হোয়াটসঅ্যাপে ভাইয়ের মেসেজ পেয়ে সে সরাসরি ভিডিও কল দেয়। কল দিয়েই বলে, ‘ভাই ভাবীকে পেয়ে গেছি।’ এরপর অন্তর উত্তরে বলেছিলো, ‘কই দেখি?’ তখনই হিয়া নাতাশাকে দেখায় কিছু টা দূর থেকে। অন্তর ফোন কে”টে দেওয়ার সাথেই হিয়া নাতাশার কাছে গিয়ে দাড়ায়। নাতাশা হিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে দৃষ্টিটা আবার জলরাশির উপর ফেলে। হিয়া বললো,
“তোমার মন খারাপ?”
“কি করে বুঝলে?”
নাতাশা না তাকিয়েই প্রশ্নের উত্তরে প্রশ্ন করেই বসে। হিয়া বলে,
“নাম টা তো এমনি এমনি হিয়া নয়। কার হিয়ার মাঝে কি চলে একটু হলেও বুঝি।”
তখনই ইহসাস হিয়াদের পিছনে এসে দাড়ায়। হিয়ার কথা তার কানে যেতেই বলে,
“বুঝেন না শুধু আমার হিয়ার মাঝে কি চলে মিস হিয়া ম্যাম।”
হিয়া পিছন দিকে তাকায়। ইহসাসকে দেখে মুখ ভেঙচিয়ে বললো,
“পাগলের প্রলাপ বুঝে লাভ নেই।”
“সকল প্রেমিকই সব প্রেমিকার কাছে পাগল হয়ে থাকে। তারা ভালোবেসে প্রেমিক পুরুষকে পাগল বলে সম্মোধন করে৷”
“আসছে প্রেমের উপর পিএইচডি করা লোক।”
৬১,
“হ্যাঁ আসছিই তো।”
নাতাশা চুপ করে ওদের ঝ”গড়া দেখছিলো। মনে তপমন আনন্দ আগ্রহ নেই বলে সে কথা বলছিলো না। কিন্তু এবার বিরক্ত হয়ে বললো,
“ভাইয়া তুই সর তো। ভালো লাগছে না এখন।”
ইহসাস এবার সিরিয়াস হয়। বোনকে নিয়ে সবসময় সে সেনসিটিভ। বোনের কিছু হয়েছে বুঝলে তার অবস্থা পা’গল প্রায় হয়ে যায়। সে এটাও জানে এখন নাতাশাকে কিছু জিগাসা করলে বলবেনা। নিজে থেকেই এসে পরে বলে। সেজন্য ইহসাস নাতাশাকে ছেড়ে সরে নৌকার অন্য মাথায় চলে যায়। যেখানে রাদ আর রায়া দাড়িয়ে আছে। ইহসাস যেতেই রাদ বলে,
” কাপ্তাই লেকে জুমঘর রেস্তোরার নাম বেশ জনপ্রিয়। নৌকা সেখানে থামিয়ে কিছু খাওয়া যাক। এরপর ঝুলন্ত ব্রিজে থামিয়ে ঘুরে হোটেলে ফেরা যাক।”
“যেটা ভালো মনে হয় ভাইয়া।”
“শুধু তোমার ভাইয়ার ভালো মনে হলেই হবে? তোমাদেরও তো ভালো লাগতে হবে।”
বললো রায়া। ইহসাস মুচকি হেসে নৌকার দার ঘেষে বসে বললো,
“সেটা তো অবশ্যই ভাবী।”
এরপর সবার মাঝে পিনপিন নিরবতা। শুধু পানির কলকাকলীতে চারপাশ মুখরিত। ওরা রাদের কথা অনুযায়ী জুমঘর রেস্তোরার পাহাড়ে থামলো। এরপর পাহাড়ের চূড়ায় রেস্তোরায় গিয়ে একটা টেবিলে বলে। রাদ সবাইকে জিগাসা করে,
“কি খাবে তোমরা?”
হিয়া বললো,
“যা ইচ্ছে হয় অর্ডার করুন দুলাভাই।”
“হ্যাঁ ভাইয়া, তোর মনমতো অর্ডার করে দাও।”
নাতাশা হিয়ার পরেই কথাটা বলে। রাদ ওদের কথায় পাহাড়িদের বিশেষ খাবার, বাঁশ কোড়ল, কাঁচকি ফ্রাই, কেবাং, কোলার মোচা দিয়ে তৈরি খাবারগুলো অর্ডার দেয়। খাবার সার্ভ হতেই ওরা নিশ্চপে খেয়ে নেয়। নাতাশার নিরবতায় সব যেনো নিরব হয়ে গেছে। ইহসাস এবার নাতাশার সাথে কোনো রকম খুনশুটি করলো না। ওরা খাওয়া শেষে বিল মিটিয়ে ফের নৌকায় করে ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে রওনা দেয়। কিছু সময়ের মাঝে ওরা ঝুলন্ত ব্রিজে এসে নামে। হিয়া ঝুলন্ত ব্রিজের সামনে দাড়িয়ে এক পা ব্রিজে দেয় আবার ভয়ে পিছিয়ে আসে। ইহসাস তো ততক্ষণে ব্রিজে উঠে হাটা শুরু করেছে। ঝুলন্ত ব্রিজ যেহেতু, মানুষ চলাচল করলে ব্রিজ একটু নড়ে। নাতাশাও ভাইয়ের পিছু পিছু খুনশুটি করতে করতে চলে গেছে রায়া আর রাদও পাশাপাশি হাটছে ব্রিজে। জনসমাগম বেশি না থাকলেও মোটামুটি ভালোই লোকজন নজরে পরছে তাদের৷ রাঙামাটির বিশেষ আর্কষণই এই ঝুলন্ত ব্রিজ। রাঙামাটিকে ঘিরে আছে কাপ্তাই লেক যেটি একটি কৃত্রিম লেক। ১৯৬০সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে লেকটি নির্মিত হয়। রাঙামাটির চারদিকে যে পানি আর পাহাড়গুলো আছে সব এই লেকেই আটকা পরে৷ আর এই কাপ্তাই লেকেই রাঙামাটির সকল দর্শনীয় স্থান। হিয়া সাহস করে যখন ব্রিজে পা দিয়েই ফেলে, ভয়ে চোখ বন্ধ করে নেয়। তখনই বিষয় টা ইহসাস খেয়াল করে সে হিয়ার দিকে এগিয়ে আসে। রায়া বিষয়টা খেয়াল করলেও মনোযোগ দিতে চায় না। ইহসাস একটু বেশিই হিয়ার আশোপাশে ঘেষছে। এবং কেনো এতো ঘুরঘুর করা রায়ার বুঝতে বাকি নেই। কিন্তু এসবে হিয়ার সম্মতি থাকলে সে কিছু বলবেনা। ইহসাস হিয়ার কাছে দাড়িয়ে বলে,
“বিয়াইন সাহেবা? ভয় পাচ্ছেন নাকি?”
হিয়া ইহসাসের কন্ঠস্বর শুনে চোখ খুলে। এরপর ভয় নিয়েই বলে,
“একটু একটু।”
ইহসাস হিয়ার কথা শুনে নিজের হাত বারিয়ে দেয়। হিয়া একবার ইহসাসের মুখের দিকে একবার হাতের দিকে তাকায়। হিয়া হাত টা ধরছেনা দেখে ইহসাস চোখ দিয়ে ইশারা করে হাত ধরার জন্য। হিয়া একবার বোনের দিকে তাকায়। রাদ, রায়া আর নাতাশা প্রায় ব্রিজের অপর মাথায় পৌছে গেছে। হিয়া সাহস করে ইহসাসের হাতে হাতটা দিয়েই দেয়। এরপর দুজনে পাশাপাশি হাঁটতে শুরু করে। মুহুর্ত টা দারুণ লাগছে হিয়ার কাছে। ইহসাসের মনেও আনন্দের ঢেউ। কিন্তু আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হিয়া হাতটা ছেড়ে দেয়। ইহসাস একটু হিয়ার দিকে সরে এসে কানের মুখ নিয়ে বলে,
“আজ ছেড়ে দিলেন কিছু বললাম না, কিন্তু এমন এক দিন আসবে, আপনি ছাড়লেও আমি ধরেই রাখবো।”
হিয়া একবার ইহসাসের এই কথায় তার মুখের দিকে তাকায় । এরপর চোখ নামিয়ে নেয়। ইহসাসের চোখের দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারেনা। তার চোখের দৃষ্টিতে কেমন একটা ঘোর লেগে আসে। কি একটা য”ন্ত্রণা। তবে কি হিয়া একটু একটু করে ইহসাসের প্রেমেই ডু”বে যাচ্ছে!
চলবে?
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।