#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ২৮
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
৬২,
স্রোতের নিয়মে বয়ে চলেছে সময়। দেখতে দেখতে রাদ আর রায়ার বিয়ের বয়সও দেড় মাস হয়ে আসলো। দেড় মাসে বদলেছে অনেক কিছু। রায়া এমনিই চুপচাপ, স্বভাবের নিয়মে আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছে সে। তার শ্বশুর বাড়ির প্রতিটা মানুষও কেমন একটা যেনো। সবাই সবার নিয়মে ব্যস্ত। এই তো দিন যাচ্ছে সকালে বড়ো জা-য়ের সঙ্গে সকালের নাস্তা বানানো শেখা, নাস্তা টেবিলে দেওয়া, দুপুরের খাবার তৈরিতে আনিকাকে সাহায্য করার চেষ্টা করা নয়তো রাতের খাবার বানাতে সাহায্য করা। আনিকা জানে তার ছোটো জা সাংসারিক কাজ কর্মে পটু নয়, সে শিখিয়ে নিচ্ছে সব। ব্যস পুরো সংসার মিলিয়ে কাজই তো এটুকু। বাড়িতে কাজের লোক নিয়োগ করেছে তার শ্বশুর। রান্নাবান্না বাদ দিয়ে সব কাজের মহিলাই করে দিয়ে যায়৷ শ্বশুর, চাচাশ্বশুর, স্বামী, ভাসুর সবাই সকালে খেয়েই কাজে চলে যায়। নিজেদের ব্যবসা সামলায়। শাশুরি, চাচী শাশুড়ী খেয়ে দেয়ে ঘরে শুয়ে বসে রেস্ট করেন নয়তো দুই জা গল্প করেন। এভাবেই চলছে জীবন, জীবনের নিয়মে। রায়া চাপা স্বভাবের। সে গিয়ে তেমন ভাবে সবার সাথে মিশতে পারেনা। আনিকা তো সংসার সামলিয়ে কিছু বলতেই হিমশিম খায়। নাতাশা চট্টগ্রাম থেকে ঘুরে আসার পর জার্মানি চলে গিয়েছে। এরপর পুরো বাড়ি একদম নিস্তব্ধ, যেনো মানহষ বসত করেনা এই বাড়িতে। সকালে নাস্তার টেবিলে আর রাতে খেতে বসলে তবেই সবার গল্প গুজবের আওয়াজ পাওয়া যায়। ব্যালকনির গ্রিল ধরে আকাশের দিকে তাকিয়ে আনমনে এসবই ভাবছিলো রায়া। সংসার জীবন কেমন একটা পানসে হয়ে গেছে । রাদ সে তো তার সাধ্য মতো রায়ার মনে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা করে চলেছে। কিন্তু তার ভেতরের অনুভূতিরা সব কেমন যেনো মৃ”ত প্রায় হয়ে গিয়েছে। একবার কাউকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসে অন্য কাউকে সহজেই যদি ভালোবাসা যায়, তবে প্রথম টা ভালোবাসা ছিলো আদৌও! রায়া পারছেনা যেনো রাদকে মন থেকে মানতে। তবে সে চেষ্টা করছে মনের গন্ডিটা সংসারে বেধে রাখতে। কিন্তু মন তো পাখি নয় যে চাইলেই খাঁচায় বন্দী করবে! মন তো সেই দূরেই দূরদেশে হারিয়ে এসেছে রায়া। তাকে খুজে পাওয়া অসম্ভব এখন৷ রায়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। জীবনের লক্ষ্য, চাওয়া পাওয়া বাঁচার আশা সব এক নিমিষে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে যেনো! রায়া তার এলো চুল খোঁপা করে। ফ্লোরে ছড়ানো শাড়ির আঁচল টা গুছিয়ে নেয়। আকাশে গোধুলির আলো নেমেছে। নিচে যাওয়া দরকার, আনিকা একা একা কি করছে কে জানে! রায়া পেছন ফিরতেই ব্যালকনির দরজার সাথে রাদকে বুকে হাত বেঁধে দাড়িয়ে থাকতে দেখে সে দাড়িয়ে পরে। রাদ তখন বলে,
“অগোছালো রায়াকেই বড্ড সুন্দর লাগে।”
রায়া নিষ্প্রভ দাড়িয়ে রয়। সে জানে এই মানুষ টা তাকে ভালোবাসে। কিন্তু তার কোনো কথাতেই সে কোনো অনুভূতি খুজে পায়না। কেনো পায়না খোদা মালুম। রাদ রায়ার দিকে দুকদম আগায়। রায়া ভ্রু কুঁচকায়। রাদ রায়ার মুখোমুখি দাড়িয়ে রায়ার কপালে, মুখের উপর পরে থাকা ছোটো চুলগুলো কানের পিঠে গুজে দেয়। আচমকা রাদে স্পর্শে রায়া কেপে উঠে৷ সে দুহাতে শাড়ি চেপে ধরে। রাদ পিছনে সরে যায় রায়ার অবস্থা দেখে। সে মাথা নিচু করে রায়াকে বলে,
“স্যরি।”
রায়া এবার মুখ খোলে। সে বলে,
“কেনো?”
“আপনাকে ছুয়ে ফেললাম।”
“অপরাধ করেননি কোনো। বউকেই ছুয়েছেন, পাড়ার মহিলাদের নয়।”
রায়া কথাটা বলেই রাদ কে পাশ কা”টিয়ে রুমে ঢুকে। রাদ ওখানেই ‘থ’ হয়ে দাড়িয়ে আছে। রায়া তাকে কি বললো! এ্রায়া তো প্রয়োজন ব্যতিত একটা শব্দও বলে না। সেখানে আজ ছোয়ার ফলে রাগ নয়, তার অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে গেলো! রাদ যেনো কথা বলতেই ভুলে গিয়েছে। সে রুমে আসে। রায়া ততক্ষণে রুম থেকে বেরিয়ে গেছে৷ রাদ মাথা চুলকে মুচকি হাসে। সে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়।
৬৩,
ইদানীং বাবার ব্যবসায় হাত লাগিয়েছে ইহসাস। সাথে নিজের একটা পরিচয় গড়ার চেষ্টা করতে বিভিন্ন জায়গায় চাকরীর ইন্টারভিউ দিচ্ছে। কিন্তু হয় তার কাজ পছন্দ হচ্ছে না বা কাজ পছন্দ হলে ইহসাসের প্লেস পছন্দ হচ্ছে না। ভবঘুরে ছেলে কিনা! মন কি আর কাজে আটকায়। নিজের প্রতি বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে ইহসাস। জীবনটাকে আরও উপভোগ করার ইচ্ছে তার। কিন্তু সে যে আটকে গেছে এক মায়াবতীর মায়ায়। তার মায়ায় আটকে থাকতে গেলে একটা কিছু তো করতেই হবে। হিয়ার কথা মনে আসতেই মুচকি হাসে ইহসাস। সবে সে বাবার সুপারশপ থেকে কাজ শেষে বেরিয়েছে। বেরিয়ে হাঁটতে হাটতেই হিয়ার কথা মনে পরে যায় তার। রাঙামাটিতে ঘোরাফেরা শেষে তারা সোজা বাসায় চলে এসেছিলো। তার ভাবী আর চায়নি ঘোরাঘুরি হোক, আর নাতাশারও ফ্লাইটের ডেট এসে গিয়েছিলো। সেজন্য তারা রাঙামাটি ঝুলন্ত ব্রিজ দেখেই চট্টগ্রামে ব্যাক করে। এরপর তাইবার সাথে দেখা করে চলে আসে রাজশাহীতে। তাইবা তাদের সাথে ফেরেনি। রাহেদের পরিবারের সাথে পরিচিত হয়ে ঢাকাতেই থেকে গিয়েছে তাইবা। ইহসাসের মা অবশ্য তাইবার কথা জিগাসা করেছিলেন বাসায় ফেরার পর। তাকে মানিয়ে নিয়েছে তাইবা পড়াশোনার প্রেশারের কথা জানিয়ে৷ কিন্তু সেখান থেকে ফেরার পর পুরো দেড়মাস হলো হিয়ার সাথে ঠিকঠাক কথা হয়না ইহসাসের। হিয়ার নাম্বার সে রায়ার ফোন থেকে লুকিয়ে সংগ্রহ করলেও হিয়া কোনোদিন তার ফোন রিসিভ করেনি। মেসেজ করলে মেসেজের রিপ্লাই করেনি। একদিন শুধু রিপ্লাই করে বলেছিলো, অচেনা নাম্বারের কল রিসিভ করেনা সে। ইহসাসও মেসেজে নিজের পরিচয় বলেনি৷ ব্যাপারটা ভালো লেগেছিলো ইহসাসের। কিন্তু হিয়ার রাঙামাটি থেকে ফেরার পর কি হয়েছে জানেনা ইহসাস। কিছু বুঝতেও পারছেনা। সে রায়াকে দেখতে আসেনা তাদের বাড়িতে। শুধু ফোনে কথা বলে। ইহসাস জানেনা পরিস্থিতি কোনদিলে বাক নিচ্ছে! তবে কি হিয়াকে প্রপোজ করায় সে রাগ করেছে। ইহসাস চাইলেই পারতো হিয়ার সাথে প্রতিদিন দেখা করতে! কিন্তু ভাবীর বোন! তার সাথে এমনিই যতটা খোলাখুলি কথাবার্তা, মেলামেশা করেছে সে! এটাই দৃষ্টিকটু। তারমাঝে বিনা কারণে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলে বাড়ির বড়োরা মোটামুটি একটা আন্দাজ করে নিবে তাদের মাঝে হয়তো কিছু চলছে! আর এটা তো বাংলাদেশ, একটা মেয়ের পাশে তার ভাইকে দেখলেও না চিনে থাকলে প্রেমিক বানিয়ে দেয় কিছু মানুষ। ইহসাস চায় না বিদেশের কালচারে বড়ো হওয়া একটা মেয়েকে তার স্বদেশে এসে অপমান জনক কিছু মুখোমুখি হোক। ইহসাস হাঁটতে হাটতে আনমনে এসবই ভাবছিলো। সময়টা রাতের আটটার কাছাকাছি। ইহসাস বাড়ি পৌছে যায়। বাসায় ঢুকতেই সোফায় আনিকা, রায়া আর হিয়াকে সোফায় বসে থাকতে দেখে খানিকটা অবাক হয়। অবাক রায়া বা আনিকাকে দেখে নয়, বরং হিয়াকে দেখেই হয়েছে। সে পকেটে হাত গুজে ভেতরে প্রবেশ করতে করতে বলে,
“বাহ! সূর্য আজ কোনদিকে উঠলো! আমাদের বিদেশী বিয়াইন সাহেবা আজ আমাদের বাড়িতে!”
হিয়া ইহসাসকে দেখতে পেয়ে আনিকার সাথে কথা বলছিলো, থেমে যায় তার কথা। মনের মধ্যে ঠান্ডা স্রোতের মতো একটা অনুভূতি বয়ে যায়৷ দেড় মাস, কম না পুরো দেড় মাস পর সে ইহসাসকে দেখছে। একই শহর, একই জায়গায় থেকেও শুধু কিছু টা দূরত্বে ছিলো তারা। অথচ একে-অপরকে দেখা হয়নি কতদিন। মনে হচ্ছে কতটা যুগ ইহসাসকে দেখেনি সে। এক নাগারে তাকিয়েই আছে ইহসাসের দিকে । রায়া বিষয়টা লক্ষ্য করে। তবে কি সে যা সন্দেহ করেছে সেটাই ঠিক! ইহসাস আনিকার পাশে সোফায় বসতে বসতে বলে,
“যাক বাবা তোমরা আমি আসার সাথে এমন ফুলস্টপ হয়ে গেলে কেনো?”
আনিকা বললো,
“আজ এতো তাড়াতাড়ি ফিরলে যে! ১০টার আগে তো আসো না।”
“এমনিই ভাবী, শরীরটা আজ ম্যাজমেজে লাগছে। কাজকর্মে মন বসছে না। চলে আসছি।”
“ওহহ আচ্ছা। রাদও আজ তারাতাড়ি আসলো, শরীর খারাপ বলে, তুমিও আসলে। দু-ভাইয়ের কি মিল ভাই।”
ভাইয়াও এসেছে?”
“হ্যাঁ।”
ইহসাস এবার হিয়ার দিকে তাকালো। এরপর বললো,
“তা বেয়াইন সাহেবা! এতোদিন পর কি ভেবে উদয় হলেন? রাঙামাটি থেকে এসে তো অমাবস্যার চাদের মতো ছিলেন। দেখা পাওয়া দুষ্কর।”
হিয়া নিশ্চুপ ইহসাসের কথায়। সে না হয় দেখা করেনি, তবে ইহসাস কেনো তাকে দেখতে গেলো না! এই নাকি সে আবার ভালোবাসে তাকে! হিয়ার মনে কিশোরী মেয়েদের মতো অভিমান জমে। অভিমানের পাহাড়ে সে মুখে কুলুপ এটে বসে রয়। রায়া হিয়ার হয়ে উত্তরে বলে,
“হিয়ার কানাডা ফেরার ফ্লাইট টাইম ফিক্সড হয়ে গিয়েছে। দেখা করতে এসেছে।”
ইহসাস বিস্ময়ে বিমূড় হয়ে যায়। সে অবাক নয়নে হিয়ার দিকে তাকায়। হিয়া ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে বসে আছে। ইহসাস অবিশ্বাসের সুরে বলে,
“মানে! এতো তাড়াতাড়ি ফিরবেন উনি? কিন্তু কেনো?”
“বিয়েটা আপুর হয়েছে, আমার না। যে আমি দেশে পরে থাকবো। আমার পড়াশোনা আছে, ক্যারিয়ার আছে। আমায় ফিরতে তো হবেই।”
হিয়া সোফা ছেড়ে উঠে দাড়াতে দাড়াতে কথাটা বলে। সে ড্রইং রুম ছেড়ে উপরের দিকে যেতে ধরে। যাওয়ার আগে বলে,
“আপু একটু তোর রুমে আয়। কথা আছে।”
রায়া হিয়ার কথা শুনে তার পিছু পিছু যায়। ইহসাসের মনের কোণে সুক্ষ এক তীক্ষ্ণ ব্যাথার উদয় হয়। এই ব্যথা কীসের! হিয়াকে পাওয়ার আগেই হারানোর পথে এজন্য! নাকি হিয়া তাকে না বুঝেই চলে যাচ্ছে সেজন্য! আনিকা ইহসাসের কষ্ট ভারাক্রান্ত মুখ দেখে ইহসাসের কাঁধে হাত রাখে। ইহসাস আনিকার দিকে তাকাতেই আনিকা বলে,
“এবার কি উচিত না ইহসাস তোমার মনপাড়ার খবরটা সবাইকে জানানো! সে চলে যাচ্ছে ইহসাস। ধরে বেধে রাখার মানুষ সে নয়। কিন্তু তেমন কিছু করা তো দরকার!”
ইহসাস আনিকাকে তার সব কথায় শেয়ার করে। সে জানে হিয়াকে ইহসাস ভালোবাসে। ভালোবাসা এমনই এক অনুভূতি, যেটা তৈরি হতে কারোর এক মুহুর্ত লাগেনা, আবার কেউ বছর গেলেও নিজের ভালোবাসা উপলব্ধি করতে পারেনা । যে পারে সে আগলে রাখার চেষ্টা করে, আর যারা পারেনা তারা হারিয়ে খুজে বেড়ায় ভালোবাসা। কি অদ্ভুদ নিয়ম। ইহসাস একটু ভেবেচিন্তে বলে,
“হ্যাঁ ভাবী, আমি হারাতে পারবোনা হিয়াকে। সময় নিয়েছি এতোদিন নিজেকে প্রিপেয়ার করার চেষ্টা করেছি শুধু হিয়ার বাবার সামনে নিজেকে অযোগ্য যেনো মনে না হয়৷ কিন্তু যার জন্য এতোকিছু, সেই তো চলে যেতে উঠেপরে লেগেছে। আগে তো তার মনপাড়ার খবর জানতে হবে ভাবী।”
“যেটা ভালো হয় সেটা করো ইহসাস।”
আনিকা উঠে চলে যায়। ইহসাস দুহাতে নিজের চুল টেনে মাথা নিচু করে বসে পরে। অসহায় লাগছে নিজেকে। কি করবে মাথায় ঢুকছেনা তার।
চলবে?
#হিয়ার_মাঝে
#পর্বঃ২৯
#আর্শিয়া_ইসলাম_উর্মি
৬৪,
সময়টা রাতের ২টো বাজে। ছাদের মিটিমিটি আলোয় ছাদে রাখা দোলনায় বসে আছে হিয়া। এটা তার বদঅভ্যেস। রাত বিরেতে মন খারাপ হলেই সে যেখানেই থাকুক, ছাদে উঠে বসে পরে। মন খারাপের গল্প গুলো আলো আধারের রাত্রীর মাঝে বিলিয়ে দেয়। আজ ভীষণ মন খারাপ হিয়ার। রাত পেরুলে দিন, এরপরই বিকেলে সে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দিবে। রাদ আর রায়া গিয়ে তাকে রেখে আসবে। সারারাতের জার্নি, দিনে একটু রাদের মামার বাসায় রেস্ট নিয়ে রাতের ফ্লাইটে সোজা কানাডায়। আগের সেই একঘেয়ে জীবনের সাথে আবার অভ্যস্ত হতে হবে। বাংলাদেশে কাটানো দিনগুলো সে ভুলবেনা। ঘোরাফেরা, আরাফাত, আফরা, রায়হানের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া দিনগুলো সে ভুলবেনা৷ সাথে এই বাড়ির মানুষগুলোকেও সে ভুলবে না। বড্ড অমায়িক মানুষ তার আপুর শ্বশুরবাড়ির। এতোটা মিল, সুখ, শান্তি বরাবর আজকাল কোনো পরিবারে দেখা যায় না। তাদের মাঝে সব থেকে বেশি হয়তো বিশেষ একজনকে মিস করবে হিয়া। বিশেষ একজন! শব্দটা হিয়া আনমনে ভাবলেও মষ্তিষ্কে তীক্ষ্ণ ভাবে গেথে পরলো হিয়ার। আসলেই বিশেষ মানুষ! হবে হয়তো। হিয়া হাটুর উপর হাত দিয়ে মাথা চেপে বসে আছে। আজ আকাশের বিশালতায় অন্ধকারে মন খারাপের গল্প উড়িয়ে দিয়েও তার মনের শান্তি আসছেনা। জীবনটা এমন কেনো! কিছু চাইতে বা পেতে গেলে ভয় আর দ্বিধায় পু”ড়তে হয় তাকে।
“এতোরাতে ছাদে আসতে ভয় লাগেনা তোমার?”
কারোর গলার স্বর শুনে মাথা তুলে তাকালো হিয়া। আবছা আলোয় দেখলো ইহসাস দাড়িয়ে টাউজারের পকেটে হাত গুজে। ইহসাসকে এতো রাতে ছাদে দেখে কিছু টা অবাক হয় হিয়া। সে ফোনে সময় দেখে নেয়। ২ঃ৪৭বাজে। সে আলতো স্বরে বলে,
“আপনি এতোরাতে এখানে?”
“সেই প্রশ্ন তো আমারও হিয়া।”
হিয়া উঠে দাড়ায়। আস্তে হেঁটে ছাদের রেলিং ঘেষে দাড়ায়। এরপর বলে,
“মানুষের কিছু বদঅভ্যেস থাকে। ধরতে পারেন এই রাত হলে মন খারাপ থাকলে ছাদে আসা আমার বদঅভ্যেস।”
ইহসাস নিঃশব্দে হেঁটে এসে হিয়ার পাশে দাড়ালো। এরপর পকেট থেকে হাত বের করে রেলিং উপর হাত দিয়ে ভর দিয়ে দাড়ালো। এরপর বললো,
“কিছু বদঅভ্যেস কে প্রশয় দিতে হয়না হিয়া। ”
“বাদ দিন। আপনি নিজেও তো এসেছেন।”
“আমি উঠেছিলাম তোমার সাথে কিছু কথা বলার জন্য। কিন্তু তোমার রুমের সামনে গিয়ে দেখলাম রুমের দরজা হাট করে খোলা। আর তুমিও রুমে নেই। নিচে গিয়ে চেইক করলাম। সেখানেও তুমি নেই৷ এজন্য ধাড়ণা করলাম হয়তো ছাদে থাকবে। আবার নাও থাকতে পারো, যেহেতু রাত অনেক। সন্দেহ মিটাতে আসলাম ছাঁদে। কিন্তু আশা ছিলো না তুমি এখানে থাকবে!”
“ওহহ।”
“হিয়া!”
ইহসাস কিছু টা কাতর স্বরে কষ্ট নিয়ে হিয়াকে ডাকে। ইহসাসের এমন কণ্ঠে ডাক শুনে সে ইহসাসের দিকে তাকায়। ইহসাস তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। আবছা আলোয় ওদের দুজনের চোখাচোখি ভালো করেই হলো। হিয়া বললো,
“কিছু বলবেন?”
“চলে যেয়ো না।”
“বললেই কি যাওয়া বাদ দেওয়া যায়! আমার গন্তব্য ওটা৷”
“তুমি জানো আমি তোমায় ভালোবাসি।”
“ভালোবাসি বললেই কি ভালোবাসা হয়ে যায় মিঃ ইহসাস?”
“আমার নাম ইহসাস হিয়া, অর্থটা উপলব্ধি। সেই আমি উপলব্ধি করতে পারবোনা নিজের অনুভূতি! এতোটা অবুঝ নই আমি হিয়া।”
“আচ্ছা বুঝলাম।”
“উত্তর দিলে না?”
“কীসের?”
“বললেনা ভালোবাসো কিনা!”
“কি জানি! আমি তো আর ইহসাস নই, যে নিজের অনুভুতি বুঝতে পারবো।”
“হেয়ালি করো না হিয়া। আমি তোমার মতামত জেনে আমি বাবা মাকে বিয়ের কথা বলবো।”
“একটা গল্প শুনবেন?”
“বলো!”
“একটা মেয়ে আজ থেকে ২০বছর আগে জন্ম নিয়েছিলো জানেন। বাবা মায় চাননি সে আসুক। মেয়েটার বাবা মা তার বড়ো ভাই আর বোনকে নিয়েই হ্যাপি ছিলো। মেয়েটা এসে তাদের হ্যাপি ফ্যামিলির মাঝে বারতি সন্তান হলো। মায়ের কাছে তার জন্য সময় ছিলো না, বাবার কাছেও না।মেয়েটা বাসার মেইডদের কাছে বড়ো হতে লাগলো। বড়ো হওয়ার সাথে সাথে বাবা মায়ের এই তার প্রতি অবঙ্গা বুঝতে পারলো। এরপর নিজের একাকিত্ম মানতে না পেরে যখন বাবা মায়ের কাছে প্রশ্ন করলো। তাদের উত্তর ছিলো মেয়েটা তাদের আনএক্সপেক্টেড চাইল্ড। যে ছিলোই আনএক্সপেক্টেড, সে কি করে বাবা মায়ের ভালোবাসা পাওয়ার আশা রাখে। মেয়েটার সব আবদার জমা হতো বড়ো বোনের কাছে। বড়ে বেনও তো ব্যস্ত মানুষ। চাইলপও সব আবদার মিটাতে পারতো না। মেয়েটা অভ্যস্ত হয়ে যায় নিজের একাকিত্বে। কারোর কাছে কিছু চাইতো না, আশা রাখতো না। কারণ সে জানে, সে কিছু চাইলে হয়তো জিনিসটা হারিয়ে যায় নয়তো ফুরিয়ে যায়। তার কাঙ্ক্ষিত জিনিস সে কখোনোই পায় না৷ সে কি করে কাউকে ভালোবাসতে পারে বলুন! সে তো ছোটো থেকে একা থেকেই অভ্যস্ত। ভালোবাসা অনুভূতি টা তার বোঝার মতো মন টা তার ভিতরে নেই। তার ভিতরের অনুভূতিরা মৃ”ত প্রায়। সে আশা করেইনি কখনও যে তাকে কেউ ভালোবাসবে!”
৬৫,
একদমে কথাগুলো বলে থামলো হিয়া। ইহসাস মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনলো। এরপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
“বুঝতে পেরেছি মেয়েটার মনে হারানোর বা না পাওয়ার ভয় টা আছে। তবে সে যদি অনুমতি দেয়, তবে তাকে নিজের করে হারানোর ভয় টা দূর করে দিতে রাজী ছেলে টা। তার একাকিত্বের সঙ্গী হতে, তার সব আবদার মেটানোর চেষ্টা করতে ছেলেটা একপায়ে রাজী৷”
“মেয়েটা কে বুঝতে পেরেছেন?”
ইহসাস হিয়ার এই কথায় হিয়ার বাহুতে হাত দিয়ে হিয়াকে নিজের দিকে ঘোরায়। এরপর বলে,
“চাঁদের কলঙ্ক থাকে, চাঁদকে চিনতে মানুষ ভুল করেনা।”
“চাদের অস্তিত্ব তো সেই কিছু সময়ের জন্য। এরপর তো সে দিনের আলোয় মিলিয়ে যায়।”
হিয়া ইহসাসের চোখে চোখ রেখে কথাটা বললো। ইহসাস হালকা হেসে বললো,
“দিনের আলোয় চাঁদ হারাবে, হারাক না। তাকে বুকের মাঝে জড়িয়ে হারিয়ে যেতে দিবো। সে হারাবে ভালোবাসার আলোয়।”
“কথাগুলো সিনেমা বা উপন্যাসে মানায় ইহসাস সাহেব। বাস্তব জীবনে নয়!”
“হোক না কিছু ভালোবাসা উপন্যাসের পাতা। মানুষ পড়বে, ভালোবাসতে শিখবে, আর নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করবে আগলানোর।”
হিয়া ইহসাসের হাত সরিয়ে দেয় নিজের বাহু থেকে। হাটা ধরে নিচে যাবে বলে। যেতে যেতে বলে,
“রুমে যান, ঘুমিয়ে পরুন।”
“আমি আমার উত্তর পেলাম না হিয়া!”
“উত্তরটা হিয়ার হিয়ারও অজানা।”
“তবে আমি অপেক্ষা করতে রাজী হিয়া।”
“দেখা যাক কি হয়৷”
হিয়া কথাটুকু বলেই ছাদ থেকে বেরিয়ে গেলো। ইহসাস ওখানেই নিজের স্থানে দাড়িয়ে বড়ো করে নিঃশ্বাস নিলো। এরপর বিরবির করে বললো,
“আমার বিশ্বাস আমার ভালোবাসা সত্যি। আর এই ভালোবাসা আপনাকে আমার বাঁধনে বাঁধবে হিয়া৷ আই প্রমিজ, আমি আপনাকে ঠিক আমার করে নিবো। শুধু উপরওয়ালা আমার সহায় হলে হয়।”
পরেরদিন সকালবেলায়,
নাস্তার টেবিলে বসেছে এহসান পরিবারের সবাই, সাথে বসেছে হিয়া। সবাই মাথা নিচু করে খাচ্ছে। জাহিদুল সাহেব পরোটা ছিড়ে সবজি দিয়ে মুখে দিতে দিতে বললেন,
“হিয়া মা!”
হিয়া উনার মুখে নিজের নাম শুনে মুখ তুলে তাকালো। সে মুখে স্যান্ডউইচের বাইট দিয়েছে মাত্র। না চিবিয়েই সে কোনো রকম বললো,
“জ্বি আংকেল?”
এহসান পরিবারের সবাই খাওয়া রেখে জাহিদুল সাহেব কি বলেন তা শোনার জন্য উনার মুখপানে তাকিয়ে আছে। উনি মুখের খাবার শেষ করে বললেন,
“তোমরা এভাবে খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছো কেনো? খাও! আমি হিয়ার সাথে কথা বলবো, তোমাদের সাথে না।”
উনার কথায় সবাই নিজেদের খাওয়া শুরু করলো আগ্রহ দমন করে। হিয়া জাহিদুল সাহেবের দিকে তাকিয়ে মুখের খাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে শেষ করার। কিন্তু উনি কি বলবে এই চিন্তায় খাবার গলা দিয়ে নামছে না। গতকাল রাতে ইহসাসের সঙ্গে তাকে দেখেছেন নাকি উনি! এই ভয়েই হিয়ার আত্মা ভেতরে যেনো শুকিয়ে গেছে। কারণ সে ছাদ থেকে নামার সময় দেখেছিলো, উনাদের রুমের দরজা খোলা। জাহিদুল সাহেব সব অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বললো,
“আর কিছুদিন থেকে গেলে হয়না মা?”
হিয়া হাফ ছেড়ে বাচে। ইহসাসের এতোক্ষণ হেল দোল ছিলো না কোনো। এইম প্রশ্নের উত্তরে হিয়া কি বলে! এই আশায় সে করুণ চোখে হিয়ার দিকে তাকায়। আর ইহসাসের এই করুণ চাহনী লক্ষ্য করছে টেবিলে বসা আরও একজোড়া চোখ। রায়া খাবার চিবুতে চিবুতে দেখছে ইহসাসকে। বোঝার চেষ্টায় আছে হিয়ার জন্য ইহসাসের অনুভূতি। ইহসাসকে দেখার পাশাপাশি রায়া হিয়ার দিকে তাকায়। হিয়া ইহসাসের চাহনী লক্ষ্য করে সেই কখন চুপসে মাথা নিচু করে বসে আছে। মানা করতে যেনো বুক কাপছে হিয়ার। রায়া যা বোঝার বুঝে নেয়। সে যে দহনে পু”ড়ছে রোজ। সেই দ”হনে বোনকে পু”ড়তে কিছুতেই দিবেনা। সে খাওয়ার মাঝেই হিয়া জাহিদুল সাহেবের কথার উত্তর দেওয়ার আগেই বলে,
“বাবা আমার একটা কথা বলার ছিলো।”
“কি কথা রায়া মা?”
জাহিদুল সাহেব প্রশ্ন করলেন। রাদের বোধগম্য হচ্ছে না রায়া কি বলবে! হিয়াও বোনের দিকে তাকায় কি বলে এটা শোনার আশায়। রায়া ইহসাস আর হিয়াকে এক নজর দেখে বলে উঠে,
“ইহসাস আর হিয়ার বিয়ে হলে কেমন হবে বাবা?”
রায়ার এই কথায় উপস্থিত সকলে যেনো বিস্ময়ের ঘোরে চলে গেছে। হিয়ার তো বোনের কথায় বিষম শুরু হয়ে গেছে। এটা কি বললো রায়া!
চলবে?
ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন।