হীরকচূর্ণ ভালোবাসা পর্ব-২৪+২৫

0
396

#হীরকচূর্ণ_ভালোবাসা
#পর্ব২৪
#রাউফুন

কলিংবেলের শব্দ পেয়ে গা-ছাড়া ভাব দূরে ঠেলে উঠে বসে তুলিকা৷ পুনরায় কলিংবেল বেজে উঠতেই সে পীপহোলে চোখ রাখলো কে এসেছে দেখার জন্য। মুহুর্তের মধ্যে মন টা খুশিতে নেচে উঠে তার। চমৎকার একটা হাসি দিয়ে দরজা খুলে দিলো তুলিকা।

‘আশু, নীতি ভাবি আপনারা? কেমন আছেন আপনারা?’

‘কি রে জল এতো দূর গড়িয়েছে আর আমাদের জানালি না পর্যন্ত? কি কথা ছিলো প্রতি মুহুর্তের খবর আমাদের জানানোর কথা ছিলো তাই না?’

‘আরে আশু তোরা কি বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকবি ভেতরে আয়!’

‘নাহ আমরা ভেতরে যেতে আসি নি। ভীষণ অভিমান হয়েছে আমাদের।’ বললো নীতি।

‘কিন্তু ভাবি আমি কি করেছি?’

‘সেটা তো তুমিই ভালো জানো।’

‘আরে ভাবি, আশু আয় না ভেতরে!’

আশফি আর নীতি ভেতরে গিয়ে সরাসরি তুলিকার ড্রেস ভরে নিলো তাদের আনা ব্যাগে। তুলিকা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো।

‘আরে কি হয়েছে আশু? আমার কাপড় কেন ব্যাগে তুলছিস?’

‘কেন আবার! তুই আজকে এক্ষুনি আমাদের সঙ্গে আমাদের বাড়ি যাচ্ছিস!’

‘মানে? কি বলছিস এসব?’

‘সব তোকে জানতে হবে না।’

‘কিন্তু মাইজিনকে বলে যায়। সে চিন্তা করবে তো!’

আশফি ফোন কে’ড়ে নিয়ে বেরিয়ে এলো। ঘরের দরজা বন্ধ করে তুলিকাকে এক প্রকার জোর করেই তাদের সঙ্গে নিয়ে গেলো।

আজকে মাইজিন অফিস থেকে কাজ সেরে প্রায় দশটা নাগাদ বের হলো। এখনো অব্দি তুলিকার কোনো ফোন আসেনি ভেবেই চিন্তায় মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। মাইজিন কাজের ব্যস্ততায় ফোন দেওয়ার সময় পাইনি। সে ফোন বের করে কল করতে যাবে তুলিকাকে সেই মুহুর্তে আশফির কল আসে। সে রিসিভ করে।

‘হ্যালো!’

‘হ্যালো মাইজিন ভাইয়া আপনি সরাসরি আমাদের বাড়িতে চলে আসুন। মিষ্টি আর তুলিকা আমাদের এখানেই আছে।’

মাইজিন ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে ভ্রু উঁচু করলো। বললো,
‘তুলিকা তোমাদের বাড়ি ভাবি? যাওয়ার আগে একবারও বললো না যে!’

‘আহা আসুন না মশাই।’

মনে মনে ভীষণ অভিমান হলো মাইজিনের। তুলিকা তাকে না জানিয়ে এভাবে কিভাবে যেতে পারে? একটা কল করে অন্তত জানাতে পারতো। সে যেতে যেতে সারে এগারোটা বেজে গেলো। ভীষণ টায়ার্ড সে। ওখানে যেতেই সাইমুম আর নীরব তাকে কোনোদিন রকম বাক্য বিনিময় করতে না দিয়েই ঠেলে অন্য একটা রুমে নিয়ে যায়। তাকে নতুন বরের বেশে সাজিয়ে দিলে সে হতভম্ব হয়ে যায় পুরো বিষয়টাতে।

‘কি হচ্ছে এসব?’ শুধাই মাইজিন।

‘কিছু না। চল আমাদের সঙ্গে!’

সাইমুম আর নীরব মাইজিনকে ধরে নিয়ে আসে।
দরজার সামনে মিষ্টি, আশফি, নীতি, এমন কি নাফিসসহ দাঁড়িয়ে আছে। তারা সমস্বরে চিৎকার করে বলে উঠে, ‘টাকা ছাড়ুন বউ দেখুন!’

মাইজিন কিছুই বুঝতে পারে না। বোকা বোকা চোখে তাকিয়ে থেকে কোনো রকম গড়িমসি না করেই পুরো মানি ব্যাগ ধরিয়ে দেই ওঁদের হাতে। তারা আবারও সমস্বরে বলে উঠে, ‘ ওহোহো! বউ দেখার এতোই তাড়া! কিয়া বাত হে কিয়া বাত হে!’

দরজা ছেড়ে দিয়ে মাইজিনকে ধা’ক্কা দিয়ে ভেতরে পাঠিয়ে দেই তারা। ঘর পুরোপুরি অন্ধকার। কিছুই দেখার জো নেই। সে অন্ধকারে হাতড়ে রুমের লাইট জ্বালিয়ে দিলো। পুরো ঘরটা দেখে সে একদম চমকে যায়। পুরোটা রুম রেড আর হোয়াইট অর্কিড দিয়ে সাজানো। রুম জুড়ে ক্যান্ডেল জ্বালানো আর গোলাপের সুগন্ধিতে মোঁ মোঁ করছে। পুরো রুমে কোথাও তুলিকাকে পেলো না মাইজিন।
সে তাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে বারান্দায় গেলো। সেখানে গিয়ে সে যেনো থমকে গেলো। একজন নজরকাঁড়া বিমোহিত নারীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে। তার সমস্ত শরীরের লোমকূপ দাঁড়িয়ে যায় মুহুর্তের মধ্যে। তুলিকাকে দেখে এই মুহুর্তে মনে হচ্ছে কোনো অপ্সরী নেমে এসেছে ধরনীতে। সে হরিনী পায়ে এগিয়ে গেলো নিজের স্ত্রীর কাছে।
তার পায়ের শব্দ পেয়ে তুলিকা তার দিকে ফিরে তাকাই। সেই মুহুর্তে মনে হয় তার হার্টবিট যেনো কয়েকশো গুণ বেড়ে গেছে। তুলিকা মাথা নিচু করে বলে,

‘আ’আ’সলে ওঁরা এমন জ্বালাচ্ছিলো আমাকে। আপনাকে জানাতে চেয়েছিলাম এখানে আসার আগে। কিন্তু আশফি জানাতে দিলে তো!’

‘জানালে কি এমন একটা চাঁদকে দেখতে পেতাম।’

মাইজিনের ঘোর লাগা দৃষ্টি। চাঁদের আলো এসে সোজা তুলিকার মুখে মেখেছে। কি স্নিগ্ধ লাগছে তাকে। সে বিভোর হয়ে গেছে তাকে দেখে৷ চোখ যেনো সরছেই না। বড্ড অবহেলায় তুলিকা অন্য দিকে ফিরলো। মাইজিনের এমন চাহনী না পারছে সইতে আর না পারছে উপেক্ষা করতে।

‘আপনার ঠিক কেমন অনুভুতি হচ্ছে জানি না। আমার ঠিক কেমন অনুভূতি হচ্ছে জানেন? ভেতরটা খরার মতো তুখোড় হয়ে যাচ্ছে। আপনার এই বিমোহিত করা রুপে আমার নাজেহাল অবস্থা হচ্ছে তুলিকা সেটা কি আপনি বুঝতে পারছেন না? আমার ভারী নিঃশাসের শব্দ কি আপনি শুনতে পাচ্ছেন না তুলিকা?’

মাইজিনের ঘোর লাগা কথায় তাকালো তুলিকা। আবার অস্বস্তিতে বিমুঢ় হয়ে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়ে বলল,’আজ তুমি বলুন না হয়। আ-আপনি থাক!’

হুট করেই মাইজিন এক অজানা কারণে নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বেসামাল হয়ে গেছে। মাইজিন তুলিকার কানে হাত দিলে খানিকটা কেঁপে উঠলো সে। মাইজিন তার ভে’জা ঠোঁটের স্পর্শ এঁকে দিলো তার কানের লতিতে। কানের দুল খুলে ফিসফিসিয়ে বলল,

‘ঠিক কেমন অনুভুতি হচ্ছে জিজ্ঞাসা করো না! শুধুই মন্জুর করো আমাকে মিসেস সুলতান!’

এই দম বন্ধ করা মুহুর্তে জমে গেছে তুলিকা। মাইজিন নিজেকে তুলিকাতে ব্যস্ত রেখেই বললো,

‘তুমি এতো বড় একটু অন্যায় করলে কিভাবে আমার সঙ্গে?’

তুলিকা এক ঝলক মাইজিনের দিকে অবাক হয়ে তাকাই। মাইজিন মুচকি হেসে উঠলো। বলল,

‘তোমার এই ঝুমকো, চুড়ি, টিকলি, মাথায় দিয়ে রাখা ঘোমটা, এই যে মাথার মুকুট চুলগুলোর উপর আসন নিয়েছে, তোমার বিমোহিত করা রুপে এসবের জায়গা নেওয়াই আমার যে খুব হিংসা হচ্ছে! হিংসাত্মক তৎপরতা থেকে এইসবের উপর দৃষ্টি চলে যাচ্ছে আমার! এসব কিছু যে আমাকে বড্ড ডিস্টার্ব করছে। মন চাচ্ছে কি জানো? এই সবকিছুই আমি কেন হলাম না? তবে হইতো ওঁদের আগে আমি তোমাকে স্পর্শ করে থাকতাম। এটা কি অন্যায় হয়নি তোমার বলো? তাই এসব খুলে ফেলাই উচিত। মুকুটটা তোমার চুলের উচ্ছ্বলতায় ভর করে ছিলো। এই মুকুটের কি অধিকার আছে আমার বউয়ের চুলের উপর আধিপত্য বিস্তার করার?বলো?’

‘ভাবি আর আশু এসব***!’

মাইজিন ওর ঠোঁটে নিজের আঙুল ছুঁইয়ে দিয়ে ওঁকে বলতে বারন করলো। তার সমস্ত জুয়েলারি খুলে দিয়ে বলল,

‘ওই যে চাঁদ, এই চাঁদের আলো তোমার গায়ে মাখছো, আমি চাঁদ হলাম না কেন বলো তো? ওই চাঁদের আলোয় দৃষ্টির কঁম্পন থেকে আমাকে দৃষ্টিচ্যুত করতে বাধ্য করেছে বিশ্বাস করো! আমার চাঁদকে হিংসা হবে না বলো?’

তুলিকা কিঞ্চিত ঘাড় ঘুরিয়ে নিলো। মাইজিনের উষ্ণ নিশ্বাস চোখে মুখে লাগছে তার। পা’গ’ল পা’গ’ল লাগছে নিজেকে। মাইজিন একহাতে ওর কোমড় জড়িয়ে ধরলো। কপালে পরে থাকা চুলগুলো কানে গুজে দিয়ে বললো, ‘তপ্ত ধারাই এই পুরো তুমিটাতে শুধুই আমার অধিকার আছে। তোমার সৌন্দর্য একমাত্র এই মাইজিন সুলতানের তরে। শুধুই আমার তরে বুঝলে?’

একপলক চোখ তুলে তাকালো তুলিকা মাইজিনের পানে। তার মুখে তৃপ্ততার হাসি। তার চোখের দিকে তাকিয়ে আস্তেধীরে মাথা উপরনিচ করলো তুলিকা। যার মানেটা হচ্ছে সে বুঝেছে। মাইজিন মুচকি হেসে তার একগালে হাত রেখে এগোচ্ছিলো তার ঠোঁটের কাছে। সেই সুযোগ টুকো না দিয়ে তার পাঞ্জাবী খামচে ধরে তার বুকে মুখ লুকালো তুলিকা। মাইজিন কিছুক্ষন থেমে থেকে ওকে কোলে তুলে নিলো। ঘটনার আকস্মিকতায় বড় বড় চোখে তাকালো তুলিকা!মাইজিন বললো,

‘আর ইউ রেডি গেটিং টুগেদার উইদ মি মিসেস সুলতান?’

তুলিকা পুরোই বোকাবনে গেলো এমতা প্রশ্নে। এই মানুষ টাকে সে ভেবেছিলো পুরো নিরামিষ প্রাণী। কিন্তু এখন দেখছে সে সব দিক দিয়ে এক্সপার্ট। আর এখন কিভাবে সবটা তার দিকে তাক করলো। ওর চাওয়া মানে কি? সে কি চাইছে না? তুলিকাকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মাইজিন সামনে তাকিয়েই হাঁটতে হাঁটতে বললো, ‘তোমার এই চাহনিতে কি ধরে নেবো? তুমি রাজি?’

প্রশ্নটা শুনেই লজ্জায় নুইয়ে গেলো তুলিকা। আরো শক্ত করে মাইজিনের গলা জড়িয়ে ঘাড়েই মুখ গুজে মিশে যেতে লাগলো ওর বুকের মাঝে। এ রাত লজ্জার! এ রাত ভালোবাসার!

‘আমার লাজুকলতার সকল চাওয়া শিরধার্য!’

বাতাসে পুষ্পের পরাগ ভাসন্ত। কৃষ্ণচূড়ার শেষপ্রান্তে এক চড়ুই পাখির দল কিচিরমিচিরে মশগুল। আজকে মাইজিনের আগে তুলিকার ঘুম ভেঙেছে। কতটা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে মানুষটা। সে ত্রস্ত পায়ে বিছানা থেকে নামতে নিলে মাইজিন তার হাত আঁকড়ে ধরলো। টেনে নিজের কাছে এনে তুলিকার পে’টে মুখ গুজে দিলো। কেঁপে উঠলো তুলিকা৷ শ্লথ কন্ঠে বললো,

‘কি হচ্ছে টা কি? ক’টা বাজে খেয়াল আছে? আমাকে এক্ষুনি ফ্রেশ হতে হবে।’

‘আগে আমার সকালের পাওনা টা আদায় করি!’

‘আবার সকালের পাওনা কিসের!’

‘দেখাচ্ছি!’

মাইজিন আলতো করে তার ঠান্ডা ঘ্রান্দ্রেয়ীও তুলিকার পে’টে ঘসে। টুপ করে চুমু দিয়ে তুলিকাকে ছেড়ে দেই। তুলিকা কতক্ষণ জমে থেকে দৌঁড়ে উঠে ওয়াশরুমে চলে যায়।

ফ্রেশ হয়ে কোনো রকমে শুকনো ওড়না পেঁচিয়ে তুলিকা বাইরে বের হয়৷ সে তো ভুলে কোনো পোশাক ই নিয়ে যায়নি। ওয়াশরুমে ওড়না ছিলো সেটাই পেচিয়ে বেরিয়ে এসেছে সে। ততক্ষণে মাইজিন উঠে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করছিলো। মাইজিন ল্যাপটপে মুখ গুজে আছে দেখে সে স্বস্তি পেয়ে শাড়ী বের করলো। হাতে নিয়ে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে থাকে। মিন মিন করে বললো,

‘আপনি একটু বাইরে যান না? আমি শাড়ী চেঞ্জ করবো।’

‘আমার সামনেই করো! সমস্যা কই?’

‘আ-আপনার সামনে ক-কি করে হ-হবে?’

‘তুমি চেঞ্জ করতে পারো আমি তাকাবো না তোমার দিকে।’

‘আপনি যান না বাইরে। ওয়াশরুম ভেজা শাড়ি ভিজে যাবে তাই রুমে পরছি।’

মাইজিন ভ্রুকুচকে চাইলো! বলল, ‘আমি তো বললাম তাকাবো না। বিশ্বাস করো না আমায়?’

‘আর যদি তাকান তখন?’

মাইজিন বিছানায় বসে পায়ের উপর পা তুলে নাটুকে ভঙ্গিমায় আরেকবার শুধালো, ‘কেন আমায় বিশ্বাস করো না?’

তুলিকার চোখের পাতা কেঁপে উঠলো। উক্ত প্রশ্নের উত্তরে ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলতে চেয়েও পারলো না। দৃষ্টি নামালো। হাতের শাড়িটা মুঠোয় আঁকড়ে অবনত মস্তকে দিকভ্রান্ত হয়ে নজর ঘুরাতে লাগলো মেঝেতে। বুঝা যাচ্ছে সে মারাত্মক মুশকিলে পরলো যেনো এই প্রশ্নে।

‘কি হলো বলো তুলিকা বিশ্বাস করো না আমায়?’

তুলিকার মুখটা শুকিয়ে গেলো। ঢোঁক গিলে জমে যাওয়া দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো ওঁ। অসার হয়ে উঠলো হাত পা। কোনো রকম জবাব দিলো, ‘হ্যাঁ ক-করি!’

মাইজিন নীরব হাসলো। ফিচেল গলায় বলল, ‘এতো লজ্জা পাচ্ছো কেন? কাল তো তোমার শাড়ি থেকে শুরু করে সব আমিই খুললাম। মানে তোমার ওই শাড়ির পিন। অবশ্য তুমি চাইলে তুমিই সব খুলে টুলে আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারতে । কিন্তু তা করো নি! কেন? নাকি তুমি চাইছিলে আমি এসে–!

‘আশ্চর্য! আমি কেন চাইবো!’ বলেই বিস্ফোরিত চোখে চেয়ে রইলো তুলিকা!

‘তা হলে খু’লে অন্য পোশাক পরো নি কেন?’

ভারি অপ্রস্তুত হলো তুলিকা। সজাগ হলো মন, মস্তিষ্কে গতরাতের অতিব ঘনিষ্ঠ মুহূর্তগুলো। মুহুর্তের মধ্যে সে মিইয়ে গেলো। অনুরণিত হলো তার চোখের তারা। কঠোরভাবে অনুভূতি প্রকাশে অনিচ্ছুক মেয়েলি মনটাও গুটিয়ে গেল লজ্জায়৷ রক্তিম বর্ণ ধারণ করলো গাল দুটো। অতঃপর উপায়ন্তর না পেয়ে সে দৌঁড়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো। বুকের কাছের প্রণয়ের চিহ্নে নজর পরতেই শরীর বিবশ, বিমুঢ় হয়ে এলো তার। আর তাকিয়ে থাকতে পারলো না সে। সলজ্জে চোখদু’টি সরিয়ে ফেললো ওঁ। ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি ঠাঁই পেতেই বিরবিরিয়ে আওড়ালো,

‘কালকে রাতের পর থেকে বেহায়া হয়েছে লোকটা একেবারেই!’

#চলবে

#হীরকচূর্ণ_ভালোবাসা
#পর্ব২৫ (বোনাস পার্ট)
#রাউফুন

শাড়ী পরে হয়ে নিচে নামলো তুলিকা। এখন সবার সামনে যেতেও কেমন যেনো লজ্জা লাগছে তার। আশফি নিশ্চিত তাকে লেকপুল করবে। যেমন সে করেছিলো তার বাসর রাতের পরেরদিন। এই সুযোগ নিশ্চয়ই কাজে লাগাবে ওই শা’ক’চুন্নীটা। আশফি তুলিকাকে দেখেই ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো। তাকে রান্ন ঘরে টেনে নিয়ে বললো, ‘ভাবি দেখেছো কতো লজ্জা পাচ্ছে তুলিকা? এই তোর কান লাল কেন? মনে হচ্ছে—!’

তুলিকা কনুই দিয়ে গু’তো দিলো আশফিকে। কটমট করে তাকাতেই আশফি নিভে যাওয়া গলায় বলে, ‘বারে তুই যখন আমাকে জ্বালিয়েছিস তখন?’

‘তাই বলে তুই রিভেঞ্জ নিবি শাক’চুন্নী কোথাকার।’

‘পাই টু পাই হিসেব রেখেছি। ওই তো মাইজিন ভাই এসেছে। কি মাইজিন ভাই আমার বান্ধবীর চুল ভেজা কেন?’

‘তোমার বান্ধবীর চুল ভেজা কেন আমি কেমনে জানবো ছোট ভাবি!’

‘কি দেবরজি রান্না ঘরে কি? বউকে চোখে হারাচ্ছো নাকি বলো, বলো?’ বললো নীতি।

আশফি বললো, ‘সেকি গো তুমি কি আমার বান্ধবীকে***!’

‘ছোট ভাবি পেছনে লাগো কেন?’ ফোস ফোস করে উঠলো মাইজিন। সে এক লহমায় চটে যাওয়ার নাটক করে কে’টে পরলো।

পাশ থেকে নীতি অপ্রসন্ন সুরে বললো, ‘সবই বুঝলাম! কিন্তু মাইজিন চটে গেল কেন?’

‘কি আর হবে ভাবি? আমার বান্ধবী ঠিক সামলে নেবে আমাদের মাইজিন ভাইকে।’ বলেই হো হো করে হেসে উঠলো আশফি। এদিকে লজ্জায় মাথা কা’টা যাচ্ছে তুলিকার। সে নত মস্তকে দাঁড়িয়ে আছে শুধু। ভাগ্যিস এখানে সাইমুম ভাইয়া আর নীরব ভাইয়া নেই। কি যে হতো এখানে থাকলে।

মিষ্টি ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নিচে আসলো। তার মন-মেজাজ সকাল সকাল তুঙ্গে উঠে গেছে। সে গুমরা মুখে সোফায় বসলো। সকাল সকাল নাফিসের সঙ্গে ধাক্কা লেগেছে। লু’চ্চা লোক চোখ যেনো আকাশে রেখে হাঁটে। মনে মনে হাজার টা গা’লি দিয়েও ক্ষান্ত হতে পারছে না সে। নাফিস সে-সময় আবারও তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। সব সময় অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে থাকে ব’দ লোক। স্কুলে আসার সময় পিছু পিছু আসে। আবার সুযোগ পেলেই এটা সেটা বলে। ওসব কথা বার্তা তার ভালো লাগে না। সে কারোর সঙ্গে কোনো কথা না বলে টিভি ছেড়ে কার্টুন দেখাই মনোযোগ দিলো। সবাই মিষ্টির মন খারাপ টা লক্ষ্য করেছে। হুট করেই নাফিস এসে তার পাশে বসে। মিষ্টি তাকে দেখে খেয়ে ফেলবে সেভাবে তাকালো তার দিকে। নাফিস দমে যায় ওমন ভয়ংকর রকমের চাহনীতে। সে শুকনো ঢুক গিলে বলে,

‘ওই বাচ্চা মরিচ ওইভাবে তাকাও কেন?’

‘খবরদার আরেকবার বাচ্চা মরিচ বলেছেন তো!’

‘তো তুমি তো বাচ্চায়!’

‘আপনি এখানে বসলেন কোন সাহসে? এমন ছোক ছোক ব্যাপার স্যাপার কেন আপনার মধ্যে শুনি?’

‘নাউযুবিল্লাহ! তওবা তওবা। আমার মতো ইনোসেন্ট একটা পোলারে ছোক ছোক পোলা বানাই দিলা? এই বাচ্চা মরিচ এমন ঝাল ভাবে কথা না বলে একটু ভালো ভাবেও তো কথা বলা যায়!’

‘আপনার মতলব ভালো না তাই ভালো কথা আসে না। আপনাকে দেখলেই আমার অসহ্য লাগে। ভালো কথা লুকিয়ে এইভাবেই কথা বেরিয়ে আসে সুরসুরী দিয়ে। আমার ভেতরে আ’গু’ন লাগে আপনার কথা শুনলে।’

‘আল্লাহ কেন যে এই মেয়ের দিকে তাকিয়ে ছিলাম।এখন তার ফল ভুগছি!’

‘এই কি বললেন?’ মিষ্টি ক্ষুব্ধ হয়ে কটমট করে তাকাই নাফিসের দিকে। নাফিস ঝট করে সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পরলো। এই বুঝি এই মেয়ে গায়ে হাত তুলে।

‘এখন আমি কি করবো বলো? আমার যদি তোমাকে ভালো লাগে আমার তো কিছু করার নেই! তাই আই লাভ ইউ!’

মিষ্টি ফট করে সোফায় উঠে দাঁড়িয়ে পরলো। কিছুটা ছুটে গিয়ে নাফিসের গলা টি’পে ধরলো। নাফিসের চোখ মুখ উলটে আসছে ওইভাবে মিষ্টির গলা টি’পে ধরাই। এসব কিছু আবার চুপচাপ অবলোকন করছিলো নীতি, আশফি, তুলিকা। ঘটনা কতদুর যায় দেখার জন্য। কিছু কিছু কথা কানে এলেও লাস্ট কথা গুলো শুনতে পাইনি কেউ-ই। অবস্থা বেগতিক দেখে তারা ছুটে এসে মিষ্টিকে ছাড়িয়ে নিলো। নাফিসের চেঁচানোতে সবাই এসে হাজির। সাইমুম, নীরব, মাইজিন তারাও অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। নীতি জলদি পানি এনে নাফিসের দিকে বারিয়ে দিলো। মিষ্টি এখনো ফোসফাস করছে। নাক ফুলিয়ে তেড়ে আসতে চাইছে নাফিসের দিকে। তুলিকা আর আশফি তার দুই হাত ধরে তাকে আটকে ধরে রেখেছে।

‘আরে নাফিস তুই মিষ্টিকে কি বলেছিস? এভাবে ক্ষেপলো কেন মিষ্টি?’

‘আপনার বন্ধু একটা ব’জ্জা’ত লোক মাইজিন ভাই। তার চরিত্রের দোষ আছে।’ জোরে জোরে শ্বাস ফেলে বললো মিষ্টি।

হা করে তাকিয়ে থাকে সবাই নাফিসের দিকে। নাফিস খুক খুক করে কেশে কাচুমাচু করছে। কোনো রকমে বলে, ‘আমি তো কিছুই করিনি!’

‘তাহলে মিষ্টি ওইভাবে হামলা কেন করলো?’

‘ হ্যাঁ গো নাফিস তোমাকে দেখে তো মনে হয় না তুমি এমন মানুষ!’

‘বিশ্বাস করেন নীতি ভাবি আমি কিছুই করিনি!’

‘নাফিস ভাই মিষ্টিকে দেখে তো মনে হচ্ছে আপনি তাকে এমন কিছু করেছেন বা বলেছেন যার দরুন সে এমন রে’গে গেছে!’ বললো আশফি।

‘আমি কিছুই করিনি তুলিকা ভাবি আমাকে বিশ্বাস করুন!’

‘এই বুবুজান ওই লোক মিথ্যা বলছে! নজর সহ চরিত্রও খারাপ এই লোকের! হাড়ে হাড়ে বদ’মাই’শি!’

সবাই অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে থাকে নাফিসের দিকে। মাইজিন এবার সিরিয়াস হলো। এতো বছর নাফিসের সঙ্গে তার সম্পর্ক। কই কোনো দিন তো কোনো মেয়ের কাছ ঘেঁষতে দেখেনি নাফিসকে। বরং মেয়েরাই তার সঙ্গে চিপকানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু নাফিস সে-সব মেয়েদের দিকে ভালো ভাবে তাকিয়েও দেখেনি। তার বন্ধুর যে নজর খারাপ না সেটা সে মানে এবং বিশ্বাস করে। তবে আজ কি হলো? তবে মিষ্টিই বা কেন মিথ্যা বলবে? বাচ্চা একটা মেয়ে হঠাৎ ওমন করার তো কোনো কারণ নেই। তাছাড়া মিষ্টির মতো শান্তশিষ্ট মেয়ে এমন আগুনের ফুল্কির মতো ফুসে উঠার তো কথা না কারণ ছাড়া। সে গম্ভীর মুখে বললো, ‘নাফিস তুই আমার বন্ধু। অনেক দিন থেকে তোকে চিনি, জানি। সত্যি করে বল তো মিষ্টি হঠাৎই এমন আক্রমনাত্মক কেন হলো?’

‘মাইজিন আপনি নাফিস ভাইয়াকে কিছু বলবেন না। আমি মানুষ চিনি! উনার চোখে আমি কখনোই ওরকম নোং’রা দৃষ্টি দেখিনি। আমি একটা মেয়ে কোন ছেলের চাহনী কেমন সেটা খুব ভালো ভাবে জানি। আমার মনে হয় কোনো ভুল হচ্ছে! এই মিষ্টি মিথ্যা বলছিস তুই?’

‘বুবুজান তুমি জানো আমি মিথ্যা বলিনা। তুমি জানো না ওই লোক আমাকে একটু আগে কি বলেছে!’

‘কি বলেছে?’ সবাই এক সাথে জিজ্ঞেস করলো।

‘বলে কি আই লাভ ইউ!’

নাফিস ইশারায় মানা করা সত্ত্বেও মিষ্টি বলে দিলো। যা ভয় পাচ্ছিলো তাই হলো। বেফাঁস কথাটা বলেই দিলো ওই বাচ্চা মরিচ। নাফিস নিজেই নিজেকে বলে, “নাফিস রে তুই ফেসে গেছিস!”

সবাই নাফিসের দিকে তাকিয়ে এক সাথে আশ্চর্য হয়ে বলে, ‘কিহ!’

‘আমি বলতে চাইছিলাম না কিন্তু স্কুলে থেকে আসার সময় ওই লোক আমার পিছনে পিছনে আসে। আর এই একটু আগে বলে আমার তোমাকে ভালো লাগে। আই লাভ ইউ!’

‘শেষে তোমার এমন অধঃপতন!’ আবারও সবাই এক সাথে বলে উঠলো!

নাফিস সোফায় বসে পরলো। সবাই তাকে ঘিরে ধরে গোল হয়ে। নাফিস সবাইকে দেখে বলে,

‘আমি কি করবো আমার যদি একটা বাচ্চা মরিচকে ভালো লাগে!’

‘ওওওও বাচ্চা মরিচ!’ সবাই সমস্বরে হেসে উঠলো। যেই সেই হাসি না পেট ফাঁটা হাসি যাকে বলে। এদিকে তাদের এমন অবস্থা দেখে মিষ্টি রাগে ক্ষোভে গর্জে উঠে। তার চেচানোতে সবাই চুপসে গিয়ে সটকে পরে।

নিকষ কালো আকাশের একপ্রান্তে মেঘের আড়াল থেকে বারবার উঁকি দিচ্ছে এক ফালি চাঁদ। ক্ষণে ক্ষণে ঝি ঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। রাত বাড়তেই তুলিকা আস্তে আস্তে নিবিড় পায়ে এগিয়ে গেলো রুমের দিকে। বাবু নিশ্চিত রে’গে ব’ম্ব হয়ে আছে। সারাদিন সে নিজেকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছে। ভুল করেও আর সামনে পরেনি তুলিকা। কি যে হবে সেটা ভেবেই হাত পা ঠান্ডা আসছে তার।
সে গিয়ে দেখলো মাইজিন শুয়ে আছে। আজকে কেনো যে যেতে দিলো না আশফি তাকে। মাইজিন ঘুমিয়ে গেছে ভেবে বিড়াল পায়ে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পরলো। তম্বন্ধে মাইজিন তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরলো। তার গলায় মুখ ডুবিয়ে বললো,

‘এতো দিন তো অনেক দূরে দূরে থেকেছো আমার থেকে। এখন কেন পালিয়ে পালিয়ে বেরাচ্ছিলে সারাদিন? এখন শাস্তি ডাবল করা হলো!’

‘কি শ-শা-স্তি?’

‘তুমি যেটা ভাবছেন সেই শাস্তি!’

‘নাহ! আজ না!’

‘ উঁহু বারণ তো শুনবো না। আরও আমার থেকে পালিয়ে পালিয়ে বেরাবে?’

সটান হয়ে শুয়ে থাকে তুলিকা। চোখ মুখ খিচে বন্ধ করে রাখে। মাইজিন আরও কিছুটা ঘনিষ্ঠ হয়ে বললো, ‘শাস্তির ব্যবস্থা করি তবে মিসেস সুলতান?’

তুলিকা মাইজিনের হাত সরানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু মাইজিন খুব শক্ত করে ধরেছে যার দরুন এক ফোটাও নড়াতে পারলো না মাইজিনের হাত।

‘আমার হাত সরানোর চেষ্টা করে নিজের যেটুকু শক্তি আছে সেটাও খোয়া গেলো তাই না?’

‘আজকে আমাকে এমন জ্বালাতন করছেন কেন মাইজিন?’

‘শিহ! যা হচ্ছে মেনে নাও।একটা করে কথা বলবা আর শাস্তি বাড়বে!’

#চলবে