#হীরকচূর্ণ_ভালোবাসা
#পর্ব২৬
#রাউফুন
মাইজিন অফিস থেকে বের হচ্ছিলো। হঠাৎ তার বাবা আব্দুর রৌফ সুলতানের সঙ্গে চোখাচোখি হলো মাইজিনের। মাইজিন তাকে পাশ কা’টিয়ে ভাবলেশহীন ভাবে চলে যাচ্ছিলো।
‘মাইজিন! ভদ্রতা ভুলে গেছো দেখছি!’
থমকে দাঁড়ালো মাইজিন। কতটা নিদারুণ ভাবে শুধালেন কথাটা। অথচ লোকটা যা করেছে সেজন্যই তার সঙ্গে সম্পর্কের এতোটা অবনতি হয়েছে। মাইজিন সেভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলো। রৌফ সুলতান হেঁটে তার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পরলেন। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মাইজিনের চোখে চোখ রেখে বললেন,
‘তোমার আমাকে এড়িয়ে চলার কারণ টা কি জানতে পারি? কই এতো দিন তো এমন করো নি তবে এই ছয়মাসে কি এমন পরিবর্তন হলো যে তুমি সাধারণ বাক্যলাপ ও করো না।’
‘হুম?’ ভ্রুকুটি করে বলে মাইজিন।
‘হুম? এতো গুলো কথার বিনিময়ে শুধু হুম?’
‘আমি আমার লাইফে অপছন্দের তালিকায় ফেলা মানুষের সঙ্গে কথা বলি না।’
‘হোয়াট? ডোন্ট ফরগেট আ’ম ইউর ডেড। হাউ ডেয়ার ইউ টক লাইক দিস? স্পীক পোলাইটলি! আন-লেস!’
‘আন-লেস হোয়াট ডেড?’
‘কিছু না। এখন বলো কোথায় থাকছো?’
‘আমি কোথায় থাকি এই কথা জিজ্ঞেস করার জন্য ছয়টা মাস লাগিয়ে দিলেন?’
‘কি বলতে চাইছো? আমি কি তোমার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করিনি? তুমি দিনের পর দিন এড়িয়ে গেছো আমায়!’
‘আপনি অন্য পন্থা অবলম্বন করেও আমার খোঁজ নিতে পারতেন! আপনার সেই ক্ষমতা আছে।’
‘আমি নিইনি কারণ আমি চাইনি তোমার ব্যাক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করতে।’
‘আপনি সত্যিই চান নি তবে আমার ব্যাক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ হবে বলে না। আপনি চাননি কজ আপনি নিজের ইগো টাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।’
‘মাইজিন!’
‘ইয়েস ডেড আমি বাধ্য হচ্ছি বলতে। জীবনে কখনোই আমার ভালো-মন্দ খোঁজ রেখেছেন? আমি কতটা কষ্টে ছিলাম, কতটা আনন্দে ছিলাম, যখন আপনাকে আমার প্রয়োজন ছিলো, খুব করে চাইতাম আপনাকে, খোঁজ নিয়েছেন তখন? আপনার অগোচরে কি হতো তার খোঁজ রেখেছেন? শুধু বিজনেস, টাকা পয়সা, বিদেশে ছোটাছুটি করেছেন। নিজের এক মাত্র সন্তানের খোঁজ নেওয়ার মতো সময় কি সত্যিই আপনার ছিলো? আমি আপনার ছেলে, আপনি আমার বাবা, একজন সন্তানের যে বাবার ভালোবাসার প্রয়োজন পরে সেটা কি এতো বছরেও আপনি বুঝতে পারেন নি? যেহেতু আপনার ভালোবাসা থেকে এতো বছর বঞ্চিত ছিলাম তখন এখনো পারবো। বিশ্বাস করুন এখন আমি ভালো আছি আমার স্ত্রীর সঙ্গে!’
‘তুমি বিয়ে করেছো? কি হলো বলো? আমরা কেউ-ই জানি না! কিন্তু কেন? রৌফ সুলতানের ছেলে বিয়ে করেছে অথচ কেউ-ই তা সম্পর্কে অবগত নয়। আমাদের কি জানার অধিকার নেই? অন্তত তোমার মাকে জানাতে পারতে। কেন জানাওনি আমাদের?’ অবাক হয়ে বলেন রৌফ সুলতান
রৌফ সুলতানের কথার উত্তর দেইনা মাইজিন। শুধু যাওয়ার আগে বলে,
‘এমন কাউকে বিশ্বাস করুন যে আপনার রাগের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভালো মানুষ টাকে চিনতে পারবে। আপনার সততাকে চিনতে পারবে। তাকে বিশ্বাস করবেন না যে আপনার ভালো হৃদয়ের অন্তস্থলে লুকিয়ে থাকা সৎ মনুষ্যত্বকে চিনতেই পারবে না। যে আপনার ভালো মানুষির সুযোগে আপনার সবচেয়ে প্রিয় জিনিসকে আপনার থেকে আলাদা করে দিয়েছে তাকে চিন্তেই পারলেন না! একটু চোখ কান খোলা রাখলেই, আশে পাশে দেখলেই বুঝে যাবেন কে আপনার বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছে। আসি। আমার স্ত্রী আর আমার জন্য দোয়া করবেন। আসসালামু আলাইকুম।’
মাইজিন চলে গেলো। আর পেছনে ফেলে গেলো রৌফ সুলতানের একরাশ আত্ম গ্লানিবোধ আর অবাক করা মুখ।
•
তুলিকা রান্না করছে। ব্রেকফাস্ট তৈরির সময় মাইজিন এসে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। ঘাড়ে নাক ঘষে আবার চলে গেলো। একটু পর আবার এসে গালে চু’মু দিলো। মাইজিনের এসব কাণ্ডে যারপরনাই অবাক তুলিকা। আবারও এসে ডান গালে চু’মু দিলো তুলিকার। তারপর আবার এসে মাথায় চু’মু দিলো। পরবতর্তীতে এসে হাতে চু’মু দিলো। ষষ্ঠ বার যখন এসে ওষ্ঠে চু’মু দিতে যাবে তখনই তুলিকা একটা হাড়ি তার মুখের সামনে ধরেছে। মাইজিন সেই হাড়িতে চুমু দিয়েছে। ঠিক সেই মুহুর্তে মিষ্টি ওখানে এসে উপস্থিত! এদিকে তুলিকা হেসে লুটোপুটি খাওয়ার অবস্থা। পে’ট চেপে হেসেই যাচ্ছে। মিষ্টি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে মাইজিনের দিকে।
‘একি ভাইয়া আপনি এভাবে হাড়িতে মুখ লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?’
মাইজিন চোখ খুলে তাকিয়ে দেখে ‘‘আআআহ!” করে চিৎকার দিয়ে ছিটকে সরে যায়। কি ভেবেছিলো কি হলো!
‘মিষ্টি তুমি কখন এলে?’
‘আপনি যখন হাড়িতে চুমু দিয়েছেন তখনই!’
‘তুমি কিছুই দেখো নি ঠিক আছে? যাও রেডি হও!’
মিষ্টি মাথা চুলকে চলে গেলো।
‘এই এটা কি হলো? মাইজিন তুলিকার কাছে এসে দাঁড়ালো।
‘কদিন থেকেই দেখছি এরকম করছেন! আমাকে এতো জ্বালাচ্ছেন কেন শুনি?’
‘কি হয়েছে তাতে? আমি আমার বউকে একটু চু’মুও দিতে পারবো না?’
‘এতো দিন ভাবতাম কি জানেন?’
‘কি ভাবতে?’
‘আপনি একটা নিরীহ, নিরামীষ আন-রোমান্টিক পার্সন! কিন্তু না এখন বুঝতে পারছি। আল্লাহ এভাবে জ্বালান যদি আমি কিভাবে কাজ করব!’
‘হ্যাঁ বউয়ের কাছে সব ছেলেই রোমান্টিক। এখন মানুষকে কি দেখাতে যাবো আমি রোমান্টিক? তখন আমাকে কাছেই ঘেঁষতে দেও নাই তাই জানো না আমি কতটা রোমান্টিক!’
মাইজিন জড়িয়ে ধরে তুলিকাকে। তুলিকা কনুই দিয়ে গুতা দিলো তার পে’টে।
‘আউচ! এটা করতে পারলে তুমি?’
‘খুব পারলাম।’
‘কাঁদতে হবে আড়ালে রোমান্টিক বর হারালে।’
‘অদ্ভুত!’
•
মাইজিন আর নাফিস টংয়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে। নাফিস কখন থেকে নার্ভাস। কাপের পর কাপ খালি হচ্ছে চায়ের, কিন্তু এখনো অব্দি কিছুই বলতে পারেনি নাফিস। মাইজিনের ধৈর্যের বাঁধ ভাঙলো। সে মুখ বিকৃত করে বলল,
❝তুই কি বলবি, এক্সাক্টলি কি বলতে চাইছিস?❞
❝মিষ্টি আমাকে মে’রে’ছে।❞ লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল নাফিস।
❝কিহ? আবার?❞
‘হ্যাঁ!’
‘তুই আবার সেটা গর্ব করে বলছিস? মা’র খেয়ে কেউ লজ্জা পায়?’
‘গর্ব করবো না তো কি করবো। ওইভাবেই তো ওঁ আমাকে স্প’র্শ করে একটু তাই লজ্জা পাচ্ছি!’
‘আসলেই? মানে সিরিয়াসলি? মা’র খেয়ে কেউ লজ্জা পায়? তা আবার কি বলেছিলি যে উড়ং ধোঁলাই দিলো?’
‘বলেছিলাম চলো বিয়ে করি!’
‘হেই কি জন্য বলছিস তুই এসব? মাথায় একটা বা’রি দিয়ে চেং দোলা করে তুলে ডাস্টবিনে ফেলে দিবো। মিষ্টির হাতে মা’র খেয়েছিস এবার আমার হাতে খাবি। তুই ওর পেছনে ছুটতেছিস হ্যাঁহ? ওঁ আমার বোন। ওঁকে ছাড় এবার!’
‘তুই বুঝতে পারছিস না কেন আমি ওঁকে ছাড়া থাকতে পারবো না। হোক সে বাচ্চা, হোক সে রাগীনি, সে আমার বাচ্চা মরিচ!’
‘মিষ্টির বয়স তুই জানিস?’
‘সে কী জানবো না কেন?’
‘তাহলে কোন সেন্সে তুই ওই বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পরলি? আর তোর মতো বুড়োকে দিয়ে বিয়ে দিবো আমার বোনকে ভাবলি কিভাবে?’
‘হ্যাঁহ ওসব ভেবে কি আর প্রেম হয়? আমি কি করবো যদি আমি একটা বাচ্চা মেয়ের প্রেমে পরি।’
‘তুই আসলে এখন ইয়েএএ ব্যা’টা!’
‘ধুর! আমি আজকে মিষ্টিকে দেখেছি আমার ঘরে!
স্বপ্ন দৃশ্যে মিষ্টিকে খাটের তলায় ঢুঁকিয়েছিলাম। সেখানে বহুক্ষণ সে থেকেছে। ছবি এঁকেছে। আমার সঙ্গে গল্প করেছে।’
‘শেষ পর্যন্ত খাটের তলায়? আর কোনো জায়গা পাস নি খাটের তলায় ঢুকিয়েছিস। এই তোর আক্কেল? তুই যেমন অদ্ভুত তোর স্বপ্নও অদ্ভুত! খাটে বসাতি।’
‘যাহ এভাবে বলিস না।’ নাফিস আবারও লজ্জা পেলো।
‘ওটা স্বপ্ন নয় ব্যাটা ওটা তোর হ্যালুসিনেশান।’
‘আরে না সত্যিই!’
‘আধুনিক খাটের হাইট সম্বন্ধে তোর কোনও ধারণা আছে? তার তলায় পনেরো-ষোল বছরের বাড়ন্ত একটা মেয়ে ঢুকতেই পারে না। ঢুকলেও সর্বক্ষণ তাকে উপুড় হয়ে শুয়ে থাকতে হবে।’
‘স্বপ্নের মধ্যে সবই হয়।’
মাইজিন হা হা করে হেসে উঠলো। মাটির চায়ের কাপে আর একটা চুমুক দিয়ে বললো, ‘কোনও একটা জায়গায় কল্পনার সঙ্গে বাস্তবের মিলন প্রয়োজন। ফাউন্ডেশান ছাড়া বাড়ি দাঁড়ায়?উঁহু শুয়ে পরবে! তেমনি তোর মিষ্টিকে নিয়ে স্বপ্ন টাকে ছাড়তে হবে! তুই তাকে খাটের তলায় ঢুকিয়েছিস এটা মিষ্টি জানলে তোর খবর আছে।’
‘তুই খাটের তলায় ঢোকানো টাকে এত ইমপর্টেন্স দিচ্ছিস কেন?’
‘নিশ্চয় দেবো। এখন তোর প্রতিটি কথা মূল্যবান। তাৎপর্যপূর্ণ। মিষ্টিকে যদি পটাতে না পারিস জীবনে তোর বউ পাওয়া হবে না।’
‘উম হবে না হুহ্! লাইন লেগে আছে আমার পেছনে মেয়ের। জুনিয়র না হলে সিনিয়র, সিনিয়র না হলে বিয়াত্তা আন্টিরা সবাই আছে।’
‘তোর কপালে আন্টিই জুটবে না। এই নারকেল তেল দেওয়া বাদ দে নাইলে মিষ্টি কেন শিমেল ও পাবি না।’
‘তুই আমার জাত শত্রু। না হলে এভাবে বদ দোয়া করতে পারতি না।’ নাফিস উঠে হাঁটা ধরলো।
‘আরে যাচ্ছিস কোথায়?’
‘মিষ্টিকে পটাতে হবে। ‘
‘আবার মা’রা পরিস না দেখিস।’
‘পরলে পরবো তাতে তোর কি? তোর মতো বন্ধু যেনো কোনো মানুষের না হয়। ভু-ত-জ্বীনও তার থেকে বন্ধু হিসেবে ভালো।’
‘পারলে একটা ভু’ত বন্ধু বানিয়ে দেখা।’
‘না বাবা ওসবের কি প্রয়োজন! রাতে যদি ঘা’ড় টাই না থাক তার থেকে তুই ভালো। আয় বন্ধু, আয়। কাছে আয়, গলা ধরে কান্দি!’
‘যাহ ভাগ সা’লা!’
‘মিষ্টিকে পটানোর একটা টিপস দে না ভাই!’
‘জীবনে না। আমার বোনকে বিয়ে দেবো না তোর কাছে সালা।’
‘আরে তুই কেন সালা বলিস? আমি তোকে বলবো এটা।’
‘ম’র’তে না চাইলে এখান থেকে যাহ।’
‘লাগবে না যাহ। মনে রাখিস আজ অবলা বলে আমাকে এভাবে পর করলি তো? দেখিস আমি একদিন ওই বাচ্চা মরিচ কে পটিয়েই ছাড়বো।’
‘তোর শরীরের চামড়াটা তবে পুরু করিস! না হলে হাড্ডি ছাড়া কিছুই খুঁজে পাবি না।’ হাসতে হাসতে বললো মাইজিন।
‘যাহ না। এভাবে ভয় দেখাস কেন? ভয় পাচ্ছি আমি!’
মাইজিন হো হো করে হেসে ফেলে আবারও!
#চলবে
#হীরকচূর্ণ_ভালোবাসা
#রাউফুন
#পর্ব২৭
মিষ্টির পেছনে ছুটছে নাফিস। এই সন্ধ্যায় মেয়েটা হেঁটে আসছে। কেন অটো ধরলে কি সমস্যা? আবার সে যদি হেল্প করতে চাই মেডাম আবার ক্ষেপে যাবেন। একেবারে নাকানিচুবানি খাওয়াচ্ছে তাকে এই বাচ্চা মরিচ। এইযে এভাবে সে রোজ রোজ তাকে ফলো করে, তার চোখ গরম করা চাহনি, কথার ঝাঝ, রাগী রাগী মুখ, মা’রকুটে হাতে মা’র সব সহ্য করছে এগুলো কি এমনি এমনি? তাকে বুঝতেই চাই না একদম। একটুও পটলে কি হবে? দোষের কি এখানে? হতে পারে তার একটু বয়স বেশি তাতে কি? একেবারে বুড়ো তো নয়!
‘ওগো মিষ্টি! শুনো!’
‘কি হয়েছে?’ মিষ্টি দাঁড়িয়ে পরলো।
‘এভাবে আর কত ঘুরাবে?’
‘কেন এতেই হাঁপিয়ে গেছেন?’
‘ উঁহু।’
‘তাহলে?’
‘তোমার পেছনে ঘুরা তো আমার দায়িত্ব। ছেলেটা কে তোমার পিছনে আসছিলো?’
‘সেসব জেনে আপনার কাজ কি?’
‘আমার অনেক কাজ। আমার বাচ্চা মরিচের পেছনে কেউ আসুক সেটা আমি সহ্য করবো ভাবছো? নাকি তোমার ওঁকে ভালো লাগে?’
‘অসম্ভব। হি ইজ আ’ স্কাউন্ড্রেল।’
‘হ্যাঁ সব ঝাঁঝ শুধু আমার সঙ্গে ওর সঙ্গে তো পারো না। আমাকে মারো কিছু বলি না। ওঁর উপর হাত চালালে ঐ ছেলেও মা’রঃবে দেখে নিও!’
‘আমাকে তাহলে জিমনাসিয়ামে ভর্তি হতে হবে। ওঁ মা’র’লেই আমি ডাবল মা’র’ব।’
‘কাউকে কিছু করতে হবে না। আমাকেই মে’রো!’
‘মারবোই তো।’
‘থাক দরকার নেই। আমাকে মারলে কিন্তু বিবাহ করতে হবে!’
‘আবার বিয়ে বিয়ে করছেন? কোনো পুরুষকে আমার বিশ্বাস নেই। টৌয়াইস চিটেড।’
‘টৌয়াইস চিটেড মানে? তোমাকে দুবার কে ঠকালো? আমার বাচ্চা মরিচ কে ঠকালো? একবার নাম বলো শুধু!’
‘আমাকে না আমার ফ্রেন্ডকে!’
‘ওহ আচ্ছা তাই বলো। আমি ভয় পেয়েই গেছিলাম!’
মিষ্টি জোরে হাঁটা দিলো। নাফিস তার সঙ্গে না পেরে দৌঁড়ে তার সাথে সাথে হাঁটছে।
‘ওগো আমার বাচ্চা মরিচ!’
‘আবার!’
‘স্যরি, স্যরি!’
‘হু! এবার সরুন কাছ থেকে। মানুষ আমাকে বাঁকা চোখে দেখছে!’
‘হেহ্ দেখলে দেখুক। আমি কাউকে পরোয়া করি নাকি!’
‘হ্যাঁ তা করবেন কেন? আপনাদের ছেলেদের তো আর কিছু না। বদনাম হলে হবে মেয়েদের।’
‘হবে না আমি তো তোমাকে বিয়েই করবো।’
‘কিন্তু আমি বিয়ে করবো না। এই আপনি যাবেন? অনেকক্ষন থেকেই আপনাকে সহ্য করছি!’
‘আচ্ছা আমি মরে গেলে তুমি কাঁদবে না?
‘নিশ্চই কাঁদবো। অনেক দিন কাঁদিনি!’
‘কিভাবে কাঁদবে, দেখাও।’
‘তার আগে আপনি মরে দেখান।’
‘এএএএহেহেহে!’
‘এই আমার বাচ্চা মরিচ শোনো! ❝বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী!❞
‘মানে?’
‘মানে আমি তোমাকে পটিয়ে,বিয়ে করেই ছাড়বো। যুদ্ধের ময়দানে নেমেছি যখন যুদ্ধ তো করতেই হবে।’
মিষ্টি সামনের দিকে ফিরে জোরে জোরে হাঁটা দিলো। কিছু দূর যেতেই নাফিসের কথা ভেবে মুখ টিপে হাসলো।
•
প্রচন্ড ক্লান্তিতে মাথা ধরে আছে মাইজিনের। মনে হচ্ছে মাথাটা ফেটে যাবে ব্যথায়। সে বাড়ি ফিরে সোজা ওয়াশরুমে গেলো। তুলিকাকে রুমে দেখা গেলো না। সে ঘরে থাকলে তো দরজা লক করা থাকতো না বাইরে থেকে।নিশ্চয়ই নুশাদের বাড়ি গেছে মিষ্টিকে নিয়ে। এদিকে মাইজিনের মাথা ব্যথা সহ্য হচ্ছে না। কোনো রকমে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো। তুলিকা যখন আসলো তখন মাইজিনের সবে সবে একটু চোখ টা লেগে গেছিলো। তুলিকা আর মিষ্টি এক সাথে ঢুকলো। মিষ্টি পাশের রুমে চলে গেলো। মাইজিন তুলিকার উপস্থিতি টের পেয়ে চোখ মেলে চাইলো।
‘কখন আসলেন?’
‘এইতো একটু আগে।’
‘আমার কাছে একটু বসুন না তুলিকা!’
‘বসলে হবে না। রান্না করতে হবে তো।’
‘একটু বসুন!’ কাতর গলায় বললো মাইজিন। তার এই নিদারুণ আবদারকে খুব নিষ্ঠুর ভাবে প্রত্যাহার করলো তুলিকা। মুখের সামনেই কিছু কঠিন বাক্য ছুড়ে দিলো।
‘অফিস থেকে এসেছেন শুয়ে রেস্ট নিন মাইজিন। সব সময় ছোঁয়ার একটা বাহানা খোঁজেন। এখন আপনার পাশে বসব আর আপনি আমাকে উঠতেই দিবেন না। চিপকে ধরে থাকবেন। বার নানান ভাবে স্পর্শ করবেন৷ সব সময় এরকম ভালো লাগে না। আমিও মানুষ আমারও একটু স্পেসিফিক টাইম চাই। স্পেস চাই। সব সময় স্পর্শ করা চাই ই হ্যাঁ?’
‘আমি আমার কথার খেলাফ করে তোমাকে স্পর্শ করিনি তুলিকা! আমি প্রথম বার যখন তোমাকে স্পর্শ করি তখনও তোমার অনুমতিতেই স্পর্শ করেছিলাম। তোমার মনে আছে? রাস্তায় প্রথমদিন তোমাকে ধা’ক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়া টা? সেদিন কিন্তু তুমি আমার দেওয়া শাড়ীটা পরেছিলে। আমি সেদিন তোমাকে ওই ভাবে স্পর্শ করাটাও মিস করতে চাইনি। আমি যেভাবেই তোমাকে স্পর্শ করে থাকি না কেন সেটাই ছিলো শুধুই ভালোবাসা! আমার দেওয়া শাড়ী পরাটা তোমার অনুমতি ধরে নিয়েই স্পর্শ করি তোমাকে। মাইজিন সুলতান তার দেওয়া কথা রেখেছিলো। আর আজকে তুমি আমাকে এইভাবে বলতে পারলে? ওয়াও!’
তুলিকা অপরাধীর ন্যায় মাথা নত করে রাখলো। সে সত্যিই ওভাবে বলতে চাইনি মাইজিনকে। এখন নিজের উপরেই নিজে ক্ষেপে গেলো৷ কি রকম কঠিন কথা বলে ফেলেছে এখন বুঝতে পারছে। এভাবে বলাটা কি খুব জরুরি ছিলো? স্পষ্ট ব্যথাতুর চোখ- মুখ মাইজিনের।তার ব্যথিত মুখের পানে চেয়ে তার কষ্ট দ্বিগুন হারে বাড়লো। মাইজিন ভাঙা গলায় আবার বলল,
‘আমার স্পর্শে কি শুধুই কামনা খুঁজে পান তুলিকা? ভালোবাসা নেই? এতোটাই তিক্ত লাগে আমার ছোঁয়া! নিশ্চয়ই লাগে না হলে এমন তিক্তক বাক্য কেউ মুখে আনে! আপনার প্রতি আমার ভালোবাসা, স্পর্শে, স্পর্শে ভালোবাসাটা কিছুই না? আসলে ভালোবাসার মানুষের কাছে যাওয়াটা কি অন্যায়?’
‘আ’ম স্যরি মাইজিন। আ’আমি আসলে*।’
‘বুঝেছি আমি। আপনি যান আমি এখানেই শুয়ে পরছি। আপনি যান মিষ্টির রুমে!’
মাইজিন মাথা ব্যথার কথাটা আর জানালো না তুলিকাকে। দাঁত দাঁতে কামড়ে মাথা ব্যথা সহ্য করলো। তুলিকা কতক্ষণ তাকিয়ে রইলো অসহায় দৃষ্টিতে। নিজের মুখের কথাকেই এখন নিজের কাল বলে মনে হচ্ছে। কেন ওভাবে বলতে গেলো সে!ছিঃ! কতটা কষ্ট পেয়েছে মানুষটা। ওভাবে না বললেও পারতো সে। তুলিকা অন্য রুমে গেলে মাইজিন কোনো রকমে উঠে দরজা বন্ধ করা দিলো। তুলিকা থমকে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে দেখলো। এর আগে মাইজিন কখনোই দরজা এভাবে বন্ধ করেনি। আর আজকে?
সকালে সাতটা বাজতেই মাইজিন অফিস চলে গেলো। মাথা ব্যথাটা কিছুটা কমেছে। তবে বুঝতে পারলো আবার ব্যথাটা উঠবে।
তুলিকা মাইজিনকে ডাকতে এসে দেখলো মাইজিন নেই। মিষ্টি স্কুলে যাওয়ার পর সে দরজা আটকে দিলো। রাতে সে খেতে ডেকেছে মাইজিন দরজা খুলে নি। সকালের খাবারও খেলো না মানুষটা। তার কথায় তীব্র অভিমান হয়েছে মানুষটার বুঝতে পারলো সে। খুব ভালো ভাবে উপলব্ধি করতে পারলো মাইজিনের কষ্টটা। মাইজিন এর আগে কখনোই এরকম করেনি। আর আজকে তার একটা ভুলের জন্য মানুষটা তিলেতিলে কষ্ট পাচ্ছে। তুলিকা নিজের গালেই সপাটে কয়েকটা থা’প্প’ড় দিলো।
সকালে উঠে রোজকার মতো রান্না ঘরে গিয়ে তাকে জ্বালাতন করেনি। হুটহাট গিয়ে চুমু দেইনি।অভ্যাস বশত সে খুবই মিস করছিলো মাইজিনকে। আজকে মাইজিন তাকে জ্বালাতনও করেনি ইভেন কথাও বলেনি। মাইজিন অফিস থেকে ফিরে কখনোই শুয়ে থাকে না। কাল শুয়ে ছিলো। নিশ্চয়ই খুব খারাপ লাগছিলো মানুষ টার। সেজন্যই তাকে পাশে বসতে বলেছিলো। এটা একটাবার ভাবলো না সে মাইজিন কেন শুয়েছে? একটা বার জিজ্ঞেস করলো না মানুষটার খারাপ লাগছে কি না? সবটা ভাবলেই বুক ফে’টে কান্না আসছে তার। কেন সে ওমন ধারালো বাক্য ছুড়েছিলো মাইজিনের দিকে। কেন? সে মুখ চেপে কাঁন্না করে দিলো। মাইজিনের শুয়ে থাকা বিছানায় শুয়ে পরলো। হঠাৎ তার পিঠের নিচে শক্ত কিছু বাঁধলো। সে উঠে হাতে নিয়ে দেখলো একটা মেডিসিন।
‘কেফেডোন! এই ওষুধ? এই ওষুধ টা কিসের জন্য? এটা কি মাইজিন খেয়েছে? মানুষটার কি শরীর অনেক খারাপ ছিলো? আল্লাহ আমি কেন উনার সঙ্গে ওরকম করলাম।’
সে মাইজিন কে কল করলো দ্রুত। কিন্তু সে কল ধরলো না। সে না পেরে অস্থির হয়ে নাফিসকে কল দিলো।
‘ হ্যাঁ ভাবি বলুন! কোনো দরকার?’
‘ হ্যাঁ নাফিস ভাই কেফেডোন কিসের ওষুধ গো?’
‘সেকি ভাবি আপনি জানেন না? কাল রাতে আমিই তো ওষুধ দিয়ে এলাম। মাইজিনের প্রচন্ড মাথা ব্যথা ছিলো। ওষুধ টা মাথা ব্যথার।’
তুলিকা শব্দ করে কেঁদে দিলো। সে কি করে ফেলেছে এটা। কালকে রাতের ব্যবহারের জন্য ভেতরটা এখন আরও বেশি পুঁড়ছে। খাঁ খাঁ করছে ভেতরটা। অপরাধ বোধ সময়ের সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো।
‘আরে ভাবি কাঁদছেন কেন? কি হয়েছে?’
‘ভাই আমাকে একটু আপনার বন্ধুর অফিসে নিয়ে যাবেন?’
‘এখন?’
‘ হ্যাঁ!’
নাফিসের অন্য একটা দরকারি কাজ ছিলো কিন্তু পরিস্থিতি অন্য রকম বুঝে রাজি হলো তাকে নিয়ে যেতে। তুলিকা যখন অফিস পৌঁছে যায় তখন ভীষণ ভীর দেখলো মাইজিনের ডিপার্টমেন্টের হেড অফিসে। সে ভীর ঠেলে ঢুকে দেখলো মাইজিন অজ্ঞান হয়ে পরে আছে। কয়েকজন তার জ্ঞান ফেরানোই ব্যস্ত।তুলিকা চিৎকার দিয়ে গেলো তার কাছে।
#চলবে