হীরকচূর্ণ ভালোবাসা পর্ব-৩২+৩৩

0
433

#হীরকচূর্ণ_ভালোবাসা
#পর্ব৩২
#রাউফুন

ভরা পেটটা নিয়ে নিচু হয়ে বসতে পারে না তুলিকা। টুলস এর উপর বসে কাজ করতে হয় না হলে কয়েক দন্ড দাঁড়িয়ে কাজ করতে হয়। মাইজিনের পুরো পুরি কাউন্সিলিং করার পর এখন সে সুস্থ। তবে স্প্লিট পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার থেকে পুরো পুরি নিরাময় হওয়া সম্ভব নয়৷ রোজ মনে করে ওষুধ টা দিতে হচ্ছে তুলিকাকে। তুলিকা ভাবে সে না থাকলে মানুষটার কি হবে? কোথাও এক দন্ড পাঠিয়েও শান্তি পায় না সে। তারা এখন আর নাফিসের বাড়িতে ভাড়ায় নেই। রৌফ সুলতান নিজে গিয়ে জোর করে তাদের এখানে এনেছে। মাইজিনকে ছাড়া ছয়টা মাস সে খুবই খারাপ সময় কা’টিয়েছে। নাফিসদের বাড়ি থেকে এসেছে মাইজিন ফেরার পরেই। তুলিকা নিজেই সেই বাসা ছাড়তে চাইনি। তাদের প্রথম সংসার টা তো ওখান থেকেই শুরু হয়েছিলো। তাই বাড়িটার মায়া ছাড়তে চাইনি এতোটা দ্রুত। মাইজিন না থাকাই নাফিসের তাদের প্রতি করা অবদান আজীবন মনে রাখবে। উপকার কারীকে আর অবমাননাকারীকে মানুষ কখনোই ভুলতে পারে না৷

এদিকে মিষ্টির মেট্রিক পরীক্ষা চলে এগিয়ে এসেছে। মেয়েটা দিন রাত এক করে পড়াশোনা করে। পাশাপাশি বোনের কাজে সাহায্য করে। তুলিকার শরীরে প্রেগন্যান্সির কারণে পানি ধরেছে। কাউকে না কাউকে ধরাধরি করে চলাচল কর‍তে হয়।রেশমা নামের একজন মহিলাকে রেখেছেন রৌফ সুলতান। যাতে তুলিকাকে রান্না ঘরের আশেপাশেও যেতে না হয় সেজন্য।

তুলিকা মাথার চুলকানোর জ্বালা সইতে পারছে না আর। উঁকুন হয়েছে তার চুলে। মাইজিন তুলিকাকে ধরে বসালো। টুলসে বসিয়ে নিজেও বসলো। বিলি কে’টে উঁকুন এনে দিলো।

‘আল্লাহ আমার একি জ্বালা হলো। শেষ পর্যন্ত মাথায় উঁকুনে বাসা বাঁধলো৷ এই বাবুর আব্বু মাথায় কি বেশি উঁকুন হলো?’

‘না না একটু একটু হয়েছে। মাথা তো পরিষ্কার করে দিই প্রতিদিন তাহলে থাকছে কিভাবে?’

‘রেশমা আপা বললো পোয়াতি মায়ের মাথায় নাকি একটু আধটু উঁকুন হয়। একেকজনের একেক কমপ্লিকেশন থাকে। দেখ বাবু তোমার জন্য আমার কি অবস্থা। মনে রেখো কিন্তু সব।’

‘তোমার পায়ের বড় নখের আ’চ’ড় লাগে। বসো নঁখ কে’টে দিবো।’

মাইজিন নেইল কা’টার এনে তার পায়ের নখ কে’টে দিলো। হাতের নখও কে’টে দিলো। এরপর বলল,

‘এয়্যাই বাবু দেখো তোমার আব্বুও কষ্ট করছে। বাবুর আম্মু তুমি একাই কষ্ট করছো না আমিও করছি। বাবু মনে রাখিও কিন্তু?’

‘আমি বেশি কষ্ট করছি। এই দেখুন আমার পা ফুলে গেছে পানিতে। হাঁটতেও পারি না।’

‘তোমরা কেউ-ই কিছু করছো না। বাবুর খালামনিই সব করছে! তাই না বাবু!’

‘হ্যাঁ এবার এসেছে আসল জন। দেখো মিষ্টি তোমার বুবুজান আমাকে কি বলছে আমি নাকি বাবুর জন্য কষ্ট করছি না।’

‘বাবুর জন্য যে বেশি কষ্ট করবে সে আগে কোলে নিবে।’

‘আমিই তো বেশি করছি! তাই আমিই বাবুকে প্রথমে কোলে নিবো।’

‘সবার প্রথমে আমি কোলে নিবো বুবুজান। তোমরা কেউ না!’

‘এয়্যাহ বললেই হলো। আমি বাবুর মামা আমি কোলে নিবো আগে।’

‘আরে নাফিস ভাই যে!’ নাফিসকে দেখে মাথায় কাপড় টেনে নিলো তুলিকা। উঠে বসলো আস্তে আস্তে। মাইজিন নাফিসকে জড়িয়ে ধরলো উঠে গিয়ে।

‘এতোদিন পর বোনকে মনে পরলো?’ বললো তুলিকা।

‘অনেক ব্যস্ত ছিলাম গো বোনটি। ঢাকার বাইরে গেছিলাম কাজের জন্য! এখন ফিরতেই এখানে না এসে থাকতে পারলাম না। তোমাদেরকে খুব মিস করছিলাম।’

‘ উঁহু আমাদের না বল মিষ্টিকে।’

‘এই মাইজিন তুই কিন্তু বেশি বলছিস!’

মিষ্টির মন খারাপ হলো ভীষণ। একটা বার নাফিস তার দিকে তাকাইনি পর্যন্ত। এমন কি কোনো রকম বাক্যব্যয় করেনি।

‘মিষ্টি বোন যা তো চা বসাতে বল রেশমা আপাকে।’

‘আমাদের জন্যও বসাতে বলিস তাহলে।’

‘আরে আশু, নীতি ভাবি, সাইমুম ভাইয়া, নীরব ভাইয়া আপনারা কখন এলেন! এই আশু এই তোর আসার সময় হলো?’

‘আর বলিস না বাবার শরীর তো সব সময় খারাপ থাকে তাই কোথাও যেতে পারি না৷ বয়স্ক মানুষ কখন কি হয় তার চিন্তায় খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সবাই। আমাকেও সব দিক সামলাতে হচ্ছে।’

‘পাক্কা গিন্নি হয়ে গেছিস একেবারে। সেই যে মাইজিনকে দেখে গেলি। আর আসিস নি তাই অভিমান হয়েছে।’

‘আচ্ছা স্যরি আমার বান্ধবী।’ আশফি জড়িয়ে ধরলো তুলিকাকে।

তারা ছেলেরা এক জোট হয়ে ড্রয়িংরুমে আড্ডা দিতে বসে গেলো। আর মেয়েরা এক জোট হয়ে তুলিকার রুমে চলে এলো। মিষ্টি রেশমার সঙ্গে কাজে সাহায্য করছে আর ফাঁকে ফাঁকে নাফিসকে লক্ষ্য করছিলো। নাফিস তার সাথে কথা না বলাই রাগে দুঃখে পেয়াজ কা’ট’তে বসলো। রেশমা শুধালো,

‘মিষ্টি তুমি পেয়াজ ছুলাইতাছো ক্যালাই।?’

‘পেয়াজের জুস করুম রেশমা আপা!’

‘ওমা এটা আবার কিমন জুস। জীবনে হুনি নাই!’

‘হুনো নাই হুনবা।’

‘কিন্তু এইডা তুমি কারে খাওয়াইবা? নাফিস ভাইরে?’

মিষ্টি কটমট করে তাকালে রেশমা দমে গিয়ে নিজের কাজে মন দিলো। এদিকে কষ্টে চোখের পানি বের হচ্ছে। পেয়াজের ঝালা লাগাটা বড় কথা না ভেতরে কষ্ট হচ্ছে সেটার জ্বালাই চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পরছে।

সাইমুম, নীরব, আশফি, নীতি তারা সবাই এসেছিলো মাইজিনের এসাইলামে যাওয়ার আগে। তাছাড়া রোজ আশফির সঙ্গে তুলিকার কথোপকথন হতোই। সবটা ফোনে শুনলেও আসতে পারতো না আশফি। তার সংসারে শাশুড়ী নেই। তার উপর নীতি তখন পাঁচ মাসের প্রেগন্যান্ট। তার শরীরে অনেক কমপ্লিকেশন থাকায় তাকে ফুল বেড রেস্টে থাকতে বলেন ডক্টর। যদিও নীতি কাজ করতে চাইতো কিন্তু আশফি তাকে কাজে হাত ও লাগাতে দিতো না। এখন তার বাচ্চার বয়স দুইমাস। কি সুন্দর ফুটফুটে একটা ছেলে বাবু হয়েছে তার। নীতির কোলে বাচ্চা এটা তুলিকা মাত্র খেয়াল করলো।

‘ভাবি আমি খেয়ালই করিনি বাচ্চাকে। এতো ঝামেলায় আমরাও ওঁকে দেখতেও যেতে পারিনি৷ একটু দিন ওঁকে কোলে নিই!’

‘এয়্যাই তুলিকা তোর এই অবস্থা। বাবু ছোট হলে কি হবে পেটে জোর কদমে কিক দেই। ব্যথা পেয়ে যাবি।’

তুলিকা মানলো না। এতো সুন্দর বাবুকে কি কোলে না নিয়ে থাকা যায়।

‘তুই চুপ কর তো আশু। আমি একটুর জন্য বাবুকে কোলে নিবো। বাবু আমাকে অনেক ভালোবাসে আমাকে কিক দিবে না।’

নীতি মিষ্টি হেসে বললো,’নেও তবে বাবুর হাত পায়ের কন্ট্রোল নেই একদম। ছোট হলে কি হবে লা’থিটা জোরেই লাগে। কোলে নাও তবে অল্প সময়ই থাকবে তোমার কাছে।’

‘আচ্ছা দিন তো। কি নাম রেখেছেন ওর?’

‘মুহিন!’

‘বাহ ভারী মিষ্টি নাম!’

তুলিকা বাচ্চাকে কোলে নিয়ে দুই গালে কপালে, ঠোঁটে, স্নেহের পরশ এঁকে দিলো।

‘এয়্যাই তুই দেখি জামাই আদর করছিস! জামাই বানাবি নাকি?’

‘বানালে ক্ষতি কি? এতো সুন্দর জামাইকে হাত ছাড়া করতে চাই না।’

আশ্চর্যের বিষয় হলো তুলিকার কাছে গিয়ে বাচ্চাটা শান্ত হয়েই আছে। যেনো একটু নড়লেই সে ব্যথা পাবে। আর এটাই বাচ্চাটা চাইছে না। কেমন দুই হাতে আলতো করে গলা জড়িয়ে ধরেছে তুলিকার বড্ড আদুরে ভঙ্গিতে। তুলিকা তার উচু পে’টের উপর দিয়েই বাবুকে আগলে ধরেছে।

‘দেখেছিস বাচ্চা আমার কাছে এসে কেমন চুপচাপ হয়ে আছে।’

‘ হ্যাঁ তাই তো দেখছি।’

‘বাবু মনে হয় তোমাকেই শাশুড়ী বানাতে চাইছে। এই জন্যই মহব্বত করে লাথি দেইনি এখনো।’

নীতির কথায় হেসে উঠলো তুলিকা আর আশফি।

মিষ্টি সবার জন্য শরবত নিয়ে গেলো। এই অসময়ে চা কফির বদলে শরবত দেখে একটু অবাক হয় সবাই।

‘নিন এই গরমে শরবত খেয়ে গলা ভেজান সবাই!’

‘এই সকালে শরবত? আর গরম কোথায় মিষ্টি। শীত শীত আমেজ পরেছে সবে সবে!’ বললো মাইজিন।

‘খেলে খান না খেলে নিয়ে যাচ্ছি এতো কথা কেন বুঝতে পারছি না!’

‘এই রে মাইজিন তোর বোন তো দেখছি রেগে যাচ্ছে।’ বললো সাইমুম।

‘হ্যা তাই তো দেখছি।’

‘কি রে নাফিস তুই কিছু বলেছিস নাকি?’

‘আমি? আমি কি বলবো নীরব ভাই!’

মিষ্টি সবার সামনে শরবত রাখলো। নাফিসের সামনে শরবতের গ্লাস টা শব্দ করেই রাখলো। সবাই শরবত হাতে নিয়ে মিষ্টি আর নাফিসকে দেখে মিটিমিটি হাসলো।

নাফিস শরবত মুখে দিতেই চোখ মুখ উলটে এলো।

‘তোমরা কি শরবতে পেয়াজের গন্ধ পাচ্ছো?’

‘কই না তো।’ এক সাথে জবাব দিলো তারা।

নাফিস মনের ভুল ভেবে আরেক ঢুক মুখে দিতে
উটকো করে ফেলে দিতে উদ্যত হলো। সে সময় মিষ্টি হাতে লা’ঠি এনে দাঁড়িয়ে পরলো তার সামনে।

‘খবর দার এক ফোটা শরবত ফেললে এই লা’ঠি ভাঙবো আপনার পি’ঠে!’

অবস্থার বেগতিক দেখে সাইমুম, নীরব, মাইজিন কে’টে পরেছে। আড়াল থেকে দেখছে মিষ্টি কি করে। নাফিস ভয়ে আশেপাশে তাকিয়ে দুনিয়ার সবচেয়ে অদ্ভুত স্বাদের শরবত পান করে নিলো। বার বার উলটে আসছিলো মুখ থেকে কিন্তু শেষ না করে উঠতে দেইনি মিষ্টি৷ শরবত শেষ হলে গ্লাস হাতে নিয়ে চলে গেলো মিষ্টি। আড়াল থেকে তারা তিন জন বেরিয়ে এলো।

‘প্রে’মের ম’রা জলে ডুবে না!’ সমস্বরে মৃদু চেচিয়ে নাফিসের কানের কাছে বললো তারা।

‘তোমরা সব নিমোকহারাম। সুযোগ বুঝে ঠিক সটকে পরেছো!’

‘বাচ্চা মেয়ের প্রে’মে পরার শাস্তি এটা তোর!’ আবারও এক সাথে বলে উঠলো তারা।

নাফিস বিরবির করে বলে, ‘কি করলাম যার জন্য এমন অদ্ভুত ধাঁচের শরবত পান করালো এই বাচ্চা মরিচ! তাতে কি ভালোবাসা ছিলো এতে!’

#চলবে

#হীরকচূর্ণ_ভালোবাসা
#পর্ব৩৩
#রাউফুন

তুলিকা কোনো রকমে শাওয়ার নিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে এলো। সে এখন ঠিক করে কাপড় ও কাঁচতে পারে না। নিজের এই অসহায়ত্বে কাঁন্না পাচ্ছে তার। মাইজিন রোজ তার কাপড় ধুঁয়ে দিচ্ছে। এতে দিনকে দিন তার খারাপ লাগা বেড়েই যাচ্ছে। অনেক সময় অন্যের কাপড় কাঁচতে গেলে তার নিজেরই সংকোচ লাগে সেখানে মাইজিন নিঃসংকোচে তার প্রতিটি কাপড় কেঁচে দিচ্ছে। কতটা নির্বিঘ্নে খুটিয়ে খুটিয়ে কাজ করে দিচ্ছে।

‘বাবু, তুমি যে কবে আসবে। তোমার বাবার আমাদের জন্য কত কষ্ট হচ্ছে দেখেছো?’

‘কিছুই কষ্ট হচ্ছে না মাই চ্যাম্প। তোমার মাকে বলে দাও তোমার বাবা সুপার হিরো।’

মাইজিন ওয়াশরুম থেকে কাপড় হাতে নিয়ে বের হলো। বারান্দায় কাপড় মেলে দিয়ে এসে তুলিকার নাক টেনে দিয়ে বললো, ‘তুমি জানো না তুমি আমাকে কি দিয়েছো। আমাকে বাবা হওয়ার আনন্দ দিয়েছো, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় খুশি যে এনে দিচ্ছে তার অসময়ে তার পাশে থাকবো না? যে মানুষটা আমার জীবনের প্রতিটি খুশির কারণ তার জন্য এটুকু করতে পেরে আমি ধন্য! নিজের মনে এতোটা গিল্ট রেখো না মাই সুইটহার্ট!’

তুলিকার অসহায়ত্ব কমলো অনেকটা। মাইজিনের এমন কথায় সে আপ্লুত। মাইজিনকে এক হাতে জড়িয়ে ধরে তার বুকে মাথা রাখলো।

‘আমি তো মুটিয়ে গেছি। এখন খুব বা’জে লাগে আমাকে দেখতে! আপনি আমাকে আগের মতো ভালোবাসেন তো বাবুর আব্বু?’

‘নাহ আগের মতো ভালোবাসি না! ইশ কি হয়েছো তুমি!’

তুলিকার মন খারাপ হয়ে গেলো এবারে ভীষণ। ছলছল চোখে তাকাতেই মাইজিন হো হো করে হাসলো। প্রাণ খোলা সেই হাসি।

‘ওই দেখো, কেমন কাঁদুনে। মেয়েরা বোধহয় একটু বেশিই কাঁদুনে হয়! এদের চোখে কি দু তিনটে লুকোনো কুয়ো থাকে নাকি?’

তুলিকা শ্লথ পায়ে গিয়ে বিছানায় বসলো। মুখ গোমরা করে অন্য দিকে তাকিয়ে রইলো।

‘আগের মতো ভালোবাসি না। কারণ ভালোবাসা বেড়ে চার হাজার গুণ হয়ে গেছে। আগে তুমি শুধু মাত্র আমার স্ত্রী ছিলে আর এখন তুমি আমার সন্তানের মা। তাহলে ভালোবাসা বাড়বে না বলো তো?’

তুলিকা খিলখিল করে হাসলো।

‘আহ! এমন হাসিতে আমি বারবার ম’র’তে রাজি।’

‘মাইজিইইইন আপনি খুব পঁচা!’

‘এই কেন কেন? এত্তো এত্তো ভালোবাসছি তাও পঁচা!’

‘ পঁচাই তো। না হলে এমন মজা কেউ করে?’

‘আচ্ছা বাবা আর করবো না।’

তুলিকা উঠে মাইজিনকে সোজা হয়ে জড়িয়ে ধরতে গেলে মাঝে বাঁধা হলো তার উঁচু পেট। দুজনেই ঝলমলিয়ে হেসে উঠলো এটা দেখে।

দিনটা শুক্রবার। সকাল থেকেই তুলিকার শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছিলো। সারাদিন ওভাবেই কা’ট’লো তার। মাইজিন গেছে অন্য একটা জরুরি কাজে। যদিও সে যেতে চাচ্ছিলো না কিছুতেই। হঠাৎই পেটের বা দিকে ব্যথার উপদ্রব হলো তার। তুলিকা মিষ্টিকে ডেকে বললো, ‘মিষ্টি তোর ভাইয়াকে কল করে আসতে বল। আমার শরীর খারাপ লাগছে।’

‘বেশি খারাপ লাগছে আপু?’

‘ হ্যাঁ মনে হচ্ছে বাবু হবে। ব্যথা করছে ভীষণ!’

মিষ্টি জলদি মাইজিনকে কল দিলো। এদিকে মাইজিন জানালো তার আসতে আরও ঘন্টা খানেক লাগবে। অস্থির মাইজিন পারলে উড়ে উড়ে চলে আসে। মিষ্টি অনুচিন্তন হয়ে নাফিসসহ আশফিদের ও কল করে আসতে বললো। তারা আধ ঘন্টার মধ্যেই গাড়ি দিয়ে চলে এলো। দ্রুত হসপিটালে নেওয়া হয় তুলিকাকে। মিষ্টি জানে বাচ্চা হওয়ার আগে বাচ্চার মাকে পানি পান করাতে হয় অনেক। হাঁটাহাঁটি করাতে হয় অনেক। মিষ্টি অনেক বার তুলিকাকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করলো হসপিটালে। কারণ বাবুর পজিশন ভালো আছে তাই নরমাল বেবি হবে ডক্টর জানালেন। বাবু হতে হতে সন্ধ্যা সারে ছয়টাই হলো। মাইজিন অস্থির হয়ে হসপিটালে ছুটে এসে শুনলো তার একটা মিষ্টি প্রিন্সেস হয়েছে। সকলের চোখে মুখে খুশির ফোঁয়ারা। কথা মতো মাইজিন সবার প্রথমে বাবুকে কোলে নিলো। অবাক করার বিষয় হলো তুলিকা বাচ্চা হওয়ার সময় একটা ছোট আওয়াজ করেছে শুধু। পুরোটা সময় শুধু চোখ দিয়ে অনর্গল পানি পরে গেছে। ঠোঁট, জিহ্বা কামড়ে ব্যথা সহ্য করেছে। তার একটাই কথা, ‘আল্লাহ্ তায়ালা মেয়েদের এই কঠিন কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা দিয়েই দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন।’

তুলিকা সম্পুর্ন সুস্থ ছিলো সে জন্য তাকে বাড়ি আনা হয়েছে। পুরো এলাকায় মিষ্টি বিতরণ করেছেন রৌফ সুলতান। নাতনীকে কোলে নিয়েই বলেছেন, ‘এটা তো আমার আসমা! সে আমার কাছে ফিরে এসেছে নতুন রুপে!’

রাতে বাবুর কান্নায় মাইজিনের ঘুম ভেঙে গেলো। সে আস্তে আস্তে উঠে বসলো যাতে করে তুলিকার ঘুম না ভাঙে। বাবুকে চেইক করে দেখলো সে পটি করেছে। মাইজিন বাচ্চার কাপড় বদলে দিলো। এরপর ভালো পোশাক পরিয়ে দিতেই বাচ্চা শান্ত। বুকের উপর চেপে ধরলো মাইজিন তার কন্যাকে। আহ এ যেনো অনবদ্য শান্তি, বাবা হওয়ার আনন্দ বোধহয় এতোটা তীব্র। কি শান্তি এতে মাইজিন মন উজাড় করে তা উপলব্ধি করলো। তুলিকা ভীষণ ক্লান্ত থাকাই বুঝতে পারলো না বাবা মেয়ের রাতের নিরব আলাপ চারিতা। বাবুকে বুকে নিয়েই মাইজিন ঘুমিয়ে গেলো।

সকালে বাবা মেয়ের এমন দৃশ্য দেখলো তুলিকা প্রাণ ভরে। সে মনে মনে বলল, ‘তুমি ভীষণ লাকি আমার প্রিন্সেস। এমন বাবা ভাগ্য করে পাওয়া যায়।আর তুমি সেই একজন আমার মা!’

বাবুর বয়স সাত দিন। নিয়ম অনুযায়ী বাচ্চার আঁকিকা আজ। সকলে এসেছে নিমন্ত্রিত হয়ে। যার যার মতো সবাই ব্যস্ত। মিষ্টি এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে বাচ্চাকে কোলে নিয়ে। বাচ্চার নাম ভাবায় সংকটে পরেছে সে। তার একটাই কথা বাচ্চার নাম সে রাখবে। মাইজিন, তুলিকাও মেনে নিয়েছে বিষয়টা। কারণ খালারা তো ভাগনা-ভাগনিদের অর্ধেক মাতা। তার সম্পুর্ন অধিকার রয়েছে বাচ্চার নাম করণ করার।

‘মাম্মাম বলো তো তোমার কোন নাম টা পছন্দ? আঁতুর নাকি জেবা?’

‘ওঁর নাম টা আমিই রাখি?’

‘কে?’ পেছন ঘুরলো মিষ্টি। নাফিসকে দেখেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো সে। কারণ একটাই আজও নাফিস তার সঙ্গে কথা বলেনি। এসেই কাজ করতে ব্যস্ত হয়ে গেছে।

‘একটা মানুষের এত্তো রাগ আসে কোথা থেকে শুনি? রাগ ছাড়া কি আর কোনো ধাঁতু তোমার মধ্যে সাবমিট করেন নি আল্লাহ তায়ালা? মানে নাকের ডগায় রাগ ঝুলে থাকে মুলার মতো। তুমিও আগাও তোমার রাগও আগায় তোমার সাথে সাথে!’

‘হ্যাঁ রাগই তো করি শুধু। আপনি যে খুব ভালো মানুষ!’

‘মানে সিরিয়াসলি? তোমার রাগ উঠবে এটাতেও আমার দোষ? আল্লাহ্, আল্লাহ্, আল্লাহ্ আমাকে উঠিয়ে নাও ধরনী থেকে!’

‘রাগ টা করি কি জন্য? আপনার কথা শুনলেই রাগে আমার মাথা তিনশো ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরে যায়।’

‘কই দেখি দেখি।’

‘হোয়াট?’ চোখ কোণা করে প্রশ্ন করে মিষ্টি।

‘না চেইক করে নিলাম আসলেই মাথাটা তিনশো ষাট ডিগ্রি এঙ্গেলে ঘুরেছে কি না। আমি কি মাথা বাঁকা বউ নিবো নাকি।’

‘ইইই! নাফিসের বাচ্চা!’

নাফিসকে আর সে তল্লাটে পাওয়া গেলো না। সে উঁধাও মুহুর্তের মধ্যে। মিষ্টি রাগে ফুসছে। সব সময় এই লোকটা তাকে রাগিয়ে দেবে। উফফ সহ্য হয় না।

‘এই লোকের সঙ্গে কথা বলবো না বলেও বলা হচ্ছে। কথা না বললেও আবার মন আঁকুপাঁকু, আঁকুপাঁকু করে। করবেই তো। না করে যাবে কই। তিনশো পয়ষট্টি দিন ঘুর ঘুর করলে মন তো গলবেই। এখানে আমার দোষ কই? দিনশেষে আমিও তো মানুষ নাকি! অভ্যস্ত হয়ে গেছি তো!’

মিষ্টি যখন একা একা বিরবির করছিলো তখন নাফিস হুট করে পেছন থেকে তনু কন্ঠে বলে, ‘কিছু বলছিলে আমার বাচ্চা মরিচ?’

‘আপনি আবার এসেছেন এখানে?’

‘তুমি যে আমায় ডাকলে?’

‘আমি জীবনেও ডাকিনি আপনাকে।’

‘ওহ তাই বুঝি? কেউ আমাতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এই কথা বলছিলো মনে হয়?’

‘আপনাকে আমি ভালো ভেবেছিলাম।’

‘আমি বরাবরই ভালো। তাতে সন্দেহ আছে?’

‘আছে অবশ্যই আছে। কোনো ভালো ছেলে কখনোই আড়ি পাতে না।’

‘বাড়ে আড়ি কখন পাতলাম? এতো জোরে জোরে কথা বললে যে কেউ শুনতে পাবে।’

‘এই বুড়ো আপনি বিয়ে করছেন না কেন?’

‘তুমি হ্যাঁ বললেই করে নিবো!’

‘আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই আপনার মতো ভীতুর ডি’ম হাবলাকে বিয়ে করবো। তারপর আমার আর আপনার বয়সের এরকম আকাশ-পাতাল তফাৎ!’

‘তাতে কি রাজি হয়ে যাও না।’

‘কি জন্য?’

‘বিয়ের জন্য!’

‘জীবনে না।’

‘জীবনে হ্যাঁ!’

‘না!’

‘ হ্যাঁ!

‘নাহ!’

‘ ওকে নাহ!’

‘ওকে হ্যাঁ!’

মুখ ফসকে মিষ্টি হ্যাঁ বলতেই নাফিস “ইয়েএএ!”বলে লাফিয়ে উঠলো।

‘কি দিলাম তো মাত?’

‘বুইড়া দূর হোন আমার চোখের সামনে থেকে! না হলে এই বাচ্চা মরিচ সেদিন পেয়াজের শরবত খাইয়েছে, আজ মরিচের শরবত খাওয়াবে!’

‘এই দেখো, দেখো বাবু আমাদের ঝগড়া বেশ এনজয় করছে! কেমন হাসছে।’

মিষ্টি দেখলো সত্যিই হাসছে বাবু। অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো। কি মিষ্টি সেই হাসি।

#চলবে