হৃদমাঝারে পর্ব-০১

0
35

#হৃদমাঝারে ( প্রথম পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
<১>
“কলকাতার রাস্তায় আজকাল এতো ট্রাফিক জ্যাম ! দু মিনিট গাড়ি চলে তো পাঁচ মিনিট থামে .. ধুর ভালো লাগে না ! মিটিং এ পৌঁছতে লেট্ হয়ে যাবে খুব ..” কথাগুলো নিজের মনে মনে বিড়বিড় করছিলো শ্রীদীপ আর দূরন্ত চোখ দুটো ভিড় রাস্তার এদিক ওদিক চলে যাচ্ছিলো কালো কাঁচ ঢাকা গাড়ির ভেতর দিয়ে | এপ্রিল মাস , এ.সি গাড়িতেও যেন গরম লাগছে ওর ! আসলে দু বছর কানাডাতে থেকে এখন কলকাতার ওয়েদার ট্রাফিক ভিড় সবের সাথেই খুব বেমানান লাগে নিজেকে | আগে এই গরম , এই ভিড় রাস্তা , এই ট্রাফিকের লাইন , গাড়ির হর্ন , কলকাতার মেট্রো , কলেজ স্ট্রিটের বই বাজার সবই অনেক নিজের লাগতো , এ.সি গাড়ির দরকার ছিল না রোজকার দিনে , বাস অটো তে দিব্বি কাজ চলে যেত | কিন্তু এই দু বছরে সবটাই বদলে গেছে , সব অভ্যাস , সব ভাবনা , সব হিসাব ! এই দু বছর বাদে কলকাতায় ফিরে এসে রোজ মনে হচ্ছে , সব কিছুর মধ্যেও কিছু একটা নেই ! আনমনে নিজের অজান্তেই এই ভিড়ে ঠাসা রাস্তাগুলোতে একটা চেনা মুখ খুঁজে চলেছে শ্রীদীপের চোখ ! অনেকদিনের না দেখা একটা মুখ | অবশ্য না দেখার ডিসিশনটা শ্রীদীপেরই নেয়া … দু বছর আগের একটা বৃষ্টি ভেজা বিকেলে শ্রীদীপ খুব কঠিন হয়ে গিয়েছিলো , এতো রাগ জমেছিলো ওর মনে , হাত ধরে টেনে নিজের ঘর থেকে বার করে দিয়েছিলো তাঁকে ,
” আর কখনো আমার সামনে আসবি না , আজ থেকে তোর আর আমার কথা শেষ ..” …. চিৎকার করে কথাগুলো বলে মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলো | সে অনেকবার ‘সরি’ বলেছিলো , কথা বলার চেষ্টা করেছিল , ফোন , ম্যাসেজ ,চিঠি অনেকভাবে ফিরে আসতে চেয়েছিলো , কিন্তু শ্রীদীপ আর সুযোগ দেয়নি | কানাডা যাওয়ার দিনও দেখা না করেই এয়ারপোর্টে চলে গিয়েছিলো | ভেবেছিলো আর কখনোই তাকে মনে পড়বে না ! যার ওপর এতো রাগ এতো বিরক্তি জমে সে জীবনে না থাকাই ভালো | কিন্তু ভাবনাগুলো মেলেনি | দিন যত এগোলো , রাগের বরফটা গলতে শুরু করলো | হঠাৎ হঠাৎ সেই গলার আওয়াজটাকে মনে পড়তে শুরু করলো ! “এতটা রুডলি বিহেভ না করলেই চলতো !” … কথাটা মাঝে মাঝেই মনে হতে লাগলো | যদিও ততদিনে সবই শেষ | সে শ্রীদীপের কথা শুনে নিজের সব কথা নিয়ে এই ভিড় রাস্তায় হারিয়ে গেছে | আর ফিরে আসার চেষ্টা করেনি | একদিন যখন শ্রীদীপ ওর জন্মদিনে নিজের রাগ ইগো সব বিসর্জন দিয়ে প্রায় এক বছর পর সেই পুরোনো নম্বরটা ডায়াল করলো , ওপারে তখন ছিল নিঃস্তব্ধতা | ফোন নম্বরটা তারপর যতবারই ডায়েল করেছে ততবার সুইচ অফ ই বলেছে | এক বছর পর খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো সে তার এড্রেসটাও চেঞ্জ করে নিয়েছে | নতুন ঠিকানা কেউ জানে না ! আজ এতদিনে বাদে কলকাতায় ফিরে তাই কারণে অকারণে মাঝে মাঝেই সেই পুরোনো হারিয়ে যাওয়ার মুখটাকে মনে পড়ে ওর | এই যেমন এখন এই ট্রাফিক জ্যামে কালো কাঁচের ভেতরে বসে মনে পড়ছে , গরম , বিরক্তি , মিটিং এ দেরিতে পৌঁছনোর চিন্তার মধ্যেও ! এই সময়েই হঠাৎ ওর গাড়ির জানলায় টোকা পড়লো , —- ” একটা ধুপ নেবেন ? খুব ভালো গন্ধ , দাম মাত্র দশ টাকা |” …. সেই গলার স্বর , সেই বড়ো বড়ো চোখের মেয়েটা , ওই কালো কাঁচের ওপারে দাঁড়িয়ে ! শ্রীদীপ কাঁচ নামাতেই মেয়েটার মুখটা থমথমে হয়ে গেলো | এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে মেয়েটা ট্রাফিকে ঠাসা রাস্তায় পা চালালো আর শ্রীদীপের চোখের পলকেই ভিড়ে হারিয়ে গেলো | ততক্ষনে ট্রাফিকের আলো সবুজ হয়ে গেছে , পেছনে লাইন দেয়া গাড়িগুলো সময়ের সাথে দৌড়োবে বলে হর্ন দিতে শুরু করেছে | এখন গাড়ি থেকে নেমে শ্রীদীপের ভিড়ে তাকে খুঁজতে যাওয়া অসম্ভব | তাই স্টিয়ারিং এ হাত দিতে হলো |
<২>
তিয়াসা প্রায় দৌড়ে রাস্তাটা পার হলো , তারপর যতটা সম্ভব জোরে পা চালিয়ে ভিড় রাস্তায় হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলো | হ্যাঁ, হারিয়েই তো যেতে চায় ও ! দূরে কোথাও , যেখানে চেনা মুখগুলো আর কখনো সামনে আসবে না ! কখনো মুখোমুখি হতে হবে না পুরোনো সময়, ফেলে আসা মানুষগুলোর সাথে | কিন্তু আজ যেন সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে | হঠাৎ এতদিন বাদে শ্রীদীপের সাথে দেখা ! গাড়ির কালো কাঁচের ওপারে যদি শ্রীদীপ আছে জানতো , তাহলে কখনোই ধুপগুলো নিয়ে ওই গাড়িটার কাছে যেত না বিক্রি করতে | এখন তিয়াসারও মনে হয়, কিছু দূরত্ব শেষ না হওয়াই ভালো | কিছু মানুষকে দূরে রাখাই ভালো | কিন্তু তা ও আজ হঠাৎ পুরোনো দিন, পুরোনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে তিয়াসার , বার বার | শ্রীদীপ আর তিয়াসা একই পাড়ায় থাকতো | ছোট থেকেই একই স্কুল , তাই বন্ধুত্বটা শুধু পার্কে খেলার সময় না , বই এর পাতায়ও জমতো খুব | শ্রীদীপ তিয়াসার থেকে এক বছরের বড়ো | তাই একটা গার্জিয়ান ভাবও কাজ করতো ওর মধ্যে | ওকে দ্বায়িত্ব নিয়ে স্কুলে পৌঁছে দেয়া , প্রজেক্টগুলো কমপ্লিট করে দেয়া , প্র্যাকটিকাল এর লেখা লিখে দেয়া সবটাই করতো শ্রীদীপ | তিয়াসাও তাই ছোট বড়ো সব ব্যাপারেই একজনের স্মরণাপন্ন হতো | ও জানতো , শ্রীদীপ ওর সব কথা শুনবে , ও উত্তরে বললে উত্তরে যাবে, দক্ষিণে বললে দক্ষিণে | তাই তিয়াসার একটা অদ্ভুত অধিকারবোধ কাজ করতো শ্রীদীপের ওপর | পুজোর সময় কোন শার্টটা পড়ে ঘুরতে যাবে , কিম্বা কোন রঙের পর্দা শ্রীদীপের নতুন ঘরে লাগানো হবে , সবটাই ঠিক করে দিতো তিয়াসা | মাঝে মাঝে এসেই শ্রীদীপের অগোছালো ঘরটাকে গুছিয়ে দেয়া , আলমারির তাকগুলোতে জামাগুলোকে ভাঁজ করে দেয়া , ছড়ানো ছেটানো বই এর টেবিলটাকে সাজিয়ে দেয়া তিয়াসার রোজকার রুটিন | আর এই রুটিন ফলো করতে করতেই কখন যে শ্রীদীপের জন্য ফিল করতে শুরু করেছিল ! ওকে ভালোবাসতে শুরু করেছিল , নিজেও বোঝেনি | বুঝলো যেদিন মা বাবা হঠাৎ একটা ট্রেন একসিডেন্ট এ মারা গেলো | তখন ওর ক্লাস টেন | ফোন এ যখনি খবরটা পেলো , চোখের সামনে সবটা অন্ধকার হয়ে গিয়েছিলো | মা বাবা বলেছিলো বিয়ে বাড়িতে যাচ্ছে , কিন্তু আর যে ফিরে আসবে না সেটা বলেনি | সাত দিন কেমন পাথরের মতন ছিল , চোখের জল , কান্না , যন্ত্রণা কিছুই ফিল হচ্ছিলো না ! বুঝতে পারছিলো না জীবনে সবটা শেষ হয়ে গেলে কি ভাবে রিয়্যাক্ট করতে হয় ! সাতদিন বাদে মা বাবার আগের বছরের ম্যারেজ এনিভার্সারীর ভিডিওটা শ্রীদীপ ওকে দেখিয়েছিলো , চোখের সামনে জীবন্ত হাসি খুশি মানুষ দুটোকেকে দেখে বুঝতে পেরেছিলো এরা আজ এখন এই পৃথিবীর আর কোথাও নেই | চিৎকার করে সব হারানোর কান্না এসে জমেছিলো ওর গলায় , আর তখনই শ্রীদীপ ওকে আঁকড়ে ধরেছিলো, শক্ত করে | সেইদিন মনে হয়েছিল শ্রীদীপ যদি ওকে ধরে না রাখে তাহলে হয়তো ও শেষ হয়ে যাবে | গলায় দড়ি বা ঘুমের ওষুধই হয়তো শেষ করে দেবে | কিন্তু না , ওই ছেলেটার জন্য সেইদিন বাঁচতে ইচ্ছে করেছিল | সব হারিয়েও মনে হয়েছিল একজনকে পেয়েছে |

এই দিনের এক বছর পর মা বাবার বাৎসরিক অনুষ্ঠানে মামা মামী তো অলমোস্ট ওর বিয়ে ঠিক করেই দিয়েছিলো ওদের কোন আত্মীয়র সঙ্গে | তিয়াসাকে ঘাড় থেকে নামাতে পারলেই বাঁচতো ওরা | তাহলেই তিয়াসার বাড়ি , ব্যাংকের টাকা খুব সহজেই হাত করে নেবে | কিন্তু সেইদিনও ওদের সব প্ল্যানে জল ঢেলে দিয়েছিলো ওই একজন , শ্রীদীপ | জোর গলায় এক ঘর আত্মীয় স্বজনের সামনে বলেছিলো , —- ” কাকু কাকিমা মারা গেছে মানে এই না যে তিয়াসার কেউ নেই | ওর এখনো ১৮ বছর হয়নি | ওর বিয়ে দেয়াটা ইললিগ্যাল | এরপরও আপনারা যদি জোর করে তিয়াসার বিয়ে দিতে যান তাহলে আমার বাবা আপনাদের এগেনস্ট এ কেস ফাইল করবে | আর নিশ্চয়ই জানেন আমার বাবা হাই কোর্টে প্র্যাকটিস করে | তিন চার বছরের জেল হলে কি খুব ভালো লাগবে ? তাই প্লিজ নিজের লিমিট এ থাকুন | ” ……… এই কথাগুলোতেই কাজ হয়েছিল | মামা মামী আর তারপর ভুল করেও ঘাঁটাতে আসেনি শ্রীদীপের সঙ্গে | তিয়াসার তখন মনে হয়েছিল শ্রীদীপ যেন ওর চারিদিকের একটা উঁচু শক্ত পাঁচিলের মতন , সেটা ভেদ করে কেউ ওর ক্ষতি করতে , ওকে হার্ট করতে আসতে পারবে না | মনে মনে শ্রীদীপকে আরো বেশি করে আঁকড়ে ধরেছিলো তিয়াসা | এরপরের দিনগুলো ছিল স্বপ্নের মতন | হাই সেকেন্ডারি পাশ করে তিয়াসা শ্রীদীপেরই কলেজে এডমিশন নিলো | স্কটিশচার্চ কলেজে | একই সঙ্গে কলেজ যাওয়া , কলেজ থেকে ফেরা, ক্যান্টিনে আড্ডা , সব চলতো নিয়ম মতো | শ্রীদীপ এক বছর সিনিয়র বলে কলেজে ওর একটা আলাদা ফ্রেন্ড সার্কেল ছিল | কিন্তু সেই সার্কেলে তিয়াসার অবাধ যাওয়া আসা ছিল | কলেজের সবাই ভাবতো যে তিয়াসা আর শ্রীদীপ রিলেশনে আছে | আর এই ভাবনাটা সেই ক্লাস টেন থেকে তিয়াসার মনেও ছিল | শ্রীদীপ ওকে ‘আই লাভ ইউ’ বলে প্রপোজ না করুক , বাকি একজন লাইফ পার্টনার যা যা করে শ্রীদীপ তো তার সবটাই করে | ওর কেয়ার করা , ওর হেল্প করা , ওর পাশে থাকা | তাই যখনি কলেজের কেউ ওদের রিলেশনের ব্যাপারে তিয়াসাকে জিজ্ঞেস করতো , তিয়াসা আলতো হেঁসে নীরবে সম্মতি জানাতো |
কিন্তু একদিন তাল কাটলো | তখন শ্রীদীপের থার্ড ইয়ার | কলেজে নতুন এন্ট্রি নিলো অনুশ্রী |
চলবে।