হৃদমাঝারে পর্ব-০৩

0
31

#হৃদমাঝারে ( তৃতীয় পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
<৫>
শ্রীদীপ জানে ঘি সোজা আঙ্গুলে না উঠলে আঙ্গুলটাকে বেঁকাতে হয় | তিয়াসা আগের থেকে অনেক বদলে গেছে | অনেক কঠিন হয়ে গেছে | আর সেটাই স্বাভাবিক | লাইফের কিছু কিছু ইনসিডেন্ট মানুষ কে পাথর করে দেয় | কিন্তু পাথর হয়ে তো জীবন কাটানো যায় না ! জীবনে হাঁসি , কান্না , রাগ , অভিমান এই ফিলিংস গুলো শেষ হয়ে গেলে সেই বাঁচার মধ্যে কোনো প্রাণ থাকে না | তিয়াসার কথা শুনে ওর থেকে দূরে থেকে শ্রীদীপ আর একটা ভুল কখনোই করবে না | বরং কাছে থেকে পুরোনো হারিয়ে যাওয়া সব কিছু ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করবে | এইসব ভাবতে ভাবতেই পরের দিন তিয়াসার হোস্টেলের সামনে গাড়িটা পার্ক করলো | আজ ও তিয়াসাকে বোঝাবেই , ওর মামা মামীর এগেনস্ট এ কেস করতেই হবে | ওদের কে এতো সহজে ছাড়া যায় না ! মনে মনে আজ অনেক ডায়লগ ও রেডি করে এসেছে শ্রীদীপ | তিয়াসাকে যুক্তি দিয়ে হোক, তর্ক করে হোক বোঝাতেই হবে | অফিস রুমে বসে বসে সেইদিন এইসব চিন্তা করছিলো | তবে তিয়াসা দরজা দিয়ে ঢুকতেই চিন্তাটা মাঝ রাস্তায় থেমে গেলো | তিয়াসার মুখটা আজ বেশ গম্ভীর | শ্রীদীপ কিছু বলার আগেই তিয়াসায় আজ শুরু করলো,
” দেখো শ্রীদীপ, কাল এতো করে বোঝানোর পর আজ আবার এখানে আসার মানে কি ? একটা কথা প্লিজ বুঝে নাও, আমি আমার ঝামেলায় কাউকেই জড়াতে চাই না | আমার নিজের বলে কেউ নেই , আর কোনো বাইরের লোক আমাকে হেল্প করবে, আমার জন্য চ্যারিটি করবে, সেটা আমি কখনো এলাও করবো না | তাই প্লিজ, আমি রিকুয়েস্ট করছি , তুমি তোমার মতন থাকো | আর আমাকে আমার মতন থাকতে দাও | আর যদি তুমি এরপরেও আমার হোস্টেলে এইভাবে আসো, তাহলে হয়তো আমাকে এই এড্রেসটাও চেঞ্জ করতে হবে | “…. কথাটা শেষ করে আজও তিয়াসা চলে গেলো | কিন্তু শ্রীদীপের যেন পা এগোচ্ছিল না | কথাগুলো এতটা কানে লাগবে ভাবেনি ! আগে তো একটা স্কুল প্রজেক্ট শেষ করার জন্যও তিয়াসা শ্রীদীপের কাছে আসতো | আর আজ ওর সাথে না দেখা করার জন্য এড্রেস চেঞ্জ করার কথা বলছে ! তাহলে কি শ্রীদীপ সেইদিনগুলোতে এতটাই রুড ছিল যে এতো দূরে চলে গেছে তিয়াসা ! সত্যি ই কি তাহলে আজ ওদের বন্ধুত্বটা শেষ ! হঠাৎ যেন কেমন অন্ধকার লাগছে চারিদিকটা | মনে হচ্ছে কেউ আবার হারিয়ে যাচ্ছে, অনেক দূরে চলে যাচ্ছে ! এইসব ভাবনার ভিড়ে আনমনেই সেইদিন রাস্তাটা পার হচ্ছিলো | হঠাৎ যে কখন গাড়িটা ওর এতো কাছে চলে এসেছিলো বুঝতেই পারেনি ! তারপরেই একটা ধাক্কাতে সবটা এলোমেলো হয়ে গেলো | হঠাৎ দেখলো ওর চারিদিকটা আবছা হয়ে আসছে | রাস্তার লোকেরা ওকে ঘিরে ভিড় করছে , আর সেই আবছা মুখগুলোর মাঝে একটা চেনা মুখ হঠাৎ উঁকি দিলো | যে দূরে চলে গিয়েছিলো, সে হঠাৎ আজ ওর খুব কাছে !
তিয়াসা সেইদিন ওর হোস্টেল এর ঘর থেকে শ্রীদীপের চলে যাওয়াটা দেখছিলো | হঠাৎ মনে হচ্ছিলো অতটা খারাপ ভাবে না বললেও হতো ! তবে শ্রীদীপকে হার্ট না করলে ও কখনোই তিয়াসার থেকে দূরে থাকবে না | শুধু শুধু ওর জীবনের ঝামেলার মধ্যে শ্রীদীপকে জড়িয়ে তো কোনো লাভ নেই ! এইসবই ভাবছিলো মনে মনে | কিন্তু তখনি দেখলো একটা গাড়ি জোরে শ্রীদীপের দিকে এগিয়ে আসছে | তিয়াসা জানলা দিয়ে অনেক চিৎকার করেছিল, শ্রীদীপকে সরে যেতে বলেছিলো | কিন্তু সেই বলার মাঝেই গাড়িটা শ্রীদীপকে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেলো আর ও ছিটকে পড়লো রাস্তার ওপর | ছাই রঙের পিচ ঢালা রাস্তাটা ওর চোখের পলকেই রক্তে লাল হয়ে গেলো | এখনো যেন দৃশ্যটা ভাসছে ওর সামনে !.. হঠাৎ একটা ভয় হচ্ছে খুব | যদি সত্যি একসিডেন্টটা সিরিয়াস হতো ! যদি সত্যি শ্রীদীপ চলে যেত, আর ফিরে না আসার জন্য ! তিয়াসা এক মনে এইসব ভাবছিলো শ্রীদীপের সামনে বসে বসে | মাঝে মাঝে মাথাটা গরমও হচ্ছিলো ! একটু রুডলি কথা বলেছে , তার জন্য ওই ভাবে রাস্তা পার হতে হবে ! ফিরুক একবার সেন্স শ্রীদীপের | একটা হেস্ত নেস্ত করেই ছাড়বে |
আর তখনি শ্রীদীপের ঘুম ভাঙলো | মাথায় কয়েকটা স্টিচ পড়েছে তাই হালকা একটা যন্ত্রণা আছে | তবে ডাক্তার বলেছে টেনশনের কোনো ব্যাপার নেই | ছোট একসিডেন্ট, রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে | পাশের নার্সটা এই অভয় বাণী দিয়েই কেটে পড়লো , আর এখন হসপিটালের এই ফাঁকা ঘরটায় শুধুই তিয়াসা আর শ্রীদিপ |
” একটু খারাপ ভাবে কথা বলেছি ! তার জন্য ওই ভাবে রাস্তা ক্রস করতে হবে ? চোখ কান ঠাকুর দিয়েছে কি করতে শুনি ! জানলা দিয়ে কত চিৎকার করলাম, শ্রীদীপ সরো , গাড়ি আসছে , সরে দাঁড়াও | কিন্তু না, একজন তো কখনোই আমার কথা শোনে না | সত্যি বলছি আজ মনে হচ্ছে তোমাকে খুন ই করে দিই | তারপর হোক আমার ফাঁসি , কোনো প্রব্লেম নেই | নইলে তো কোনো দিন তোমার জন্য হার্ট অ্যাটাক এ ই মরতে হবে ! এই দু ঘন্টা কি ভাবে কাটলো যদি একবারও জানতে !” … এক নিঃশ্বাসে চিৎকার করে বকে গেলো তিয়াসা | আর শ্রীদীপ হাঁ | একটা একসিডেন্ট যে সেই পুরোনো ঝগড়ুটে তিয়াসাকে ফিরিয়ে দেবে সেটা যদি আগে জানতো তাহলে তো নিজেই একটা গাড়ি ডেকে এনে বলতো, ‘আয়, আমাকে ধাক্কা মেরে যা |” … কথাটা ভেবেই শ্রীদীপের মুখে একটা হাসি খেলে গেলো | তবে সেটা দেখে তিয়াসা আর তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো | এতক্ষন ধরে এতো বকছে, এতো সিরিয়াস কথা বলছে , আর সেটা শুনে শ্রীদীপের হাসি পাচ্ছে ! …….. ” পাগল হয়ে গেছো তুমি? তোমার কি সিরিয়াসলি মাথায় চোট লেগে আর মাথা কাজ করছে না? তুমি বুঝতে পারছো না আমি তোমাকে বকছি |” …
শ্রীদীপ প্রশ্নটা শুনে শান্ত গলায়ই উত্তর দিলো , — ” হ্যাঁ, বুঝতে পারছি না | মানে রাস্তার অজানা অচেনা লোকের একটা একসিডেন্ট হয়েছে, তাতে তো কারোর হার্ট অ্যাটাক হওয়ার কথা না ! আর একজন তো আমাকে চেনেই না | আমার সাথে দেখা না করার জন্য নিজের এড্রেসও চেঞ্জ করে দিতে পারে | এইসব কথার পর মনে হয় না তার এতো কনসার্ন থাকা উচিত |” … ওর কথাগুলো শুনে তিয়াসার গলাটা একটু নরম হলো , — ” সেইসব তো এমনি বলেছিলাম | শুধু শুধু আমার প্রব্লেমে কাউকে জড়াতে চাই না তাই | তোমাকে আমি হার্ট করছে চাইনি | “…..
কথাগুলো শুনে শ্রীদীপ গম্ভীর গলায় বললো ,
” হুম বুঝলাম | তো এই একসিডেন্ট পর্ব হওয়ার পরও কি তোর ওই ‘একা থাকবো’, ‘একা বাঁচবো’ এইসব স্পিচ শুনতে হবে ? না কি কাল আমার সাথে লইয়ারের সাথে দেখা করবি ? আর এতো কিছু পর তুই এটা বুঝেই গিয়েছিস আশা করি যে এতো সহজে আমি তোকে ছাড়ছি না | এরপর তোর ডিসিশন |” …..
না, তিয়াসা আর সেইদিন মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেনি ! কেউ যদি এতো করে ফিরিয়ে আনতে চায়, তাহলে না এসে থাকা যায় না | অনেকদিন বাদে সেইদিন ওর মধ্যে একটা ভালো লাগা কাজ করেছিল | ওর মনটা যে আজও বেঁচে আছে , পাথর হয়ে যায়নি, সেটা বুঝতে পেরেছিলো |

এইসবের পর চার মাস কেটে গেছে | তিয়াসার মামা মামীর এগেনস্টে কেসটা কোর্টে উঠেছে, আর তার সঙ্গে ওর ডিভোর্স কেসটাও চলছে পুরুলিয়াতে | দুটো হিয়ারিং এ যা বোঝা যাচ্ছে বল এখন তিয়াসারই কোর্টে | আর হবে না ই বা কেন, শ্রীদীপের বাবা হাইকোর্টের নামি লইয়ার | এইসব ছোটোখাটো কেস ওনার কাছে কিছুই না ! তবে তিয়াসার মাঝে মাঝে খারাপ লাগে একটু | চেনা পরিচিত বলে আলাদা সুবিধা নিতে ! শ্রীদীপ যদি আজ ওর বন্ধু না হতো তাহলে এতো বড় লইয়ার হায়ার করার কথা ও স্বপ্নেও ভাবতে পারতো না | একদিন কথায় কথায় শ্রীদীপের বাবার সামনেও বলে ফেলেছিলো কথাটা | এইসব শুনে ওর বাবা অবাক !…
” বাবা ! তুই তো অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস রে ? এতো কথা ঐটুকু মাথায় আনিস কি করে বল তো ? ছোট থেকে দেখছি বলে আর বকলাম না | তবে নেক্সট টাইম এইসব শুনলে আর স্পেয়ার করবো না | আর শোন কয়েকদিন ধরে ভাবছিলাম তোকে বলবো | আমার ল-ফার্মের জন্য ভালো একটা টাইপিস্ট চাই | তোর তো ছোট থেকেই টাইপের হাত ভালো | কাল সকাল ১১ টায় চলে আসিস | ঠিক আছে |” …… কথাটা বলেই শ্রীদীপের বাবা ফাইল হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছিলো | তিয়াসাকে কিছু বলার সুযোগই দেয়নি ! সেইদিন যদিও সারাক্ষন তিয়াসার মনটা খচ খচ করেছিল | সত্যি এরা আর কত করবে ওর জন্য ! তিয়াসা খুব ভালো করেই জানে ওর সেলস গার্লের চাকরিটা মোটেও পছন্দ করতো না শ্রীদীপ | হয়তো ও ই বলেছে বলে তিয়াসা এই চাকরিটা পেলো | সেদিন শ্রীদীপকে দেখেই ও বেশ গম্ভীরভাবে বলেছিলো ,
” এই টাইপিস্ট এর চাকরির কথাটা কাকুকে তুমি বলেছো ? ”
” টাইপিস্ট ! কিসের টাইপিস্ট ! ” …………. শ্রীদীপ এমনভাবে উত্তর দিয়েছিলো যেন এই ওয়ার্ডটাই প্রথম শুনছে |
” বুঝেছি | তার মানে তুমিই বলেছো | কিন্তু এইসবের তো কোনো দরকার ছিল না | এইভাবে আমি আর কত হেল্প নেবো ?”
শ্রীদীপ কথাটা শুনে শান্ত গলায়ই বলেছিলো , ” হেল্প তোর না, বাবারই হবে | জানিস কতদিন ধরে একজন ভালো টাইপিস্ট খুঁজছিলো | আমি সেইদিন শুনে জাস্ট তোর নামটা রেকমেন্ড করেছি | আর বাবা তো লাফিয়ে উঠলো | তোর এপয়েন্টমেন্ট লেটার সেইরাতেই বাবার টাইপ করা হয়ে গেছে | এরপর যদি তুই না বলিস তাহলে বাবার সত্যি খুব খারাপ লাগবে | কিন্তু আফটার অল এটা তোর লাইফ ! তোর ডিসিশন ! আমি তো বাইরের লোক, কি ই বা আর বলতে পারি !” ……….
তিয়াসার এইসবের পর আর না বলার উপায় ছিল না | আসলে ও জানে , এটা শ্রীদীপের নতুন স্ট্র্যাটেজি | কথায় কথায় ‘বাইরের লোক’ ‘বাইরের লোক’ বলে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করে কাজ হাসিল করা |
চলবে।