#হৃদমাঝারে ( অন্তিম পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
<৬>
এই যেমন সেইদিন , দূর্গা পুজোর শপিং করতে টেনে টেনে নিয়ে গেল শ্রীদীপ ওকে | ও প্রথম থেকেই না বলছিল বার বার | আসলে অনেকদিন হলো, এইসব পুজো , প্যান্ডেলে ঘোরা , কেনাকাটি করা, কোনো কিছুই আর তিয়াসার ভালো লাগে না | আগে যখন রাস্তার ধরে বাঁশ বাঁধার শুরু দেখতো তখন নিজের অজান্তেই একটা হাসি চলে আসতো মুখে | কিন্তু আজকাল সবটা দেখেও অদেখা হয়ে থেকে যায়! আসলে দুর্গা পুজোর একটা স্মৃতি এখনো মনে গেঁথে আছে , তাই হয়তো নতুন করে আর কোনো স্মৃতি তৈরী করতে ইচ্ছে করে না | এইসব ভাবনার ভিড়েই হারিয়ে ছিল তিয়াসা সেইদিন | হঠাৎ শ্রীদীপের কথায় সম্বিত ফিরলো ,
” কিরে , তোর পছন্দ হয়নি লাল রঙের শাড়িটা ? না পছন্দ হলে বল, চেঞ্জ করা যাবে |”
” কে বললো পছন্দ হয়নি ! খুব পছন্দ হয়েছে |”
” তাহলে ওই রকম গোমড়া মুখ করে আছিস কেন ? কি হয়েছে ?”
” কিছু না | একটা পুরনো কথা মনে পড়ছিল | বাদ দাও |”
” হুম , সেই | এখন আর পুরনো নতুন কোনো কথাই বা কেন বলবি ! আমি তো বাইরের লোক |”
কথাটা শুনে তিয়াসা দু সেকেন্ড চুপ করেছিল | তারপর হঠাৎ বলতে শুরু করলো , —— ” আমার বিয়ে সেপ্টেম্বরে হয়েছিল | এক মাস বাদেই পুজো | তবে সেইবার পুজোটা একদম আলাদা ছিল | আমাকে চারদিন ওরা ওদের স্টোর রুমে বন্ধ করে রেখেছিল | আসলে পুজোর সময় তো বাড়িতে অনেক লোক আসে | আমি যদি বলে দিই এই বিয়েটা আমি না জেনে করেছি , আমার বর পাগল এটা আমার জানা ছিল না ! যদি পাড়ার লোক, আত্মীয় স্বজনের সামনে সবটা ফাঁস করে দিই ! তাহলে তো ওরা খুব চাপে পড়ে যাবে ! তার থেকে আমাকে ওই অন্ধকার ঘরটাতে আটকে রাখা খুব সহজ ছিল | আরশোলা , ঝুল , ধুলো . নোংরা, কয়েকটা ভাঙা ফার্নিচারের মধ্যে কখন ষষ্ঠী এলো , আর কখন দশমী গেল বুঝতেই পারিনি ! তবে ঢাকের আওয়াজটা কানে আসতো | রোজ ! আর যেইদিন আওয়াজটা আসা বন্ধ হয়ে গেলো, সেইদিন বুঝলাম একাদশী পড়েছে, বিসর্জন হয়েছে |” ……. এতদিনের এতো জমা কথা বলে আপনাআপনিই একটা দীর্ঘশ্বাস চলে এলো তিয়াসার | গঙ্গার ধারের সূর্যটা এখন পশ্চিমে ঢলে পড়ছে | চারিদিকে গোধূলি লগ্ন | লাল আভা ছড়িয়ে আছে গঙ্গার সাদা জলে | তিয়াসা এইসবের মাঝে হঠাৎ খেয়াল করলো শ্রীদীপকে | ওর চোখটা জলে চিক চিক করছে | কেমন যেন চুপ করে গেছে ও | এই চুপ থাকার মানে বোঝে তিয়াসা | ছোট থেকেই, যখন শ্রীদীপের খুব খারাপ লাগে, খুব কষ্ট হয় , শ্রীদীপ এইভাবেই চুপ করে যায় | তারমানে আজও শ্রীদীপের খুব কষ্ট হচ্ছে, তিয়াসার জন্য | তিয়াসা ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই পরিবেশটা হালকা করার জন্য বললো, ——— ” না, দেখছি বাইরের লোককে এতো কথা বলা উচিত হয়নি | শুধু শুধু এই পুজো মরশুমে একজনের মুড্ অফ করে দিলাম !” …..
এরপরেও শ্রীদীপ হাসেনি | ওর মুখটা থমথমেই ছিল |
সেইদিন বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার সময় শ্রীদীপ হঠাৎ ওর হাতটা খুব শক্ত করে ধরেছিলো | সামনের চলন্ত গাড়িগুলোর সামনে তিয়াসাকে যেন আগলে রেখেছিলো শ্রীদীপ | ওর মনে হচ্ছিলো একবার এই হাতটা ছেড়ে দিয়ে যেই ভুলটা করেছে , আর সেটা কখনো করবে না | বরং খুব শক্ত করে ধরে রাখবে , সারা জীবনের জন্য ধরে রাখবে |
<৬>
আজ দূর্গা পুজোর সপ্তমী | সকাল সকাল ঢাকের আওয়াজে শ্রীদীপের ঘুমটা ভেঙে গেলো | কানাডা থেকে ফেরার পর এই প্রথম দূর্গা পুজো কলকাতায় | একটা কথা ঠিক , কোনো কিছুর থেকে দূরে থাকলেই তার ইম্পর্টেন্স টা বোঝা যায় লাইফে | এই যেমন এই দু বছর, কত মিস করেছে এই শরৎ কাল , ঢাকের আওয়াজ , ঠাকুর মশাইয়ের মাইকের সামনে জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ ! অবশ্য এই দু বছরে যে শুধু দূর্গা ঠাকুরের ইম্পর্টেন্সই বুঝেছে লাইফে তা নয় ! আরো একজন যে কতটা ইম্পরট্যান্ট , কতটা জায়গা জুড়ে আছে ওর লাইফে তা ও বুঝেছে | সত্যি ও মাঝে মাঝে ভাবে, কি টিউব লাইট ই না ছিল একটা সময় ! তিয়াসাকে যে মনে মনে এতো ভালোবাসতো , সেটা অতগুলো বছর না বুঝে কাটিয়ে দিলো | মাঝখান থেকে শুধু শুধু এতগুলো ঘটনা , এতসব ট্র্যাজেডি হয়ে গেলো তিয়াসার লাইফে | ব্যাস, তবে আর না | এবার ওর এই ট্র্যাজিক স্টোরিকে একটা হ্যাপি এন্ডিং দেয়ার সময় চলে এসেছে | আজ বেশ কয়েকবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো শ্রীদীপ | লাল রঙের পাঞ্জাবিতে খারাপ লাগছে না খুব একটা ! বরং বেশ একটু হ্যান্ডসামই লাগছে | লাল রং তিয়াসার ফ্যাভারিট | প্রপোস যখন করবে তখন একটু স্পেশাল প্রিপারেশন তো নিতেই হয়
<৭>
আজ দুর্গা পুজোর সপ্তমী | সকাল সকাল ঢাকের আওয়াজে শ্রীদীপের ঘুমটা ভেঙে গেলো। বিদেশ থেকে ফেরার পর এই প্রথম দুর্গা পুজো কলকাতায় | একটা কথা ঠিক, কোনো কিছুর থেকে দূরে থাকলেই তার ইম্পর্টেন্সটা বোঝা যায় জীবনে | এই যেমন এই দু বছর, কত মিস করেছে এই শরৎ কাল , ঢাকের আওয়াজ , ঠাকুর মশাইয়ের মাইকের সামনে জোরে জোরে মন্ত্রপাঠ ! অবশ্য এই দু বছরে যে শুধু দুর্গা ঠাকুরের ইম্পর্টেন্সই বুঝেছে জীবনে তা নয়, আরো একজন যে কতটা দামি , কতটা জায়গা জুড়ে আছে ওর মনে, ওর জীবনে তাও বুঝেছে| সত্যি ও মাঝে মাঝে ভাবে, কি টিউবলাইটই না ছিল একটা সময় ! তিয়াসাকে যে মনে মনে এতো ভালোবাসতো , সেটা অতগুলো বছর না বুঝে কাটিয়ে দিলো | মাঝখান থেকে শুধু শুধু এতগুলো ঘটনা , এতসব ট্র্যাজেডি হয়ে গেলো তিয়াসার জীবনে| ব্যাস, তবে আর না | এবার ওর এই ট্র্যাজিক স্টোরিকে একটা হ্যাপি এন্ডিং দেয়ার সময় চলে এসেছে | আজ বেশ কয়েকবার আয়নায় নিজেকে দেখে নিলো শ্রীদীপ | লাল রঙের পাঞ্জাবিতে খারাপ লাগছে না খুব একটা ! বরং বেশ একটু হ্যান্ডসামই লাগছে | লাল রং তিয়াসার প্রিয় | প্রপোজ যখন করবে তখন একটু স্পেশাল প্রিপারেশন তো নিতেই হয় |
এইসব ভাবতে ভাবতেই কলেজ স্কোয়ারের পুজোয় পৌঁছে গেলো | এখন সকাল ১০ টা | তিয়াসার তো এতক্ষণে চলে আসার কথা ! কাল রাতেও শ্রীদীপ ফোনে টাইমটা মনে করিয়ে দিয়েছে ! এইসব এলোমেলো চিন্তার মাঝেই ও দেখলো ভিড়ের মধ্যেই একটা গোলাপি শাড়ি | সেই চেনা মিষ্টি মুখটা ওর কাছে এগিয়ে আসছে , যেন কত বছর বাদে, কত বাঁধা , কত মুহূর্ত পেরিয়ে সে এগিয়ে আসছে অবশেষে তার গন্তব্যে | ভেবেই একটা হাসি চলে এলো শ্রীদীপের মুখে, কিন্তু পরক্ষণেই সেই হাসিটা মিলিয়েও গেলো , যখন ওই মিষ্টি মুখ থেকে চোখটা সরে পাশের জনের দিকে পড়লো ! তিয়াসার সঙ্গে এটা কে ? অনুশ্রী ! সেই কলেজের ফেলে আসা অনুশ্রী ! এ হঠাৎ এখানে কি করছে | হাজারটা প্রশ্ন যেন এক সেকেন্ডে শ্রীদীপের মাথায় এসে ভিড় করলো | আর তার উত্তর দিতেই তিয়াসা হাসি মুখে ওর সামনে হাজির, ——- ” দেখো, কাকে সঙ্গে করে এনেছি | অনুশ্রী | এটা আমার তরফ থেকে তোমাকে পুজোর গিফ্ট | আমি জানি আমি অনেক ভুল করেছি | ওই ভাবে মিথ্যা বলে তোমাদের রিলেশনটাকে নষ্ট করাটা আমার একদম ঠিক হয়নি | আমার জন্য তোমাদের জীবনের দুটো বছর চলে গেছে | আমি জানি সরি বলে এটাকে ঠিক করা যাবে না | তাও একটু চেষ্টা করলাম | প্লিজ এবার তোমরা কথা বলে পুরনো সব কিছু সল্ভ করে নাও | আর অনুশ্রীকে আমি আগেই সবটা বুঝিয়ে বলেছি | আর এখন তো অনুশ্রীর বাড়ির থেকেও ওর জন্য ছেলে খুঁজছে | প্লিজ তোমরা এবার নতুন করে শুরু করো | অল দ্যা বেস্ট | যাই হোক, আর কথা বাড়াবো না | আমি চললাম | তোমরা এনজয় করো |” ……. কথাটা বলেই তিয়াসা আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না ,শ্রীদীপের কিছু বোঝার আগেই ভিড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেলো | তবে অনুশ্রী দাঁড়িয়ে ছিল , শ্রীদীপের সামনে | কিছু কথা সাজিয়েও বললো,
—- ” সরি শ্রীদীপ. সেইদিন ঐভাবে না জেনে না বুঝে অতো বাজে ভাবে তোমার সাথে বিহেভ করা উচিত হয়নি | তিয়াসা যে এতদিন বাদে আমার ঠিকানা খুঁজে আমাকে সব সত্যি বলবে এটা আমি একদম এক্সপেক্ট করিনি | আর এখন তো আমার মা বাবাও আমার জন্য ছেলে খুঁজছে | তাই যদি তুমি রাজি থাকো, তাহলে আর একবার নতুন করে শুরু করা যায় না ?”
……. না যায় না | নতুন পুরোনো কোনো কিছুই শুরু করা যায় না | আর এইসবের পর যদি শ্রীদীপ চুপ থাকে তাহলে জল আরো গড়াবে, তাই তাড়াতাড়িই অনুশ্রীর কথা থামিয়ে দিয়ে বললো, —— ” আই অ্যাম সরি অনুশ্রী | অনেক বড় মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়ে গেছে | আমি তোমাকে লাইক করি না , ইনফ্যাক্ট হয়তো কখনো করতামও না | কিন্তু এটা বুঝতে অনেক দেরি হয়ে গেছে | যাইহোক, আমাকে এখন যেতে হবে | আর দেরি করলে চলবে না !” ……… কথাটা বলেই শ্রীদীপ এগিয়ে গেলো | আর পেছনে ফিরে তাকালো না | অনুশ্রী ওর জীবনের একটা ভুল স্টেশন ছিল , ওর গন্তব্য না ! আজ ওকে ওর ঠিক স্টেশনটা খুঁজে বার করতেই হবে | এই ভেবেই এগিয়ে যাচ্ছিলো |
ওই ভিড় রাস্তায় হাজারো অজানা অচেনা মুখের মাঝে সেই একটা চেনা মুখ খুঁজছিলো | আর হঠাৎ চোখটা আটকে গেলো | সেই চেনা মুখ গাড়ি ভর্তি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে , রাস্তা পার হওয়ার অপেক্ষায় | শ্রীদীপ দৌড়ে গেলো ওর কাছে | তিয়াসা হঠাৎ শ্রীদীপকে পাশে দেখে অবাক | ওর চোখটা এখনো জলে ভর্তি | তখন ওই মুহূর্তে শ্রীদীপ আর অনুশ্রীর মাঝে দাঁড়ায়নি কারণ এই জলটা হঠাৎ করে চলে এলে খুব মুশকিল হয়ে যেত | একবার শ্রীদীপকে কাছে পেতে চেয়েছে, কিন্তু আর তো সেই ভুল করবে না ! .. কিন্তু শ্রীদীপ হঠাৎ এখানে কি করছে ! কথাটা জিজ্ঞেস করার আগেই শ্রীদীপ ওর হাতটা ধরে নিলো , শক্ত করে | সেই যেমন সেইদিন গঙ্গার ধার থেকে ফেরার সময় ধরেছিলো ! তারপর বেশ গম্ভীর গলায় বললো,
“তোকে আর কখনোই আমি একা রাস্তা পার হতে দেব না , বুঝলি | আর তুই কি ভেবেছিস তিয়াসা , যখন তখন আমার লাইফে যা খুশি তাই করবি ? তোকে কে মাথার দিব্যি দিয়েছিলোঅনুশ্রীকে খুঁজে আমার সামনে নিয়ে আসতে ? কে বললো তোকে যে আমি ওকে বিয়ে করতে চাই?”
তিয়াসা থমথমে মুখে উত্তর দিলো , —— ” কেন ? তুমিই তো বলেছিলে | দু বছর আগে |”
” হে ভগবান ! দু বছর আগে যা বলেছিলাম, সেটা এখনো মনে রাখলি ? আর এই রিসেন্টলি , এতগুলো দিন যে এতো কিছু করলাম , তোর জন্য একসিডেন্ট , কোর্টে কেস , তোর ডিভোর্স ! এইসব কিছু মনে হলো না ? ”
” কি মনে হবে ! আমি ভালো বন্ধু তাই করেছো |”
” না | আপনি শুধু আমার ভালো বন্ধু না , আপনার জন্য আমি ফিল করি , মন থেকে। ভালোবাসি , নিজের করে রাখতে চাই, সারা জীবনের জন্য | তাই এতকিছু করেছি | আর আজ , এই লাল রঙের পাঞ্জাবি পড়ে , আমি তোকে প্রপোজ করতে এসেছিলাম | বুঝলি এবার | প্লিজ , এবার আর না বলিস না | অলরেডি দু বছর দেরি হয়ে গেছে ! প্লিজ … ”
না , তিয়াসা হ্যাঁ, না কিছুই বলেনি | শুধু শ্রীদীপকে জড়িয়ে ধরেছিলো, আঁকড়ে ধরেছিলো , সারা জীবনের জন্য |কিছুক্ষণ আগে যে অনেক দূরের ছিল , আজ হঠাৎ , এই মুহূর্তে সে অনেক কাছের হয়ে গেছে | একদম নিজের হয়ে ধরা দিয়েছে ওর কাছে | আর ঠিক তখনই দূরে কোনো পুজো মণ্ডপের মাইক থেকে একটা খুব চেনা সুর তিয়াসা আর শ্রীদীপের কানে এলো , সুরটা ওদের মনটাকে ছুঁয়ে গেলো …
”
তোরে হৃদমাঝারে রাখিবো , ছেড়ে দিবো না !
তোরে বক্ষমাঝে রাখিবো , ছেড়ে দিবো না !
< সমাপ্ত >