#হৃদয়েশ্বরী – ৪৫
সাদিয়া মেহরুজ দোলা
সিলেটের এক গ্রামাঞ্চলে কাল আকাশপথে হা’মলা হয়েছে। বো’মা হা’মলা। হেলিকপ্টার থেকে বো’মা নিক্ষেপ করা হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত সেই ঘটনায় নিহত হয়েছে প্রায় পঞ্চাশোর্ধ মানুষ। ফসলি জমি, সেখানকার কিছু ঘরবাড়ি তৎক্ষনাৎ বো’মা নিক্ষেপ করার কারণবশত ধ্বংস হয়ে ছাই। আচানক এমন কান্ডে এয়ার ফোর্স যখন হেলিকপ্টার নিয়ে ছুটলো আকাশপথে সেই হেলিকপ্টার’টাকে আয়ত্তে আনার জন্য, তৎক্ষনাৎ দেশবাসীকে চমকে দেয়ার জন্য ঘটলো আরেক অনা – আকাঙ্খিত ঘটনা!বিকট এক শব্দে সেই হেলিকপ্টার ব্লাস্ট হয়ে আকাশপথ থেকে ছিটকে ভূমিতে আছড়ে পড়ল। সেই ক্ষণটায় আরো হতাহতের কান্ড ঘটল। আগুনের লাভা গাছে পড়ে আগুন লাগল। পুরো দেশের মানুষেরা তখন স্তব্ধ, কিংকর্তব্যবিমুঢ়! প্রতিরক্ষা বাহিনীর মাথায় হাত। কি থেকে কি হয়ে গেলো!তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়ে গেল এই বো’মা হামলা। থমকে রয়েছে যখন দেশের মানুষের বুঝতে বাকি নেই ১৯৯৯ সালের সেই ধ্বংসযজ্ঞ পরিস্থিতি আবারও সৃষ্টি হতে চলেছে।
অম্বরে অর্ধবৃত্তের ন্যায় চাঁদ উঠেছে। চাঁদের স্বচ্ছ, ঝলমলে রশ্মি তখন বাতাবরণ জুড়ে চাদরের ন্যায় বিছিয়ে রয়েছে। পশ্চিম দিক থেকে আসা থমথমে সমীর জানান দিচ্ছে আজকের রাতটি হবে উত্তপ্ত! ভ্যাপসা গরমে কাহিল অবস্থা। গুমোট অম্বরে মেঘ নেই।তিমীরাবৃত, কলুষিত আঁধারে বিলীন অন্তরীক্ষ। চাঁদের ঝলমলে আলো গায়ে লাগাতে মীরা মাত্রই বারান্দায় এসে বসল। তার মুখ শুকনো, ফ্যাকাশে। কোমড় অব্দি চুলগুলো থমথমে তপ্ত অনিলের ছোঁয়া পেয়ে এলোমেলো হয়ে উড়ছে। মীরা পা গুটিয়ে বসল মেঝেতে। তার মলিন দৃষ্টিপাত আবদ্ধ করল দূর আকাশের স্বচ্ছ, চকচকে চাঁদটার দিকে। চোখের কোণে তার অবহেলায় লেপ্টে থাকা অশ্রুরা রশ্মির দর্শন পেয়ে চিকচিক করে উঠল। ঠোঁট ভেঙে আচানক কান্না আসল মীরার।কান্না উপচে আসল দুঃখে নয় রাগের প্রকোপে!মীরা যখন মাত্রাতিরিক্ত রেগে যায় তখন তার কান্না পায়। কান্নার দলাটাকে সে পরপর দুমড়ে মুচড়ে ভেতরে পুড়ে নিল। স্বগোতক্তি করল,
-“পৃথিবীর চরম বদমাইশ লোক তুমি উশান!তোমাকে সামনে পেলে আমি…,”
পরবর্তী শব্দটা শব্দ ভান্ডারে খুঁজতে গিয়ে মীরা স্বগতোক্তি করা থামাল। পরক্ষণেই শব্দটা খুঁজে পাওয়া গেলেও সে তা উচ্চারণ করল না। মৌন রইল। তার নিকট বিষাক্ত লাগছে সবকিছু। কারণটা উশান।
উশান যেদিম তাকে উজানের বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গায়েভ হলো সেই যে..আর দেখা নেই তার! মাঝে উশান মীরাকে একবার ফোন দিয়ে বলেছিল, যাতে সে চট্রগ্রাম ফিরে যায়।মীরা উশানের কথা শোনেনি, তার আদেশ মানেনি, অনুরোধ রাখেনি! মীরার সেই মূর্হতে একটাই জেদপূর্ণ আবদার, মীরা চট্টগ্রাম যাবে না মানে যাবেইনা! সে ঢাকায় চাকরি করবে। মায়ানাকে এখানে নিয়ে আসবে। মাহদি তো আর দেশে নেই। সুইজারল্যান্ড গিয়েছে। ব্যাবসায়ীক কাজে। দু’বছর হলো তাও ফিরেনি এখনো। মীরার এমন জেদ দেখে উশান চুপ ছিল। কিছু বলেনি। মনে মনে প্রথমবার আফসোস করল, কেনো সে তার বিপরীত ধর্মী নারীর প্রেমে পড়ল না? উশান – মীরা একই স্বভাবের। জেদী এবং বড্ড বেশি রগচটা! মানুষ পড়ে বিপরীত ধর্মী মানুষ এর প্রেমে। আর মীরা – উশান? তারা পড়েছে তাদের স্বভাবেরই ব্যাক্তির প্রেমে!
মীরা ঢাকায় একটা ফ্লাট ভাড়া নিয়েছে। ফুপির কাছ থেকে মায়ানকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছে চট্টগ্রামে গিয়ে। এখন সে, রুহি, টুইঙ্কেল আর মায়ান একসাথেই থাকে। মীরা চাকরি খুঁজছে! হয়েও যাবে হয়ত অল্প কয়েকদিনের মাঝে। উশান ভীষণ ক্ষুদ্ধ! মীরা কেন তার কথা শোনেনা? সে কি আর মীরার ক্ষতি চায়? নাতো..! এই করে দু’জনের কথা বলা বন্ধ আজ ১২ দিন হবে।কথা বলাটা বন্ধ মীরার তরফ থেকে। উশান তো চরম ব্যাস্ততার কারণে তার অভিমানীর সঙ্গে একদণ্ড কথা বলতে পারছে না।
পর্দার আড়াল থেকে মীরার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে টপাটপ দুই থেকে চারটা মীরার ছবি তুলল রুহি। তারপর সেই ছবিগুলো পাঠাল উশানের ইনবক্সে। সাথে ম্যাসেজ দিল,
-” আপনার জন্য মেয়েটা দিন দিন সন্নাসী হয়ে যাচ্ছে উশান ভাই! প্লিজ কাম ব্যাক সুন। মীরাকে মানুষ থেকে সন্ন্যাসী হওয়া থেকে বাঁচিয়ে নিন!আমি অবশ্যই চাই না আমার একটা মাত্র বান্ধবী এমন সন্ন্যাসী হয়ে দিনকে দিন মাথা পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াক।”
উশান মিটিং এ ছিল। মিটিং শেষ হলো মাত্রই আর সঙ্গে সঙ্গে তার ফোনে ম্যাসেজ ‘টিউন ” এর শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে তার কানে এসে বাজল। মিটিং রুম থেকে বের হতে হতে উশান তার সেলফোনে আসা ম্যাসেজটা চেক করল। রুহির ম্যাসেজ। মীরার ছবি পাঠিয়েছে কয়েকটা সাথে ক্ষুদ্র বার্তা। সেই ক্ষুদ্র বার্তাটিকে রেখে উশান ছবিতে ক্লিক করল। মীরার প্রতিচ্ছবি চক্ষু সম্মুখে স্পষ্টত হতেই তার বক্ষঃস্থল শীতল হলো বৈকি তবে মীরার হাল দেখে সে কিঞ্চিৎ কপালের চামড়া কুঁচকালো!মীরার মুখোশ্রীতে রাগের আচঁ সাথে অন্তঃস্থলের অদৃশ্য চাপা কষ্ট ফুটফুটে অবস্থায় ফুটে রয়েছে। উশান হতাশ দৃষ্টিতে আরেকবাট মীরাকে পরখ করে পাওয়ার বাটনে চাপ দিয়ে ফোন বন্ধ করে দিল। সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বিড়বিড়িয়ে বলল,
-” রাগ করার কথা আমার। উল্টো রাগ করে বসে আছে সে! ”
____
পঁচিশ মিনিট যাবৎ একই ভঙ্গিতে বসে থাকার পর মীরার হুট করে মনে হলো সে বোকামি করছে সঙ্গে ন্যাকামিও! এসব করা কি তার মানায়? পঁচিশটা বছর পেড়িয়ে আজ রাতে সে ছাব্বিশ বছরে পা দিতে চলেছে। তার তো থাকা উচিত একদম কঠিন রূপে, ম্যাচিউর হয়ে। সে কিনা এতোবড় দামড়া মেয়ে হয়ে টিপিক্যাল কিশোরীদের মতো আচরণ করছে? আশ্চর্য তো! হলোটা কি তার?
গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়াল মীরা। কক্ষে পা রাখতেই প্রখর শব্দ কর্ণপাত করে তার কান এঁটো হলো।ভীষণ রকমের বিরক্তি নিয়ে সম্মুখে পূর্ণপাত দৃষ্টি আবদ্ধ করতেই সে থমকাল! চমকাল! বাকরুদ্ধ হয়ে রইল।
-” হ্যাপি বার্থডে মীরা..!”
রুহি, উমাইশা সাথে আরো কয়েকজনের জোড়াল চেঁচানোর সুর। উজানের কোলে মায়ান। সে বোনের দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে। টুইঙ্কেল দৌড়ে এসে মীরাকে একপ্রকার ঝাপটে ধরল। মীরা হাঁটু গেড়ে বসে টুইঙ্কেল কে কোলে তুলে নিল। টুইঙ্কেল তার হাতে লুকানো ছোট্ট বাক্সটা এবার সামনে আনলো। বলল,
-” তোমার বার্থডে গিফ্ট মিষ্টি। খুলো এটা। ”
টুইঙ্কেল কে একহাতে জড়িয়েই মীরা ছোট্ট বাক্সটার র্্যাপিং পেপারটা খুলে বক্সের বদ্ধ মুখ উন্মুক্ত করে দিল। ভিতরে ছোট্ট একটা প্রজাপতির ক্লিপ। বেশ আকর্ষণীয়। মীরা টুইঙ্কেলের গালে চুমু খেল। বলে উঠলো,
-” গিফ্ট’টা খুব বেশি সুন্দর প্রিন্সেস। থ্যাঙ্কিউ! কাকে দিয়ে আনিয়েছ এটা? ”
-” লাফঝাঁপ এনে দিয়েছে। ”
মীরা সামনে এগোল। উমাইশা তাকে জড়িয়ে ধরল। উজান, রুহি উইশ করল তাকে। মায়ান লাফ দিয়ে উজানের কোল থেকে নেমে মীরার পাশ ঘেঁষে দাঁড়াল। টুইঙ্কেলের দিকে সে কটমট চোখে তাকাল। তার মতে এই মেয়েটা আসার পর থেকে মীরা তাকে কম ভালোবাসে। তাই সে টুইঙ্কেল কে সহ্য করতে পারেনা। দেখলেই ঝগড়া করে তবে তা মীরার দৃষ্টি অগোচরে।
-” তোমরা কখন আসলে আপু? ”
-” এইতো একটু আগে। উজান নিয়ে আসল। আজ যে তোমার বার্থডে এটা আমাদের উশান ফোন করে জানাল। বলল তোমার বাসায় একটু যেতে। ও না বললেও আমি চলে আসতাম! ”
রাত ১১ টা ৫০ পর্যন্ত সবার খোশগল্প চলল।অতঃপর মীরার জন্য অর্ডার করা কেক এসে পৌঁছাতেই সবাই কেক কাটার জন্য প্রস্তুতি নিল।মীরা হাসঁফাসঁ করছে। বারংবার সদর দরজার প্রতি গভীর চাহনি নিক্ষেপ করছে। উশান কি আসবে না? এতো রাগ, ক্ষোভ? মীরা আচানক দ্বিধা ফেলে সবার সামনে জিজ্ঞেস করে বসল,
-” আপু? উনি কি আসবে না? ”
উমাইশা ধরতে পারল না কথাটা। সে প্রশ্ন করল,
-” এই ‘ উনিটা’ কে? ”
মীরা ইতস্তত বোধ করে জবাব দিল,
-” উশানের কথা বলছিলাম। ”
-” অহ! না। ও আসবে না। ওর নাকি দরকারি কাজ আছে। ”
মীরার হটাৎ মন খারাপ হলো। বুক ব্যাথা হওয়ার মতো মন খারাপ৷ ভীষণ, ভীষণ মন কেমনের গল্প নিয়ে সে কেক কাটল। তার চারিপাশে হৃষ্টচিত্ত তাকে ঘিরেই অথচ সে মনমরা। মলিনতা তার কাওকে বুঝতে দিল না। হাসি হাসি মুখে কয়েক প্রহর পার করে দিল। রাত বাড়লো! তখন রাত তিনটা হবে। যে যার মতে ঘুমোতে চলে গেছে। মীরার সবকিছু গুছিয়ে নিজের কামড়ায় আসল। দরজা ভিড়িয়ে রেখে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। কাঁদলো কতক্ষণ নিজমনে।পরক্ষণেই নিজেকে শক্ত করে উঠে বসল। এভাবে কাঁদলে কি হবে? কিছুই না! কিচ্ছুটির সমাধান হবে না।
-” কান্নাকাটি শেষ? ”
বিরক্তিমাখা কন্ঠ! বড্ড চির – পরিচিত মীরার এই কন্ঠস্বরটা। চমকিত হয়ে সে পিছনে ঘুরল। উশান বসে সোফায়। আয়েশী ভঙ্গিতে! তার তাকানো মাত্র সে উঠে দাঁড়াল। হাতের সেলফোন মীরার সামনে ধরে বলল,
-” আধাঘন্টা যাবৎ বসে আছি। কতক্ষণ কাঁদতে পারো তুমি তার হিসাব করলাম। গড! প্রায় ৩৫ মিনিট ১২ সেকেন্ড ধরে কাঁদছ। এতো ছিচকাদুঁনে হলে কবে? ”
রাগ, হৃষ্টচিত্ততা, বাহারি ক্রন্দন! অনুভূতির পুরো এক সংমিশ্রণ। মীরা কোনটা রেখে আগে কোন অনুভূতিটাকে প্রকাশ করবে তা ভেবে ভেবে একটু অন্যমনস্ক হলো। তারপর আচানক লাফিয়ে উঠে উশানের শার্টের কলার চেপে ধরে ধমকে বলল,
-” বে’য়াদব লোক! ফাজলামো হচ্ছে? তোমাকে আমি চড় লাগাব আজ। ”
উশান রসিকতার সুরে প্রতিত্তুর করল,
– ” তো লাগাও! নিষেধ করেছি? এই নাও গাল দিলাম বাড়িয়ে। জলদি করো। অনেক কাজ আছে আজ। ”
মীরা থাপ্পড় লাগাল না। বরং চিমটি কাটল জোড়ে। উশান হেঁসে গাল সরিয়ে নিল। বলল,
-” ব্যাস এতটুকুই? এতোদিনের জমে থাকা ক্ষোভের মাত্র এতটুকু শাস্তি? ”
মীরা নিরুত্তর! উশান শার্টের কলার ছেড়ে সরে গেল সে। মীরা সরতেই উশান তাকে আপাদমস্তক দেখে, সুক্ষ্ম নজরে, খুঁটিয়ে খুটিয়ে! দেখা শেষে মীরার প্রতি দৃষ্টি ফেলে শুধায়,
-” লাল রঙে তোমাকে একদম টমেটোর মতো লাগছে মীরা। তোমার নাক, গালও লাল! পুরো আস্ত একটা টমেটো। ”
-” ছিহ্! কথার কি ছিঁড়ি! ”
উশান হেঁসে ফেলল। বলল,
-” লাল শাড়ীতে তোমাকে এতোটা সুন্দর লাগবে জানলে আমি অন্যান্য রঙের শাড়ী গুলো না এনে শুধু এই লাল রঙের শাড়ীই আনতাম। ”
ভ্রু দ্বয়ের মাঝে পরাপর সুক্ষ্ম করে ভাজ ফেলল মীরা। সন্দিহান গলায় শুধাল,
-” মানে কি! এই শাড়ী তো আমাকে উমাইশা আপু দিয়েছে। তুমি কখন দিলে? ”
-” আমিই কিনে দিয়েছিলাম আপুকে। যাতে আমার আসার আগেই তোমাকে শাড়ী পরিহিত অবস্থায় দেখতে পারি৷ রাস্তায় ছিলাম। জ্যাম ছিল প্রচুর।তাই লেট হলো। ”
মীরা নিশ্চুপ। আচানক উশান তার হাত ধরে কাছে টানল। মীরা হতবিহ্বল হয়ে তৎক্ষনাৎ বলল,
-” আরে আশ্চর্য! টানাটানি করছো কেন? দেখা করতে আসলেই শুধু টানাটানি। অ’শ্লী’ল লোক! ”
বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হলো না উশান। সে মীরার চিবুক ধরে নতজানু হয়ে থাকা মীরাকে সোজা করল। ঠোঁট ছোঁয়াল গভীর করে চিবুকে।গাল দু’টো আগলে ধরে অধরের স্পর্শ আকঁল অনবরত। গলায় নেমে এসে গভীর করে ঠোঁট ছোঁয়াল। মীরার অবস্থা তখন বেহাল! মুক্ত বাতাসে ওড়া ঘাসের মতো করে কাঁপুনি দিচ্ছিল অবিরত। কাঁপাটে কন্ঠে কোনোমতে
ধমকে বলার চেষ্টা করল,
-” ছাড়ো! ”
উশান ছাড়ল না মীরাকে। বরং বাঁধন নিবিড় করল। কানের পিঠে অধর ছুঁইয়ে দিতে দিতে জবাব দিল,
-” আজকে নো ছাড়াছাড়ি!নো দূরে যাওয়া – যাওয়ি। আজকে শুধু ভালোবাসা – বাসি হবে ম্যাডাম। লেট মি লাভ ইউ! ”
চলবে~
#হৃদয়েশ্বরী
সাদিয়া মেহরুজ দোলা
(৪৬).
উশান বাগানে চারা রোপণ করছে। বুঁনো গোলাপের চারা। মীরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে উশানের চারা রোপণ করা দেখছিল এক মনে। সিক্ত কেশ দিয়ে তার পানি পড়ছে টপটপ করে সেদিকে খেয়াল নেই তার। পানি পড়ে তার সদ্য নতুন শাড়ীটার আঁচল পুরো ভিজে গিয়েছে। ভেজা আঁচল মুক্ত সমীরে উড়ে যখন তার হাতে বাড়ি খেল তৎক্ষনাৎ হুঁশে ফিরল মীরা। উশান তখন উঠে দাঁড়িয়েছে। মীরা ছুটল রুমে! উশানের সাথে যেন চোখাচোখি নাহয় তার জন্য আজ সকাল থেকে সে এক প্রকার পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। অদ্ভুত হলেও সত্য মীরা ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে।ভয়ানক লজ্জা! উশানের মুখোমুখি হতে হবে তা ভাবলেই তার গা হিম হয়ে উঠছে ত্রপার ভারে। কি মুশকিল!
রুমে উপস্থিত হওয়ার পর মীরা চটপট সিদ্ধান্ত নিল সে এখন শাড়ী বদলে উমাইশার রুমে ঢুকবে। সেই ১ বার যে ঢুকবে উশান বাসা থেকে না যাওয়া পর্যন্ত আর বের হবেনা। কিছুতেই না! স্বগতোক্তি করা শেষ করে মীরা নতুন একটা শাড়ী হাতে নিল। ওয়াশরুমে শাড়ী হাতে ছুটবে তৎক্ষনাৎ উশান রুমে হাজির।
-” এই মেয়ে এই দাঁড়াও! ”
কান এঁটো করা ধমক শুনে মীরা থামল মাঝরাস্তায়। পিছন ফিরল নতজানু রূপে। দৃষ্টিপাত যখন তার ভূমিতে স্থির হয়ে তখন সে শ্রবণ করল তাড়াহুড়ো করে ফেলা পদচারণের শব্দ। প্রখর ধ্বনি! কর্ণকুহরে এসে বাজছে বারবার। আঁড়চোখে সম্মুখে তাকাতেই খেয়াল হয়, উশান তার সামনে দাঁড়িয়ে। লোকটার মুখাবয়ব দর্শন করা হলো না মীরার। নতজানু যে সে!
-” সকাল থেকে এমন পালিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছ কেন বলো তো? ঘুম থেকে উঠে পেলাম না। বাহিরে যাওয়ার সময়ও দেখলাম না। বাগানে গাছ লাগিয়ে উঠে দাঁড়ানোর পর ছুটে চলে গেলে আর এখন আবার পালাচ্ছো। সমস্যা কি? ”
স্বাভাবিক হওয়ার প্রয়াস চালাল মীরা। হাতের শাড়ী কখন তার হাত পিছলে পড়ে গিয়েছে তা টেরই পায়নি সে। মেঝে থেকে নজর সরিয়ে মাথা তুলল। বলে উঠলো,
-” পালাবো কেন? কাজ ছিল তাই রুমে ছিলাম না।”
উশান তীক্ষ্ণ নজরবিদ্ধ করল মীরাকে। বোঝার চেষ্টা করল আসলে হয়েছেটা কি এই মেয়ের? মীরা যে এই মাত্র মিথ্যা বলছে তা সে পুরোদমে নিশ্চিত।একটু নিখুঁত ভাবে মীরাকে অবলোকন করার পর উশানের আসল ব্যাপারটা বোধগম্য হলো। অদ্ভুত হাসল সে। কন্ঠের খাদ নামিয়ে গভীর স্বরে প্রশ্ন করল,
-” কালকের ব্যাপারটার জন্য লজ্জা পাচ্ছো তাই না? মিথ্যা বলবে না! ”
মীরা অপ্রতিভ হলো। বুঝলো কি করে এই লোক? আশ্চর্য! সে কি মুখবয়বে প্রতিক্রিয়া ফুটিয়ে তুলেছিল? হয়তো! নাহলে বুঝবে কি করে?উশানের প্রশ্নে নিরুত্তরহীন সে। ছুটল উশানকে ফাঁকি দিয়ে বাথরুমে। পেছন হতে উশান তখন চেঁচিয়ে বলল,
-” আশ্চর্য মেয়ে! লজ্জা পাওয়ার কি আছে? কাল রাতে না লজ্জা ভেঙে দিলাম? ”
_____
‘ রুমিশা মাহবুব! বাংলাদেশে একজন দায়িত্ববান সাংবাদিক তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তার হ’ত্যাকারী তার আপন বোন রাহনুমা। ঠিক কি কারণে তাকে রাহনুমা হ’ত্যা করেছে তা জানা যায়নি এখনো। এ বিষয়টা সম্পর্কে আমি বলি স্যার। রুমিশা ছিলেন রাহনুমার ফুফাতো বোন। আপন বোন নয়! তবে তাদের দু’জনকে এ যাবৎ আপন বোন হিসেবেই সর্বদা পরিচয় দিয়ে আসা হয়েছে। রাহনুমার বাবা মাহাবুব তালুকদার, তিনি তার বোনের অকাল মৃত্যুর পর রুমিশা মাহাবুবকে নিজের কাছে এনে নিজের মেয়ের মতো লালন – পালন করা শুরু করেন।রুমিশার বাবা ছিল না। তিনি মারা গিয়েছিলেন। তার মৃত্যুর পর তার পরিবার রুমিশা এবং তার মায়ের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করেন।
মাহাবুব তালুকদার এবং তার স্ত্রী রুদিবা সবসময়ই রুমিশাকে নিজেদের আপন মেয়ে রাহনুমার থেকে রুমিশাকে বেশি ভালোবাসতেন। কারণটা জানা নেই সঠিক। রাহনুমা নিজের বাবা মাকে অন্য একটা মেয়ে কে বেশি ভালোবাসা, মর্যাদা দিতে দেখে তিনি ছোট থেকেই হয়ে উঠেছিলেন অদ্ভুত, রগচটা এবং আত্ন অহংকারী! দিনকে দিন অবহেলায় বড় হতে থাকা রাহনুমার মনে ছিল রুমিশাকে নিয়ে বেজায় হিংসা, ক্ষুদ্ধতা। রাহনুমার রুমিশার প্রতি ঘৃণার শুরুটা হয় এখান থেকেই। তারপর কিভাবে কি করে রাহনুমা প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার সাথে সাথে যুক্ত হলেন এক সন্ত্রা’সী দলের সাথে। সেখান থেকে তিনি হয়ে উঠলেন হিংস্র, নর’পশু! একটা সময় পরিবার থেকে নিরবিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন তিনি। তারপর একদিন রাতের আঁধারে নিজের বাড়ি ফিরে নিজের বাবা মা কে হ’ত্যা করলেন অত্যান্ত বা’জে ভাবে। তার লক্ষ্য ছিল রুমিশাকেও মে’রে ফেলা। কিন্তু রুমিশা তখন পড়াশোনার জন্য ঢাকায় থাকতেন। সুযোগ পাননি সে রুমিশাকে হ’ত্যা করার। তার কয়েকবছর পর! একদিন যখন মোক্ষম সুযোগ হাতে পেলেন তিনি সেদিন রুমিশাকে মে’রে ফেললেন তিনি রুমিশার দুই পুত্র সন্তানের সামনে। ‘
সেলফোনে আসা এই বার্তাটিকে কমপক্ষে চার থেকে পাঁচবার পড়ে ফেলেছে উজান। বারংবার বোঝার চেষ্টা করছে কে পাঠাল এই বার্তা? কে জানে এ সম্পর্কে? যেই নাম্বার থেকে ম্যাসেজ এসেছিল তার ফোনে, সেই নাম্বারটা ট্র্যাক করতে গিয়ে ব্যার্থ হয় তার টিম! উজানের অন্তঃকরণ তখন তুমুল অবিন্যস্ত। আচানক তার মাথায় এলো সিয়ার নামটা সুস্পষ্ট রূপে! আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে সিয়া তার মায়ের দোষ কিছুটা লাঘব করতে এই বার্তাটি প্রেরণ করেছে। কিন্তু সিয়া, এই মেয়েটা এখন কোথায়?
________
-” কবে ফিরবে আবার? ”
মলিনতা, একরাশ মন খারাপ বৃথা লুকানোর চেষ্টা করল মীরা। তবে সে সফল হলো না বোধহয়। উশান ঠিকই বুঝে নিল তার মন খারাপ। মাত্রই শাওয়ার নিয়ে বেড়িয়ে সে ইউনিফর্ম পড়ছিল।ঝকঝকে শুভ্র রাঙা ইউনিফর্ম। শেষ দু’টো বোতাম তাড়াহুড়ো করে লাগানো কালীন হাত দু’টো একটু একটু করে স্থির হয়ে আসলো তার। ধীরাজ পায়ে উশান এগোল মীরার নিকট। নিকটবর্তী পৌঁছে মীরার হাত দু’টো নিজের হাতের মুঠোয় নিল। জোড়াল শ্বাস ফেলে বলল,
-” দেখো মীরা! আমি মিশনে যাচ্ছি। সেখান থেকে ফিরে আসা না আসার ব্যাপারটা সম্পূর্ণ আল্লাহ তায়ালার হাতে থাকে। আমি নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলতে পারবোনা। তবে হ্যা, আমি এর আগেও মিশনে গিয়েছি। ফিরেও এসেছি তবে আহত হয়ে! কখনোবা সুস্থ রূপে। আমার সাথে যারা যেত হয় তারা সুস্থ ভাবে ফিরতো, নয়তো আহত কিংবা মৃ’ত্য রূপে। আমি আমার অভিজ্ঞতা, কনফিডেন্স থেকে বলতে পারি আমি ফিরবো। সুস্থ রূপেই! এখন যদি আল্লাহ চান আমি মারা যাই তাহলে মরে যাবো। বুঝেছ? ”
মীরাকে বিষন্ন দেখাল। উশান হতাশ হয়! মীরা কেন এমন? মেয়েটা কি বোঝে না উশান তার এই রূপ দেখে গেলে নিজের কাজে মনোযোগ দিতে পারবে না।
-” তুমি ম্যাচিউর মীরা! ১৮-১৯ বছরের কিশোরী মেয়েদের মতো আচরণ করবে না। আমি ফিরে আসি কিংবা না ফিরি! এটা তোমার ওপর কোনো প্রভাব ফেলবে না। গট ইট? হাহ্? ”
মীরা নম্র দেখাল। অত্যাধিক নম্র। সবসময় কঠিন দেখানো মীরাকে আচানক যেন পৃথিবীর সবথেকে নম্র মানুষটি মনে হলো। গাছপালা যেমন তার খাদ্য বস্তু রোদ, বাতাস, বৃষ্টি না পেলে নেতিয়ে যায় ঠিক তেমনি করে মীরা নেতিয়ে গেল। অবিন্যস্ত চাহনি মেলে আশেপাশে দেখে মাথা এলিয়ে দিল উশানের প্রশস্ত বুকে। দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরার চেষ্টা করল উশানকে। তবে সম্ভবপর হলো না। তার হাত দু’টো বেশ কাঁপছে। মীরা থেমে থেমে গলার স্বর নম্র করে বলল,
-” তোমার কিছু হলে আমি সত্যি সত্যিই সেই মূর্হতে মারা যাব আমি। ”
উশান বেফাঁস হলো। তৎক্ষনাৎ সে সামলালো নিজেকে। স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
-” টিপিক্যাল ওয়ার্ড’স। ”
মীরা ক্ষুদ্ধ হলো। রুষ্ট কন্ঠে শুধাল,
-” ইট’স নট টিপিক্যাল ওয়ার্ড’স। ”
উশান হেঁসে ফেলল। মীরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো,
-” ওকে! ওকে! ”
পরবর্তী কয়েক লহমা মীরা নিশ্চুপ রইল। কিছু বলার মতো খুঁজে পেল না। অথবা বলতে চাইল না। উশানও কথা বাড়ায়নি! হাত ঘড়ি দেখল সে। তার দেরী হচ্ছে। তবুও ইচ্ছে করছে না যেতে।এই মেয়েটা কে ফেলে যেতে হবে ভাবতেই তো কেমন তার বুকে মোচড়ঁ দিচ্ছে! শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আফসোস গুলো ছিল ক্ষনিকের। পরপর নিজেকে সামলে নিল সে৷ তাকে এসব কথা মানায়? কিছুতেই না!
গা ছমছম করা মৌনতায় ধস নামিয়ে মীরা হুট করে বলল,
-” আমি কখনোই নিজের থেকে কাওকে কক্ষনোই বেশি ভালোবাসি না জানো? কাওকে নিজের থেকে বেশি ভালোবাসা মানেই কষ্ট পাওয়া!সেই ব্যাক্তিটার চিন্তায় রাতদিন ডুবে থাকা। সে যদি কষ্ট থাকে তাহলে সেই মূর্হতটার মতো মারাত্মক মরণ যন্ত্রণাময় মূর্হত আরেকটাও নেই। আমি জানতাম এসব! তবুও কি করে নিজের থেকে বেশি আপনাকে ভালোবেসে ফেললাম বলুন তো? আপনার মতো নিষ্ঠুর – পাষাণ লোকটাকে আমার একটুও ভালোবাসা উচিত হয়নি একটুও না! ”
উশান মীরার নুইয়ে রাখা মুখোশ্রী চিবুক ধরে ওপরে তুলল। মীরা কাঁদছে না! তবে আঁখি দু’টো দীঘির পানির মতো টলমলে হয়ে। উশান গেলেই যে তারা অনুমতি পেয়ে টপটপ করে শ্যাম রঙা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে তা উশান জানা আছে।মীরা নিজেকে ধাতস্থ করল। তুলতুলে দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
-” আমার কপালে একটা চুমু খাও তো সময় নিয়ে। ”
নিঃসঙ্কোচ আবেদন, আকুতি। উশান এক মূর্হত দেরী না করে তাই করল। পাঁচেক মিনিট পর সরে এসে উঠে দাঁড়াল। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র হাতে নিয়ে কৃত্রিম বিরক্তি নিয়ে বলল,
-” আমার লেট করিয়ে দিলে মেয়ে! ”
যাওয়ার পথে উমাইশার সাথে কয়েকক্ষণ আলাপ করে, উজানকে মীরা – উমাইশার দায়িত্ব তুলে দিয়ে উশান যখন সবেমাত্র গাড়িতে উঠে বসল তৎক্ষনাৎ কোথা থেকে যেন মীরা ছুটে আসলো। উজান দাঁড়িয়ে ছিল বাহিরে। ভাইকে বিদায় দিতে। কবে না কবে আবার আসে উশান! মীরাকে ছুটে আসতে দেখা মাত্র উজান দু’জনকে স্পেস দিয়ে সরে গেল। উজান যেতেই মীরা উশানকে ঝাপটে ধরল! বলল,
-” জলদি জলদি ফিরে আসবে। ঠিক আছে? হুহ্?”
উশান অধর প্রসারিত করে হাসল। জবাব দিল,
-” আসবো! মাদকতাকে ফেলে কতক্ষণ দূরে থাকা যায়? বাসায় যাও এখন। ”
-” আপনি যেতে যেতে একটু থাকিনা। ”
উশান বিশেষ বারণ করল না। উজানকে ডাক দিল। উজান আসতেই দু’জন গাড়িতে বসে নিজ গন্তব্যে রওনা দিল। গাড়িটা চক্ষু আড়াল হওয়া অব্দি মীরা মূর্তির ন্যায় স্থির হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইল ক্ষণ কয়েক। সে বিমর্ষ গলায় শুধাল,
-” শেহজাদা ফিরে আসুক। সুস্থরূপে, অতি দ্রুত! ”
চলবে~
( রি -চেইক করিনি।..❤️)