Home "ধারাবাহিক গল্প ভালোবাসার শহরে ভালোবাসার শহরে পর্ব-০৮

ভালোবাসার শহরে পর্ব-০৮

0
255

#ভালোবাসার_শহরে
#ঈপ্সিতা_মিত্র

শরতের রং কি সুন্দর হয় না ! সোনালী রোদের রং | নীল মেঘের রং | হালকা সাদা তুলোর মতন কাশফুলের রং ! সবটা মিলিয়ে বছরের সেরা সময় লাগে পরিণীতার এই শরৎকালকে | মনে হয় এই দিনগুলোকে যদি ধরে রাখা যেত সারা বছর ! যদি এই শহরের চারিদিকের সাজ সাজ ভাব , মায়ের জন্য দিন গোণা , সবার হাসি মুখ , পুজো নিয়ে উৎসাহ , ভালো কিছু হওয়ার আশা , এই সব কিছুই যদি মাত্র এই একটা মাসের জন্য না থেকে সারা বছরের জন্য থাকতো ! তাহলে কি ভালোই না হতো ! ও ছোটবেলায় বাবাকে বলতো মাঝে মাঝে এই কথাগুলো ! এখনো মনে আছে ! এইসব শুনে কি হাসতো বাবা ! তারপর বলতো , ———– ” সারা বছর ধরে যদি শরৎকাল থাকে , তাহলে শরৎকালকে আর এতো ভালো লাগবে না কারোর ! কম সময়ের জন্য থাকে বলেই সবাই এই সময়টা পাওয়ার চেষ্টা করে | এতো অপেক্ষা করে | আসলে এটাই নিয়ম , সহজে পাওয়া জিনিস , সময় , মানুষ , কোনো কিছুরই দাম থাকে না বেশি | যার জন্য অপেক্ষা করতে হয় , সে-ই দামি হয় | বুঝলি |”

না , কথাগুলোর মানে সেদিন না বুঝলেও আজকাল বোঝে পরিণীতা একটু একটু | এই যেমন অনির্বাণ ! ও এতো দূরের বলেই হয়তো ওর হঠাৎ হঠাৎ কাছে আসাটা ভালো লাগে পরিণীতার | মনে হয় যদি সত্যি ওদের কোনো গল্প সম্ভব হতো ! যদি মাঝের এই দেয়ালটা না থাকতো ! যদি অনির্বাণ এতো বড়োলোক , এতো অধরা না হয়ে ওর মতন সাধারণ কেউ হতো ! তাহলে হয়তো জোর করে এইভাবে মনকে ঘুরিয়ে রাখতে হতো না | চাপা দিতে হতো না এই ফিলিংসগুলোকে | কিন্তু এইসব ভাবনার ভিড়ে আবার এটাও মনে হয় , যদি অনির্বাণ এতটা দূরের না হয়ে ধরা ছোঁয়ার মধ্যে হতো , তাহলে কি এই টানটা থাকতো পরিণীতার ! তাহলে কি আলাদা করে অনির্বাণের জন্য মন কেমন করতো ! না কি বাবার কথা অনুযায়ী দাম কমে যেত ছেলেটার !

আজ এই শরতের নীল আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে বাসের অপেক্ষা করতে করতে পরিণীতার এইসবই মনে হচ্ছিলো কেমন | আজ চতুর্থী | কলেজের ছুটি পড়লো আজ | আবার এক মাস বাদে দেখা হবে এই ক্লাসরুমগুলোর সঙ্গে | তবে শুধুই কি ক্লাসরুম ! এক মাসের জন্য তো অনির্বাণও দূরে থাকবে ওর থেকে | ছেলেটার ওই হঠাৎ হঠাৎ কাছে আসা , টুকরো টুকরো কথা , কিছুই থাকবে না এই এক মাসে ! কথাটা ভেবে আনমনে একটা মন খারাপ এসে জমলো যেন মনে | কিন্তু তখনই পরিণীতাকে অবাক করে ওর সামনে অনির্বাণ এসে হাজির | ওর ডিপার্টমেন্টের সবাই যদিও আজ ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছে | কিন্তু অনির্বাণ ইচ্ছে করেই যায়নি | ও জানতো পরিণীতার ক্লাস কটায় শেষ হবে আজ | তাই সময় মতন বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছে | কিন্তু পরিণীতা এরকম হঠাৎ অনির্বাণকে দেখে নিজের আনন্দটাকে আর লুকিয়ে রাখতে পারলো না কিছুতেই ! দুটো উজ্বল চোখ নিয়েই বললো ,

————— ” তুমি ! তোমার ক্লাস শেষ হয়ে গেছে ? ”

কথাটা শুনে অনির্বাণ ওর দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে বললো , ———- ” না হয়নি | কিন্তু আমি আজ একটা ক্লাস না করেই বেরিয়ে এলাম |”

এটা শুনে পরিণীতা একটু প্রশ্নবোধক চিহ্নের মতন মুখ করেই বললো , ———– ” ওহ , কেন ?”

অনির্বাণ এই প্রশ্ন শুনে একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেলে বললো , ————- ” আছে কারণ একজন ! আজ থাক , অন্য একদিন বলবো | কিন্তু তোমার সেই বন্ধুটা নেই আজ ? সে তো দেখি সারাক্ষণ তোমার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে !”

কথাটায় পরিণীতা একটু মুখটা অন্ধকার করেই বললো , ———— ” অর্না ! ও তো ওর মামারবাড়িতে | বর্ধমানে | পুরো পুজোটা ওখানে থাকবে | আমি যে কি করবো একা একা !”

এটার উত্তরে অনির্বাণ ওকে অন্য একটা প্রশ্ন করে উঠলো হঠাৎ , ———– ” কেন ? তুমি ঠাকুর দেখতে বেরোও না কোথাও ?”

পরিণীতা এর উত্তরটাও একটু ম্লান হয়ে দিলো | কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বললো , ———— ” বাবা যখন বেঁচে ছিল তখন ঘুরতাম অনেক | কিন্তু তারপর ! অর্না থাকলে তাও যাই টুকটাক এদিকওদিক | কিন্তু ও না থাকলে একা একা ভালো লাগে না | আর মা ও আসলে বাবা চলে যাওয়ার পর এই পুজোর দিনগুলোতে বেরোতে চায় না ঠিক !”

কথাগুলো নিজের মনেই বলে গেলো সেদিন পরিণীতা | কিন্তু খেয়াল করলো অনির্বাণও চুপ হয়ে গেছে হঠাৎ এইসব শুনে | আর তখনই বাসটাও চলে এলো | ওরা আর অপেক্ষা না করে বাসে উঠে বসলো | এখন রাস্তায় বেশ ভিড় | পুজোর মার্কেটিং নিয়ে সবাই ব্যস্ত | চলন্ত কলকাতাকে দেখতে দেখতে পরিণীতা এইসবই ভাবছিলো | তখনই অনির্বাণ বলে উঠলো ,

————- ” তুমি আমার সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরোবে ? এইবার পুজোতে ?”

পরিণীতা কথাটা শুনে জানলা থেকে মুখ ফিরিয়ে বেশ অবাক হয়ে অনির্বাণের দিকে তাকালো এখন | কি বলছে ছেলেটা হঠাৎ ! কিছুই যেন বুঝলো না ঠিক পরিণীতা | মানে হ্যাঁ, ওদের মধ্যে এতদিন টুকটাক কথা হয় ঠিকই | কিন্তু অনির্বাণ কখনো ওর ফোন নাম্বারটা অব্দি চায়নি ! সে আজ একসঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার কথা বলছে !

কথাগুলো ভাবতেই অনির্বাণ আবার বলে উঠলো , ————— ” কি হলো ? কি ভাবছো ? যাবে ?”

পরিণীতা কথাটা শুনে নিজের মনেই বললো , ———— ” আমি ! ঠাকুর দেখতে ! তোমার সঙ্গে ?”

অনির্বাণ এই প্রশ্নটা শুনে একটু দৃঢ় গলায়ই বললো , ————– ” কেন ? যাওয়া যায় না ? প্রব্লেম আছে কোনো ?”

পরিণীতা এর উত্তরে কিছুটা ভদ্রতা করেই বললো , ———– ” না না ! প্রব্লেম কিসের ! কিন্তু মানে আমার সঙ্গে তুমি কেন ঠাকুর দেখবে ? তোমার তো অনেক সার্কেল আছে বন্ধুদের , বাড়ির লোকের | তাদের সঙ্গে দ্যাখো | আমার সাথে ঠাকুর দেখতে গেলে অতটা মজা হবে না |”

অনির্বাণ এবার যেন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস নিলো নিজে | তারপর আলতো হেসে বললো , ————– ” তোমার সঙ্গে ঠাকুর দেখলে আমার ভালো লাগবে কি লাগবে না , সেটা তুমি নিজে বুঝবে না কি ! সেটা তো যে তোমার সঙ্গে যাচ্ছে সে বুঝবে | যাইহোক , তাহলে ওই কথাই রইলো | কবে কখন যাবো সেটা ফোন এ কথা বলে ডিসাইড করে নেয়া যাবে | তুমি আমার নাম্বারটা নাও |”

কথাটা বলেই অনির্বাণ পরিণীতার ফোন এ নিজের নাম্বারটা সেভ করালো সঙ্গে সঙ্গে | তবে ততক্ষণে রাসবিহারী চলে এসেছে | তাই রাস্তা আর কথা , দুটোই আজ এখানেই শেষ হলো দুজনের | কিন্তু পরিণীতার বাড়িতে এসেও ঠিক ঘোরটা কাটলো না | হঠাৎ অনির্বাণ ওর সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাওয়ার কথা বললো কেন ! ফোন নাম্বারও এক্সচেঞ্জ করলো ! ওই মাপা দূরত্বটাকে আজ ভাঙতে চেষ্টা করলো কেন অনির্বাণ ! কি কারণে এইভাবে কাছে এলো হঠাৎ ! তবে এইসব চিন্তার মধ্যেও মনে একটা আনন্দ না চাইতেও এসে জড়ো হচ্ছিলো ওর | ভেবেছিলো আবার এক মাস বাদে এই ছেলেটার সঙ্গে দেখা হবে হয়তো | কিন্তু ভাবনাটা মিললো না | অনির্বাণ নিজেই দূরত্বটা কমিয়ে দিলো |
আজ সপ্তমী | ঘুমটা ভেঙেছিল পরিণীতার সেই প্রত্যেকবারের মতন , ঢাকের আওয়াজে | সোনাঝুরি আর কলকাতা দুটো জায়গায় সব আলাদা হলেও এই শরতের সকালগুলো খুব এক | কথাটা ঘুম ভাঙতেই মনে হলো হঠাৎ | আর মনে হলো বাবার কথা | এই পুজোর দিনগুলোতে বাবাই তো আগে আদর করে ঘুম থেকে তুলতো ওকে | তারপর রেডি হয়ে একসঙ্গে মণ্ডপে যেত | কত অন্যরকম ছিল দিনগুলো ! এখন ভাবলে মনে হয় একটা রঙিন পৃথিবী | যাইহোক , তবে আজ অনির্বাণের সাথে বেরোনোর কথা আছে |তাই স্নান করে রেডি হয়ে আর মণ্ডপে গেলো না | রাসবিহারীর মোড়ের দিকেই পা বাড়ালো | আজ একটা লাল রঙের চুড়িদার পড়েছে ও | মা যতই টানাটানি থাক , পুজোতে ওকে ঠিক একটা শাড়ি , একটা চুড়িদার দেবেই ! তবে এবার পরিণীতাও দিয়েছে মা কে , একটা নতুন শাড়ি | টিউশনির টাকা জমিয়ে | শাড়িটা পেয়ে মায়ের মুখের হাসিটা ওর সারা জীবন মনে থাকবে ! যদিও এমন কিছু দামি শাড়ি না | তবে মা এমনভাবে ওকে জড়িয়ে ধরেছিলো যে মনে হচ্ছিলো যেন বিশাল দামি কোনো জিনিস গিফ্ট করেছে ! এইসব ভাবনার ভিড়েই হারিয়ে ছিল সেদিন, তখনই আকাশী পাঞ্জাবিতে অনির্বাণ ওর সামনে এসে দাঁড়ালো ভিড়ের মধ্যে থেকে | পরিণীতার কাছে হাসি মুখে এসেই বললো ও ,

——— ” হাই কতক্ষণ এলে ? রাস্তায় এতো জ্যাম ছিল বলে দেরি হয়ে গেলো আমার | সরি ..”

পরিণীতা এর উত্তরে ঘাড় দুলিয়েই বললো ,

——— ” না না , বেশিক্ষণ হয়নি এসেছি | সরির কিছু নেই !”

অনির্বাণ কথাটা শুনে অন্য একটা কথা বলে উঠলো ওকে ,

———– ” নতুন চুড়িদার ? খুব সুন্দর দেখতে |”

কথাটায় পরিণীতার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো এখন যেন | ও বেশ উচ্ছসিত হয়েই বললো ,

———– ” তাই ! এটা আমার মা দিয়েছে আমাকে | নিজে পছন্দ করে কিনে এনেছে | ”

অনির্বাণও এটা শুনে একটু তাল দিয়ে বললো , ———– ” ওই জন্যই ! মায়ের পছন্দ তো | সব সময় বেস্টই হয় |”

কথাগুলোতে পরিণীতার মুখে হাসি | ওর হঠাৎ খুব অন্যরকম লাগছিলো অনির্বাণকে | সবার থেকে আলাদা | আসলে আজ যখন সকালে বেরোচ্ছিল , মামী রান্নাঘর থেকে বলে উঠেছিল চুড়িদারটা দেখে , ” কত দাম হবে ! দেখে তো মনে হচ্ছে না ভালো কাপড় | কোনো ছোটোখাটো দোকান থেকেই কিনেছে মনে হয় তোর মা !”

কথাটায় পরিণীতার মুখটা অন্ধকার হয়ে এসেছিলো সেই সময়ে | ভাগ্গিস মা ছিল না সামনে | তাহলে খুব কষ্ট হতো মায়ের | আসলে মামা মামী এরা এরকমই | কথায় কথায় ওদের ছোট করা , ওদের নিজের অবস্থাটা বুঝিয়ে দেয়া . এগুলো ওদের স্বভাব | তাই অনির্বাণকে চোখে লাগছিলো খুব | মনে হচ্ছিলো এইসব তো অনির্বাণের না বললেও চলতো ! ওর এই সাধারণ ড্রেসটা নোটিশ করার মতন তো ছিল না ! তাও অনির্বাণ এইসব বলে বুঝিয়ে দিলো কারণ ছাড়াই কাউকে ভালো ফিল করানো যায় | যেটা সবাই পারে না !

চলবে।