#ভালোবাসার_শহরে ( অন্তিম পর্ব )
#ঈপ্সিতা_মিত্র
তবে সেদিন রাতে একটা ঘটনা ঘটেছিল , যেটা পরিণীতা কে নিজের আড়াল ভাঙতে বাধ্য করেছিল যেন । আসলে সেই রাতে ছোটু অনির্বাণের বাড়িতে খাবার ডেলিভারি দিয়ে আসার পর আনমনে পরিণীতাকে বলে উঠেছিল ,
————— ” ওই যে সেদিন টিউটোরিয়াল হোম এ যেই দাদাটাকে নিয়ে এসেছিলাম ! ওর শরীর খুব খারাপ জানো দিদি । ভীষণ জ্বর । খাবার দিতে গিয়ে দেখলাম , ঠিক মতন দাঁড়াতে অব্দি পারছে না ! বললাম বাড়ির লোকের যদি কোন নাম্বার থাকে তাহলে দিতে ! ফোন করে জানাবো । কিন্তু কি বললো জানো ! বললো ওর নিজের কোন লোক নেই ! কাউকে জানানোর মতন নেই না কি ! দাদাটা অনেক বছর ধরে একাই থাকে ! বুঝতে পারলাম না কিছু ! দেখে তো ভালো বাড়ির ছেলে বলেই মনে হয় । কি হয়েছে কে জানে ! ”
কথাগুলো শুনে পরিণীতার যেন কেমন ধাক্কা লাগলো হঠাৎ ! নিজের কেউ নেই মানে ! মা বাবা স্নেহা সবাই তো আছে অনির্বাণের ! তাহলে এরকম কেন বললো ! না কি পরিণীতার হিসেব এ কিছু ভুল হচ্ছে বুঝতে ! এই পাঁচ বছরে অনির্বাণের জীবনে কিছু কি বদলে গেছে ! যেটা পরিণীতা জানে না । কথাগুলো ভাবতেই খেয়াল হলো অনির্বাণের খুব জ্বর বললো না ছোটু ! কিন্তু আজ বিকেলে তো দেখা হয়েছিল । কলেজ মোড়ে । তখন তো খুব বৃষ্টি পড়ছিল ! তাহলে কি বৃষ্টিতে ভিজেই জ্বর এলো ছেলেটার ! কথাটা ভাবতেই মনে পরে গেল সেই পুরনো দিনের একটা ঘটনা । কলেজ থেকে ফেরার সময় সেদিনও তো খুব বৃষ্টি নেমেছিল । পরিণীতা দূর থেকে দেখেছিল অনির্বাণকে । ছেলেটা হাত দিয়ে নিজের মাথাটাকে বৃষ্টির জল থেকে আড়াল করার চেষ্টা করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিল বাস স্টপের দিকে । পরিণীতা তখনই জোরে পা চালিয়ে ওর কাছে গিয়ে ছাতাটা ধরেছিল অনির্বাণের মাথায় । সেদিনও বাসে উঠে অনির্বাণ কাশতে শুরু করেছিল না ! ওইটুকু বৃষ্টির জল লেগেই ছেলেটার সর্দি কাশি হয়ে গিয়েছিল ! পরিণীতা তো তাই বাস থেকে নেমে ছাতাটাও দিয়ে দিয়েছিল নিজের । তাহলে কি আজও সেরকম কিছু হলো ! কিন্তু আজ তো অনির্বাণ অনেক বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়েছিল বৃষ্টির মধ্যে । পুরো ভিজে গেছিল ও । পরিণীতা তো দূর থেকে দাঁড়িয়ে খেয়াল করেছিল , অনির্বাণ কাঁপছে ঠান্ডায় । কিন্তু সেই কলেজের দিনটার মতন আজ এগিয়ে যেতে পারেনি শুধু । আসলে একটা না দেখা কাঁচের দেয়াল আছে ওদের মাঝে । সেটা পার করতে পারেনি পরিণীতা । সেই জন্যই কি এতটা জ্বর এলো অনির্বাণের ! কথাগুলো ভেবে ও আর স্থির থাকতে পারলো না যেন ! কিছুতেই ছেলেটার কাছে না গিয়ে থাকতে পারলো না নিজে ! এতটা শরীর খারাপের মধ্যে একা আছে অনির্বাণ । ছোটু বাইরের লোক বলে হয়ত বাড়ির কারোর নাম্বার দেয়নি । পরিণীতা গিয়ে জোর করলে অনির্বাণ বাড়িতে খবর দেবেই নিজে। কথাটা ভাবতে ভাবতেই পরিণীতা প্রায় রাত ৯ টার সময় এসে হাজির হলো অনির্বাণের বাড়িতে । তারপর মনের সব দ্বিধা গুলোকে দূরে সরিয়ে এত বছরের তৈরি কাঁচের শক্ত দেয়ালটাকে ভেঙে কলিং বেল বাজালো পরিণীতা , অনির্বাণের দরজার ।
সেদিন তিন চারবার কলিং বেল বাজানোর পর অনির্বাণ ধীরে ধীরে এসে দরজা খুলেছিল ওকে । বুঝতে পারছিল না কে এলো এখন ! এই সময় তো কারোর আসার কথা নয় ! এসব ভাবনার ভিড়েই গায়ে চাদরটাকে ভালোভাবে জড়িয়ে আলতো পায়ে এগিয়ে গিয়েছিলো | কিন্তু দরজা খুলতেই ও স্তব্ধ হয়ে গেলো কিরকম | পরিণীতা ওর সামনে দাঁড়িয়ে | এতো রাতে ! পরিণীতাও অনির্বাণকে দেখে স্থির হয়ে গেলো কয়েক সেকেন্ড | অনির্বাণের মুখটা ভীষণ ফ্যাকাসে লাগছে এখন | পরিণীতা এটা দেখে চুপ থাকতে পারলো না আর ! ও নিজে থেকেই বলে উঠলো ,
———– ” তুমি ঠিক আছো ? তোমার খুব জ্বর হয়েছে শুনলাম !”
কথাটায় অনির্বাণ কয়েক সেকেন্ড সময় নিয়ে বললো একটু নিস্তেজ গলায় , ———– ” ঠিক আছি আমি | কিছু হয়নি |”
কিন্তু কথাটা বলেই ওর মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গেলো কেমন | অনির্বাণ ঠিক টাল রাখতে পারলো না নিজের | পরিণীতা ব্যাপারটা খেয়াল করেই ওর হাতটা ধরে নিলো এই মুহূর্তে শক্ত করে , আর অনুভব করলো অনির্বাণের শরীরের উত্তাপটা | পরিণীতা এবার বেশ জোরেই বলে উঠলো , ———– ” তোমার তো সত্যি খুব জ্বর ! ঠিক আছো মানে ! ভেতরে চলো |”
কথাটা বলে অনির্বাণকে ভেতরের ঘরে নিয়ে এলো ও একটু জোর খাটিয়েই | অনির্বাণ যদিও সেই সময়ে পরিণীতাকে বার বার বলছিলো চলে যেতে | আসলে এতদিন যখন সোনাঝুরি তে আসার পরেও পরিণীতা ওকে চিনেও চেনেনি , একবারও নিজে থেকে ওর সঙ্গে কথা অব্দি বলেনি ! তখন আজ ওর জ্বরের সময় পরিণীতার কনসার্ন কেয়ার অনির্বাণ আর চায় না | কথাটা ভেবেই ওকে সেদিন চলে যেতে বলেছিলো ছেলেটা | কিন্তু পরিণীতা সেই সবে কান না দিয়েই অনির্বাণকে ধরে সাপোর্ট দিয়ে ঘর অব্দি নিয়ে এসেছিল । তারপর ওকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলে উঠেছিল ,
———- ” তোমার বাড়ির নাম্বার দাও | তোমার মা কে ফোন করে জানাই | এতো জ্বরের মধ্যে এখানে পরে আছো একা একা ! এটা ঠিক না |”
কথাটা বলে পরিণীতা খেয়াল করেছিল অনির্বাণ যেন কিরকম নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে | কথাগুলো জড়িয়ে আসছে ওর | চোখ দুটো বুঁজে আসছে জ্বরের ঘোরে | তার মধ্যেই অনির্বাণ আস্তে গলায় বলে উঠলো , ————— ” কেউ নেই জানানোর মতন ! আমি পাঁচ বছর ধরে একা থাকি | মা বাবাকে আমার কোনো ব্যাপারে জড়ানোর দরকার নেই | ওরা, ওরা ওদের মতন ভালোই আছে | ”
কথাটা শুনতেই পরিণীতার কিরকম ধাক্কা লাগলো যেন | কি বলছে এইসব অনির্বাণ ! একা থাকে মানে ! তবে ও এবার একটু ভেবে বলে উঠলো ,
————— ” তাহলে স্নেহার নম্বর দাও | ও আজ জানলে কাল ঠিক চলে আসবে তোমার কাছে ! ”
এই কথাটায় অনির্বাণ জ্বরের ঘোরের মধ্যেও শক পেলো একটা | ও এলোমেলো হয়ে কেমন রেগেই বললো , ———– ” স্নেহা ! স্নেহা কেন আসবে আমার কাছে ! কে ও ! আর আমার জ্বর তো ওর কি ?”
পরিণীতা কথাটায় কিরকম আকাশ থেকে পড়লো ! ও নিজেও অবাক হয়ে বললো , ————- ” তোমার বিয়ে হয়নি স্নেহার সঙ্গে ? তোমার মা যে বলেছিলো তুমি নিউইয়র্ক থেকে ফিরলেই তোমাদের বিয়ে দিয়ে দেবে ! ”
কথাটায় অনির্বাণ এবার কিরকম ক্লান্ত স্বরে বললো , ————- ” মা বললো ! আর তুমিও বিশ্বাস করলে ? আমাকে একবারও জিজ্ঞেস, জিজ্ঞেস পর্যন্ত করলে না কিছু ! ”
তবে না | কথাটা শেষ করে অনির্বাণ আর কিছু এক্সপ্লেন করতে পারলো না পরিণীতাকে | ওর শরীরের সব শক্তি যেন শেষ বলে মনে হচ্ছে ! অনির্বাণ এর এতো ক্লান্ত লাগছে যে চারিদিকটা ঝাপসা হয়ে এলো ওর | কালো অন্ধকার জমে উঠলো চোখের সামনে হঠাৎ | পরিণীতা এবার খেয়াল করলো অনির্বাণের আর কোনো সেন্স নেই | ছেলেটা পরিণীতার সামনে নিস্তেজ হয়ে গেল হঠাৎ।
” অনির্বাণ কি হয়েছে? কথা বলো আমার সাথে প্লিজ, ওঠো প্লিজ। ”
অনির্বাণ কে এই অবস্থায় দেখেই পরিণীতা ওর গালে মারতে মারতে কথাগুলো বলে উঠলো। আপ্রাণ চেষ্টা করলো ওকে জাগিয়ে তোলার। চোখে মুখে জল ছিটিয়ে, হাতের তালুতে হাত ঘোষে যেভাবে সম্ভব অনির্বাণকে জাগিয়ে তোলার!
আসলে এইভাবে ছেলেটাকে দেখে সবটা ওলোট পালোট হয়ে যাচ্ছে ওর। এতটা নিস্তেজ ও কোনোদিন অনির্বাণকে দেখেনি! কেমন যেন ভয় এসে ভিড় করছে মনে। ভালোবাসার মানুষকে হারিয়ে ফেলার ভয়। ছেলেটা তো এতদিন কত কথা বলার চেষ্টা করেছে! কিন্তু পরিণীতা বার বার ফিরিয়ে দিয়েছে ওকে, অচেনা হয়ে থেকেছে। আর আজ অনির্বাণ ওকে ফিরিয়ে দেবে না তো! নিজেকে শেষ করে! না না, কি সব ভাবছে ও। যেভাবেই হোক ছেলেটাকে সুস্থ করতে হবে।ও এবার অনির্বাণের হাতটা ধরেই ডাক্তারকে কল করলো |
তবে পরিণীতারও ঠিক মাথা কাজ করছে না এখন ! অনির্বাণ যা বললো সেটা কি ঠিক ! তাহলে কি ওর বিয়ে হয়নি স্নেহার সঙ্গে ! পরিণীতা অনির্বাণকে ভুল বুঝেছে এতদিন ধরে ! আর মা বাবার ব্যাপারে কি বললো ! যোগাযোগ নেই কোনো পাঁচ বছর ধরে ! কথাগুলো জানার পর পরিণীতা কিছুতেই আর স্থির থাকতে পারলো না | নিজের ওপরই ভীষণ রাগ হচ্ছে যেন | এতদিন হলো ছেলেটা সোনাঝুরিতে আছে , কিন্তু পরিণীতা একবারও ভালো করে কথা অব্দি বললো না ! এমন কি আজ এই বৃষ্টির দিনে যখন দেখলো যে অনির্বাণ ঐভাবে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিজছে , তখনও এগিয়ে গেলো না ! অনির্বাণ তো কিরকম থমকেই তাকিয়ে ছিল ওর দিকে | কিন্তু পরিণীতা সেই দৃষ্টিটা দেখেও অদেখা করে দিলো ! কথাটা ভাবতে ভাবতেই ওর অনির্বাণের নিস্তেজ শরীরটার দিকে চোখ চলে যাচ্ছিল | ছেলেটার ফ্যাকাসে মুখ পরিণীতাকে আরোও থমকে দিচ্ছিলো কেমন ! তারপর সেই সারা রাতটাই রইলো ও অনির্বাণের বাড়িতে | ওষুধ কিনে আনার ব্যবস্থা করা থেকে ওর মাথায় জল পট্টি দিয়ে জ্বর কমানোর চেষ্টা , সবই করলো পরিণীতা রাত জেগে | ছোটুকে এর মধ্যে ডেকে নিয়েছিল যদিও | রাতে যদি কোনো দরকার লাগে ! কিন্তু ছোটু অনির্বাণের কাছে থাকবে , এটা বলার পরও পরিণীতা ওর পাশ ছেড়ে ওঠেনি | সব সময় অনির্বাণের হাত ধরে বসেই ছিল কেমন | আসলে কিরকম কষ্ট হচ্ছিলো পরিণীতার আজ ছেলেটার জন্য | বার বার মনে পড়ে যাচ্ছিলো ওর অসহায় দৃষ্টিটা ! যেন কত কি বলার ছিল পরিণীতাকে অনির্বাণের ! কিন্তু পরিণীতা ওকে কোনো সুযোগই দিল না | একবারও অনির্বাণের দিকটা শোনার চেষ্টা করলো না কখনো | আজ অনির্বাণকে এরকম নিস্তেজ অবস্থায় পরে থাকতে দেখে ওর খুব মনে হচ্ছে , একবার যদি ছেলেটা ওর সঙ্গে কথা বলে ! একবার যদি ওর দিকে তাকায় ! ওর কাছে আসে ! তাহলে পরিণীতা আর কখনো হয়তো যেতে দেবে না অনির্বাণকে | কখনো ওকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখবে না | সেই রাতে সারাক্ষণ পরিণীতা এইসবই ভেবে গেছিলো এক মনে | জ্বরের ঘোরে বার বার কেঁপে কেঁপে উঠছিল অনির্বাণ। পরিণীতা সেই সময় ওর হাতটা শক্ত করে ধরে বোঝানোর চেষ্টা করছিল অনির্বাণ আর একা নেই। পরিণীতা আছে কে
ওর সাথে। তারপর ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটেছিলো সোনাঝুরিতে | অনির্বাণের জ্বরটাও নেমে এসেছিলো অবশেষে | তবে সেদিন চোখ খুলে পরিণীতাকে দেখে অনির্বাণ সত্যি চমকে গেছিলো | কিন্তু ও পরিণীতাকে কিছু বলার আগেই পরিণীতা বলে উঠেছিল , ———- ” শরীর কেমন লাগছে ? জ্বর নেই তো ?”
কথাটা বলেই ওর মাথায় হাত দিয়েছিলো নিজে থেকে | তখন অনির্বাণ ওর হাতটা সরিয়ে বলেছিলো একটু কঠিন গলায় ,
———— ” তুমি কি পাগল হয়ে গেছো ? সারা রাত আমার বাড়িতে এসে থাকলে ? ওই ছেলেটা জানলে কি হবে ! তোমাদের তো মনে হয় বিয়েরও ঠিক | আমার মতন একটা ভ্যালুলেস মানুষের জন্য কেউ এইসব করে না কি !”
শেষ কথাগুলো যে অনির্বাণ একটা চাপা রাগ থেকে বলছে , এটা পরিণীতা বুঝেছিলো | কিন্তু ও আর চুপ না থেকে আস্তে গলায় বলেছিলো ,
———— ” সৌম্য আমার শুধু ভালো বন্ধু হয় | আমাদের মধ্যে কিছু নেই | সেদিন আমি যা বলেছিলাম বানিয়ে বলেছিলাম | আসলে আমি ভেবেছিলাম তোমার আর স্নেহার রিলেশন আছে ! তোমার মা আমাকে এটাই বলেছিলো যে তোমাদের না কি বিয়ের ঠিক | তোমার নিউ ইয়র্ক থেকে ফেরার পরই বিয়েটা হয়ে যাবে | তাই আমিও বানিয়ে ঐসব !”
ওর কথাটা এবার মাঝ পথেই থামিয়ে দিলো অনির্বাণ | ও একটু উত্তেজিত হয়ে উঠে বসে বললো ,
————– ” মা তোমাকে এইসব বলেছিলো ! আর তুমি কি সেই জন্য আমার সঙ্গে আর কোনো কন্ট্যাক্ট করোনি ! সেই জন্য সোনাঝুরিতে দেখা হওয়ার পরেও কথা বলোনি একবারও ?”
কথাগুলো বলতে বলতে অনির্বাণ কিরকম নিজের মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়লো কিছুক্ষণ | আসলে ও আজ বুঝলো এই পাঁচ বছরের নিঃস্তব্ধতার কারণটা ! পরিণীতার ফিরে না তাকানোর কারণটা | পরিণীতা তখন আস্তে গলায় বলে উঠলো , ———— ” সেদিন তোমার মা এমন কিছু কথা বলেছিলো আমাকে যে আমি তারপর আর কোনো কিছু যুক্তি দিয়ে চিন্তা করতে পারিনি | নিজের গাড়িতে বসিয়ে আমাকে এই কথাটাও বলেছিলো যে আমি আর আমার মা না কি ছেলেদের ফাঁসিয়ে টাকা রোজগার করি ! সেদিনের সেই অপমানটার পর আমার আর কিছু ভাবার অবস্থা ছিল না ! আর বাড়ি ফিরে দেখেছিলাম মামাও মার্ গায়ে হাত তুলেছে | রক্ত পড়ছিলো কপালটা কেটে গিয়ে | সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল কলকাতা আমাদের জায়গা নয় | ওই শহরে কেউ নেই যে নিজের | তাই আমি আর মা সোনাঝুরি ফিরে এসেছিলাম | তবে আজ , এই পাঁচ বছর বাদে মনে হচ্ছে , একবার তোমার সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল ! একবার তোমাকে সত্যিটা জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল আমার !”
কথাগুলো কেটে কেটে বলেছিলো পরিণীতা | তখন থমকে থাকা গলায় ভীষণ ক্লান্ত ভাবে উত্তর দিয়েছিলো অনির্বাণ একটা দীর্ঘ্যশ্বাস ফেলে ,
————- ” তোমাকে ফোন এ না পেয়ে , মেল্ করে যোগাযোগ করতে না পেরে আমি দু মাস বাদেই নিউইয়র্ক থেকে কলকাতা ফিরে এসেছিলাম | কিন্তু ততদিনে তুমি কলকাতা ছেড়ে দিয়েছিলে ! আমি কলেজে গিয়ে অর্নার কাছে শুনেছিলাম সব | আমি সত্যি জানতাম না মা তোমাকে ঠিক কি কি বলেছে | তবে মায়ের সাথে কথা বলে বুঝেছিলাম যে মা কতটা খারাপ কথা বলতে পারে একজনকে , শুধুমাত্র তার ক্লাস , তার স্ট্যাটাস আলাদা বলে ! আমি সেইদিনই ওই বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম | মা ববাবা তারপর অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে আমার সঙ্গে ! কিন্তু আমি কখনো ফিরে যাইনি | ”
কথাটা বলে অনির্বাণ থেমেছিল একটু । পরিণীতার এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে কোন অর্ধেক পড়া বই এর গল্প শুনছে যেন। যেই বই এর একটা দিকই শুধুমাত্র পড়েছে পরিণীতা । বিপরীত দিকটা তো অজানাই । কথাটা ভাবতে ভাবতেই ও অনির্বাণ কে জিজ্ঞেস করে উঠলো ,
————– ” আর নিউইয়র্ক ? ওখানে যাওনি আর ! আর তোমার পড়াশোনা , পিএইচডি ?”
কথাটার উত্তরে অনির্বাণ আস্তে গলায় বলে উঠলো, ————” যাদবপুর থেকে পি.এইচ.ডি কমপ্লিট করেছি | নিউইয়র্ক আর ফিরে যাওয়ার কথা ভাবতেও পারিনি । কলকাতা আসলে তাও একটা স্মৃতির শহর ।আর স্টাইফেন এর টাকায় চলে যেত আমার ঠিকভাবেই ! কিন্তু এর মধ্যে আমি অনেক খোঁজার চেষ্টা করেছি তোমাকে | তোমার মামার বাড়িতে গেছিলাম প্রথমে | কিন্তু ওখানে কাউকে পাইনি | ওরা বাড়ি চেঞ্জ করে চলে গেছিলো ততদিনে অন্য জায়গায় | এরপর দু একবার তো সোনাঝুরিতে এসেও এদিক ওদিক ঘুরেছি | যদি কখনো দেখা হয়ে যায় এই ভেবে ! কিন্তু সেই সময় এটা ভাবিনি যে দেখা হলে তুমি আর চিনতে পারবে না আমায় ! কথা বলতে চাইবে না একটুও !”
কথাগুলো বলে আবার থামলো কিছুক্ষণ অনির্বাণ | তারপর নিজেকে কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে বললো ,
———– ” মা তোমাকে আমার আর স্নেহার ব্যাপারে যা বলেছে , সেটা অর্ধেক সত্যি | আসল কথা হলো স্নেহার বাবা মা এসেছিলো আমার নিউইয়র্ক যাওয়ার আগের দিন , সম্বন্ধ নিয়ে | আমাদের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলতে | কিন্তু আমি শুনেই না বলে দিয়েছিলাম | বিয়ের কোনো কথা এগোতেই দিইনি কখনো ! ”
কথাটা শুনে পরিণীতা ঠিক কি বলবে এরপর বুঝতে পারছিলো না | এতো ভুল বুঝেছে ছেলেটাকে ! দিনের পর দিন ওকে নিজের কাছে আসতে দেয়নি ! কোনো যোগাযোগ রাখেনি | আর অনির্বাণ ! অনির্বাণ এরপরেও এই পাঁচ বছরে ওকে এতো খুঁজেছে ! দেখা হওয়ার পর কথা বলার চেষ্টা করেছে | পরিণীতার জন্য এমন কি নিজের মা বাবার সঙ্গেও সম্পর্ক রাখেনি ছেলেটা ! শুধুমাত্র ওকে ভালোবাসে বলে | কথাগুলো ভেবে হঠাৎ চোখে জল জমলো ওর | বুঝতে পারছিলো না এতো ভুল বোঝার পর কিভাবে ফিরে যাওয়া যায় ! কিভাবে বলা যায় , ‘ভালোবাসি’ |
কিন্তু সেই মুহূর্তে অনির্বাণই বলে উঠেছিল , ———- ” আই এম সরি .. আমার মা যা যা বলেছে , সেই সবের জন্য | আর ভুল কিছুটা আমারও ছিল | আমার নিউইয়র্ক যাওয়ার আগেই আমাদের রিলেশনের ব্যাপারে বলে দেয়া উচিত ছিল | তাহলে যা রিয়্যাক্ট করার , আমার ওপর করতো | তোমাকে এইভাবে একা ডেকে এতো বাজে কথা বলতো না ! ভেবেছিলো আসলে আমি বাইরে আছি | এই সুযোগে তোমাকে ইনসাল্ট করে সম্পর্কটা ভেঙে দেবে আমাদের | আর সেটাই হলো | পাঁচ বছর কিভাবে শেষ হয়ে গেলো আমাদের ! ”
কথাটার উত্তরে পরিণীতা এরপর আর চুপ থাকতে পারলো না | অনির্বাণের হাতটাকে নিজের কাছে শক্ত করে ধরে বললো ,
————- ” আমারও ভুল | আমি সব বিশ্বাস করেছি | কখনো তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করিনি | আমি যদি একবার কথা বলতাম নিজে , তাহলে হয়তো এইভাবে পাঁচ বছর শেষ হতো না আমাদের | ”
কথাটা বলে পরিণীতা কেঁদে ফেললো এবার নিজের মনে | আর পারছে না এই ভেতরের কষ্টটাকে আটকাতে | এতো বছরের জমা দম চাপা যন্ত্রণাটা বেরিয়ে আসছে এবার , চোখ ঝাপসা করে | কিন্তু অনির্বাণ আর ওকে এইভাবে অন্ধকারের মধ্যে থাকতে দিলো না | হঠাৎ আঁকড়ে ধরলো পরিণীতাকে নিজের সমস্তটা দিয়ে | তারপর আস্তে গলায় বললো ,
————– ” পাঁচ বছর শেষ | কিন্তু জীবনটা , এখনো আছে | তাই সময়ও হয়তো আছে | আরেকবার নতুন করে শুরু করার | সোনাঝুরিতে | ”
কথাটায় পরিণীতা আর কিছু বলতে পারলো না এই মুহূর্তে | শুধু নিঃশব্দে ভেজা চোখে জরিয়ে থাকলো অনির্বাণকে | আসলে অনেকদিন বাদে এই স্পর্শটা পেলো ও ! সেই কলেজের ক্রাশ , পুরোনো ক্লাসরুম , বৃষ্টি ভেজা বাস স্টপ পেরিয়ে , অবশেষে সত্যি এই ছেলেটা এলো ওর জীবনে | একটা না হওয়া গল্পকে পূরণ করতে |
—————–( সমাপ্ত )—————–

