#অনুভবে_শুধুই_তুমি
#রুখসাত_রুষা
#পর্ব৩৫ (অন্তিম পর্ব)
***********************************
পূর্ণিমা রাত। অন্যান্য রাতের তুলনায় এ রাতের চাঁদের আলো ধরনীর বুকে একটু বেশিই ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ণিমার এই রাত যেন আকাশের এক নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি। চাঁদ আজ তার সমস্ত আলো উজাড় করে দিয়েছে পৃথিবীর সামনে, আর অন্ধকারও যেন অভিমান ভুলে তাকে সাদরে জায়গা করে দিয়েছে।
চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করতে থাকা ছাঁদের পরিবেশটাও এখন এক গভীর নীরবতার রূপ ধারণ করে আছে। মৌ এর ছবি এবং ডায়েরিটা টা হাতে নিয়ে বসে আছে মাহির। তাঁর পাশেই বসা তাঁর অষ্টাদশী কন্যা মিহিরিমা জান্নাত মিতা। মেয়েটার চোখ বেয়ে টুপটুপ করে পানি পরছে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে সে। কান্নার তালে তালে শরীর কাঁপছে বারবার। মাহির ওর হাতটা মিতার মাথায় রাখলো। তারপর মুচকি হেঁসে বললো….
—– তোমার মায়ের ক’বরের মাটি ছুঁয়ে ওয়াদা করেছিলাম পরকালে আমাকে চাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর সাথে অন্যকোনো অংশীদার থাকবে না। পূর্ণ অধিকার নিয়ে সে আমাকে চাইতে পারবে। । তাহলে তোমার কথা কি করে রাখবো মিতা? তুৃমি তো আমার মিতা, আমার বন্ধু তুমিও যদি আমাকে না বোঝো তাহলে কে বুঝবে আমাকে? আমি তো তোমার মাকে আমার অপেক্ষায় থাকতে বলেছিলাম। সে তো আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমরা এ জীবনে শুধুমাত্র তিনটি বছর কাটিয়েছি একসাথে। কিন্তু পরকালে সারাজীবন একসাথে থাকবো বলে ওয়াদা বদ্ধ হয়েছি আমরা। তাই তোমার চাওয়া পূর্ণ করা সম্ভব নয় আমার। আমি তোমার মায়ের ক’বরের মাটি স্পর্শ করে করা প্রতিজ্ঞা ভাঙতে পারবো না মা। কখনোই না।
বাবার এমন কথায় আবারো কেঁদে উঠলো মিতা। সে তো চেয়েছিলো তাঁর বাপি নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিক। তাঁর ও একজন জীবনসঙ্গী হোক। একা একা আর কতো? তাঁকেও ভালোবাসার মতোন একজন মানুষ এসে তাঁর জীবনটা গুছিয়ে দিক কিন্তু আজ যখন বাপির মুখ থেকে সবকিছু শুনলো তখন আর সেই কথা বলার মতোন সাহসই হচ্ছে না। বাপি ওর মাকে ঠিক কতোটা ভালোবাসে এতোদিন তাঁর আন্দাজও করতে পারেনি। সবসময় ভেবে এসেছে ওর বাপি ওর জন্য বিয়ে করতে রাজি হয়না। সৎ মা কখনো নিজের মায়ের মতোন হয় না। এসব ভেবেই হয়তো বাপি বিয়ে করেনি। কিন্তু ওর বাপি যে ওর মাকে দেওয়া ওয়াদা পূর্ণ করতে বিয়ে করছে না সেটা আজ জানলো।
আজ মিতার আঠারো তম জন্মবার্ষিকী। সাথে মৌ এর আঠারো তম মৃ’ত্যুবার্ষিকীও। মেয়ের জন্য মাহির প্রতিবছর কেক আনে ঠিকই কিন্তু কখনো ধুমধাম করে জন্মদিন পালন করে না। সব সময় বাড়িতে খতম পড়ানো হয় এবং এতিমদেরকে খাওয়ানো হয়। আর সন্ধ্যার সময় মিতা নিজ পরিবারের সামনে একটা কেক কাটে। আঠারো বছর ধরে মেয়ের জন্মদিন এভাবেই পালিত হচ্ছে। আগামীকালও এমন করেই পালিত হবে সব। কিন্তু প্রতিবারের মতোন রাত বারোটায় একটা কেক কাটে মিতা। সেটা আনে মিতার দাদুভাই। আজও ব্যতিক্রম হয়নি। দুই দীদা মিলে মিতার পছন্দের পায়েস বানিয়েছে এবং দাদুভাই কেক এনেছে।
এবারও কেক কাটার সময় যখন মাহির জিজ্ঞেস করলো তোমার কোনো ইচ্ছে আছে মা, তখন মিতা বলেছিলো…..
“আমার একটা মা চাই। অনেক তো হলো বাপি, আমিও এখন বড় হয়ে গেছি। নিজেকে সামলাতে পারি। এবার প্লিজ তুমি নিজের জন্য ভাবো। একটা জীবনসঙ্গী নিয়ে এসো”
মাহির তখন আর কিচ্ছুটি বলেনি। শুধু বলেছিলো খাওয়া দাওয়া শেষ করে ছাদে আসবে তোমাকে আজ একটা গল্প শুনাবো।
বাপির মুখ থেকে বাপি আর মায়ের গল্প শুনে এখন সমানে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। রুখসাত রুষা পেইজে ফলো এবং লাইক দিয়ে নতুন নতুন গল্প পেতে পাশে থাকুন।
সেদিনের পর মাহির মিতাকে নিয়ে মৌদের বাড়িতে চলে এসেছিলো। সাথে এসেছে মুজাহিদ আহমেদ, রেহানা খান,তানিশা আহমেদ এবং মিম, মিতু। মুশতাক আহমেদকে যেনো একঘরে করে দিয়েছিলেন তাঁরা। মুশতাক আহমেদ শতবার চেয়েও তাঁদেরকে আটকাতে পারেন নি। মাহিরের সাথে সবাই চলে এসেছিলো। মাহির কাউকে না বলেনি এমনকি তানিশা আহমেদকেও না। সবার সাথে মিলে মেয়েকে বড় করেছ। নিজের জীবনের সাথে দ্বিতীয় কাউকে জড়ায়নি।
ওরা চলে আসার কয়েকমাস পরেই মুশতাক আহমেদ বিছানা শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। ইন্ডিয়াতে গিয়ে তাঁর কোলন ক্যান্সার ধরা পরেছলো। লাস্ট স্টেজ। তানিশা আহমেদ যখন শুনতে পেয়েছিলেন তখন তিনি স্বামীর কাছে ফিরে গিয়ে তাঁর সেবা শুশ্রূষা করেছিলেন। কিন্তু মন থেকে তাঁকে মাফ করেন নি। তাঁর দেড় বছরের মাথায় মুশতাক আহমেদও পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। তবে মৃত্যুর আগে সবার কাছে মাফ চেয়েছিলেন তিনি। নিজের কৃতকর্মের জন্য নিজের অসুস্থতা কে শাস্তি হিসেবেই নিয়েছিলেন ভদ্রলোক।
মুবিন কানাডাতেই বিয়ে করে সেটেল্ড হয়ে গেছে। দু বছরে একবার এসে সবার সাথে দেখা করে যায় বউ,বাচ্চাদের নিয়ে। সবকিছু জানতে পেরে নিজ বোনের উপর কুনজর দেওয়ায় আজও আফসোস করে ছেলেটা। আজও অনুতপ্ত হয় নিজের রক্তকে চিনতে না পারার আফসোসে। সেই সাথে ভাতিজিকেও চোখে হারায়। মিম আর মিতুরও বিয়ে হয়ে গেছে। বাচ্চাদের নিয়ে সুখে স্বামীর সংসার করছে তাঁরা। বছরে দু’বার এসে বেড়িয়ে যায় সবাই।
এদিকে কাঁদতে কাঁদতে বাপির কোলে দোলনাতেই ঘুমিয়ে গেছে মিতা। রেহানা খান এবং তানিশা আহমেদ ছাঁদে এসে দেখলেন মিতা ঘুমাচ্ছে আর মাহির ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। দু’জা এমন দৃশ্য দেখে মুচকি হাসলেন।
“কিরে! বাবা মেয়ে এখানে বসে থাকলে হবে? মিতা তো ঘুমিয়ে গেছে। ওকে শুইয়ে দে। তুই নিচে চলে যা। নয়তো কোমর ধরে যাবে এভাবে বসে থাকতে থাকতে।”
রেহানা খানের কথায় সহমত প্রকাশ করলেন তানিশা আহমেদ।
“ঠিকই তো ওকে এখানে ঘুম পাড়ালি কেনো? আর ঘুমাচ্ছেই যখন ঘুমাক। তুই যেয়ে নিচে ঘুমা। উঠলে আমরা ওকে নিয়ে আসবো।”
মাহির মুচকি হেসে বললো….
—— থাক না বড় আম্মু। কতোদিন পর এভাবে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে ঘুমাক। আমি ঠিক আছি। উঠলে নিচে নিয়ে আসবো। তোমাদের পিঠে বানানো শেষ?
“হ্যাঁ। মিম আর মিতুও নাকি আসছে। মুবিনের আসতে আসতে ভোর হবে। সেটাই বলতে এসেছিলাম। ”
——- ঠিক আছে। তবে মিতা কে কিন্তু জানিয়ো না। সারপ্রাইজ পাবে ও।
“আচ্ছা ঠিক আছে”
——————————–সমাপ্ত—————————-

