#স্নিগ্ধ_প্রেমাবেশ (০৮)
#জেরিন_আক্তার
[কার্টেসি ব্যাতিত কপি করা নিষিদ্ধ]
হিয়া শ্রাবণের কোলে থেকে নামলোই না। বসে আছে তো বসেই আছে। শ্রাবণ কি ঘুমাবে না ওর কি ঘুম পায়নি? ওর এখন মনে হচ্ছে হিয়াকে ভূতের ভয় দেখিয়ে ভুলই করে ফেলেছে। শ্রাবণ শুধানো গলায় বলল,
-“বউজান এখন তো বাজ পড়ছে না এখন একটু শুয়ে পড়ো। আমি কোথাও যাচ্ছি না তোমার পাশেই আছি। এই আমাকে ধরে রাখো।”
হিয়া শ্রাবণের কোলে থেকে নেমে পাশে গুটিশুটি মেরে শুলো। শ্রাবণ ল্যাম্প লাইট নিভিয়ে শুয়ে বলল,
-“তোমাকে জড়িয়ে ধরবো কি?”
-“হুম।”
-“পরে তো আবার এইটা নিয়ে ঝগড়া করবে না?”
হিয়া মাথা নাড়িয়ে বলল,
-“না, ঝগড়া করবো না।”
শ্রাবণ হিয়াকে জড়িয়ে ধরে মনে মনে বলল,
-“মিথ্যে বলে ভয় দেখিয়ে যদি বউকে এভাবে জড়িয়ে ধরার পারমিশন পাওয়া যায় তাহলে এরকম মিথ্যে তো হাজারটা বলাই যায়।”
সকালবেলা হিয়ার ঘুম ভাঙার পরে শ্রাবণকে পাশে দেখলো না। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসলো। ওর তখন আবার রাতের সেই কথা মনে পড়লো। এরপরে একটু নার্ভাস হয়েই বিছানায় থেকে নেমে ওয়াশরুমে এলো।
হিয়া ফ্রেশ হয়ে নিচে এলো। শ্রাবণ জিম করে এসে সোফায় বসে কথা বলছিলো তৌকির চৌধুরীর সাথে। হিয়া এগিয়ে এসে দাড়ালো। সাবিহা চৌধুরী হিয়ার মুখটা শুকনো দেখে বললেন,
-“কি হয়েছে মা?”
-“কিছুনা মা।”
-“শ্রাবণ কিছু বলেছে?”
-“না।”
হিয়া কিছু সেকেন্ড চুপ থেকে বলল,
-“মা এই বাড়ির পেছনে নাকি ভূত আছে?”
সাবিহা চৌধুরী হেসে বললেন,
-“কিহ ভূত? কই কোনো ভূত তো নেই?”
হিয়া শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“উনি যে বলল।”
শ্রাবণ সাথে সাথে বলে উঠল,
-“বাবাই তো আমাকে বলেছে। তাই তো তোমাকে বললাম।”
তৌকির চৌধুরী বোকা বনে চলে গেলেন। ছেলেকে ভূত সম্পর্কে কিছুই তো বলেননি। তাহলে!
শ্রাবণ তৌকির চৌধুরীকে চোখ মেরে বলল,
-“বাবা তুমি বলেছিলে না যে অনেক বছর আগে বাড়ির পেছনে একটা কাপল থাকতো। মেয়েটা তার স্বামীর সাথে ঝগড়া করতো বলে সেই ছেলে আত্মহত্যা করেছে। সেটাই তোমার বউমাকে বলছিলাম।”
তৌকির চৌধুরী মাথা নাড়িয়ে বললেন,
-“হ্যা হ্যা ঠিকই তো। হিয়া শ্রাবণ ঠিকই বলেছে। বিশ্বাস না হলে তোমার শাশুড়িকেও জিজ্ঞাসা করো সেই জানে।”
সাবিহা চৌধুরী হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন ওদের দিকে। বুঝতে পেরেছেন শ্রাবণ হিয়াকে মিথ্যে বলেছে যেনো ঝগড়া না করে। তাই বলে উনাকেও ফাঁসিয়ে দিলো।
অতঃপর ছেলের দিকটা বিবেচনা করে তিনিও তালে তালে হিয়াকে বললেন,
-“হুমম, ছিলো তো ভূত। তাই বলি তোমরা এতো ঝগড়া করো না।”
হিয়া একপাশে বসলো। শ্রাবণ মুখটিপে হাসলো।
…..
হিয়া ক্যাম্পাসে এসেছে অনেক দিন পরে। হিয়া, নেহা, সাথী, রাসেল মাঠেই বসেছে সবাই। নেহা রসিকতা করেই হিয়াকে বলল,
-“কিরে ভাই বিয়ের পরে তো দেখি আরও ব্রাইট করছিস। ব্যাপার কি?”
হিয়া ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বলল,
-“ভাই আর খেপাস না। বুঝতে পারিনি বজ্জাতটা এমন করে বিয়ে পর্যন্ত নিয়ে যাবে।”
রাসেল বলল,
-“তোর শশুর-শাশুড়ি কেমন রে? তারাও কি তোর জামাইয়ের মতো নাকি?”
-“উহু। আমার শশুর-শাশুড়ি ভালো। এদের মধ্যে রাগ আছে কিন্তু আমার উপরে কোনো রাগ দেখায় না। শরীরে ফুলের টোকাও লাগতে দেয়না। আমার দেবর আছে, নাম কাব্য। ও ভালো। আজকে আসবে দেখিস। আর ভালো না শুধু ওই লোকটা। সবসময় গম্ভীর হয়ে থাকবে। পায়ে পারা দিয়ে ঝগড়া করবে সবসময়।”
নেহা হিয়াকে ধাক্কা দিয়ে হেসে হেসে বলল,
-“এখন ঝগড়া এরপরে আস্তে আস্তে বন্ধুত্ব, এরপরে প্রেম, ভালোবাসা। এরপরে আরও কতো কি।”
-“এই থাম তো। বাজে বকিস না।”
ভার্সিটি ছুটির পরে হিয়া নেহার সাথে কথা বলতে বলতে ক্যাম্পাসের বাহিরে এলো। দেখলো কাব্য ওকে নিতে এসেছে। হিয়াকে বলল,
-“ভাবি চলুন।”
নেহা হিয়াকে বাই বলে চলে যাবে ঠিক তখন কাব্য নেহাকে বলল,
-“আপনিও চলুন সাথে। নামিয়ে দেই।”
নেহা হেসে বলল,
-“সমস্যা নেই। আপনারা যান।”
-“গেলে খুশি হতাম।”
-“থ্যাংকস। অন্য একদিন যাবো।”
-“ওকে।”
বিকেল বিকেলে ফাহিমা বেগম শ্রাবণের শার্টগুলো ছাদে থেকে নিয়ে আসে। ধুয়ে দিয়েছিলো। নিচে এনে আয়রন করে উপরে নিয়ে আসে। হিয়া ফাহিমা বেগমের হাতে শার্ট দেখে বলল,
-“আন্টি আমাকে দিতেন আমি আয়রন করে রাখতাম।”
ফাহিমা বেগম হেসে বললেন,
-“তুমি এখন নতুন বউ। কয়েকদিন যাক এরপরে করো। নাহলে তোমার শাশুড়ি আমায় বকবে।”
-“ঠিক আছে।”
-“তাহলে এগুলো নাও। কাভার্ডে তুলে রাখো।”
-“ঠিক আছে দিন।”
হিয়া শার্টগুলো কাভার্ডে তুলে রাখলো। এরপরে ওর ব্যবহৃত একটা শার্ট বের করে স্মেল নিচ্ছিলো। ভালোই স্মেল। হিয়া বিড়বিড় করে বলল,
-“কি যে পারফিউম নেয়, স্মেলটা মারাত্মক। বের করতে হবে পারফিউমের নাম কি?”
হিয়া ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে একে একে শ্রাবণের সবগুলো পারফিউম নিয়ে শুকে দেখছিলো। কিন্তু এই শার্টে যে পারফিউম সেটা পাচ্ছে না। ও শার্ট আলাদা করে রাখলো। শ্রাবণ এলে জিজ্ঞাসা করবে। নাহলে ওর পেটের ভাত হজম হচ্ছে না।
সন্ধ্যায় শ্রাবণ ফিরলো। শাওয়ার নিয়ে রুমে পা রাখতেই হিয়া কফি নিয়ে হাজির। অবশ্য এখন কফি ও খায়না। শ্রাবণ কাভার্ড খুলে শার্ট বের করতে করতে বলল,
-“এখন কফি খাইনা জানো না নাকি?”
হিয়া কপাল কুঁচকে। বলল,
-“আপনি এই টাইমে কি বাড়িতে থেকেছেন যে জানবো,দেখবো? খাবেন না যখন ঠিক আছে আমি খেয়ে নিলাম।”
-“ওকে, খাও।”
শ্রাবণ টিশার্ট পড়ে নিলো। হিয়া কফি রেখে সেই শার্টটা হাতে নিয়ে শ্রাবণের সামনে এসে বলল,
-“শুনুন!”
-“বলো!”
-“এই শার্টটায় থেকে যে স্মেল আসছে এইটার পারফিউম কোথায়?”
শ্রাবণ আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
-“খুঁজেছো নাকি?”
-“হুমম।”
-“পাওনি?”
-“না, সবগুলো পারফিউম শুকে দেখেছি একটাও মিলেনি।”
শ্রাবণ শার্টটা একটু সামনে নিয়ে বলল,
-“ও এই পারফিউম রুমে পাবে না। এটা গাড়িতে আছে।”
-“ওও। তাহলে এরপরে গাড়ির কাছে গেলে নিয়ে আসবেন।”
-“ঠিক আছে।”
হিয়া শার্টটা ভাজ করে কাভার্ডে রেখে দিলো। শ্রাবণ হেসে হেসে বলল,
-“এই শোনো আমার একটা পারফিউম ভালো লেগেছে। যা তোমার কাছে পাওয়া যাবে দিবে প্রতিদিন?”
-“আমি তো কোনো পারফিউম নিয়ে আসিনি। কোথায় পাবো। আর আপনাকে প্রতিদিন দিবো কি করে?”
-“আছে আছে।”
শ্রাবণ তড়িৎ পায়ে এগিয়ে এসে হিয়ার কানে ফিসফিস করে বলল,
-“রাতে যখন আমায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলে তখন তোমার নেক স্মেল নিয়েছিলাম। বিশ্বাস করো সেই পারফিউমটাই আমার চাই প্রতিদিন।”
হিয়া সরে গিয়ে বলল,
-“অসভ্য লোক। একটুও ভালো চিন্তা মাথায় নেই।”
পরদিন বিকেলে…
শ্রাবণ রনিকে ডাকে। রনি আসতেই বলে বসতে ইম্পরট্যান্ট কথা আছে। রনি বসলো। শ্রাবণ ভাবুক গলায় বলল,
-“আচ্ছা রনি মেয়েদের জেলাস ফিল করাতে কি করতে হয় একটা আইডিয়া দাও তো!”
রনি বাকা হেসে বলল,
-“স্যার আমি যা করি তা থেকে বলি।”
শ্রাবণ ভ্রু কুঁচকে নিয়ে বলল,
-“ও তোমার তো আবার ম্যানেজারের মেয়ের সাথে ইটিস-পিটিস। তো বলো কি করে জেলাস ফিল করাও।”
রনি উঠে দরজা লক করে দিয়ে এসে বসে গলা খাকারি দিয়ে বলল,
-“বলা তো যায়না আবার ম্যানেজার ঢুকে পড়বে, শুনেও নিবে।”
শ্রাবণ ঠোঁট চেপে হেসে বলল,
-“এবার বলো।”
রনি গড়গড় করে বলে উঠল,
-“স্যার যখন ব্যাস্ত থাকি তখন সে বোঝে যে আমি বিজি আর বিরক্ত করে না। তখন আমার রাগ হয়, আমার এই কাজের মাঝে ও কি এক্সট্রা কেয়ার করতে পারে না। এরপরে আমি আবার কল দিয়ে রাগ করেই বলি যে —শোনো কাজের অনেক চাপ। পরে ফোন করবো। ডিসটার্ব করবে না। আর নিজেকে রিফ্রেশ করতে একটু বারে যাবো। ও রেগে বলে, হ্যা তুমি বারে যাবে! কেনো যাবে? আমি কি ভালোবাসি না। তুমি বারে গেলে ব্রেকাপ, হ্যান-ত্যান। এরপরে স্যার বিশ্বাস করবেন না ও বারবার কল দিবে। আপনিও এটা ট্রাই করে দেখেন।”
শ্রাবণ ভাবুক গলায় বলল,
-“হুমম। ওয়েট এক্ষুনি কল দিচ্ছি। তবে ও যে ধারী লঙ্কা।”
চলবে….

