#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৪৯
ধীরে ধীরে কুয়াশার পাতলা পর্দা ভেদ করে দিগন্তে উঁকি দিল এক টুকরো কাঁচা সোনা রোদ। সেই প্রথম আলো যখন ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দুগুলোর ওপর পড়ল, মনে হলো যেন সবুজ মখমলের ওপর হাজারটা হিরে জ্ব’লজ্ব’ল করছে। শিউলি আর বকুল ফুলগুলো রাতের বেলা ঝরে পড়েছিল বাগানে, তাদের সুবাস ভোরের বাতাসে মিশে চারপাশটাকে এক স্বর্গীয় শান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছে।
এত শান্তিময় স্নিগ্ধ সকালের মাঝেও একজন রমণী তরতর করে ঘেমে চলেছে। দু’হাতে বিছানার চাদর খামচে ধরে ঘনঘন মাথা এদিকওদিক নড়াচড়া করছে। অজানা কারণে মেয়েটার সর্বাঙ্গ থরথর করে কাপছে। অস্ফুটস্বরে কিছু একটা বিরবির করছে। তখনো বাইরে থেকে মৃদুস্বরে গানের লাইন ভেসে আসছে। গানটা হঠাৎই বন্ধ হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে রমণী গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল,
-“ছায়াআআআআ…..!”
এক লাফে শোয়া থেকে উঠে আলো হাঁপাতে হাঁপাতে কেঁদে উঠল। ওর চিৎকার শুনে নিচ থেকে আধার হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে। মেয়েটার এমন অবস্থা দেখে তড়িঘড়ি করে কাছে এসে দুগালে হাত রাখতেই আলো হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-“ও…ওই লোকটা আমার বোনকে মে’রে ফেলেছে, ওই লোকটা আমার বোনের হৃদয়ে গু লি মে’রেছে। আ..আপনার বন্ধুর জন্য আ..আমার বোনটা শেষ হয়ে গেল। আমি ক..কাউকে ছাড়ব না, দুজনেই মে’রে ফেলব। ওরা আ-আমার নিষ্পাপ বোন কে মে’রে দিয়েছে।”
মেয়েটার কথা শুনে আধার চমকে উঠে বলল, -“এসব কি বলছো তুমি? মাথা ঠিক আছে? তোমার বোন ম রবে কেন, ও তো বেঁচে আছে, নিজের বাড়িতে আছে। আর কে তোমার বোনকে গু লি করবে, আশ্চর্য!”
-“আপনি মিথ্যে বলছেন, আমি নিজের হাতে আমার বোনের নিথর র’ক্তা’ক্ত শরীরটা এই বুকে নিয়েছি। ওরে কতবার ডাকলাম, কিন্তু আমার ডাকে একটুও সাড়া দিল না। ওখানে আপনিও তো ছিলেন, এখন মিথ্যে বলছেন কেন?”
আধার ব্যাপারটা বুঝতে পেরে মেয়েটাকে শান্ত করানোর চেষ্টা করে বলল, -“হঁশশ…রিল্যাক্স! তোমার বোনের কিচ্ছু হয়নি, ও একদম সুস্থ আছে। আর তুমি হয়তো কোনো বাজে স্বপ্ন দেখেছো! তাই এমন মনে হচ্ছে। তুমি একটু চারিদিকে তাকিয়ে দেখো, আমাদের রুমে আছো। আর তুমি গতকাল সন্ধ্যার দিকে সিঁড়ি থেকে পড়ে জ্ঞান হারিয়ে ছিলে, তারপর হাসপাতাল থেকে ভোর রাতে তোমাকে নিয়ে এসেছি। আর ওখান থেকে আসার সময় শুনেছিল, একজন মেয়ে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই মা’রা গেছে। হয়তো ওই ঘটনার জন্য তুমি দুঃস্বপ্ন দেখেছো। একটু মনে করার চেষ্টা করো, গতকাল কোথায় ছিলে! তাহলে বুঝতে পারবে।”
স্বামীর কথা শুনে আলো তড়িঘড়ি করে নিজের কপালে হাত রাখল, সেখানে ছোট্ট করে ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ করা। শরীর থেকে কম্ফোর্টার সরিয়ে ডান পায়ের প্লাজু হাঁটুতে তুলে দেখে, সেখানেও ব্যান্ডেজ করা। তারমানে লোকটা ঠিক বলছে? কিন্তু, তার বিশ্বাস হচ্ছে না। তাই সে বিচিলিত কণ্ঠে বলল,
-“আমার বোনের কাছে যাবো, আমাকে এক্ষুনি নিয়ে চলুন!”
-“তোমার শরীর ভালো নেই আর এই অবস্থায় কোথাও যেতে পারবে না।”
মূহুর্তেই আলো চেঁচিয়ে উঠল, -“তারমানে আপনি এতক্ষণ মিথ্যে বললেন? আমাকে দেখে আপনার পাগল মনে হয়?”
আধার নিজের কপাল চেপে ধরল। সে এ কোন পাগলের পাল্লায় পড়েছে? কোমা থেকে বেরিয়ে এসে মাথার তার আরো ছিঁড়ে গেছে মনে হয়। সে কিছু একটা ভেবে নিজের ফোন বের করে একজনকে ভিডিও কল দিল। কিছুক্ষণ পরই অপর প্রান্ত থেকে কল রিসিভ হতেই ফোনটা মেয়েটার মুখের সামনে ধরে বলল,
-“নাও, তোমার বোনের সাথে কথা বলো।”
ফোনের স্ক্রিনে ছোট বোনের ঘুমন্ত চেহারা ভেসে উঠতেই আলোর কান্না দিগুণ হলো। সাতসকালে বড় আপুকে কাঁদতে দেখে ছায়ার সব ঘুম হাওয়া হয়ে গেল। সে তড়িঘড়ি করে উঠে বসে চিন্তিত গলায় বলল,
-“কি হয়েছে আপু? তুমি কাঁদছো কেন? সব ঠিক আছে তো?”
আলো নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,
-“তুই ঠিক আছিস?”
-“আমার আবার কি হবে?”
আলো কিছু বলল না। আধার ফোনটা নিয়ে শালী সাহেবার উদ্দেশ্যে বলল, -“তোমার আপু তোমাকে নিয়ে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছে, তাই এমন করছে। আমি গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি, তুমি আজ একটু এখানে এসো। নয়তো তোমার আপু কেঁদেকুটে পুরো বাড়ি ভাসিয়ে দিবে।”
-“ঠিক আছে ভাইয়া। আর আপু? আমি একদম ঠিক আছি, তুমি চিন্তা করো না।”
আধার আরো কিছু বলে লাইন কেটে দিয়ে বউয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, -“এখন বিশ্বাস হয়েছে?”
আলো এগিয়ে এসে দু’হাতে স্বামীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে বলল, -“আমি জ’ঘন্য একটা স্বপ্ন দেখেছি, যেটা ভাবলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমি আমার বোনকে খুব ভালোবাসি, ওর কিছু হলে আমি সইতে পারব না। ও আমার খুব আদরের!”
আধার মেয়েটার মনের অবস্থা বুঝতে পারল। কারণ সেও নিজের বোনকে হারিয়েছে, তাই হারানোর যন্ত্রণাটা জানে। সে আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেয়েটাকে একহাতে আলিঙ্গন করে, অন্যহাতে মাথা বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,
-“ভয় পেও না, কোনো খারাপ কিছু হবে না। আর তোমার বোন তোমার কাছে সবসময় থাকবে।”
★
দশটার দিকে ছায়া খান বাড়িতে হাজির। ছোট বোনকে কাছে পেয়ে আরেকদফা কেঁদেছে আলো। সে ভীষণ ভয় পেয়েছে, নিজের বোনকে হারানোর ভয়। এত জঘ’ন্যরকম একটা স্বপ্ন কীভাবে দেখতে পারল, বুঝতে পারছে না। তার সাধ্য থাকলে, সে ওই নিকৃষ্ট কল্পনাকে স্মৃতির পাতায় থেকে মুছে দিত। কী ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন ছিল! এমন স্বপ্ন কোনো শত্রুকেও যেন না দেয়।
মেয়েটা গতকাল সিঁড়ি বেয়ে পড়ে যাওয়াতে আজ পুরো সিঁড়িতে কার্পেট বিছিয়ে নিয়েছে আধার। এই তিড়িংবিড়িং করা মেয়েটার হাতপা এখনো কন্ট্রোল করতে পারল না। সবসময় কিছু না কিছু অঘটন ঘটিয়ে বসে থাকবে। আজ খুব সকাল বেলায় তিথি এসেছে মাকে দেখতে। আর সে-ই রুমে বসে গান শুনছিল। আর সেগুলো মেয়েটা কল্পনা করছিল।
ছায়া নিজ হাতে আপুকে খাবার ও ঔষধ খাইয়ে দিল। আলো মুখ মুছে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“গায়ক মৃন্ময় আহমেদ রাজের অনুষ্ঠানে যাবি না তুই।”
বড় বোনের কথা শুনে ছায়া চমকে উঠল। অবাক কণ্ঠে শুধাল, -“কেন আপু?”
-“আমি না করছি তাই।”
-“কিন্তু…!”
-“কোনো কিন্তু নয়, ছায়া। তুই ওই লোকটার থেকে দূরে থাকবি।”
আলো শুনেছে, ভোরের স্বপ্ন মাঝেমধ্যে সত্যি হয়! তাই সে নিজের বোনকে নিয়ে কোনোরকম ঝুঁকি নিতে চায় না।
-“আমার খুব ইচ্ছে ছিল আপু, উনার সাথে আবারো দেখা করার।”
ছায়ার কথা শুনে আলো গম্ভীর কণ্ঠে বলল, -“উনাকে ভুলে যা।”
-“সম্ভব নয়!”
-“উনি কখনোই তোর হবে না, তোদের মাঝে বয়সের অনেক তফাৎ।”
ছায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, -“মাত্র বারো-তেরো বছরেরই তো গ্যাপ।”
আলোর রাগ হলো ভীষণ। এমনিতেই অশান্তিতে আছে, তারওপর এই মেয়েটা আবার ত্যাড়ামি শুরু করেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-“ওই লোকটাকে হাজারো মেয়ে চায়, এত এত বড়লোক পরিবারের সুন্দরী মেয়েদের রেখে তোর মতো একটা সাধারণ মেয়েকে উনি ভালোবাসবেন? এটা ভাবাও বোকামি। গিয়ে দেখ, উনার ভালোবাসার মানুষ অলরেডি আছে। তাই তো নিজের ফ্যানদের দিকেও তাকায় না। আর আমি শুনেছি, উনি অন্য একজনকে ভালোবাসেন। সেখানে তোর কোনো অস্তিত্ব নেই। বেশি বাড়াবাড়ি করলে, বাবাকে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করব, তখন এমনিতেই সব আবেগ বেরিয়ে যাবে।”
ছায়া মাথা নিচু করে ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকিয়ে রাখার বৃথা চেষ্টা করছে। একই সাথে আপু কথাগুলো শুনে বুকটা ফেটে যাচ্ছে। তারমানে তার প্রিয় মানুষটারও ভালোবাসার মানুষ আছে? একতরফা ভালোবাসা এত কষ্টদায়ক কেন? সে কেন ওই মরীচিকাকে নিজের মন দিতে গেল? তার আপু তো ঠিক কথায় বলেছে, এত এত মেয়ে থাকতে কেন তাকে পছন্দ করবে? কি আছে তার? কিছুই নেই। সে তো খুবই সাধারণ একজন মেয়ে, বেশি স্মার্টও নয়। ওই লোকটার সাথেও তাকে মানাবে না। সে শুধু শুধু এতগুলো বছর ধরে চাঁদকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে এসেছিল। যেটা বাস্তবে কখনো সম্ভব নয়।
ছায়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর ধীর কণ্ঠে বলল,
-“আমি বিয়ে করতে চাই আপু, তুমি বাবাকে বলে আমার বিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করো। স্বামী, সংসার পেলে নিশ্চয়ই ভুলে যাবো নিজের অবাধ্য অনুভূতিকে।”
আলো আনমনে বলল, -“রাত ভাইয়া যদি ভালো হতো, তাহলে তোকে আমার জা বানিয়ে এই বাড়িতেই নিয়ে আসতাম। তখন দুবোনে একসাথে থাকতে পারতাম।”
ছায়া কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, -“তুমি চাইলে বাবার কাছে রাত ভাইয়ার কথা বলতে পারো।”
-“অসম্ভব! বাবা যদি ওই লোকটার ব্যাপারে জানে, তাহলে আমাকে মে’রে ভর্তা বানিয়ে দিবে। আমি চাই, আধার স্যারের মতো কেউ তোর জীবনে আসুক। যার প্রথম ও শেষ ভালোবাসা শুধুই তুই হবি। তোর দুলাভাইয়ের মতো ত্যাড়া, গুরুগম্ভীর, বদরাগী, হিটলার স্বভাবের না হলেই হবে। তোর জীবনে এমন কেউ আসুক, যে শুরু থেকেই তোকে চাইবে এবং ভালোবাসবে। কোনোরকম কষ্ট যেন তোকে ছুঁতে না পারে। আর এমন একটা মানুষকে আমি চিনি, যে তোকে ছোট বেলা থেকেই ভালোবাসে। কিন্তু কখনো প্রকাশ করেনি!”
বড় বোনের বলা শেষের কথাটা শুনে ছায়া চমকে উঠল। অস্ফুটস্বরে জানতে চাইল, -“কে?”
আলো হেঁসে বলল, -“উমমম…সিক্রেট। আগে বাবা, মা’কে তোর বিয়ের বিষয়ে বলি, তারপর এটা নিয়ে কথা বলব। উনারা যদি রাজি হোন, তার পরেই তোকে বলব।”
ছায়া কিছু বলল না। শুধু আড়ালে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তার সারাজীবন একটা আফসোসই রয়ে যাবে, সে তার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসার মানুষকে পেল না। তবে সে মন থেকে দোয়া করে, তার না পাওয়া প্রিয় মানুষটা উনার ভালোবাসার মানুষটির সাথে সুখে থাকে। এবং সংসার করুক। যেখানে দুই তরফার ভালোবাসায় অনেক পূর্ণতা পায় না, সেখানে তার তো একতরফা ভালোবাসা। ওখানে পূর্ণতা পাওয়াও বিলাসিতা! আর যদি মানুষটা হয় সামর্থ্যের বাইরে, তাহলে তো কোনো কথাই নেই।
বোনকে চুপ করে থাকতে দেখে আলো মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, -“একটা কথা জেনে রাখ, তোর আপু কখনো তোর খারাপ চাইবে না। আমি যা করব, সবটা তোর ভালোর জন্যই।”
ছায়া হাসল। আপুকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলল, -“নিজের থেকেও বেশি তোমাকে বিশ্বাস করি আপু।”
আলো মনে মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বোনকে আদর করে দিল। ছায়া কিছুক্ষণ বসে থেকে গল্প করে বাইরে চলে গেল এবং তখনই আধার ভেতরে প্রবেশ করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
-“তুমি কিন্তু এটা ঠিক করছো না।”
আলো কপাল কুঁচকে বলল, -“কি করলাম?”
-“আমি জানি, ছায়া মৃন্ময়কে ভালোবাসে।”
-“তো? ছায়ার মতো হাজারো মেয়ে আপনার বন্ধুকে ভালোবাসে। সেখানে এটা স্বাভাবিক।”
-“আমি চাই মৃন্ময়ের জীবনে ছায়া আসুক।”
-“কিন্তু আমি চাই না।”
-“কেন? মৃন্ময় কোনদিক দিয়ে খারাপ?”
-“উনি ভক্তদের সাথে সাথে নিজের জীবনে কম শত্রু তৈরি করেননি! আমি আমার বোনকে এমন কারোর হাতে দিবো না, যেই মানুষটা আগে থেকেই অন্য কাউকে ভালোবাসে। আর আপনার বন্ধুর সাথে আমাদের পরিবার যায় না। দেখা যাবে, আমার মতো আমার বোনটাও সমাজে শুনতে পাবে, নিজের রূপ দেখিয়ে বা কালা জাদু করে বড়লোক পরিবারের ছেলেকে ফাঁসিয়ে বিয়ে করেছে। আমি যেসব সহ্য করেছি, সেসব আমার বোনটাও সহ্য করুক, এটা আমি চাই না। ও যেমন সাধারণ, তেমন সাধারণ মানুষের কাছেই দিবো। তখন কেউ খোঁটা দিতে পারবে না। আর আপনার বন্ধুর পরিবারও আমার বোনকে মেনে নিবে না। ওদের মধ্যে বয়সেরও তফাৎ রয়েছে। তাই আমি সবদিক থেকে বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি আপনি শুধু আপনার বন্ধুর দিকটা দেখবেন না, আমার বোনের দিকটাও দেখবেন।”
আধার কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
-“তুমি কবে থেকে সমাজ মানতে শুরু করলে? আর এতোই যদি মানতে, তাহলে কেন আমার কাছে ছিলে? যেখানে শুরুতে তোমাকে আমি নিজের বউ হিসেবে মেনে নেইনি। আমি তো তোমাকে আগে ভালোবাসিনি, তুমি আমাকে আগে ভালোবেসেছো, সবকিছু সহ্য করে আমার কাছে থেকে গিয়েছো! ভালোবাসার জন্য যদি নিজের আত্মসম্মান ত্যাগ করে বেহায়ার মতো পড়ে থাকতে পারো, তাহলে তোমার বোনের বেলায় এত সমস্যা হচ্ছে কেন? আমাদের মধ্যেও তো বয়সের ব্যবধান রয়েছে। কই এতে তো তোমার সমস্যা হয়নি? আমি মানছি, মৃন্ময় অন্য কাউকে ভালোবাসত, কিন্তু ওর লাইফে ছায়ার মতো মেয়ে গেলে ও নিজের অতীত ভুলে বেরিয়ে আসবে। যেমনটা আমি এসেছি। কিন্তু তুমি সবকিছু জেনেশুনেও স্বার্থপরের মতো বিহেভ করছো।”
আলো অপলক নয়নে স্বামীর রাগান্বিত চেহারার দিকে তাকিয়ে আছে। মূহুর্তেই এক গাল বেয়ে একফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পড়ল। পরক্ষণেই সে চোখের পানি মুছে তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল,
-“ঠিকই বলেছেন আপনি, একদম ঠিক। এই আমিই তো আপনার কাছে বেহায়া, নির্লজ্জ, কুকুরের মতো পড়ে ছিলাম। যেখানে আপনি আমাকে সামান্য বউয়ের অধিকার প্রথমে দেননি। এই বাড়িতে পা রাখার পর কম কষ্ট, আঘাত, অপমান, অপবাদ সহ্য করিনি। তবুও পড়ে ছিলাম এখানে। আরে আপনি তো আমাকে ডিভোর্সও দিতে চেয়েছিলেন, এটা নিয়ে তো দাদাজানের সাথে আপনার কম যুদ্ধ হয়নি! একসময় আমিই ডিভোর্স দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম, কারণ এই বাড়িতে থাকতে থাকতে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি ছিলাম মুক্ত পাখি, মা-বাবার ভীষণ আদরে! কিন্তু এখানে এসে এতিমের মতো জীবনযাপন করেছি। বিশ্বাস করুন, আমি মুক্ত হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এই জঘ’ন্য ভালোবাসার কাছে আমি হেরে গিয়েছি একসময়।
আপনি ঠিকই বলেছেন, আমিই আগে আপনাকে ভালোবেসেছি। তাই তো বেহায়ার মতো ছিলাম আপনার কাছে এবং সবকিছু সহ্য করে গেছি। আমি যদি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে আপনার কাছে না থাকতাম, তাহলে আপনি আমার দিকে ফিরেও তাকাতেন না। আপনি ভালোবাসায় বিশ্বাস করেন না জেনেও আমি নিজের মনটা দিয়েছি আপনাকে, আপনি আর পাঁচটা মানুষের মতো স্বাভাবিক না জেনেও আপনাকে ভালোবেসেছি। কারণ দিনশেষে আপনাতেই আমার শান্তি ছিল।
হ্যাঁ আমি স্বার্থপর, নিজের স্বার্থের জন্যই আপনাকে আমি চেয়েছি। লাজলজ্জা ভুলে আপনার কাছে অসভ্যের মতো গেয়েছি, যেখানে আমার সামান্য ছোঁয়াতেও আপনি বিরক্ত অনুভব করতেন। তবুও কুকুরের মতো আপনার একটু ভালোবাসা পাওয়ার জন্য সারাক্ষণ পিছু পিছু ঘুরেছি। আমি খুব করে চেয়েছিলাম আপনিও আমাকে ভালোবাসুন। কিন্তু আপনি তো আমাকে দূর দূর করতেন। আমি সবসময় হাসিখুশি ছিলাম বলে এই নয়, আমার কষ্ট হয়নি। আমারো কষ্ট হয়েছিল, খুউউউউব কষ্ট হয়েছিল। কিন্তু কখনো আপনাকে অভিযোগ করিনি। আর না জোর করে স্ত্রীর অধিকার নিয়েছি। আমি যখন ম’রতে বসেছিলাম, তখন আপনার অনুভূতি জেগেছিল। ওই যে কথায় আছে না? দাঁত থাকতে আমরা দাঁতের মর্যাদা বুঝি না। ঠিক তেমন আপনিও।
বিয়ের আগে আপনার ব্যাপারে আমি কিছুই জানতাম না। বাবার সিদ্ধান্ত ও আপনার দাদুর কথাতে রাজি হয়ে যাই। আপনার মতো আমিও কখনো আমার স্বামী হিসেবে আপনাকে কল্পনা করিনি। কিন্তু কি করতাম? বিয়ে তো হয়ে গেছিল, আর আমার বারো ঘাটে কেন? কখনো দুই ঘাটে পানি খাওয়ার মতো স্বভাব নেই। তাই আপনাকে আমি শুরুতেই স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। মুক্ত পাখি ছিলাম আমি, আর সেই আমিই আপনার খাঁচায় বন্দী হয়েছি। এতেও আমার কোনো আফসোস ছিল না। কারণ এক জীবনে শুধু আমি আপনাকেই চেয়েছি।
আচ্ছা, সবসময় শুধু আমরা মেয়েরায় কেন সবকিছুতে মানিয়ে নিবো? আমাদের মন, হৃদয় বলে কিছু নেই? আমাদের কষ্ট হয় না? শুধু আমরাই কেন স্যাক্রিফাইজ করে যাবো? নিজের মা-বাবা, জন্মস্থান ছেড়ে নতুন সংসারে আসার পর যদি শুনতে হয়, নিজের স্বামী তাকে বউ হিসেবে মেনে নেয়নি, তখন একটা মেয়ের কেমন লাগবে? আমি শুরু থেকে যা যা কষ্ট করেছি, সেগুলো আমার বোন করুক ওটা একটুও চাই না। আমি চাই না, আমার মতো আমার বোনটাও নির্লজ্জ, বেহায়া হোক। এটাও চাই না, আমার মতো শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে ছায়া কথা শুনুক। আমি চাই না আমার বোন আমার মতো স্বার্থপর হোক এবং নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিক। নয়তো দিনশেষে তাকেও আমার মতো স্বামীর কাছ থেকে শুনতে হবে, “স্বার্থপর”! এবং এটাও শুনতে হবে, “কেন আমাকে ভালো বেসেছিলে? আমি তো তোমাকে আগে ভালোবাসি নি? তাহলে কেন বেহায়ার মতো ছিলে?” আমি আমার জীবনে যতটা কষ্ট পেয়েছি, তার একভাগও আমার বোনকে পেতে দিবো না৷ এতে আপনি আমার পাশে না থাকলেও চলবে!”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে আলো দু’হাতে চোখের পানি মুছে, বালিশে মাথা রেখে অন্য পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। কম্ফোর্টার টেনে মাথা পর্যন্ত ঢেকে নীরবে কেঁদে উঠল। সে কখনো ভাবেনি, এই মানুষটাও দিনশেষে তাকে ভালোবাসা নিয়ে খোঁটা দিবে। এবং স্বার্থপর বলবে। সে দিনশেষে এতটা বেহায়া না হলেও পারত! অন্তত আজকের দিনটা দেখতে হতো না। আর কেউ বলতেও পারত না—আমি তোমাকে আগে ভালোবাসি নি…..
#চলবে
#এক_মুঠো_চাঁদের_আলো
#লেখনীতে_নুসরাত_ফারিয়া
#পর্ব_৫০
এতগুলো দিনের জমিয়ে রাখা অর্ধাঙ্গিনীর মনের অভিযোগ শুনে আধার এক মূহুর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। সে জানে, এই মেয়েটা তাকে পাওয়ার জন্য কম কষ্ট সহ্য করেনি। এমনকি সে অপমান, তুচ্ছতাচ্ছিল্যও করেছিল। কিন্তু, সেগুলো তো অতীত! সে বর্তমানে এই মেয়েটাকে খুব ভালোবাসে, খুউউব। নিজের অতীতের জন্য শুরুতে বিয়ে, ভালোবাসা কিছুই মেনে নেয়নি। নিজের মনের মধ্যে অনুভূতি তৈরি হলেও সে সেটা মানতে নারাজ ছিল। যার জন্য সে আজও মনে মনে আফসোস করে। প্রথমেই যদি সাহস করে নিজের অবাধ্য অনুভূতিকে মেনে নিয়ে নিজের ভালোবাসা স্বীকার করত, তাহলে হয়তো মেয়েটার কষ্ট কিছুটা লাঘব হতো।
আধার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে বসে, দেয়ালের মাঝে নজর রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“আমি শুধু তোমাকে বাস্তবটা বোঝাতে চেয়েছিলাম। তুমি তোমার ভালোবাসা পাওয়া জন্য অনেক কিছু করেছো, আমি সেটাকে ছোট করছি না! তুমি আমার জীবনে না এলে, আমি কখনোই এই নতুন জীবনটা পেতাম না। আমি সত্যিই তোমার ওপর কৃতজ্ঞ। সবকিছু জেনেশুনেও আমাকে ভালোবেসেছো। আমি তোমাকে শুরুতে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তার জন্য সরি! আমি তো আর আমাদের অতীত বদলাতে পারব না, তবে বর্তমান ও ভবিষ্যতে শুধুই তোমাকে চেয়ে যাবো, ভালোবেসে যাবো।”
একটু থেমে পুনরায় আওরাল,
-“আমি অন্য কারোর জন্য নিজের সংসারে অশান্তি চাই না। তুমি যদি চাও, তোমার বোন নিজের ভালোবাসা ভুলে অন্যকে বিয়ে করে নিক, তাহলে সেটাই হবে৷ আমি তোমাদের মধ্যে আসব না। মৃন্ময় একজনকে অনেক ভালোবেসেছিল, কিন্তু মেয়েটা ওকে ধোঁকা দিয়ে অন্য একজনকে বিয়ে করে নেয়। তারপর থেকে ছেলেটা আমার মতোই ছন্নছাড়া। সাহস করে দ্বিতীয় বারের মতো কাউকে ভালোবাসতে পারেনি৷ বলতে পারো, ওর বিশ্বাস উঠে গেছে। আমি শুধু চেয়েছিলাম, ওর জীবনটাও আমার মতো সুন্দর হোক। ও বলেছিল আমায়, তোমার মতো যদি কাউকে পায় তাহলে, নিজেকে আরেকটা সুযোগ দিবে। সেসময় সর্বপ্রথম তোমার বোনের কথা মনে হয়েছিল। আমি আড়াল থেকে দেখেছি ছায়ার চোখে মৃন্ময়ের প্রতি ভালোবাসা। তোমার পরিবারের সাথে আমার এত মেলামেশা না থাকলেও তোমাদের র ক্তের ওপর সম্পূর্ণ বিশ্বাস রয়েছে। যেখানে বড় বোন নিজের ভালোবাসার জন্য এতকিছু করতে পারে, এবং মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসতে পারে, সেখানে নিশ্চয়ই ছোট বোনের ভালোবাসায় কোনো খাদ থাকবে না। আমি হয়তো স্বার্থপরের মতো কথা বলছি, কিন্তু কি করব বলো? আমি নিরুপায়!”
প্রতিত্তোরে আলো কিছু বলল না, শুধু চুপচাপ শুনে গেল। একটু পর খেয়াল করল তার ওপর থেকে কম্ফোর্টার গায়েব হয়ে গেছে। আর সে স্বামীর কোলের ওপর! আধার মেয়েটার কান্নাভেজা চেহারার দিকে তাকিয়ে থেকে, আলতো হাতে চোখের পানি মুছে দিয়ে, কপালের মাঝে ভালোবাসার পরশ একে দিল।
-“তুমি যেটা চাও, সেটাই হবে। আমি কোনোরকম বাঁধা দিবো না। তবুও তুমি কষ্ট পেও না!”
আলো নাক টেনে মুখ সরিয়ে নিয়ে বলল, -“আমি কষ্ট পেলে আপনার কি?”
-“বুকের মাঝে বড্ড ব্যথা করে।”
আলো কিছু না বলে সরাসরি মানুষটার দিকে তাকায়। চোখজোড়া ভীষণ লাল হয়ে আছে, সুন্দর মুখখানাও কেমন শুকিয়ে গেছে। আলোর হঠাৎই লোকটার অতীতের কথা মনে পড়ল। সে আবেগের বশে একটু বেশিই বলে ফেলেছে। এখানে তো লোকটার কোনো দোষ নেই। সে তো সবকিছু জেনেশুনেই ভালোবেসেছে, কাছে থেকেছে। কারণ দিনশেষে এই লোকটাই যে ওর শান্তির কারণ ছিল। আর এখন, তার ভালোবাসা স্বার্থক! সে যাকে খুব করে চেয়ে এসেছিল, আজ তাকেই পেয়েছে। হয়তো একটু দেরিতে, কিন্তু শেষটা একটু বেশিই সুন্দর ছিল। আর সেও চায় না, কোনো কারণে তাদের মধ্যে অশান্তি হোক।
আলো তপ্ত শ্বাস ফেলে স্বামীর বুকের মাঝে মাথা রাখল। আহ, শান্তি! এটাই তো তার একমাত্র শান্তির জায়গা। এত এত কষ্ট করার পর যদি এই মূহুর্তটা পেতে হয়, তাহলে সে নির্দ্বিধায় আবারো একই আগুনের মধ্যে ঝাপ দিবে। নিজের মনকে এটা বলে সান্ত্বনা দিতে পারবে, অবশেষে সে নিজের ভালোবাসার মানুষটিকে পেয়েছে। যে কি-না তাকেও পাগলের মতো ভালোবাসে। দিনশেষে মেয়েরা একটু যত্ন, একটু বিশ্বাস ও একটু ভালোবাসার কাছে গলে যায়। যেমনটা সে নিজের প্রিয় পুরুষকে পেয়ে অতীতের সব কষ্ট ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ না চাইতেও সব কথা বেরিয়ে এসেছে।
আধার স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বাহুডোরে প্রিয়তমাকে শক্ত করে আগলে নিল। পুরো চেহারায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিতে দিতে ফিসফিসিয়ে বলল, -“অতীতের কষ্ট মুছতে পারব না, তবে এখন তোমাকে কোনো কষ্ট ছুঁতে পারবে না। অন্তত আমার পক্ষ থেকে না-ই তো!”
-“আমিও এখন থেকে নিজের আবেগ কে কন্ট্রোল করব। যাতে দ্বিতীয় বার আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যতের মধ্যে অতীতের কোনো কথা না আসে।”
আধার মুচকি হেঁসে অর্ধাঙ্গিনীকে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজে ধীর কণ্ঠে বলল,
-“মাঝেমধ্যে ঝামেলা হলে মন্দ হয় না!”
-“ঠিকই বলেছেন, নেক্সট টাইম ঝামেলা করে বাপের বাড়িতে চলে যাবো। তখন আপনি থাইকেন ঝামেলার সাথে।”
-“নো প্রবলেম জান। এই আধার খানও তার শ্যামা পাখির পাখা ধরে, উড়ে উড়ে শ্বশুর বাড়ি চলে যাবে।”
-“আচ্ছা, আপনি আমাকে শ্যামা পাখি বলেন কেন?”
-“কারণ…তুমি সারাক্ষণ কিচিরমিচির করো এবং শ্যামা পাখির মতো মিষ্টি কন্ঠস্বরে গান গাও৷ যেটা শোনা মাত্রই ড্রাগের মতো নেশা ধরে যায়!”
-“কিন্তু…আপনি তো আগে এই গান গাওয়া নিয়ে ভার্সিটিতে বকাবকি করতেন। একবার তো গিটারও ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।”
-“তোমাকে দেখে কিছু না হলেও, তোমার কণ্ঠস্বর, হাসি, পাগলামি, মনের মধ্যে অদ্ভুত অনূভুতি জাগিয়ে তোলে। আমি যেদিন তোমার গান শুনতাম, সেদিন রাতে ঘুমাতে পারতাম না। বারবার কানের কাছে তোমার কণ্ঠস্বর ভেসে বেড়াত। এইজন্যই পছন্দ করতাম না তোমার গান গাওয়া।”
আলো সোজা হয়ে দু’হাতে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-“আরো অনেক মেয়েই তো গাইত, ওদের বেলাতেও আপনার এমন ফিল হতো?”
আধার চোখমুখ কুঁচকে বলল, -“হোয়াট ননসেন্স! আমি তুমি ব্যতীত অন্য মেয়েদের গান শুনিনি। প্রয়োজনে কানে হেডফোন গুঁজে রাখতাম।”
আলো সরু চোখে তাকিয়ে শুধাল, -“তারমানে আপনি আমাকে আগে থেকেই পছন্দ করতেন?”
-“মোটেও না, তুমি আমার ভীষণ অপ্রিয় ছিলে।”
-“আর এখন?”
-“এখন আমার পুরো জীবনটাই তুমি।”
আলো হেঁসে বুকের মাঝে মুখ গুঁজে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে, -“আর আপনি আমার অক্সিজেন!”
★
বিকেলের দিকে ছোট বোন ও টুনা-টুনিকে নিয়ে বাগানে বসে আছে আলো। ছায়া আজকের রাতটা এখানে থাকবে এবং পরেরদিন ফিরে যাবে। মেয়েটাও খরগোশের মতো পাশে বসে থেকে গাজর চিবোচ্ছে। তিনজনকে দেখে একই দলের বললে ভুল হবে না৷ তাদের থেকে দূরে, দাদা-নাতি বসে থেকে গল্প করছে ও চা খাচ্ছে। মানুষটা কথা বলার ফাঁকেফাঁকে তার দিকে তাকাতেও ভুলছে না। আলো এসব দেখে আনমনে হেঁসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলল,
-“তুই যথেষ্ট বড় হয়েছিস, আর নিজের ভালোমন্দও বোঝার জ্ঞান রয়েছে। তাই আমি সবকিছু তোর ওপর ছেড়ে দিলাম। আমি কখনোই নিজের সিদ্ধান্ত তোর ওপর চাপানোর চেষ্টা করব না। কারণ দিনশেষে আমার বোনের সুখেই আমার সুখ!”
ছায়া বড় বোনের পাশে বসে থেকে দোল খাচ্ছিল আর গাজর চিবোচ্ছিল, তখন কথাগুলো শুনে কপাল কুঁচকে গেল। জানতে চাইল, -“কোন বিষয়ে বলছো?”
-“তোর বিয়ের ব্যাপারে। আমার জন্য হুট করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে না। সময় নে এবং লেখাপড়া শেষ কর। তারপর যেটা ভালো হয় সেটাই কর। আমি তোর পাশে আছি সবসময়। আর এ বিষয়ে বাবাকে কিছু বলার দরকার নেই। মন দিয়ে শুধু লেখাপড়া করে যা আর নিজের প্রতি যত্ন নে। তোর ভাগ্যে যেটা রয়েছে, ওটাই হবে। আর সবকিছু ওপরওয়ালার ওপর ছেড়ে দে। আশা করছি, উনি তোকে নিরাশ করবেন না। যা করবে ভালোর জন্যই! আর তুই চাইলে ইভেন্টে যেতে পারিস। আমার এতে কোনো আপত্তি নেই। আসলে একটা বাজে স্বপ্ন দেখে একটু বেশিই রিয়াক্ট করে ফেলেছিলাম। তারজন্য তখন মানা করেছি। কিন্তু, এখন বলব, তুই তোর মতো করে জীবনটাকে উপভোগ কর! আর পারলে নিজের মনের কথাগুলো বলে দেওয়ার চেষ্টা করিস। নয়তো সারাজীবন অনুভূতি না প্রকাশ করার জন্য আক্ষেপ থাকবে। এরপর যা হবে সেটা নাহয় দেখা যাবে, তবুও মনে মনে একটু হলেও স্বস্তি পাবি। নয়তো প্রতিনিয়ত গুমরে গুমরে ম’রবি। অবাধ্য ভালোবাসাই যে এমন…!”
ছায়া কথাগুলো শুনে ভাবুক হয়ে পড়ল। সে চায় তার গায়ক সাহেবকে, খুব করে চায়। কিন্তু, এই চাওয়া যে ওর সাধ্যের বাইরে। এখন কি করবে ও? কি করা উচিত?
আলো চায়ের কাপে শেষ বারের মতো চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। উদ্দেশ্য ছিল একটা গোলাপ ছিঁড়ার। কিন্তু সামনে পা বাড়াতেই হঠাৎ মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। তড়িঘড়ি করে একহাতে মাথা চেপে ধরে দোলনায় বসল। আজকাল শরীরটা অদ্ভুত লাগছে। সাথে মন-মেজাজও!
-“তুমি ঠিক আছো?”
মেয়েটাকে মাথা ধরে বসতে দেখে আধার তড়িঘড়ি করে ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল। ওর পিছু পিছু সোবহান খানও এসে জানতে চাইলেন,
-“কোনো সমস্যা হচ্ছে?”
পাশ থেকে ছায়া বড় আপুর হাত ধরে বলল,
-“তুমি ঠিক আছো, আপু?”
আলো নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আস্তে করে বলল,
-“আমি ঠিক আছি, শুধু একটু মাথা ব্যথা করছে।”
সোবহান খান নাতির উদ্দেশ্য বললেন, -“মেয়েটাকে ঘরে নিয়ে যাও! একটু আরাম করুক।”
উনার বলতে দেরি হলেও নিজের বউকে পাঁজা কোলে তুলে নিয়ে ভেতরের দিকে যেতে একটুও দেরি হলো না আধারের। এই দৃশ্যটা দেখে ছায়া হেঁসে বলল,
-“ভাইয়া আপুকে অনেক ভালোবাসে, তাই না দাদু?”
সোবহান খান আরেক নাতনির পাশে বসতে বসতে বললেন,
-“উঁহু, তোমার আপু আমার ত্যাড়া নাতিকে খুউউব ভালোবাসে।”
ছায়া আবারো হাসল৷ প্রতিত্তোরে বলল, -“তারা দু’জন দু’জনকেই অসীম ভালোবাসে দাদু। আর এই ভালোবাসায় যেন কারোর নজর না লাগে। তারা দুজন সারাজীবন একে অপরের পাশে এমন করেই থেকে যাক। নিজের ভালোবাসার মানুষটার সাথে সংসার করার সৌভাগ্য আর কতজন মেয়ের হয়? সবাই যদি পূর্ণতা পেত, তাহলে হয়তো আর জীবনে কোনো আফসোস বলে কিছু থাকত না। তবে, এত অপূর্ণতার মাঝেও এমন পূর্ণতা দেখতে ভালোই লাগে।”
সোবহান খান মাথা নাড়িয়ে বললেন, -“ভালোবাসা সুন্দর।”
-“উঁহু, ভয়ংকর সুন্দর…!”
—————————-
রাত ওইদিনের পর আর অফিসে যায়নি। বরং দেশ ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া থেকে একটা কোম্পানিতে কাজের অফার পেয়েছে, আর সে ওখানেই যাচ্ছে। পরিবারের সবার সাথে এই বিষয় নিয়ে কথা বলা হয়ে গেছে। আধার প্রথমে আপত্তি জানায়, কারণ সে ভাবছে তার ছোট ভাই দেশের বাইরে গেলে আবারো বিগড়ে যাবে। কিন্তু রাত কথা দিয়েছে সে আর এসবের মধ্যে নিজেকে জড়াবে না। একবার যেই পথ থেকে ফিরে এসেছে, ওই পথে চলার কোনো প্রশ্নই ওঠে না৷ আধার শেষ বারের মতো ছোট ভাইকে বিশ্বাস করেছে। দেখা যাক, রাত কতটুকু ওর কথা রাখতে পারে।
তাহমিনা খান আজকাল নিজের ঘর থেকে আর বের হোন না। বলতে গেলে, নিজের এক পা হারিয়ে বিছানায় পড়ে থেকে অনুশোচনায় ভোগেন। উনাকে দেখার জন্য আলাদা করে দুজন মহিলা থাকলেও আলো মাঝেমধ্যে এসে শ্বাশুড়ি মায়ের সেবা করে যায়। হাজার হোক, শ্বাশুড়ি বলে কথা! সে তো আর ফেলে দিতে পারবে না। আর না উনার মতো বাজে ব্যবহার করতে পারবে। তিথি এসে সারাদিন থেকে রাতের বেলা চলে গিয়েছে চট্টগ্রামে। তাকে তিহান নিতে এসেছিল! মেয়েটা এখন আর হোস্টেলে থাকে না, বরং শ্বশুর বাড়িতে থাকে। এবং ওখানে সুখেই আছে।
-“কোথায় যাচ্ছো?”
ডিনার শেষে, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে এসে দেখে—আলো বড় পুতুলটা বগলদাবা করে, খুড়িয়ে খুড়িয়ে হেঁটে বাইরে যাচ্ছে। তখন আধার উপরোক্ত প্রশ্নটি করে। আলো থেমে গিয়ে পাশে তাকিয়ে বলল,
-“ছায়ার কাছে।”
-“কেন?”
-“নাচতে।”
জবাব শুনে আধার বিরক্ত হয়৷ গমগমে গলায় আওরাল,
-“যা করার এখানেই করো, অন্য কোথাও যেতে হবে না।”
আলো কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিরবির করে বলল, -“এখন যদি গরম গরম রসগোল্লা বানিয়ে খাওয়ান, তাহলে যাবো না কোথাও।”
-“অপেক্ষা করো, বানিয়ে আনছি।”
একথা বলে আধার রুম থেকে চলে গেল আর আলো গিয়ে সোফায় বসল।
প্রায় অনেক্ক্ষণ পর আধার বউয়ের জন্য রসগোল্লা বানিয়ে নিয়ে এল। এতে আলো মূহুর্তেই খুশি হয়ে যায়। সে একটা মিষ্টি নিয়ে স্বামীর উদ্দেশ্যে বলল, -“খাবেন?”
-“উঁহু, তুমি খাও!”
আলো আর কিছু না বলে খেতে শুরু করল। পাঁচটার মতো মিষ্টি খেয়ে বাদবাকি রেখে থম মে’রে বসে থাকল। তাকে এইভাবে বসে থাকতে দেখে আধারের কপাল কুঁচকে গেল। কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, -“কি হলো? মিষ্টি ভালো হয়নি?”
আলো কিছু না বলে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়ায়। তখনই ঘটিয়ে ফেলল এক অঘটন! স্বামীর গায়ের ওপরই বমি করে দিল। আধার চমকে মেয়েটার দুগালে হাত রেখে অস্থির গলায় শুধাল, -“তুমি ঠিক আছো? শরীর খারাপ লাগছে?”
আলো স্বামীর নোংরা টিশার্টের দিকে তাকিয়ে অসহায় কণ্ঠে বলল, -“সরি, আমি ইচ্ছে করে এমনটা করতে চাইনি।”
-“হুঁশশশ…ডোন্ট সরি। আমার এতে কোনো যায় আসে না।”
একথা বলে মেয়েটাকে নিয়ে সে ওয়াশরুমে চলে গেল। আলো চোখেমুখে পানি দিয়ে বিরবির করে বলল, -“আজ থেকে আমার মিষ্টি খাওয়া বন্ধ, আমি চাইলেও আর এনে দিবেন না।”
আধার টিশার্ট খুলতে খুলতে জবাব দিল, -“মিষ্টির দোষ না, সব দোষ তোমার আর দাদাজানের। আরো বেশি বেশি করে খাও বাহিরের জিনিস। তারপর পেট খারাপ করে নিয়ে বসে থাকো!”
-“বললেই হলো? সব দোষ আপনার মিষ্টির।”
আধার হতাশ কণ্ঠে বলল, -“ঠিক আছে ম্যাডাম, মানলাম সব দোষ আমার মিষ্টির। এখন চলুন, আরাম করবেন!”
আলো কিছু না বলে স্বামীর সাথে বাইরে এল। তারপর বিছানায় শুয়ে বুকের মাঝে মাথা রেখে শান্ত গলায় বলল,
-“কিছুদিনের জন্য বাবার বাড়িতে যেতে চাই।”
-“সুস্থ হয়ে নাও, তারপর।”
-“ঠিক আছে।”
তখন বাজে রাত দুইটা। এসময়ে সবাই গভীর ঘুমে মগ্ন থাকলেও ছায়ার চোখে ঘুম নেই। আজ যেন মেয়েটার সব ঘুম হারিয়ে গিয়েছে। সে তো নির্জন বারান্দায় এসে একা দাঁড়িয়ে থেকে আকাশের চাঁদ দেখছে। হালকা বাতাসে উড়ছে খোলা চুল! মেয়েটাকে একটু অগোছালো লাগছে। হয়তো কিছু একটা নিয়ে ভাবছে। একসময় সকল পিনপতন নীরবতা ভেঙে রমণী উদাস মনে বলে উঠল,
❝আপনাকে পাবো না জেনেও ভালো বাসলাম। আপনি ঠিক ওই নীল আকাশের চাঁদের মতো। যাকে শুধু দেখা যায়, ছোঁয়া নয়। আপনিও ঠিক তেমনই আমার সাধ্যের বাইরে…গায়ক সাহেব! যাকে ছায়া কোনোদিনও নিজের করে পাবে না৷ হয়তো আমাদের এটাই ভবিতব্য।❞
#চলবে

