Home "ধারাবাহিক গল্প "গোধূলী লগ্নে তুমি গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৬

গোধূলী লগ্নে তুমি পর্ব-০৬

0
1

#গোধূলি_লগ্নে_তুমি
#কলমে_ফাহিমা_ইসলাম
#পর্ব_৬

[ অনুমতি ব্যতীত কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ 🚫]

ধরণীর বিস্তীর্ণ বক্ষজুড়ে রাত্রি নেমে এসেছে। মেঘকুঞ্জের গম্ভীর গর্জন ক্ষণে ক্ষণে আকাশের নৈঃশব্দ্য বিদীর্ণ করে উঠছে। বুক চিঁড়ে বেরিয়ে আসা কোনো অদৃশ্য হাহাকারের ন্যায় সেই গর্জন কাঁপিয়ে তুলছে ধরিত্রীর অন্তঃস্থল। প্রকৃতির বিষণ্ণতার অবসান যেনো আজ কোনোভাবেই ঘটবার নয়। ক্ষণিক বাদেই আকাশের বুক ফুঁড়ে নেমে এলো মুষলধারে বর্ষণ। অবিরাম ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। ব্যস্ত নগরীর রাজপথে ছুটে চলেছে অগণিত যানবাহন। কেউ মাথা লুকানোর সামান্য আশ্রয়ের আশায় ফুটপাতের দোকানগুলোর নিচে ঠাঁই নিয়েছে, কেউবা বর্ষণের তোয়াক্কা না করেই ছুটে চলেছে নিজ নিজ গন্তব্যের দিকে।

এই দুর্যোগময় বর্ষণের মাঝেও আয়াশের গাড়ি এগিয়ে চলেছে। অথচ তার কোনো তাড়া নেই। গাড়ির গতি অত্যন্ত ধীর। বাড়িটার কাছাকাছি পৌঁছালেই কেমন এক গুমোট পরিবেশ তাকে চারদিক থেকে আবৃত করে ফেলে। সেখানে পৌঁছানো মানেই যেনো বুকের ওপর অদৃশ্য কোনো ভার চাপিয়ে দেওয়া; যেখানে স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নেওয়াটুকুও দায় হয়ে দাঁড়ায়। সারাদিনের ক্লান্তির সঙ্গে দুশ্চিন্তার অদৃশ্য ভারে নুয়ে পড়েছে তার সমগ্র সত্তা। নিজের ওপরই কেমন এক অজ্ঞাত বিরক্তি অনুভব করছে সে। কেনো এমন লাগছে, কীসের জন্য এমন অস্থিরতা, কোনো প্রশ্নেরই যেনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না।

হঠাৎই নিস্তব্ধতার বুক চিরে বেজে উঠলো ফোন। স্ক্রিনের ওপর ভেসে উঠলো একটি পরিচিত নাম, শ্রেয়া। আয়াশ হাত বাড়িয়ে ছিটকে পড়ে থাকা ফোনটি তুলে নিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো-

“ আজ যে আসলে না?”

আয়াশ কী উত্তর দেবে? নিজের অন্তর্গত স্তরে দলা পাকিয়ে থাকা উৎকণ্ঠাগুলোই যেনো একের পর এক অসহনীয় যন্ত্রণার জন্ম দিচ্ছে। অথচ সেই যন্ত্রণার ভাষা তার জানা নেই।

“ কাজে ব্যস্ত ছিলাম।”

“ মিথ্যে! এতো বছরের দেখা তোমায় চিনি, এতো সামান্য বিষয়ের জন্য তুমি কখনো না আসা হয়ে থাকো না।”

“ মানুষের পরিস্থিতি সর্বদা সমান থাকে না শ্রেয়া। কিছু জিনিস হঠাৎ পরিবর্তন হয়।”

শ্রেয়া হয়তো বিস্মিত হলো। এই হতাশাগ্রস্ত কণ্ঠস্বর যেনো এই প্রথমবার আয়াশের কণ্ঠে নিজের অস্তিত্ব জানান দিলো। এত বছরের পরিচয়ে এমন ক্লান্ত, এমন অবসন্ন স্বর সে হয়তো কখনো শোনেনি।

“ তুমি ঠিক আছো তো? তোমার কণ্ঠ শুনে মনে হচ্ছে,কিছু একটা হয়েছে?”

“ কিছু না কালকে আসবো।”

“ কিন্তু আজকে তো বার্থডে!”

আয়াশ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মাত্র তিন দিনেই নিজের ভেতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো সে খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে। আর সেই পরিবর্তনের অন্তরালে যে বিশাল কারণটি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম ইনায়া।
নামটা পুনরায় মস্তিষ্কের অলিন্দে আঘাত হানতেই কেমন এক শূন্যতা তাকে গ্রাস করলো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা ফাঁকা ঠেকলো। ক্ষণে ক্ষণে কেনো যেনো মনে হচ্ছে, সে বড্ড একা হয়ে পড়েছে। চারপাশে এত মানুষ, এত পরিচিত মুখ, এত কোলাহল থাকার পরও কেনো এই নিঃসঙ্গতা তাকে এমনভাবে গ্রাস করছে?

“ আচ্ছা, আমি আসচ্ছি।”

বলেই ফোনটা কেটে দিলো আয়াশ। পরক্ষণেই গাড়ির গতিপথ ঘুরিয়ে নিলো সে, এবার অন্য এক গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কিছুক্ষণ পর ফোনের পর্দায় আঙুল চালাতে লাগলো আয়াশ। অনলাইনের কোথাও ইনায়ার অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় কি না, সেই উদ্দেশ্যেই খুঁজে চললো সে। অথচ মেয়েটার ফেসবুক আইডি থেকে শুরু করে তার সঙ্গে সম্পৃক্ত সবকিছুই যেনো হঠাৎ করেই ভ্যানিশ হয়ে গেছে। কোথাও ইনায়া নেই। কোনো পরিচিত নাম নেই, কোনো ছবি নেই, কোনো উপস্থিতির ক্ষীণতম চিহ্নও নেই।

আজকের দিনটাতে প্রতিবছর সে শ্রেয়ার সঙ্গেই কিছুটা সময় কাটায়। হয়তো অতীতের কোনো অদৃশ্য টানের তাড়নায়, হয়তো অভ্যাসের দীর্ঘ ছায়ায়। অথচ আজ সেই দিকটায় যাওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেও জাগেনি তার মনে। বরং সে যেনো সম্পূর্ণ বেমালুম হয়ে বসেছিল। অথচ এই একটি দিনের জন্যই তো সে প্রতিবছর অপেক্ষা করে। আজ আয়াশের চিন্তার জগতে সেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটির কোনো স্থান হলো না। তার পরিবর্তে সেই সমস্ত জায়গা নিঃশব্দে দখল করে নিলো ইনায়া নামক মেয়েটির স্মৃতি।

সে কোনোদিনও এই বিয়ের জন্য প্রস্তুত ছিলো না। রিয়াজুল হাসান ম’রার আগেও ইনায়া নামক মেয়েটার সম্পর্কে বলেছিলো। নিজের ইচ্ছেও জাড়ি করেছিলো তার কাছে, তখন সে নিরব ছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার বিয়েটা ইনায়ার সঙ্গেই হলো। ইনায়াকে রিয়াজুল হাসান বেশ পছন্দ করতেন। ‘বেশ’ বললে হয়তো কম বলা হবে, মেয়েটি ছিল তার বড্ড পছন্দের পাত্রী। মৃত্যুর আগ অবধি তিনি একটি ইচ্ছেই আঁকড়ে রেখেছিলেন, ইনায়াকে এই বাড়ির বউ করা হোক। অন্যদিকে আয়াশ তখন নিজের ভাঙাচোরা সত্তাটুকু নিয়ে ধীরে ধীরে বেঁচে থাকার প্রচেষ্টায় ছিল। সেই ভগ্ন অস্তিত্বের ওপর হঠাৎ করেই বিবাহ নামক নতুন এক সম্পর্কের ভার এসে পড়বে, তার জন্য প্রস্তুত ছিলো না সে। বরং বিয়েটা সে করতেও চায়নি। কারণ সে জানতো, বিয়ে করলে সেই মেয়েটাকে প্রাপ্য ভালোবাসাটুকু সে দিতে পারবে না।

যে ভালোবাসা একজন স্ত্রীর অধিকার, যে অনুভূতিটুকু একটি দাম্পত্যকে পূর্ণতা দেয়, সেটুকু যদি সে দিতে না পারে, তবে তার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে মেয়েটা হয়তো আজীবন আফসোসের ভার নিয়েই কাটাবে। ভালোবাসার মতো মন তার বহু আগেই হারিয়েছে। তাই নতুন করে আর একজনকে ভালোবাসার সেই শক্তি তার নেই। থাকলেও সে সেই অনুভূতিকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায় না। নিজের ভেতরে থাকা সমস্ত অনুভূতির দ্বার সে নিজ হাতেই বন্ধ করে দিয়েছে। তাই এই বিয়েতে একদমই মত ছিলো না এই বিয়েতে৷ কিন্তু শেষ পর্যন্ত সকলের জোরাজুরির কাছে নতিস্বীকার করে এই বিয়ে করে বসলো সে। বিয়ের সময় ইনায়ার দিকে একটিবারও ঠিকমতো তাকায়নি আয়াশ। কারণ মেয়েটার দিকে তাকালেই নিজের ভেতরটা অপরাধবোধে ভারী হয়ে উঠতো। তার মতো ভাঙা একজন মানুষের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে মেয়েটাও একদিন ভেঙে পড়বে, এই আশঙ্কাটাই তাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়াতো।

আর আজ হয়েছেও সেটাই। ইনায়াকে শুরুতেই তার কাছ থেকে কোনো আশা রাখতে বারণ করেছিল আয়াশ। তাকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছিল, কিন্তু মনের সেই অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে নয়। অথচ সময়ের অদৃশ্য স্রোতে মেয়েটাও তার মায়ায় পড়ে গেলো। ইনায়ার এখানে কোনো ভুল নেই। কারণ যত যাই হোক, সে তো তার নিজের স্বামীর মায়ায় পরেছে। নিজের স্বামীর কাছ থেকে ভালোবাসা চাওয়া কোনো নারীর অপরাধ হতে পারে না। কিন্তু তার সেই মায়ায় পড়াটাই ধীরে ধীরে ইনায়ার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো।
মেয়েটা তার কাছে ভালোবাসা চায়। অথচ সেই ভালোবাসা দিতে সক্ষম নয় আয়াশ। বারবার ফিরিয়ে দিয়েছে সে ইনায়াকে। প্রতিবারই নিজের চারপাশে আরও দৃঢ় করে তুলেছে সেই অদৃশ্য প্রাচীর, যার ওপারে কোনো অনুভূতির প্রবেশাধিকার নেই।

শত হোক সে পুরুষ মানুষ, তারও চাহিদা রয়েছে। পুরুষরা চাইলে ভালোবাসাবিহীন কাউকে আপন করতে পারে, হোক সেটা ভালোবাসা কিংবা ভালোবাসাহীন। কিন্তু নারীরা সেটা কোনো মতেই পারে না। ইনায়ার সঙ্গে তার বহুবার শা*রীরিক মিলন ঘটেছে। কিন্তু দে’হের মিলন হওয়া মানেই এই নয় যে মনের মিলনও ঘটবে। দুটি মানুষের শরীর হয়তো একই ছাদের নিচে, একই সম্পর্কে আবদ্ধ হতে পারে, অথচ তাদের হৃদয়ের মাঝখানে থেকে যেতে পারে অনতিক্রম্য এক দূরত্ব। ইনায়ার প্রতিটা নীরব আর্তনাদ সে দেখেও,অদেখা করেছে। কারণ তার কাছে সেই আর্তনাদ কমিয়ে দেওয়ার কোনে ঔষধ নেই। যে সে নিরাময় করে দিবে, তাই সেও নিরবে সবটা এড়িয়েছে। ইনায়াও মুখ ফুটে তার আর্তনাদ জাড়ি করেনি। হয়তো সেও বুঝে গেছে, তার সেই আর্তনাদ আয়াশের অব্দি পৌঁছালেও সেটার নিয়ামক সে করতে পারবে না। তাই সে নীরব ছিলো তিনটা বছর। তিনটি বছর।

কতগুলো দিন, কতগুলো রাত, কতগুলো ঋতু পেরিয়ে গেছে সেই নীরবতার অন্তরালে। অথচ সেই নীরবতারই আড়ালে লুকিয়ে ছিলো কত অপ্রকাশিত অনুভূতি। আবারও তার মাথায় ডায়েরির সেই কয়েকটা লাইন ঘুরপাক খেলো।
সত্যি কি তিনটা বছর কাউকে ভালোবাসার জন্য যথেষ্ট নয়? তিনটা বছর অনেকগুলো দিন, নাকি সে নিজেই নিজের অনুভূতি বুঝতে সক্ষম নয়? প্রশ্নগুলো একের পর এক তার মস্তিষ্কের অলিন্দে আঘাত করতে লাগলো। উত্তরহীন সেই প্রশ্নগুলোর ভার যেনো ক্রমশ আরও গভীরে ডুবিয়ে দিচ্ছে তাকে। ভাবতে ভাবতেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় এসে গাড়িটা থামলো। এতক্ষণে বৃষ্টিও কমে এসেছে।

গাড়ি থেকে নামতেই সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা শ্রেয়াকেও দেখতে পেলো আয়াশ। হয়তো তারই অপেক্ষায় ছিলো।
আয়াশ ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো তার দিকে।শ্রেয়া আয়াশের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখশ্রী পানে চেয়ে প্রশ্ন করে বসে-

“ তোমার কি কিছু হয়েছে? এমন দেখাচ্ছে কেনো?”

আয়াশ প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হতে চাইছে না। এই মুহূর্তে সে কেমন আছে, নিজের কাছেই যার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই, সেখানে অন্য কারও কাছে সেই অনুভূতির ভাষ্য তুলে ধরার বিন্দুমাত্র ইচ্ছেশক্তি তার অবশিষ্ট নেই। সত্যিই তো, সে নিজেও জানে না, কেমন আছে সে। কেবল জানে, অন্তরের কোথাও একটা অদৃশ্য ভার ক্রমশ জমাট বেঁধে তাকে অবসন্ন করে তুলছে।

“ খাবার দিয়েছো?”

“ হুম সেই দুপুরেই খাওয়ানো শেষ হয়েছে। কিন্তু তুমি এলে না কেনো? প্রতি বছর তো তুমিই খাওয়াও।”

“ ব্যস্ত ছিলাম।”

উত্তরটা শ্রেয়ার কর্ণকুহরে পৌঁছালেও মননে তার কোনো গ্রহণযোগ্যতা পেলো না। এই বিশেষ দিনটিতে আয়াশ পৃথিবীর যাবতীয় ব্যস্ততা, কর্মব্যস্ততার সমস্ত আবর্ত পেরিয়ে দিনটাকে নিজের মতো করে উদযাপন করে। অথচ আজ সেই মানুষটিই যেন নিজের পরিচিত অভ্যাসের কাছেই অপরিচিত হয়ে উঠেছে।

“ তোমার মুখ মিথ্যে বললেও, তোমার চোখ অন্যটা বলছে।”

“ তাহলে বারবার একই প্রশ্ন কর না,যখন বুঝতে পারছো বিষয়টা।”

“তোমার বৈবাহিক জীবনে কিছু কি হয়েছে?”

হঠাৎ নিক্ষিপ্ত প্রশ্নটি আয়াশের স্থির মুখশ্রীতেও এক মুহূর্তের জন্য থমথমে ছায়া নামিয়ে আনলো। যত যাই হোক, নিজের সংসার কিংবা বৈবাহিক সম্পর্কের অন্তরঙ্গ কোনো বিষয় বহির্জগতে আলোচনার টেবিলে তুলে ধরতে সে কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। ইনায়ার সঙ্গে তার জীবনটা অদ্ভুত রকমের শান্তিতেই কেটে গেছে। হয়তো ইনায়া বলেই সম্ভব হয়েছে। তার মতো ভাঙাচোরা একজন মানুষের সঙ্গে নিজের জীবনের তিনটি বছর এতটা নির্বিঘ্নে পার করে দেওয়া কোনো সাধারণ নারীর পক্ষে হয়তো সম্ভব ছিল না।

ইনায়া নিতান্তই ধৈর্যশীলা, শান্ত প্রকৃতির এবং স্বল্পভাষী একজন মেয়ে। নিজের সামান্যতম অসুবিধাটুকুও সে কাউকে মুখ ফুটে জানাতে চায় না। অভিমানকে শব্দে রূপ দেওয়ার চেয়ে নীরবতার আড়ালে গোপন করে রাখতেই যেন বেশি স্বাচ্ছন্দ্য তার। ইনায়া সত্যিই একজন আদর্শ স্ত্রী।
আয়াশের মতো ভাঙা এক মানুষের সঙ্গেও সে নিপুণ মমতায় সংসারের প্রতিটি দিন সাজিয়ে নিয়েছে। খুব ধীরে, খুব নিঃশব্দে নিজের মতো করে গড়ে নিয়েছে চারপাশটাকে। হিসাবী মেয়েটা অকারণে অর্থব্যয় করে না, অপ্রয়োজনীয় কোনো কিছুর প্রতি তার মোহ নেই। সংসারের ছোটখাটো প্রয়োজনের ফাঁকে ঘরে বসেই টুকটাক ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করতো। চাকরিটা করেনি, সংসারটাকে সময় দেবে বলেই।
মেধাবী মেয়েটা কখনোই নিজের সামর্থ্যকে অলসতার আড়ালে বিসর্জন দেয়নি। নিজের সামান্য ব্যক্তিগত খরচটুকুও যথাসম্ভব নিজেই বহন করতো। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিছু কেনার অভ্যাস ছিল না, অযথা ব্যয়ের প্রতিও ছিল প্রবল অনীহা।

তবুও কখনো কখনো আয়াশের মনে হয়, তার সঙ্গেই থাকতে থাকতে মেয়েটা হয়তো নিজের জীবনের সমস্ত রঙের সঙ্গে ধীরে ধীরে বিচ্ছেদ ঘোষণা করেছে। যে মেয়েটার জীবন একদিন হয়তো নিজস্ব বর্ণে উজ্জ্বল হতে পারতো, সে-ই হয়তো অজান্তে নিজের চারপাশটাকে সাদা-কালোর আবরণে রাঙিয়ে নিয়েছে। আর সেই বিবর্ণতার নেপথ্যে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি যে স্বয়ং আয়াশ, এই উপলব্ধিটাই যেন তাকে নিঃশব্দে দগ্ধ করে। আয়াশের মুখশ্রী ক্রমশ গম্ভীর হয়ে এলো। এই প্রসঙ্গকে আর এক মুহূর্তও দীর্ঘায়িত করার ইচ্ছা তার নেই। নিজের সংসারের অন্দরমহল নিয়ে কথা বলা তার স্বভাববিরুদ্ধ, আর আজ তো আরও নয়।

“ শ্রেয়া আই থিংক ব্যাপারে জানতে না চাওয়াই শ্রেয়।”

শ্রেয়া হয়তো তার কণ্ঠের অন্তর্নিহিত অনিচ্ছাটুকু বুঝতে পারলো। তাই আর প্রশ্নের সুতো টেনে দীর্ঘ করলো না। প্রসঙ্গ বদলে আয়াশের সঙ্গে এগিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ বললো,

“ আমাদের গিফ্ট কই?”

আয়াশের মস্তিষ্ক যেন আচমকাই সজাগ হয়ে উঠলো। গিফ্ট।
সে তো কোনো উপহারই কেনেনি। এতটা অমনোযোগী সে কবে হয়ে গেল? নিজের আচরণের এমন অস্বাভাবিক পরিবর্তনে নিজেই যেন বিস্মিত হয়ে গেল আয়াশ। যে দিনটিকে ঘিরে প্রতিবছর এত প্রস্তুতি, এত আয়োজন, এত যত্ন, সেই দিনেই কিনা কাঙ্ক্ষিত বিষয়টুকুই তার মন থেকে সম্পূর্ণ বিলীন হয়ে গেছে!

শ্রেয়া তার মুখের পরিবর্তিত মানচিত্রটি লক্ষ্য করেই বিষয়টা আঁচ করতে পারলো। সেও আকস্মিক বিস্ময়ে কিছুক্ষণ আয়াশের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো।

“ আয়াশ সত্যিই কি তুমি ঠিক আছো? এতোটা অমনোযোগী তুমি কবে হলে?”

প্রশ্নটির উত্তর আয়াশের কাছে নেই। এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা নিয়ে সে বসে রইলো। যেন নিজের ভেতরের কোনো এক অচেনা কক্ষের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ সেই দরজা খোলার চাবিটিই তার নিজের কাছে নেই। এই দিনটিতে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি আয়োজনের নেশায় মেতে থাকে সে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোনো না কোনো কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখে। পথের অসহায় শিশুদের খাওয়ানো, তারপর দাদুর সেই অনাথ আশ্রমে গিয়ে সবার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা, সবকিছুই নিজের হাতে করার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি খুঁজে পায় সে।

অথচ আজ?

আজ সে এতটাই অন্যমনস্ক যে নিজের দীর্ঘদিনের অভ্যাসটুকুও বিস্মৃত হয়েছে। শ্রেয়া কিছুক্ষণ নীরবে তার দিকে তাকিয়ে রইলো। হয়তো তার অন্তর্দৃষ্টি ইতোমধ্যেই কোনো অদৃশ্য সত্যের আভাস পেয়ে গেছে। তাই অত্যন্ত ধীর স্বরে বলে উঠলো,

“ হয়তো তোমার প্রিয় কেউ তোমার মধ্য থেকে বিলীন হয়ে গেছে। তাই হয়তো এই অমনোনয়ন কারণ!”

কথাটি আয়াশের অন্তস্তলে যেন আকস্মিক বজ্রাঘাতের মতো আঘাত করলো।চমকে উঠলো সে। দৃষ্টি স্থির হয়ে গেলো শ্রেয়ার মুখশ্রীতে।সত্যিই কি এমন কিছু? তার নিজের মধ্যেই কি কোনো প্রিয় মানুষের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেছে?
নিজের ভেতরে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলো তো সে নিজেও অস্বীকার করতে পারছে না। গত তিনটি দিনেই যেন তার চিন্তার প্রকৃতি বদলে গেছে, অভ্যাস বদলে গেছে, অপেক্ষার সংজ্ঞা বদলে গেছে। অথচ তাই বলে এতটা পরিবর্তন?একজন মানুষ কি সত্যিই এতটা অমনোযোগী হয়ে যেতে পারে, শুধুমাত্র আরেকজন মানুষের অনুপস্থিতিতে?

নাকি অনুপস্থিতিটা কেবল বাহ্যিক? কেউ কি তার ভেতরেই থেকে গিয়ে তার সমগ্র সত্তার বিন্যাসটাই বদলে দিয়েছে?
আয়াশ নিজের অজান্তেই সেই প্রশ্নগুলোকে মনের গভীরে ঠেলে দিলো।

“ এমন কিছুই না।”

“ একটা সময় মানুষের অনুভূতি থেমে যায়, যে অনুভূতি আমরা লালন করি তা ধীরে ধীরে কারো উপস্থিতিতে মিলন হয়ে পরে। তোমারও হয়েছে, সত্যিটা মেনে নাও।”

কথাগুলো শ্রবণেন্দ্রিয়ের সীমা অতিক্রম করে আয়াশের অন্তঃস্থলের গভীরতম কোনো প্রকোষ্ঠে গিয়ে যেন স্থির হয়ে রইলো। শ্রেয়ার উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ মস্তিষ্কের অলিন্দে প্রতিধ্বনিত হতে হতে ধীরে ধীরে এক অস্বস্তিকর সত্যের অবয়ব ধারণ করলো। ভাবনার অতল গহ্বরে তলিয়ে গেলো আয়াশ। সত্যিই কি এমন কিছু ঘটেছে? কবে থেকে? কীভাবে? কোথায় সেই পরিবর্তনের সূচনা, যার আগমনী বার্তা তার নিজের হৃদয়ও তাকে জানাতে পারেনি?

কই, সে তো টেরই পায়নি!

নিজেকে খুব ভালো করেই চেনে আয়াশ। নিজের অনুভূতির গতিপথ, নিজের ভালো লাগা, নিজের অনাগ্রহ, এমনকি নিজের নৈঃশব্দ্যের অন্তর্নিহিত অর্থটুকুও সে চিনতে জানে। নিজের মনের দরজায় কোন অনুভূতি এসে কড়া নাড়ছে, কোনটি নিঃশব্দে ফিরে যাচ্ছে, তার হিসাব বরাবরই তার নখদর্পণে ছিলো। তবুও এই পরিবর্তনের আগমন সে কেনো অনুভব করতে পারলো না? নাকি অনুভূতিটা এতদিন তার চোখের সামনেই দাঁড়িয়ে ছিলো, অথচ সে ইচ্ছাকৃতভাবেই তার অস্তিত্ব অস্বীকার করে এসেছে? প্রতি বছর যে মানুষটিকে ঘিরে এত আনন্দ, এত আয়োজন, এত স্মৃতিচারণ, সেই মানুষটির কথাই গত দুদিনে বিশেষভাবে মনে পড়েনি। অগণিত পুরোনো স্মৃতি, পরিচিত হাসি, অতীতের অসংখ্য মুহূর্তকে পেছনে ফেলে তার মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠেছে কেবল একজনের মুখ। ইনায়া।

তিনটি দিন কি তবে তাকে তিনটি বছরের উপলব্ধি একসঙ্গে বুঝিয়ে দিচ্ছে? সময়টা কেমন অদ্ভুতভাবে তিন সংখ্যাটির অলিন্দে আটকে আছে। তিন দিন, তিন বছর, আর সেই তিন বছরের বুকজুড়ে নীরবে শিকড় ছড়িয়ে থাকা অগণিত অনুভূতি। শ্রেয়া আয়াশের স্তব্ধ মুখশ্রী পানে তাকিয়ে মৃদু হাসলো। তার চোখের সম্মুখে যেন একজন মানুষ প্রথমবারের মতো নিজেরই অজানা সত্যের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। যে সত্য এতদিন তার কাছেই অচেনা ছিলো, আজ সেই সত্যই যেন সমস্ত আবরণ ছিন্ন করে তার সামনে দাঁড়িয়েছে।

“ তোমার অবশেষে মুক্তির সময় এসেছে আয়াশ, নিজেকে মুক্ত করে এই দায়বন্ধ থেকে।”

আয়াশ কেমন এক স্থির দৃষ্টিতে শ্রেয়ার পানে চাইলো।একই মুখশ্রী। একই অবয়ব। একই রকম চেনা কিছু রেখা। অথচ তারা একই মানুষ নয়। কখনো সে হাসতো, আর মনে হতো আকাশটাও বুঝি তার সঙ্গে খিলখিলিয়ে হাসছে। তার হাসির ক্ষীণতম রেশটুকুতেই আয়াশের সমগ্র পৃথিবী আলোয় ভরে উঠতো। সে যখন অশ্রু ঝরাতো, তখন মনে হতো তার নিজের অন্তঃস্থলেও কেউ নিঃশব্দে কাঁদছে। সে যখন অভিমানে রাগী চোখে তাকাতো, তখন আয়াশের গোটা দুনিয়া এক মুহূর্তের জন্য থমকে গিয়ে আবার অদৃশ্য কোনো টানে দুলতে শুরু করতো। তবে কি সবই ছিলো ভ্রম? এই তো এখনো আয়াশের মনে হচ্ছে, তার চোখের সম্মুখে অতি প্রিয় সেই মুখশ্রীটিই উপস্থিত। পরিচিত সেই অবয়ব, সেই চোখ, সেই চাহনি। অথচ সেই মুখশ্রী পানে চেয়ে আজ আর আগের মতো বুকের গভীরে সুখের স্পর্শ অনুভব করতে পারছে না। তাহলে দায়বদ্ধতা?

তার ভালোবাসা কি তবে কোনো এক অদৃশ্য দায়বদ্ধতার শিকলে আবদ্ধ ছিলো? এমন কোনো বন্ধন, যার অস্তিত্ব সে নিজেই এতদিন নিজের অনুভূতির নাম দিয়ে আড়াল করে রেখেছিলো? এমন কোনো অদৃশ্য শিকল, যেখান থেকে আজ তাকে মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলছে শ্রেয়া?

“ দায়বদ্ধ? আমার অনুভূতিকে দায়বদ্ধ মনে হয়?”

“ তোমার অনুভূতিকে আমি অসম্মান করছি না, তবে তুমি নিজেই নিজেকে একটা শিকলে বেঁধে রেখেছো। সেটাকে দায়বন্ধই বলা চলে, অনেকটা বছর তো হলো৷ এবার নাহয় নিজেকে মুক্ত করো।”

‘মুক্তি।’

কী অদ্ভুত একটি শব্দ! উচ্চারণে কতটা সহজ, অথচ নিজের জীবনের সঙ্গে সেই শব্দটুকু মিলিয়ে দেখতেই আয়াশের অন্তঃস্থল কেমন ভারী হয়ে উঠলো। অন্য কাউকে মুক্তির পথ দেখানো যত সহজ, নিজের পায়ের চারপাশে বছরের পর বছর পেঁচিয়ে থাকা অদৃশ্য শিকলগুলো ছিন্ন করা কি সত্যিই ততটাই সহজ?সে তো জানে না। অথবা জানে, কিন্তু মানতে চায় না।

“ মুক্ত করা কি এতোই সহজ?”

“ কেনো নয়? কিসের টানে আটকে থাকবে তুমি? প্রিয়ার জন্য? ও তো নেই, তাহলে এতো দায়বদ্ধতা কেনো?”

আয়াশের বুকের ভেতর কোথাও যেন কথাগুলো নিঃশব্দে এসে আঘাত করলো। কিসের টানে? কীসের জন্য? প্রিয়ার জন্যই কি এতদিন নিজেকে এভাবে আটকে রেখেছে সে?
তার অনুপস্থিতিতে যদি তাকে ভালোবাসতে না হয়, তবে এতদিনের ভালোবাসার অর্থটাই বা কী? মনের অন্দরে হঠাৎই ভেসে উঠলো এক চেনা অভিমানী মুখ। সেই চোখ দুটো যেন এখনো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। সেই চাহনির গভীরে যেন আজও অদৃশ্য কোনো অভিযোগ জমে আছে। ছয়টি বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও সেই অভিমান কি তবে তার হৃদয়ের কোনো এক গোপন প্রকোষ্ঠে জীবন্ত হয়ে রয়ে গেছে?

“ তার অনুপস্থিতিতে যদি তাকে ভালোবাসতে নাহয়, তার জন্য তাকে ভালোবাসিনি। ও রাগ করবে তো!”

শ্রেয়া কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আয়াশের দিকে। তারপর অত্যন্ত শান্ত অথচ নির্মম এক সত্য তার সামনে মেলে ধরলো।

“ রাগ জীবিতরা করে আয়াশ, মৃ’তদের কোনো রাগ নেই। ”

‘মৃ’ত।’

শব্দটা যেন আকস্মিক বজ্রপাতের ন্যায় আয়াশের কর্ণকুহরে আঘাত হানলো। একটি মাত্র শব্দ, অথচ তার অন্তঃস্থলের সমস্ত দরজা-জানালা যেন একই সঙ্গে কেঁপে উঠলো। দীর্ঘদিন ধরে যে সত্যকে সে স্মৃতির আড়ালে, অনুভূতির আবরণে, ভালোবাসার নামে লুকিয়ে রেখেছিলো, একটি শব্দই যেন তার সমস্ত আড়াল ভেদ করে দিলো। মৃ’ত।
হ্যাঁ। দেখতে দেখতে ছয়টি বছর পেরিয়ে গেছে। ছয়টি দীর্ঘ বছর ধরে এই ধরিত্রীর বুকে প্রিয়ার কোনো অস্তিত্ব নেই। নেই তার পদচিহ্ন, নেই কণ্ঠস্বর, নেই অভিমান, নেই হাসি। নেই সেই মানুষটি, যার উপস্থিতিকে কেন্দ্র করেই একসময় আয়াশের পৃথিবী পূর্ণতা পেতো। তবুও এত বছর পরেও কেনো তার মনে হয়, এই তো প্রিয়া আছে?এই তো সে কোথাও আছে।

হয়তো কোনো বিকেলের বিষণ্ন বাতাসে, কোনো পরিচিত গন্ধের আবেশে, কোনো পুরোনো স্মৃতির ভাঁজে, কিংবা গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় হঠাৎ ভেসে ওঠা কোনো মায়াবী অনুভূতির অন্তরালে। মৃ’ত্যু মানুষকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়।কিন্তু ভালোবাসার স্মৃতি থেকে কি সত্যিই সরিয়ে দিতে পারে?

“ যে স্মৃতিটুকু আছে সেটা মুছে ফেলো। আমি জানি, তুমি ভয় পাও যদি আবার ভালোবেসে হারিয়ে ফেলো। সবসময় ভাগ্য এক রকম হয় না আয়াশ। ভাগ্য পরিবর্তনশীল, তোমার ভাগ্যে প্রিয়া লিখা ছিলো না।”

শ্রেয়ার কথাগুলো আয়াশের অন্তঃস্থলে একের পর এক ঢেউ তুললো।ভয়।হ্যাঁ, হয়তো সে ভয়ই পায়।আবার ভালোবাসতে ভয় পায়।কারণ ভালোবাসার পর হারানোর যন্ত্রণা সে কেবল দেখেনি, নিজের অস্তিত্বের প্রতিটি স্তরে অনুভব করেছে। হারিয়ে যাওয়ার সেই শূন্যতা কতটা নির্মম হতে পারে, তা সে জানে। তাই দ্বিতীয়বার কোনো মানুষকে হৃদয়ের অলিন্দে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ার আগেই সে নিজের সমস্ত দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। অনুভূতির প্রতিটি জানালায় এঁটে দিয়েছে অনমনীয় পর্দা।কিন্তু ভাগ্য কি সত্যিই এতটা নির্মম?নাকি মানুষ নিজেই নিজের ভাগ্যের ওপর কিছু অনুভূতির নাম লিখে রাখে?প্রিয়া তার ভাগ্যে লেখা ছিলো না।তবুও তাকে ভালোবেসেছিলো সে। তাহলে ভালোবাসা কি সবসময় ভাগ্যের অনুমতি নিয়ে আসে?

নাকি কিছু ভালোবাসা ভাগ্যের বিধানকে অতিক্রম করেই মানুষের জীবনে এসে উপস্থিত হয়, তারপর সময়ের নির্মমতায় হারিয়ে গিয়েও হৃদয়ের ভেতর নিজের অস্তিত্ব অমোচনীয় করে রেখে যায়? শ্রেয়ার কথাগুলো থেমে যাওয়ার পরও শেষ বাক্যটি আয়াশের কর্ণকুহরে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো। একটি বাক্য, অথচ তার ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে বছরের পর বছর জমে থাকা অসংখ্য প্রশ্নের ভার। সমস্ত দ্বিধা, সমস্ত অনুশোচনা, সমস্ত অস্বীকারকে ছাপিয়ে তার অন্তরে কেবল একটি প্রশ্নই বারবার মাথা তুলে দাঁড়ালো।

“ যে ভাগ্যে নেই, তার জন্য এতো অগাধ ভালোবাসা কেনো?”

——

বিস্তীর্ণ নীলিমাজুড়ে মেঘপুঞ্জেরা দলবদ্ধ হয়ে ভেসে চলেছে উদ্দেশ্যহীনভাবে। আকাশের বুকে কাকপক্ষীরও কোনো হদিস নেই। প্রকৃতির মেজাজটাও যেন আজ বড়ই খামখেয়ালি। কখনো তার বিষণ্ণ মুখজুড়ে ঘন মেঘের আস্তরণ, আবার কখনো প্রখর রৌদ্রের তেজে চারদিক দগ্ধ হয়ে উঠছে। সকালেই গগন কাঁপিয়ে নেমে এসেছিল বর্ষণ, অথচ দুপুর গড়াতেই সেই আকাশ যেন সমস্ত স্নিগ্ধতা বিসর্জন দিয়ে প্রখর রৌদ্রতাপে ফুঁসে উঠেছে।

এই উত্তপ্ত পথের বুকে অবিরাম হেঁটে চলেছে ইনায়া। চারপাশের রাস্তাঘাট, অলিগলি, মানুষজন সবই তার কাছে অপরিচিত। নতুন শহরের প্রতিটি বাঁকেই তাই পদে পদে বিড়ম্বনার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। তবুও থেমে নেই সে। পেট চালাতে হলে কাজের সন্ধান তাকে করতেই হবে। জ্বর সেরেছে মাত্র দুই দিন হলো। অথচ শরীরের দুর্বলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি। হাঁটতে গেলেই শরীরের প্রতিটি অস্থিসন্ধি যেন নিজের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। তবুও থামার অবকাশ নেই। সঙ্গে থাকা সামান্য টাকাগুলোও যে আর বেশিদিন স্থায়ী হবে না। নতুন শহর, নতুন পরিবেশ, নতুন মানুষ। সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নিতে খানিকটা সময় তো লাগবেই।

ইনায়া মূলত একটা সাইবার ক্যাফে কিংবা কম্পিউটারের দোকান খুঁজছে। ঢাকায় থাকার সময় আয়াশ তাকে একটা ল্যাপটপ কিনে দিয়েছিল ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজের জন্য। এতদিন সেটাই ব্যবহার করেছে সে। কিন্তু বাড়ি ছেড়ে আসার সময় সঙ্গে করে কিছুই আনেনি ইনায়া। আনার ইচ্ছেটুকুও তার ছিল না। এখন আপাতত এভাবেই নিজের ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ চালিয়ে নিতে হবে। তার বেশ ভালো কিছু ক্লায়েন্ট রয়েছে। সেখান থেকে মোটামুটি ভালোই আয় হয়। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে টাকা জমিয়ে একটি ভালো ল্যাপটপ কিনে নেবে সে। এই মুহূর্তে কাজ চালানোর জন্য কম্পিউটারের দোকানে ঘণ্টা হিসেবে টাকা দিয়ে বসতে হবে।
দীর্ঘক্ষণ খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একটি সাইবার ক্যাফের দেখা পেলো ইনায়া। ভেতরে ঢুকে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলে নিলো। দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা বসার জন্য পঞ্চাশ টাকা। সময় যত বাড়বে, টাকার পরিমাণও তত বাড়বে।

সবকিছু ঠিকঠাক করে বেরিয়ে এলো সে। এখন কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনা দরকার। হাতে টাকা না আসা পর্যন্ত এই সামান্য অর্থ দিয়েই তাকে দিন গুজরান করতে হবে। হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে একটা লোকাল মার্টে এসে পৌঁছালো ইনায়া। ভেতরে ঢুকে নিজের সামর্থ্যের মধ্যে সবচেয়ে কম দামের একটি কম্বল কিনে নিলো। ঠান্ডা হোক কিংবা গরম, কম্বল ছাড়া তার ঘুম আসে না।এরপর আরও কিছু প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনে মেসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলো।

মেসের নিয়মটা বেশ সহজ। সবাই একসঙ্গেই রান্না করে, একসঙ্গেই খায়। কেউ আলাদা করে নিজের জন্য রান্না করে না। মাসের খরচ সবাই সমান ভাগে বহন করে। প্রয়োজনীয় সবকিছু একসঙ্গেই কেনা হয়। আর রান্নার দায়িত্বও ভাগ করে নেওয়া। একেকজন একেক দিন রান্না করে। সবকিছুই মিলেমিশে করা হয়। আজ রান্নার পালা ইনায়ার। মেয়েগুলো তার অসুস্থতার সময় যে যত্ন নিয়েছে, তা কোনোদিন ভুলতে পারবে না ইনায়া। অপরিচিত একটি শহরে এসে এই অচেনা মানুষগুলোর কাছ থেকে পাওয়া সামান্য মমতাটুকুও তার কাছে যেন একখণ্ড আশ্রয়ের সমান।এর জন্য তাদের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে সে।

রাস্তা পার হওয়ার জন্য ইনায়া সামনের দিকে পা বাড়াতেই আচমকা বিকট শব্দে একটি বাইক ছুটে এলো। অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ছুটে আসা বাইকটি যেন মুহূর্তের মধ্যেই তার একেবারে নিকটবর্তী হয়ে গেল। সরে যাওয়ার মতো সময়টুকুও পেলো না ইনায়া। তার আগেই বাইকটি দ্রুতগতিতে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। ভারসাম্য হারিয়ে পিচঢালা রাস্তায় আছড়ে পড়লো ইনায়ার শরীর। এমনিতেই দুর্বল শরীর। তার ওপর এমন আকস্মিক আঘাত। পড়ে যেতেই পেটের ভেতর তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হলো। ব্যথার তীব্রতায় অনিচ্ছাকৃতভাবেই আর্তনাদ করে উঠলো সে। কিন্তু নিজের ব্যথার কথা ভুলে গেল মুহূর্তেই। ঘর্ষণে ছুলে যাওয়া হাতটি কাঁপতে কাঁপতে নিজের পেটের ওপর রাখলো ইনায়া।

এইখানে তো আরও একজন রয়েছে। তার হাতের চামড়া রাস্তার ঘর্ষণে ছুলে গেছে। পায়েরও বেশ কিছু অংশে আঘাত লেগেছে। সেখান থেকে র’ক্তের ক্ষীণ ধারা গড়িয়ে পড়ছে।
তবুও সেসবের দিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই তার। পেটের ভেতর থাকা সেই ছোট্ট প্রাণটির কথাই যেন সমস্ত চিন্তাকে গ্রাস করে নিয়েছে। ইনায়ার পড়ে যাওয়া দেখে কয়েকজন মানুষ দ্রুত এগিয়ে এলো। ছুটে পালিয়ে যাওয়া বাইকটির দিকে তাকিয়ে সাধারণ মানুষজন ক্ষোভে গালিগালাজ করতে লাগলো। তাদের মধ্য থেকেই একজন এগিয়ে এসে ইনায়াকে ধরাধরি করে উঠিয়ে দিলো। এমনিতেই দুর্বল শরীর, তার ওপর এমন আকস্মিক ধাক্কা।

কোনোমতে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আবারও পেটের ওপর হাত রাখলো ইনায়া। ভেতরটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠছে। হাতের পাশাপাশি পায়ের বেশ কিছু জায়গাও ছুলে গেছে। ছোপ ছোপ রক্ত বেরিয়ে এসে ত্বকের ওপর লেগে আছে। কিন্তু সেই ব্যথাকেও উপেক্ষা করলো সে। দাঁতে দাঁত চেপে পেটের ওপর হাত রেখে ভিতরে বেড়ে ওঠা ছোট্ট প্রাণটির উদ্দেশ্যে ভয়াতুর কণ্ঠে বলে উঠলো-

“ কষ্ট হচ্ছে তোমার? একটু কষ্ট সহ্য করে নাও কেমন? মা’কে আর একটু সময় দাও, মা তোমাকে কষ্ট পেতে দিবো না।”

“ ঠিক আছেন?”

একজন জিজ্ঞেস করলো।

ইনায়া ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করলো। কিন্তু ব্যথা আর আতঙ্কের ভারে সেই হাসিটুকুও মুখে স্থায়ী হলো না। তবুও কোনো রকমে নিজেকে সামলে বলে উঠলো,

“ ভাইয়া একটা রিক্সা ঠিক করে দিন, তাহলে খুব উপকার হতো।”

লোকটি দ্রুত একটি রিকশার ব্যবস্থা করে দিলেন। ইনায়া ধীরে ধীরে উঠে বসলো। ভেবেছিল, এইটুকু পথ হেঁটেই চলে যাবে। তাতে কয়েকটা টাকা বেঁচে যেত। এই সামান্য অর্থও এখন তার কাছে কম নয়। কিন্তু শরীর আর সেই অনুমতি দিলো না। রিকশা চলতে শুরু করলো। চাকার ঘূর্ণনের সঙ্গে সঙ্গে পেছনে পড়ে রইলো ব্যস্ত রাস্তাঘাট, অচেনা শহর আর অসংখ্য অপরিচিত মুখ। ইনায়ার গাল বেয়ে নিঃশব্দে দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো। কেন কাঁদছে সে? নিজেকেই যেন প্রশ্ন করলো ইনায়া। পরক্ষণেই নিজের মনকে ধমকে উঠলো-

“ এতো কাঁদছিস কেনো? এর আগেও তুই একাই ছিলি,ক্ষণিকের মায়া লাগিয়ে সব ভুলে গেছিস?”

আবারও পেটের ওপর হাত রাখলো সে। ভয় হচ্ছে। মাত্র একটু অসাবধানতার কারণে আজ কত বড় অঘটন ঘটে যেতে পারতো! এই ছোট্ট প্রাণটির কথা ভেবেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো তার। তার আরও সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করা উচিত ছিল। নিজের অমনোযোগিতার জন্য নিজেরই ভীষণ অপরাধী মনে হলো ইনায়ার। কাঁপা হাতের তালু পেটের ওপর রেখে অতি মমতায় ভেতরে বেড়ে ওঠা প্রাণটির সঙ্গে কথা বললো সে-

“ ইসস সোনা! মা তোমাকে বেশি কষ্ট দিচ্ছি তাই না? মা’কে মাফ কর কেমন? বার বার এই ভাবে আঘার পাচ্ছো আমার ভুলের কারণে।”

#চলবে