#Out_Of_Bounds
#Ishrat_Jahan_Jarin
#part_1
জ্যাক্সন মিলারের জীবনে নারীর অস্তিত্ব মানেই পারফিউমের ক্ষনস্থায়ী সুবাস। পারফিউমের সুগন্ধ বাতাসে কতক্ষণ থাকে জানো? যতক্ষণ সেই সুগন্ধটা অন্য কাউকে মাতাল করে রাখতে চায়। জ্যাক কোনো সম্পর্কে জড়ায় না, কারণ খাঁচায় বন্দি হওয়া তার স্বভাব নয়। আজ রাতে তুমি তার পারফিউমের গন্ধে মাতাল হতে পারো, তার বাহুবন্ধনে আসতে পারো, কিন্তু সকাল হতেই সে আবার মুক্ত। এই শর্তে যদি খেলায় নামতে চাও, তবে নেমে পড়ো।
ঘড়িতে তখন রাত একটা বেজে পনেরো মিনিট। বোস্টনের বিলাসবহুল নাইটক্লাব ‘দ্য ভেলভেট রুম’-এর ভিআইপি লাউঞ্জের করিডোরে আলো-আঁধারির খেলা চলছে। লাল আর নীল নিয়ন আলো এসে পড়েছে দেয়ালে ঝুলানো দামি ওয়েলভেটের পর্দায়। চারপাশের স্পিকার থেকে ভেসে আসা ভারী বেজের মিউজিক এই করিডোরে এসে মৃদু কম্পন তৈরি করছে। দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ছয় ফুট চার ইঞ্চির একটা দানবীয় শরীর। জ্যাক্সন ‘জ্যাক’ মিলার। বাস্কেটবল কোর্টের বিধ্বংসী শুটিং গার্ড আজ রাতের পার্টিতেও সমানভাবে ডমিনেটিং। তার গায়ের কালো শার্টের ওপরের দুটো বোতাম খোলা, কপালে এসে পড়েছে কিছুটা অবিন্যস্ত ব্লন্ড চুল। তার শরীর থেকে ভেসে আসছে তীব্র, সম্মোহনী সুগন্ধ। মিলার অ্যারোমাটিকস এর তৈরি নিজস্ব এই পারফিউমের নাম ব্ল্যাক ওড অ্যান্ড হোয়াইট মাস্ক – কাস্টম ব্লেন্ড। ব্ল্যাক ওড আর হোয়াইট মাস্কের এক রাজকীয় ব্লেন্ড। এই সুগন্ধটা শুধু জ্যাকের জন্যই কাস্টমাইজড।
তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক তরুণী। মেয়েটি জ্যাকের চওড়া বুকের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে বলল, “সবাই বলে তুমি নাকি বড্ড নিষ্ঠুর, জ্যাক। কোর্টে যেমন, কোর্টের বাইরেও তেমন?”
জ্যাকের ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে মেয়েটির থুতনিটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরল। তার ধূসর চোখের দৃষ্টিতে বিপজ্জনক হাতছানি। সে নভারী গলায় বলল,
“নিষ্ঠুর? নো ডার্লিং, আমি আসলে নিষ্ঠুর নই। আমি শুধু জানি আমার কী চাই, আর সেটা আমি আদায় করতে ভালোবাসি। লোকে সেটাকে নিষ্ঠুরতা বললে আমার কী করার আছে বলো? আর কোর্টের বাইরের কথা যদি জানতে চাও… আমি নিয়ম মেনে চলতে বড্ড অপছন্দ করি। নিয়ম ভাঙাটাই আমার জীবনের সবচেয়ে প্রিয় খেলা।”
মেয়েটি জ্যাকের আরও কাছে ঘেঁষে এল। তার চোখের পাতা অলস হয়ে আসছে। সে ফিসফিসিয়ে বলল, “তাহলে আজ রাতে কোনো নিয়ম ভাঙছ?”
জ্যাক তার দীর্ঘ শরীরটা নিয়ে মেয়েটার ওপর কিছুটা ঝুঁকে পড়ল। তার গরম নিশ্বাস মেয়েটার ঘাড়ে লাগতেই মেয়েটি শিউরে উঠল। জ্যাক বলল, “আজ রাতে কোনো নিয়ম থাকবেই না। তুমি শুধু বলবে কতটা গভীরে যেতে চাও। তবে একটা কথা মনে রেখো, আমার ডিকশনারিতে ‘সম্পর্ক’ বা ‘প্রেম’ বলে কোনো শব্দ নেই। ওয়ান নাইট, নো স্ট্রিংস অ্যাটাচড। যদি এই শর্তে রাজি থাকো, তবেই আমার লাউঞ্জের চাবি তোমার ব্যাগে যাবে। অন্যথায়, দরজার বাইরে আরও ডজনখানেক মেয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে।” মেয়েটি এক সেকেন্ডও দ্বিধা করল না। সে জ্যাকের জ্যাকেটের পকেট থেকে চাবিটা বের করে নিয়ে হাসল। জ্যাকও মৃদু হাসল। এই আত্মসমর্পণ তার খুব চেনা। সে মিলার পরিবারের একমাত্র উত্তরাধিকারী, শহরের সবচেয়ে বড় পারফিউম ও রিয়েল এস্টেট মোগলের ছেলে। টাকা, ক্ষমতা আর রূপের এমন মারণাত্মক কম্বিনেশন যার থাকে, তার দিকে মেয়েরা এভাবেই ছুটে আসে। বাড়ি বলতে তার এক বিলাসবহুল প্রাসাদ আছে বটে, কিন্তু সেখানে তার মন টেকে না। রাত হলেই সে ক্লাবে, হোটেলে কিংবা নিজের পেন্টহাউসে কাটাতে ভালোবাসে। সে এই শহরের ‘গোল্ডেন বয়’। ঠিক তখনই করিডোরের শেষ মাথার ভারী ওক কাঠের দরজাটা একটা খটখট শব্দে খুলে গেল। সেই কর্কশ শব্দে জ্যাকের করিডোরের মায়াবী আবহাওয়াটা এক ঝটকায় ভেঙে গেল। ভারী বুটের সুনির্দিষ্ট আওয়াজ তুলে করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছে একটা মেয়ে। পরনে একদম সাধারণ একটা নীল জিন্স আর ওভারসাইজড ধূসর সোয়েটার, চুলে খোলা। । তার এক হাতে ইউনিভার্সিটির কিছু ফিনান্সের ফাইল আর অন্য কাঁধে একটা ল্যাপটপ ব্যাগ। মেয়েটি আর কেউ নয় নাম ক্লারা বেনেট। জার্মানির মিউনিখের এক অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া মেয়ে। ছোটবেলা থেকেই অভাব আর একাকীত্বকে সঙ্গী করে বড় হয়েছে। আজ সে নিজের মেধা আর যোগ্যতায় এই নামী ইউনিভার্সিটির টপ স্কলারশিপ হোল্ডার। তার জীবনে একটাই লক্ষ্য পড়াশোনা শেষ করে নিজের স্বপ্ন পূরণ করা, যাতে জীবনের বাকি দিনগুলোতে আর কখনো অভাবের মুখ দেখতে না হয়। প্রেম-ভালোবাসা কিংবা বড়লোকের ছেলেদের সে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে।
ক্লারা ল্যাপটপ ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করতে করতে এই করিডোর দিয়ে যাচ্ছিল প্রফেসরের দেওয়া একটা ইমার্জেন্সি ফাইল সাবমিট করতে। কিন্তু মাঝপথে জ্যাক আর ওই মেয়েটির এই অতি-ঘনিষ্ঠ অবস্থা দেখে সে এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়াল। তার চোখে কোনো লজ্জা বা সংকোচ নেই, বরং সেখানে উপচে পড়ছে তীব্র ঘৃণা আর চরম বিরক্তি। যেন সে কোনো দামি পারফিউম পরা ডাস্টবিনের দিকে তাকাচ্ছে। জ্যাক সাধারণত কোনো মেয়ের চোখে নিজের জন্য এই লুক দেখতে অভ্যস্ত নয়। সে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে একটা চোখ টিপল। কিন্তু ক্লারা বেনেট যা করল, তা জ্যাক মিলার তার চব্বিশ বছরের জীবনে কোনো মেয়ের থেকে কল্পনাও করেনি। ক্লারা এক সেকেন্ডের জন্য দাঁড়াল, জ্যাকের পা থেকে মাথা পর্যন্ত তার সেই অহংকারী ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির শরীরের দিকে তাকাল, আর জার্মানি ভাষায় নিচু স্বরে বিড়বিড় করল, “অ্যাবশিলিশ” মানে জঘন্য। তারপর ইংরেজিতে স্পষ্ট গলায় বলল, “রাস্তাটা ছাড়বেন মিস্টার মিলার? আপনার এই নোংরামি দেখার মতো ফালতু সময় আমার নেই। কিছু মানুষ ডাস্টবিনেই মানায়, দয়া করে করিডোরটা ব্লক করবেন না।” জ্যাকের মুখের সেই উইকেড হাসিটা এক ঝটকায় মিলিয়ে গেল। করিডোরের আবছা আলোতেও তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। ক্লারা এক মুহূর্তও অপেক্ষা করল না। এমনিতেও ক্লারা বেনেট প্রফেসরের দেওয়া ইমার্জেন্সি ফাইলটা ক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে থাকা তার ব্যক্তিগত সহকারীর কাছে জমা দিয়ে ফিরছিল। প্রফেসরের এই খামখেয়ালিপনার জন্য এই নোংরা নাইটক্লাবে আসতে হওয়ায় মনে মনে সে প্রচণ্ড বিরক্ত। তার ভারী বুটের শব্দ তুলে সে জ্যাককে পাশ কাটিয়ে হড়হড় করে করিডোর পার হয়ে চলে গেল। তার যাওয়ার পথে বাতাসের হালকা একটা ঝাপটা দিয়ে গেল। জ্যাক স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার সাথে থাকা মেয়েটি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “কে এই অভদ্র মেয়েটা, জ্যাক? চলো আমরা ভেতরে যাই…”
“লিভ,” জ্যাকের গলা থেকে একটা ঠান্ডা শব্দ বের হলো।
“হোয়াট?” মেয়েটি অবাক।
“আই সেড, লিভ। আজ রাতের মতো পার্টি শেষ,” জ্যাক মেয়েটার দিকে না তাকিয়েই করিডোরের দেয়াল থেকে নিজের শরীরটা সোজা করল। তার দীর্ঘ অবয়বটা এখন আরও ভয়ংকর দেখাচ্ছে। মেয়েটি আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না, চাবিটা রেখে দ্রুত পায়ে চলে গেল। জ্যাক একা দাঁড়িয়ে রইল। তার ডান হাতের আঙুলগুলো মুঠো পাকিয়ে উঠল। ক্লারা বেনেট। নামটা সে চেনে। ইউনিভার্সিটির নোটিশ বোর্ডে সবসময় এই জার্মান মেয়ের নাম সবার ওপরে থাকে। কিন্তু ক্লাসের বাইরে এই মেয়ের সাথে তার কখনো কথা হয়নি। আর আজ? সে তাকে ডাস্টবিন বলল? তাকে, যার একটা ইশারায় পুরো শহরের মেয়েরা লাইন দেয়? জ্যাক লাউঞ্জ থেকে বের হয়ে সোজা চলে এল ক্লাবের পেছনের প্রাইভেট পার্কিং লটে। সেখানে পার্ক করা আছে তার সবচেয়ে প্রিয় খেলনা, একটি ডার্ক ক্রিমসন রঙের “Rolls-Royce La Rose Noire Droptail গাড়িটি। চাঁদের আলোয় গাড়ির সেই গাঢ় লাল রঙটা রক্তের মতো জ্বলজ্বল করছে। জ্যাক গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। স্টিয়ারিং হুইলে হাত রাখতেই তার মাথায় ক্লারার সেই নীল চোখের তীব্র অবজ্ঞার দৃষ্টিটা ভেসে উঠল। গাড়ি স্টার্ট দিতেই ইঞ্জিনটা গর্জন তুলে জেগে উঠল। বোস্টনের সুনসান রাস্তা দিয়ে গাড়িটা তীরের মতো ছুটে চলল। কিন্তু জ্যাকের মাথায় তখন অন্য ঝড়। সে স্পিডোমিটারের দিকে তাকাল, গতি একশো পার হয়ে গেছে। সাধারণত গতি তাকে আনন্দ দেয়, কিন্তু আজ দিচ্ছে না। তার মনে হচ্ছে, ক্লারা বেনেট নামের ওই সাধারণ মেয়েটা তার অহংকারের গায়ে একটা বড়সড় আঁচড় কেটে দিয়ে গেছে।
“ডাস্টবিন?” জ্যাক নিজের মনেই হাসল। সে বিড়বিড় করল, “তুমি ভুল মানুষের সাথে পাঙ্গা নিয়েছ, ক্লারা বেনেট। মিলারদের কেউ কখনো এভাবে অপমান করে পার পায়নি।”
–
পরদিন সকালে ইউনিভার্সিটির বাস্কেটবল প্র্যাকটিস গ্রাউন্ডে জ্যাকের পারফর্ম্যান্স ছিল দেখার মতো। সে যেন আজ কোর্টে আগুন ঝরাচ্ছে। একের পর এক পারফেক্ট থ্রি-পয়েন্টার শট জাল চিরে ভেতরে ঢুকছে। টিমের কোচ দূর থেকে দেখে শিষ দিয়ে উঠলেন, “জ্যাক আজ ফর্মে আছে!” কিন্তু জ্যাকের দলের অন্য প্লেয়াররা জানত, জ্যাক যখন অতিরিক্ত রেগে থাকে বা ফোকাসড থাকে, তখনই সে এমন বিধ্বংসী খেলে। প্র্যাকটিস শেষে লকার রুমে যখন জ্যাক নিজের গায়ের ঘাম মুছছিল, তখন তার বন্ধু কোল এসে বলল, “কী রে জ্যাক? কাল রাতের পার্টিতে কোনো ঝামেলা হয়েছে নাকি? তোকে দেখে মনে হচ্ছে তুই কাউকে খুন করতে চাস।” জ্যাক তার লকারটা দড়াম করে বন্ধ করে বলল, “কোল, আমাদের ফিনান্স ডিপার্টমেন্টের ক্লারা বেনেট মেয়েটাকে চিনিস?”
কোল একটু ভেবে বলল, “ওহ, ওই জার্মান মেয়েটা? যে সবসময় বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে থাকে? হ্যাঁ চিনি। অসম্ভব সুন্দরী কিন্তু বড্ড অহংকারী। কেন, কী হয়েছে?”
জ্যাক তার ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে অদ্ভুত ভঙ্গিতে হাসল, “কিছু না। জাস্ট জানতে ইচ্ছা করল।”
–
দুপুর দুটো। ইউনিভার্সিটির ফিনান্সিয়াল অ্যানালিসিস ক্লাসের পর প্রফেসর ডক্টর রিচার্ডসন সবাইকে থামতে বললেন। ক্লারা তখন নিজের খাতা-কলম ব্যাগে ভরছিল। প্রফেসর চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে বললেন, “সবাই একটু শোনো। তোমাদের এই সেমিস্টারের সবচেয়ে বড় প্রজেক্ট, ‘গ্লোবাল মার্কেট ইনভেস্টমেন্ট’-এর জন্য আমি টিম তৈরি করে দিয়েছি। এই প্রজেক্টের ওপর তোমাদের ফাইনাল গ্রেডের ৪০% নির্ভর করছে। আর হ্যাঁ, পার্টনার আমি নিজেই সিলেক্ট করেছি, কোনো চেঞ্জ হবে না।” ক্লারা মনে মনে প্রার্থনা করল, যেন কোনো ফাঁকিবাজ ছেলের সাথে তার নাম না পড়ে। সে একা কাজ করতেই অভ্যস্ত। কিন্তু প্রফেসর যখন একে একে নাম ডাকতে লাগলেন, তখন ক্লারার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাওয়ার উপক্রম হলো।
“টিম নম্বর সেভেন ক্লারা বেনেট এবং জ্যাক্সন মিলার।” পুরো ক্লাসে একটা মৃদু গুঞ্জন উঠল। ক্লারা স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল প্রফেসরের দিকে। সে দ্রুত প্রফেসরের ডেস্কের সামনে গিয়ে বলল, “এক্সকিউজ মি প্রফেসর। আমি এই প্রজেক্টটা একা করতে চাই। আমার কোনো পার্টনারের প্রয়োজন নেই।”
প্রফেসর রিচার্ডসন মাথা নাড়লেন, “দুঃখিত ক্লারা। এটা একটা টিম প্রজেক্ট। আর মিস্টার মিলারের ফিনান্সের গ্রেড দিন দিন কমছে। বাস্কেটবল টিমে টিকতে হলে এই প্রজেক্টে তার এ গ্রেড পাওয়া জরুরি। তোমার মতো একজন টপ স্টুডেন্টের সাথে থাকলে সে হয়তো কিছু শিখতে পারবে।”
ক্লারা পাশ ফিরে তাকাল। ক্লাসের পেছনের বেঞ্চে বসে আছে জ্যাক্সন মিলার। তার মুখে অলস হাসি। সে ক্লারার দিকে তাকিয়ে এমন একটা ভাব করল যেন সে নিজেই এই ব্যাপারে খুব অবাক হয়েছে। কিন্তু ক্লারা বোকা নয়। সে স্পষ্ট বুঝতে পারল, এর পেছনে কোনো চাল আছে। ক্লাস থেকে বের হওয়ার পর করিডোরে ক্লারার পথ আটকে দাঁড়াল সেই ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির শরীর। জ্যাকের গা থেকে আবার সেই সিগনেচার ব্ল্যাক ওড পারফিউমের সুগন্ধ ভেসে আসছে। “হ্যালো, পার্টনার,” জ্যাক নিচু স্বরে বলল।
ক্লারা তার ফাইলগুলো বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “শুনুন মিস্টার মিলার। আমি জানি না আপনি প্রফেসরকে কী খাইয়েছেন বা কীভাবে রাজি করিয়েছেন। কিন্তু আমি আপনাকে সাফ জানিয়ে দিচ্ছি, এই প্রজেক্টের পুরো কাজ আমি একাই করব। আপনার মতো কোনো বিগড়ে যাওয়া বড়লোকের ছেলের সাহায্য আমার লাগবে না। আপনি শুধু প্রেজেন্টেশনের দিন এসে মুখ দেখাবেন, আর আপনার গ্রেড পেয়ে যাবেন। আমার সাথে কথা বলার বা আমার আশেপাশে আসার কোনো চেষ্টা করবেন না।”
জ্যাক এক পা এগিয়ে এল। ক্লারা কিছুটা পিছিয়ে যেতে চাইল, কিন্তু তার পিঠ গিয়ে ঠেকল করিডোরের দেয়ালে। জ্যাক তার একটা হাত ক্লারার মাথার পাশে দেয়ালে রাখল। তাদের মধ্যকার দূরত্ব এখন মাত্র কয়েক ইঞ্চি। জ্যাক ক্লারার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি বড্ড বেশি কথা বলো, ক্লারা। আর বড্ড বেশি এজাম্পশন তোমার। আমি প্রফেসরকে কোনো ঘুষ দিইনি। কিন্তু যেহেতু আমরা পার্টনার, আর আমার গ্রেডটা দরকার, তাই আমি তোমাকে একটা ডিল অফার করতে এসেছি।”
“কীসের ডিল?” ক্লারার গলায় রাগ ও সতর্কতার মিশ্রণ।
জ্যাক পকেট থেকে একটা ব্ল্যাঙ্ক চেক বের করে ক্লারার ফাইলের ওপর রাখল। “আমি জানি তুমি স্কলারশিপে পড়ালেখা করো। অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছ, টাকার কষ্ট কেমন সেটা আমি না জানলেও আন্দাজ করতে পারি। এই চেকে তুমি তোমার ইচ্ছামতো অ্যামাউন্ট বসিয়ে নাও। বিনিময়ে, তুমি এই প্রজেক্টের সব অ্যাসাইনমেন্ট আর এক্সাম পেপার আমার জন্য রেডি রাখবে। আমাকে যেন এক মিনিটের জন্যও লাইব্রেরিতে বসে মাথা ঘামাতে না হয়।” ক্লারা চেকে এক নজর তাকাল। তারপর সেই চেকটা দুই টুকরো করে ছিঁড়ে জ্যাকের মুখের ওপর ছুড়ে মারল। চেরে টুকরোগুলো জ্যাকের চওড়া বুকে লেগে নিচে মেঝেতে পড়ে গেল। ক্লারা তার তীক্ষ্ণ নীল চোখ দুটো জ্যাকের চোখে নিবদ্ধ করে বলল, “জার্মানিতে একটা কথা আছে, মিস্টার মিলার, “টাকা দিয়ে কুকুর কেনা যায়, মানুষের মগজ নয়।” আপনার ওই নোংরা টাকা আপনার পকেটেই রাখুন। আপনার এই অহংকার আর এই টাকার গরম আমি আমার পায়ের নিচে রাখি। আজ থেকে আমাদের চুক্তি একটাই প্রজেক্টের কাজ হবে লাইব্রেরিতে, অফিশিয়াল টাইমে। এর বাইরে আমার সাথে কোনো যোগাযোগের চেষ্টা করলে আমি ডিনের কাছে কমপ্লেন করব।” ক্লারা জ্যাককে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে গেল। জ্যাক মেঝেতে পড়ে থাকা ছেঁড়া চেকের টুকরোগুলোর দিকে তাকাল। তার চোয়ালের হাড় শক্ত হয়ে উঠল। কিন্তু এবার তার রাগ হলো না, তার ভেতরে জেদ আরও চাড়া দিয়ে উঠল।
সে ফিসফিসিয়ে বলল, “পায়ের নিচে রাখো? আচ্ছা ক্লারা… দেখা যাক কে কার পায়ের নিচে আসে।”
–
রাত কয়টা বাজে কে জানে? জ্যাক তার বিলাসবহুল পেন্টহাউসের বিশাল লিভিং রুমে বসে আছে। চারপাশ অন্ধকার, শুধু তার সামনে থাকা তিনটি বিশাল মনিটরের আলো এসে পড়েছে তার মুখে।
খুব কম মানুষই জানে যে, জ্যাক্সন মিলার শুধু বাস্কেটবল কোর্টের স্টার নয়, টেকনোলজি আর কোডিংয়ের দুনিয়াতেও সে এক অপ্রকাশিত জিনিয়াস। ছোটবেলা থেকেই একাকীত্ব কাটাতে সে কম্পিউটারের ডার্ক ওয়ার্ল্ডে সময় কাটিয়েছে। আজ রাতে তার সেই সুপ্ত প্রতিভা এক নতুন উদ্দেশ্যে জেগে উঠেছে। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর ঝড়ের গতিতে চলতে লাগল। স্ক্রিনে লাইনের পর লাইন গ্রিন কোড ভেসে উঠছে। সে ইউনিভার্সিটির মেইন সার্ভার হ্যাক করে ক্লারা বেনেটের সমস্ত প্রোফাইল নিজের স্ক্রিনে নিয়ে এল।
“ক্লারা বেনেট। বয়স বাইশ। জন্ম: মিউনিখ, জার্মানি। সেন্ট মেরি অনাথ আশ্রমে বড় হওয়া…” জ্যাক স্ক্রিনে থাকা ক্লারার একটা সাধারণ পাসপোর্ট সাইজ ছবির দিকে তাকিয়ে পড়তে লাগল। ছবিতে ক্লারার মুখে কোনো হাসি নেই, এক জোড়া শান্ত, দৃঢ় চোখ ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছে। জ্যাক মাউস স্ক্রোল করল। ক্লারার দৈনিক রুটিন, তার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যেখানে মাত্র কয়েকশো ডলার পড়ে আছে, তার ফোন নম্বর সব এখন জ্যাকের হাতের মুঠোয়। সে এখানেই থামল না। ক্লারার ব্যবহৃত পুরনো ল্যাপটপ আর ফোনের আইপি অ্যাড্রেস ট্র্যাক করে সে একটা স্পাইওয়্যার ইনস্টল করে দিল। এখন থেকে ক্লারা ফোনে কার সাথে কথা বলছে, ইন্টারনেটে কী সার্চ করছে, এমনকি তার ল্যাপটপের ওয়েবক্যাম দিয়ে সে কী করছে সবকিছু জ্যাক এই ঘরে বসে লাইভ দেখতে পাবে। স্ক্রিনে ক্লারার ল্যাপটপের ওয়েবক্যামের ফিডটা চালু হলো। জ্যাক দেখতে পেল, ক্লারা তার ছোট্ট ডর্ম রুমের টেবিলে বসে একটা টেবিল ল্যাম্পের আলোয় পড়াশোনা করছে। তার চশমাটা নাকের ডগায় নেমে এসেছে। সে খুব মনোযোগ দিয়ে ফিনান্সের কিছু নোট তৈরি করছে। মাঝে মাঝে সে ক্লান্ত হয়ে কপালে হাত দিচ্ছে, আবার এক চুমুক কফি খেয়ে কাজে মন দিচ্ছে। জ্যাক মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ধূসর চোখে পৈশাচিক আনন্দ। সে গ্লাসে থাকা দামি হুইস্কিতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, “তুমি ভাবছ তুমি খুব স্বাধীন, তাই না ক্লারা? তুমি ভাবছ ওই সামান্য স্কলারশিপ আর জেদ দিয়ে তুমি দুনিয়া জয় করবে? কিন্তু তুমি জানো না, আজ রাত থেকে তোমার প্রতিটা নিশ্বাসের ওপর আমার নিয়ন্ত্রণ।” ঠিক তখনই স্ক্রিনে দেখা গেল, ক্লারার ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠেছে। কেউ একজন তাকে মেসেজ করেছে।
জ্যাক দ্রুত তার সিস্টেমে মেসেজটা ইন্টারসেপ্ট করল। মেসেজটা পাঠিয়েছে লিয়ো নামের এক স্টুডেন্ট, যে ক্লারার ক্লাসেই পড়ে। মেসেজে লেখা, “হাই ক্লারা, কাল কি লাইব্রেরিতে একসাথে লাঞ্চ করবে? প্রজেক্টের ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।” লিয়োর মেসেজটা দেখামাত্রই জ্যাকের হাতের কাঁচের গ্লাসটা সশব্দে টেবিলের ওপর আছাড় খেল। তার চোখে-মুখে তীব্র হিংস্রতা ফুটে উঠল। তার খেলনা, তার শিকারের দিকে অন্য কেউ হাত বাড়াবে? এটা সে সহ্য করবে না। জ্যাক কিবোর্ডে কয়েকটা কমান্ড টাইপ করল। লিয়ো নামের ওই ছেলেটার সমস্ত প্রোফাইল, তার ইউনিভার্সিটির রেকর্ড এক সেকেন্ডে স্ক্রিনে চলে এল। জ্যাক ঠান্ডা মাথায় লিয়োর অ্যাকাউন্টের কিছু ব্যক্তিগত চ্যাট আর অ্যাসাইনমেন্টের ফাইল ডিলিট করে দিল এবং ইউনিভার্সিটির ডিসিপ্লিনারি কমিটির কাছে লিয়োর নাম থেকে একটা ফেক চিপিং কমপ্লেন মেইল পাঠিয়ে দিল।
“আগামী এক সপ্তাহ তোমাকে ইউনিভার্সিটির ডিটেনশন রুমে কাটাতে হবে, লিয়ো,” জ্যাক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে ক্রূর হাসল। “ক্লারা বেনেটের আশেপাশে আসার শাস্তি এটাই।”
–
পরদিন বিকেল চারটে। ইউনিভার্সিটির কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির চারতলার একটা নির্জন কর্নারে বসে আছে ক্লারা। টেবিলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বড় বড় ফিনান্সিয়াল জার্নাল। সে ঘড়ির দিকে তাকাল। চারটে বেজে দশ মিনিট। জ্যাক মিলারের এখনো দেখা নেই।
“উদ্ধত বড়লোকের ছেলে। সময়ের কোনো মূল্য নেই ওর কাছে।” ক্লারা মনে মনে বিরক্ত হয়ে পেনটা টেবিলের ওপর রাখল। ঠিক তখনই লাইব্রেরির শান্ত পরিবেশটা যেন একটু চঞ্চল হয়ে উঠল। পড়তে বসা কয়েকজন মেয়ে নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করতে লাগল। ক্লারা চোখ তুলে তাকাল। করিডোর দিয়ে হেঁটে আসছে জ্যাক। আজ তার পরনে একটা অফ-হোয়াইট লুজ ফিটিং সোয়েটার আর ডার্ক জিন্স। কাঁধে বাস্কেটবলের কিট ব্যাগ। তার সেই লম্বা শরীর আর উপস্থিতি লাইব্রেরির ধুলোবালি মাখা বইয়ের গন্ধের মাঝে বৈপরীত্য তৈরি করেছে। তার গা থেকে ভেসে আসা সেই কাস্টমাইজড পারফিউমের গন্ধটা পুরো কর্নারে ছড়িয়ে পড়ল। জ্যাক এসে ক্লারার ঠিক সামনের চেয়ারটা টেনে বসল। কোনো দুঃখপ্রকাশ না করেই সে বলল, “বলো পার্টনার, আজ কী কাজ করতে হবে?” ক্লারা নিজের বিরক্তি চেপে একটা ফাইল জ্যাকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “এখানে গত পাঁচ বছরের মার্কেটের ডাটা আছে। আমাদের এটার একটা ট্রেন্ড অ্যানালিসিস করতে হবে। আপনি এই গ্রাফগুলো স্টাডি করুন। আশা করি গ্রাফ পড়তে পারেন, নাকি বাস্কেটবলের বল ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ে না?”
জ্যাক ফাইলটা হাতে নিল, কিন্তু তার চোখ ফাইলের দিকে ছিল না। তার ধূসর চোখ দুটো ক্লারার মুখের ওপর স্থির হয়ে রইল। সে খুব নিচু স্বরে বলল, “বাস্কেটবল কোর্টে বলের মুভমেন্ট বুঝতে এক সেকেন্ডের ফ্র্যাকশন সময় লাগে, ক্লারা। আর মানুষের মনের মুভমেন্ট বুঝতে তার চেয়েও কম। যেমন আমি এখন বুঝতে পারছি, তুমি আমাকে বড্ড বেশি ঘৃণা করো।”
“ঘৃণা করার জন্য একটা মানুষের কোনো যোগ্যতা থাকা লাগে, মিস্টার মিলার,” ক্লারা খাতা টানতে টানতে ঠান্ডা গলায় বলল। “আপনার প্রতি আমার কোনো অনুভূতি নেই না ভালো, না খারাপ। আপনি আমার কাছে স্রেফ একটা প্রজেক্ট পার্টনার, যার কারণে আমার গ্রেডটা নষ্ট হতে পারে। ব্যস, এটুকুই।”
জ্যাক চেয়ারে একটু হেলান দিয়ে বসল। তার মুখে সেই রহস্যময় হাসি। সে বলল, “সত্যিই কোনো অনুভূতি নেই? তাহলে কাল রাতে যখন লিয়ো তোমাকে লাঞ্চের অফার করল, আর আজ সে হুট করে এক সপ্তাহের জন্য ডিটেনশনে চলে গেল… তোমার খারাপ লাগেনি?” ক্লারা চমকে চোখ তুলে তাকাল। তার নীল চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। “আপনি… আপনি কীভাবে জানলেন লিয়ো আমাকে মেসেজ করেছিল? আপনি আমার ফোন চেক করেছেন?”
জ্যাকের হাসিটা আরও গভীর হলো। সে একটু ঝুঁকে এসে বলল, “আমার এত খেয়েদেয়ে সময় আছে? এসব খবর তো বাতাসে কান পাতলেই জানা যায়।”
ক্লারা রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল। “আপনি একটা সাইকো! আপনি আমার ব্যক্তিগত জীবনে নজরদারি করছেন? আমি এখনই ডিনের কাছে যাচ্ছি!”
জ্যাক শান্তভাবে নিজের জায়গায় বসে রইল। সে তার ফোনটা টেবিলের ওপর রেখে বলল, “যেতে পারো। তবে ডিনের কাছে যাওয়ার আগে জেনে রেখো যে অনাথ আশ্রমের ফান্ডে তুমি প্রতি মাসে পার্ট-টাইম জবের টাকা পাঠাও, সেই সেন্ট মেরি আশ্রমের ল্যান্ড লিজের কাগজগুলো এখন আমার বাবার কোম্পানির টেবিলে পড়ে আছে। আমি যদি একটা ফোন করি, তবে আগামী চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ওই আশ্রমটা সিলগালা হয়ে যাবে। সেখানে থাকা বাকি অনাথ বাচ্চারা রাস্তায় এসে দাঁড়াবে।”
ক্লারার মুখের সমস্ত রক্ত যেন এক মুহূর্তে শুষে নেওয়া হলো। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ দিয়ে জল পড়ার উপক্রম হলো, কিন্তু সে তার ভেতরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই কান্না চেপে রাখল। সে বুঝতে পারল, এই ৬ ফুট ৪ ইঞ্চির সুদর্শন ছেলেটি আসলে কোনো মানুষ নয় সে একটা মুখোশধারী শয়তান।
“আপনি… আপনি এত নিচু হতে পারেন?” ক্লারার গলা কাঁপছে।
জ্যাক উঠে দাঁড়াল। তার দীর্ঘ শরীরটা ক্লারার ওপর এক বিশাল ছায়া ফেলল। সে ক্লারার খুব কাছে এসে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “আমি আমার জিনিস পাওয়ার জন্য যেকোনো স্তরে নামতে পারি, ক্লারা। আজ থেকে তুমি শুধু আমার সাথে প্রজেক্ট করবে, আমার সাথে কথা বলবে, আর আমার দিকেই তাকাবে। অন্য কারো ছায়াও যদি তোমার ওপর পড়ে, তবে তার পরিণতি বড্ড ভয়ংকর হবে। এখন, শান্ত হয়ে বসো। আমাদের অনেক পড়াশোনা বাকি।” ক্লারা গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চেয়ারে বসে পড়ল। তার চোখে এখন জ্যাকের জন্য ঘৃণার আগুন জ্বলছে। সে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এই শয়তানটাকে সে একদিন নিজের পায়ে আনতে বাধ্য করবে। আর জ্যাক? সে ক্লারার নীল চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের পৈশাচিক হাসি হাসল। খেলা তো কেবল শুরু হলো!
চলবে?
