তুমি আমারই রবে পর্ব-২০ + বোনাস পর্ব

0
900

#তুমি_আমারই_রবে
#পর্ব_২০
#Nishat_Jahan_Raat (ছদ্মনাম)

“কাউকে ডাকতে হবে না। টাউজারটা তুমিই দাও।”

চোখ দুটো আমার কপালে উঠে গেলো। মানে সত্যি সত্যি না, জাস্ট ইমেজিন। চূড়ান্ত অবিশ্বাস্যযোগ্যতার ফল এটা। চোখ দুটোকে আগের মতো স্বাভাবিক করে আমি উনাকে বললাম,,,

“এ্যাঁ। আমি পারব না। আন্টিকে ডেকে দিচ্ছি।”

“আম্মু কাজ করছে। কি দরকার বলো আম্মুকে ডিস্টার্ব করার?”

আমি কিছুক্ষণ ভেবে চিন্তে বললাম,,

“আচ্ছা দিচ্ছি।”

“বেশ!”

কাবার্ডের ড্রয়ার থেকে আমি টাইজারটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বললাম,,,

“মেহুল। টাউজারটা।”

“এনেছ?”

“হুম।”

“ওয়েট আমি দরজা খুলছি।”

আমি খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে উনাকে বললাম,,,

“এই আস্তে আস্তে৷ পুরোটা খুলতে যাবেন না যেনো। একটু খুললেই হবে। হাত বাড়িয়ে টাউজারটা আমি আপনাকে দিয়ে দিবো।”

“এক্সকিউজ মি। আমি এতোটা ও নির্লজ্জ নই যে পুরোটা দরজা খুলে নিজের মান, ইজ্জত সব নিলামে তুলে দিবো!”

আমি মনে মনে বিড়বিড় করে বললাম,,

“হাফ প্যান্ট পড়েই যে হাজার হাজার মেয়ের সামনে রাস্তায় চলে যায় সে কিনা আবার এসেছে নিজের মান ইজ্জত নিয়ে বড় বড় ডায়লগ ছাড়তে। যত্তোসব!”

এর মাঝেই দরজা খোলার আওয়াজ হলো। সাথে সাথে আমি চোখ বন্ধ করে টাউজারটা এগিয়ে দিলাম। এই লোকের সাথে বিশ্বাস নেই, বলা যায় না হুট করে পুরো দরজাটা চিচিং পাক করে দিলো! তখন উনার চেয়ে আমি বেশি লজ্জায় পড়ে যাবো। এতোদিনে যা বুঝেছি, এই লোকের লজ্জা শরম একদমই নেই। তাই নিজে থেকে সতর্ক থাকা ভালো।

অনেকক্ষন চোখ বুজে রাখার পরে ও টাউজারটা উনি আমার হাত থেকে নিচ্ছেন না। একইভাবে টাউজারটা আমার হাতেই রয়ে গেছে। চোখ বন্ধ রাখার কারণে সামনে কি হচ্ছে না হচ্ছে কিছুই আমার বুঝা সম্ভব হচ্ছে না। নাক, মুখ কুঁচকে আমি প্রচন্ড বিরক্তি নিয়ে এক চোখ খুলতেই দেখলাম মেহুল আধ খোলা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। বডি উন্মুক্ত, নিচে অবশ্য টাওয়াল পড়ে আছেন। খুব ফ্রেশ দেখতে লাগছে উনাকে। ঠোঁটে হালকা শয়তানি হাসি ও লেগে আছে। এলোমেলো চুল থেকে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। সেই জলের প্রতিটা ফোঁটা দেহের সর্বএ ছড়িয়ে পড়ছে। স্নিগ্ধ, সুন্দর, মায়াভরা মুখটা আমাকে আকৃষ্ট করে তুলছে। বুকের বাঁ পাশটা খুব জোরে টিউটিউ করছে। কিছুতেই যেনো চোখ সরাতে পারছি না। আর একটু এখানে দাঁড়িয়ে থাকলেই হয়তো আমার হার্ট ফেল হয়ে যাবে।

বুকে হাত দিয়ে আমি পিছু ঘুড়তে নিলেই উনি পেছন থেকে আমাকে ডেকে বললেন,,

“টাউজারটা না দিয়েই চলে যাবে?”

আমি পিছন থেকে হাত বাড়িয়ে টাউজারটা উনার দিকে এগিয়ে দিলাম। উনি হেয়ালী কন্ঠে বললেন,,,

“না। এ ভাবে এক্সপেক্টবেল না।। অনলি ফেইস টু ফেইস।”

আমি কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললাম,,,

“পারব না আমি। এভাবে নেওয়ার হলে নিয়ে যান। না হয় থাক।”

“কোনো ব্যাপার না। তাহলে আমি এভাবেই ড্রইং রুমে চলে যাবো। ড্রইং রুমে নিশ্চয়ই লামিয়া আর নীলা ও আছে!”

সাথে সাথেই আমি ক্ষীপ্ত দৃষ্টিতে পিছু ফিরে উনার দিকে তাকালাম। উনার ঠোঁটে এখনো শয়তানী হাসি লেগে আছে। বাম পাশের ভ্রুটা বার বার উঁচিয়ে উনি বাঁকা হাসছেন। টাউজার টা আমি উনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চোখ, মুখ লাল করে বললাম,,

“বিদেশ থেকে তো এসবই শিখে এসেছেন। উন্মুক্ত শরীরে কিভাবে সুন্দর সুন্দর মেয়েদের পটাবেন। লাজ লজ্জা আছে নাকি আপনার?”

উনি টাউজারটা হাতে নিয়ে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন,,,

“লাজ লজ্জা আছে বলেই তো টাউজারটা তোমাকে দিতে বললাম। নতুবা টাউজার ছাড়াই ড্রইং রুমে চলে যেতাম। ওখানে অবশ্য লামিয়া আর নীলা ও ছিলো।”

“সেই কখন থেকে লামিয়া আর নীলা করে যাচ্ছেন। আপনি কিভাবে জানলেন ওরা দুজন ড্রইং রুমেই আছে?”

“ইট’স ম্যাজিক। তুমি বুঝবে না।”

উনি স্লো ভয়েসে আমার দিকে আরেকটু ঝোঁকে বললেন,,,

“আগে আমাকে একটা কথা বলো, তুমি কি কোনো ভাবে জেলাস ফিল করছ?”

“বয়ে গেছে আমার জেলাস ফিল করতে। আপনি কে হ্যাঁ হে? যে আমি জেলাস ফিল করব?”

“আমি হলাম তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড। তার পাশাপাশি খুব স্মার্ট, হ্যান্ডসাম আর ড্যাশিং ও। এমন একজন হ্যান্ডসাম বেস্ট ফ্রেন্ড থাকলে তো যে কেউ চান্স নিতে চাইবে তাই না?”

“মানে, আপনি কি বলতে চাইছেন? আমি চান্স নিচ্ছি?”

“হ্যাঁ নিতেই পারো৷ এতো বড় সুযোগ তো আর কেউ হাত ছাড়া করতে চায় না। তাই না?”

“এই শুনুন, আপনার মতো হ্যান্ডসাম ছেলে আমি জীবনে প্রথম বার দেখি নি। আপনি জানেন, আমার হিমু কতোটা হ্যান্ডসাম ছিলেন? আপনার চেয়ে ও দ্বিগুন বেশি হ্যান্ডসাম ছিলেন। আ’ম ড্যাম সিউর ওর কাছে গেলে আপনি পাত্তাই পাবেন না।”

“আরেহ্ বাঃহ তোমার হিমু?”

“হুম আমার হিমু। হিমু একান্তই আমার।”

“কাশ…এতোটা জোর দিয়ে যদি দুই বছর আগে হিমুকে কথাটা বলতে পারতে।”

“বলি নি। তবে বুঝাতে চেয়েছিলাম। উনি বুঝতে চান নি। এতে আদৌ আমার কোনো দোষ ছিলো না।”

আমি পিছু ঘুরে খানিক ভাব নিয়ে আবারো উনাকে বললাম,,,

“শুনুন, আমার কোনো ইচ্ছেই নেই, এতো হ্যান্ডসাম হাজবেন্ড রেখে আপনার উপর চান্স মারার।”

উনি দৌঁড়ে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললেন,,,

“একদিন দেখা করাবে হিমুর সাথে? তাহলে দেখে নিতাম, কে বেশি হ্যান্ডসাম?”

কথার মাঝখানেই আমার নজর গেলো উনার টাওয়ালের দিকে। টাওয়ালটা লুজ হয়ে আছে উনার। যেকোনো সময় খুলে পড়বে। উনি এক হাত দিয়ে টাওয়ালটা ধরে আছেন, আর অন্য হাত দিয়ে টাউজার। অবশ্য টাওয়ালটা ধরে রেখে ও লাভ নেই। উপর থেকে কোমড়ের প্যাঁচ খুলে গেছে। এনি টাইম টাওয়ালটা খসে পড়ে নিজের মান ইজ্জত হারাবেন। মুখে হাত চেঁপে হেসে আমি পিছু ফিরে রুম থেকে বের হচ্ছি আর পিছন থেকে উনাকে উদ্দেশ্য করে বলছি,,

“আগে টাওয়ালটা সামলান। না হয় এবার সত্যি সত্যি আপনার মান ইজ্জত নিলামে উঠবে।”

উনি ব্যতিব্যস্ত হয়ে পেছন থেকে আমাকে ডেকে বললেন,,,

“প্লিজ রূপা। একদিন হিমুর সাথে দেখা করাবে?”

আমি হাঁটা থামিয়ে পেছন থেকে উনাকে উদ্দেশ্য করে বললাম,,,

“কোনো স্কোপ নেই। কারণ হিমুর সাথে রূপার যোগাযোগ নেই।”

“রূপা তো চাইলেই হিমুর সাথে যোগাযোগ করতে পারে।”

“রূপার সেই ইচ্ছেটা আর নেই। মরে গেছে।”

চলে এলাম আমি ড্রইং রুমে। লামিয়া আর নীলা অলরেডি খাবার টেবিলে বসে গেছে। আমাকে দেখে দুজনই নাক, মুখ ফুলিয়ে বলল,,,

“সেই কখন থেকে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। ক্ষিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে।”

আমি ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে বললাম,,,

“তাহলে খেয়ে নিতিস তোরা৷ এতোক্ষন অপেক্ষা করলি কেনো?”

“কখনো তোকে ছাড়া খেয়েছি আমরা?”

আমি মলিন হেসে নীলার পাশের চেয়ারটায় বসলাম। আন্টি আমার প্লেইটে খাবার দিচ্ছেন আর আমাকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,,

“মেহুল এখন কেমন আছে রূপা?”

আমি জিভ কেটে মনে মনে বিড়বিড় করে বললাম,,,

“ইসসস যে কারণে যাওয়া সেই কারণটাই তো জানা হলো না। ঝগড়া করেই তো কূল পাচ্ছিলাম না। কিভাবে জানব উনি কেমন আছেন? অবশ্য উনাকে দেখতে তো সুস্থ আর ফিট ই লাগছিলো। অসুস্থ হলে নিশ্চয়ই আমার সাথে ঝগড়া করতে পারত না বা শাওয়ার ও নিতো না। যাই হোক, আন্টিকে বলে দেই উনি এখন ভালো আছেন!”

আমি মলিন হেসে আন্টির দিকে তাকিয়ে বললাম,,,

“উনি এখন ভালো আছেন আন্টি।”

“তাহলে তোমার সেবা টা কাজেই দিয়েছে বলো?”

আমি হালকা হেসে মাথা নাঁড়ালাম। সবার প্লেইটে খাবার সার্ভ করার পর আন্টি আমাদের তিনজনকে উদ্দেশ্য করে বললেন,,

“নাও। তোমরা তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমি পরে মেহুলের সাথে খাবো।”

এর মাঝেই মেহুল হঠাৎ ড্রইং রুমে প্রবেশ করলেন। দ্রুত পায়ে হেঁটে উনি ডাইনিং টেবিলের কাছে এগুচ্ছেন আর বলছেন,,,

“বাঃহ্। আমাকে ছাড়াই সবাই খেয়ে নিচ্ছে!”

প্রথম লোকমাটা মুখে দিতে গিয়ে ও আমি থেমে গেলাম। মেহুলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম উনি উন্মুক্ত শরীরে নিচে শুধু টাইজার পড়ে চলে এসেছেন৷ মেজাজ টা খনিকের মধ্যে চটকে গেলো আমার। চোখ লাল করে আমি উনার দিকে তাকালাম। উনি বাঁকা হেসে আমার বিপরীত পাশের চেয়ারটায় বসে পড়লেন। আন্টি মেহুলের মাথায় হাত বুলিয়ে হালকা হেসে বললেন,,,

“আমি যাচ্ছিলাম তোকে ডাকতে। এর আগেই তুই চলে এলি।”

লামিয়া আর নীলার দিকে তাকিয়ে দেখলাম দুজনই খাওয়া বন্ধ করে ড্যাব ড্যাব করে মেহুলের দিকে তাকিয়ে আছেন। মেহুল ও দুজনের দিকে তাকিয়ে হাসছেন। নীলার পিঠে চিমটি কেটে আমি দাঁত কিড়মিড়িয়ে নীলার কানে কানে বললাম,,,

“এভাবে হা করে কি দেখছিস? নিচের দিকে তাকিয়ে খা৷ তোর পাশেরটাকে ও বল হা করে তাকিয়ে না থেকে মনযোগ দিয়ে খাবারটা খেতে।”

নীলা চিমটির ব্যাথায় উহ্ করে চিৎকার করার আগে নিজেই নিজের মুখে হাত চেঁপে ধরে মিনমিনিয়ে আমাকে বলল,,,

“আমরা তো খাচ্ছিলাম ই। হঠাৎ মেহুল এসে আমাদের মাথাটা ঘুড়িয়ে দিলেন।”

নীলা হঠাৎ ভ্রু উঁচু করে বেশ কৌতুহলী হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,,,

“বাই দ্যা ওয়ে, তোর এতো জ্বলছে কেন? এতো রিয়েক্ট ই বা করছিস কেন?”

আমি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলাম,,,

“ঠিকই তো! আমি এতো রিয়েক্ট করছি কেনো?”

নীলার থেকে চোখ ঘুড়িয়ে আমি খাওয়ায় মনযোগ দিলাম। মেহুলের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম উনি ইশারায় লামিয়ার সাথে কথা বলছেন৷ হাত নাড়িয়ে কিসব যেনো বলছেন। আগা মাথা কিছুই বুঝছি না। লামিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, লামিয়া বাম হাতের আঙ্গুল দিয়ে গোল চিহ্ন এঁকে বুঝাচ্ছেন মেহুলকে খুব সুন্দর লাগছে। মেহুলের দিকে তাকিয়ে দেখলাম উনি ও বাঁকা হেসে লামিয়াকে বলছেন, লামিয়াকে ও খুব সুন্দর লাগছে। দুজনের থেকেই চোখ সরিয়ে আমি খাওয়ায় মনযোগ দিলাম। এসবে চোখ, কান দিয়ে লাভ নেই আমার। এসব ব্যাপারে মাথা ঘামানোর ও কোনো দরকার নেই আমার।

আন্টি মেহুলের পাশের চেয়ারটা টেনে খেতে বসে পড়লেন। দুজনের প্লেইটেই খাবার সার্ভ করা। মেহুল ও এবার লামিয়ার থেকে চোখ ঘুড়িয়ে খাওয়ায় মনযোগ দিলেন। খাওয়ার এক পর্যায়ে মনে হলো কেউ পায়ে শুড়শুড়ি দিচ্ছে। কৌতুহল নিয়ে আমি টেবিলের নিচে তাকাতেই দেখলাম মেহুল আমার পায়ে আলতো করে উনার পা ছোঁয়াচ্ছেন। তাই পায়ে শুড়শুড়ির অনুভূতি হচ্ছে। চোখে, মুখে বিরক্তি নিয়ে আমি উনার দিকে তাকাতেই দেখলাম উনি খাবার চিবুচ্ছেন আর ভ্রু নাচিয়ে আমাকে ইশারা করে বলছেন,,,

“জেলালালালালস।”

ঢঙ্গী মেয়েদের মতো ভঙ্গিমা করে উনি টেনে টেনে কথা বলছেন। অধৈর্য্য হয়ে আমি ঠোঁট কামড়ে ধরে পায়ের সমস্ত জোর দিয়ে উনার পায়ে দিলাম এক চাঁপ৷ চাঁপের চোটে পা টা হয়তো এতোক্ষনে থেতলে গেছে উনার৷ সাথে সাথেই উনার নাকে, মুখে উঠল। উনার মুখের সমস্ত খাবার এসে আমার মুখে ছিটকে পড়ল। শোধ নিয়ে ও শান্তি হলো না আমার। সেই আমাকেই ঝামেলা পোহাতে হলো। বিরক্তি নিয়ে আমি উনার দিকে তাকালাম। এই বিরক্তির মাঝে ও স্বস্তি লাগছে। একটু হলে ও শোধ নিতে পেরেছি। আস্তে আস্তে বিরক্তি ভাবটা মিইয়ে গেলো আমার। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। উনি আমার দিকে তাকিয়ে মাথায় সমানে চাপড় মারছেন আর কাঁপা কাঁপা গলায় আমায় বলছেন,,

“উফফফ। এই চিকনি চামেলি মেয়ের শরীরে এত্তো জোর। বাপরে বাপ, পা চাঁপা না খেলে বুঝতেই পারতাম না।”

আমি শয়তানী হাসি দিয়ে ইশারা করে উনাকে বললাম,,

“কেমন দিলাম?”

উনি কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙ্গুলটা উপরে তুলে বললেন,,,

“জোস।”

আন্টি ব্যতিব্যস্ত হয়ে মেহুলের মুখের কাছে পানির গ্লাস ধরে বললেন,,,

“এই মেহুল তোর হঠাৎ নাকে, মুখে উঠল কেনো? আর কার সাথেই বা এভাবে কথা বলছিস?”

আমি হু হা করে হেসে খাওয়া ছেড়ে দাঁড়িয়ে আন্টির দিকে তাকিয়ে বললাম,,

“আপনার ছেলেকে ভূতে পেয়েছে আন্টি। ভূত দেখেই হয়তো উনার নাকে, মুখে উঠেছে। সাথে আবোল তাবোল ও বকছেন। তাড়াতাড়ি ওঝা দেখান!”

মেহুল রাগী দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি উনাকে ভেংচি কেটে পিছু ঘুড়ে বেসিনের দিকে চলে এলাম। আন্টি আমাকে পেছন থেকে ডেকে বললেন,,

“এই রূপা। খাওয়া ছেড়ে উঠে গেলে যে?”

“আর খাবো না আন্টি। খাওয়া হয়ে গেছে।”

আন্টি আবার কাঁপা কাঁপা গলায় আমাকে বললেন,,,

“এই রূপা। সত্যিই কি আমার ছেলেকে ভূতে পেয়েছে?”

“হুম আন্টি। ইমেডিয়েলটি ওঝা ডাকুন। নতুবা সব হাতের বাইরে চলে যাবে।”

হাত, মুখ ভালো করে ধুঁয়ে আমি হাসতে হাসতে আমাদের ফ্ল্যাটে চলে এলাম। মেহুলের মুখটা দেখার মতো ছিলো। একেবারে ফুলকো লুচির মতো। তবে আন্টিকে দেখে খুব ঘাবড়ানো টাইপ লাগছিলো। বোধ হয় খুব ভয় পেয়েছেন আন্টি। আমার পিছু পিছু লামিয়া আর নীলা ও রুমে চলে এলো। দুজনই আমাকে চেঁপে ধরে বলল,,,

“মেহুলের হঠাৎ নাকে, মুখে উঠল কেনো? কি করেছিস তুই বল তো? আমাদের তো কোনো দিক থেকেই মনে হয় নি মেহুলকে ভূতে পেয়েছে!”

আমি হাসতে হাসতে ওদের দুজনকে সব খুলে বললাম। ওরা দুজনে ও আমার সাথে হাসতে হাসতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ল। হাসতে হাসতে সবার চোখে জল চলে এলো। দু থেকে তিন মিনিট পর রুমের দরজায় হঠাৎ টোকা পড়ল। আমি, লামিয়া আর নীলা হাসি থামিয়ে দরজার দিকে তাকালাম। অমনি দেখলাম মেহুল বুকের উপর দুহাত গুজে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে, মুখে উনার অসংখ্য রাগ লেগে আছে। আমি, লামিয়া আর নীলা শুকনো ঢোক গিলে তিনজন তিনজনের দিকে তাকালাম। উনি দরজা থেকেই দাঁত কিড়মিড়িয়ে আমাকে বললেন,,,

“হাসি থামালে কেনো? হাসো হাসো!”

লামিয়া আর নীলা আমার হাত চেঁপে ধরে কাঁপা কাঁপা কন্ঠে আমাকে বলল,,,

“আআআমরা একটু আসছি। তুতুই এখানটা ম্যানেজ কর।”

দুজনই হুড়মুড়িয়ে রুমের দরজার কাছে চলে গেলো। মেহুল ক্ষীপ্ত দৃষ্টিতে দুজনের দিকে তাকালের। দুজনই ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মেহুলের দিকে তাকিয়ে দৌঁড়ে রুম থেকে বের হয়ে গেলো। ওরা রুম থেকে বের হতেই মেহুল খরগোশের মতো দৌঁড়ে এসে আমার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। ভয়ে আমি কেঁপে উঠলাম। সেকেন্ডের মধ্যে ব্যাপারটা ঘটে গেছে তো, তাই খানিকটা হকচকিয়ে গেছি। বুকে থু থু ছিটিয়ে আমি ভ্রু কুঁচকে উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,,,

“এই সমস্যা কি আপনার? দিন দুপুরে ভয় দেখিয়ে মানুষকে হার্ট ফেল করাতে চান নাকি?”

“আগে বলো তোমার সমস্যা কি? তুমি কেনো আম্মুকে উল্টো পাল্টা বললে?”

“আগে বলুন, আপনি কেনো আমার পায়ে শুড়শুড়ি দিচ্ছিলেন?”

“দিতেই পারি। বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে একটু হাসি ঠাট্টা করতেই পারি। তাই বলে তুমি আমার পা মলে দিবে?”

“বেস্ট ফ্রেন্ড হিসেবে আমি ও দুষ্টুমি করতে পারি। দুষ্টুমি করে আমি ও পা মলে দিতে পারি। এতে এতো রিয়েক্ট করার কি আছে?”

“ব্যাথা পেয়েছি আমি। ওকে? এর শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে।”

“ওহ্ মাই গুডনেস। আপনি ব্যাথা পেয়েছেন, তাই বলে আমাকে শাস্তি পেতে হবে?”

“হ্যাঁ হবে। আলবাত পেতে হবে।”

“তা শুনি একটু, কি শাস্তি?”

“এই যে দেখতে পারছ, আমি খালি গায়ে দাঁড়িয়ে আছি। আমাকে শার্ট পড়িয়ে দেওয়াটাই হলো তোমার শাস্তি।”

“একশ হাত দূরে গিয়ে দাঁড়ান। যান যান দূরে গিয়ে দাঁড়ান। এই শাস্তি আমি নাকোচ করলাম।”

“আমি তো কোনো ভাবেই এখান থেকে নড়ছি না মিস রূপা। শাস্তি আপনার মন্জ্ঞুর করতেই হবে।”

“আপনার কোথাও নড়তে হবে না। ওকে? আমিই নড়েচড়ে বাইরে যাচ্ছি। থাকুন আপনি এই রুমেই।”

সামনে কদম বাড়ানোর আগেই উনি দৌঁড়ে গিয়ে দরজার খিল লাগিয়ে দিলেন। আর দরজার সাথে হেলান দিয়ে ভ্রু নাঁচিয়ে বাঁকা হেসে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

“এবার রুম থেকে বের হয়ে দেখাও।”

আমি ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে বুকের উপর দু হাত গুজে একই জায়গায় দাঁড়িয়ে বললাম,,

“বের হলাম না। এখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। তো কি হয়েছে?”

“কতক্ষন এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারো, আমি ও দেখব।”

“দেখুন। দাঁড়িয়ে থাকতে না পারলে বিছানায় শুয়ে পড়ব। বিকল্প অনেক অপশন ই আমার কাছে আছে।”

“তবু ও শাস্তি মানবে না?”

“প্রশ্নই আসছে না।”

উনি বেশ ক্ষীপ্ত হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

“ওকে। ” সি ইউ নট ফর মাইন্ড।”🤣

আমি ও মুখটা বাঁকিয়ে বললাম,,,

“আই নট অল লাইক!” 😂

উনি ও আমার মতো মুখটা বাঁকিয়ে এক পা দরজায় হেলান দিয়ে অন্য পাশ ফিরে দাঁড়িয়ে আছেন। দুজনই একই জায়গায় প্রায় ১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমি কিছুটা ক্লান্ত হয়ে আমি বিছানার উপর পা তুলে বসে পড়লাম। মেহুল একই ভঙ্গিতে এখনো দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কিছুক্ষন পর পর মুখ বাঁকিয়ে উনার দিকে তাকাচ্ছি। উনি উপরের দিকে তাকিয়ে দুহাত তুলে করুণ কন্ঠে আল্লাহ্কে বলছেন,,,

“হে আল্লাহ্। তুমি যাই করো, প্লিজ আমার এতো চুন্দ্রী বেস্ট ফ্রেন্ডের মুখটা হঠাৎ বাঁকিয়ে দিও না। হিমু ফিরে এসে এই বাঁকা মুখ ওয়ালী মেয়েকে পছন্দ করবে না।”

#চলবে….

#তুমি_আমারই_রবে
#বোনাস_পর্ব
#Nishat_Jahan_Raat (ছদ্মনাম)

“হে আল্লাহ্। তুমি যাই করো, প্লিজ আমার এতো চুন্দ্রী বেস্ট ফ্রেন্ডের মুখটা হঠাৎ বাঁকিয়ে দিও না। হিমু ফিরে এসে এই বাঁকা মুখ ওয়ালী মেয়েকে পছন্দ করবে না।”

তড়তড়িয়ে আমি বসা থেকে উঠে উনার কাছে তেড়ে গিয়ে বললাম,,,

“এই কি বললেন আপনি? ইনডিরেক্টলি আল্লাহ্ কে বললেন আমার মুখটা বাঁকা করে দিতে?”

“কই না তো! আমি তো আল্লাহ্কে রিকুয়েস্ট করছিলাম বাই এ্যনি চান্স ও যেনো আল্লাহ্ তোমার মুখটা বাঁকা না করেন।”

প্রতি উত্তরে কিছু বললাম না আমি। উনার থেকে মুখ ঘুড়িয়ে রাগে গিজগিজ করে পুরো রুমে পায়চারী করছি। প্রায় অনেকক্ষণ পর আমি ধৈর্য্য হারা হয়ে মেহুলের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে না চাইতে ও করুন কন্ঠে বললাম,,

“প্লিজ মেহুল। এইবারের জন্য শাস্তিটা নাকোচ করুন। আর কক্ষনো, ভুলে ও আমি কোনো কারণে আপনাকে ব্যাথা দিবো না।”

“স্যরি মিস রূপা। আপনার রিকুয়েস্ট আমি রাখতে পারব না। আপনি তো জানেন ই আমি কতোটা এক রোঁখা!”

চোখ জোড়া খিঁচে বন্ধ করে আমি প্রচন্ড রেগে উনাকে বললাম,,,

“শার্ট টা নিয়ে আসুন। জলদি যান।”

উনি শয়তানী হাসি দিয়ে বললেন,,,

“সে ই তো শাস্তিটা মানলে। কি দরকার ছিলো বলো? ফালতু সময় নষ্ট করার।”

“আপনি খুব খারাপ একটা লোক বুঝেছেন?”

“হুম বুঝেছি। অনেক আগেই বুঝেছি। তাই তো ভালো হওয়ার চেষ্টা করছি।”

“খারাপ লোকরা কখনো ভালো হয় না।”

“কিন্তু, আমি তো ভালো হয়ে গেছি! যা তোমার চোখে পড়ছে না।”

“আপনি সেই একই রকম রয়ে গেছেন। আসার পর থেকে যেমন ছিলেন, এখনো ঠিক তেমনই আছেন।”

মলিন হাসলেন উনি। আর দরজার খিল খুলে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি রাগে ফুসফুস করছি। ছেলেটা বড্ড এক রোঁখা। নিজে যা ভালো মনে করবে, যা ভাববে ঠিক তাই করবে, সাথে আশেপাশের লোকদের ও জোর করে করাবে। কিছুক্ষনের মধ্যে উনি শার্ট নিয়ে রুমে ঢুকে পড়লেন। আর শার্টটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন,,

“নাও। পড়িয়ে দাও।”

চোখে, মুখে বিরক্তি নিয়ে আমি উনাকে শার্টটা পড়িয়ে দিলাম। শার্টের বাটন গুলো লাগাতে গিয়ে খেয়াল করলাম, শার্টটা নীল রঙ্গের। রঙ্গটাতে উনাকে দারুন মানিয়েছে। চোখ তুলে উনার দিকে তাকাতেই উনি হালকা হেসে বললেন,,,

“নীল। আমার গার্লফ্রেন্ডের প্রিয় রং ছিলো। তাই আজ তোমার হাতেই শার্টটা পড়লাম!”

“নীল রং তো আমারো খুব পছন্দ। আপনার গার্লফ্রেন্ডের সাথে এদিক থেকে আমার খুব মিল আছে।”

“আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমারো নীল রঙ্গ পছন্দ।”

“আরেহ্ বাঃহ। হিমুর ও নীল রঙ্গ খুব পছন্দের।”

উনি হঠাৎ আমার দিকে ঝুঁকে বললেন,,

“আচ্ছা, তোমার কি মনে হয় না হিমুর সাথে আমার অনেকটাই মিল আছে?”

“আছে। তবে আপনি আমার হিমু নন।”

মেহুল হঠাৎ আমার সামনে থেকে সরে দ্রুত পায়ে হেঁটে রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি আশ্চর্য হয়ে উনার যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ উনার এমন অদ্ভুত রিয়েকশান আমার কেমন যেনো অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

,

,

রাত আটটার মধ্যে আমাদের সব গুলো রুম গোছানো কমপ্লিট হয়ে গেলো। অবশ্য আসবাবপএ সেট করতে হিমু আমাদের খুব সাহায্য করেছিলেন। রুম ডেকোরেশনে উনার অভিজ্ঞতা অনেক। রাত দশটার মধ্যেই আমরা আন্টিদের ওখানে ডিনার করে নিজেদের রুমে এসে শুয়ে পড়লাম। তিনজনই খুব ক্লান্ত৷ তাই পর্যাপ্ত রেস্ট দরকার। কাল সকাল থেকে আবার অফিস। আবার টানা এক সপ্তাহের ধকল। মেহুল ও হয়তো আমাদের মতো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। এতক্ষনে হয়তো উনি ঘুমিয়ে ও পড়ছেন। রুম গুছাতে উনি আমাদের সাথে খেঁটেছেন। আমাকে তেমন কাজ করতে দেন নি উনি। আমার সমস্ত কাজ উনিই করেছেন। ছোট্ট করে একটা থ্যাংকস ও দেওয়া হয় নি উনাকে। আসলে সুযোগ ই হয়ে উঠে নি।

ঘড়িতে রাত এগারোটা বাজতেই আমার চোখে ঘুম হানা দিলো। লামিয়ার উপর হাত রেখে আমি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম। সেই ঘুম ভাঙ্গল আমার সকাল আটটায়। আবারো সেই আগের রুটিন। নাস্তা করো, ফ্রেশ হও, শাওয়ার নাও, অফিসে যাও, অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আবার রান্না করো, রাতের ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ো। এটাই হলো জীবন।

মাঝখানে কেটে গেলো প্রায় তিন মাস। এই তিন মাসে। দারুন পরিবর্তন এসেছে আমার লাইফে। পরিবর্তনটা ঘটেছে মেহুলের হাত ধরেই। উনি ফ্রেন্ড হয়ে আমার জীবনে আসার পর থেকেই আমার সাদা মাটা জীবনটা খুব রঙ্গিন হয়ে উঠেছে। অফিসের ব্যস্ততার পর বাড়ি ফিরে বাকিটা সময় আমাকে খুব হাসি খুশি আর হৈ, হুল্লোড়ে থাকতে হচ্ছে। আর প্রতিদিন রাতে নিয়ম করে সামনের টং দোকানে চা খেতে যাওয়া, টানা দু, তিন প্লেইট ফুচকা খাওয়া, আইসক্রীম খাওয়া, মাঝে মাঝে গভীর রাতে ছাদে বসে জোসনা বিলাস করা, কখনো আবার রাতের নির্জন শহরে রাস্তার ফুটপাত ধরে হেঁটে চলা, নদীর পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা, ঝুম বৃষ্টিতে পাশাপাশি হাঁটা, হুট হাট করে জোর করে শপিংয়ে নিয়ে যাওয়া, রিকশার হুড খুলে, খোলা আকাশের নিচে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুড়োঘুড়ি করা, দু এক দিন পর পর রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া, ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ঝালমুড়ি খাওয়া। মানে আমি জীবনকে যেভাবে উপভোগ করতে চেয়েছিলাম, এই পর্যায়ে এসে জীবনটাকে আমি ঠিক সেভকবেই উপভোগ করছি।

আমার জীবনের সমস্ত শখ, আহ্লাদ মেহুল পূরণ করে দিয়েছেন। আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্কটা দিন দিন খুব গভীর হচ্ছিলো। দুজন দুজনকে ছাড়া এক মুহূর্ত ও ভাবতে পারছিলাম না। হাঁটতে, বসতে, খেতে, চলতে, ফিরতে সর্বক্ষেএে দুজন দুজনকে ছাড়া অঁচল। উনি নিজের চেয়ে ও আমার বেশি খেয়াল রাখতেন। সামন্য হাচ্চি, কাশি হলে ও উনি উতলা হয়ে উঠতেন। কখন আমাকে সুস্থ করে তুলবেন সেই ভাবনায় থাকতেন। এই ছোট ছোট কেয়ার গুলো আমি হিমুর থেকে খু্ব এক্সপেক্ট করতাম। যার বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন মেহুল। হিমুর অভাব আমার মেহুলের মাঝেই পূর্ণ হযে যাচ্ছে। তার মানে এই না যে, আমি হিমুকে ভুলতে বসেছি। উল্টো মেহুলের আচরণে আমি বার বার হিমুকে খুঁজে পেয়েছি। হিমুকে আরো বেশি করে মিস করেছি। মেহুল আমার জন্য যাই করুক না কেনো মেহুল সবসময় আমার বন্ধুর জায়গাতেই থাকবেন। কখনো হিমুর জায়গা দখল করতে পারবেন না।

এসবের মাঝেই দিন কেটে যাচ্ছে আমার। কিভাবে যেনো কেটে গেলো প্রায় তিন তিনটে মাস। সময়ের কোনো হিসেব ই রাখা হয় নি। ঘড়ির কাটার মতো দিন গুলো খুব সহজে পাড় হয়ে গেছে।

,
,

আজ শুক্রবার। আমাদের অফ ডে। ছুটি পেয়ে আজ সারা দিন ঘুমিয়েছি। গত রাতে মেহুলের সাথে পুরো এলাকায় ঘুড়ে বেড়িয়েছি। কোলাহলহীন রাতের নিস্তব্ধ আকাশের নিচে, মৃদ্যু মন্দ মলিন বাতাসে হাঁটাহাঁটি করার মজাই আলাদা। আর মেহুল পাশে থাকলে তো কথাই নেই। জমে পুরো ঘি৷ সারা রাত ঘুড়ে আমরা ভোর পাঁচটায় বাড়ি ফিরেছি। বাড়ি ফিরেই ঘুম। সেই ঘুম ভাঙ্গল আমার বিকেল পাঁচটায়। ঘুম থেকে উঠতেই বেডের উপর আমি একটা রঙ্গিন কাগজে মোড়ানো উপহার বক্স দেখতে পেলাম। চোখ কচলে আমি বক্সটা হাতে নিতেই দেখলাম বক্সের উপরে সাদা কাগজে লিখা,,,

“নীল রঙ্গের একটা শাড়ি আছে বক্সটাতে। সাতটার মধ্যেই রেডি হয়ে ছাঁদে চলে এসো৷ অনেক সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।”

বুঝতে আর দেরি হলো না লিখা গুলো কার। মেহুলই উপহার বক্সটা আমার জন্য পাঠিয়েছেন। নিশ্চয়ই মাথায় কোনো শয়তানী বুদ্ধি এঁটে আমাকে বোকা বানানোর বানোয়াট একটা সারপ্রাইজের ব্যবস্থা করেছেন। ছেলেটা আসলেই পারে। পুরো অদ্ভুত।

হালকা হেসে বক্সটা খুলতেই দেখলাম নীল রঙ্গের একটা জামদানী কাপড়ের সাথে নীল চুড়ি, নীল টিপ, নীল কানের দুল, গাজরা ফুল সাথে লাল আলতা। মানে সবকিছু ম্যাচ করা। অবাক হয়ে আমি সব গুলো উপহার দেখছি। একটা ছেলে কিভাবে এতোটা মিলিয়ে মিলিয়ে মেয়েদের সাজ সরন্জ্ঞামের এরেন্জ্ঞ করতে পারে আই ডোন্ট নো!

হাতে চুড়ি গুলো পড়ে দেখলাম চুড়িগুলো একদম ঠিকঠাক ভাবে আমার হাতে লেগেছে। পুরোপুরি আমার হাতের সাইজ। এর মাঝেই লামিয়া আর নীলা রুমে ঢুকল। দুজনই চোখ মুখ কুঁচকে আমার দিকে তাকিয়ে বলল,,,

“কি রে? এখনো রেডি হস নি?”

“রেডি হবো কেনো?”

“আমরা কিভাবে জানব? মেহুল বলল সাতটার মধ্যেই তোকে রেডি করিয়ে ছাদে নিয়ে যেতে।”

“কেনো বল তো? আজ কি আছে?”

“আছে হয়তো স্পেশাল কিছু।”

দুজনই রহস্যময়ী হাসি দিয়ে আমাকে টেনে ওয়াশরুমে ঢুকিয়ে দিলো। আর বললো আধ ঘন্টার মধ্যেই শাওয়ার নিয়ে তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম থেকে বের হতে। ওদের শর্ত মতো সব করলাম আমি। আধ ঘন্টার মধ্যেই শাওয়ার নিয়ে ওয়াশরুমে থেকে বের হয়ে এলাম। দুজনই আমাকে পাখার নিচে বসিয়ে চুল শুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এর মাঝে নীলা আবার আমাকে লোকমা ধরে ভাত খাইয়ে দিচ্ছে। বোবা প্রাণীর মতো তাকিয়ে তাকিয়ে আমি সব দেখছি। কিছু বলার ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।

ঘড়িতে ৫ঃ৩০ বাজার সাথে সাথেই দুজন আমাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসিয়ে দিলো। নিজেদের ইচ্ছে মতো আমাকে সাজাতে শুরু করল৷ আমি শুধু বোকার মতো ওদের দিকে তাকিয়ে আছি। কেনো জানি না মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হচ্ছে না আমার।

৬ঃ৩০ বাজতেই সাজ কমপ্লিট হয়ে গেলো। এবার শুধু শাড়ি পড়ার পালা। লামিয়া খুব গুছিয়ে শাড়ি পড়াতে পারে। তাই লামিয়াই আমাকে শাড়িটা পড়িয়ে দিচ্ছে। শাড়ি পড়ানোর পর আয়নার দিকে ঘুড়ে দাঁড়াতেই আমি নিজেকে সম্পূর্ণ নতুন রূপে আবিষ্কার করলাম। কেবল মাএ বিয়ের দিনই আমি এতোটা ঘটা করে সেজেছিলাম। মাঝ খানে আড়াই বছরের মতো এভাবে ঘটা করে আর সাজা হয় নি। এই সাজটাতে বিয়ের কনে লাগছে আমার। মনে হচ্ছে আজ আমার নতুন করে বিয়ে হবে! নীল শাড়ির সাথে সব কিছু ম্যাচ করা। সাজটা ও কেমন নীল নীল লাগছে। খোঁপাটা সব থেকে বেশি সুন্দর হয়েছে। আমার ঘন চুল বলে খোঁপাটা অনেক বড় হয়। খোঁপায় গাজরা পড়লে তো খোঁপাটা দেখতে আরো বেশি বড় মনে হয়। নীলা খুব সুন্দর আইলাইনার পড়াতে হবে। চোখ গুলো দেখতে টানা টানা লাগে। একদম হরিনীর চোখের মতো। আয়নাতে আমি নিজেই নিজেকে দেখে মুগ্ধ হচ্ছি। কিছুতেই যেনো চোখ সড়াতে পারছি না। এই সাজে আমি হিমুকে খুব তাক লাগাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু কখনো স্কোপ ই পাই নি, হিমুকে এভাবে সেজে ইমপ্রেস করার।

লামিয়া আর নীলা আমার দু কাঁধে মাথা রেখে মৃদ্যু হেসে বলল,,,

“তোকে খুব সুন্দর লাগছে রে রূপা। একদম রূপকথার রাজকন্যাদের মতোন। ভাবতেই পারি নি সাজলে তোকে এতোটা সুন্দর লাগবে!”

“আমি যদি রাজ কন্যাই হতাম। তাহলে রাজকুমার আমার পাশেই থাকত।”

“রাজকুমার ঠিক আসবে। তোকে পালকীতে করে নিয়ে যাবে! শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা।”

“দিবা স্বপ্ন এসব। যা কখনো সত্যি হবে না।”

প্রতি উত্তরে লামিয়া আর নীলা কিছু বলল না। ঘড়িতে সাতটা বাজতেই দুজন আমাকে টেনে হেছড়ে ছাদের দিকে নিয়ে এলো। ছাদের দরজা খুলতেই আমি খুব অবাক হয়ে গেলাম। পুরোটা ছাঁদ বিভিন্ন রঙ্গের ঝাড় বাড়িতে ঝিলমিল ঝিলমিল করছে, চারপাশ থেকে গোলাপ ফুলের সুবাস ভেসে আসছে, পুরোটা ছাদের ফ্লোরে অসংখ্য গোলাপের পাঁপড়ী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মাঝখানেই ফুলের পাঁপড়ীর উপর নীল রঙ্গের ঝাড় বাতি দিয়ে লাভ আঁকা আছে।

সব কিছু আমার কাছে স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। শাড়ির কুচিঁতে হাত দিয়ে আমি পুরো ছাদটায় আলতা রাঙ্গা পায়ে হেঁটে চলছি। চোখে আমার যতো রাজ্যের বিস্ময়। কিছুতেই কূল করতে পারছি না কেনো এসব হচ্ছে, আর কি সারপ্রাইজ ই বা আমার জন্য অপেক্ষা করছে। ছাঁদের ডান পাশটায় যেতেই আমি হঠাৎ থমকে গেলাম। মেহুল নীল রঙ্গের পান্জ্ঞাবি পড়ে হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি এক ধ্যানে উনার দিকে তাকিয়ে আছি৷ নীল পান্জ্ঞাবীতে উনাকে মনোমুগ্ধকর লাগছে। কিছুতেই যেনো উনার থেকে চোখ সরাতে পারছি না। বুকের বাঁ পাশটা ও সমান তালে লাফাচ্ছে। কোনো রকম বিশ্রাম নিচ্ছে না।

আমার মতো মুগ্ধ দৃষ্টিতে মেহুল ও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বুকের বাঁ পাশটা উনার ও ধুকপুক ধুকপুক করছে। যা আমি এক ফুট দূরত্বে থেকে ও বুঝতে পারছি। হঠাৎ উনি হাঁটু গেড়ে বসে এক হাতে এক গুচ্ছ গোলাপ আর অন্য হাতে ডায়মন্ড রিং নিয়ে স্থির চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

“উইল ইউ মেরি মি রূপা?”

#চলবে…..