ছদ্মবেশে লুকানো ভালোবাসা পর্ব-১১

0
1214

#ছদ্মবেশে_লুকানো_ভালোবাসা
#মৌমি_দত্ত
#পর্ব_১১

আজকে আফিমের জন্মদিন। দেখতে দেখতে দুইদিন কেটে গেছে। সময় আসলেই খুব চঞ্চল। তাই কোনদিকে যে কেটে যায় বুঝে উঠা যায় না। গতকাল রাত থেকে ইনায়াত এখানে। পুরো ঘর সাজানো,,, ইনভিটেশন কার্ড ঠিকানা মতো পাঠিয়ে দেওয়া,,, কেক থেকে শুরু করে সবটাই সে নিজে তদারকি করছে। অন্যান্য বার জোসেফ সবটা তদারকি করে,, এবার ইনায়াত করছে। অবশ্য আফিম এসবের কিছুই জানেনা। জন্মদিন নিয়ে মাতামাতি তার ভালো লাগে না। তাই সে ঘুমিয়ে আছে। কেননা আজকে অফিস বন্ধ দিয়েছে জোসেফ সাহেব। লাবিবা ছেলের জন্য নিজ হাতে রান্নাবান্না করছে আর আফরা সাজগোজ করছে। আপাতত ছোট্ট একটা কেক বানিয়েছে সে প্রতিবছরের মতো। তাই দিয়ে সবার আগে উইশ করবে আফিমকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুল ঠিক করতে করতে আফরা আনমনা হয়ে গেলো। ভেসে উঠলো খুব প্রিয় একটি মুখ। যে মানুষটার সাথে তার দেখা হয়েছে শুধু কিছু সেকেন্ডের জন্য রাস্তায়। সব ভাবনা ঝেড়ে আবারও সাজগোজে মন দিলো। জোসেফ বের হয়েছে কিছু কাজে।
ইনায়াত দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব তদারকি করছে। তখনই আফরা কেক নিয়ে এলো ইনায়াতের কাছে। ইনায়াতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো।
– ভাবী,, চলো। ভাইয়ার আছে যাই।
– আবারও ভাবী আফরা আপু?? আমার তো এখনো এইচএসসির রেজাল্ট দেয়নি। কতো বাচ্চা একটা মেয়ে। আর আমাকেই কিনা তোমার জ্বালাতে হবে।
– অলেলে আমার কিউট ভাবীটা। প্রথম দেখে যখন ভাবী ডেকেছি তখন সারাজীবন ওটাই ডাকবো। এবার চলো তো।
আফরা হাতে কেক নিয়ে হেসে আগাচ্ছিলো। পিছনে ইনায়াত আসছিলো। আফিমের ঘরের কাছে এসে আফরা চিৎকার করে উঠলো মৃদু স্বরে।
– ওহ শিট!! আমি ক্যান্ডেলস ভুলে গেছি।
আফরা দ্রুত ইনায়াতের হাতে কেক ধরিয়ে দিয়ে বললো,,
– তুমি যাও না ভাবী। আমি আসছি ক্যান্ডেলস নিয়ে।
আফরা দৌড়ে চলে গেলো। নিচে গিয়ে নিজের রুমে ঢুকে দরজা বেঁধে দিলো।
– তোমাদের এক করতে গিয়ে আমাকে আর কি কি করতে হবে ভাবী ও ভাইয়া!!
কাঁথা মুড়ি দিয়ে আবারও ঘুম দিলো আফরা সাজগোজ নিয়েই।
ইনায়াত কেকটা নিয়েই বোকার মতো কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো। এরপর কি করবে ভেবে না পেয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলো আফিমের রুমে। আফিম ফ্রেশ হয়ে টাওয়েল পড়ে মাথা মুছতে মুছতে সবে বের হয়েছিলো। তখনই চোখের সামনে ইনায়াতকে দেখে বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে এলো। ইনায়াত মেয়ে এটা জানবার পর ইনায়াতের কাছে সে তেমন থাকে না। ইনায়াতকে নিজের জিনিসপত্র ছুঁতে দেয় না,, খেয়াল রাখতে দেয় না। ইনায়াতকে দেখলেও তার বিরক্ত লাগে খুব। এখন আবার সকাল সকাল কেক হাতে ইনায়াতের রিমে আসা আফিমের আদিখ্যেতা মনে হলো। আফিম হাতের টাওয়েলটা ছুড়ে মারলো খাটে। স্বভাববশতই ইনায়াত দ্রুত কেকটা টেবিলে রেখে ভেজা টাওয়েল তুলে নিতে গেলেই আফিমের মাথার রাগ অত্যন্ত বেড়ে গেলো। আফিম ইনায়াতের হাতের বাহু চেপে ধরে টেনে নিজের আছে আনলো।
– হোয়াট?? কি চাও তুমি?? টাকা পয়সা?? নাকি অন্যকিছু লাগবে?? কি চাও তুমি??
ইনায়াত কিছুই বুঝে উঠতে পারলো না। হা করে তাকিয়ে রইলো।
– স্যার!! আর ইউ অলরাইট?? কি বলছেন আপনি??
– আমি ঠিক আছি। বাট তুমি ঠিক নেই। কেন ঘুরঘুর করছো আমার সামনে?? কি ভাবছো তুমি?? আমার মনে জায়গা করে নেবে?? আমার আম্মু,, আর দুই বোন ছাড়া কোন মেয়ে আমার মাঝে জায়গা করতে পারবে না। আন্ডারস্ট্যান্ড?? তুমি কি ভেবেছো?? আমি বুঝি না তোমাদের মতো চিপ ক্লাস মেয়েদের কাজগুলো?? অনেক ভালোই বুঝি। নিশ্চয় এভাবেই করে ঐ তাহজিব নাকি কি নাম,, ঐ ছেলেকে বশ করেছো তুমি। তাইতো পিছে ঘুরছে। এখন আর ঐ ছেলেকে মনে ধরছে না বলে পালাচ্ছো। ভালোই জানি তোমাদের মতো মেয়েদেরকে।
ইনায়াত চোখ বন্ধ করে নিলো ব্যাথায়,, অপমানে আর লজ্জায়। একটা মেয়ের কাছে সব থেকে বেশি মূল্যবান তার ইজ্জত আর সম্মান। আফিম ইনায়াতকে চোখ বন্ধ করে শান্ত দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ইনায়াতের বাহু আরো খামচে ধরলো। একপর্যায়ে ছুড়ে দিলো ইনায়াতকে। ইনায়াত মাটিতে পড়েও শান্ত হয়ে কিছু সেকেন্ড বসে রইলো।
– ঐ!! শেষ?? নাকি ন্যাকা কান্নার নাটক এখনো স্টার্ট করোনি?? আর্লি শেষ করো আর যাও এখান থেকে। তোমার মুখ আমি দেখতে চাইনা। বুঝেছ?? তোমার মতো চিপ মেয়েরা আমার সাথে একটা সম্পর্কই রাখে আর তা হলো আমাকে খুশী করা। গেট আউট!!
ইনায়াত ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো। নিজের মাথা নিচু রেখেই বললো,,
– শুভ জন্মদিন স্যার!!
এতোকিছু বলবার পরেও ইনায়াত শুভেচ্ছা জানাচ্ছে বিষয়টা যেন হজম হচ্ছে না আফিমের। ইনায়াতকে ডেকে কিছু বলতে যাবে ততোক্ষনে মাথা নিচু রেখেই চলে গেলো ইনায়াত নিচে। ইনায়াত নিচে আসতেই দেখলো লাবিবা জোসেফের সাথে কথা বলছে। ইনায়াত সেদিকে এগিয়ে গেলো।
– স্যার!! আমার একটু ছুটি লাগবে।
ইনায়াতের হঠাৎ এমন কথা শুনে চমকে উঠলো লাবিবা আর জোসেফ।
– স্যার মানে?? আংকেল থেকে স্যার কবে হলাম??
– না মানে,, অফিসের কথা বলছি তো। তাই আর কি!!
– এটা কোন কথা হলো?? কয়দিনের ছুটি লাগবে নিয়ে নে।
ইনায়াত উত্তরে মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ বের হয়ে এলো দরজা দিয়ে। জোসেফ আর লাবিবা হা হয়ে সেদিকেই তাকিয়ে রইলো। তখনই হাতে কেক নিয়ে আফিম রাগে ফোসফোস করতে করতে নেমে এলো। কেকটা এনে ধুপ করে টেবিলের উপর রাখলো। তা দেখেও অবাক হলো জোসেফ আর লাবিবা।
– কি হলো আফিম?? তোর মুখ এমন দেখাচ্ছে কেন??
জোসেফ জানতে চাইলো। লাবিবা কেকের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বললো,,
– ওমা!! আফরা আর তুই কেক কাটিসনি?? আমি তো ভাবলাম কেক কাটা হয়ে গেছে তাই ইনায়াত চলে গেছে। মেয়েটা এতোকিছু করলো আর মেয়েটাকে আটকাতে পারলিনা??
আফিম অবাক জোসেফ আর লাবিবার দিকে তাকিয়ে আছে।
– আমি কিছু বুঝলাম না!! এইবছরও কি আফরা কেক বানিয়েছে??
– হ্যাঁ তো!! ও তো ইনায়াতের সাথে তোর রুমের দিকে গেছিলো। কোথায় ও??
আফিমের মুখ হা হয়ে গেলো। ও ভেবেছিলো কেক ইনায়াত বানিয়েছে। মাথাতেই আসেনি যে কেক আর কেও না প্রতি বছরের মতো আফরা বানিয়েছে।
– ওহ শিট!!
আফিম মাথা চেপে বসে পড়লো ডাইনিং টেবিলের একটা চেয়ার টেনে।
.
.
তাহজিব খাটে আধশোয়া হয়ে কফির কাপে শেষ চুমুক দিলো। সে নিজের রুমে বসে আছে এখন । সবে মাত্র কানে হেডফোন গুঁজে মাথা এলিয়ে দিলো চোখ বন্ধ করে তাহজিব। গান ছাড়তে যাবে তখনই ব্যালকনিতে কিছু একটা আওয়াজ হলো। ভ্রু কুঁচকে এলো তাহজিবের। কান খাড়া করে রইলো। ব্যালকনি বেয়ে কারোর হাত উঠছে। তাহজিবের চোখ ছোট ছোট হয়ে এলো। তবে এমন ভাণ করলো যেন তার চোখ যায়নি ব্যালকনির দিকে। ব্যালকনি টপকে একটা কেও ভিতরে ঢুকলো। এরপর পা টিপে টিপে রুমের ভেতর এলো একটা ১৫/১৬ বছর বয়সি মেয়ে। পড়নে একটা কালো ফুলহাতা টিশার্ট আর ব্ল্যাক জিন্স। চুলগুলো পনিটেইল করে উঁচু করে বাঁধা। ফর্সা গায়ের রঙ,, হালকা সবুজ চোখের মণি,, ঠোঁটের উপর ছোট্ট একটা তিল। দেখতে জ্যান্ত পুতুল মনে হচ্ছে মেয়েটাকে। খুব বেশি হলে হয়তো ক্লাস টেনের স্টুডেন্ট হবে বুঝা যায়। মেয়েটাকে দেখেই তাহজিব চোখ বন্ধ করে ঘুমের ভাণ করলো। মেয়েটা তাহজিবের কাছে এগিয়ে এসে হালকা ঝুঁকে দেখলো তাহজিব ঘুম কিনা।
– যাক বাবা!! ভাগ্য আজকে অনেক ভালো। প্রতিদিন ভোরেই যা একটু ঘুমাও দুই এক ঘন্টার জন্য। বেশিক্ষন থাকতেও পারিনা। গত ৩ দিন তো আসতেও পারিনি জ্বর ছিলো বলে। বাই দা সমুদ্র,, আমাকে মিস করেছো তুমি?? অবশ্য করবে কিভাবে?? তোমার লাইফের ভেতর যে একটা পিচ্চি জোড়পূর্বক প্রবেশ করে ফেলেছে তা তুমিও জানোনা। ধ্যাত!! আব্বু কেন যে তোমাকে এতো ভয় পায়!! আর তোমার রাগটাও একটু বেশি। নাহয় কোন একদিন সামনে টপকে পড়তাম।
কথা বলতে বলতে মেয়েটা খাটে উঠে তাহজিবের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। তাহজিবের অনেক আরাম লাগলো। কিন্তু মেয়েটার কথা শুনে অবাকের চূড়ান্তে পৌছে গেছে সে। এই মেয়ে কি বলছে এসব?? তার মানে কি এই মেয়ে প্রায়ই আসে তাহজিবের রুমে তাহজিব ঘুম থাকা অবস্থায়?? আর মেয়েটার বাবাই কে??
– জানো!! ঐদিন না তোমার এখানে এসেছিলাম জ্বর শরীর নিয়ে। আসার সময় প্রতিবারের মতো ধমকধামক দিয়ে এক কন্সটেবলকে এনেছি। কিন্তু আমি না এখানে উঠবার আগেই অজ্ঞান হয়ে গেছি গো। গত ৩ টা রাত তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমানোও হয়নি। পাক্কা দুই সপ্তাহের অভ্যেস তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমানো। এর মধ্যে অনেক দিন বাইরে ছিলে,, অনেকদিন ঘুমাওনি। কিন্তু আমি এসেছি। আমার কাজের প্রতি আমি অনেক সিরিয়াস। আফটার অল পুলিশ কমিশনারের মেয়ে বলে কথা। আচ্ছা জামাই!! তুমি এত্তো সুন্দর আর কিউট কেন?? আমার পড়তে বসলে,, গিটার বা আর্টের ক্লাসে গেলে মাথায় চিন্তা ঘুরে তোমাকে নিয়ে। আচ্ছা!! ইনায়াত আপু কি ফিরে আসবে?? তাহলে তো তুমি উনাকে বিয়ে করে ফেলবে!! আমার কথা তুমি জানো না,, জানবেও না। কি সুন্দর ব্যাপার না!! জেনে শুনে কাওকে কষ্ট দিলে পাপ হয়। তুমি তো আর জানো না আমি তোমাকে ভালোবাসি। তাই আমি কষ্ট পেলেও তোমার পাপ হবে না। বুঝলে জামাই!! আর আমার কি?? আব্বু তো বলে,, ” রুহি!! ঔষধ খা!! নাহলে তুই হারিয়ে যাবি!! “। আমি তাই তো ঔষধ খাইনা। যাতে করে আমার রোগটা আমাকে মেরে ফেলে। তাহলে গল্পের শেষে হ্যাপি এন্ডিং হবে। তাই না জামাই??
মেয়েটা নিজের মতো করে কথা বলেই যাচ্ছে। তাহজিবের হাত দুটো সড়িয়ে বুকে জায়গা করে নিয়ে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়লো মেয়েটা চুপ করে। মেয়েটা শুয়ে পড়তেই তাহজিব ধপ করে চোখ খুললো।
– পুলিশ কমিশনার আরভিদ খানের মেয়ে রুহি খান?? মেয়েটা সামনের বছর এস.এস.সি দেবে না?? হ্যাঁ,, আরভিদ সাহেব তো বলেছিলো সেদিন। উনার মেয়ে এতো ধানি লঙ্কা তা তো বলেনি। কি বলে দুই সপ্তাহ আমার ঘরে আমার বুকে মাথা রেখে শুয়েছে?? আর কি রোগের কথাও বললো মনে হয়!! কি রোগ আছে মেয়েটার??
মনে মনে নিজেকে নিজে বললো এসব তাহজিব। হঠাৎই তাহজিব বুঝলো রুহির গা গরম আর ভারী নিঃশ্বাস পড়ছে। অর্থাৎ রুহি ঘুমিয়ে পড়েছে আর জ্বরও এসছে আবার। তাহজিব ধীরে ধীরে সড়ে উঠে পড়লো। রুহির দিকে চোখ ছোট করে তাকিয়ে পুলিশ কমিশনার আরভিদ খানকে কল লাগালো। ফোন রিসিভ হতেই অপরপাশ থেকে আরভিদ বলে উঠলো,,
– হ্যালো স্যার!! কিছু বলবেন স্যার?? কিছু লাগবে আপনার??
– না শ্বশুরমশাই!!
দাঁতে দাঁত কিড়মিড় করে জবাব দিলো তাহজিব। আরভিদ সাহেব যেন আকাশ থেকে পড়লেন!!
– এঁহ স্যার!!
– আপনার মেয়ে কোথায় আরভিদ সাহেব??
– কেন স্যার!! স্কুলে!! এতো সকালে স্কুলেই তো যায় বাচ্চারা।
– অহ!! তা স্কুল কি আমার ঘরে??
– আমি বুঝলাম না স্যার??
তাহজিব সবটা খুলে বললো আরভিদ সাহেবকে। আরভিদ সাহেব ঘাবড়ে গেলেন।
– স,,স্যার!! আ,আ,,আমি আ,স,ছি স্যার,,, বা,,বাচ্চা মেয়ে। ভুল করে ফেলেছে মাফ করে দিন। মা মরা মেয়ে স্যার!! এমনিও বেশি দিন বাঁচবে না। ওকে মারবেন না স্যার!! আমি এক্ষুনি আসছি।
আরভিদ সাহেব ফোন কেঁটে থানা ছেড়ে গাড়িতে উঠলেন তাহজিবের বাসার উদ্দেশ্যে। আর তাহজিব ফোন সেভাবেই কানে ধরে ভাবছে আরভিদের বলা কথাগুলো।

সরি কারেন্ট ছিলো না,,, তাই লেইট হলো গল্প দিতে। জ্বর,, দুর্বলতা আছেই। তবুও চিন্তা নেই। গল্প মিস যাবে না। দিতে একটু লেইট হতে পারে।

চলবে,,