#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪৪
আইমান একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জব করছে। ক্যারিয়ার নিয়ে খুবই সচেতন সে। হয়ত এ কারণেই এতদিনেও বিয়ে শাদীর কথা মাথায় আনেনি। সেদিন একটা ফ্যামিলি প্রোগ্রামে মিথিলার সাথে দেখা। একসময় কত কত পাগলামি করেছে মিথিলার সাথে। সে সব কথা বলাবলি করে খুব মজা করেছে মিথিলা আর সে।
কথাপ্রসঙ্গে তার পাগলামির কারণে বিয়ের দিনই যে মিথিলার আর সাজিদের সম্পর্কে প্রায় চিড় ধরে গেছিল এ কথা জেনে মিথিলার কাছে খুব দুঃখ প্রকাশ করে আইমান। সে রাগের বশে ওসব কথা বলে ফেলেছে। মিথিলার দাম্পত্য জীবনে অশান্তি করা তার ইচ্ছা ছিল না মোটেই। তাই নিজের এমন কর্মকাণ্ডের জন্য খুব লজ্জিত হয় আইমান।
মিথিলা তখন দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তাকে সবকিছু ভুলে যেতে অনুরোধ করে।
বহুদিন পর মিথিলার খুব ভালো একটা সময় কাটে আজ। কত কত আত্মীয় স্বজনের সাথে দেখা হলো আজকের অনুষ্ঠানে । সবাই সবার জীবনে কত ব্যস্ত, কত হাসিখুশি। কিন্তু তার জীবনটা যেন থেমে আছে ছয় বছর আগে। তার সমবয়সী চাচাত , ফুফাত বোনেরা তাদের স্বামী সন্তান নিয়ে এসেছে। ওদের দেখেই মনটা জুড়িয়ে যায়। কত সুন্দর সাজানো গোছানো পরিপাটি জীবন ওদের। খুব লোভ হয় ওদের দেখলে মিথিলার। সারাদিন কর্মব্যস্ত দিন শেষ করে শূণ্য বাসায় এসে বুকের মধ্যে হাহাকার করে ওঠে তার। কেউ তার জন্য অপেক্ষা করে না, বাসায় দেরী করে আসলে কেউ বকা দেয় না, কেউ দুশ্চিন্তা করে না। মাঝেমাঝে খুব বেশি খারাপ লাগলে সাত তলাতে মামা মামীর ফ্লাটে যেয়ে খানিক সময় কাটিয়ে আসে। মামাতো বোন দুটির বিয়ে হয়ে গেছে। ওখানে যেয়েও খুব বেশি সময় থাকা হয় না তার। ওনাদের সাথে আন্তরিকতা আগে থেকেই কম। তাই মনকে কিছুটা শান্ত করার জন্য গেলেও বেশি সময় থাকা হয় না আর।
আজ অবশ্য মেহরাব আছে ওর বউ নিয়ে। দু’দিন থাকবে। ফুফুর মেয়ের বিয়ে উপলক্ষ্যে এসেছে ওরা। মেহরাবের পোস্টিং এখন চট্টগ্রামে। আগামীকাল বউভাতের প্রোগ্রাম শেষ করে ফিরবে । এরপর আবার সেই একাকিত্বের জীবন।
মেহরাবের বউ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে মেরিন সায়েন্সে পড়ে। মেয়েটা বেশ লক্ষী । মেহরাবের সাথে রিলেশানের বিয়ে হলেও মিথিলার অপছন্দ হয়নি । মেহরাবকে খুব ভালোবাসে এটাই বড় কথা।
পরদিন সকালে মিথিলা রুমে বসে কীসব টুকটাক কাজ করছিল এরমধ্যে মেহরাব আর ওর বউ আসে রুমে। মিথিলা ওদের দেখে হাসিমুখে বসতে বলে।
– কী ব্যাপার ! সকাল সকাল মানিক জোড় একসাথে? রাতে ঘুমাতে প্রবলেম হয়নি তো , আশা! এবার তো অনেকদিন পরে এলে।
– না, না আপা। একদমই না। আমি তো ভেবেই অবাক হচ্ছি একা এখানে এতবড় বাসায় থাকেন কী করে? আমি হলে তো মরেই যেতাম। বলল, মেহরাবের বউ আশা।
– হা হা! ‘ঠেলার নাম বাবাজী ‘ কথাটি শোননি? ঠেলায় পড়লে সবই করতে হয় বাধ্য হয়ে। একা না থেকে উপায় কী বলো!
– আবার নতুন করে জীবনটা সাজিয়ে নিলেই পারিস! তবেইতো উপায় হয়ে যায়।
সুযোগ পেয়ে বলে উঠল , মেহরাব!
– খুব বড় হয়ে গেছিস , তাই না! বিয়ে করেছিস বলে ভাবিস না যে আমি দু ‘একটা চর থাপ্পড় দিতে পারব না। বউয়ের সামনেই কী পানিশমেন্ট পেতে চাচ্ছিস নাকি?
– দিতে চাইলে দে! কোনো সমস্যা নেই । কিন্তু এবার একটা দফারফা করেই আমি ফিরব। তুই এখানে একা একা থাকিস আমার কিছুই ভালো লাগে না। জানিস কত চিন্তায় থাকি। কাজেও ঠিকঠাক মন দিতে পারি না। কতবার বললাম, আমার কাছে চলে আয়। চাকরি বাকরি করার দরকার নেই। আর দরকার হলেও ওখানে কিছু কর, কিন্তু তা তো যাবি না।
– আমার এখানে থাকায় তোর কী সমস্যা? আমি তো ভালো আছি।
– কত ভালো আছিস সে তো দেখছিই। এভাবে একা একা কতকাল? এখন শরীরে, মনে জোর আছে তাই তোর হয়ত খুব বেশি খারাপ লাগছে না। একটা বয়স পরে দেখবি এই জীবন আর ভালো লাগবে না। তখন কী করবি ভেবেছিস কখনো? এক কথা আর কতবার বলবো তোকে?
– এক কথা আমারও শুনতে ভালো লাগে না.। এত ভাবতে থাকলে জীবন চলে না। ভবিষ্যতে কি হবে তখনের টা তখন দেখা যাবে। তাছাড়া তোরা তো আছিসই। এসব কথা শুনার বয়স বা ধৈর্য কোনোটাই এখন আমার আর নেই।
– এটা কোনো কথা হলো না। তোর বয়সী মেয়েরা এখনো অনেকে আছে যারা বিয়েই করেনি। তাই এমন কিছু বয়স হয়নি যে তুই বিয়ে করতে পারবি না।
– তুই দেখছি খুব বড় বড় কথা বলছিস আজকাল। এত বেশি বুঝিস না। ভুলে যাস না আমি তোর বড় বোন।
– আপা, মেহরাব ভুল কী বলেছে? আমি আপনাকে খুব ভয় পাই। তাই কথা বলতে সাহস পাচ্ছি না। এজন্য চুপচাপ ছিলাম। কিন্তু না বলে আর পারছি না। আপনি কেন বোঝেন না! আপনার জন্য আমরা টেনশানে থাকি। বলল, আশা।
– এত টেনশান কেন করো? আমি কি বলেছি করতে। আমি তো ভালোই আছি। কখনো তো বলিনি যে আমার খারাপ লাগে এ জীবনে। সবার কাছে বারবার এই এক কথা শুনতে শুনতে আ’ম ফেড আপ। আজ প্রোগ্রামে যেয়েও একই প্রশ্ন সবার মুখে। আমার কথা হলো এত টেনশান কেন করো তোমরা ? একটা সিংগেল মেয়ে কী তার লাইফ লিড করার মতো যোগ্যতা রাখে না?
– অবশ্যই রাখে। রাখবে না কেন? আমিও একটা মেয়ে । আমি জানি মেয়েদের একা পথ চলা আমাদের সমাজে কতটা ভয়ানক। সমাজের কথা না হয় বাদই দিলাম ! আজ আপনি সুস্থ আছেন, ভালো আছেন তাই কিছু খারাপ লাগে না। কাল যদি অসুস্থ হয়ে একা ঘরে পড়ে থাকেন কে দেখবে বলেন তো! আমরা তো খবর পেয়ে আসতে আসতে আপনার আরো খারাপ অবস্থা হবে। আজ আব্বাও আপনার কথা বলতে বলতে কান্না করে দিয়েছে।
– বাবা?
– হ্যা, কালকে প্রোগ্রামে অনেক সময় কথা হয়েছে । আপনিতো অন্যদিকে তখন ব্যস্ত ছিলেন। আব্বা বাসাতে আসার পরেও কল দিয়েছিল। অনেক সময় নিয়ে কথা বলেছে। উনি শুধু আপনাকে নিয়েই ভাবে। আপনাকে কিছু বলতে সাহস পায় না। কারণ সে কোনমুখে বলবে? আপনাদের প্রতি কোনো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি তাই কত আফসোস করে! আর এখন এ অবস্থায় থাকেন বলে খুব কষ্ট পায়। উনি আমার কাছে আবদার করেছে মৃত্যুর আগে তার একটাই আশা আপনাকে সংসারী দেখে যাওয়া। আমি আব্বাকে কথা দিয়েছি। মেহরাবের কথা আপনি শোনেন আর নাই শোনেন আমি আপনার কোনো কথাই শুনব না। এবার আপনাকে যদি রাজী করাতে না পারি তবে আমি আর চট্টগ্রামই যাব না। সামনের মাসে আমার সেমিস্টার ফাইনাল। সব গোল্লায় যাক! আমি মেহরাবকেও বলে দিয়েছি, আপা যদি বিয়েতে রাজী না হয় আমি তবে এখন থেকে এখানেই থাকব।
– মিথিলা মুচকি হেসে বলল, তবে তো ভালোই হয়। দুই বোন জমিয়ে আড্ডা হবে।
– আমি কিন্তু ফান করছি না , আপা। সিরিয়াসলি!
– আমিও সিরিয়াস বলছি।
– মেহরাব একটু ক্ষেপে যেয়ে বলল, এত খামখেয়ালি করিস না তো , আপা। এবার তোর কোনো কথা শুনব না।
– মিথিলা হাসতে হাসতে বলল, আচ্ছা, আমাকে যে বিয়ে দেবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিস ! তা এই বুড়ির পাত্র পাবি কই তাই বল!
– তুই একবার রাজী হয়েই দেখ!
– আচ্ছা, ধর আমি রাজী! এবার বল কোন আংকেলের গলায় আমাকে ঝুলাবি?
– পাত্র আমি পেয়েছি। তুই শুধু বল বিয়েতে রাজী! বাকিসব আমার দায়িত্ব!
– তলে তলে অনেকদূর এগিয়েছিস মনে হচ্ছে। বিয়ের কার্ডও ছাপিয়ে ফেলেছিস নাকি?
– হেয়ালি করিস না একদম। আমি সিরিয়াস!
– আমিও সিরিয়াস! বললাম তো আংকেলের সাথে দেখা করিয়ে দে। আগে দেখি পাত্র পছন্দ হয় কি না! তারপরে না হয় ভাবব।
– ভাবাভাবির কিছু নেই। পাত্র আমাদের সবার পছন্দ। বাবাও পছন্দ করেছে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা তার তোকে খুব পছন্দ।
– তাই নাকি! কে সে ভদ্রলোক?
– আইমান ভাইয়া!
– হোয়াট! মিথিলা চমকে উঠল।
– ইয়েস। আইমান ভাই নিজে আমার সাথে কথা বলেছে। কোনো মিডিয়ার থ্রুতে কথা বলতে আসেনি । সে নিজেই বাবার সাথে আর আমার সাথে কথা বলেছে আজ অনুষ্ঠান শেষে। অনেকদিন ধরেই সে তোকে পছন্দ করে এটা আমরা সবাই জানি। আইমান ভাই এখন আর সেই আগের মতো বাউন্ডুলে নেই। একদম অন্যরকম মানুষ এখন সে। সে নিজে থেকে তোর ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছে। তাছাড়া তার পরিবারেরও তার উপর কথা বলার কোনো সাহস নেই। আইমান ভাই যাকে পছন্দ করবে তাকেই তারা মেনে নিবে। বিশ্বাস কর , আপা! আমি আইমান ভাইয়ের চোখে তোর জন্য ভালোবাসা দেখেছি। উনি তোকে খুব সুখী রাখবে। তাছাড়া তোরা দু’জনই যথেষ্ঠ ম্যাচিউর! ভুল হবার কোনো চান্সই নেই।
– পাগলের মতো কথা বলিস না তো! আমি বিয়েশাদী কিছুই করছি না।
– আমিও তবে এবার তোকে বলে রাখলাম , তুই যদি বিয়েতে রাজী না হোস তবে কোনোদিন আমি আর এ মুখো হব না।
– তোর বউ বলে সারাজীবনের জন্য এখানে থেকে যাবে আর তুই বলিস আসবি না । তাইলে কেমন হলো! সবকিছু উল্টাপাল্টা হয়ে গেল না।
– আশা কী বলেছে না বলেছে জানি না। তবে আমার কথা যে গাছে পাতায় বলিনা ভালো করেই জানিস! আমি এই মুহূর্তে তোর সামনে থেকে চলে যাব আর কোনোদিন আর আসব না। আমাদের কোনো কথার মূল্য তোর কাছে নেই । আমাদের ইমোশানের দাম নেই! সেখানে এসে মায়া বাড়িয়ে আর লাভ নেই। বিয়ে শাদী যা খেয়েছি সেই অনেক। বউভাতে আর যাচ্ছি না। আশা প্যাক করো! কুইক।
রাগ করে সেখান থেকে উঠে গেল ,মেহরাব!
মেহরাবের চোখ রক্তবর্ণ! ওর এমন চেহারা কখন হয় এটা মিথিলা জানে। খুব জেদী ছোটবেলা থেকে । ও যদি সত্যিই এখান থেকে একবার রাগ করে যায় তবে এই রাগ ভাঙ্গাতে কত কী যে করতে হবে আল্লাহ মালুম! সত্যিই যদি তার ভাইটি আর তার সাথে যোগাযোগ না রাখে। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে ওর সাথে কথা না বললে মিথিলার ঘুম আসে না। অথচ পাগলটা কী বলছে এসব?
সে দ্রুত ওর পিছু পিছু যেয়ে বলল, আচ্ছা, একটু সময় দে। ভেবে জানাই।
– ভাবাভাবির সুযোগ নেই। এই কথা বলে এত বছর কাটিয়েছিস। এবার আর আমার তোকে বিশ্বাস নেই। বেঁচে থাকার জন্য অর্থের প্রয়োজন । মানলাম তোর সেটা আছে কিন্তু একজন সঙ্গীরও যে প্রয়োজন সেটা কেন বুঝিস না। একসময় দেখবি ক্লান্ত হয়ে গেছিস। আর পারছিস না। তখন আর পেছনে ঘুরে দাঁড়াবার সময়ও থাকবে না। আজ যে সুযোগ এসেছে তাকে হেলায় হারাস না। আইমান ভাই সম্পর্কে অনেক খোঁজখবর আগে থেকেই জানি। প্রয়োজনে আবার নিবো। তুই আর না করিস না , আপা। তুই শুধু একবার হ্যা বলে দেখ! আইমান ভাই তোকে পাগলের মতো চায়! গতকাল আমার আর বাবার সামনে তোকে পাবার জন্য বাচ্চাদের মতো করে হাতজোড় করেছে। তোকে বলার সাহস ওনার নেই। তাই আমাদের কাছে আসতে বাধ্য হয়েছে।
– মিথিলা নিশ্চুপ!
– ঠিক আছে ! তুই সময় চেয়েছিস , ওকে! আজ সারাদিন ভাব। আগামীকালও ভাব। আমি প্রয়োজনে মেইল করে আরো দু’দিন এমার্জেন্সী ছুটি বাড়িয়ে নিবো। তাও এবার আমি আর খালি হাতে ফিরতে চাই না। গতবার এসেও এক ডাক্তার ছেলে ঠিক করলাম তুই রাজীই হলি না। এবার আর না করিস না আপা। এবার তুই না করলে সত্যিই তোর সাথে আর কোনো যোগাযোগই আমি রাখব না। আম্মি মারা যাবার পর তুইই আমার সব। তোকে কতটা ভালোবাসি তুই জানিস। আর তোর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করা আমার জন্য কতটা কষ্টের সেটাও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছিস। আমার কষ্ট যে তুই সত্য করতে পারিস না সে আমি জানি।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেহরাব বলল, বাকিটা তোর ইচ্ছা!
মিথিলা দু ‘ হাতে মাথা চেপে ধরে সোফায় বসে আছে । আশা কয়েকবার এসে নাস্তা খাবার জন্য তাড়া দিলেও সে সাড়া দেয় না। বলে, পরে খাবে।
মেহরাবকে যেয়ে খানিক সময় বকাঝকা করল আশা।
-আপার সাথে এমনভাবে কথা বললে? দেখো, আপা কী অস্থিরতায় ভুগছে!
– অস্থিরতায় ভুগছে তুমি শিওর?
– হুম! তাই তো দেখছি।
– তবে নিশ্চিত থাকো! পজিটিভ রেজাল্টই আসবে। তুমি পারলে বাড়িয়ে বাড়িয়ে আরো কিছু বলে অস্থিরতা বাড়িয়ে দাও। বলো আমি সত্যিই আর যোগাযোগ রাখব না এমনটাই বলছি। বিলিভ মি! আপাকে তো আমি চিনি। আমাকে হারানোর কথা সে ভাবতেই পারবে না। আমার জন্য আপাকে এবার রাজী হতেই হবে। আইমান ভাইয়ের সাথে বিয়ে হলে আমি একদম নিশ্চিত থাকব। জানাশোনার মাঝে থাকবে আপা।
তুমি একটু আগুনে ঘি ঢালো ,যাও। এবার একটা এসপার ওস্পার করেই ছাড়ব।
– তুমি না!
– আমি কিছুই না! আমি শুধু একজন অপারগ ছোট ভাই। সারাজীবন ওর থেকে নিয়েই গেছি । ওকে কিছু দিতে পারিনি। গাধাটা সারাজীবন শুধু সবার জন্য করেই গেল। কারো প্রতি কোনো অভিমান , রাগ কোনোকিছু হতে দেখিনি ওকে। একদম সিনেমার নায়িকা, শাবানা। বাস্তবে এমন মিলে না। তাই, আমি নিজের কাছে এবার প্রমিজ করেছি আমার দুঃখী বোনটাকে আমি এবার যেভাবেই হোক একটু সুখের আলো দেখাতে চাই।
– মন থেকে চাইছ! আল্লাহ নিশ্চয়ই সহায় হবেন! দেখি , একা একা আপা কী করে! খুব মানসিক প্রেসারে আছে মনে হলো।
– থাকতে দাও। সিদ্ধান্ত আমাদের ফেভারেই আসবে , ইন শা আল্লাহ!
– ইন শা আল্লাহ! তাই যেনো হয়!
সামনা সামনি দু’টি চেয়ারে বসে আছে প্রিয় আর এনা। প্রিয় এতকরে বলেছে আসার সময় আয়াতকে নিয়ে আসতে। কিন্তু এনা আনেনি। এনা চায় না আয়াতের সাথে প্রিয়র এটাচমেন্ট বাড়তে থাক। এমনিতে ছেলেটা বাবার জন্য খুব ঝামেলা করে। এ ক’মাসে কিছুটা কন্ট্রোলে এনেছে। প্রিয়র সাথে এতবার দেখা হলে আবার সেই আগের মতো হয়ে যাবে।
– কী বলবে দ্রুত বলো! আমার আবার পার্লারে এপয়েন্টমেন্ট আছে।
– এটা করেই তো দিন পার করো! আল্লাহ তো অনেক সুন্দর চেহারা দিয়েই তোমাকে পাঠিয়েছে । এত পার্লারে যেয়ে সময় নষ্ট করে কী লাভ! ছেলেটাকে একটু সময় দিলেই তো পারো।
– সেটা তোমার না ভাবলেও চলবে! আমার সৌন্দর্য দেখার চোখ তো দেখছি ভালোই হয়েছে । আগে তো কখনো হদীস পাইনি । আচ্ছা, সেসব কথা রাখো ডেকেছ কেন তাই বলো।
– ডেকেছি কারণ প্রথমত আয়াতকে দেখতে চেয়েছিলাম।
– সেটা সম্ভব না। আয়াত ঘুমাচ্ছিল।
– মিথ্যা বলার অভ্যাস আর গেল না।
– আচ্ছা, দ্বিতীয়ত কী সেটা বলো।
– আমি বাংলাদেশে ফিরে যাচ্ছি। আয়াতকে তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। আয়াত তোমার কাছে আমার আমানত। তবে ছয়মাস অন্তর আসব ওকে দেখতে। আর ওর সাথে প্রতিদিন যেন কথা বলতে পারি সেটা মেক শিওর করার দায়িত্ব তোমার। আর এটা যদি তুমি করতে অপারগতা প্রকাশ করো তবে আমি আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবো। আদালতের কথাগুলো নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে।
– ওহ! তবে বাংলাদেশে ফিরবে? একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, এনা।
– এখানে করব কী তবে? কিছু তো করে খেতে হবে।
– বিজনেস থেকে না বেরোলেই পারতে।
– একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে প্রিয় বলল, তাই তোমার বাবার বিজনেস!
– হ্যা, তো!
– আচ্ছা ওসব কথা বাদ দাও। ওসব এ যেতে চাই না। আর আয়াত আর একটু বড় হলে ওকে আমি আমার কাছে নিয়ে রাখব কিছুদিনের জন্য। ওর নিজের দেশ, দাদা-দাদি এদেকেও দেখা দরকার ওর। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি বছর দুয়েক পরে ওকে কিছুদিনের জন্য বাংলাদেশে নিয়ে যাব আমার সাথে। আশা করছি তখন কোন ধরনের সিনক্রিয়েট করবে না।
– দুই বছর পরে ছেলের জন্য এই ভালোবাসা তোমার থাকে কিনা সেটা দেখো না!
– নিজের মত সবাইকে কেন ভাবো!!
– আচ্ছা তোমার কথা শেষ হয়েছে? আমি উঠব।
– হুম। আপাতত শেষ। ভালো থেকো। আর আগামী সপ্তাহে আমি টিকিট করেছি। যাবার আগে একবার ছেলেটার সাথে দেখা করে যেতে চাই। আগামী পরশু তো ওর স্কুল ছুটি। ঐদিন সারাদিন আমি ওর সাথে থাকতে চাই। ড্রাইভারকে দিয়ে পাঠিয়ে দিবে। আমি অপেক্ষা করব।
– বেশতো! বাসায় চলে এসো।
– সরি। আমার বাসাতে নিয়ে আসব। আপত্তি করার মতো কোনো কারণ দেখছি না।
– আচ্ছা।
– উঠি তবে।
– তবে এখানেই কি আমাদের শেষ দেখা?
– আর কী প্রয়োজন আছে?
– নাহ! সময় কত নিষ্ঠুর তাই না!
– সময় নিষ্ঠুর না। নিষ্ঠুর আমরা বানিয়েছি। সময় সময়ের গতিতে চলে। সেখানে কারো হাত নেই।
– অল দ্যা বেস্ট।
প্রিয়র চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো এনা। চোখের কোণ বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল অজান্তে। মানব মন কত বিচিত্র। সে অবাক হয়ে ভাবছে, “প্রিয় চলে যাবে শুনে এত খারাপ লাগছে কেনো আমার? একসময় মানুষটাকে কত কষ্ট দিয়েছি!
সহ্য করতে না পেরে ডিভোর্স পর্যন্ত দিয়েছি। তারপরও কিসের টান কাজ করছে?
প্রিয় দেশে ফিরে কি করবে? ওর মা-বাবা নিশ্চয়ই ওকে আবার বিয়ে দিবে! সে কি আর ইতালিতে ফিরবে? আর কি আমার সাথে ওর দেখা হবে? ”
মানুষ সত্যিই হয়ত দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। এত বছরেও যে অনুভূতি কাজ করেনি হঠাৎ করে সেই অনুভূতি মোচড় দিয়ে উঠলো এনার বুকের মধ্যে।
আইমান অনেকক্ষণ ধরে ওয়েটিং রুমে বসে আছে । অনেক কষ্টে মিথিলাকে ডিনারের জন্য রাজি করানো গেছে। মিথিলার পাঁচটার দিকে ছুটি হবে। ছুটি হলেই দু’জনে মিলে কিছুটা সময় পার্কে হাঁটবে। ডিনার পর্যন্ত কাটাবে সেখানে। মিথিলার খোলা হাওয়া খুব পছন্দ এটা জানে আইমান। বিশেষ করে সন্ধ্যার হাওয়া। আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এসেছে । তার কাছে এখনো যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। সবকিছু স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে। মেহরাব যখন বলেছিল, মিথিলা তার সাথে ডিনারে যাওয়ার জন্য রাজি! শুনে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না কিছু সময়ের জন্য আইমান। তার সারা জীবনের অধরা স্বপ্ন আজ বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। মিথিলাকে সে তার মনের রাণী বানিয়ে রাখবে সে সারাজীবন। নিজের কাছেই নিজেই প্রতিজ্ঞা করল।
চলবে……
#সুখের_সন্ধানে
#পর্ব_৪৫
সকাল থেকে মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে । শরীরটাও গরম মনে হচ্ছে। ভয় হচ্ছে জ্বর টর না আসে। সবদিকে সামলাতে হয় একা হাতে। এই অবস্থায় অসুস্থ হলে কীভাবে চলবে? সকালে নাস্তাও খাওয়া হয়নি। খেতেই ইচ্ছে হচ্ছে না। মুখে দিলেই কেমন বমি চলে আসছে। আজ আবার বিকেলে আমার শাশুড়িকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। কখনো সেলিমকে নিয়ে আবার কখনো আমার শাশুড়িকে !এভাবে ডিউটি দিতে দিতে নিজেই অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কিছুই করার নেই । আমি ছাড়া এই মানুষ দুটির আর আছেই বা কে? আমার দেবর অবশ্য কয়েকবার আমার শাশুড়িকে তার বাসাতে নিতে চেয়েছে। আমার শাশুড়ি সেখানে যেতে চায় না। আমারও কেন যেন মন সায় দেয় না ওনাকে এখান থেকে পাঠিয়ে দিতে। সারা বাড়িতে মানুষ এই তিনজন। আম্মাও যদি চলে যায় তবে তো ভূতের বাড়িতে রূপ নিবে। মন খারাপ হলে আম্মার পাশে বসে খানিকসময় কথা বলি। সেও যদি চলে যায়! আম্মা তো এ বাড়ি ছেড়ে যেতেই চায় না। তার একটাই কথা মরতে হলে এ বাড়িতে বসেই মরবে। এখানে থাকতেই সে অভ্যস্ত। এখান ছেড়ে সে কোথাও যাবে না। তাই এই অসুস্থ মানুষ দু’জনকে নিয়েই আমার পৃথিবী।
বাবুর্চী কী রান্না করবে জিজ্ঞেস করতে এলে কেনো যেন মনে হলো আজ প্রিয়র পছন্দের খাবার রান্না করতে বলি। ওর পছন্দের খাবার যেদিন রান্না হয় মনে হয় এই বুঝি একটু বাদেই প্রিয় এসে বলবে , আম্মু খাবার দাও। আমার কিন্তু তর সইছে না।
আমি বাবুর্চীকে বললাম , আজ আলু ভর্তা ,চিংড়ী শুঁটকি ভর্তা, মসুর ডাল ভর্তা করো। সাথে পাবদা মাছের ঝোল আর কচুর লতি ইলিশ রান্না হবে।
বাবুর্চী চলে যাবার পর সেলিম বলল, ছেলেকে মনে পড়েছে?
– মনে তো সবসময়ই পড়ে। আজ যেন কেন খুব বেশিই মনে পড়ছে। এই ক’দিন ওকে কল করেও পাওয়া যাচ্ছে না। পরশু একটা মেসেজ দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে সে ব্যস্ত। ফ্রী হলে নক করবে। এই তিনদিনেও ফ্রী হয়নি ভেবে অবাক হই! হায়রে সন্তান! এর থেকে নিঃসন্তান থাকলেও মনকে শান্ত রাখতে পারতাম। জীবনের কোনো মানে খুঁজে পাচ্ছি না। এভাবে একটা জীবনকে আর টেনে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হয় না। ওর পছন্দের খাবার রান্না হলে মনে হয় এই বুঝি ছেলেটা আসবে। প্লেট নিয়ে আমার পাশের চেয়ারে বসবে। এটুকু ভাবতেও খুব ভালো লাগে। ওসব তুমি বুঝবে না। তুমি খাবার আগের ওষুধটা খেয়ে নিও। আমি একটু শুয়ে পড়ব। শরীরটা কেমন ব্যথা মনে হচ্ছে। জ্বরটর না আসলে হয়! ঘুমিয়ে গেলে ডাক দিও না।
– আচ্ছা। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল , সেলিম।
ঘণ্টাখানেক একটু শুয়ে থাকলাম। ঘুম আর আসলো না। শরীরটাকে টেনে নিয়ে কোনোরকমে খাবার টেবিলে এসেছি। আম্মার খাবারটা পাঠিয়ে দিলাম ওপরে। আমি একটা একটা করে ঢাকনা তুলছি আর চোখ জোড়া ভিজে আসছে। সেলিম বুঝতে পারে আমি কেন কাঁদছি । একটা প্লেট নিয়ে সেলিমকে খাবার দিলাম। আমিও অল্প কিছু খাবার নিয়ে মাখিয়ে মুখে দেয়ার চেষ্টা করছি। কিছুই খেতে ইচ্ছে হচ্ছে না একদম। মনে হচ্ছে এই বুঝি বমি চলে আসবে।
মাত্র এক লোকমা খাবার মুখে দিব ঠিক তখন মনে হলো পেছন থেকে প্রিয় এসে বলল, আম্মু আমার প্লেট কই?
আমার হাত থেকে ভাতের লোকমা নিচে পড়ে গেল। ভাবলাম , আমার ভ্রম হবে হয়ত। সেলিমের দিকে তাকিয়ে দেখলাম , সেলিম মুখের খাবার চিবানো বাদ দিয়ে কেমন হা হয়ে পেছনে তাকিয়ে আছে।
আমিও পেছনে তাকালাম। নিজেকে বিশ্বাস করতে পারছি না। কাকে দেখছি আমি। আমি কি জ্বরের ঘোরে ভুলভাল দেখছি? কিন্তু সেলিম সেই বা আমার মতো ভুলভাল দেখছে কেন। সেলিমও খাওয়া বন্ধ করে হা হয়ে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে।
আমি কিছু বলতে যাব অমনি হাটুগেড়ে ধপাস বসে পড়ল সেলিমের পায়ের উপর।
– আব্বু, কেমন আছো তুমি? এই কুলাঙ্গার ছেলেকে মাফ করে দাও। আমি তোমাকে কেমন দেখে গিয়েছিলাম আর আজ কি দেখছি। তোমাকে চিনতেই তো পারছি না। এ আমি কাকে দেখছি?
সেলিম শুধু কাঁপছে । মনে হচ্ছে এখনি হাউমাউ করে বাচ্চাদের মতো কেঁদে উঠবে। নিজেকে সে সামলাতে পারছে না কিছুতেই। ভেতর থেকে কান্না বেরিয়ে আসছে তার । কোনোরকমে প্রিয়কে টেনে তুলল পায়ের উপর থেকে। কিছুই বলতে পারছে না। শেষমেশ এত চেষ্টা করেও কান্না আর থামাতেই পারল না সেলিমও। বাপ ছেলে মিলে কেঁদে কেটে একাকার। এত বছরের অভিমান গলে গলে পড়ছে। এ যেন ফুরাবার নয়। সেলিম একটু ঝুঁকে প্রিয়র মুখে চুমা দিতে দিতে যেন ক্লান্ত হচ্ছে না। আমি কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ঘরের মধ্যে কী এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে; আমিও যেয়ে সেলিমের পায়ের কাছে প্রিয়র পাশে বসে পড়লাম। প্রিয়কে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম এবার তিনজন মিলে। আশেপাশের মেইডরা কে কী ভাবছে সেটা ভাবার সময় আমাদের নেই। দু’একজন বাদে সবাই নতুন মেড। নতুনদের কাছে হয়ত অবাক লাগছে ।
প্রিয়কে কান ধরে টান দিয়ে কোনো রকমে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বললাম, আসবে আমাকে বললেই পারতে। এই তোমার ব্যস্ততা ? এই জন্যই এ ক’দিন কথা বলোনি , তাই না!
প্রিয় কান্নার মাঝেও হেসে দিয়ে বলল, যদি এক্সাইটেড হয়ে সত্যি বলে ফেলতাম তাই সাহস হয়নি কথা বলার।
– বললে কী হতো!
– যদি মিথ্যে আশা দেয়া হতো! কাঁদছে আবার হাসছে প্রিয়।
সেলিম এখনো নিশ্চুপ! আট বছর বাদে ছেলের সাথে দেখা আর কথা। কত কথা জমা আছে তার। অথচ মুখ খুলে বলতেই পারছে না কিছু। শুধু প্রিয়র মাথা হাতড়াচ্ছে আর কিছুক্ষণ পর পর বুকে চেপে ধরছে। পাগলের মত কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে সে। বুঝতে পারছি সেলিমের কেমন লাগছে! আমি তো তবু প্রিয়র সাথে ভিডিও কলে মাঝামাঝে কথাবার্তা বলি । কিন্তু সেলিমের সাথে তো কখনো কথাই হয়নি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল বাপ ছেলের সামনা সামনি দেখা হলে এই অভিমান গলে বরফ হয়ে যাবে। ভালোবাসার উষ্ণতার কাছে এসব অভিমানের কোনো মূল্য নেই।
এতক্ষণে মনে হলো প্রিয়র সাথে হয়ত এনা আর আমার নাতী আয়াতও এসেছে। আমি এদিক সেদিক তাকিয়ে প্রিয়কে বললাম , বাবা! এনা আর আয়াত কোথায়?
হঠাৎ খেয়াল করলাম প্রিয় এতক্ষণে একটু স্বাভাবিক হলো। আমার কথা শুনে কেমন চমকে উঠে বলল, ওরা আসেনি আম্মু। একাই এসেছি। শুষ্ক গলায় বলল , আমার ছেলেটা।
– ওহ! আসেনি তবে! আয়াতকে দেখা হবে না তবে? মনের মধ্যে প্রদীপ হয়ে উঁকি দিয়ে জ্বলে ওঠার আগেই আশাটুকু নিভে গেল এক ঝলকে।
– প্রিয় চোখ মুছতে মুছতে বলল, কেন হবে না? অবশ্যই হবে! আজ আসেনি তো কী হয়েছে? খুব তাড়াতাড়িই আয়াতের সাথে তোমাদের দেখা হবে। আব্বু, দাদী কোথায়?
– সে তো হাঁটাচলা করতে পারে না । উপরে রুমেই থাকে। চলো , উপরে যাই।
সেলিম ধীরে ধীরে টুকটাক কথাবার্তা বলতে বলতে স্বাভাবিক হলো। প্রিয়র সাথে কত কথা তার! বাবা ছেলের কথাপোকথন শুনতে শুনতে আমিই আবেগপ্রবণ হয়ে হয়ে গেলাম ।
আমরা উপরে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি তখনই দেখলাম আমার শাশুড়ি এসে হাজির। আমাদের একজন পুরাতন সার্ভেন্ট মতিন ওই নিয়ে এসেছে আম্মাকে। প্রিয়কে দরজাও আসলে ওই খুলে দিয়েছে। কিছুক্ষণ আগে বেল বাজার শব্দ হলে আমিই মতিনকে পাঠিয়েছিলাম দরজা খুলতে। ভেবেছিলাম কোনো সার্ভেন্ট বা অন্য কেউ এসেছে হয়ত। মতিন প্রিয়কে দেখেই আম্মাকে খবর দিতে গিয়েছিল। আম্মাই নিশ্চয় নিচে আসার জন্য জেদ ধরেছিল।
আমার শাশুড়ি আসার পর শুরু হয় আরেক আবেগী দৃশ্য ! নাতীকে পেয়ে যেন আকাশ পেয়েছে সে। বুকের সাথে জাপটে আছে প্রিয়কে। কান্না করছে আর বলছে, কত ডেকেছি উপরওয়ালাকে! আমি জানতাম মরার আগে তোকে আমি দেখতে পাবই। আমার ডাক আল্লাহ শুনেছেন! আমি এবার শান্তিতে মরতে পারব। আর কিছু চাওয়ার নেই আমার?
কান্নাকাটি পর্ব শেষ করে কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে প্রিয় ফ্রেশ হতে রুমে গেল। ওর রুমটা দেখলে মনে হয় প্রিয় এখনো এখানেই থাকে। ও যে আট বছরের বেশি সময় ধরে এ ঘরটাতে থাকে না এটা বোঝাই যায় না। প্রতিদিন ওর রুমের ঝাড়ামোছা হয়। এমনকি ড্রেসিং টেবিলের উপর ওর ব্যবহৃত পারফিউম, বডিস্প্রেসহ আরো অন্যান্য কসমেটিকসগুলি পর্যন্ত এমনভাবে রাখা যে দেখে মনে হবে প্রতিদিনই এগুলি ব্যবহার করা হয়।
আলমারীতে কাপড় চোপড়ও একইভাবে প্রতিদিন নাড়াচাড়া করে গুছিয়ে রাখি আমি। প্রায়দিনই ঘুমাতে যাবার আগে ওর ঘরে বসে এগুলি নাড়াচাড়া করি আর ওর শরীরের ঘ্রাণ নেয়ার চেষ্টা করি।
প্রিয় ওর রুম এমন পরিপাটি দেখে অবাক হয়ে গেল। ঠিক সেই দিনের মতোই আছে যেদিন সে চলে গিয়েছিল।
খাবার টেবিলে বসে প্রিয় আরো অবাক। সব তার পছন্দের খাবার রান্না হয়েছে আজ। আসলে মায়ের মন ঠিকই সব টের পায় । আজ কী মনে করে এই খাবারগুলি আমি রান্না করতে বলেছিলাম। খুবই ভালো হলো। প্রিয় তৃপ্তি সহকারে খাবার খেলো। আমি কী খাব শুধু তাকিয়ে দেখছি। শরীরের সেই যন্ত্রনাও যেন ভুলে গেছি নিমেষে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে নিজেকে।
তবে আসার পর থেকেই প্রিয়র চেহারার মাঝে একটা বিষন্নতার ছাপ দেখতে পাচ্ছি। নিশ্চয়ই এনার সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে এসেছে। ওই বদমায়েশ মেয়ে এত সহজে তো প্রিয়কে আসতে দেয়নি। বড় রকমের যুদ্ধ, দাঙ্গা হাঙ্গামা করেই এসেছে এটা আমি শিওর। যা হয় হোক! আমার ছেলে এসেছে এটাই আমার বড় পাওয়া!
এতক্ষণে মনে হলো ও ক’দিন না ক’দিন থাকবে জানা দরকার। কতকিছু করে খাওয়াব ছেলেটাকে। আবার ভাবছি এটা জিজ্ঞেস করলে ও কিছু মনে করে যদি!
হঠাৎ সেলিমই বলে উঠল, ক’দিন থাকবে, বাবা?
– তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছ? আসতে না আসতেই যাওয়ার কথা বলছ! হাসতে হাসতে বলল, প্রিয়।
– না, না! তা কেন? তোমার বাবা সেটা বোঝায়নি।
– বুঝেছি আম্মু। আমি তো মজা করছিলাম। দেখি কতদিন থাকা যায়। এত বছর পরে এলাম এত সহজে তো যাচ্ছি না। ইচ্ছে হলে এবার তোমাদের সাথে থেকেও যেতে পারি।
– তাই! তবে তো খুব ভালো হয়। এনা আর আয়াতকেও নিয়ে আসো।
– দেখি!
আজ আইমানের সাথে আইমানের অফিসের একটা ডিনার পার্টিতে যাচ্ছে মিথিলা। আইমানই খুব জোর করে রাজী করাল। মিথিলা যেতেই চায়নি। তবে এ ক’দিন আইমানের সাথে টুকটাক কথাবার্তা বলতে বলতে অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে সে। অফিস শেষে আইমান নিজে আসবে মিথিলাকে নিতে। মিথিলা অগত্যাই অনুরোধে ঢেকি গেলার মতো করে রাজী হয়েছে। তার এক মন একবার বলে আইমানকে এই সম্পর্কের ব্যাপারে না করে দেয় আবার ভাবে , সবাই তো ঠিকই বলেছে। এভাবে একা একটা মানুষ কীভাবে বাঁচতে পারে। মেহরাবের সংসারে যেয়ে তার থাকবার ইচ্ছা কোনোদিনই নেই। দূরে আছে তাই ছোটভাইয়ের বউয়ের কাছে সম্মান আছে, শ্রদ্ধা আছে। তার সংসারে যেয়ে থাকলে নিজের সম্মানটাই হারিয়ে যাবে। তাছাড়া বাকী জীবন আর কারো ঘাড়ে বোঝা হয়ে থাকতে তার মন সায় দেয় না। আইমানকে হ্যা অথবা না কিছুই বলেনি। মিথিলা ভাবছে ,একটা বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তো আগে হোক! তারপরে বিয়ে শাদীর চিন্তা তারপরে করা যাবে। আইমান মাঝেমাঝেই এখানে সেখানে যাবার জন্য তাকে কল করে। মিথিলার সময় থাকলে যায় , আবার সময়ে না মিললে যায় না। আইমান অবশ্য রাগ করে না। সে মিথিলাকে বোঝে। আইমান এখন অবধি তার বন্ধুত্বের সীমা অতিক্রম করেনি। এটা মিথিলার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। সে নিজেও আসলে একটু সময় নিতে চাচ্ছে। আইমানকে সে এ কথা ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অবশ্য আগেই বুঝিয়ে দিয়েছে । আইমানও নির্দ্বিধায় এটা মেনে নিয়েছে। সেও চায় মিথিলা কোনো চাপে পড়ে নয় , স্বেচ্ছায় একটা সিদ্ধান্তে আসুক! তবে একজন ভালো বন্ধু হিসেবে দু’জনের আড্ডা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয় তার কাছে। বরং এটা তো ভালোই। এই সুযোগে দু’জন দু’জনকে আরো জানার সুযোগ হবে।
আমি প্রিয় এসেছে সেই খুশিতে আর উত্তেজনায় কাউকে জানাতেই মনে নেই যে প্রিয় আসার খবর আত্মীয় স্বজনদের জানানো দরকার। বিশেষ করে মিথিলাকে, সে তো রীতিমত অভিমানের পাহাড় সাজিয়ে বসে আছে এতদিনে।
ফোনটা হাতে নিতেই ওপাশ থেকে ফোন সুইচড অফ বলছে। এটা এই মেয়েটার একটা বদ অভ্যাস! স্কুল থেকে ফেরার পরে কোনোদিকে হুশ থাকে না। ব্যাগের মধ্যে ফোন বাজতে বাজতে একসময় চার্জ ফুরিয়ে যায়! খুব রাগ হলো বারবার ওই কম্পিউটারাইজড লেডির একই কথা শুনতে!
এদিকে আম্মাকে ডাক্তারের কাছে নিতে হবে। এসে আবার প্রিয়র জন্য কত রকমের রান্না করতে হবে। ছেলেটা ক’দিন না ক’দিন থাকে খবর আছে। হুট করে বলবে আমার অমুক তারিখে ফ্লাইট! ওর কোনো বিশ্বাস নেই। প্রিয় ওর রুমে ঘুমাচ্ছে। আমি দু’জন সার্ভেন্টকে সারাক্ষণ ওর ডিউটিতে লাগিয়ে দিলাম। ও কী খেতে চায় , কোথায় যেতে চায় সবদিক খেয়াল রাখতে বলেছি।
আম্মাকে নিয়ে ফেরার পর থেকে শরীরটা আর চলছেই । দুপুরে মেডিসিন খেতে ভুলে গেছি। এখন খেতে হবে। ফিরে দেখলাম প্রিয় তখনও ঘুম। ওকে আর জাগালাম না। কতটা পথ জার্নি করে এসেছে । দ্রুতপায়ে কিচেনের দিকে গেলাম । প্রিয় সন্ধ্যার নাস্তায় মিষ্টি খাবার পছন্দ করে। ও ওঠার সাথেই যাতে ওর পছন্দের নাস্তা দিতে পারি তাই একটু তড়িঘড়ি। দেখলাম সবজির ঝুড়িতে খুব কচি একটা লাউ রাখা। তৎক্ষণাৎ মনে পড়ল প্রিয়র খুব পছন্দ লাউয়ের ক্ষীর, চালকুমড়ার মোরব্বা।
বাবুর্চীকে বললাম দ্রুত চুলায় দুধ জ্বালিয়ে ঘন করতে। এবং আরেকজনকে বললাম লাউ খুব মিহি করে কেটে দিতে। আমি বাকীসব আয়োজন দেখার জন্য চুলার পাশে গেলাম। এটা সেটা নেড়েচেড়ে দেখছি এর মধ্যে কি হলো আর কিছু মনে নেই। শুধু মনে আছে একটা কেমন যেন চক্কর দিলো মাথার মধ্যে। চারপাশ অন্ধকারে ভরে যাচ্ছে যেন।
একজন সার্ভেন্ট দৌড়ে গিয়ে সেলিমকে খবর দিলো। দ্রুত প্রিয়কে ডাকতে বলল, সেলিম। সে খুব ঘাবড়ে গেছে। এই মুহূর্তে সে কী করবে? সে তো অপারগ! ক’দিন ধরেই কেমন অসুস্থ মনে হচ্ছিল , রুম্পাকে। কিন্তু আজ তো ছেলেকে পেয়ে মনে হলো কিছুটা সুস্থই লাগছিল । কী হলো হঠাৎ?
প্রিয় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলো বাবার রুমে।
– কী হয়েছে আম্মুর? কই সে?
– আমি নিজেও জানি না। এখানে নেই। নীচে আছে। আমাকে একটু নিয়ে চলো।
– আচ্ছা।
তড়িঘড়ি একটা এম্বুলেন্স ডাকল , প্রিয়। একদমই সেন্স নেই। জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে । সেলিম আর প্রিয় দু’জনই ঘাবড়ে গেল খুব।
এম্বুলেন্স আসতে আর মিনিট কিছু বাকি। প্রিয় একাই যাচ্ছে তার আম্মুকে নিয়ে। সেলিম খুব হাহাকার করছে আর আফসোস করছে পাশে না থাকতে পারার জন্য।
সে তার ফোনটা বের করে দ্রুত মিথিলাকে কল দিলো। এই মুহূর্তে মিথিলা ছাড়া আর আছেই বা কে? রুম্পার পাশে এই মুহূর্তে মিথিলাকে খুব প্রয়োজন।
দুইবার রিং বাজতেই মিথিলা কল রিসিভ করল।
– আসসালামু আলাইকুম , মা। তুই কই এখন?
– এই তো বাসায়? কিছু কী বলবেন?
– তোর রূম্পা মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সেন্স নেই একদমই। তাড়াতাড়ি চলে আয়। এম্বুলেন্স চলে আসছে। এভারকেয়ারে নিয়ে যাচ্ছি।
মিথিলা আর কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই কল কেটে দিলো সেলিম।
মিথিলা রেডি হচ্ছিল পার্টিতে যাবার জন্য। খুব সুন্দর করে পরিপাটি সাজে সেজেছে সে। বহুদিন পর ডিপ সবুজ আর মেজেন্টার কম্বিনেশানের একটা জামদানী শাড়ি পরেছে, চোখে কাজল পরেছে, ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়েছে আর কপালে একটা ছোট্ট সবুজ টিপ। আইমান এসে গেছে প্রায়। কিছুক্ষণ আগেও কল করেছিল রেডি হওয়া শেষ হয়েছে কিনা জানতে।
মিথিলার মাথা কাজ করছে না। রূম্পা মাকে কে নিয়ে যাবে? কে দেখছে? ও বাড়ি তো সবাইই পেশেন্ট। কী হলো এমন? গতকাল কীসব ব্যস্ততায় কথাও হয়নি রূম্পা মায়ের সাথে। দিনে একবার কথা হয় তার সাথে। নিজের উপর রাগ হচ্ছে গতকাল কথা না বলতে পারার জন্য।
গত পরশুও আইমানের ব্যাপারে কত কথা জানতে চাইল রূম্পা মা। বারবার মিথিলাকে বুঝেশুনে থাকবার পরামর্শ দিলো। সারাক্ষণই সবার কথা ভাবে মানুষটা। অথচ নিজের মাঝে কী সমস্যা চলছে কিছুই বলে না।
মিথিলা দ্রুতই যে অবস্থায় আছে সে অবস্থায়ই রওয়ানা হলো হাসপাতালে যাবার জন্য। রাস্তায় যেতে যেতে আইমানকে জানিয়ে দিবে সে পার্টিতে যেতে পারবে না।
চলবে…