#শেষ_সূচনা
পর্বঃ ১২
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
সেদিন রাতে ক্যাম্প এ ফিরলাম রাত দশটার দিকে। আসার সময় স্বর্ণা কিচ্ছুটি বলে নি।নির্ভার হয়ে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়েছিল শুধু। কবি নজরুলের সখীর মতো বিদায়ের বেলায় জল-ছলছল চোখেও চাইলনা, কাতর কণ্ঠে বিদায়ের গানও গাইলনা;এমনকি আমার অতি প্রত্যাশিত হাত দু’টোও নেড়ে মুচকি হাসলনা। চিত্রার্পিতার ন্যায় দাঁড়িয়ে থেকে অনাড়ম্বরে বিদায়ের কাজ সারল। আমি অটো নিয়ে ক্যাম্পের অদূরে এসে গাড়ি থেকে নেমে এলাম। অনেক্ক্ষণ বাইরে পায়চারী করে গেটের দারোয়ানে গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলাম। উদ্দেশ্য, যেই একটু সরে পড়বে অমনি টুস্ করে গেটের ভিতর ঢুকে পড়ে তার সঙ্গে আলাপ জুড়ে দেওয়া। মিনিট পনেরো পর সেই সুযোগ আসা মাত্রই আমি এক লাফে গেট পার হয়ে আলতো করে তার কাঁধে হাত রাখলাম। সে চকিতে উওও বাবা বি-ভি কে?কে?… বলে ভীতির অনুকার শব্দ করে দু’পা পিছিয়ে গেল। আমি ঠোঁট দু’টো দু’দিকে প্রসারিত করে হেসে বললাম,
— আমি আমি। ভয় পাচ্ছেন কেন?
দারোয়ানের হাতে লাঠি ছিল। সে নিজের মাথায় টাং করে একটা বাড়ি দিয়ে নিজের ভয় কাটাল। লোকে ভয় পেয়ে বুকে থুথু দিতে দেখেছি,কিন্তু এমন কাণ্ড তো দেখি শতবছরে একবার ঘটে!ভয় কাটাতে মাথায় বাড়ি! দারোয়ান আমতা আমতা করে বলল,
— পাগল আমি হলাম না তুমি? কখন, কীভাবে, কোনদিকে এলে তুমি?
আমি মুখে সেই হাসি টানটান করে ঝুলিয়ে রেখে বললাম,
— পাগল কেউ না। আপনার তো রাতের ডিউটি।… মাত্র ঘুম থেকে উঠে এলেন। তাই এমন ভুলভাল দেখছেন। চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিন। ঠিক হয়ে যাবে।
বলে দাঁড়ালাম না আমি। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানে নানান অযাচিত প্রশ্নে ফুরফুরে, রোমাঞ্চকর মনটাকে বিষিয়ে তোলা। হঠাৎ এমন করে কিস্ করে বসবে সেটা আমার ভাবনার ও অতীত ছিল। পেছন থেকে দারোয়ান বলেই চলেছে আমার উদ্দেশ্য করে,
— কিন্তু কেন এলে, সেটা তো বলে যাও। এই ছেলে।
আমি পিছনে ফিরে তাকালাম না। একটা ‘ভাবে’ আছি সেটা নষ্ট করতে চাইনা।
ব্যারাক ঘরের চৌকাঠে পা রাখতেই অনিক কলকলিয়ে বলে উঠলো,
— আরে বাহ্ বস, গিয়েছিলে কোথায়? সবাই তোমাকে খুঁজে হয়রান।।
আমি একটু সচকিত হলাম,
— সবাই মানে?
অনিক ফিচেল দৃষ্টিতে তাকাল আমার দিকে। সহসাই ফিক করে হেসে দিয়ে বলল,
— ভয় পাচ্ছ কেন? সবাই না। শুধু আমি। বনের দিকে যেতে দেখলাম সেই বিকালে এতক্ষণ কী করলে? বলোতো কই গিয়েছিলে?
আমি খাটের উপর পা তুলে দিয়ে আরাম করে বসলাম, ভাবলেশহীনভাবে বললাম,
— তোমাকে বলতে যাব কেন?
অনিক হাসি হাসি মুখটা ম্লান করে ফেলল। এ’কথার জবাবে কিছু বললনা। তার চপল চোখ হঠাৎ আমার পায়জামার উপর পড়ে আবার পূর্বের হাসি হাসি নকশা ফিরে পেল। সে ভ্রু দুটি নাচিয়ে প্রশ্ন করল,
— আমাকে না-ই বললে, কিন্তু তোমাকে তো প্যান্ট পরে বনের দিকে যেতে দেখেছি। রাতের বেলা কি আসমান থেকে পরী-টরি এসে তোমার প্যান্ট পাল্টে পায়জামা দিয়ে গেল?
আমি রহস্যময় একটা হাসি দিয়ে বললাম,
— হতে পারে। অসম্ভব কিছু না।
— অ্যাঁ, সত্যি নাকি। তুমি কী রাশি ভাই? কন্যা রাশি? সব মেয়ে তোমার জন্য পাগল হয়। আজকাল দেখি আসমানের পরীও তোমার জন্য পাগল। তাও বাদ গেলনা! অথচ আমার দেখো, একটা মেয়ে ফিরেও তাকায় না।
কথার সঙ্গে একরাশ হতাশা ঝরে ঝরে পড়ল অনিকের কণ্ঠে। বলাবাহুল্য তখন ব্যারাকে কেউ ছিলনা, সবাই রাতের খাওয়া নিয়ে ব্যস্ত।
আমি চোখা চোখে তাকিয়ে বললাম,
— অন্য মেয়ে দিয়ে কী করবে? তোমার না ঘরে বউ আছে? ওনি কি এসব জানে? জানাতে হবে?
— নাহ, জানাতে হবেনা। তাহলে কপালে খারাবি আছে আমার। চৌদ্দ দিন বাপের বাড়ি থেকে আসবে। আর আমাকে একা রান্না করে খেতে হবে। প্যারা ভাই প্যারা।
আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। কেন জানিনা অনিকের কথায় আমি ভারি আমোদিত হলাম। এই ছেলেটার মাঝে মানুষের মন ভালো করার একটা নৈসর্গিক উপাদান আছে। কেউ-ই এর সামনে মুখ গোমড়া করে বসে থাকার অবকাশ রাখেনা। রাখলেও নানা তরবেতর কাণ্ড-কারখানা করে এক চিলতে হাসি ফুটানোই যেন তার মৌলিক দায়িত্ব। আমার বাঁধভাঙা হাসি দেখে সে ছদ্মগাম্ভীর্যে মুখ গুম করে বললো,
— আর হেসে লাভ নেই। চলো। খেয়ে নিই। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম।
আমি হাসার গতি শ্লথ করে খাট থেকে নেমে আলতো করে বললাম,
— ঠিকাছে চলো।
এভাবেই উল্লেখযোগ্য ঘটনাবিহীন আরো কয়েকমাস কেটে গেল ক্যাম্পে। প্রতিদিনের একটাই রুটিন।সকালে ওঠা,ফ্রেস হয়ে খেয়েই ট্রেনিংয়ে যোগ। সারাদিন শেষে বিকেলে একটু ঘুরাফেরা কিংবা বিশ্রাম। তবে বলাই দরকার, অনিককে এখন আগের মতো উঠকো ঝামেলা মনে হয় না। তার হাস্য-রসাত্মক অযাচিত কথাগুলোয় বিরক্তিতে মাখামাখি না হয়ে বরং একটু আমোদ নেওয়ার চেষ্টা করি। এতোদিনে হয়তো তার আসল খোরাকটা বুঝতে পারি নি। একঘেয়ে,গুরুগম্ভীর জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম নিদারুণভাবে। এখন শেষ সময়ে এসে আফসোস হচ্ছে মনে মনে। জীবনে কোন না কোন সময় একজন হাসানোর মানুষ অবশ্যই দরকার,যে মনের সকল ধোঁয়াশা আলোর দ্যুতিতে ভরিয়ে দিবে। হোক সেটা সল্প সময়ের জন্য।
এরি মধ্যে একদিন মা ফোন দিয়েছিল আননোন নাম্বার থেকে। এর আগে অবশ্য মূল নাম্বার থেকে ফোন করেছিল, আমি তুলি নি। বদলে পুরো দুইদিন ফোন সুইচড অফ করে ফেলে রেখেছিলাম। সেদিন আননোন নাম্বার থেকে ফোন দিয়ে তিনি আকুলিবিকুলি করে নানান কথা বুঝাতে চাইলেন। কিন্তু আমি কোন কথা শুনতে নারাজ। সাফ সাফ জানিয়ে দিয়েছি যে, এতোবছর পর হঠাৎ উতলে উঠা আদর আমার চাইনা। এতোদিন বেশ ছিলাম, এখনো তাই আছি। ভবিষ্যতেও তাই থাকব। বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ফোন কেটে দিয়েছিলাম। জানিনা ছেলে হিসেবে আমার এটা করা উচিত হচ্ছে কি না! কারণ আমি জানিনা মা-বাবার সঙ্গে কেমন ব্যাবহার, কতটুকু রাগ, কতটুকু অভিমান করা সমীচীন,। সেই ধরাবাঁধা নিয়মের বাঁধ ভেঙে কখন সেটা বেয়াদবির পর্যায়ে চলে যায় সেটা আমার অজানা। কারণ,কখনো এ বিষয়ে জানি নি আমি। জানার চেষ্টা করিনি। গল্প,উপন্যাসে, মুভিতে, ফেসবুকের নিউজফিডে, জীবনের পরতে পরতে যখনই মা-বাবার কোন কথা, সিন আসতো তখনই আমি এড়িয়ে যেতাম। কেন জানি সহ্য হতোনা। নিরন্তর এই সম্পর্কটার প্রতি এতোটাই কদর্য জমে একটা পর্যায়ে সেটা বিশাল আকার ধারণ করেছে। কিন্তু সেসব অশোভনীয় কদর্যতার অথই দরিয়ার জল ছাপিয়ে সেদিন মায়ের সঙ্গে এমন ব্যবহারে মনটা কেমনতর খচখচ করছিল। নিরতিশয় অস্থিরতায় এফোঁড়ওফোঁড় দৌড়েও শান্তি মিলছিল না। নাড়ির টানটা বুঝি সেদিনই প্রথম আমার লেগেছিল। সে যে কি অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত টান। সে কি যে চিনচিনে ব্যথা! যার টান পড়ে শুধুমাত্র সে-ই বোঝে এই ব্যথা ঠিক কোথায় গিয়ে হাসিমুখে হুল ফোটায়। তবুও আবার ফোন দিয়ে দুঃখিত শব্দটি উচ্চারণ করারও সম্ভ্রম রাখি নি। এভাবেই সেই দিনটা কেটে গেল৷ হ্যা কেটেই গেল। সঙ্গে ভস্মস্তূপ সহ অনুশোচনাটাও উড়িয়ে নিয়ে গেল। মনের মধ্যে সেই ক্ষোভটা আবার জেঁকে বসল পূনরায়।
ধীরে ধীরে ট্রেনিংয়ের শেষ সময়ে চলে আসছিল। লক্ষ্যে রাখা সকল ট্রেনিংগুলোও প্রায় শেষের পথে। মাঠের বাইরেও ক্লাসরুমের মতো করে বারকয়েক যথোচিত কাজকর্ম বুঝিয়ে দেয়া হলো সবাইকে।
ক্যাম্প ছাড়ার ছ কি সাত দিন আগের কথা। অনিক গভীর রাতে ফিসফাস করে স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলছিল। প্রতিদিনই বলে। আমার এসবে খুব একটা আকর্ষণ নেই বললেই চলে। হঠাৎ সেদিনই ফিসফাস শুনে ঘুম ভেঙে গেল। ওপাশ থেকে কী বলছে সেটা অবশ্য শোনা যাচ্ছেনা। কিন্তু অনিকের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে দুজন দুজনকে বেজায় মিস করছে। যাকে শুদ্ধ বাংলায় বলা হয়, অদ্ভুত আপনজনহীনতায় ভোগা।
তখনই টাস্ করে একটা কুবুদ্ধি আসল মাথায়। অনেক সময় কুবুদ্ধির জন্য বেশি ভাবতে হয় না। খাট থেকে সন্তর্পণে নেমে ধীরে ধীরে গিয়ে ফোনটা ঝামটা মেরে কেড়ে নিলাম। অনিক ভয় পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। পরক্ষণেই অন্য ঘটনা দেখে আমার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নেবার জন্য হাতাহাতি করা শুরু করল। আমিও নাছোড়বান্দা, প্যাঁচ লাগিয়েই ছাড়ব এমন দৃঢ়সংকল্প নিয়েই মাঠে নেমেছি। দ্রুত ফোনটা কানে নিয়ে গলাটাকে যথাসম্ভব তীক্ষ্ণ, মেয়েদের মতো করে বললাম,” হ্যালো, কে আপনি? ওনার ফোনে কল করেছেন কেন?
ওমনি অনিক ফোনটা ঝাপটা মেরে কেড়ে নিতে সফল হলো। কিন্তু যা হবার তো হয়েই গেল৷ এবার বুঝুক! অনিক ফ্যালফ্যালিয়ে কিছুক্ষণ আমার দিকে চেয়ে থেকে ফোন কানে দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অনিরুদ্ধ হাসি চাপাতে মুখে কাঁথা গুঁজে দিলাম আমি। “সঙ্গ দোষে লোহা ভাসে” কথাটি আবারও জোরালভাবে প্রমাণিত হল। এসব অনিকের-ই আদর্শ। মজা করে অন্যের বারোটা বাজানো। না-হয় আমি কখনোই এমন আগুন লাগানো মানুষ ছিলাম না। যাইহোক, দিনগুলো ঠিকঠিক পার হয়ে গেল। একটা বছর নানান চড়াই-উতরাই করে অবশেষে ট্রেনিংয়ের অন্তিমকাল এসে দরজায় টোকা দিল। শেষ ক’টা দিন,বিশেষ, সেদিন রাতের পর থেকে অনিক বোধহয় খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যে ছিল না। তার গুণধর বউ মনে হয় তখনও প্যারা দিয়ে যাচ্ছিল সেই রাতের সামান্য ব্যপারটা নিয়ে। অবশ্য আমার কাছে যৎসামান্য মনে হলেও ফোনের অপরপ্রান্তের মানুষটি তো এইপ্রান্তের ঘটনা জানেনা। যার কারণেই অনিকের এতো অস্বস্তি বোধ করা।
ট্রেনিং শেষে ঢাকা ফেরত বাসে অনিক আমার পাশেই বসল। সব প্রস্তুতি শেষে গাড়ি ভোঁ দৌড়াল কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকা। আবার সেই গাছ-গাছালিতে ভরা মহাসড়কের পার্শ্ব দৃশ্যগুলোকে হারিয়ে যাওয়া শুরু করলাম আমি। শেষ আড়াইমাসে স্বর্ণার কোন যোগাযোগ নেই। নির্দিষ্ট দিন পার হয়ে আরেকটা দিন চলে আসে, কিন্তু সে একেবারেই গা ঢাকা দিল৷ আমার ঘোরতর সন্দেহ, হয়তো পুলিশ কিছু জানতে পেরেছে তাই সে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে গা ঢাকা দিয়েছে। তাছাড়া সেদিন রাতের পর থেকেই স্বর্ণা একটু গলেছে । আমার সঙ্গে সেই রূঢ় আচরণ ও করে খুব কম। উনুনের সংস্পর্শে মোম যেমন করে গলে গলে তরল হয় এবং আগুন নিভে গেলেই পূনরায় সেই তরল কঠিন হয়ে পূনরায় কড়া মোমে রূপান্তর হয়, ঠিক তেমন করে আমার সংস্পর্শে থাকা স্বর্ণা যদি দূরে সরে গিয়ে পূনরায় কঠিন হয়ে যায়? এখানেই যত ভয়! যত সংশয়! যাচিত,অযাচিত শত উচাটন।
একটু পর, সেদিনের ঘটানাটা খুলে বলার অভিপ্রায়ে অনিককে বললাম তার স্ত্রীকে ফোন দেয়ার জন্য। হয়তো সমস্যায় আছে বেচারা। মায়া লাগল। সে কোন প্রকার দ্বিরুক্তি না করে ফোন দিল এবং গাড়িতেই সেদিন কী হয়েছিল সমস্ত বুঝিয়ে দিলাম তার স্ত্রীকে। মহিলা তো কেঁদেকেটে শেষ! আহারে! এইতো ভালোবাসা!
গুনে গুনে চারটা ঘন্টা পর গাড়ি এসে ভিড়ল মূল কার্যালয়ের সামনে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়েছে। চারিদিকটা ব্যস্ত শহুরে কোলাহলে গমগম করছে তখন। অনেকের পরিবারের সদস্য এসেছে সাদরে গ্রহণ করার জন্য। আবার অনেকের আসে নি। অনিকের স্ত্রী এসে পড়েছে অনেক আগে। অনিককে গাড়ি থেকে নামতে দেখে দূর থেকে ঝরঝরে হেসে কাছে এগিয়ে আসলেন তিনি। এরপর আলতো করে জড়িয়ে ধরে উভয়ে হাসি দিয়ে ঠোঁট নেড়ে নানান কথা বলতে লাগল। কী কথা বলল দূর থেকে শোনা গেলনা। আমি তাদের অগোচরে ধীরে ধীরে সরে যেতে পা বাড়ালাম। ঠিক তখনি আমার নাম ধরে পরিচিত মেয়েলী কণ্ঠে কেউ একজন ডাকল। চকিতে শব্দোৎস লক্ষ্য করে ফিরে তাকালাম। লক্ষবস্তু অদূরে একজন মেয়েকে দেখে ঋজুর দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো আমার। একটু কাছে আসতেই মুখটা চেনা গেল। সেই যে ছ মাসের মায়া লাগানো মেয়েটা। জুহি! কিন্তু ও এখানে কী মনে করে, কিভাবে এলো সেটাই মাথায় ঢুকল না। কাছে এসেই শীতের শিশিরসিক্ত সকালের এক চিলতে রোদের মতোন ঝলমলে হেসে বলল,
— কি ভেবেছিলেন? আপনার জন্য কেউ আসবেনা? এইযে দেখুন, স্বশরীরে হাজির আমি। বলে নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো পাটি করে তার শরীরের দিকে ইঙ্গিত করল।
আমি সন্দিহান হলাম যে, জুহি মনে করেছে চিঠিটা আমি পড়িনি এখনো। হয়তো তার মনে হয়েছে আমি সেটাকে ফেলনা মনে করে ফেলে রাখব, আর নাটক মুভির মতো বৃদ্ধ বয়সে গিয়ে ফেলে আসা স্মৃতিগুলো রোমন্থন করব। সন্দেহটা বিশ্বাসে রূপ নিল তার অস্বাভাবিক সাবলীল কথাবার্তায়।
আমি প্রতুত্ত্যরে হাসিটা ফিরিয়ে দিয়ে বললাম বললাম,
— তুমি হয়তো নিজের কাজে এসেছ কার্যালয়ে। আমার জন্য কেউ আসবে সেটা ভাবা যায়না। যেই আমাকে দেখলে ওমনি বললে আমার জন্য এসেছ। ভালো বুদ্ধি তো!
জুহি প্রতিবাদ করল,
— মোটেই না। কাজ অবশ্যই ছিল। কিন্তু প্রথম উদ্দেশ্যটা আপনাকে রিসিভ করা, এবং আমার বাসায় নিয়ে যাওয়া।
— ঠিকাছে মানলাম আমার জন্যই এসেছ,কিন্তু তোমার বাসায় যাব কেন? আমার বাসা তো কাছেই।
বলে কাঁধের ব্যাগটা টেনেটুনে ঠিক করলাম।
— হোক কাছেই। আপনার কথা বলেছি আম্মুকে। আম্মু আপনাকে দেখতে চেয়েছে।
— কী বলেছ? – মনের মধ্যে রত্তিপরিমাণ ভয় নিয়ে ঝুঁকে বললাম আমি।
জুহি চোখ আড় করে মনে করার ঢং-এ বলল,
— কী বলব? বলেছি, আপনি খুব ভালো। সিনিয়র, ট্রেনিংয়ে অনেক হেল্প করেছেন,একা সময়ে সাহস দিয়েছেন। এই আরকি।
আমি ভ্রুকুটি করে রহস্য করে বললাম,
— এইটুকুই?
জুহি ডানে বায়ে তাকিয়ে ইতস্ততঃ করল।
— হ্যাঁ এটুকুই, আর কী?
আমি চাপা হাসিটা ফিক করে ছেড়ে দিলাম।বললাম,
— আচ্ছা, অন্যদিন আসব আমি। আজ টায়ার্ড আছি।
— অন্যদিনেরটা পরে দেখা যাবে। আজ আপনাকে যেতেই হবে। – ছেলেমানুষী বেশ ধরে বায়না ধরল জুহি।
আমি মুখে বিরক্তি নিয়ে শক্তকণ্ঠে বললাম,
— সেটা নাহয় দেখা যাবে। এখন তো চলো কিছু খাই৷ খিদায় তো পেট জ্বলে গেল।
জুহি আমার চোখের দিক থেকে নজর ফিরিয়ে নিয়ে অলক্ষ্যে একবার তর্জনী দেখিয়ে দিয়ে বলল,
— নাহ,এখন না। বাসায় গিয়ে খাবেন। এখন খেলে খিদে চলে যাবে।
আমি একটা নিশ্বাস ফেললাম। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে কয়েক নেনো সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে ছোট করে বললাম,
— তোমার বাসায় পৌঁছুতে কত সময় লাগবে?
— এক ঘন্টা। অন্যদিকে তাকিয়ে বললো সে। তার গলা থমথমে, মুখের ভাবভঙ্গি নির্ভার,চোখের দৃষ্টি ডগমগে। বিমনা হয়ে হাতদুটো এদিকওদিক নাচাচ্ছ বারবার। ভেবে পেলাম না প্রস্তাব প্রত্যাখানে রাগ করলো,নাকি এই সন্ধ্যাকালে আচমকা ভূতে আছর করল। বললাম,
— একঘন্টা নিশ্চয় না খেয়ে থাকবনা। কিছু অন্তত খেয়ে নিই চলো। তারপর…তারপর যাব!
আচমকা যেমন ভূত ভর করেছিল, আবার আচমকাই ছেড়ে দিল। পলকে সে প্রফুল্ল হয়ে বলল,
— যাবেন?
মেরে কেটে ভাসিয়ে দিলেও জুহির সঙ্গে যাবার ইচ্ছে আমার ছিলনা ৷ কিন্তু হঠাৎ মনে পড়লো খালা বলেছিল,বাসায় এখনো বাবা-মা অবস্থান করছেন। কবে যাবেন তারও ঠিকঠিকানা নেই। অন্তত আজকে ফিরেই সেই দুটি প্রাণীর সম্মুখে পড়ার ইচ্ছে আমার নেই। তাই একপ্রকার দ্বিধাদ্বন্দে পড়ে রাজী হতে হলো। বললাম,
— হুমমম যাব।
………………………………
রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসতেই আচমকা অনিক হুড়হুড়িয়ে আমাদের টেবিলের সামনে এসে গড়গড় করে বলল,
— কী বস? আমি তোমাকে চারিদিকে খুঁজি, আর তুমি এখানে? আর জুহি…কথাটা শেষ করতে দিলাম না তাকে। তড়িৎ উঠে গিয়ে তার মুখ চেপে ধরে সেখান থেকে সরিয়ে আনলাম। আরেকটু হলে নির্ঘাত সব ফাঁস করে দিতো জুহির সামনে। অনিক মুখ থেকে আমার হাতটা ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করতে করতে বলল,”আরে কী হয়েছে বলো”
একটু দূরে এনে ছেড়ে দিয়ে বললাম,
–চিঠির সম্মন্ধীয় কোন কথা বলোনা৷ দেখি জল কতদূর গড়ায়৷ আর যদি বলেছ না! তাহলে তোমারো সব ফাঁস করে দিবো তোমার বউয়ের সামনে।
“কী ফাঁস করবে? কপাল কুঁচকাল অনিক।
আমি বললাম,
— ভেবে দেখো সেটা।
অনিক একটু ভেবে বললো,
— ঠিকাছে ঠিকাছে বলবোনা কিছু।
আমি হেসে বললাম,
— চলো। নাশতা করে নিই।
অনিক এবং তার স্ত্রী রেস্টুরেন্টের একটি টেবিলে বসে গল্পগুজব মগ্ন ছিল। হয়তো খাবার দাবার খাবার কোন পরিকল্পনা ছিল। আমাদের দেখেই অনিক ধড়ফড়িয় উঠে এসেছে। এখন আবার আমার অনুরোধেই সবাই একসঙ্গে বসে নাশতা করতে হলো। চেনাপরিচিত মানুষ! একই রেস্টুরেন্টে ভিন্ন ভিন্নভাবে খেলে কেমন দেখায়? অবশ্য শুরুতে পরিচয় পর্বটা সেরে নিয়েছে সবাই৷ খেতে খেতে সবার মধ্যে পরিচয়টা আরো ভালোভাবেই হয়ে গেল। কথায় কথায় অনিকের স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বললাম,
— আপনি একদিন বেড়াতে আসবেন, অনিকের কিছু আকাম কুকামের লিস্ট দিবো আপনাকে।
সঙ্গে সঙ্গে অনিক বিষম খেয়ে গেল। কাশতে কাশতে বললো,
— আমি আবার কী করলাম হ্যাঁ?
— সেটা পরে বলবো। আগে দাওয়াতটা কবুল করো৷
— ঠিকাছে করলাম। দেখবো কী বলো তুমি। আমি জানি আমি কিছু করিনি৷ নো টেনশন। – বলে জোর করে হাসলো অয়ন।
অনিকের স্ত্রী তাল দিয়ে বলল,
— হ্যাঁ ঠিকি। আমার স্বামী সহজসরল মানুষ। ওনি কিছু করতেই পারেনা। আর করলেও বিশ্বাস করব কেন?
কথাটাতে শ্লেষ কিংবা খোঁটার উপস্থিতি টের পেলাম না। বুঝতে পারলাম না তালটা কি আমাকে দিল৷ নাকি স্বামীকে। না বুঝে দশটা কথার চেয়ে বুঝে একটা কথাই শ্রেয়। তাই তৎক্ষনাৎ চুপ করে রইলাম। খাবার শেষে রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে অনিকরা বিদায় নিল।
অনেক্ক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর একটা অটো পাওয়া গেল৷ এসময় এই জায়গাটাতে অটো পাওয়া ভারি শক্ত। দু’একটা পাওয়া গেলেও তিনগুণ টাকা চেয়ে বসে। জুহি অটোটা চড়া দামেই ভাড়া করে তাতে চেপে বসল। আমার সুবিশাল ব্যাগটা সব জায়গা অতিক্রম করে ঠাঁই পেল তার কোলে। গাড়ি চলছে ঢিমেতেতালে হেলেদুলে। শহরের কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে চলে এসেছি তখন। জুহি আনমনা হয়ে আকাশের পানে একদৃষ্টিতে চেয়ে কি যেন ভাবছে। দেখাদেখি আমিও তাকালাম আকাশের দিকে। নির্মেঘ আকাশে একঝাঁক তারার মেলায় পরিবেশটা ক্ষাণিক মোহময় লাগছে। তবে আমার মনের অনুকরণেই বোধহয় অম্বরের ঠিক পশ্চিম কোণে সফেদ মেঘ জমেছে থরে থরে। জানিনা জুহি কার কথা ভাবছে,কিন্তু আমি ভাবছি স্বর্ণার কথা। এতোদিন ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে কোথায়, কোন কাননে লুকিয়ে আছে সেটা জানার জন্য মনটা ভীষণ আঁকুপাঁকু করছে। এই সুবিশাল দিগন্তলুপ্ত আকাশটাই যেন যত মন খারাপের ডালি। মন খুলে তাকালেই মন ভরে হাহাকার দিতে সে ভুল করেনা। এটাও বুঝি তার অন্যতম বৈশিষ্ট্য! বড় একটা নিশ্বাস মাটিতে পড়তে না পড়তেই জুহি বলল,
— এতোবড় দীর্ঘশ্বাসের জন্য দায়ী মানুষটা কে শুনি?
— স্বর্ণা!
একটু থেমে আবার বললাম,
— আড়াই মাস হলো তার সঙ্গে কোনপ্রকার যোগাযোগ হয় না। কে জানে কোথায় আছে। আগে তো সপ্তাহ-পনের পরেই ফোন করত। হঠাৎ হাওয়া হয়ে গেল।
— ঢাকা তো এসেছেন,ভালো করে খোঁজ নিলেই পাবেন।
— তা পাব… আচ্ছা একটা দারুণ ঘটনা তো বলা হয়নি তোমাকে।
— কী? ভ্রু কুঁচকে বলল জুহি।
— কয়েকমাস আগে সে কুমিল্লা এসেছিল একটা কাজে৷ কিন্তু আমায় বলেনি। একপর্যায়ে তার আচার-আচরণে ধরে ফেলি যে সে কুমিল্লা এসেছে।
— তারপর? – ব্যগ্রকণ্ঠে বলল জুহি।
আমি দায়সারা গলায় বললাম,
— তারপর আরকি। অনেক রাজি করার পর দেয়াল টপকে গেলাম তার সঙ্গে দেখা করতে। তারপর… তারপর হঠাৎ কথা বলার একসময় কারেন্ট চলে গেল। মোমবাতি এনেই ও আমার পাশে এসে বসল এবং হুট করেই আমাকে কিস করে বসল। যেন তেন কিস না। একেবারেই…
শুনে জুহি চমকিত হয়ে উঠল একটু। যা আমার সুক্ষ্ণ নজর এড়াল না। আকাশপানে তাকিয়ে থাকা মোহাচ্ছন্ন ডৌল কেমন মলিন হয়ে ধীরে ধীরে আমার দিকে তাকাল। পরক্ষণেই জোর করে ঠোঁটদুটো টেনে কৃত্রিম হেসে বলল,
— ভালোই তো। আপনি একটু চাইলেই তাকে সৎপথে ফিরিয়ে আনতে পারেন। আজ একটু গলেছে কাল নাহয় পুরোপুরি ঠিক হবে। চালিয়ে যান।
— চালিয়ে গেলেই তো চলছে না। সে হয়তো পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে অন্যকোথাও চলে গেছে। তার খোঁজই নেই।
জুহি মুচকি হেসে বলল,
— অপেক্ষা করুন। অপেক্ষার ফল সুমিষ্ট হয়।
আমি “হুমম” বলে চুপ করে রইলাম। এরপর কথার অভাবেই সারাপথ দুজনে চুপ করে রইলাম। গাড়ি এসে ভিড়ল একটা বড় গলির মাথায়। কোন কারণে এই রাস্তা দিয়ে বড় গাড়ি চলা নিষেধ। ভাড়াটা আমি দিতে চাইলাম,কিন্তু জুহির জেদের কাছে শেষ পর্যন্ত হারতেই হলো। জুহি বলল পাঁচ মিনিটের মধ্যেই বাসায় পৌঁছা যাবে। কিন্তু এই পাঁচ মিনিট আমার কাছে পঞ্চাশ মিনিটের মতো লাগছে। ক্লান্ত শরীরটা আর এগুতেই চাইছে না। তবুও আমার মস্তিষ্ক বিকল নেই। বারংবার সংকেত দিচ্ছে সেই চিঠির ব্যাপারে জুহিকে জিজ্ঞেস করার জন্য। কিন্তু স্বেচ্ছাচারী মন আমার মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ বিরোধী। দু’জনের মধ্যে তুমুল হট্টগোল বাঁধার আগেই আমি জুহিকে ডাক দিলাম,
— জুহি!
— হ্যাঁ বলুন। হাত বদলে ব্যাগটা ডান হাতে নিয়ে বলল জুহি।
আমি একটু সময় নিয়ে বললাম,
— সেই চিঠিটা দেয়ার অর্থ কী?
জুহির মুখ থেকে সমস্ত রক্ত নিমিষেই ছুটে গিয়ে আকর্ণ রক্তিম হয়ে গেল এবং মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল। আমি নিশ্চল চেয়ে রইলাম তার রক্তশূন্য মুখের দিকে। জুহি বার-কয়েক ইতস্ততঃ করে রিনরিনে গলায় বললো,
— তেমন কিছু না। পড়লেই বুঝতে পারবেন।
— তাহলে তোমার সামনেই পড়ি? কী বলো?
আমার কৃত্রিম শঠতা বুঝতে পারলনা সে। সাদা কাগজে মিশকালো অক্ষরের লেখাগুলো মনে গাঁথিয়ে চিঠিতো কবেই পুকুরের জলে ভেসে গেছে। তবুও যাচাই করাটা প্রয়োজন যে,সে আসলে কী চায়। জুহি তড়িঘড়ি করে বাঁধা দিয়ে বলল,
— না না এখন দরকার নেই। অন্যসময়। যখন সেই দিনগুলো খুব মনে হবে তখন।
— কেন? প্রশ্ন করলাম আমি।
— এই কেন এর উত্তর আমার কাছে নেই আপাতত।
এখন চলুন তো বাসায়। ঐতো সামনের বাড়িটা।
চলবে…
#শেষ_সূচনা
পর্বঃ ১৩
লেখকঃ আরিফুর রহমান মিনহাজ
আরো কয়েক পা এগিয়ে গেলাম। রাস্তার পাড় ধরেই গড়ে উঠেছে চিত্তাকর্ষক তেতলা বাড়ি। রংটা পুরোনো হলেও বাড়ির আকার এবং নকশা যথেষ্ট স্বতন্ত্র। প্রথমত মনে করলাম কোন ভাড়া বাড়ি হবে হয়তো। কারণ, জুহির ভাষ্যমতে তাদের আর্থিক অবস্থা অতোটা স্বচ্ছল না। জুহি আমার ভেতরের কথা বুঝতে পেরে বলল,
— জানি কী ভাবছেন, আসলে আমার বাবা ব্যবসা করতেন বেঁচেথাকাকালীন। এই বাড়ীটা ওনারই করা। তখন আমাদের পরিবারে কোন অভাব ছিলনা। কিন্তু বাবা হঠাৎই হার্ট অ্যাটাকে মারা গেলেন। তখন আমি সবে ক্লাস টেনে। জমানো টাকা দিয়ে আর ক’দিন চলে?
আমি ছোট একটা নিশ্বাস ফেলে বললাম,
— হুমমম বুঝতে পারলাম।
— হুমম, চলুন ভেতরে যাওয়া যাক। মায়ের ঔষধের সময়টা পার হয়ে যাচ্ছে।
মূল ফটক পেরোতেই পূবে একটা বাগান দৃষ্টি গোচর হলো। পর্যাপ্ত আলো না থাকায় আপাতত বাগানের সৌন্দর্যটা মনে ধারণ করার উপায় নেই।
সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে জুহি বলল,
— আমরা থাকি দোতলায়। উপরে আর নিচে ভাড়াটিয়া থাকে। এ দিয়েই সংসার চলত। এবার বুঝুন অবস্থা!
আমি কিছু না বলে উপরে নিচে মৃদু মাথা দোলালাম।
দরজায় টোকা পড়তেই ষোল সতের বছরের টিনটিনে একজন বালক এসে দরজা খুলে দিল। আমাকে দেখে একগাল হেসে সালাম দিয়ে বলল,
— আপনিই মিনহাজ ভাইয়া তাইনা?
প্রতিত্তোরে আমি সালামের জবাব দিয়ে কৃত্রিম বিস্ময়ের ভড়ং করে বললাম,
— হ্যাঁ, তুমি চিনলে কিভাবে?
ছেলেটি ঝুলানো হাসিটা মুহূর্তের জন্য নামিয়ে রেখে দৃঢ়ভাবে বলল,
— চিনবনা? বুবুর মুখে কত্ত শুনেছি আপনার কথা!
— ওও.. তাই নাকি?- জুহির দিকে তাকিয়ে টেনে টেনে বললাম আমি।
জুহি ভাইকে কড়কে বলল,
— হয়েছে চুপ থাক। মেহমান আসছে ঘরে ঢুকতে দিবি না? সর সামনে থেকে।
বালক একলাফে দূরে সরে গিয়ে রাজকীয় ঢংয়ে বলল, আসুন আসুন।
ঘরে ঢুকেই প্রথমে গেলাম জুহির অসুস্থ মায়ের ঘরে। মহিলা আধশোয়া অবস্থায়। আমাকে দেখেই মুচকি হেসে পরক্ষণেই জুহির দিকে তাকালেন। জুহিও মুচকি হেসে মাথা নাড়লো। ভদ্রমহিলা লিকলিকে হাতের ইশারায় ডাকলেন আমাকে। আমি একটু সংকোচ নিয়ে আরেকটু কাছে গিয়ে মাথা নোয়ালাম। কেমন একটা চাপা অস্বস্তিকর দম বন্ধকরা অবস্থা। তিনি তার রক্তশূন্যপ্রায় কুঁচকে যাওয়া হাতে আমার মুখে একবার হাত বুলিয়ে থুতনিটা ধরে নাড়া দিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই আমার শিরশির করে শিহরণ জাগিয়ে তড়িদ্দাম বয়ে গেল। চোখের কোণে কয়েকফোঁটা লোনা জ্বল চিকচিক করে উঠলো। মনে হলো, আজ বহুবছর পর জান্নাত হতে আমার দাদীর তুলতুলে নরম হাতের পেলব স্পর্শ এই মহিলার মাধ্যমে দিয়ে গেল। সঙ্গে জানাতে চাইল বেঁচে থাকাকালীন না বলা কথাগুলো। আশ্চর্য! কেন এমন মনে হলো? দাদী কি আমাকে কিছু বলে যায় নি? বরাত-বিড়ম্বনা কিংবা কষ্ট পাব বলে? জুহির ডাকে চমক ভাঙল আমার।
— খেতে চলুন। আপনি টায়ার্ড।… আম্মু, তোমার ঔষধ দিয়েছে রাফি? (রাফি জুহির ভাইয়ের নাম)
মহিলা ধীরে ধীরে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লেন। আমরা খেতে চলে এলাম। রাফি হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে। খাবার টেবিলে একা একা বসে আছি আর ফেসবুকের নিউজফিড স্ক্রল করে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ স্বর্ণার এ পর্যন্ত করা একটা নাম্বার থেকে মিসড্ কল এলো। কয়েকদিন আগেও এসেছিল। রিসিভ করার আগেই কেটে গেছে। জানিনা এই মেয়েটা আসলে কি চায়! না জীবন থেকে একেবারে চলে যাচ্ছে, আর না একেবারে কাছে এসে নিজেকে পরিবর্তন করছে৷ সে স্বেচ্ছাচারী। চড়ুই পাখির মতো মনের ঘুলঘুলিতে নানান স্মৃতির খড়খুটো দিয়ে বাসা বেঁধেছে সে। সেখানে তার অবাধ অনুপ্রবেশ ঠেকাবার সাহস কার? এতো তার নিজেরই বাসা। যখন ইচ্ছে আসবে,আর যখন ইচ্ছে নিরুদ্দেশ হয়ে আপন মানুষগুলোকে পীড়া দেবে। আবার কখনো কখনো ক্ষণকালের জন্য দেখা দিয়ে হৃদয়ের গভীরতম জায়গায় গাঢ় রেখাপাত করে যাবে। সেই বিষাক্ত রেখা যখন ধীরে ধীরে অল্প-বিস্তর মুছতে বসবে ঠিক তখনি আরেকটা রেখা এসে আঘাত হানবে আজকের আচমকা মিসডকলের মতোন।
জুহি একে একে সকল খাবার এনে টেবিলের উপর থরে থরে সাজাল। এরপর একে একে বিভিন্ন পদের খাবার পাতে তুলে দিল এবং নিজেও নিল। শুরুতে আমিই বললাম,
—- তারপর… কোন থানায় আছো?
—- সিলেটে, এখন ছুটিতে আছি আপাতত। এক সপ্তাহের।
সিলেট বলতেই একটু চমকালাম আমি। স্বর্ণার গ্যাঙ এর মূল আস্তানা তো সিলেটেই! বললাম,
— ও আচ্ছা… Dont গ্যাং সম্পর্কে জানো কিছু? যাদের Dont এর O’র জায়গায় একটা এ্যাঙ্গরি ইমুজি থাকে!
জুহি খাবার থামাল। সন্দিগ্ধ গলায় বলল,
— হ্যাঁ কিন্তু আপনি জানেন কী করে?
আমি একটা শ্লেষাত্মক হাসি দিয়ে বললাম,
— ইঁদুরের বুদ্ধি নিয়ে পুলিশ হলে কেন? গোটা বাংলাদেশ জানে এই কথা। মিডিয়াগুলো সরব। আর তুমি বলছো আমি কিভাবে জানি? কোন কারণে কি আমাকে তোমার মঙ্গল গ্রহের প্রাণী মনে হয়?
আমার শ্লেষামিশ্রিত কথা শুনেও জুহি হিশহিশ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে টেবিলের উপর নুইয়ে পড়ায় লক্ষ্য করলাম, এই ছ’মাসে সামনের ছোট কয়েকগাছি চুল এখন বড় হয়ে এলোমেলোভাবে কপালে ঝুলে পড়ায় চেহারার মায়াটা দ্বিগুণ বেড়েছে। এতোক্ষণে সেটা খেয়াল করলাম। জুহি হাসি থামিয়ে বলল,
— হুমম। তা মনে হয় না অবশ্য। কিন্তু ঐ গ্যাংটা অনেক ডেঞ্জারাস। তল্লাশি চলছেই। কিন্তু কোন ফল পাওয়া যাচ্ছেনা। আমাদের ওসি সাহেবকে তো রীতিমতো জবাবদিহি করতে হচ্ছে উপরমহলের কাছে।
— হুমমম বুঝলাম ব্যাপারটা।
— আপনাকে কোন থানায় দিয়েছে? জয়েনিং কখন? মুখে একটা লোকমা পুরে দিয়ে অস্পষ্ট গলায় বলল জুহি।
— আমাকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানায়। নীচ লেভেল থেকেই শুরু করছে। রাউজান থানায় দিতে চেয়েছে অবশ্য। পরে অনেক দোয়া-দরখাস্ত করে হাটহাজারীতে এনেছি। আমিতো খুশিতে আটখানা। ভাবছি অনেকবছর পর নিজের বাসায় গিয়ে থাকব।ফিলিংটাই অন্যরকম। চার দিন পরেই জয়েনিং।
একসঙ্গে অনেকগুলো কথা বলে আরেকটা লোকমা মুখে দিলাম।
জুহি হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলল,
— আরে খাবার কেমন হয়েছে বললেন না তো!
আমি বাঁ হাত উঁচিয়ে বৃদ্ধ আর তর্জনী এক করে বললাম,
— খুব ভালো। চমৎকার। কতদিন পর এতো খাবার খাচ্ছি। বলে একটু সময় নিয়ে চিবুতে চিবুতে বললাম,
—- তুমি রেঁধেছ নাকি?
জুহি বোধহয় এই প্রশ্নটারই অপেক্ষা করছিল। সঙ্গে সঙ্গে সলজ্জ হেসে বলল, হ্যাঁ। আর কে রাঁধবে? আমি এখানে না থাকলে একজন বিধবা ফুফু থাকে। ওনিই সব করে। এখন ওনি বেড়াতে গেছে।
জগতশুদ্ধ লোকে জানে,মেয়ে মানুষ প্রসংশা শুনতে ভালোবাসে। একবার প্রশংসা শুনলে তারা আরো শুনতে চায় এবং খুশিতে চটক খেলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত। সেটা মাথায় রেখেই আবার বললাম,
— ভালোই তো রান্না করো। পুলিশ না হয়ে বাবুর্চি হলে তো পারতে।
জুহি হেসে বলল,
— অতো হওয়ার ইচ্ছে নেই।
খাওয়া শেষে জুহি নিজের রুমটা দেখিয়ে দিল রাতটা কাটানোর জন্য। আমি বললাম,
— তুমি কোথায় থাকবে?
— আমি মায়ের পাশে থাকব। তাছাড়া অন্য রুমগুলো একটু অপরিচ্ছন্ন তাই আমার রুমেই থাকুন।
আমি নীরবে সায় দিলাম। জুহি বিছানার চাদর টানটান করে বিছিয়ে দিয়ে বালিশদুটো ঠিক করে দিল৷ এরপর মুচকি হেসে “শুভ রাত্রী” বলে বিদায় নিল। জুহি চলে গেলে আমি ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দিলাম। সারাদিনের ভোগান্তিতে অবসন্ন,অবসাদগ্রস্থ শরীরটাকে ঘুমের রাজ্যে মুহূর্তেই রাজ্যের ঘুম পরীরা বরণ করে নিল বুকভরা আকিঞ্চনসহ হরেকরকমের ফুলহার নিয়ে।
সকালে ঘুম ভাঙল জানালার দ্বারে কলকণ্ঠী কোন অতিথি পাখির চেঁচামেচিতে৷ সাতসকালে মেয়েলী পাখিটা কি সঙ্গীর সাথে কুরুক্ষেত্র বাঁধিয়ে দিয়েছিল? হতে পারে অসম্ভব কিছু নাহ্। মেয়েরা কুঁজড়ামি স্বভাবেরই হয়। ঘুম ভাঙতেই নিজের অবস্থান বুঝতে একটু সময় লাগল। দেয়াল ঘড়িতে তখন ন’টা। পরক্ষণে আড়মোড়া ভেঙে বিছানা ছেড়ে ওঠে জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিলাম। ঝপাৎ করে একগুচ্ছ আলোকরশ্মি হুড়মুড়িয়ে মেঝেতে আছাড় খেল। সঙ্গে সঙ্গে ঘরময় অকৃত্রিম আলোর ফিনিক খানাখন্দে পর্যন্ত আলো পৌঁছে গেল। সুন্দর, ফুরফুরে নির্মল একটা পরিবেশ চোখে পড়ল বাইরে। এখান থেকে বাগানের যে একাংশ দেখা যাচ্ছে সেখানে সূর্যমুখী আর গোলাপ ফুটেছে। দেখেই যেকারো মনের সমস্ত অবসাদ কিছুক্ষণের জন্য হলেও মুছে যাবে। অতিথি পাখির চিৎকার থেমেছে। বোধহয় মান ভেঙেছে।
দরজার কাছে এসে হাসিমুখে দাঁড়াল জুহি। হাতে ট্রে। স্বচ্ছ প্রসাধনহীন নিটোল চোখ,মুখ,ঠোঁট। কপালে স্থানচ্যুত একটি কালো টিপ। পরনে সাদা সবুজ রং-এর মিশেলে হাটু অবধি থ্রি-পিচ। ভেজা আলুথালু চুল পিঠময় ছড়ানো। ট্রে হাতে এগিয়ে এসে বিছানার পাশে টেবিলের উপর যত্ন করে রাখল সেটা। ট্রে থেকে চায়ের সরঞ্জামগুলো নামাতে নামাতে জাঁদরেল ভঙ্গিতে বলল,
— ঘুম ভাঙল?
আমি অবাক হলাম তার বচনভঙ্গি শুনে। যেন আমি দীর্ঘদিন ধরে এখানে পড়ে আছি। আর এই অনভিপ্রেত “ঘুম ভাঙল” কথাটা নতুন কোন উক্তি নয়।
অবাক হলেও প্রকাশ করলাম না। গলায় যথোপযুক্ত ঋঝুত্ব বজায় রেখে বললাম,
— হ্যাঁ ভাঙল,… শুন,আমার যেতে হবে। বাসায় কাজ আছে কিছু।
মিথ্যা বললাম। আদতে বসে থাকা ছাড়া কোন কাজ আমার ছিলনা। আরেকটা কাজ অবশ্যই আছে, স্বর্ণার খোঁজ করা। জয়েনিং এর আগে তিনটা দিন কাটানোর জন্য এটাই যথেষ্ট। জুহি উল্টোস্বর টেনে আর্তনাদ করে বলল,
— না না, এতো সহজে ছাড়ছি না আপনাকে। দুপুরে খেয়ে দেয়ে তবেই যাবেন।
— তুমি বুঝতে পারছোনা…
কথাটা শেষ করতে দিলনা জুহি। ক্যাটক্যাট করে বলে উঠল,
— আমি এতো বুঝতে চাইনা। আপনি দুপুরে খেয়ে যাবেন ব্যস।
মুখের উপর কথা বলাটা আমার বরাবরই অপছন্দের। চাপা একটা ক্রোধের বহ্নি খেলে গেল আমার সর্বাঙ্গে। সেটাকে প্রাণপণে চাপিয়ে অন্যদিকে মুখ করে থমথমে গলায় বললাম,
— যেতে না দিলে জোর করে যাব। তবুও যেতেই হবে।
—- ঠিকাছে যান। বাঁধা দেবনা। জুহির কণ্ঠে বর্ষার ঘোরকালো মেঘের মতো বুকভরা অভিমান আর একটুখানি রাগের স্ফুরণ ।
আমি একটু দম নিলাম। চুপটি করে বসে থাকা রাগটালে ধমকালাম। বললাম,
— দেখো। আমার সময় খুব কম। এরমধ্যেই অনেককিছু ম্যানেজ করতে হবে। আর… আর স্বর্ণার খোঁজও পাচ্ছিনা। বুঝতেই পারছ।
জুহি ম্লান হেসে বললো,
— ঠিকাছে সমস্যা নেই। অন্যদিন আসবেন আবার।
কাজ তো কাজই।
তুষ্টের হাসি দিয়ে নাশতা করতে বসলাম আমি।
বাসায় যখন ফিরলাম তখন বেলা এগারোটা। আমার কাছে থাকা চাবি কাজে লাগাতে হলনা। বাড়ির মূল গেইট থেকে শুরু করে ভেতরের দরজা আগাগোড়া খোলা ছিল এবং স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। গুটি পায়ে অন্দরমহলে ঢুকতেই চোখে পড়ল বাবা সোফার উপর বসে নিমগ্ন হয়ে একটা ম্যাগাজিনের পাতায় উল্টাচ্ছেন। চশমা নাকের ডগায়। পরনে সাদা পাঞ্জাবি। এ দৃশ্য যেমন অভূতপূর্ব তেমনি অভাবনীয়। বাবা তাঁর দামি স্যুট,বুট ছেলে এই বেশ-ভূষায় কেন অভ্যস্ত হতে সেই বিষয়টাতেই চমক। বুঝতেই পারলাম না বরাতের কোন বিড়ম্বনায় পড়ে তারা এই বাড়িতে বাস শুরু করেছে। আমি আমার কর্তব্যনুযায়ী একটা লম্বা সালাম ছুঁড়ে দিয়ে নিজের ঘরে এসে বসলাম। বাবা উত্তর দিলেন কি না বোঝা গেলনা। তবে নিশ্চিত হলাম যে, তিনি বিস্ময় -বিহ্বলিত হয়ে স্কুল মাস্টারের মতোন চশমার ফাঁকে চেয়ে আছেন। অকস্মাৎ আমার উপস্থিতিতে তাঁর চোখ হতে বিস্ময় যে ঝুরঝুরে অম্রমুকুলের মতো ঝরে পড়ছে।
ফেরার সময় মোড়ের দোকান থেকে এক প্যাকেট সিগারেট কিনেছিলাম। বিছানায় বসে সে সিগারেটই আগুন ধরালাম। শেষ সিগারেট খেয়েছি অন্তত মাস পাঁচেক আগে। স্বর্নার আদখাওয়া সিগারেট। এখনো তার স্পষ্ট প্রতিবিম্ব চোখের পর্দায় ভাসে,আর মানস তটে তার অস্পষ্ট অনুভূতি দোলদোল শিহরণ জাগায়। কটাস করে পাল্লা খুলে গেল। আমি তখনো নির্বিঘ্নে সিগারেট ফুঁকছি। কয়েক মুহূর্ত পর মা পাশে এসে দাঁড়ালেন। আমি হন্তদন্ত হয়ে আশেপাশে এ্যাশট্রে খুঁজলাম। না পেয়ে কিছুটা রাগ নিয়ে সিগারেট টা হাতের মুঠোয় গলে জানালার দিকে ফিকে মারলাম। হাতে ছেঁকা লাগল। ঠোঁট কামড়ে সহ্য করলাম। আধখাওয়া সিগারেটটা শূন্যে ভেসে জানালার সঙ্গে আটকে ভেতরে পড়ে জ্বলতে লাগল। মা নামের মানুষটি আমার পাশে এসে বসল সন্তর্পণে। আমার জানামতে এই প্রথম৷ আগে কখনো বসেছে বলে মনে পড়ে না। আমি কাঠকাঠ গলায় বিরক্তি নিয়ে বললাম,
— কেন এসেছেন?
— আমার কথা শুন মিনহাজ। হাজার হোক, আমি তোমার জন্মদাত্রী মা। তোমাকে কিছু বলার অধিকার আমার অবশ্যই আছে। মা’য়ের কণ্ঠে শান্ত অথচ দৃঢ়।
আমিতো ততোধিক কঠিন কণ্ঠে বললাম,
— না নেই। সেই অধিকার আপনি খুইয়েছেন অনেক আগেই।
— তুমি যা জান সব ভুল জানো। শুনলেই বুঝতে পারবে।
আমি নিভলাম একটু। ভাবলাম কি এমন অজানা আছে আমার? শুনেই দেখিনা। এমন তো না যে, ওনার কথায় আমার কান জ্বলে যাবে। বললাম,
— ঠিকাছে বলুন,শুনছি।
তিনি বলতে শুরু করলেন,
— তোমার বয়স যখন চার। তখন তোমার বাবা ব্যাবসায়ী কাজে বাইরে যায় এক মাসের জন্য। আমি জানিনা তোমাকে আজ কথাগুলো কি হিসেবে বলবো।কিভাবে বলবো। কিন্তু আমাকে বলতেই হবে। জীবনের একটা বড় অংশ পার করার পর আমি আর ছেলে থেকে দূরে থাকতে চাইনা। তোমার বাবা ফেরার কথা ছিল একমাস পরে। কিন্তু সতের দিনের মাথায় সে ফিরে আসে। সেদিন বাসায় আসে আমার খালাতো ভাই। যে আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল কিন্তু কোন কামাই না থাকার কারণে সম্ভব হয় নি। তোমার বাবা সব জেনেও বিয়ে করেছিল আমাকে। সেদিন ও আসার পর আমি তাকে সরাসরি পাঠিয়ে দিতে পারিনি। তুমি তখন ঘুমুচ্ছিলে। রান্নাঘরে গিয়েছিলাম শরবত বানাব বলে। তারপর বলেকয়ে বিদেয় করব এই ছিল মনে। তখনি তোমার বাবা এসে কলিং বেল বাজাল। এরপর বুঝতেই পারছো… বাইরে থেকে এসে তোমার বাবার মাথা ঠিক ছিলনা,তার উপর খালিঘরে একসাথে আমাদের দেখে সঙ্গে সঙ্গে তালাক দিয়ে দেয়। খালাতো ভাই হয়তো আমাকে কিছু বলতে এসেছিল। কিন্তু সে ঘটনার পর সে অভিমানে আত্মহত্যা করে বসে, একটা চিঠি দিয়ে যায় সে। সেখানে লেখা ছিল, সমস্ত কথা। তোমার বাবা পরে ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু কিছুই করার নেই। বাড়ি থেকে চলে যাওয়ার সময় আমি তোমাকে নিয়ে যেতে চাইলে তোমার ফুফুরা সবাই মিলে আমাকে কুলটা বলে অপমান করে। তোমাকে নিয়ে আসতে পারিনি আমি। অথচ আজ দেখো সেই ফুফুরাই তোমার খোঁজ নেয় না। তোমার দাদীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল। তোমার খোঁজখবর নিতাম প্রতিদিন। কিন্তু ওনাকে বলতে নিষেধ করেছিলাম তোমার বাবা-মা’র সত্যিকারের ঘটনাটা। নিষেধ করার যথেষ্ট কারণ অবশ্য ছিল। মাঝে মধ্যে তোমার বাবা আর আমি একসঙ্গে গিয়ে তোমাকে দেখা দিয়ে আসতাম। তোমার বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটাও কমিয়ে দিলাম। কারণ তুমি তখন সবকিছু বুঝতে শিখছ।
মায়ের কণ্ঠটা জড়িয়ে এলো। আর কিছু বললেন না। এরপর বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠে দরজার কাছে গেল। আমি প্রস্তরীভূত হয়ে রইলাম। মুখে রা নেই। যেন আমার বাকশক্তি কোন অশুভশক্তি দ্বারা রহিত করা হয়েছে। অনুভব করলাম ঠোঁট দুটো বারকয়েক নড়ল আমার। কিন্তু ঐন্দ্রজালিক মায়ায় কোন কথা বেরোল না। অনেক কষ্টে একটা অক্ষর বেরোল,
— মা।
মা বিমোহিত নয়নে ঘাড় ঘুরাল। খুব ধীরে ধীরে। তার চোখ ভর্তি বিতৃষ্ণার জমানো জল টলমল করছে। মৃদু মৃদু করে বললাম,
— না জেনে অনেক ভুল করেছি মা। ক্ষমা করো।
মা’র বিমর্ষ মুখে একচিলতে হাসির রেখা। সেই হাসির ধাক্কায় টলটলে চোখের উদ্গত জল ক্ষান্ত বর্ষণের পর কচু পাতার পানির মতো গণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। মায়ের হাসি যে এতো স্নিগ্ধ, এতো চিত্তহারী হতে পারে তা আমার অবিদিত ছিল।
বিকেলের দিকে যখন একটু স্বর্ণার খোঁজে বেরোব বলে তৈরি হচ্ছিলাম ঠিক তখনি অনিক ফোন করে বাইরে দেখা করতে বলল। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। কারণ ঠিক কোথায় খুঁজব সেটার ইয়ত্তা নেই। একজন সঙ্গে থাকলে হয়তো মনে একঘেয়েমী কাজ করবেনা। সেই ভেবেই দ্বিধাদ্বন্দ না করে বেরিয়ে গেলাম। অনিকের বলা জায়গা মতো টিএসসি মোড়ে গাড়ি থেকে নামতেই সে হঠাৎ কোথা থেকে উড়ে এলো। করমর্দন করতে করতে বলল,
— কেমন আছো বস? যা গেটআপ নিয়ে এলে। শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার জন্য পারফেক্ট।
ব্যাপারটা মাথায় ঢুকলনা। সংশয় দূর করতে বললাম,
— শ্বশুর বাড়ি মানে বুঝলাম না। কার শ্বশুর বাড়ি? কি?
অনিক পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে হেসে বলল,
— মনে হয় ভাজা মাছ উল্টে খেতে জানো না। আমার শ্বশুর বাড়ি যাব বলেই তো ডাকলাম তোমাকে। এরি মধ্যে ভুলে গেলে?
আমি তাজ্জব বনে গেলাম। আশ্চর্য ও কখন আমাকে শ্বশুর বাড়ির কথা বলল? থুতনি চুলকিয়ে মনে করার চেষ্টা করলাম ঘটনা সত্যি নাকি ভড়ং। পরে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে মাথা নেড়ে বললাম,
— নাহ,তুমিতো আমাকে কোন শ্বশুর বাড়ির কথা বলো নি। কিসের মধ্যে কী?
অনিক কানে কনিষ্ঠ আঙুল ঢুকিয়ে চুলকাতে চুলকাতে মুখখানা কুঁচকে বলল,
— ঠিকাছে না বললে নাই। এখন বলো কী করবে?
— স্বর্ণাকে খুঁজতে হবে আপাততঃ। সাবলীল কণ্ঠে বললাম আমি।
— স্বর্ণা? সে কি বাচ্চা যে তাকে খুঁজতে হবে? অনিকের কণ্ঠে কৌতুক।
আমি বিরক্তির চ কারান্ত শব্দ করে বললাম,
— হ্যাঁ বাচ্চা।
— বাচ্চা? কার বাচ্চা? বয়স কতো? কখন হারাল? পত্রিকায় নিউজ দেয়া হয়েছে? -একসঙ্গে গড়গড় করে বলল অনিক।
আমি তারস্বরে বললাম,
— আরে শালা চুপ করবি? শান্তিতে ভাবতে দে না আগে।
ধমক শুনে ক্ষণকাল বোবার মতো নীরব হয়ে রইল অনিক। একটু পর ধমকের মেয়াদ কাটতেই বলে ওঠল,
— বস জানেন? একটা মেয়ে দুইটা ছেলের নুনু কেটে লিখে দিয়ে আসছে Dont, মাঝখানে O এর জায়গায় এ্যাঙ্গরি ইমুজি।
— হ্যা সেটাতো জানি। এবং এটাও জানি খুনটা কে করেছে! আচমকাই মুখ ফসকে বের হয়ে গেল কথাটা৷
— কে? পলকেই অনিকের চেহারা বদলে গেল।
আমি সামলে নিয়ে বললাম,
— কে আবার? ঐ মেয়েটা!বলেই হেসে ওঠলাম।
অনিক আমার হাসিতে যোগ দিলনা৷ গভীরভাবে কি যেন ভাবতে লাগল।
আমি বললাম,
— অতো ভাবার কিছু নেই। কেসটা তো আর তোমার কুষ্টিয়া থানায় যাচ্ছেনা!
বলা উচিত। অনিকের পোস্টিং হয়েছে কুষ্টিয়ায়। সেও আমার মতো তিন দিন পর বেরোবে। তবে অনিকের এতো ভাবার পিছনে কোন যুক্তিযুক্ত কারণও আমি খুঁজে পাইনা। তবে কি হত্যাকারীর সঙ্গে আমার যোগাযোগের ব্যাপারটা জেনে গেল? নাহ সেটাও প্রায় অসম্ভব। এতে অনিকের লাভ ও নেই ক্ষতি ও নেই। সে ভাবনার জগৎ হতে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হতে পারলনা। বলল,
— তাও ঠিক। কিন্তু সম্প্রতি পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। সেখান থেকে সে দারোয়ানের জায়গা বরাবর ঘুষি মেরে পালিয়ে যায়।
— তাই নাকি?
অনিক দুঃখ প্রকাশ করে বলে,
— হুমম,নিউজ দেখোনি? দারোয়ান বেটা জোয়ান ছেলে৷ মেয়ে আসামীর কাছে জায়গা বরাবর লাথি খেয়ে এখন সে পণ করেছে ঐ মেয়েকেই বিয়ে করবে সে।
এবার আমি বেহদ্দ বীতশ্রদ্ধ হয়ে বললাম,
— আহা,বাজে বকোনা তো! চুপ থাকো।
অনিক সংযত হওয়ার ঢংয়ে দুই হাত সামনে মেলে বলল,
— আচ্ছা তা নাহয় থাকলাম। কিন্তু তুমি এমন করে চোরের মতো মেয়েদের দিকে উঁকিঝুঁকি মারছ কেন?
আমি এর জবাব দিতে গিয়েও দিলাম না। অদূরে ব্যাংকের এটিএম বুথের দিকে চোখ গেল আমার। একজন বোরখাওয়ালা মেয়ে। চোখগুলো হুবহু স্বর্ণার অনুরূপ। ধারালো চোখের লম্বা অক্ষিপক্ষ্ম। সরু চোখে বারকয়েক পরখ করলাম আমি। হাঁটা চলা, চোখের অচঞ্চল নিরঞ্জন চাউনি। হ্যাঁ আমার ষষ্ঠইন্দ্রীয় অনবরত বলে যাচ্ছে এটাই স্বর্ণা। চারচোখ এক হলো নিমেষের জন্য। সে পরোয়া না করে মুখ ফিরিয়ে নিল। সন্দিহান হয়ে গেলাম। সে কি আসলেই স্বর্ণা? চলন-বলন তো পঁচাত্তর শতাংশই স্বর্ণারই অনুকূলে। একবার ডাক দিয়ে দেখলে তো দোষ নেই।
অনিক বলে ওঠলো,
— বস,মেয়েটাকে চিনো তুমি? চোখদুটো সেই নাহ?
আমি ক্রোধ এবং বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বললাম,
— আরেকটা কথা বলবে তো এসব কথা তোমার বউয়ের কানে যাবে।তখন কিন্তু রাম ধোলাই খেয়ে আমাকে দোষ দিতে পারবে না। মাইন্ড ইট।
বউয়ের কথায় অনিক ফাটা বেলুনের মতো টুস করে চুপসে গেল।
আমি দ্রুত দুই পা এগিয়ে গেলাম স্বর্ণা সন্দেহ করা মেয়েটার দিকে। মেয়েটা বোধহয় সেটা বুঝতে পেরে একবার ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে দুই হাতে বোরখা আলগা করে ধরে প্রাণপণে দৌড় দিল। এবার আমার সন্দেহ গাঢ় বিশ্বাসে রূপ নিল। আমিও স্বর্ণার নাম ধরে কয়েকবার ডেকে দৌড় দিলাম। অনিকও কিছু না জেনে ছুটল আমার পিছু পিছু।
চলবে…