#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ২৫
#Saiyara_Hossain_Kayanat
নীলার ফোন বন্ধ শুনে আরশি কিছুটা চমকে উঠলো। চোখে মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। রৌদ্র আরশির দিকে এগিয়ে এসে দাঁড়ালো। আরশি খানিকটা রেগে উচ্চস্বরেই কাসফিয়াকে বলল-
“তুই কেন বার বার নিলু ফোন দিচ্ছিস বুঝতে পারছি না। ওকে একটু একা ছেড়ে দে তো কাসফি।”
রৌদ্র চোখ বড় বড় করে বিস্ময় নিয়ে তাকাতেই আরশি নিজেকে সামলিয়ে নিল। নিম্ন স্বরে আমতা-আমতা করে বলল-
“মানে তুই শুধু শুধুই চিন্তা করছিস। নিলুর সাথে আমার কথা হয়েছে ওর ফোনে চার্জ নেই। তাই বললাম তুই বার বার ওকে ফোন করিস না। আমি এখন রাখছি। তুই ঘুমিয়ে যা এখন।”
আরশি একদমে কথাগুলো বলেই তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দিল। কাসফিয়াকে কিছু বলায়ার সুযোগই দেয় নি। কাসফিয়া আরশির এমন অদ্ভুত ব্যবহার দেখে বোকা বনে গেল। ফোন হাতে নিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। পরক্ষণেই সব চিন্তা ভাবনা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললো। হয়তো রৌদ্রর সাথে আছে তাই এমন অদ্ভুত আচরণ করেছে এটা ভেবেই কাসফিয়া আর চিন্তা করলো না। আরশি ফোন রেখেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নীলাকে বার বার করছে শুনে আরশি নিজের অজান্তেই কাসফিয়ার উপর রেগে গিয়েছিল। রৌদ্র আরশির দিকে তাকিয়ে বলল-
“নীলা ঠিক আছে তো?? আপনার সাথে কথা হয়েছে সত্যি?”
আরশি মাথা নাড়িয়ে “না” জানালো।
“তাহলে আপনি মিথ্যে বললেন কেন?? এই সিচুয়েশনে কি আপনার চিন্তা হচ্ছে না আপনার ফ্রেন্ডের জন্য!!”
আরশি চমকে উঠে রৌদ্রকে জিগ্যেস করলো-
“আপনি কিভাবে বুঝলেন এইসব?? আমি তো আপনাকে পুরো পুরি কিছুই বলিনি।”
রৌদ্র গম্ভীর গলায় বললো-
“যতটুকু বলেছেন তাতেই বুঝতে পেরেছিলাম কি হয়েছে আর এখন শিউর হয়ে গেলাম কার সাথে কি হয়েছে।”
আরশি ছোট্ট করে বলল-
“ওহহ”
“এখন কি করবেন! নীলার বাসায় যাবেন??”
আরশি নির্লিপ্ত ভাবে জিজ্ঞেস করলো-
“নিলুর বাসায় যাবো কেন??”
রৌদ্র ভ্রু কুচকে চিন্তিত গলায় বললো-
“উনি যদি খারাপ কিছু করে ফেলেন!!”
রৌদ্রর কথা আরশি মাথা নিচু করে কিছুটা সময় চুপ করে রইলো। মনে মনে নানানরকম হিসেবনিকেশ করে মাথা তুলে রৌদ্রর দিকে তাকালো। শান্ত গলায় বললো-
“হুহ্, নিলু এমন কিছু করবে না আমি জানি।”
কথাটা বলেই আরশি আগের জায়গায় গিয়ে বসে পরল। রৌদ্রও আরশির পাশে এসে বসলো। দুজনেই চুপ করে আছে। রৌদ্র আরশির থেকে নরজ সরিয়ে ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেললো। আরশি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। চাঁদটা কালো মেঘে ঢেকে আছে এখন। বাতাসও বইছে না। কেমন যেনে এক গুমোট থমথমে পরিবেশ হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যেই।
“যে মানুষটা অন্যের সুখের কথা ভেবে নিজের কষ্ট লুকিয়ে রাখে। অন্য কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে হাসিমুখে ঘুরে বেড়ায়। আর যাইহোক সেই মানুষটা কখনো নিজের ক্ষতি করার মতো বোকামি করতে পারবে না আমি জানি। নিলুকে হয়তো এতদিন বোকাসোকা ইমোশনাল মেয়ে মনে হয়েছে সবার। হয়তো এখনো সবাই তা-ই ভাবে কিন্তু আমি দেখেছি ওর ভিতরের অন্য এক রূপের অস্বস্তি। নিজেকে সব সিচুয়েশনে সামলিয়ে নেওয়ার মতো শক্ত মানসিকতা আছে ওর মধ্যে। তাই ওকে নিয়ে আমি চিন্তা হচ্ছে না। এই মুহূর্তে হয়তো একা একা বসে অঝোরে চোখে পানি ফেলছে। প্রচন্ড কষ্ট পাচ্ছে। একদমই ভেঙে পরেছে এই মুহূর্তে। হয়তো সারাদিন অভিনয় করে ক্লান্ত হয়ে পরেছে তাই এখন নিজেকে অন্ধকার রুমে বন্দী করে রেখেছে নিলু। কারও সাথে যেন কথা বলতে না হয় সেই জন্যই ফোন অফ করে রেখেছে।”
রৌদ্র অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আরশির সব কথা শুনলো। আরশি মতো বেখেয়ালি মেয়ে তার ফ্রেন্ডদের ব্যাপারে এতো বেশিই খেয়াল রাখে সেটা দেখে রৌদ্র ঠোঁট আপনা আপনি প্রসারিত হয়ে গেল। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে রৌদ্র আরশির গম্ভীরমুখে।
“বাহহ আপনি তো খুব বড় হয়ে গেছেন মিস আরু। জ্ঞানী মানুষের মতো করে কথা বলা শিখে গেছেন।”
আরশি ভ্রু বাঁকিয়ে রৌদ্রর দিকে তাকালো। চটপটিয়ে বললে উঠলো-
“কেন এতো দিন কি আমাকে বাচ্চা মনে হয়েছে না-কি!!”
“আপনার মতো পিচ্চি মেয়েকে আর কি-ই বা মনে হতে পারে!!”
আরশি ক্ষিপ্ত হয়ে কর্কশ গলায় বললো-
“আপনি কিন্তু বড্ড বেশিই বাড়াবাড়ি করছেন ডক্টর।”
রৌদ্র উঠে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে শরীরর ঝেড়ে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললো-
“বাচ্চাদের মতো ঝগড়াঝাটি না করে এখন বাসায় চলুন। বাচ্চাদের বেশি রাত পর্যন্ত বাহিরে থাকা ঠিক না।”
আরশি প্রচন্ড রেগে বসা থেকে উঠেই রৌদ্রর দিকে তেড়ে গেল। কিন্তু হলো তার বিপরীতে। এলোমেলোভাবে পা ফেলতে গিয়ে তাল সামলাতে না পেরে পেছনের দিকে ঝুঁকে পরলো। আরশি পড়ে যেতে নিলেই রৌদ্র আরশির ডান হাত শক্ত করে ধরে ফেলে। আরশি ভয়ে চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে ফেলে। রৌদ্র একটা পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল-
“এবার নিজেই প্রমাণ পেয়ে গেলেন আপনি যে একটা বাচ্চা। শুধু বাচ্চা না বেখেয়ালি বাচ্চা।”
রৌদ্র কথাটা বলেই আরশির হাত টান দিয়ে একদম নিজের কাছে নিয়ে আসে। আরশি সোজা হয়ে দাঁড়িয়েই চোখ খুলে ফেললো। নিজেকে রৌদ্রর এতটা কাছে দেখে হকচকিয়ে পেছনে ফেরতেই হাতে টান পরলো। রৌদ্র আরশির হাত এখনো ধরে রেখেছে। মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে তার রুদ্রাণীর দিকে। রৌদ্র হাত ছেড়ে দিতেই আরশি লজ্জায় মাথা নিচু করে গটগট করে রাস্তার দিকে এগিয়ে গেল। রৌদ্র একটা মুচকি হাসি দিয়ে আরশির পেছন পেছন যেতে লাগলো।
————————
ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমের এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে নীলা। দু হাটুতে মুখ গুজে দিয়ে হিচকি তুলে কান্না করে যাচ্ছে অনবরত। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মেঝেতে পড়ে আছে ভাঙাচোরা মোবাইলের এক একটা টুকরো। বিছানার পাশের টেবিলেই রাখা আছে খাবার৷ ঠিক যেমনটা দিয়ে গিয়েছিল তেমনই আছে। কান্নাকাটি করার বেশ কিছুক্ষন পর মাথা তুলে তাকালো নীলা। চোখ গুলো রক্ত লাল বর্ন ধারণ করেছে। চোখ মুখ ফুলে চেহারা যেন একদমই অন্য রূপে পরিনত হয়ে গেছে। তবুও খুব স্নিগ্ধ লাগছে। মায়াবী লাগছে। দুধে-আলতা গায়ের চামড়ায় কান্নার ফলে লালচে আভা ফুটে উঠেছে। এই মুহূর্তে নীলা দেখলেই হয়তো যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যাবে। কান্নার পর মেয়েদের সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়ে যায় এটা নীলা দেখলেই প্রমানিত হবে। নীলাকে দেখে সবাই মুগ্ধ হলেও হয়তো তার ভালোবাসার মানুষটাই মুগ্ধ হবে না। তার ভালোবাসা মানুষ তো এখন অন্য কারও ভালোবাসায় মুগ্ধ। নীলা দু হাত দিয়ে চোখ মুখ মুছে চূল গুলো ঠিক করে নিল। নিজেকে সামলিয়ে মেঝে থেকে উঠে বারান্দায় চলে আসলো। দু হাত রেলিঙের উপর রেখে আকাশের দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে আছে। বড় বড় কয়েকটা শ্বাস নিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে সুর তুলে গান গাইতে লাগলো।
জন্ম মৃত্যুর আর্বতনে পুনরজন্ম হবে
তোমার আবার দেখা পাব
কখন কে জানে
জন্ম মৃত্যুর আর্বতনে পুনরজন্ম হবে
তোমার আবার দেখা পাব
কখন কে জানে
দূরে যাও সরে যাও
রেখে যাও কিছু সৃতি তোমার আমার
জানি আবার একটি জন্ম আমার কবু হবে না।
জানি আবার এমন করে তোমার দেখা পাবো না
জানি আবার একটি জন্ম আমার কবু হবে না।
জানি আবার এমন করে তোমার দেখা পাবো না
সোজা সাত্তা একথা সত্য কথা বলি
তোমায় বিষন রকম ভালোবাসি
হাজার যুদ্ধ ভয়ে গেছে মনে
তোমায় এই কথা বলব বলে
বলা হয়নি কথা কি ছিলো এই মনে…..
বলা হয়নি কথা কি ছিলো এই মনে
জানি আবার একটি জন্ম আমার কবু হবে না।
জানি আবার এমন করে তোমার দেখা পাবো না
জানি আবার একটি জন্ম আমার কবু হবে না।
চলবে….
#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ২৬
#Saiyara_Hossain_Kayanat
প্রিয় রুদ্রাণী,
রুদ্রাণী কখনো আমাবস্যার চাঁদের মতো আঁধার হয়ে থাকে না। রুদ্রাণী তো রোদের মতো জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠে। চারপাশ আলোতে উজ্জ্বল করে তোলে। আমি জানি আমার এই রুদ্রাণী কখনো আমাবস্যার মতো মন খারাপ করে থাকবে না। রোদের মতো হাস্যজ্বল হয়ে সবাইকে আলোকিত করে তুলবে।
ইতি
রৌদ্র
সকাল প্রায় ছয়টায় আরশির ঘুম ভেঙে যায়। ঘুম থেকে উঠেই নীলার কথা ভেবে মন খারাপ করে ফেলে। মনটা একটু হাল্কা করতেই বারান্দায় আসে। সকালের স্নিগ্ধতায় নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছে। আনমনে বেশ কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পর রুমে আসবে তখনই রৌদ্রর নীল রঙের চিরকুট মেঝেতে পরে থাকতে দেখে। হয়তো কাল রাতেই চিরকুটটা দিয়েছে। চিরকুটটা পড়েই আরশির ঠোঁটের কোণে তৃপ্তি তৃপ্তি ভরা হাসি ফুটে উঠেছে। চোখ বন্ধ করে লম্বা লম্বা করে তিনবার শ্বাস নিল। চিঠিটা পড়ে এই মুহূর্তে নিজের মনের মধ্যে প্রচন্ড ভালো লাগা অনুভব করলো। ছোট্ট একটা চিরকুট হলেও এর কয়েক লাইন পড়েই যেন মনোবল ফিরে পেল আরশি। সে বুঝে গেছে এখন তাকে কি করতে হবে। আরশি রুমে এসে দ্রুত ফ্রেশ হয়ে রেডি হয়ে গেল। কাসফিয়ার ফোনে ছোট্ট একটা মেসেজ দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পরলো তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। ড্রয়িং রুমে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল আরশি। মনে মনে কিছু একটা ভেবে আবারও রুমে এসে পরলো। দ্রুত পায়ে বারান্দা গিয়ে গোলাপ গাছ থেকে নতুন ফুটন্ত সব গুলো তাজা ফুল ছিড়ে সাইড ব্যাগ সুন্দর করে নিয়ে নিল। পাশের বারান্দায় এক ঝলক তাকিয়ে আবারও বেরিয়ে গেল রুম থেকে। ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বেজে দশ মিনিট। আরশি টাইম দেখে একটা বড় শ্বাস নিয়েই কলিং বেলে চাপ দিল। কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই। পরপর তিনবার কলিং বেল বাজানোর পর দরজা খুলে গেল। আরশি একটা মনকাড়া হাসি দিয়ে সালাম বিনিময় করলো।
“সরি আন্টি সকাল সকাল তোমার ঘুম ভেঙে দিলাম।”
মিসেস রোজা বেগম খানিকটা কড়া শাসনের স্বরে বললেন-
“এক থাপ্পড় দিব ফাজিল মেয়ে। সরি বলছিস কেন!! আয় ভিতরে আয়।”
আরশি ভিতরে এসে নম্রতার সাথে বললো-
“আসলে আন্টি আমি নিলুর কাছে এসেছিলাম। ও কি এখনো ঘুমাচ্ছে??”
রোজা বেগম চিন্তিত গলায় বললেন-
“আর বলিস না আরশি। কাল সন্ধ্যা থেকেই রুমের মধ্যে বসে আছে। ওর নাকি প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে আমাকে বলেছে আমি যেন ডাকাডাকি কিরে ডিস্টার্ব না করি।”
আরশি নীলার আম্মুর অগোচরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল-
“ওহহ… আচ্ছা নীল কবে আসবে আন্টি??”
“আজ অথবা কালকেই চলে আসবে। নীল তো যেতেই চায়নি ওর আব্বুই তো জোর করে নিয়ে গেছে অফিসের কাজে। যাইহোক তুই যা নীলার রুমে। আমি যাই ফ্রেশ হয়ে নাস্তা বানাই।”
আরশি মাথা নাড়িয়ে নীলার রুমের দিকে পা বাড়ালো। দরজা খুলে রুমের ভিতরে আসলো। পুরো রুমে নজর বুলিয়ে নিল একবার। বারান্দার দরজা খোলা, মেঝেতে ফোনের ভেঙে যাওয়া টুকরো পরে আছে। বিছানার মাঝে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে নীলা। এলোমেলো চুল আর ফোলা ফোলা চোখ মুখ দেখেই আরশি সব বুঝে গেল। মেয়েটা সারারাত নির্ঘুম কেঁদে কেটেই পাড় করেছে। আরশি নীলার বিছানার পাশে এসেই চেচিয়ে ডাকা শুরু করলো।
“নিলু এইইইইই নিলু। আর কত ঘুমাবি ওঠ এবার। এইইইই নিলুউউউ…..”
আরশির ডাকে নীলা ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। চোখ কচলিয়ে আরশিকে দেখেই হতভম্ব হয়ে গেল। দেয়াল ঘড়িতে একবার সময় দেখে বিস্ময় নিয়ে আরশির দিকে তাকালো। এই সময় আরশিকে দেখে কিছুটা অবাক হয়েছে নীলা। আরশি নীলার দৃষ্টি পাত্তা না দিয়ে ব্যাগ থেকে সব গুলো ফুল বের করলো। সুন্দর করে সব গুলো ফুল এক সাথে মিলিয়ে তোড়ার মতো করে নিল। নীলা হতবাক হয়ে আরশির কাজ দেখছে। কোনো কথা বলছে না। আরশি ফুল গুলো হাতে রেখেই নীলার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে মলিন কন্ঠে বললো-
“আমি জানি নিলু আমি তোকে যেই কষ্টের মুখোমুখি করয়েছি সেটা সহজে ভুলে যাওয়া সম্ভব না। তবুও আমি চাই তুই যেন আগের মতো হয়ে যাস। কখনো কষ্ট পেলে সেটা সবার থেকে লুকিয়ে রাখলেও অন্তত আমার সাথে অভিনয় করিস না প্লিজ। কষ্ট পেলে, কান্না আসলে তুই আমার সাথে শেয়ার করিস প্রয়োজনে আমরা দুজন মিলে একসঙ্গে বসে কান্না করবো। তবুও সব কিছু মনের মধ্যে চেপে রাখিস না। আমাকে তো তুই নিজের সব থেকে কাছের ফ্রেন্ড ভাবিস তাহলে আমার সামনে কেন এতো অভিনয় করে বেড়াস নিলু!!”
নীলা অশ্রুসিক্ত চোখে আরশির দিকে আছে। নোনাপানিতে ভরে উঠেছে নীলার দুটি চোখ। হয়তো এখনই গাল গড়িয়ে পরবে। আরশি নীলার দিকে ফুল গুলো এগিয়ে দিয়ে বলল-
“ভালোবাসার মানুষ হারিয়ে ফেলেছিস তো কি হয়েছে আমি আছি তো। will you be my soulmate?? নিলু।”
নীলার এবার চোখেরজল ছেড়েই দিল। কান্নারত অবস্থাতেই ঠোঁটে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে আরশির পাগলামি দেখে। আরশির নীলার পাশে বসতেই নীলার আরশিকে জড়িয়ে ধরে বাচ্চাদের মতো কেঁদে দিল। আরশি নীলার মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছে। কিছুটা সময় পর নীলা নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসে। আরশির হাত থেকে ফুল গুলো নিয়েই একটা মিষ্টি হাসি উপহার সরূপ দিল। আরশি মুখে কিছুটা গম্ভীর ভাব এনে বললো-
“এই আদ্রাফ হারামি নেই তাতে কি দেখিস আমি তোর জন্য রাজপুত্র খুঁজে বের করবো। জাস্ট কিছুটা দিন অপেক্ষা কর। তুই আর আমার হবু দুলাভাই হবে বেস্ট কাপল। তোরা দুজন যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাবি তখন মানুষ তোদের দেখে জ্বলবে আর মমতাজের গান গাইবে ‘ফাইট্টা যায় বুকটা ফাইট্টা যায়’ তুই শুধু অপেক্ষা কর নিলু।”
আরশির কথা শুনে নীলা খিলখিল করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে আরশির পিঠে একটা চাপড় মেরে বললো-
“হারামি তুই চুপ কর। এসব কি কথা বলছিস??”
“হুহ্ তুই মিলিয়ে নিস আমার কথাটা।”
নীলা আরশির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল-
“তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আশু। তুই সকাল সকাল আমার মন ভালো করে দিলি। বস তুই আমি রেডি হয়ে আসি। আজ আমরা দুজন অনেক ঘুরবো।”
নীলা কথা গুলো বলতে বলতে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো। আরশি কিছুটা খেপে গিয়ে চেচিয়ে বলল-
“আর কখনো আমাকে ধন্যবাদ বললে তোর দাঁত ফেলে দিব নিলু।”
নীলা একটা ভেংচি কেটে ওয়াশরুমের চলে গেল।
—————————
মেঘলা বিকেল। চারপাশে অন্ধকার আর আকাশে কালো মেঘের খেলা হচ্ছে। শরীর কেপে ওঠার মতো হিমশীতল বাতাস বইছে। আরশি বারান্দায় একা একা দাঁড়িয়ে আছে। কোমড় পর্যন্ত চুল গুলো বাতাসে উড়িয়ে দিচ্ছে। পড়নে নীল রঙের কামিজ আর সাদা রঙের ওড়নাটাও বাতাসের সাথে তাল মিলিয়ে হেলেদুলে নড়ছে। আরশি চোখ বন্ধ করে এই শীতল পরিবেশ অনুভব করছে। আজ আরশির মনটা বড্ড বেশিই ভালো। নীলাকে আগের মতো হাস্যজ্বল দেখে বেশ স্বস্তি পেয়েছে। সারাসকাল নীলার সাথে ঘুরে ফিরে বাসায় পৌঁছে কাসফিয়াকে পেল না। কাসফিয়া বেরিয়েছে আদ্রাফের সাথে ঘুরতে। আরশি তো এটাই চেয়েছিল সবাই যেন নিজেদের মতো করে হাসিখুশি থাকে। রৌদ্র বারান্দায় এসে আরশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই একটা মুচকি হাসি দিলো। রেলিঙের পাশে এসে আরশির দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁড়ালো। আরশির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আচমকা বলে উঠলো-
“মিস আরু নিচে আসুন।”
আরশি চমকে উঠে। ফটাফট চোখ মেলে রৌদ্রর দিকে তাকালো। রৌদ্র দেখে আরেক দফায় চমকে উঠলো আরশি। মুচকি হাসি দিয়ে পকেটে দু হাত গুজে নীল রঙের শার্ট পরে দাঁড়িয়ে আছে। এই মুহূর্তে তাকে নীল রঙের শার্টে দেখার চেয়ে বেশি অবাক হয়েছে এই গম্ভীর মানুষটার মুখে হাসি দেখে। আরশির চাহনি দেখে মনে হচ্ছে রৌদ্রর মুখে হাসি দেখাটা খুবই অবিশ্বাস্য কিছু। আরশিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে রৌদ্রর ঠোঁটের হাসিটা আরও প্রসারিত করে বলল-
“আমাকে দেখার আরও অনেক সুযোগ পাবে আরু।”
আরশি থামকাল। চোখের আকার বিস্ময়ে গোলাকৃতি ধারন করল। গলার কাছে আটকে আসতে লাগলো নিঃশ্বাস। রৌদ্র এভাবে তুমি সম্মোধন করে কথা বলছেন কেন?? আর মুচকি হাসছেন ই বা কেন?? আরশি জ্ঞানশূন্য হয়ে গেছে। গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। রৌদ্রর এমন ব্যবহারে আরশির গলার স্বর যেন কৌতুহলের নিচে চাপা পরে আছে। কানে ভেসে আসছে রৌদ্রর শান্ত শীতল কন্ঠ-
“কি হলো মিস আরু!! কোথায় হারিয়ে গেলেন!!”
আরশির হুশ ফিরলো। চোখ জোড়ায় কৌতুহলের রেশ। একটা জোড়ালো শ্বাস ফেলে বলল-
“নাহ কিছু না।”
রৌদ্রর হাসলো। ডান হাতে কপালের উপর আছড়ে পড়া চুল গুলো পেছনে ঢেলে দিল। নম্র কন্ঠে বলল-
“পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি নিচে আসুন।”
রৌদ্র কথা শেষ করেই চলে গেল, বরাবরের মতো আরশির প্রতিত্তোরে অপেক্ষা না করে। আরশির বড়বড় চোখগুলোতে বিস্ময়ের তারা খেলে গেল। আজও আবার বাহিরে যেতে বলছে তাকে?? কিন্তু আজ আবার কেন!! আরশি ফুস করে নিঃশ্বাস ছাড়লো। ধপধপ পায়ে রুমে চলে আসলো। সাদা রঙে ওড়নাটা বড় করে মাথায় ঘোমটা টেনে দিল। টেবিলের উপর থেকে ফোন নিয়ে বেরিয়ে পরলো। রৌদ্র একটা কালো রঙের গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আজ তার মুখের ভাবভঙ্গি প্রকাশ পাচ্ছে। এক নজর তাকালেই তার হাসি মাখা ঠোঁটের দিকে সর্বপ্রথম নজর পরবে। আরশি রৌদ্রর দিকে একনজর তাকিয়ে মাথা নিচু করে এগিয়ে আসলো।
“গাড়িতে উঠুন মিস আরু।”
আরশি সন্দিহান কন্ঠে বললো-
“আপনার বাইক কোথায়? গাড়ি কেন আজ??”
“বর্ষাকাল আসছে তাই আম্মু গাড়ি পাঠিয়েছে যেন বাইকে ভিজে ভিজে কোথাও যেতে না হয়।”
আরশি ছোট্ট করে বলল-
“ওহহ।”
আরশি গাড়িতে উঠে বসলো বিনাবাক্যব্যয়ে। রৌদ্র গাড়িতে উঠে ড্রাইভ শুরু করলো। একটু পরপর আড় চোখে তাকাচ্ছে আরশির দিকে। বাতাসে আরশির ঘোমটা পড়ে গেছে। চুল গুলো এলোমেলোভাবে উড়ছে। আরশি চোখেমুখ প্রচন্ডভাবে অস্বস্তির প্রকাশ ঘটাচ্ছে। বেসামাল চুল আর রৌদ্রর বার বার আড় চোখে তাকানো সব মিলিয়ে আরশি পরেছে ভয়ংকর অস্বস্তির সাগরে। বিরক্তিতে কপালে ভাঁজ পরেছে। কিছুটা পথ যেতেই গুরিগুরি বৃষ্টি শুরু হলো। জানালা দিয়ে বৃষ্টির পানি আরশির মুখ ছুয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির ঠান্ডা পানিতে আরশির শরীর কিছুটা কেঁপে উঠল। তবুও আরশি জানার কাচ তুলছে না। আরশির মন খুব করে চাইছে এই বৃষ্টির মাঝে নিজেকে হারিয়ে দিতে। আরশির মনের সেই ইচ্ছে যেন রৌদ্রর মনেও হানা দিল। নির্জন এক ফাঁকা রাস্তায় এসেই গাড়ি থামিয়ে দিক। পিচঢালা সরু রাস্তা আর দু’পাশে বড়বড় গাছ তাছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না আশেপাশে। রৌদ্র গাড়ি থেকে নেমে গেল। আরশি চমকে রৌদ্রর দিকে তাকালো। বৃষ্টির বেগ আগের থেকে খানিকটা বেড়ে গেছে। রৌদ্রর পুরো শরীর ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। গাড়ির জানালার কাছে এসে ঝুঁকে আরশিকে বলল-
“বৃষ্টি আমার খুব বেশিই পছন্দ তাই বৃষ্টিতে ভেজার সুযোগ পেলে কখনো হাত ছাড়া করি না। মনের কোনো ইচ্ছে পূরণ করার সুযোগ পেলে তা নিয়ে ভাবতে নেই। সময় নষ্ট না করে সঙ্গে সঙ্গেই সেই ইচ্ছে পূরণ করে ফেলতে হয়।”
রৌদ্র শেষের কথা গুলো আরশিকে উদ্দেশ্য করে বলেছে তা আরশির বুঝতে বাকি রইলো না। আরশি কোনো কিছু না ভেবেই গাড়ি থেকে নেমে পরলো। গায়ের ওড়নাটা ভালো করে জড়িয়ে নিল। গাড়ি থেকে কিছু দূরে গিয়েই চোখ বন্ধ করে বৃষ্টি উপভোগ করতে লাগলো। রৌদ্র মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে।
“মিস আরু আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।”
রৌদ্রর মুখে আচমকা এমন কথা শুনে আরশি বৃষ্টির মাঝেই চোখ বড় বড় করে বিস্ময় নিয়ে রৌদ্রর দিকে তাকালো। “রৌদ্র এই কথা কেন বলবে!! হয়তো ভুল শুনেছি, বৃষ্টির কারনে তো তেমন কিছু ভালো করে শোনাও যাচ্ছে না।” আরশি এসব ভেবেই আর পাত্তা দিল না। কিন্তু নাহ আরশির ভাবনা ভুল প্রমাণ করে দিয়ে আবারও একই কথা কানে ভেসে আসলো তবে কিছুটা ভিন্নভাবে। তীরের মতো কানে এসে আঘাত করলো এবারের কথাটা।
“আরু আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।”
পিচঢালা রাস্তার ঠিক মাঝে দুটি মানব বৃষ্টির পানিতে কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির এই শীতল পানি ছুয়ে দিচ্ছে তাদের শরীর আর মন দুটোই। রৌদ্রর নীল রঙের শার্ট ভিজে লেপ্টে লেগে আছে তার দীর্ঘ শক্তপোক্ত দেহে। আরশি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে রৌদ্রর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা অমায়িক হাসির দিকে। এই লোকটা এতো সুন্দর করে হাসতে পারে এটা আরশির জানা ছিল না। আরশি বেশখানিকটা সময় পর হুশ আসতেই তৎক্ষনাৎ চোখ ফিরিয়ে নিলো।
চলবে….