#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৩৯
#Saiyara_Hossain_Kayanat
আংটিবদলে বাধা পরায় ড্রয়িং রুমের সকলের মুখে বিরক্তি রেশ। মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে এটা কোনো কলিং বেল নয় বিরক্তির বেল বেজে উঠেছে। সবাই হতাশ হয়ে ভ্রু কুচকে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে। নীল দরজা খুলতেই সাদা টুপি, পাঞ্জাবি পরা এক হুজুর সাহেব সালাম বিনিময় করে ভিতরে আসলেন। আদিব হাসান লোকটার দিকে এগিয়ে গিয়ে বিনয়ের সাথে কথা বলছে। আরশি বিস্মিত হয়ে সব দেখে যাচ্ছে। লোকটাকে দেখেই তার বুক ধক করে উঠলো। আজ কি তাহলে সত্যি সত্যিই আকদের কাজ সম্পূর্ণ হয়ে যাবে? এই কয়েক ঘন্টার মধ্যেই কি আমার জীবনটা পুরো পালটে যাচ্ছে? সবাই আবারও উৎসুক হয়ে আংটিবদলের জন্য এক হয়ে দাঁড়ালো। রৌদ্রর বাবা তাড়া দিয়ে বললেন-
“রৌদ্র আরশি মামুনিকে আংটি পড়িয়ে দে। তারপর আবার আকদের কাজ শুরু করতে হবে।”
রৌদ্র মাথা নাড়ালো। আরশির দিকে এক হাত বাড়িয়ে দিল রৌদ্র। আরশি রৌদ্রর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে হাতের দিকে দৃষ্টি রাখলো। বড়রা সবাই তাড়া দিচ্ছে। আর আরশির বন্ধুরা সকলে উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে আরশির দিকে। আরশি এখনো স্থির চোখে রৌদ্রর হাতের দিকে তাকিয়ে আছে। আরশির মনে চলছে হাজারো চিন্তা ভাবনা। ডক্টর রোদের দিকে হাত বাড়িয়ে দেওয়া কি ঠিক হবে? আমার এই ব্যর্থতা নিয়ে ওনার সাথে নতুন জীবন শুরু করা কি ঠিক হবে! আমার জন্য উনি কোনো কষ্ট পাবে না তো!!
“আরশি মা কি ভাবছো? তুমি কি বিয়ের জন্য রাজি না? কোনো প্রব্লেম থাকলে আমাকে বলতে পারো।”
আদিব হাসানের কথায় পুরো ড্রয়িং রুমে চিন্তার ঝড় ভয়ে গেল। সকলের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। নীল আরশির পাশে এসে দাঁড়ালো। পরিস্থিতি সামলানোর জন্য মুখে হাসি টেনে আদিব হাসানের উদ্দেশ্যে বলল-
“নাহ নাহ তা হবে কেন! আশু বিয়েতে রাজি বলেই তো রেডি হয়েছে। তাই না আশু!”
নীল আরশিকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে ফিসফিস করে আবারও বলল-
“এই আশু হাত বাড়িয়ে দে। শুধু শুধু সবাইকে চিন্তায় ফেলছিস কেন?”
আরশি কপাল কুচকে নীলের দিকে তাকালো৷ নীল চোখের ইশারায় হাত বাড়িয়ে দিতে বলছে। আরশি রৌদ্রর দিকে তাকালো। কালো শার্ট গায়ে জড়ানো। হাতা কনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। চুল গুলো কিছুটা এলোমেলো হয়ে কপালে এসে পরে আছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ থাকলেও রৌদ্রর ঠোঁটের কোণে লেগে আছে হাল্কা হাসির রেখা। আরশি রৌদ্রর হাসির দিকে তাকিয়েই তার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। রৌদ্রর হাসি মুখ খানিকটা প্রসারিত হয়ে এলো৷ আরশির হাত আলতো করে ধরে আরশির অনামিকায় আংটি পড়িয়ে দিল। সাথে সাথে ড্রয়িং রুম জুড়ে হৈ-হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। হাত তালি আর হাসির শব্দ বাড়ির প্রতিটি দেয়ালে দেয়ালে ভারি খাচ্ছে। আরশি মাথা তুলে সবার দিকে নজর বুলিয়ে নিতেই মুচকি হাসি দিলো। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই শুরু হয়ে গেল আকদের কাজ। সোফায় চুপচাপ বসে আছে আরশি। তার পাশেই আছে ডক্টর রোদ। হুজুর সাহেব কিছুটা সময় তার বড় খাতায় লেখালেখি করার পর আরশিকে কবুল বলতে বলা হলো। কবুলের কথা শুনেই আরশির হার্ট খুব জোরে জোরে লাফাচ্ছে। অস্থিরতায় দু হাত কচলানো শুরু করে দিয়েছে। পাশ থেকে নীলা আর কাসফিয়া বলল-
“আশু কবুল বলে দে।”
আরশি একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে মাথা তুলে শান্ত গলায় বললো-
“ডক্টর রোদের সাথে আমার কিছু কথা আছে।”
সবাই ভ্রু কুচকে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। আরশির মা বিরক্তি প্রকাশ করে বলল-
“এখন আবার কিসের কথা আরশি?”
রৌদ্র আরশির পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালো। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বিনয়ের সাথে বলল-
“মিস আরু হয়তো আমার সাথে কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলতে চায়। আমার কোনো আপত্তি নেই বিয়েটা ওনার মতামতেই হবে।”
রৌদ্রর কথায় সবাই শান্ত হয়ে গেল। পাশ থেকে রৌদ্রর মা নরম গলায় বললেন-
“সমস্যা নেই আমরা সবাই অপেক্ষা করছি। তোমরা যাও রুমে গিয়ে আলাদা করে কথা বলে আসো।”
সবার অনুমতি নিয়েই তাদের দুজনকে আলাদা কথা বলতে দেওয়া হলো। আরশির রুমে এসে রৌদ্রর পুরো রুম ঘুরে ফিরে দেখছে। আরশি চুপচাপ ভ্রু বাঁকিয়ে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। রৌদ্রর তাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই সে নিজের মতো রুমে হাঁটাহাঁটি করছে। দু হাত পকেটে গুজে আরশির দিকে তাকিয়ে বলল-
“আপনার রুমটা তো খুব সুন্দর মিস আরু।”
রৌদ্রর কথায় আরশির ভ্রু কুচকে এলো৷ বিরক্তির স্বরে বলল-
“আমি এখানে আপনাকে রুম দেখাতে নিয়ে আসিনি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছি।”
রৌদ্র হাল্কা হেসে ভাবলেশহীন ভাবেই বলল-
“হুম হুম আপনি বলুন আমি শুনছি।”
রৌদ্রর নির্লিপ্ততা দেখে আরশি খানিকটা শক্ত গলায় বলল-
“আপনি কি দয়া করে একটু সিরিয়াস হবেন!”
রৌদ্র আরশির দিকে এক নজর তাকিয়ে বিছানায় বসে পরলো। পায়ের উপর পা তুলে বেশ ভাব নিয়ে বলল-
“কি বলবেন জলদি বলুন।”
“আপনি কি সব ভেবেচিন্তেই আমাকে বিয়ে করছেন ডক্টর! আমি আপনাকে আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছি আমি ব্যর্থ। আমি একটা অসম্পূর্ণ মেয়ে।”
রৌদ্র আরশির দিকে তাকিয়ে গম্ভীরমুখে বলল-
“আপনার তো মা হওয়ার চান্স আছে। কিন্তু আমি তো পুরোই ব্যর্থ, বাবা হতে অক্ষম। এই জন্যেই কি আমাকে বিয়ে করতে আপনি এতো ভাবছেন মিস আরু?”
আরশি ভড়কে উঠলো। ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল-
“আমি কখনোই আপনার এসব নিয়ে ভাবিনি ডক্টর। কোনো কিছু না জেনে শুনেই কথা বলছেন কেন আপনি!”
রৌদ্র হাসলো। একটু জোরেই হাসলো। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো। আরশির তীক্ষ্ণ চোখ রৌদ্রর হাসি পর্যবেক্ষণ করছে। রৌদ্র আরশির মুখোমুখি হয়ে শীতল কন্ঠে বলল-
“আপনি আমার ব্যর্থতা নিয়ে ভাবছেন না অথচ আমাকে ঠিকই বাধ্য করছেন আপনার এই সামান্য বিষয়টা নিয়ে ভাবতে। এটা কি ঠিক হচ্ছে মিস আরু?”
আরশি কিছু বলল না। নিশ্চুপ হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। হয়তো তার বলার মতো কিছু নেই। রৌদ্র আরশিকে চুপ থাকতে দেখে মুচকি হাসলো। রৌদ্র আরশির একদম কাছে এসে আরশির গাল দু’হাতের মাঝে আগলে নিল। আরশির মাথা উঁচু করে চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বললো-
“তুমি কি ভুলে গেছো আমি তোমাকে কি বলেছিলাম! আমি শুধু তোমাকে চাই আরু।”
রৌদ্র আরশির গাল থেকে হাত নামিয়ে নিল। আরশির দিকে খানিকটা ঝুঁকে কানে ফিসফিস করে বলল-
“মৃত্যু আমৃত্যু আমি শুধু তোমাকে চাই। তোমার ব্যর্থতা, মন খারাপ সব কিছু চাই। তোমার চোখের অশ্রুজল, তোমার ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি দুটোই চাই। তোমার লজ্জা, অস্বস্তি, রাগ সব কিছু চাই। শুধু তোমার ঘৃণা নয় ভালোবাসাটা-ই চাই।”
রৌদ্র কথা গুলো বলেই হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল। আরশি এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরশির হাত আপনা আপনি আরশির গালে চলে গেল। দু’হাত দিয়ে নিজের গাল ঢেকে আছে। আচমকাই নীলা রুমে এসে অস্থিরতার সাথে বলল-
“আশু তাড়াতাড়ি চল সবাই অপেক্ষা করছে তোর জন্য।”
আরশি কিছু বললো না। আগের মতোই গালে হাত দিয়ে মূর্তি মতো দাঁড়িয়ে আছে। নীলা আরশির দিকে সন্দেহের দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল-
“কিরে গাল ঢেকে রেখেছিস কেন! তাড়াতাড়ি চল।”
নীচ থেকে ডাকাডাকির শব্দ ভেসে আসতেই নীলা হন্তদন্ত হয়ে আরশির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল। নীচে এসে আরশিকে আবারও রৌদ্রর পাশে বসিয়ে দিল। রৌদ্র আড়চোখে আরশিকে দেখছে আর ঠোঁট চেপে হাসছে। আরশি লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। হুজুর সাহেব আবারও আরশিকে কবুল বলতে বলল। আরশি চোখ বন্ধ করে বড় করে একটা শ্বাস নিল। নিজেকে শান্ত করে নিম্ন স্বরে কবুল বলে ফেলল। পর পর তিনবার কবুল বলেই আরশি নিজের জীবন রৌদ্রর সাথে জড়িয়ে নিল।আরশির কবুল বলার পর রৌদ্র কোনো সময় ব্যয় না করে সঙ্গে সঙ্গেই কবুল বলে দেয়। আকদ ভালো ভাবে সম্পূর্ণ হতেই পুরো বাড়ি জুড়ে খুশির জোয়ার বয়ে গেল। আরশিকে একে একে সবাই জড়িয়ে ধরছে, অভিনন্দন জানাচ্ছে। রৌদ্র আর আরশিকে নতুন জীবনের জন্য শুভেচ্ছা জানিয়ে সবাই নিজেদের মতো করে আড্ডায় মেতে উঠলো।
———————
আকাশে গোলাকার চাঁদের আলোয় চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে আছে। চাঁদটা কিছুক্ষন পর পর কালো মেঘে ঢেকে যাচ্ছে আবারও উজ্জ্বল হয়ে উঁকি দিচ্ছে। শীতল হাওয়া বইছে চারপাশে। পুরোটা ছাদ জুড়ে আরশির বন্ধুদের হৈচৈয়ের শব্দে পরিবেশ গরম হয়ে আছে। রৌদ্র আর আরশি চুপচাপ বসে আছে তাদের মাঝে। আজ রাত সবাই আরশির বাড়িতেই থাকবে। সন্ধ্যা হয়ে যাওয় আদিব হাসান একপ্রকার জোর করেই রৌদ্রদের রেখে দিয়েছে। বড়রা সবাই নিচে বিয়ের অনুষ্ঠান নিয়ে আলোচনা করছে আর ছোটরা সবাই ছাদে আড্ডার আসর জমিয়েছে৷ আড্ডার এক পর্যায়ে কাসফিয়া হুট করেই রৌদ্রকে জিজ্ঞেস করল-
“আচ্ছা ভাইয়া আপনি কি এর আগে কখনো কাওকে ভালোবেসেছেন? না-কি আশুই আপনার প্রথম ভালোবাসা!”
কাসফিয়ার সাথে সবাই তাল মিলিয়ে রৌদ্রর কাছে উত্তর জানতে চাইছে। রৌদ্র আরশির দিকে এক পলক তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো-
“নাহ আরু আমার প্রথম ভালোবাসা না। এর আগেও আমি একজনকে ভালোবেসেছি। আর এখনো তাকে ভালোবাসি।”
রৌদ্রর উত্তরে সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। সবার মাঝেই গম্ভীরতা এসে ভর করেছে। রৌদ্র এমন কোনো উত্তর দিবে সেটা কেউ-ই আশা করেনি৷ বিশেষ করে আরশি। আরশি তো বিস্ফোরিত চোখে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। ডক্টর রোদ এর আগেও একজনকে ভালোবেসেছেন আর এখনো ভালোবাসেন! কিন্তু উনি তো আমাকে বলেছিলেন উনি এর আগে কখনো প্রেম ভালোবাসা করেনি। আমিই তার জীবনে প্রথম মেয়ে। তাহলে কি রোদ আমাকে মিথ্যা কথা বলেছে!! আরশি মনে নানানরকম প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। চোখে মুখে কৌতুহল নিয়ে রৌদ্রর দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। নীল উৎকন্ঠিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
“আপনি আমাদের সাথে মজা করছেন তাই না ভাইয়া?”
রৌদ্র দু হাত আড়াআড়ি ভাবে ভাজ করে গম্ভীরমুখে বলল-
“এসব নিয়ে কখনো মজা করা যায় না।”
কাসফিয়া কৌতূহল মেটাতে জিজ্ঞেস করলো-
“তাহলে কি?”
চলবে…
[ব্যস্ততার জন্য রিচেক করা হয়নি। ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। জানি একটু অগোছালো হয়েছে তাই দুঃখিত। ধন্যবাদ আর ভালোবাসা সবাইকে।❤️❤️]
#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪০
#Saiyara_Hossain_Kayanat
“মানুষ তার জীবনে একবার হলেও কারও প্রেমে পড়ে। আমিও একজনের প্রেমে পড়ে ছিলাম। তবে সেটা শুধুমাত্র প্রেমে পড়া পর্যন্তই ছিল। মানুষ সুন্দর,পরিপাটি চেহারা দেখে প্রেমে পড়ে তবে আমি প্রেমে পড়েছিলাম একজনের অগোছালো চেহারা দেখে। কান্নার ফলে চোখমুখ ফুলে ছিল। চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পুরো মুখে লেপ্টে থাকা সেই অগোছালো মুখ। চোখের বিশুদ্ধ পানিতে গাল গুলো ভিজে লেপ্টে ছিল। কারও কান্না দেখলে তো মায়া বা কষ্ট হওয়ার কথা কিন্তু আমার এই নির্দয় মনে ছিল মুগ্ধতা। দুচোখে এক রাশ মুগ্ধতা নিয়েই প্রথম দেখেছিলাম কান্নারত অবস্থায় থাকা সেই বিশুদ্ধময়ি মেয়েটাকে। এক মুহূর্তের জন্যই প্রেমে পড়েছিলাম তার উপর। এর পর তার দেখা মেলেনি আর আমিও খোঁজার চেষ্টা করিনি।”
রৌদ্র হাল্কা হাসলো। ডান হাতের আঙুল দিয়ে কপালের চুল গুলো পেছনে ঢেলে দিল। আরশির দিকে অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। দুজনের চোখাচোখি হতেই আরশি চোখ নামিয়ে নেয়। আরশির বুঝতে বাকি নেই রৌদ্র কার কথা বলছে। আরশির বন্ধুরা সবাই কৌতুহলী চোখে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বান রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে বলল-
“ভাই পরে কিভাবে কি হলো! তাড়াতাড়ি বলো।”
রৌদ্রর নির্বানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে আবারও বলতে শুরু করল-
“তার ঠিক বছর দুয়েক পর একদিন বাইক নষ্ট হওয়ায় বাধ্য হয়েই লোকাল বাসে উঠেছিলাম। ওইদিনই আরুকে দেখেছিলাম। তবে এবার প্রেমে নয় ভালোবাসায় পড়েছিলাম। ভুলবশত এক অচেনা রমনীকে নিজের ছোয়া দিয়ে ভুলবশত ভাবেই তাকে ভালোবেসে ফেলেছিলাম। এবার ভালোবেসেছি তার অস্বস্তিতে ঘেরা মুখ দেখে। একনজরই দেখেছিলাম তাকে। সে তো চলে গেছে তবে রেখে গিয়েছিল তার নখের ছাপ। তখন তার স্পর্শ পেয়ে ভেবেছিলাম কখনো মেয়েদের সংস্পর্শে না আসায় এমন অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছে। কিন্তু না আমার ধারণা ভুল প্রমাণ করেই অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এই অদ্ভুত অনুভূতির কারন বুঝে গিয়েছিলাম। সেদিন থেকেই কাকতালীয় ভাবে চিঠির আদান-প্রদান শুরু হলো। একদিন পর আবারও আরুর দেখা পেয়েছিলাম আর সেদিনই জেনেছি আরুই ছিল আমার প্রথম প্রেম। আর তার কয়েকঘন্টা পরেই আরুকে পাশের বারান্দায় চিঠির মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করেছি। একই মানুষের সাথে বার বার ঘটে যাওয়া এই ঘটনা গুলো নিশ্চয়ই কোনো কাকতালীয় নায়। এটাই হয়তো আমাদের নিয়তি ছিল। তাই বার বার আমরা ঘুরে ফিরে একে অপরের কাছেই এসে পরেছি। তাই মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শুধুমাত্র এই একজনের ভালোবাসাতেই পড়তে চাই।”
রৌদ্রর কথা শেষ হতেই সবাই হাততালি দিল। পুরো ছাদ কাপিয়ে উঠেছে তাদের সিটি বাজানো আর হাততালির শব্দে। সকলের সামনে এসব বলায় আরশি লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে। বাতাসের তালের সাথে তাল মিলিয়ে আরশির চুল গুলো দুলছে। চাঁদের আলোয় আরশির আবছা মুখে লজ্জার আভা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে এক জোড়া তৃপ্ত চোখ। জলজল এই চোখ দুটো শুধুমাত্র আরশিতেই নিবদ্ধ।
“আচ্ছা সবই তো বুঝলাম কিন্তু ভালোবাসায় পরেছেন একথাটা কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। প্রেমে পড়া আর ভালোবাসায় পড়ার মধ্যে তফাত কোথায়!”
সকলের হাসিঠাট্টার মাঝেই নীলা ভাবুকতার সাথে প্রশ্ন ছুড়ে দিল রৌদ্রর দিকে। রৌদ্র নীলার দিকে তাকালো। নীলার চোখে মুখে কৌতুহল। অবুঝ বাচ্চাদের মতো ফ্যালফ্যাল করে রৌদ্রর দিকে কৌতূহল মেটানোর আশায় তাকিয়ে আছে। নীলার সাথে সাথে বাকি সবাই উত্তরের অপেক্ষা করছে।
“প্রেমে পড়া মানে একটা নির্দিষ্ট জিনিসের মায়ায় অথবা কারও মোহে জড়িয়ে যাওয়া। এই মায়া বা মোহ একটা সময় পর কেটে যায়। ঠিক যেমনটা আমিও অল্পদিনে ভুলে গিয়েছিলাম সেই কান্নারত বিশুদ্ধময়িকে মেয়েটাকে। আর ভালোবাসায় পড়া হলো একটা মানুষের নামে নিজের মনকে বিলিয়ে দেওয়া। যত কিছুই হয়ে যাক না কেন মাথা আর মন থেকে সেই নির্দিষ্ট মানুষকে বের করা সম্ভব হয়না। মানুষটার ভালো-মন্দ, ব্যর্থতা সব কিছুই তখন মুগ্ধকর মনে হয়। তার সব কিছুতেই ভালো লাগা কাজ করে। মানুষটার তুচ্ছ থেকেও তুচ্ছ জিনিস গুলোতেও ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া যায়। একবার কারও ভালোবাসায় পড়ে গেলে তাকে নিজের মন থেকে বের করা অসম্ভব। সব শেষে বলবো প্রেম একটা সময় কেটে যায় তবে ভালোবাসা সারাজীবন থেকে যায়। আর ভালোবাসলে নিজের মনে মনেই তাকে নিয়ে সারাজীবন ভালো থাকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে যায়।”
নীলা বিজ্ঞ মানুষের মতো মাথা দুলিয়ে হুম বলল। আরশি মুগ্ধ হয়ে রৌদ্রর কথা গুলো শুনছিল। নিচ থেকে ডাক আসায় আরশির ঘোর ভাঙলো। একেক করে সবাই নিচে চলে যাচ্ছে। আরশি যেতে নিলেই রৌদ্র শক্ত করে তার হাত ধরে ফেলে।
———————
“হঠাৎ করে বাঘিনী থেকে কিউট শান্তশিষ্ট বিড়াল হয়ে গেলে কিভাবে?”
সিড়ি দিয়ে নামার সময় আচমকাই পেছন থেকে নির্বানের কন্ঠ শুনতে পেয় নীলা। নির্বানের কথায় থমকে দাঁড়ায়। পেছন ফিরে নম্রমুখে বলল-
“আমার আগের ব্যবহারের জন্য আমি আসলেই খুব লজ্জিত। তখন মেজাজ খারাপ ছিল কিন্তু এখন একদম ঠিক আছে তাই নিজের ভুল বুঝতে পারছি।”
নির্বান নীলাকে পাশ কেটে নিচে যেতে যেতে বলল-
“লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই। আমি কিন্তু বাঘিনী খুব ভয় পাই তবে বিড়াল খুব ভালো লাগে আমার।”
নীলা নির্বানের পেছন পেছন সিড়ি দিয়ে নামিছে। কিছুটা বিনয়ের স্বরে বলল-
“আচ্ছা তাহলে আমি আপনাকে একটা বিড়াল কিনে দিব।”
নির্বান নীলার দিকে তাকিয়ে একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল-
“বিড়ালটা যেন তোমার মতো হয়।”
কাসফিয়ার ভ্রু জোড়া কুচকে এলো। কপালে ভাজ পরেছে। নির্বানকে কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই নির্বান শব্দ করে হাসতে হাসতে ড্রয়িং রুমে চলে গেল। নীলা এখনো ভ্রু কুচকে নির্বানের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে। এই লোককে বিড়াল না বরং একটা মানসিক ডাক্তারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। ওনার মাথায় নিশ্চিত কোনো প্রব্লেম আছে। সব সময় কি সব উল্টাপাল্টা কথা বলে অদ্ভুত লোক। নীলা মনে মনে নির্বানকে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো।
———————
রৌদ্র আরশির হাত ধরে টেনে ছাদের এক কোণায় নিয়ে আসলো। আরশির হাত ছাড়ানো জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে। হাত ছাড়াতে না পেরে অসহায় মুখে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে বলল-
“এমন করছেন কেন! হাত ছাড়ুন আমার।”
রৌদ্রর সহজ উত্তর-
“নিজের ভালোবাসার বউয়ের হাত ধরেছি অন্য মেয়ের হাত তো আর ধরিনি।”
রৌদ্রর নির্লিপ্ত জবাব শুনে আরশি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে বলল-
“সবাইকে নিচে ডাকছে। আমাদের এখন যাওয়া উচিত।”
রৌদ্র আরশির একদম কাছে এগিয়ে আসলো। আরশির দু কাধে হাত রেখে শীতল কন্ঠে বললো-
“হুম যাবো কিন্তু তার আগে বলো তুমি আমাকে ভালোবাসো কি না! উত্তরটা অবশ্য তোমার ফ্রেন্ডের কাছে শুনেছি কিন্তু এখন তোমার মুখ থেকে সরাসরি শুনতে চাই।”
আরশি মাথা নিচু করে ফেলল। রৌদ্রকে এতোটা কাছে দেখে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার৷ গলায় মাঝেই যেন শ্বাস আটকে আসছে। লজ্জায় মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে তার। আরশি দু’হাত কচলানো শুরু করবে তখনই রৌদ্রর আরশির হাত ধরে ফেলে। আরশির অবস্থা দেখে রৌদ্র ঠোঁট চেপে হেসে শান্ত গলায় বলল-
“তোমার নিস্তব্ধতা, লজ্জায় নুয়ে পড়া এসব কিছুতেই তোমার উত্তর প্রকাশ পায় আরু। তুমি মুখ ফুটে কিছু না বলেও অনেক কিছু বলে দাও।”
রৌদ্র কথা গুলো বলেই আরশির হাত ধরে ছাদের দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল-
“নিচে চলো ভালোবাসা বউ। সবাই হয়তো আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে।”
আরশি চুপচাপ রৌদ্রর সাথে সিড়ি দিয়ে নেচে নেমে যাচ্ছে। নিচে আসতেই রৌদ্রর আরশির হাত ছেড়ে দিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো। আরশি ড্যাবড্যাব করে রৌদ্র দিকে তাকিয়ে আছে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই রৌদ্র ঝুঁকে আরশির মুখোমুখি হয়ে নিম্ন স্বরে বলল-
“অবশেষে রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী চিরকালের জন্য এসেই পরলো।”
রৌদ্র সোজা হয়ে দাঁড়ালো। আরশির মাথায় হাত বুলিয়ে কপালের কিছুটা উপরের চুল গুলোতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁয়ে দিল। আরশির চুল গুলো ঠিক করে দিয়েই ড্রয়িং রুমে চলে গেল। রৌদ্রর কাছে আরশি থ মেরে দাঁড়িয়ে আছে। আজ সব কিছু তার মাথার হাজার ফিট উপর দিয়ে যাচ্ছে। নীলের আকর্ষণ কাড়া ডাকে আরশির হুশ ফিরলো। দ্রুত ড্রয়িং রুমে চলে আসলো। সবাই সোফায় বসে আছে। আরশি আসতেই কথা বলা শুরু হলো। এতোক্ষন হয়তো আরশির জন্যই অপেক্ষা করছিল সবাই। রৌদ্র সোফায় বসে আরশির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটিয়ে হেসে যাচ্ছে। রৌদ্রর হাসি দেখে আরশি কাসফিয়ার আড়ালে যেয়ে দাঁড়ালো। কাসফিয়ার আব্বু গলা খেকরিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“আমরা সবাই মিলে ঠিক করেছি বিয়ের অনুষ্ঠান আগামী মাসের শুরুতেই হবে। আর রৌদ্র বাসা যেহেতু এখান থেকে দূরে তাই বিয়ের অনুষ্ঠান ঢাকাতেই হবে।”
আদিব হাসান বলল-
“হুম এই কয়দিনে তোমরা নিজেদের মার্কেট আর বিয়ের জন্য যা যা প্রয়োজন সব কিছু রেডি করে নিবে। আর বিয়ের তারিখ তোমরা ভেবেচিন্তে আমাদের জানিয়ে দিবে। তবে তারিখ যেন আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে-ই হয়।”
রৌদ্রর আব্বু বলল-
“বিয়ের অনুষ্ঠানের আগ পর্যন্ত তোমরা আগে যেমন ছিলে তেমনই থাকবে। আমরা সবাই কালকেই এখন থেকে চলে যাবো। এমাস শেষ হতে আর মাত্র পনেরো দিন বাকি। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে। তোমাদের কারও কোনো মতামত থাকলে আমাদের জানাতে পারো ”
রৌদ্র ভদ্রতার সাথে বলল-
“আমাদের কোনো মতামত নেই। তোমরা যা বলবে তা-ই হবে।”
আদিব হাসান সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল-
“আচ্ছা তাহলে এখন সবাই যাও ঘুমিয়ে পড়। ছেলেরা সবাই কাসফিদের বাসায় যাও। আর আরশি তোমরা নিজেদের রুমে যাও।”
সবাই মাথা নাড়িয়ে চুপচাপ নিজেদের মতো করে চলে গেল।
———————
“আচ্ছা কাসফি তোর কি মনে হয় ডক্টর রোদ সত্যি সত্যিই কখনো বাবা হতে পারবেন না?”
ঘুমের ঘোরে আচমকা আরশির প্রশ্ন শুনে কাসফিয়া ফটাফট চোখ মেলে তাকালো। সাথে সাথেই ঘুম বিদায় নিয়ে উড়ুউড়ু করে চলে গেল। আরশির প্রশ্নে কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পরলো কাসফিয়া। ঘাড় বাকিয়ে আরশির দিকে তাকালো। আরশি এখনো অন্য পাশ ফিরে শুয়ে আছে। কাসফিয়ার অন্য পাশেই নীলা বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। কাসফিয়া কিছুটা নেড়েচেড়ে ওঠে। নিজেকে সামলিয়ে সিরিয়াস কন্ঠে বলল-
“কেন! ভাইয়ার অক্ষমতার জন্য কি এখন ওনাকে বিয়ে করে তোর আফসোস হচ্ছে না-কি আশু!”
আরশি কাসফিয়ার দিকে ফিরে তাকালো। শক্ত গলায় বললো-
“আমি কি কখনো বলেছি না-কি এসব! আফসোস হবে কেন? আমি তো কখনো ওনার অক্ষমতা বা ব্যর্থতা নিয়ে ভেবেই দেখিনি।”
কাসফিয়া সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
“তাহলে আজ হঠাৎ করে এসব জিজ্ঞেস করছিস কেন?”
আরশি আবারও অন্য পাশ হয়ে শুয়ে পরলো। নির্লিপ্ত ভাবে উত্তর দিল-
“তেমন কিছু না। আমাদের দুজনেরই একই প্রব্লেম এই ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত লাগছে তাই একটু কৌতুহল ছিল মনে।”
“শোন আশু এসব নিয়ে এতো ভাবিস না। তোদের ভাগ্যে হয়তো এটাই লেখা ছিল। তোরা দুজনেই নিজেদের ব্যর্থ মনে করে তোদের জীবনে কাউকে জড়াতে চাসনি তাই হয়তো আল্লাহ তোদের দুজকেই মিলিয়ে দিয়েছে একে অপরের জন্য।”
আরশি একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলল-
“হুম.. আমাদের ভাগ্য একসাথেই লেখা ছিল। আচ্ছা এখন ঘুমা সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।”
কাসফিয়া হুম বলে চোখ বন্ধ করে ফেললো। কিন্তু আরশির চোখে আজ ঘুম নেই। মাথায় আজ সারাদিনের ঘটনা গুলোই ঘূর্ণিঝড়ের মতো ঘুরপাক খাচ্ছে। একদিনের মধ্যেই কি থেকে কি হয়ে গেল!! সব কিছু একটা সপ্নের মতো লাগছে। এটা যদি সপ্নই হয়ে থাকে তাহলে কখনো যেন এই সপ্ন না ভাঙে। আরশি কথা গুলো ভাবতে ভাবতে একটা সময় ঘুমিয়ে পরে।
চলবে…