রৌদ্রর শহরে রুদ্রাণী পর্ব-৪৭+৪৮

0
824

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৭
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“রুদ্রাণী..”

রৌদ্রর ডাকে আরশি ঘাড় বাকিয়ে পেছন ফিরে তাকায়। রৌদ্র বারান্দার দরজায় হেলান দিয়ে আরশির দিকে ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আরশির বারান্দার রেলিং-এ হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে৷ বাতাসের ঝাপটা এসে আরশির চুল গুলো উড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। গায়ে লালচে-হলুদের সংমিশ্রণে সুতি শাড়ি জড়ানো। হাতে লাল আর হলুদ রঙের অল্প কিছু কাচের চুড়ি। নাকে ছোট্ট এক পাথরের নাকফুল। রৌদ্র আরশির পাশে এসে বারান্দার রেলিং-এ হাত রেখে বলল-

“গল্প উপন্যাসে পড়েছি বিয়ের পর না-কি মেয়েদের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে যায় আজ তার প্রমাণ সরূপ তোমাকে দেখে ফেললাম। আজ তোমাকে একদম পারফেক্ট মিসেস ডক্টর লাগছে। বিয়ের অনেক দিন পাড় হয়ে গেলেও এতদিন তোমাকে প্রেয়সী হিসেবেই দেখেছি। তবে এই দু’দিন ধরে তোমাকে বউ বউ লাগছে। বউদের তোমার শাড়ি পড়া আমাকে স্মরণ করে দেয় তুমি আমার বউ। তোমার নাকের এই ছোট্ট জিনিসটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী। সকালের তোমার ঘুমন্ত মুখটা আমাকে মনে করিয়ে দেয় তুমি আমার ভালোবাসার জীবনসঙ্গিনী। এখন আমার প্রতি দিন শুরু হয় তোমার ঘুমন্ত চেহারা দেখে আর আমার নির্ঘুম রাত কাটে তোমার ঘুমন্ত মুখ দেখে।”

রৌদ্র কথায় আরশি মাথা নিচু করে ফেলে। আরশিকে লজ্জা পেতে দেখে রৌদ্র হাসলো। আরশির থেকে দৃষ্টি সরিয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলল-

“তোমার লজ্জা পাওয়াটা আমার বুকে তীরের মতো করে এসে আঘাত করে। তোমার এই লাজুকতা আমাকে বার বার ঘায়েল করে রুদ্রাণী। রোদের তীর্যক রশ্মির মতো ঝলসে দেয় আমার মনকে।”

রৌদ্রর কথা শুনে আরশির লজ্জার পরিমাণ আরও বেড়ে গেল। নিচের দিকে তাকিয়ে দু হাত কচলাচ্ছে। রৌদ্র আরশির হাত ধরে তার কিছুটা কাছে নিয়ে আসে। আরশির হাতটা নিজের মুঠোয় বন্দী করে নিয়ে বলল-

“এতো হাত কচলাতে হবে না। এখন বলো বারান্দায় একা একা কি করছিলে?”

আরশি একটা জোড়ালো শ্বাস ফেলে। নিজেকে স্বাভাবিক করে মাথা তুলে তাকিয়ে নিম্ন স্বরে বলল-

“কিছু না। এমনিতেই দাঁড়িয়ে ছিলাম।”

“কাল থেকে আমি হসপিটালে যাবো। আর তোমাকেও কাল থেকে পড়াশোনা শুরু করতে হবে।”

আরশি ভ্রু বাঁকিয়ে রৌদ্রর দিকে চেয়ে বলল-

“দু’দিন যেতে না যেতেই শুরু হয়েছে আপনার পড়া পড়া করে জ্ঞান দেওয়া!”

রৌদ্র সরু চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে বললো-

“আমার বউ হয়ে তুমি পড়াশোনাকে এতো ভয় পাও কীভাবে আরু! তুমি তো দেখছি খুব ফাঁকিবাজ একটা মেয়ে।”

রৌদ্রর কথায় ধপধপ করে আরশির মাথায় রাগের আগুন জ্বলে উঠলো। জ্বলন্ত চোখে রৌদ্রর দিকে তাকিয়ে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বলল-

“আপনি কিন্তু একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করছেন ডক্টর। আমাকে অপমান করছেন আপনি!”

রৌদ্র আরশির রাগকে কোনো পাত্তা না দিয়ে নির্লিপ্ততার সাথে বলল-

“আমি কোনো বাড়াবাড়ি করছি না মিসেস আরু। আমি একদম ঠিক বলেছি। প্রথম থেকেই দেখে আসছি আপনাকে পড়াশোনার কথা বললেই আপনার মাথা নষ্ট হয়ে যায়।”

রৌদ্রর কথায় যেন আরশির রাগ আরও দ্বিগুণ বেড়ে গেল। রৌদ্রর গাঁ জ্বালানো কথায় আরশি প্রচন্ড রেগে কিছু বলতে নিবে তার আগেই রৌদ্র হুট করেই আরশির ডান গালে নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। ছোট্ট করে একটা চুমু খেয়ে আবারও সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পরে। আরশি স্তব্ধ হয়ে আছে। আচমকাই রৌদ্রর এমন কাজে আরশি বরফের মতো জমে গেছে। তৎক্ষনাৎ একরাশ লজ্জা এসে আরশিকে আঁকড়ে ধরে। রৌদ্র মুচকি হেসে বলল-

“কাল তোমাকে ভার্সিটিতে নিয়ে যাবো। তুমি রাজি তো মিসেস আরু!!”

আরশি নিচের দিকে তাকিয়েই মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। রৌদ্র ঠোঁট চেপে হাসলো। কেউ আর কোনো কথা বলল না। নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরেছে তাদের দু’জনকে। চুপচাপ বারান্দায় দাঁড়িয়ে চন্দ্রবিলাস করছে রৌদ্র আর তার রুদ্রাণী।

————————

সকালে ঘুম থেকে উঠেই আরশি বরাবরের মতো পাশে তাকালো। কিন্তু আজ রৌদ্রকে পাশে দেখতে না পেয়ে আরশির উঠে বসলো। অগোছালো চুল গুলো হাত খোপা করে। বিছানা থেকে নেমে যায়। হঠাৎই বিছানার পাশের ছোট্ট টেবিলে একটা নীল রঙের কাগজ দেখতে পেল। আরশি কোতুহলবশত কাগজটা হাতে তুলে নেয়। বিস্ময় নিয়ে কাজগের ভাজ খুলতেই আরশির ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলো।

প্রিয় রুদ্রাণী,

অনেক দিন পর তোমাকে চিঠি লিখলাম। নিশ্চয়ই আমার চিঠির অপেক্ষায় ছিলে তা-ই না রুদ্রাণী! দুঃখিত ব্যস্ততার জন্য তোমাকে চিঠি লেখার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তবে এবার থেকে একদম ঠিকঠাক নিয়মিত চিঠি দিবো তোমার নামে। আসলে ভালোবাসার মানুষকে পাশে পেলে সব কিছুই একদম এলোমেলো হয়ে যায়। সময় যেন চোখের পলকের সাথেই চলে যায়। তাই আর কোনো কিছুর খেয়াল থাকে না। তবে আর যাইহোক রৌদ্র তার রুদ্রাণীকে নীল চিরকুট দেওয়া কখনো ভুলবে না। তুমি কি তোমার ভালোবাসার মানুষকে পেয়ে ভুলে যাবে আমাকে চিঠি লেখা??

[বিঃদ্রঃ চিঠির উত্তর খুব তাড়াতাড়ি চাই। তোমার চিঠির জন্য অপেক্ষা করা আমার জন্য খুবই কষ্টকর।]

ইতি
রৌদ্র

আরশি চিঠিটা পড়া শেষে হাসিমুখেই নীল চিরকুটটা ভাজ করে নিজের কাছে রেখে দেয়। রৌদ্র ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এসে চুল মুছতে মুছতে বলল-

“আরু তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও। আমাদের যেতে হবে।”

আরশি মাথা দুলিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। বেশ কিছুক্ষন পর দুজনে রেডি হয়ে রুম থেকে বের হয়। কাসফিয়া রেডি হয়ে সোফায় বসে ফোন টিপছে। রৌদ্র কাসফিকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“সরি কাসফিয়া আমাদের দেরি হয়ে গেল।”

কাসফিয়া ফোন থেকে নজর সরিয়ে গোমড়া মুখে বলল-

“আপনারা কাজটা একদমই ঠিক করেননি ভাইয়া।”

আরশি কাসফিয়ার কাছে এসে ভ্রু বাঁকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

“কেন আমরা কি করেছি?”

কাসফিয়া গম্ভীর গলায় বললো-

“কি করেছিস মানে! তুই আর দুলাভাই আমাকে এই ফ্ল্যাটে নিয়ে এসেছিস কেন? তোদের নতুন বিয়ে হয়েছে। আমি তোদের মাঝে কাবাবের হাড্ডি হয়ে থেকে কি করবো?”

আরশি সিরিয়াস হয়ে বলল-

“তাহলে কি তুই ওই ফ্ল্যাটে একা একা থাকবি না-কি!”

রৌদ্র আরশির কাছে এসে দাঁড়িয়ে গম্ভীরমুখে বলল-

“এতো বড় ফ্ল্যাটে একটা মেয়ে একা একা থাকবে এটা তোমার জন্য খুব বিপদজনক। আর আমিও সারাদিন হসপিটালে থাকবো আরুও এই বাসায় একা একা থাকবে। তার চেয়ে বরং তুমি এখানে থাকবে এটা তোমাদের দুজনের জন্যই ভালো।”

কাসফিয়া আর কথা বাড়ালো না। তাদের কথাই মেনে নেয়। নাস্তা করা শেষে রৌদ্র আরশি আর কাসফিয়াকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে। আরশি আর কাসফিয়াকে ভার্সিটিতে দিয়ে রৌদ্র হসপিটালে চলে যায়। নীল আরশিকে দেখে দুষ্টুমি করে বলল-

“বিবাহিত বেবি তোমার নতুন বিবাহিত জীবন কেমন কাটছে?”

আরশি কিছু না বলে একটা মুচকি হাসি দিয়ে নীলা আর নীলের মাঝে বসে পরে। হঠাৎই নীলের পিঠে সজোড়ে একটা থাপ্পড় মেরে আরশি ক্ষিপ্ত গলায় বলল-

“আসতে না আসতেই শুরু হয়েছে তোর হারামিগিরি।”

নীল ব্যথায় মৃদুস্বরে আর্তনাদ করে। ডান হাত পিঠে দিয়ে বলল-

“তুই আসলেই একটা শাকচুন্নি। কই নতুন বিয়ে হয়েছে সেই জন্য ট্রিট দিবি তা না করে উল্টো আমার মতো নিরীহ একটা ছেলেকে মারছিস। তোর কি আমার জন্য একটুও দয়ামায়া হয় না!!”

নীলের কথায় আরশি শব্দ করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতেই নীলাকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“নিলু তোর ভাই না-কি নিরীহ একটা ছেলে!!”

আরশি কথাটা বলেই আবারও হাসতে লাগলো। আরশির সাথে সাথে নীলা, কাসফিয়া আর আদ্রাফও হাসছে। নীল তাদের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে ধমকের স্বরে বলল-

“দাঁত কেলানো বন্ধ কর তোরা।”

নীলের কথা শুনে সবাই আরও বেশি করে হেসে ওঠে। হাসিঠাট্টার মাঝে হঠাৎ করেই আদ্রাফ বলল-

“দোস্ত আমি আমার আর কাসফির সম্পর্কের কথা বাসায় জানিয়ে দিয়েছি।”

আদ্রাফের কথায় সবাই থমকে যায়। হতভম্ব হয়ে আছে সবাই। নীলা নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আদ্রাফের দিকে। কাসফিয়া প্রচন্ড অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল-

“তুই আমাকে না জানিয়েই সব বলে দিলি আদ্রফ!! আর আমাদের সম্পর্কের কথা শুনে আংকেল আন্টিই বা কি বলেছেন?”

আদ্রাফ সহজ গলায় জবাব দিল-

“তেমন কিছু না। বলেছে আমাদের ফাইনাল এক্সাম শেষ হলেই তোর বাসায় কথা বলবে।”

আরশি আর নীল চুপ করে আছে। দুজনের মনেই চলছে নীলাকে নিয়ে হাজারো চিন্তা ভাবনা। নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে আদ্রাফ আর কাসফিয়াকে দেখে পরক্ষণেই মুচকি হাসি দিয়ে খুশিতে গদগদ করে বলল-

“তার মানে খুব শীগ্রই আমরা তোদের বিয়ে খাচ্ছি!”

আদ্রাফ কোনো উত্তর দিল না শুধু মাথা চুলকিয়ে হাল্কা হাসি দেয়। আরশি আর নীলের একে অপরের দিকে একবার চেয়ে নীলার দিকে তাকিয়েই মুচকি হাসি দেয়। মুহুর্তেই নিজেদের স্বাভাবিক করে নেয়। নীল আদ্রাফের কাধে হাত দিয়ে বলল-

“বাহ আশুর বিয়ে দেখে মনে হচ্ছে তোরও বিয়ে করার শখ জেগেছে আদ্রাফ!!”

আদ্রাফ বিরক্তি প্রকাশ করে বলল-

“আরে বিয়ের কথা বলিনি জাস্ট আমাদের সম্পর্কের কথা জানিয়েছি।”

আরশি দুষ্টুমি করে বলল-

“আচ্ছা তোকে কি এখন থেকে আমরা দুলাভাই ডাকবো না-কি কাসফি কে ভাবি ডাকবো!! আমি তো খুবই কনফিউজড।”

কাসফিয়া তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরশির দিকে তাকায়। সাথে সাথেই নীলা, আরশি আর নীল ঝংকার তুলে হেসে ওঠে। নীলা হাসছে প্রান খুলে। নীলে নিজেকে সামলিয়ে নিয়েছে এতদিনে। অন্য কারও ভালোবাসার মানুষকে সে নিজের মনে রাখতে চায় না। তাই আদ্রাফের জন্য জমিয়ে রাখা গচ্ছিত ভালোবাসা গুলো নীলা অনেক আগেই নিজের মনে দাফন করে দিয়েছে। মেনে নিয়েছে কাসফিয়া আর আদ্রাফের সম্পর্ক। বন্ধ করে দিয়েছে নীলার মনে ভালোবাসার দরজা।

——————————

হসপিটালে রোগী দেখার পর রৌদ্র আরশির সাথে কথা বলার জন্য পকেটে থেকে ফোন বের করতে নেয়। তখনই পকেটের মধ্যে একটা লাল রঙের চিরকুট পায়। রৌদ্র মুচকি হাসে চিরকুটটা দেখে।

প্রিয় রৌদ্র,

অসংখ্য ধন্যবাদ আমাকে মনে রাখার জন্য। আমি তো ভেবেছিলাম আপনি হয়তো আমাকে ভুলেই গেছেন। সত্যি বলতে আপনার নীল চিরকুটটাকে বড্ড মিস করছিলাম। চিঠির মাধ্যমেই তো ভালোবাসার মানুষকে পেয়েছি তাই কখনো চিঠি দেওয়ার কথা ভুলবো না।

[বিঃদ্রঃ রুদ্রাণী তার রৌদ্রকে কখনো কষ্টে মাঝে রাখে না। তাই তাড়াতাড়ি করেই চিঠির উত্তর দিয়ে দিলাম।]

ইতি,
রুদ্রাণী

চিঠিটা পড়ে রৌদ্রর মুখে তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠলো৷ ভালোবাসার মানুষকে নিজের করে পেয়ে রৌদ্র নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে সুখী মানুষ মনে হচ্ছে। তবুও মনের কোণে কিছুটা ভয় আর আক্ষেপ রয়েই গেছে। আরশিকে সত্যিই সকল সুখ দিতে পারবে কি না! আরশির মা ডাক শোনার ইচ্ছেটা পূরণ করতে পারবে তো!! যদি কখনো রৌদ্রর মিথ্যে কথা আরশি জেনে যায় তখন কি হবে!! রৌদ্র নিজের মনে নানানরকম চিন্তা ভাবনা করেই মলিন মুখে বসে রইলো।

চলবে….

#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৮
#Saiyara_Hossain_Kayanat

“আশু তুই তোর দেবর কে বলে আমার পেছনে যেন এভাবে সব সময় লেগে না থাকে।”

আরশিকে স্টেশনের একটা বেঞ্চিতে বসিয়ে রৌদ্র ফোনে কথা বলতে গেছে কিছুক্ষণ হলো। আরশি বসে বসে নীলদের জন্য অপেক্ষা করছিল তখনই নীলা এসে নাক মুখ কুচকে আরশিকে কথাটা বলল। আরশি ভ্রু কুচকে নীলার দিকে তাকালো। নীলার চোখে মুখে এক রাশ বিরক্তি। নীলা কথাটা বলার পরেই নির্বান নীলার পেছন থেকে অমায়িক একটা হাসি দিয়ে আরশির দিকে এগিয়ে আসে। খুব সুন্দর করেই শালীন কন্ঠে আরশিকে বলল-

“পাশের বারান্দা কেমন আছো তুমি?”

আরশি মুচকি হাসি বলল-

“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি কেমন আছেন নীড়?”

নির্বান আড় চোখে নীলার দিকে তাকিয়ে বলল-

“ভালো তো থাকতে চাই কিন্তু কেউ আমাকে ভালো থাকতে দেয় না গো ক্রাশ ভাবি।”

আরশি নির্বানের কথায় ঠোঁট চেপে হাসে। নীলা গাল ফুলিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল-

“আশু তুই কি ওনাকে কিছু বলবি!”

আরশি হাত দুটো আড়াআড়ি ভাবে ভাজ করে সিরিয়াস হয়ে জিজ্ঞেস করল-

“কেন কি হয়েছে নিলু?”

“কি হয়েছে তুই জানিস না! উনি সব সময় আমাকে এতো ক্ষেপায় কেন? মাত্রই দেখা হলো আর উনি সাথে সাথেই শুরু করে দিয়েছে আজে বাজে কথা বলা।”

নীলা নাক ফুলিয়ে কথা গুলো বলল। নির্বান নীলাকে ক্ষেপানোর জন্য আরশিকে বলল-

“দেখলে ভাবি এতো বড় মেয়ে কতো ন্যাকামি করে কথা বলে!! আমি ওকে কিছুই বলিনি ও সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে তোমাকে।”

“তোরা কেউ কারও থেকে কম না নির্বান।”

রৌদ্র পকেটে দুহাত গুজে দিয়ে নীলের সাথে আসতে আসতে কথাটা বলল। নীল হাসি মুখে আরশির পাশে এসে দাঁড়ায়। আরশির মাথায় আস্তে করে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল-

“কিরে বিবাহিত বেবি কেমন আছিস?”

আরশি নীলের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। নীলের পিঠে একটা থাপ্পড় দিয়ে বলল-

“তুই জীবনেও ভালো হবি না হারামি। তোকে না বলেছি আমাকে এই নামে ডাকতে না!!”

রৌদ্র তাদের ঝগড়া দেখে বিরক্ত হয়ে বলল-

“এই দুজন চুপ হতে না হতেই তোমরা দুজন শুরু করে দিলে! তোমরা এক এক জন এতোটা বিচ্ছু টাইপের হলে কি করে? মাঝ দিয়ে আমাকে পাগল বানিয়ে ছাড়বে তোমরা সবাই।”

রৌদ্রর কথা আরশির তার দিকে জ্বলন্ত চোখে তাকায়। আরশি কিছু বলার আগেই রৌদ্র কথা পাল্টিয়ে বলল-

“এখন তো নীল ওরা সবাই এসে পরেছে। চল এখন। দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

কথাটা বলেই রৌদ্র ল্যাগেজ নিয়ে ট্রেনের দিকে এগিয়ে যায়। নির্বান হাসি দিয়ে বলল-

“ক্রাশ ভাবি দেখলে তো ভাইয়া তোমাকে ভয় পেয়েছে।”

নির্বানের কথায় আরশি মুচকি হাসে। তারপর রৌদ্র পেছন পেছন আরশিরাও চলে যায়। রৌদ্র কেবিনে ল্যাগেজ রেখে কেবিনের বাহিরে চলে আসে। আরশিরা কেবিনের দরজার কাছে আসতেই আচমকা একটা দু-তিন বছরের বাচ্চা মেয়ে এসে আরশির পা জড়িয়ে ধরে। সাথে সাথেই আরশি থমকে দাঁড়িয়ে যায়। রৌদ্র আর নীল ওরা কৌতুহলী চোখে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে আছে। আরশি বাচ্চাটার দিকে ঝুঁকে মাথায় হাত রাখতেই বাচ্চাটা অস্পষ্ট ভাবে বলল-

“মাম্মা এসেছে। মাম্মা এসেছে।”

বাচ্চাটার মুখে মা ডাক শুনে আরশির অন্তর কেঁপে উঠল। স্তম্ভিত হয়ে যায় আরশি। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে তার। হঠাৎই সামনে থেকে একটা লোক এসে বাচ্চাটাকে আরশির কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বলল-

“সরি ম্যাম। আসলে ওর আম্মুও আপনার মতো শাড়ি পরে তো তাই আপনাকে ওর আম্মু ভেবেছে। সরি আপনাদের ডিস্টার্ব করার জন্য।”

রৌদ্র আরশির মলিন মুখের দিকে তাকাতেই বুক চিড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসলো। আরশির দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে নিয়ে মুখে হাসি টেনে নেয়। লোকটার কাধে হাত দিয়ে বলল-

“সমস্যা নেই বাচ্চা মানুষ ভুল হতেই পারে।”

রৌদ্র কথায় লোকটা সৌজন্যমূলক হাসি দেয়। বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে পাশের কেবিনে চলে যায়। আরশি এখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। নীল আরশিকে এভাবে চুপ থাকতে দেখে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে। মুখে হাসি টেনে আরশিকে হাল্কা ধাক্কা দিয়ে বলল-

“কিরে শাকচুন্নি এখানেই মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকবি না-কি! আমার পা ব্যথা করছে চল চল ভিতরে চল।”

নীলের ধাক্কায় আরশির স্তম্ভিত ফিরে। রৌদ্র দিকে এক পলক তাকিয়ে চুপচাপ কেবিনে ভেতর চলে আসে। নীল আর রৌদ্র একে অপরের দিকে তাকিয়ে জোরালো শ্বাস ফেলে। একে একে সবাই কেবিনে যেয়ে বসে পরে।

(সময়ের বহমান স্রোতের সাথে পালটে যায় অনেক যায় কিছু। আশেপাশের মানুষ, মানুষের অনুভূতি আর একে অপরের সাথে পুরনো সম্পর্ক সব কিছুই সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন হয়। সময়ের সাথে সব কিছু পরিবর্তন হওয়াই হয়তো সময়ের নীতি। এই দু’বছরে পরিবর্তন হয়েছে অনেক কিছু। খুব কাছের মানুষ গুলোর সাথেও দূরত্ব বেড়ে গেছে এই সময়ের পরিবর্তনে। ঠিক যেমনটা হয়েছে আরশিদের বন্ধুত্বে। ছোট্ট বেলার সেই কাছের ফ্রেন্ড কাসফিয়া যার সাথেই আরশির বেড়ে ওঠা। সেই মানুষটার সাথেও তৈরি হয়েছে দূরত্ব। দেখা হওয়া, কথা বলা সব কিছুই যেন এখন দুষ্কর হয়ে উঠেছে। কাসফিয়া এখন স্বামী আদ্রাফ আর তাদের অনাগত সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত। ফ্রেন্ড সার্কেলের সব থেকে হারামি, দুষ্টু ছেলে নীলও এখন মনোযোগ দিয়ে বাবার ব্যবসায় সারাদিন পাড় করে দিচ্ছে। সব থেকে আবেগী নীলা নিজের ভাঙাচোরা হৃদয়টাকে নিজ হাতেই জোড়া দিয়ে এখন পাথরের ন্যায় মজবুত করে তুলেছে। উড়নচণ্ডী নির্বানও এখন তার প্রেয়সীর ভালোবাসা পাওয়ার জন্য দিন রাত ছটফটিয়ে উঠে। সারাদিন হাসি মুখে মেয়েটাকে জ্বালাতন করলেও দিন শেষে অন্ধকারের মাঝে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। নির্বান জানে তার প্রেয়সী নিজের মনের দরজা বন্ধ করে রেখেছে তবুও দিনের আলো দেখা দিতেই যেন নতুন আশা নিয়ে ভালোবাসার সংগ্রামে নেমে পরে। সবার কাছে পরিচিত বীরপুরুষ যে কি-না সব পরিস্থিতিতেই নিজেকে স্বাভাবিক রাখে সেই বীরপুরুষটা-ও ভয়ে রাতের আঁধারে তার ঘুমন্ত রুদ্রাণীকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। ভালোবাসাকে পাওয়ার জন্য মিথ্যার আশ্রয় নিলেও এখন সেই মিথ্যাটাই দিন দিন রৌদ্রকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে। সময়ের সাথে সাথে যেন তার রুদ্রাণীকে হারিয়ে ফেলার ভয় তাকে চারদিক থেকে চোরাবালির মতো আঁকড়ে ধরছে। সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক হাসিখুশি রাখা আরশি এখন রাস্তাঘাটে ছোট ছোট বাচ্চা দেখলেই ভেতর ভেতর ডুকরে কেঁদে উঠে। মা ডাক শোনার জন্য ব্যকুল হয়ে যায়। এতো এতো পরিবর্তনের মাঝেও কিছু কিছু জিনিস পরিবর্তন হয়নি। রৌদ্র আর রুদ্রাণীর নিয়মিত চিঠি আদান-প্রদান কথা সেই আগেই মতোই রঙিন হয়ে আছে। রৌদ্র মুখে ভালোবাসার কথা শুনে আরশি এখনো লজ্জায় নুয়ে পরে, অস্বস্তিতে হাত কচলাতে থাকে। আর রৌদ্র!! সে তো এখনও তার রুদ্রাণীর লাজুকলতায় প্রতিবার ঘায়েল হয়। বদলায়নি নীলের দায়িত্ববোধ-ও। আরশি আর নীলার প্রতি তার দায়িত্বটা সে সব কিছুর উর্ধ্বে রেখেছে। হাজারো ব্যস্ততার মাঝে নীলাকে আগলে রাখতে ভোলেনি। প্রতিদিন এক বার হলে-ও আরশিকে ফোন দিয়ে ঝগড়া করা তার নিয়মমাফিক কাজের মধ্যেই পরে। প্রতি সপ্তাহে একবার নীলা আর আরশিকে নিয়ে ভার্সিটির পরিচিত দোকানে ফুচকা খাওয়া কখনো নীলের মিস হয়না। তিনজনের বন্ধুত্ব অটুট থাকলেও তার মাঝ থেকে হারিয়ে গেছে আদ্রাফ আর কাসফিয়া।)

আরশি মলিন মুখে ট্রেনের জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছে। বাচ্চাটার মুখে মা ডাক শোনার পর থেকেই কোথাও যেন হারিয়ে গেছে আরশির ধ্যান। আরশিকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে নীল পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে রৌদ্রকে উদ্দেশ্য করে বলল-

“ভাইয়া আপনি আমাদেরকে আপনার বাসায় নিয়ে যাচ্ছেন এটা মনে হয় আশুর পছন্দ হয়নি।”

নীলের কথায় আরশি আর রৌদ্র দু’জনেই ভ্রু কুচকে তার দিকে তাকালো। সবার ঈদের ছুটি থাকায় রৌদ্র আর আরশি দুজন মিলেই প্ল্যান করেছিল এবারের ঈদ রৌদ্রদের বাসায় কাটাবে। আর সাথে করে নীল, নীলা আর নির্বানকেও নিয়ে যাবে। রৌদ্র নীলের দিকে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

“এই কথা কেন বলছো নীল? আশু নিজেই তো খুব খুশি তোমাদের সাথে ছুটি কাটাবে বলে।”

নীল গোমড়া মুখ করে দু হাত ভাজ করে বলল-

“আশুকে দেখে তো মনে হচ্ছে না ও খুশি হয়েছে। আমরা আপনাদের দুজনের মাঝে এসে পরেছি বলেই হয়তো গাল ফুলিয়ে বসে আছে।”

নীলের কথায় আরশি ক্ষেপে ওঠে। রাগান্বিত চোখে নীলের দিকে তাকায়। সিট থেকে উঠে দাড়িয়ে নীলের চুলে টান দিয়ে আবারও নিজের সিটে বসে পরে। নীল মৃদুস্বরে চেচিয়ে ওঠে ব্যথায়। চুলে হাত বুলিয়ে মিনমিনিয়ে বলল-

“দেখলেন ভাইয়া সত্যি কথা বললেই দোষ।”

রোদ্র, নির্বান আর নীলা মিটমিটিয়ে হেসে যাচ্ছে আরশির নীলের ঝগড়া দেখে। আরশি রাগে গজগজ করে বলল-

“নীল একদম ফালতু কথা বলবি না বলে দিলাম। সব সময় দশ লাইন বেশি বোঝা বন্ধ কর।”

“তোর সাথে থেকেই তো দশ লাইন বেশি বোঝা শিখেছি তাই না রে নিলু?”

নীলের কথায় নীলা হকচকিয়ে উঠে। অপ্রস্তুত হয়ে বলল-

“দেখ নীল সব সময় তোরা নিজেদের ঝগড়ার মাঝে আমাকে ফাসিয়ে দিবি না বলে দিচ্ছি। তোরা দুজন তো ঠিকই থাকিস শেষে দেখা যায় আমাকেই বোকা বানিয়ে দিস তোরা।”

নীলার কথায় কেবিনের সবাই হো হো করে হেসে ওঠে। নির্বান হাসতে হাসতে নীলাকে বলল-

“বোকা মানুষকে আর কিভাবে বোকা বানাবে!!”

নির্বানের কথায় সবার হাসির পরিমান আরও বেরে যায়। নীলা সরু চোখে নির্বানের দিকে তাকালো। আরশিকে উদ্দেশ্য করে রাগী কন্ঠে বলল-

“আশু তুই কি তোর দেবরকে কিছু বলবি!!”

আরশি কোনো রকম নিজের হাসি চেপে রাখে। বড় বড় চোখ করে নির্বানের দিকে তাকিয়ে শাসনের সুরে বলল-

“নীড় আপনাকে কত বার বলবো সব সময় সবার সামনে সত্যি কথা বলতে হয়না।”

আরশি কথাটা বলেই ফিক করে হেসে দেয়। রৌদ্র মুগ্ধ হয়ে তার রুদ্রাণীর হাসি মুখ খানা দেখে যাচ্ছে। তোমার মলিন মুখটা আমাকে বড্ড কষ্ট দেয় রুদ্রাণী। বার বার মনে হয় আমি হয়তো তোমার ইচ্ছে পূরণে ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি আরু। আমি তোমার মুখে সব সময় হাসি দেখতে চাই। তোমার হাসির জন্য এই রৌদ্র সব কিছু করতে রাজি। রৌদ্র মনে মনে কথা গুলো ভেবেই একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে।

চলবে…

(আজকের পর্বটা অগোছালো হয়েছে দুঃখিত। সবাইকে ধন্যবাদ আর ভালোবাসা।❤️❤️)