#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৪৯
#Saiyara_Hossain_Kayanat
“নিলু তুই কি ইচ্ছে করেই নীড় ভাইয়াকে কষ্ট দিচ্ছিস? তুই কেন ওনাকে মেনে নিচ্ছিস না নিলু!”
আরশির কথায় নীলার মধ্যে কোনো ভাবান্তর হলো না। সে আগের মতোই বইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। নীলার এমন নির্লিপ্ততা দেখে আরশির কপাল কুচকে এলো। ট্রেনের জানালা দিয়ে দূরের দোকানে বসে চা খেতে থাকা রৌদ্র, নির্বান আর নীলের দিকে তাকালো। একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে নীলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল-
“নিলু যা চলে গেছে সেটা নিয়ে শুধু শুধু নিজেকে কষ্ট দিস না। এভাবে আর কতদিন একা একা থাকবি? আদ্রাফকে ভালোবেসে তো কষ্ট ছাড়া কিছুই পাসনি। এবার না হয় অন্য কাওকে সুযোগ দে তোকে ভালোবেসে আগলে রাখার জন্য। আর কেউ না বুঝুক তুই তো বুঝিস ভালোবাসার মানুষকে না পাওয়ার কষ্ট কেমন হয়! তুই কি করে সেই একই কষ্ট আরেকজনকে দিতে চাচ্ছিস? মনে রাখিস একটা মানুষ সব সময় হাসিখুশি থাকে তার মানে এই না যে মানুষটার মধ্যে কষ্ট নেই। যাইহোক জীবনটা খুব সুন্দর যদি তুই সেটা সুন্দর করে গুছিয়ে নিতে পারিস। যে তোকে সত্যিই ভালোবেসে আগলে রাখতে চায় তার কাছেই নিজেকে আত্মসমর্পণ করবি অন্য কারও কাছে না।”
আরশির কথা গুলো বেশ মনোযোগ দিয়ে শুনলো নীলা। মনে হচ্ছে কোনো এক ভাবনার জগতে নিজের মনটা’কে হারিয়ে ফেলেছে। নীলা আর কোনো কথা বলেনি। সে এখন গভীর চিন্তায় মগ্ন। তার পুরো মাথা জুরেই এখন নির্বানের ভাবনা হস্তক্ষেপ কিরে নিয়েছে।
———————
রৌদদের বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে প্রায় বিকেল হয়ে যায়। বাসায় এসেই সবার সাথে কুশল বিনিময় করে সাবাই নিজেদের রুমে চলে যায়। কিন্তু আরশি তার শ্বাশুড়ির সাথে আড্ডায় মেতে উঠেছে। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যায় তবুও আরশি নিজেদের রুমে আসে না। সবার রাতে খাবার শেষে আবারও শ্বাশুড়ির সাথে আড্ডায় বসে যায়। রাত প্রায় দশটায় আরশি নিজের রুমে আসে। রৌদ্র সোফায় বসে ল্যাপটপ নিয়ে ব্যস্ত। আরশি রৌদ্রর দিকে একবার তাকিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে যায়। চুল গুলোতে চিরুনী দিয়ে আঁচড়াতে আঁচড়াতে বলল-
“আপনি এখনো ঘুমাননি কেন? ল্যাপটপ নিয়ে কি করছেন এই সময়?”
আরশির কথায় রৌদ্র কোনো প্রতিক্রিয়া করলো না। সে আগের মতোই নিজের কাজে ব্যস্ত। আরশি কিছুটা ভ্রু কুচকে আবারও জিজ্ঞেস করলো-
“কি হলো কথা বলছেন না কেন আপনি?”
আরশির কথায় রৌদ্র মাথা তুলে আরশির দিকে তাকায়। আরশির নিজের চুল আঁচড়াতে ব্যস্ত এখনো। রৌদ্র নুখে গম্ভীর্যতা এনে বলল-
“এতক্ষণে আমাকে আপনার মনে পরলো মিসেস আরু? আমি তো ভেবেছিলাম আপনি ভুলে গিয়েছিলেন আপনার হাসবেন্ডের কথা।”
আরশি আয়নার মধ্যেই রৌদ্রর দিকে ভ্রু বাঁকিয়ে তাকালো। চুল গুলো হাত খোঁপা করে বিছানায় পা দুলিয়ে বসে জিজ্ঞেস করল-
“এসব কথা বলছেন কেন? আবার কি নিয়ে রাগ করেছেন আমার উপর যে তুমি থেকে আপনিতে চলে এসেছেন?”
রৌদ্র ল্যাপটপটা বন্ধ করে সোফায় কাছের টেবিলের উপর রাখলো। ডানহাতের আঙুল দিয়ে চুল গুলো পেছনে ঢেলে দেয়। গম্ভীর্যতার সাথে সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। আরশির দিকে এগিয়ে এসে গম্ভীরমুখে বলল-
“এখানে আসার পর একবারও কি আপনি আমার কাছে এসেছেন মিসেস আরু?”
আরশি হাল্কা হাসলো। এবার সে বুঝতে সক্ষম হয়েছে তার রৌদ্র কেন গোমড়া মুখে বসে আছে। আরশি মুচকি হেসে রৌদ্র মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। শান্ত গলায় বলল-
“আমরা তো এখানেই এসেছি বিকেলে। আম্মুর সাথে গল্প করতে করতে কখন যে রাত হয়ে গেছে খেয়াল করিনি। আর আপনার সাথে তো খাবার টেবিলে দেখা হয়েছিলো।”
রৌদ্র বিরক্তি প্রকাশ করে শক্ত গলায় বলল-
“খাবার টেবিলে একবারও আমার দিকে ফিরে তাকিয়েছেন বলে তো আমার মনে হচ্ছে না।”
আরশি সরু চোখে রৌদ্রর দিকে তাকালো। নাক ফুলিয়ে রাগী কন্ঠে বলল-
“এবার কিন্তু আপনি শুধু শুধুই রাগ দেখাচ্ছেন। এখানে বেড়াতে এসে কি সারাক্ষণ আপনাকে নিয়েই বসে থাকবো না-কি! অদ্ভুত!”
“মিসেস আরু আপনি দেখছি নিজে ভুল করে এখন উল্টো আমাকেই ধমকাচ্ছেন!”
রৌদ্রর এমন কাঠাকাঠ গলা শুনে আরশি হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে। রৌদ্রর অভিমান এতো সহজে ভাঙবে সেটা আরশি খুব ভালো করেই জানে। আরশি নিরাশ হয়ে আবারও বিছানায় বসে পরে। হতাশার সুর তুলে বলল-
“আচ্ছা এখন বলুন কি করতে হবে! কি করলে আপনার রাগ কমবে?”
রৌদ্র গম্ভীর গলায় বলল-
“বারান্দায় যাও আমি কফি নিয়ে আসছি।”
“আজ আকাশে চাঁদ নেই তাই চন্দ্রবিলাস করা যাবেনা। তাই শুধু শুধু বারান্দায় যেতে হবে না।”
রৌদ্র কথার সাথে সাথেই আরশি ফটাফট করে কথা গুলো বলে উঠলো। এটা রৌদ্র নিয়মিত কাজ। দু-এক দিন পর পর বারান্দায় চন্দ্রবিলাস আর বৃষ্টিবিলাস করা মাঝে মাঝে তো কোনো কারন ছাড়াই আরশিকে নিয়ে বারান্দায় অনায়াসে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দেয়। আরশির কথায় রৌদ্রর ভ্রু জোড়া আগের থেকেও খানিকটা কুচকে গেল। জোড়ালো শ্বাস ফেলে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল-
“তুমি আমার পাশে থাকলে আকাশে চাঁদ তারা কিছুই থাকা লাগবে না রুদ্রাণী। তোমাকে নিয়ে শুধু অন্ধকার বিলাস করেও আমি ধন্য।”
রৌদ্র চলে গেল। আরশি এখনো রৌদ্র যাওয়ার পানে স্থির নয়নে তাকিয়ে আছে। হঠাৎই রৌদ্রর কথা ভেবে আরশি আনমনেই হেসে দেয়।
————————
অন্ধকারাচ্ছন্ন আকাশের পানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে নীলা। ছাদের এক কোণে রেলিঙের উপর হাত রেখে গভীর ভাবনায় ডুব দিয়েছে। আরশির বলা কথা গুলো তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। কোনো মতেই নির্বান বের হচ্ছে না নীলার মাথা থেকে।
“নিলু এখানে একা একা কি করছিস এই সময়?”
নীলের কন্ঠে নীলা পেছন ফিরে তার দিকে তাকায়। শান্ত গলায় বলল-
“কিছু না এমনিতেই এসেছি ঘুম আসছে না তাই।”
নীল নীলার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল-
“আমি জানি কেন তোর ঘুম হচ্ছে না। মাথায় এতো চাপ দিস না। নিজের মন যা বলে তা-ই করিস। সঠিক মানুষের কাছে একবার নিজেকে ধরা দিয়ে দেখ হয়তো সারাজীবন ভালোবাসা দিয়ে জড়িয়ে রাখবে।”
নীলা নিচের দিকে তাকিয়ে চুপ করে আছে। হঠাৎই নীলের ফোন বেজে উঠে। নীল ফোনের স্ক্রিনে তাকাতেই মুচকি হাসিতে তার ঠোঁট হাল্কা প্রসারিত হয়ে গেল। নীলার দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক ভাবে বলল-
“তুই দাঁড়া অফিস থেকে কল এসেছে। আমি কথা বলে আসি।”
নীলা মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ জানাতেই নীল ছাদের অন্য কোণায় চলে গেল। ফোন কানে দিয়ে মুচকি হেসে হেসে কথা বলছে নীল। নীলা আগের মতোই আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ নির্বান ওদেরকে খুঁজতে খুঁজতে ছাদে চলে আসে। নীলাকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছাদের মাঝে এসে বলল-
“ঠকঠক.. একটু দরজাটা খুলবে নীলা?”
নির্বানের উদ্ভট কথায় নীলা ভ্রু বাঁকিয়ে নির্বাকের দিকে তাকালো। আবছায়া আলোয় নির্বানের চোখ গুলো জ্বলজ্বল করছে। চুল গুলো সব সময়ের মতোই অগোছালো। চোখের বড়বড় পাপড়ি গুলো একটু পর পর পলক ফেলছে। নীলা নিজেকে সামলিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিছুটা সন্দেহের গলায় বলল-
“ছাদের মাঝখানে কি আপনি দরজা দেখতে পাচ্ছেন না-কি?”
নির্বান নীলার দিকে এসে ফিসফিস কিরে বলল-
“ছাদের মাঝে দরজা না থাকলেও তোমার মনের মাঝে তো দরজা আছে সেটাই না হয় একটু খুলে দাও।”
নীলা প্রতিত্তোরে কিছু বলল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে নীল তাদের দু’জনকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আবারও নিজের মতো করে ফোনে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে পরে।
————————
রৌদ্র মা কফির মগ দুটো রৌদ্রর হাতে দিতেই রৌদ্র মগ গুলো টেবিলে উপর রেখে দেয়। পকেট থেকে ওষুধের পাতা বের করে কফির একটা মগে ওষুধ মিলিয়ে দেয়। রৌদ্র মা প্রচন্ড অবাক হয়ে তার ছেলের কর্মকাণ্ড দেখছে। অতিমাত্রায় উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন রৌদ্রকে-
“রৌদ্র এসব কি করছিস? কিসের ওষুধ মিশিয়ে দিলি কফিতে?”
রৌদ্র কফির মগে চামচ নাড়তে নাড়তে শান্ত গলায় বলল-
“ট্রেনে একটা বাচ্চা ভুলে আরুকে মা ডেকেছিল। তারপর থেকেই আরুর মুড অফ। তাই আমি বাসায় এসে আমাদের হসপিটালের ডক্টরের সাথে আরুর ব্যাপারে আবারও কথা বলেছি। উনিই বলেছেন এই ওষুধটা আরুকে খাওয়ানোর কথা। আরুকে সরাসরি তো দিতে পারবো না তাই কফিতে মিলিয়ে দিচ্ছি।”
রৌদ্র মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন-
“এসব করার কি দরকার রৌদ্র? এমন তো না যে বাচ্চা না হওয়াতে আমরা আরশিকে অবহেলা করছি। তাহলে কেন তুই আরশিকে নিয়ে এতো চিন্তা করছিস?”
রৌদ্র তার মা’র দু কাধে হাত রেখে বলল-
“এসব আমি বাচ্চার জন্য বা আমাদের জন্য করছি না মা। এসব কিছু আমি আরুর ইচ্ছে-পূরণ করার জন্য করছি। আরুকে সম্পূর্ণ খুশি দিতেই এসব করছি। রাস্তাঘাটে বাচ্চা দেখলে আরুর চোখেমুখে কষ্টের ছাপ আমি স্পষ্ট দেখতে পাই। আরুর এই কষ্ট আমার আর সহ্য হচ্ছে না। ওর মলিন মুখ দেখলে আমার মনে হয় আমি আরুকে ভালো রাখতে পারছি না। আমি ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছি আরুকে সুখে রাখতে।”
রৌদ্রর মা রৌদ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল-
“এসব নিয়ে ভাবিস না রৌদ্র। আল্লাহর উপর ভরসা রাখ সব ঠিক হয়ে যাবে।”
রৌদ্র মাথা নাড়ালো। কফির মগ হাতে নিয়ে তার মা’র উদ্দেশ্যে বলল-
“মা আমি যাচ্ছি এখন আর ওষুধের কথা কিন্তু….”
রৌদ্র পেছন ফিরে আরশিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই রৌদ্র থেমে যায়। থমকে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র। মনের মধ্যে ভয়ংকর রকমের ভয় এসে ঝেঁকে বসেছে। আরশিকে হারিয়ে ফেলার ভয়। রৌদ্র স্থির চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে।
চলবে…
#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৫০
#Saiyara_Hossain_Kayanat
“কিসের ঔষধের কথা বলছেন আপনারা?”
রৌদ্র আরশিকে দেখে স্তব্ধ হয়ে হয়েছে। তার মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। রৌদ্র মা কিছুটা ইতস্ততবোধ করছে। আরশি রান্নাঘরে ভিতরে এসে রৌদ্র সামনে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল-
“কেউ কি অসুস্থ রোদ? কার ওষুধের কথা বললেন আপনি এই মাত্র!”
আরশির কথায় রৌদ্র একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। আরশি রৌদ্র কথা বেশি কিছু শুনতে পায়নি। আরশি ফ্যালফ্যাল করে রৌদ্র দিকে তাকিয়ে তার প্রশ্নের প্রতিত্তোরের অপেক্ষা করছে। রৌদ্র নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে ছোট্ট করে একটা শ্বাস ফেলে বলল-
“কারও কিছু হয়নি। এমনি মা’কে কিছু ভিটামিনের ঔষধ খাওয়ার কথা বলেছি।”
রৌদ্র কথার সাথে সাথেই রৌদ্র মা আরশির দিকে এগিয়ে এসে বলল-
“হ্যাঁ আমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছি তো তাই আমাকে নিয়ে রৌদ্রর চিন্তা বেড়ে যাচ্ছে।”
আরশি তাদের দিকে কিছুক্ষন ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থেকে ভ্রুক্ষেপহীন ভাবে বলল-
“এসব কি বলছো মামুনি! তোমাকে তো এখনো যুবতী মেয়েদের মতোই দেখা যায়। তবে আমার মাঝে মাঝে মনে হয় তোমার ছেলেই বুড়ো হয়ে গেছে।”
রৌদ্রর মা আরশির কথায় হেসে ওঠে। রৌদ্র তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আরশির দিকে তাকালো। দাঁতে দাঁত চেপে শক্ত গলায় বলল-
“আমাকে বুড়ো মনে হয় আপনার কাছে?”
আরশি হাসি দিয়ে সম্মতিসূচক মাথা নাড়ালো। সাথে সাথেই রৌদ্রর মা আর আরশি সশব্দে হেসে দেয়। রৌদ্র গম্ভীর গলায় বলল-
“আপনি এখানে এসেছেন কেন? আমি তো আপনাকে বারান্দায় থাকতে বলেছিলাম মিসেস আরু।”
আরশি কোনো কথা বলল না। রৌদ্রর মা’র কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল-
“তোমার ছেলে এমন গোমড়ামুখো কেন গো মামুনি? তুমি কি ওনাকে ছোট বেলা তিতা করলা খাইয়েছিলে না-কি!!”
“মধু খাইয়েছিলাম কিন্তু লাভ হয়নি। একদম বাপের মতো হয়েছে তাই এই অবস্থা।”
রৌদ্রর মা’র কথা শুনে আরশি ফিক করে হেসে দেয়। রৌদ্র তাদের দু’জনের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলল-
“কানে কানে কথা বললে এমনভাবে বলবে যেন পাশের জন শুনতে না পায়। আমি আব্বুর মতো হয়েছি কি-না সেটা কাল সকালেই আব্বুকে জিজ্ঞেস করে নিবো ঠিক আছে মা!! আর মিসেস আরু আপনাকে তো আমি পরে দেখে নিবো।”
রৌদ্র গজগজ করে কথা গুলো বলেই হনহনিয়ে চলে গেল। রৌদ্রর মা আর আরশি একে অপরের দিকে কিছুক্ষন অসহায় মুখে তাকিয়ে থেকে হুট করেই হেসে দেয়। রৌদ্রর মা হাসি থামিয়ে বললেন-
“এখন রুমে যা না হলে রৌদ্র আরও রেগে যাবে।”
আরশি মাথা নাড়িয়ে রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। দরজার কাছে এসে বড় করে এক শ্বাস টেনে বুকে সাহস জুগিয়ে রুমের ভিতর প্রবেশ করলো। পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে রৌদ্রকে দেখতে না পেয়ে আরশি বারান্দায় চলে যায়। রৌদ্র এক হাতে কফির মগ নিয়ে রেলিঙের উপর হাতের ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাশের টি টেবিলের উপর একটা কফির মগ রাখা। আরশি হাসি দিয়ে রৌদ্র পাশে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল-
“কি করছেন ডক্টর?”
“বৃষ্টিবিলাস করছি।”
রৌদ্র ত্যাড়া কথায় আরশির ভ্রু বাঁকিয়ে তার দিকে তাকালো। সন্দিহান কন্ঠে বললো-
“কিন্তু বৃষ্টি তো হচ্ছে না।”
“মনে মনে বৃষ্টিবিলাস করছি।”
রৌদ্র শক্ত গলায় উত্তর দিল। আরশি অসহায় কন্ঠে বললো-
“আপনি রেগে আছেন আমার উপর? আমি তো মজা করছিলাম রোদ।”
রৌদ্র মগের বাকিটুকু কফি বারান্দায় দিয়ে নিচে ফেলে দেয়। টেবিলের উপর মগটা রেখে দিয়ে আরশির দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। আরশির দিকে এগিয়ে আসতে আসতে গম্ভীর্যতার সাথে জিজ্ঞেস করল-
“আমি বুড়ো হয়ে গেছি?”
আরশি কিছুটা পেছনে গিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিলে। দ্রুত ডানে বামে মাথা নাড়িয়ে না জানালো। রৌদ্র আবারও জিজ্ঞেস করল-
“আমি গোমড়ামুখো? আমাকে ছোট বেলা তিতা করলা খেয়ে বড় করেছে?”
আরশি আবার মাথা নাড়িয়ে না জানালো। রৌদ্র এবার ধমকের স্বরে বলল-
“এখন মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না কেন? তখন তো খুব বক বক করছিলেন আম্মুর সামনে। মাথা না নাড়িয়ে মুখ দিয়ে উত্তর দিন।”
আরশি খানিকটা সময় চুপ থেকে কিছু একটা ভেবে আচমকাই রৌদ্র ডান গালে টুপ করে কিস করে বসে৷ রৌদ্র হতভম্ব হয়ে ডান গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো বিস্ময়ে গোলাকার ধরন করেছে। আরশি বিশ্বজয়ী একটা হাসি দিয়ে চেয়ারে বসে পরে। কফির মগ তুলে এক চুমুক খেয়ে গলা খেকরিয়ে বলল-
“রোদ আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
আরশির কথায় রৌদ্রর ঘোর কাটে। বিস্ফোরিত চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“তুমি আমাকে নিজের ইচ্ছায় কিস করলে রুদ্রাণী! দু’বছরে এই প্রথম তুমি নিজের ইচ্ছায় কোনো দ্বিধাবোধ, লজ্জা, অস্বস্তি ছাড়াই আমাকে কিস করলে?”
আরশি কিছু বলল না। ঠোঁটে এক একটা রহস্যময় হাসি ফুটে উঠেছে আরশির। চুপচাপ কফি খেতে লাগলো। রৌদ আরশির পাশে চেয়ার টেনে বসে কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলল-
“কি হলো এমন অদ্ভুত রকমের আচরণ করছো কেন হঠাৎ করে! কি হয়েছে তোমার?”
আরশি এবার খিলখিল করে হেসে দেয়। কফি মগ রেখে দিয়ে বলল-
“আপনার কাছ থেকেই এসব শিখেছি। আমি রেগে গেলেও আপনি হুটহাট এমন অদ্ভুত আচরণ করেন। তখন আমারও একই অবস্থা হয়। তাই আপনার আইডিয়া আপনার উপরেই কাজে লাগাম।”
রৌদ্র চোখ দুটো ছোট ছোট করে আরশির দিকে তাকালো। সন্দিহান কন্ঠে বলল-
“দিন দিন খুব বেশি চালাক হয়ে যাচ্ছো তুমি। আমাকে কপি করা শুরু করেছো!”
আরশি চেয়ারে হেলান দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল-
“ডক্টর রোদের বউ হয়ে চালাক না হলে কি চলে না-কি!”
আরশি কথাটা বলেই হেসে দেয়। রৌদ্রও তার সাথে তাল মিলিয়ে হেসে যাচ্ছে। এভাবেই এক সাথে বসে অন্ধকার বিলাস করছে রৌদ্র আর তার রুদ্রাণী। রৌদ্র মুগ্ধ নয়নে তার রুদ্রাণীর হাসি মুখ উপভোগ করছে। এ যেন কোনো অন্ধকার বিলাস নয় ভালোবাসাময় এক রঙিন মুহুর্ত।
——————————
“ঈদ মোবারক আদ্রাফ। কেমন আছিস?”
ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে আদ্রাফ বলল-
“ঈদ মোবারক আশু। আমরা ভালো আছি তোরা সবাই কেমন আছিস? আর ছুটি কেমন কাটাচ্ছিস তোরা সবাই?”
আরশি একটা মলিন হাসি দিয়ে বলল-
“এই তো ভালোই তবে তোরা থাকলে আরও বেশি মজা হতো।”
“ধুর গাধী আমাদের নিয়ে মন খারাপ করিস না। তোরা আসলে অন্য একদিন সবাই দেখা করবো। এই নে কাসফির সাথে কথা বল।”
আদ্রাফ কাসফিয়ার কাছে ফোন দিতেই কাসফিয়া মুচকি হেসে বলল-
“ঈদ মোবারক আশু। ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা।”
“হুম তোকেও ঈদের অনেক অনেক শুভেচ্ছা। কি অবস্থা তোর?”
কাসফিয়া ছোট্ট করে উত্তর দিল-
“ভালো।”
আরশি কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তেজনা নিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“আমাদের পুচকির কি অবস্থা? কতটুকু বড় হয়েছে? এখন কি নড়াচড়া করে? আচ্ছা তুই না হয় তোর একটা ছবি তুলে দে দেখি তুই কতটা মোটা হয়েছিস, তোর পেট বড় হয়েছে কি-না!”
আরশির এতগুলো প্রশ্নের জবাবে কাসফিয়া সহজ গলায় বলল-
“আশু মাত্র চার মাসে এতো কিছু বোঝা যায় না।”
আরশি হতাশ হলো। জোড়ালো শ্বাস ফেলে বলল-
“ওহ”
কাসফিয়া আর কোনো কথা বাড়ালো না। ব্যস্ততার তাড়া দেখিয়ে বলল-
“আশু এখন রাখছি একটু কাজ আছে। দুলাভাই আর বাকি সবাইকে আমার পক্ষ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে দিস।”
আরশির কথার কোনো অপেক্ষা না করেই কাসফিয়া ফোন কেটে দিল। আরশি ফোনটা কানের কাছ থেকে সামনে এনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। আরশি জানে কাসফিয়া মিথ্যা বাহানা দেখিয়েই ফোন কেটে দিয়েছে। আচমকাই রৌদ্র বারান্দায় এসে আরশিকে জড়িয়ে ধরলো। আরশি হকচকিয়ে উঠলো। উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করল-
“কি হলো হঠাৎ করে এসে জড়িয়ে ধরলেন কেন?”
রৌদ্র কিছু বলল না। আগের থেকেও শক্ত করে নিজের সাথে মিশিয়ে নিল আরশিকে। আরশি রৌদ্র পিঠে হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন-
“মসজিদ থেকে কখন এসেছেন?”
রৌদ্র শান্ত গলায় বললো-
“কিছুক্ষন আগেই এসেছি যখন ফোনে কথা বলছিলে।”
আরশির আর বুঝতে বাকি রইলো না রৌদ্র কেন তাকে এভাবে জড়িয়ে ধরেছে। আরশি হাল্কা হাসি দিয়ে বলল-
“আমি ঠিক আছি রোদ। ছাড়ুন এখন।”
রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে দিল। আরশি রৌদ্রর দিকে তাকালো। রৌদ্রর ফর্সা ত্বকে নীল পাঞ্জাবিটা একদম ফুটে উঠেছে। বাদামী বর্ণের চোখ গুলোতে এক আকাশ সমান ভালোবাসা প্রকাশ পাচ্ছে। রৌদ্র দু হাত ভাজ করে শান্ত গলায় বলল-
“বিকেলে আমরা সবাই ঘুরতে যাবো রেডি থেকো।”
আরশি মুচকি হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লো।
————————
বিকেলে সবাই একসাথে নদীর পাড়ে ঘুরতে বেড়িয়েছে। নীল কিছুটা দূরে ফোনে হেসে হেসে কথা বলতে ব্যস্ত। নির্বান বার বার নীলার সাথে কথা বলার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু নীলা আরশির সাথে হেসে হেসে কথা বলছে আর সামনে সামনে হাঁটছে। নির্বান রৌদ্র দিকে অসহায় মুখে তাকাতেই রৌদ্র চোখের ইশারায় নির্বানকে আস্বস্ত করে। দ্রুত পায়ে হেঁটে আরশির কাছে এসে হাত ধরে নীলার উদ্দেশ্যে বলল-
“শালিকা আমি আমার ভালোবাসার বউকে কিছুক্ষনের জন্য ধার নিচ্ছি।”
নীলা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। রৌদ্র আরশির হাত ধরে দূরে নিয়ে যাচ্ছে। নির্বান রৌদ্রর উদ্দেশ্যে কিছুটা চেচিয়ে বলল-
“ভাই পাশের বারান্দাকে দেখে রেখো।”
রৌদ্র মুচকি হাসে। আরশি ভ্রু কুচকে ফেলে রৌদ্রর এমন কাজে। নীলাও হতবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। নির্বান নীলার পাশে এসে শান্ত গলায় বলল-
“তোমার সাথে আমার কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কথা আছে নীলা।”
নীলা নির্বানের দিকে না তাকিয়েই বলল-
“হুম বলুন শুনছি।”
নির্বান ছোট্ট করে শ্বাস ফেলে। নীলার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে শীতল কন্ঠে বলল-
“প্রায় দু’বছর হয়েছে গেছে আমি তোমার পেছনে লেগে আছি, তোমাকে রাজি করানোর চেষ্টা করছি। আমি জানি কেন তুমি রাজি হতে চাইছো না। কেন তুমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছো ভালোবাসা থেকে।”
নির্বানের কথায় নীলা চমকে তার দিকে বিস্মিত দৃষ্টিতে তাকালো।
“ক্রাশ ভাবিদের বাসায় প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম তখনই আমি তোমার চোখে আদ্রাফের জন্য ভালোবাসা দেখেছি। ভালোবাসা না পাওয়ার কষ্ট দেখেছি তোমার ওই সিক্ত চোখে। তখনই আমি ভেবে নিয়েছিলাম আমি তোমাকে যে করেই হোক নিজের করে ছাড়বো। একটা মেয়ে যে কিনা একজনকে ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা না বরং কষ্ট পেয়েও এতোটা গভীরভাবে সেই মানুষটাকে ভালোবেসে গেছে। সেই মেয়েটাকে যদি একটু ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখতে পারি তাহলে নিশ্চয়ই তার দ্বিগুণ ভালোবাসা আমাকে ফিরিয়ে দিবে তাই না!! আমি অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু তোমার মন গলাতে পারিনি। তাই আজ সরাসরি বলতে বাধ্য হলাম। আজ শেষ বারের মতো বলছি। আজ যদি রাজি না হও তাহলে আর কখনো তোমাকে ডিস্টার্ব করবো না।”
নির্বান একনাগাড়ে কথা গুলো বলেই বড় করে একটা শ্বাস নিয়ে আবারও বলতে শুরু করল-
“আমি তোমাকে ভালোবাসি নীলাদ্রি ওরফে নীলা। প্রচন্ডরকম ভালোবাসি তোমাকে। একবার আমার হাত ধরে দেখো কখনো ছাড়বো না। একবার বিশ্বাস করে দেখো কথা৷ দিচ্ছি কখনো তোমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করবো না। সারাজীবন ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখবো তোমাকে।”
নীলা কিছু বলল না। নির্বানের দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। বড়বড় মায়াবী চোখগুলোতে প্রচুর ভয়। কোনো মূল্যবান কিছু হারিয়ে ফেলার ভয় আঁকড়ে ধরেছে নির্বানকে। নীলা তৎক্ষনাৎ নির্বানের দিক থেকে দৃষ্টি সরিয়ে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। কপালে বিরক্তির ভাজ পরেছে নীলার।
চলবে..