#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৫৩
#Saiyara_Hossain_Kayanat
অপেক্ষা করা কারও জন্য হয় ভালোবাসার আবার কারও জন্য হয় বিরক্তির৷ তবে এই মুহুর্তে অপেক্ষা করা আরশির জন্য ভয়, বিষন্নতা আর অনিশ্চয়তার। পাওয়া, না পাওয়ার মাঝের অনিশ্চয়তার সাগরে ডুবে আছে আরশি। হয়তো এই অপেক্ষার মাধ্যমে জীবনটা আলোকিত হবে অথবা সব আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে। আরশি কেবিনের বাহিরের একটা চেয়ারে বসে আছে। দু হাত কপালে দিয়ে মাথা নিচু করে আছে। চুল গুলো অগোছালো ভাবে ছোড়ানো। আর মাত্র আধঘন্টা পর আরশির প্রেগ্ন্যাসির রিপোর্ট দিবে। বুকে চিনচিনে ব্যথা করছে তার। রৌদ্র ফোন করেছে দু বার কিন্তু আরশি কল রিসিভ করেনি। রৌদ্রকে এই অনিশ্চিত আশার আলো দেখানোর ক্ষমতা তার নেই। মিথ্যা আশা দিয়ে রৌদ্রর মন ভাঙতে পারবে না আরশি।
“তুমি এখানে এভাবে বসে আছো কেন?”
কথাটা কানে আসতেই আরশি মাথা তুলে মানুষটার দিকে তাকালো। আরশিকে চেকআপ করা ডক্টর রুবি কৌতুহলী চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। চোখে চশমা, সাদা এপ্রোনের নিচে খয়েরী রঙের শাড়ি গায়ে জড়ানো। কালো চুলের মাঝে কয়েকটা সাদা চুল গুলো যেন তার বয়সের জানান দিচ্ছে। আরশি মলিন মুখে বলল-
“রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছি।”
ডক্টর রুবি আরশির মাথায় হাত দিয়ে বলল-
“আমার সাথে কেবিনে চলো। আমি এখন ফ্রি আছি তোমার সাথে বসে কথার ছলে একটু সময় কাটানো যাবে।”
আরশি একটা মলিন হাসি দিলো। ড.রুবি আরশির হাত ধরে তার কেবিনে নিয়ে গেল। আরশিকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজেও আরশির পাশে চেয়ার টেনে বসে পরলো। চশমাটা খুলে টেবিলের উপর রেখে শান্ত গলায় বলল-
“তুমি আমার মেয়ের মতো তাই তোমাকে তুমি করেই বলছি। এখন বল তো তুমি প্রেগ্ন্যাসির বিষয়টা নিয়ে এতো অস্থিরতায় আছো কেন? তোমার চোখে মুখে বিষন্নতার রেশ দেখা যাচ্ছে। তুমি কি কোনো কারনে বাচ্চাটা চাচ্ছো না!”
শেষের কথা শুনেই আরশির বুক ছ্যাত করে উঠলো। মনে হচ্ছে সদ্য গরম তেলে পরে যাওয়া আরশির হৃদয়টা পুড়ে ঝলসে খাঁ খাঁ করছে। যা পাওয়ার জন্য আরশির এতো ব্যকুলতা সেটা পেয়েও হারিয়ে ফেলার চিন্তা করাও কোনো বড়সড় আঘাতের চেয়ে কম না। আরশি উত্তেজিত হয়ে দ্রুত বলল-
“নাহ নাহ তা কেন চাইবো!”
“তাহলে তোমার মধ্যে এতো ভয় কেন? কিসের এতো জড়তা?”
আরশি কিছুটা সময় চুপ থেকে নিম্ন স্বরে বলল-
“কারন এটা সম্ভব না। সন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। আমার হরমোনজনিত কিছু কারনে গর্ভধারণের চান্স খুবই কম।”
ড.রুবি ভ্রু কুচকে ফেললো। সন্দিহান কন্ঠে বলল-
“তাহলে তো এটা তোমার জন্য গুড লাক। কিন্তু তুমি এখানে উদাসীন হয়ে আছো কেন!”
আরশি কিছুটা নেড়েচেড়ে বসলো। ইতস্তত করে বলল-
“কারণ আমি আর আমার হাসবেন্ড দুজনেই সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম। তাই আপনার ধারনাটা আমার কাছে মিথ্যা আশ্বাস বলে মনে হচ্ছে। যেখানে আমার হাসবেন্ড আর আমি দুজনেই অক্ষম সেখানে আমার প্রেগ্ন্যাসির বিষয়টা নেহাতই একটা মিথ্যা আশার প্রদীপ। হয়তো কিছুক্ষনের মধ্যেই সেই প্রদীপের শিখা নিবে যাবে। হঠাৎ করে একটু মিথ্যা আশার আলো দেখে দিশেহারা হয়ে গেছি। নিজেকে সামলিয়ে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। একটু পরে সব আশা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে বলে ভয় পাচ্ছি।”
ড.রুবি গম্ভীর হয়ে গেলেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে মনে মনে বেশ কিছুক্ষণ হিসেব নিকেশ করে বলল-
“তুমি কি শিউর?”
আরশি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। ড.রুবি বিস্ময়ের সাথে বলল-
“যদি তোমার কোনো আপত্তি না থাকে তাহলে আমি তোমাদের গল্প শুনতে চাই! কিভাবে তোমাদের বিয়ে হয়েছে, দেখা হয়েছে সব।”
আরশি হাল্কা হাসলো। বেশ কিছুটা সময় নিয়ে শুরু থেকে সব কিছু ডক্টরকে খুলে বলল। আরশির মুখে সব কিছু শোনার পর ড.রুবি মুচকি হেসে বলল-
“আমার যতটুকু মনে হচ্ছে তোমার হাসবেন্ড তোমাকে বিয়ে করার জন্য নিজেকে অক্ষম বলে তোমাদের সামনে তুলে ধরেছে। এখন বাকিটা তোমার রিপোর্ট দেওয়ার পরেই জানতে পারবে।”
আরশি আর কিছু বলল না। চুপচাপ আনমনে ভাবতে লাগলো সত্যিই কি রৌদ্র মিথ্যে বলেছে তাকে! আরশি তো কখনোই রৌদ্রর অক্ষমতার বিষয়টাকে গুরুত্ব দেয়নি। সে তো শুধু রৌদ্রকে বিশ্বাস করেছে, মন থেকে ভালোবেসেছে। কখনো তার ক্ষমতা, অক্ষমতা নিয়ে চিন্তা ভাবনা করেনি।
—————————
দুপুরের শেষ সময়। মাথার উপরের সূর্যটা পশ্চিম আকাশে হেলে পরছে। সূর্যের তাপ ধীরে ধীরে শীতল হয়ে আসছে। আরশি রিকশা থেকে নেমে গম্ভীর পায়ে বাসার দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই রৌদ্রকে মেসেজ দিয়ে বাসায় আসতে বলেছে আরশি। হয়তো এতক্ষণে রৌদ্র এসেও পরেছে। আরশি কলিং বেলে টিপ দেওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মাঝেই দরজা খুলে যায়।
” কোথায় ছিলে এতক্ষন? ফোন রিসিভ করছিলে না কেন? আর আমাকে বাসায় আসতে বললে কেন হুট করে?”
রৌদ্র দরজার কাছে দাঁড়িয়েই অস্থিরতার সাথে একের পর এক প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে আরশির দিকে। আরশি রৌদ্রর প্রশ্ন গুলোর কোনো জবাব না দিয়ে পাশ কেটে ভিতর চলে যায়। রৌদ্র অবাক চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। দরজা লাগিয়ে আরশির কাছে এসে আবারও জিজ্ঞেস করল-
“কি হলো কথা বলছো না কেন আরু? আর তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? কিছু হয়েছে তোমার?”
আরশি সাইড ব্যাগটা সোফায় রেখে রৌদ্র দিকে শান্ত চাহনিতে তাকালো। নির্লিপ্ততার সাথে জিজ্ঞেস করল-
“আপনি কি আমাকে কোনো কিছু নিয়ে মিথ্যা বলেছেন! আমার কাছে কিছু লুকিয়েছেন?”
আরশির প্রশ্ন শোনার সাথে সাথেই রৌদ্রর মাথায় হাজারো ভয় এসে হানা দিল। মস্তিষ্কের মধ্যে শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে “আরশি কি তাহলে কোনো ভাবে সত্যিটা জেনে গেছে?” রৌদ্র ভয় জড়ানো কন্ঠে বলল-
“কি বলছো তুমি! আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
আরশি কোনো কথা না বলে ব্যাগ থেকে রিপোর্টের কাগজ বের করে রৌদ্রর হাতে দিল। রৌদ্র কাগজটা খুলে আরশির প্রেগন্যান্সির রিপোর্ট দেখে স্তব্ধ হয়ে যায়। আরশি মা হতে পারবে! আরশির মা হওয়ার ইচ্ছে পূরণ হয়েছে!! সত্যিই কি আরশি প্রেগন্যান্ট? রৌদ্র বিস্ফোরিত চোখে রিপোর্টটা বার বার দেখছে মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করছে। আরশির দিকে তাকিয়ে রৌদ্র ভয়ংকর রকমের বিস্ময় নিয়ে আরশির দু কাধে হাত রেখে হাল্কা ঝাঁকি দিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“তুমি প্রেগন্যান্ট আরু? আমাদের বেবি হবে? সত্যি!”
আরশি নির্লিপ্ত ভাবে ছোট্ট করে উত্তর দিল-
“হুম সত্যি।”
আরশির কথার সাথে সাথেই রৌদ্র আরশিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। মনে হচ্ছে এখনই আরশিকে নিজের বুকের মধ্যে ঢুকিয়ে নেবে। খুশিতে রৌদ্র চোখ দুটো চিকচিক করছে। প্রচন্ড উত্তেজিত হয়ে রৌদ্র বলতে লাগল-
“আমি অনেক খুশি হয়েছি আরু। আমি জানি না বাবা হওয়ার ফিলিংস কেমন হয়। আর এই মুহুর্তে আমি এমন অনুভব করছি আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কিন্তু আমি অনেক খুশি অনেক। তুমি মা হবে। তোমার পেটে আমাদের সন্তান আস্তে আস্তে বড় হবে। ছোট ছোট হাত পা থাকবে। এসব ভেবেই তো আমি খুব খুব খুব এক্সাইটেড রুদ্রাণী।”
রৌদ্র অগোছালো ভাবে একনাগাড়ে কথা গুলো বলল। সাথে সাথে চোখ থেকে কয়েক ফোটা অশ্রু গাল গড়িয়ে আরশির কাধের দিকের ওড়নায় পরলো। আরশির আগের মতোই স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে কোনো প্রকার প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। আরশি শান্ত গলায় বলল-
“আপনি আমাকে মিথ্যে কথা বলেছিলেন তাই না রৌদ্র।”
রৌদ্রর হাতের বাধন হাল্কা হয়ে আসলো। আরশির কথা গুলো দমকা-ঝড়ো হাওয়ার মতো এসে রৌদ্র সকল আনন্দময় অনুভূতি গুলোকে লন্ডবন্ড করে দিল। বিষন্নতায় ছেয়ে গেল চারপাশ। রৌদ্রর মুখের হাসিখানি মিলিয়ে গেল তার লুকায়িত কথার অনুতাপে। খুশিতে চিকচিক করে ওঠা মুখ ফ্যাকাসে বর্ণের ধারণ করেছে। রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। চোখ দুটোতে অনুতাপ আর ভয়ের খেলামেলা হচ্ছে। রৌদ্রকে চুপ করে থাকতে দেখে আরশির ধৈর্যের বাধ ভাঙলো। রাগ, অভিমান আর ঘৃণায় আরশির চোখেমুখে কঠোরতা ফুটে উঠলো। রাগে গর্জে উঠে হুংকার দিয়ে বলল-
“মিথ্যা দিয়ে আমাদের সম্পর্ক শুরু করেছেন আপনি রৌদ্র! দু বছর ধরে আমাকে মিথ্যার জালে জড়িয়ে রেখেছেন? মিথ্যা দিয়ে তৈরি সম্পর্কের বাধনে আটকে রাখতে চেয়েছেন আমাকে!”
রাগে আরশির শরীর থরথর কাঁপছে। মুখ যেন হিংস্র বাঘিনীতে রূপান্তর হয়েছে। রৌদ্র আরশিকে শান্ত করার জন্য আরশির হাত ধরে অনুনয়ের স্বরে বলল-
“আরু প্লিজ শান্ত হও। ঠান্ডা মাথায় একবার আমার কথা শোনো আরু প্লিজ।”
আরশি এক ঝাটকায় রৌদ্র হাত সরিয়ে দেয়। রৌদ্রর থেকে দু কদম পেছনে সরিয়ে দাঁড়িয়ে ক্ষিপ্ত গলায় বলল-
“একদম আমাকে ছোঁবেন না বলে দিচ্ছি। মিথ্যা কথা বলে আমাকে ধোকায় রেখেছেন এতদিন আপনি! কিভাবে পারলেন আপনি এসব করতে রৌদ্র! আমার বিশ্বাস নিয়ে খেলেছেন আপনি। এতো বড় একটা মিথ্যা কথা বলার আগে একবারও কি আপনার বিবেকে বাধলো না! আমি তো আপনাকে মন থেকেই ভালোবেসেছি, বিশ্বাস করেছি। আপনি একবার বলায় আপনার সব কথাই সত্যি ভেবে মেনে নিয়েছি। কখনো আপনার অক্ষমতাকে নিয়ে নিজের মাথায় একটু চিন্তাও আনিনি। কখনো সন্তানের কথা আপনার সামনে মুখেও নেইনি আপনি কষ্ট পাবেন বলে। সব সময় নিজেকে শক্ত রেখেছি এই ভেবে যে দিন শেষে আপনার বুকেই আমার ঠাঁই মিলবে। একটা শক্তপোক্ত বিশ্বস্ত বুক। যেখানে নিজের সব কষ্ট গুলোকে তুচ্ছ বলে মনে হয়। যেখানে আছে আকাশ সমপরিমাণ পরিমাণ নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। কিন্তু নাহ আপনার কাছেই আমি ধোকা পেলাম। আপনি আমার বিশ্বাসের অমর্যাদা করেছেন রৌদ্র।”
রৌদ্র অশ্রুসিক্ত চোখে আরশির দিকে তাকিয়ে আছে। আরশির দু চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পরছে। বিশুদ্ধ কোমল পানি। যে বিশুদ্ধ নোনাজল দেখেই প্রথমবার রৌদ্র আরশির প্রেমে পরেছিল কিছু সময়ের জন্য। আজ সেই বিশুদ্ধময়ীর নোনাজল গুলো তার বুকে তীরে মতো এসে বিধছে। ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে তার হৃদয়টা-কে। রৌদ্র আরশির দিকে এগিয়ে যেতে নিলেই আরশি আবারও দূরে সরে যায়।
“খবরদার আমার কাছে আসবেন না আপনি। আমি থাকবো না এখানে। কোনো মিথ্যাবাদীর সাথে আমি থাকতে পারবো না।”
“আরু আমার কথা শোনো প্লিজ। আমি তোমাকে ধোকা দেইনি আরু। হ্যাঁ আমি মানছি আমি মিথ্যে বলেছি কিন্তু সেটা আমাদের ভালোর জন্য।”
আরশি রৌদ্রর কথার কোনো তোয়াক্কা না করে চোখের পানি মুছে নেয়। সোফা থেকে ব্যাগ নিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলল-
“ভালো জন্য!! আমার বিশ্বাস ভেঙেছেন ভালোর জন্য!”
আরশি কথা গুলো বলেই হনহনিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
চলবে….
[দুঃখিত। রিচেক করা হয়নি। ভুল ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। ধন্যবাদ আর ভালোবাসা সবাইকে।❤️]
#রৌদ্রর_শহরে_রুদ্রাণী
#পর্বঃ৫৪
#Saiyara_Hossain_Kayanat
“আমি মানছি আপনি আমাকে ভালোবাসেন বলেই এমনটা করেছেন। কিন্তু একবারও কি ভেবেছেন যাদের সত্যিই এমন প্রব্লেম আছে, যারা সত্যিই সন্তান জন্ম দিতে অক্ষম তাদের কেমন লাগে নিজেদের ব্যর্থতা নিয়ে? আমার প্রব্লেম ছিলো বলেই আমি আপনার মিথ্যা কথাটাকেই সত্যি মেনে নিয়ে আপনার কষ্ট অনুভব করতে পেরেছি। প্রতিনিয়ত ভেবেছি আপনিও হয়তো আমার মতোই ভেতর ভেতর কষ্ট পাচ্ছেন। তাই কখনো আপনার সামনে নিজেকে দূর্বল করিনি। আপনি কষ্ট পাবেন বলে। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে গেছেন আপনি তাই এতো বড় মিথ্যা কথাটাও আপনার কাছে তুচ্ছ বলে মনে হয়েছে। মিথ্যা দিয়ে সম্পর্ক শুরু করাটাও আপনার কাছে একটা নিছক ব্যাপার লাগছে তাই না রৌদ্র!”
আরশি ধরা গলায় কথা গুলো বলল। আরশির চোখ দুটো নোনাপানি টইটম্বুর। রৌদ্র মাথা নিচু করে আরশির কথা গুলো শুনে যাচ্ছে। আরশির দরজার দিকে তাকিয়ে সেদিকে এগিয়ে যেতে নিলেই রৌদ্র ঝড়েরবেগে এসে আরশিকে পেছন থেকে ঝাপটে ধরলো। আরশির গলা জড়িয়ে ধরে রৌদ্র অনুনয় করে বলতে লাগল-
“আরু প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না। আমি জানি আমি অনেক বড় মিথ্যা বলেছি। এই রকম সিরিয়াস বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলা আমার ঠিক হয়নি। আর মিথ্যা কথা বলে সম্পর্কটা শুরু করাও ঠিক হয়নি। আমি আমার ভুল শিকার করছি আরু। আমি আজকের দিনটার জন্যই দু’বছর ধরে ভয়ে ভয়ে কাটিয়েছি। আমি জানতাম আমি আমার মিথ্যার জন্য একদিন না একদিন ঠিকই শাস্তি পাবো। তুমি আমাকে যা ইচ্ছে শাস্তি দাও আমি মেনে নিব। কিন্তু প্লিজ আমাকে ছেড়ে যেও না আরু।”
আরশি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ দুটো বিস্ময়ে বড়বড় হয়ে আছে রৌদ্রর কথা শুনে। আরশি রৌদ্রর হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে বলল-
“আমাকে ছাড়ুন রৌদ্র। আমি..”
রৌদ্র আরশিকে আরও শক্ত করে নিজের বুকের সাথে চেপে ধরে। আরশির মাথার সাথে নিজের গাল মিশিয়ে নিয়ে অনুতাপের সাথে বলল-
“আরু প্লিজ এই শেষবারের মতো আমাকে মাফ করে দাও। আর কখনো মিথ্যে কথা বলবো না। তুমি যা শাস্তি দেবে আমি সব মাথা পেতে নিব। তুমি যা করার আমার সাথে থেকে করো। তবুও প্লিজ আমাকে ছেড়ে যাও না। আমরা এক সাথে থাকে সব ভুলবোঝাবুঝি ঠিক করে নিবো। তুমি একটু শান্ত হও প্লিজ আরু প্লিজ।”
রৌদ্র উত্তেজিত হয়ে একনাগাড়ে আরশিকে অনুরোধ করে যাচ্ছে। আরশি এবার কিছুটা ক্ষেপে যায়। রৌদ্র ভাবলো কিভাবে সে রৌদ্রকে সত্যি সত্যিই ছেড়ে চলে যাবে!! আরশি রৌদ্র হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে ক্ষিপ্ত গলায় বললো-
“রৌদ্র ছাড়ুন আমাকে।”
রৌদ্র আরশিকে ছাড়ছে না। আরশিকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে আরশিকে শক্ত করে জাপ্টে ধরে রেখেছে। মনে হচ্ছে আরশিকে ছেড়ে দিলেই আরশি মুক্ত পাখির মতো উড়ে যাবে। আরশি এবার খানিকটা রেগে চাপা কন্ঠে বলল-
“উফফ কি শুরু করেছেন এসব! ছাড়ুন আমাকে ব্যথা পাচ্ছি তো। আর আপনি কি আমাদের দু’জনের মধ্যকার ঝগড়া, রাগারাগি বাহিরের মানুষকেও শোনাতে চাচ্ছেন না-কি রৌদ্র!”
রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে দেয়। বিস্মিত হয়ে আরশির দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে জিজ্ঞেস করলো-
“মানে!”
আরশির দরজার লক লাগিয়ে শক্ত গলায় বলল-
“দরজার লকটাও তো ঠিক মতো লাগাতে পারেন না আপনি যত্তসব। সরুন সামনে থেকে।”
আরশিকে দরজা লাগিয়ে দিতে দেখে রৌদ্র প্রচন্ড খুশিতে আবারও আরশিকে জড়িয়ে ধরলো। আরশি ভড়কে গিয়ে নাকমুখ কুচকে রৌদ্রকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে। রৌদ্র আরশিকে ছেড়ে দিয়ে আরশির হাত শক্ত করে ধরে সোফায় বসিয়ে দিল। আরশির ব্যাগটা নিয়ে অন্যদিকে রেখে দেয়। আরশির পাশে গাঁ ঘেঁষে বসে জিজ্ঞেস করল-
“তুমি কিভাবে জানলে এসব! আর প্রেগ্ন্যাসির কথা কখন জানলে? আমাকে আগে বলনি কেন?”
আরশি রৌদ্রর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। রাগান্বিত দৃষ্টিতে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে শান্ত গলায় রৌদ্রকে সব বলতে লাগল। আরশির কথা শেষ হতেই রৌদ্র অস্থিরতার সাথে বলল-
“অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে তুমি! এখন ঠিক আছো তো আরু? আর আমাকে কেন ফোন দাওনি তুমি?
রৌদ্র একসাথে কতো গুলো প্রশ্ন আরশির দিকে ছুড়ে দিল। আরশি নির্লিপ্ততার সাথে রৌদ্রর দিকে চেয়ে বলল-
” আমি ভেবেছিলাম ডক্টরের কোথাও ভুল হয়েছে তাই আপনাকে এসব বলে মিথ্যা আশার আলো দেখিয়ে কষ্ট দিতে চাইনি। কিন্তু আমি তো বুঝতেই পারিনি আপনি আগে থেকেই আমাকে মিথ্যা বলে আসছেন।”
রৌদ্রর মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। মাথা নিচু করে নিম্ন স্বরে বলল-
“তুমি বিয়ে করতে রাজি হচ্ছিলে না তাই বাধ্য এই মিথ্যে কথাটা বলতে হয়েছে। তোমাকে মিথ্যে বলে সম্পর্ক শুরু করার অনুতাপের আগুনে ভেতর ভেতর আমি ঝলসে যাচ্ছিলাম আরু। সব সময় আমার বলা মিথ্যের জন্য তোমাকে হারিয়ে ফেলার ভয় পেতাম।”
আরশি রৌদ্রর থেকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রৌদ্রর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলল-
“আমি আপনাকে মাফ করে দিয়েছি এটা ভেবে ভুল করবেন না। মিথ্যে বলার শাস্তি আপনি নিশ্চয়ই পাবেন ডক্টর রৌদ্র।”
আরশি কথা গুলো বলেই রুমে চলে গেল। রৌদ্র ভ্রু কুচকে আরশির যাওয়ার দিকে চেয়ে আছে। সে খুব ভালো করেই জানে আরশির রাগ কিছুক্ষনের মধ্যেই উধাও হয়ে যাবে। আরশি প্রেগন্যান্ট তার সন্তান এখন আরশির পেটে। এই সময় আরশি নিশ্চয়ই রৌদ্রর উপর রাগ করে থাকতে পারবে না। তাদের অনাগত সন্তানের কথা ভেবে খুশিতে গদগদ করে ওঠে রৌদ্রর মন। রৌদ্রর সকল বিষন্নতা নিমিষেই খুশির ঝলকে পরিনত হয়ে গেল। রৌদ্র বাবা হবে ভেবেই যেন খুশির জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে তার মন।
——————————
“আরু এটা কেমন শাস্তি দিচ্ছো তুমি! প্লিজ রুমে আসো। বিকেল থেকে কথা বলছো না, তোমাকে ছুঁতে দিচ্ছো না এসব না হয় মানলাম কিন্তু এখন এই রুমে এসে থাকার কি মানে! এক-ই বাসায় আমরা আলাদা আলাদা রুমে থাকবো না-কি!! তুমি ভালো করেই জানো তোমাকে ছাড়া একা একা ঘুমানোর অভ্যেস আমার নেই।”
রৌদ্র আরশির দরজার কাছে দাঁড়িয়ে মলিন মুখে কথা গুলো বলে যাচ্ছে। কিন্তু আরশি কোনো সাড়া দিচ্ছে না। বিকেল থেকেই আরশি রৌদ্র সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। রাতেও চুপচাপ ডিনার করার পর আরশি বেডরুমে না গিয়ে অন্য রুমে এসেই ভেতর থেকে দরজা লাগিয়ে দেয়। সেই থেকেই রৌদ্র আরশিকে অনুরোধ করে যাচ্ছে রুমে আসার জন্য। আরশি রুমের ভেতরে চুপচাপ বিছানায় বসে আছে। রৌদ্রকে সায়েস্তা করার জন্য এটাই এক মাত্র মাধ্যম। রৌদ্র আবারও দরজায় ধাক্কা দিয়ে বলল-
“আরু দরজা খোলো। তুমি দরজা না খোলা অব্দি আমি কিন্তু এখান থেকে যাবো না বলে দিচ্ছি।”
রৌদ্র দরজায় হেলান দিয়ে নিচে বসে পরলো। রৌদ্র খুব ভালো করে জানে আরশি তাকে শায়েস্তা করার জন্যই এমনটা করছে। আর এটাও জানে তার রুদ্রাণী কখনো তার উপর বেশিক্ষণ রাগ করে থাকতে পারবে না। রৌদ্র একটা হতাশ নিঃশ্বাস ফেলে সুর তুলে গান গাওয়া শুরু করলো আরশির উদ্দেশ্যে।
যদি বলি আমার প্রতিটা রাত তোমার কোলে চাই,
বলো ঠোঁটের ছোঁয়ায় আদর মাখাবে গালে?
যদি বলি হ্যাঁ হাসছি আমি শুধুই তুমি আমার তাই,
বলো ছেড়ে তো দেবেনা কখনো মনের ভুলে?
আরশি তার চিরচেনা গান আর গলার স্বর শুনে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। ঠোঁটের কোণে হাল্কা হাসির রেখা টেনে দরজার কাছে এসে দাঁড়ায়। রৌদ্র আবারও দরজায় কয়েকবার করাঘাত করে গান গাইতে লাগে-
গোধূলি আকাশ মুছে দিলো সাজ
অযথা দূরে তবু তুমি আজ,
অভিমানী ভুল ধরবে আঙ্গুল
মন করে বায়না।
তুমি কি আমায় করবে পাগল
শাড়ির আঁচল, চোখের কাজল,
প্রেমে তুমিও পড়ে যাবে হায়
দেখো যদি আয়না।
বাঁচি এই বিশ্বাসে, শেষ নিঃশ্বাসে
তোমাকেই পাশে চাই,
তুমি না থাকলে আমি শূন্য এ মহাদেশে।
যদি ঘুমিয়েও পড়ি
শেষ ঘুমে আমি তবুও তোমাকে চাই,
তুমি স্বপ্নেই এসো রূপকথার ওই দেশে।।
আমি বুকের মাঝে জাপটে জড়িয়ে
যত কথা আছে সবই তোমাকেই বলি।
আমি কান পেতে সেই মনের গভীরে
লুকোনো যন্ত্রনা শুনে ফেলি।
তুমি অভিমানে খুব হয়ে গেলে চুপ
ভুল মেনে নিয়ে কত কত sorry বলি,
রৌদ্র এই লাইন গুলো গেয়েই চুপ হয়ে যায়। দরজা হেলান দিয়ে হাটুতে দু হাত ভাজ করে দিয়ে বসে আছে। আরশি সকল রাগ অভিমান ভুলে হাসি মুখে রুমের দরজা খুলে দেয়। দরজা খোলার সাথে সাথেই রৌদ্র তাল সামালতে না পেরে পেছনের দিকে ঢলে পরে যায়। রৌদ্রকে পরে যেতে দেখে আরশি ফিক করে হেসে দিয়ে গান গাইতে লাগলো-
ভাবি থাকবোই রেগে গম্ভীর মুখে
তোমার কোথায় ধুৎ, আমি হেসে ফেলি।
মারপিট আর ঝগড়াঝাটিরা
শান্তি চাইবে শেষে,
তাই অভিমান ভুলে আদর মাখতে
তোমার কাছে এসে।
রৌদ্র মেঝেতে শুয়ে থেকেই আরশির দিকে চেয়ে আছে। আরশি মুখে হাসি রেখেই রৌদ্রর দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। রৌদ্র আরশির হাত ধরে উঠে বসে। আরশি রৌদ্র পাশে বসে নম্রতা সহকারে বলল-
“সরি বিকেলের জন্য। আপনি এমন একটা সিরিয়াস কথা নিয়ে দু’বছর ধরে আমাকে মিথ্যা বলে আসছেন ভেবেই আমার মাথা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। রাগের মাথায় বেশি কিছু বলে থাকলে ক্ষমা করে দিয়েন।”
রৌদ্র আরশিকে এক পাশ থেকে জড়িয়ে ধরে জড়তার সাথে বলল-
“তোমার কোনো ভুল নেই আরু। আমিই ভুল করেছিলাম তোমাকে মিথ্যা কথা বলে। আমি তোমাকে পাওয়ার জন্য কোনো কিছু না ভেবেই তখন মিথ্যে বলে ফেলেছিলাম। কিন্তু একবারও ভেবে দেখিনি এই মিথ্যের ফলাফল কি হতে পারে।”
আরশি হাল্কা হেসে বলল-
“আচ্ছা এসব বাদ দিন। যা হওয়ার হয়ে গেছে কিন্তু এখন আমাকে প্রমিজ করুন আর কখনো আমার কাছে কিছু লুকাবেন না আর মিথ্যে কথা তো ভুলেও বলবেন না।”
রৌদ্র হাসি দিয়ে আরশির হাত ধরে বলল-
“ওকে প্রমিজ করছি আর কখনো মিথ্যে বলবো না।”
“আচ্ছা এসব ঝগড়াঝাটির মাঝে তো তুলতুলের কথা ভুলেই গেছি। নীল ওদের কাউকে তো কিছুই বলা হয়নি তুলতুলের কথা।”
আরশির কথায় রৌদ্র ভ্রু বাঁকিয়ে তার দিকে তাকালো। তুলতুল নামটা শুনে সন্দিহান কন্ঠে জিজ্ঞেস করল-
“তুলতুল কে?”
আরশি সশব্দে হাসলো। মেঝে থেকে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের চুল গুলোকে ঠিক করে পেটে হাত রেখে বলল-
“ওই ছেলেটা যাওয়ার আগে আমাদের বেবিকে তুলতুল বলে ডেকেছিল তাই বেবির নাম এটাই রেখে দিলাম। সুন্দর না নামটা!!”
রৌদ্র কিছুটা ভেবে আরশির মুখোমুখি হয়ে দাঁড়িয়ে বলল-
“হুম সুন্দর কিন্তু ছেলেটার পরিচয় নাও নি কেন!”
“তখন এতো চিন্তার মাঝে এসব কিছুই মাথায় ছিল না। তাই ছেলেটার নামও জিজ্ঞেস করা হয়নি।”
আরশি কিছুটা আফসোসের সুরে কথা গুলো বলল। রৌদ্র আরশির কাধে হাত রেখে বলল-
“আচ্ছা থাক এসব কথা। এখন রুমে চল। আমি তোমাকে ছাড়া ঘুমাতে পারি না তুমি খুব ভালো করেই জানো।”
আরশি মুচকি হেসে রৌদ্রর সাথে রুমে চলে যায়।
————————
আরশি আর রৌদ্র বিকেলে বেরিয়েছে ভার্সিটির পাশের সেই চিরচেনা কৃষ্ণচূড়া গাছটার উদ্দেশ্যে। আরশি নীল ওদেরকে ফোনে এই সুখবরটা দিতে চায় না তাই সবাইকে জরুরি কথা বলার বাহানা করেই বিকেলে তাদের পুরোনো আড্ডার জায়গায় আসতে বলেছে। আরশি নিজের চোখে তাদের সবার রিয়েকশন দেখতে চায়। তার প্রেগন্যান্টের কথা শুনে সবাই নিশ্চয়ই অনেক বেশি অবাক হয়ে যাবে, হয়তো খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাবে। আরশি কথা গুলো ভাবতে ভাবতেই ভার্সিটিতে এসে পরে। দূর থেকে কৃষ্ণচূড়া গাছের দিকে তাকিয়ে কাওকে দেখতে পেলো না। কিছুক্ষনের মধ্যেই হয়তো সবাই এসে পরবে। রৌদ্র আর আরশি কিছুটা এগিয়ে যেতেই গাছের সাথে হেলান দিয়ে নীলকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পেল। নীলের ব্যাক সাইড দেখা যাচ্ছে। অন্য পাশে মুখ ঘুরিয়ে নীল ফোনে কথা বলতে ব্যস্ত। আরশি রৌদ্রকে ইশারায় চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে বলে। আস্তে আস্তে শব্দহীন পায়ে নীলকে ভয় দেখানোর জন্য এগিয়ে যায় আরশি। নীলের কিছুটা সামনে আসতেই নীলের ফোনালাপ শুনে আরশি থমকে দাঁড়িয়ে যায়। স্তম্ভিত হয়ে গেছে আরশি।
চলবে….