#অশান্ত বসন্ত।
(প্রথম পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী।
(#প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
*******************
শেফালী মাসি মাকে জানিয়েছিলো আমার বাবা নাকি নতুন সংসার পেতেছে।মা খবরটা জানবার পর থেকেই কেমন চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলো।
সেদিন বাবা অফিস থেকে ফিরতেই মা আমাদের সামনেই বাবাকে প্রশ্ন করেছিলো কথাটা সত্যি কিনা!বাবা বলেছিলো,কথাটা মিথ্যে নয়,আর সামনের মাস থেকেই বাবা আর আমাদের সাথে থাকবেনা।মা আর কোনো প্রশ্ন করেনি বাবাকে।
বাবা চলেও গিয়েছিলো এক মাস বাদে।বাবা চলে যাওয়ার আগে মাঝের ওই দিনগুলো মা কেমন অন্যমনস্ক থাকতো।কখনো দেখতাম লাল হয়ে আছে মায়ের চোখ,খাওয়াদাওয়া ও বিশেষ করতো না।সারাদিন কি একটা ভাবতো।
তবে আমার বাবা নতুন সংসারে পুরোপুরি ভাবে চলে যাওয়ার পর থেকে, মা অভিমান করে বাবার থেকে আমাদের বা নিজের জন্য আর কোনো খরচ নেয়নি।সেই সময় আমাদের প্রায়দিনই পেট ভরে খাওয়ার জুটতোনা।শেফালি মাসি তাও জোর করে আমাদের কিছু কিছু সাহায্য করতো।তবে সেটা বেশিদিনের ব্যাপার ছিলোনা।
এক সময়ে মা টেলারিং এর কাজ শিখেছিলো।বাড়িতে একটা সেলাই মেশিন ও ছিলো।
এরপর মা দোকানে দোকানে ঘুরে ব্লাউজের অর্ডার নিয়ে নিজেই ব্লাউজ বানাতে শুরু করলো।অনেক সময় রাত ভোর হয়ে যেত অর্ডারের কাজ শেষ করতে।
আমিও সকালের দিকে স্কুলে যাওয়ার আগে বাড়িতে বসেই কয়েকটা বাচ্চাকে পড়াই ।সেখান থেকেও কিছু আসে।সব মিলিয়ে কোনোরকমে চলে যায় আমাদের তিনজনের ছোট্ট সংসার।তিনজন বলতে আমি,আমার মা আর আমার দিদিয়া।
ভেবেছিলাম ছুটির দিনে মাকে কাজে সাহায্য করবো।
কিন্তু মা বলেছে,’আমিই মায়ের একমাত্র আশা ভরসা।তাই আমাকে মন দিয়ে পড়াশোনা করতে হবে’।আমিও চেষ্টা করে যাচ্ছি, যাতে মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারি।মা যখন রাত জেগে ব্লাউজ সেলাই করে,আমি তখন নিজের মতো পড়াশোনা করি।আমাকে যে নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
আমার এখন আর কোনো প্রাইভেট টিউটর নেই।
আমি একাই নোটস বানাই লাইব্রেরির বই ঘেঁটে ঘেঁটে।মাঝেমধ্যে খুব কষ্ট হয়,বাবার জন্য মন কেমন করে।কিন্তু মা বলেছে,’বাবা আমাদের ভুলে গেছে’,বলেছে,’ বাবার গলার কাঁটা আমরা,পারলে উপরে ফেলতো’।
মা বলে,মায়ের সাথে বাবার বিয়েটা নাকি রেজেস্ট্রি করে নয়।মা বাবার সাথে পালিয়ে গিয়ে কালিঘাটে বিয়ে করেছিলো।সেই থেকে মামা বাড়ির সাথে যোগাযোগটা আর নেই।মায়ের একটাই ভয়,বাবা যদি আমাদের বাড়ি থেকে বের করে দেয়,তাহলে আমাদের রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হবে।
আমি খুব তাড়াতাড়ি বড়ো হয়ে মা’য়ের জন্য,একটা বাড়ি বানাতে চাই।
রান্নাঘরের সব কাজ সেরে যখন মা ঘরে এসে দাঁড়ায়, তখন কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের মধ্যে সিঁদুরের টিপটা জ্বলজ্বল করতে থাকে।মা মনে হয় সিঁদুর পরতে খুব ভালোবাসে,তাইতো বাবা আমাদের সাথে না থাকলেও মা রোজ সকাল বিকেল সিঁদুর ছোঁয়ায় সিঁথিতে।
ক্লান্ত মুখের হাসিটা অম্লান রেখে, দিদিয়াকে রোজ গলা গলা ভাতে,ডাল,আলুসেদ্ধ চটকে মেখে খেতে দেয়।আমার দিদিয়া কথা বলতে পারেনা,মুখ দিয়ে
সমানে লালা ঝরে।দিদিয়ার জিভের আগাটা সামনের দিকে লাগানো।
জন্মের পর ডাক্তার নাকি বলেছিলো,পাঁচ বছর বয়েস হলে অপারেশন করিয়ে নিতে।
বাবা অপারেশন করায়নি।বলেছে,’ওর পিছনে খরচ করে লাভ নেই,ও ঠিক হওয়ার নয়’।
আমি দিদিয়াকে খুব ভালোবাসি।রুমাল দিয়ে মুখ মুছিয়ে দিই।লুকিয়ে কেনা তেঁতুলের আচার শেয়ার করি।আমি এখন টুয়েলভে পড়ি।দিদিয়া কখনো স্কুলে যায়নি।স্পেশাল স্কুলেও ওকে পাঠায়নি বাবা।
মা চোখের জল মুছে বলেছিলো,’বহ্নি তুই চাকরি পেয়ে কিন্তু সবার আগে শিখার অপারেশনটা করিয়ে দিস’।
দিদিয়া কথা না বলতে পারলেও,দিদিয়ার চোখ দুটো যেন কথা বলে। ওই চোখের দিকে তাকালে সব বোঝা যায়।
দিদিয়া আমায় খুব ভালোবাসে।সর্ষের তেলে মেথি ফুটিয়ে সেই উষ্ণ তেল ঘসে ঘসে আমার মাথায় লাগিয়ে দেয়।তারপর টাইট করে চুলের বেনি করে দেয়।
আমি দিদিয়ার থেকে দশ বছরের ছোটো।কিন্তু মা ছোটোবেলা থেকে আমাকে বলে রেখেছে,দিদিয়া বয়েসে বড়ো হলেও আমাকেই নাকি ওর খেয়াল রাখতে হবে।আমাকেই ওর ভালো মন্দ সব বুঝতে হবে।
আমি বুঝি আমার অনেক দায়িত্ব। তাইতো মুখ বুজে পড়াশোনাটা করি।কারন আমি জানি,টাকা পয়সা না থাকলে আত্মীয় স্বজনরাও দুরে পালিয়ে বেড়ায়।আমার কাকাই কাম্মা পাশেই থাকে।কিন্তু আমাদের সাথে কথা বলেনা।কাকাই এর ছেলে টুকলুদা ও মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়।
রাখিপূর্ণিমায় আমি দিদিয়াকেই রাখি পরাই।ভাইফোঁটার বদলে দিদিয়াকেই বোনফোঁটা দিই,আর দিদিয়াও আমাকে রাখি পরায়,ফোঁটা দেয়।
মা বলে,’বোনফোঁটাটাই বেশি জরুরি আমাদের সমাজে।বোনফোঁটাতে মেয়েরা নিজের মূল্য বুঝে নিজেকে সম্মান করতে শিখবে,নিজেদের অপমানের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে পারবে’।
আজকাল স্কুল যাওয়ার সময় মনে হয় কেউ যেন আমাকে ফলো করছে।অথচ তাকালে কাউকে দেখতে ও পাইনা।শাড়ি পরে হাঁটতে হয় বলে জোরে হাঁটতে ও পারিনা।তবু চেষ্টা করি পা চালিয়ে যেতে।
আজ স্কুল থেকে ফিরছি হঠাৎ ,’এই যে শুনছো?হ্যাঁ তোমাকেই বলছি’,একটা পুরুষ কন্ঠের আওয়াজ কানে যেতেই আমি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তাকালাম।দেখলাম,একটি ছেলে হাত নাড়িয়ে দাঁড়াতে বলে আমার দিকেই আসছে।
আমি কেমন ভয় পেয়ে গেলাম।এই ছেলেটাই মনে হয় রোজ ফলো করছে আমায়।খুব তাড়াতাড়ি হাঁটছি আর মাঝেমধ্যে পিছনের দিকে তাকাচ্ছি।ছেলেটাও দেখলাম তাড়াতাড়ি আসছে।ঘাবড়ে গিয়ে আমি দৌড়োনো শুরু করলাম।
‘কি হলো,দাঁড়াতে বলছি তো’,রাগী গলাটা কানে আসলেও আমি দাঁড়ালাম না।
প্রানপনে ছুটতে থাকলাম।
আমাদের বাড়িটা স্কুল থেকে অনেক দুরে।এতো দুর থেকে সাধারণত কেউ পায়ে হেঁটে স্কুল যায়না।কিন্তু আমার তো কোনো উপায় নেই।আমাকে হাঁটতেই হবে।কারন আমার সাইকেল নেই আর রিক্সায় চড়ার ক্ষমতা ও নেই।অথচ পড়াশোনাটাও জরুরি। প্রতিদিন এক দেড় ঘন্টা আগেই স্কুলের জন্য রওয়ানা দিই।
আমাদের স্কুল সকাল সাড়ে এগারোটায় শুরু হয়,আর ছুটি হয় বিকেল পাঁচটা পনেরোতে।তারপর বাড়ি ফিরতে ফিরতে বেশিরভাগ দিনই সন্ধ্যে গড়িয়ে যায়। বিশেষ করে শীতের বিকেল গুলোতে গাঢ় অন্ধকার নেমে যায়।আমি একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরবার আশায় বেশিরভাগ দিনই শর্টকাট ধরি।
ওই রাস্তাটায় লোকজন তেমন একটা থাকেনা।গাছপালার ছাউনি দিয়ে ঘেরা কাঁচা রাস্তা।মা একদিন জানতে পেরে বলেছিলো,’ওই রাস্তায় লোকজন থাকেনা,কেন আসিস ওখান দিয়ে,যদি বিপদে পরিস!’,মাকে হেসে বলেছিলাম,’লোকজনকেই তো ভয় লাগে মা,সবাই কেমন করে তাকায়,আমার অস্বস্তি লাগে’,মা শুনে আমাকে বুকে টেনে নিয়েছিলো,কোন এক অজানা শঙ্কায়।
আমি যতক্ষণ বাড়িতে না ফিরি,মা পায়চারি করে ঘরের ভিতরেই।তখন মা ব্লাউজ সেলাই ও করতে পারেনা।মা বলে, ‘এতো রূপ,এতো রঙ কোনো দিন না আবার কোনো সর্বনাশ ঘটে’।
আজ আমিও সেই অজানা সর্বনাশের ভয়ে প্রানপনে ছুটে চলেছি,মনে মনে বলছি,’মা,মাগো তুমি কোথায়,আমাকে বাঁচাও’।(চলবে)
#অশান্ত বসন্ত
(দ্বিতীয় পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী।
(#প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
**********************
‘মেয়েটা যে কেন ওইভাবে ছুটছে!বাঘ না ভালুক আমি!শুধু ক’টা কথাই তো জানার ছিলো’,কথা গুলো নিজের মনেই আওড়াল পল্লব।ভাবলো আর পিছনে গিয়ে কাজ নেই।আবার যখন এখানে আসবে তখন না হয় মেয়েটির সাথে কথা বলে জেনে নেবে।’ওই কোথায় থাকে?,কি পড়ে?,হবি কি?,কোনো লাভার আছে নাকি?,বিয়ের ব্যাপারে স্পেশাল কোনো চাহিদা আছে নাকি?,এসবই জানার ছিলো।
তবে কথা বলতে না পারায় মনটা কেমন খারাপ হয়ে গেলো পল্লবের।কাল সকালেই তো আবার ফিরে যেতে হবে যাদবপুর। আবার যে কবে ছুটি নিয়ে আসতে পারবে নিজেও জানেনা।
আজকাল বেশ চাপ পরেছে অফিসে। ছুটি একদম পাওয়াই যায়না।তিন বছর হলো চাকরি পেয়েছে পল্লব।তবে বেড়াতে এসেও ল্যাপটপ তার সঙ্গী।কাজ তাকে করতেই হচ্ছে।তার ওপর এক সপ্তাহ ছুটি নিয়ে এসে প্রায় দুসপ্তাহ কাটিয়ে ফেললো।
নেহাত কাজের জায়গায় তার রেপুটেশন বেশ ভালো,আর ল্যাপটপেও কিছু কাজ এগিয়ে দিচ্ছে। তাইতো হোয়াটসঅ্যাপে শুধুমাত্র ‘কাম সুন’,মেসেজ করেই ছেড়ে দিয়েছে বস রথীন্দ্র সিং।
বেশ কিছুদিন আগেই বন্ধুদের সাথে মন্দারমনি এসেছিলো পল্লব।বন্ধুরা দুদিনের ভিতরে বাড়ি ফিরে গেলেও পল্লব ফেরেনি।
ও কাঁথিতে এসেছে ফুলমানিদের সাথে দেখা করতে।মন্দারমনির থেকে কাঁথির দুরত্ব মাত্র একুশ কিলোমিটার।
মন্দারমনি পল্লবের দারুন পছন্দের জায়গা।কতো বার যে এসেছে তার ঠিক নেই।সমুদ্রের গর্জন,সমুদ্র সৈকতে লাল কাঁকড়াদের দাপাদাপি, ওদের পিছনে ধাওয়া করা এগুলো পল্লবের দারুন পছন্দের।তবে মন্দারমনি আসলে প্রতিবারই ফুলমানিদের সাথে দেখা করে ফিরতে হয়।নাহলে মায়ের গাল ফুলে যায়।
এই প্রথমবার ফুলমানিদের বাড়িতে এসে টানা কয়েকদিন ধরে থেকে গেলো পল্লব। আসলে পরন্ত বিকেলে ব্যালকনিতে বসে,চায়ের চুমুকের সাথে হঠাৎই খেয়াল করে,কমলা পাড় সাদা শাড়ি পরে,কাঁধে ব্যাগ নিয়ে দুবেনী ঝুলিয়ে ভীষণ সুন্দর একটা মেয়ে ফুলমানিদের বাড়ির রাস্তা দিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছে।
পল্লবের প্রথম দেখাতেই ভালো লেগে গিয়েছিলো মেয়েটিকে।তারপরের দিন থেকে রোজই অপেক্ষা করে থেকেছে মেয়েটার জন্য।আর মেয়েটিকে দেখা মাত্রই আড়াল থেকে ফলোও করেছে।মেয়েটি ফুলমানিদের বাড়ি ছেড়ে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে একসময় আলো-আঁধারিতে মিশে যায়।পল্লব লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেও ওর পিছন পিছন যায়।একটা ভালো লাগা ছেয়ে যায় মেয়েটিকে দেখলেই।
গতকাল রাতে ভেবেছিলো,ফিরে যাওয়ার আগে মেয়েটার সাথে একবার অন্তত কথা বলবে। কিন্তু মেয়েটা যে কেন ভয় পেলো ওকে!
‘কিরে পল্লব খেতে ডাকছি তো, সেই কখন ছাদে গেছিস।এতোক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে কি করছিস?’,ফুলমানির ডাক কানে যেতেই পল্লব চেঁচিয়ে সারা দিলো,’আসছি ফুলমানি’।
চুপচাপ খাওয়াদাওয়া সেরে দোতলায় এসে ব্যাগ গোছাতে বসলো পল্লব।মনটা ভীষণ রকম খারাপ লাগছে।নামটা ও তো জানা হলোনা মেয়েটার।বুকের মধ্যে কেমন একটা চাপ চাপ কষ্ট হচ্ছে পল্লবের।চোখের কোনটা জ্বালা জ্বালা করছে।
‘আচ্ছা একে কি ভালোবাসা বলে?এভাবে কি কাউকে ভালোবাসা যায়?’,নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলো পল্লব।
ঠিক করে নিলো, সকালে যাওয়ার আগে একবার বের হয়ে ওই কাঁচা রাস্তাটা ঘুরে আসবে,যদি মেয়েটির সাথে দেখা হয়ে যায়!
কেমন অদ্ভুত ভাবে একা একাই একটা সম্পর্কে জড়িয়ে পরেছে পল্লব।গমগমে গলায় গেয়ে উঠলো,’তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা,তুমি আমারো নিভৃত সাধনা’।
পল্লবের মা গানটা বেশ ভালোই গায়।মায়ের গান শুনে শুনে পল্লবের ও বেশ কিছু গানের কথা ও সুর প্রায় মুখস্থ।পল্লবরা এক ভাই এক বোন।পল্লবের বোনের নাম পিউ।ভারি মিষ্টি গানের গলা পিউয়ের।পল্লব খুব ভালোবাসে বোনকে।
তবে আজকাল পিউ কেমন যেন একটা বদলে যাচ্ছে।কথাবার্তায় মোটেও আর মিষ্টতা নেই।এমনকি ছোটো বড়ো জ্ঞানটাও গেছে,যখন যা মুখে আসছে বলে দিচ্ছে।মায়ের শাসনেও কোনো লাভ হচ্ছেনা।মাকেও আজকাল ঝাঁঝিয়ে উত্তর দেয়।
“আঠেরো বছর বয়স কি দুঃসহ /স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি”,কবিতাটা মনে পরে গেলো পল্লবের।একা একাই হেসে ফেললো।সময় করে পিউটাকে নিয়ে বসতে হবে,ওর সমস্যা কি সেটা জানতে হবে,মনে মনে ঠিক করে নিলো পল্লব।
পল্লব ভাবে,এই মেয়েটিও পিউয়ের বয়েসীই হবে,কিন্তু কতো ম্যাচিওর।চোখ দুটোতে দীঘির গভীরতা,একবার দেখলে আর ভোলবার উপায় নেই।মনের মধ্যে ঘর করে নিয়েছে মেয়েটা।
নানান এলোমেলো ভাবনায় চোখে ঘুম আসছে না পল্লবের।তবে ঘুরে ফিরে সেই নাম না জানা মিষ্টি মেয়েটিই তার সমস্ত চিন্তা ভাবনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে মনটাকে আরো ভাবালু করে তুলছে।
সেলাই করতে করতে মা বলে উঠলো, ‘কিরে বহ্নি আজ পড়ছিস না যে।এতো ভয় পেলে হয়।ছুটে ছুটে বাড়ি ফিরলি,কেউ একজন ধাওয়া করেছে বলে।সাথে সাথেই রাস্তায় বের হোলাম।কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলাম না,আরে এতো ভয় পেলে কি চলে মা?রুখে দাঁড়াতে হতো যে’,মুখে এসব কথা বললেও মনে মনে নিজেই বেশ ভয় পেয়েছে করুনা।
ভগবানকে শত সহস্র কোটি প্রনাম যে মেয়েটার কিছু হয়নি।আজ বহ্নির কান্না দেখে নিজেকে বড্ড অসহায় লাগছিলো করুনার।কিছু যদি খারাপ হতো মেয়েটার সাথে!মানুষের বেশে মুখোশ পরা হায়নারা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারদিকে।তার ওপর বহ্নির যা রূপ।বুকটা কেঁপে উঠলো অজানা শঙ্কায়।
‘বহ্নি আজ আর পড়বার দরকার নেই,যা ঘুমিয়ে পর গিয়ে।আর কয়েকদিন আর স্কুলে গিয়ে কাজ নেই’,মায়ের কথায় বহ্নি বলে উঠলো,’তুমি ভয় পেয়োনা মা,এবার থেকে আমি আর শর্টকাট ধরে স্কুল যাবোনা,মেইন রোড ধরেই যাবো।তাছাড়া স্কুলে না গেলে পড়া কি করে তৈরি করবো?আমার তো আর সব বই নেই,লাইব্রেরি গিয়ে বই ঘেটে নোটস বানাতে হয় যে’।
করুনা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেশিন চালিয়ে সেলাই করতে লাগলো।সত্যিই কি সুন্দর সাজানো গোছানো সংসার ছিলো তার।কোনো কিছুরই অভাব ছিলোনা।লোকটা যে ওকে ছেড়ে,মেয়েদের ছেড়ে এইভাবে নতুন সংসার পেতে বসবে,সে কথা কি কখনো ভেবেছিলো আগে!সত্যি এই পৃথিবীতে সব আছে,নেই শুধু সত্যিকারের ভালোবাসা।নাহলে ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছিলো অর্নবকে।
বাবা দাদারা বলে দিয়েছিলো,ওই ছেলেকে বিয়ে করলে আর বাড়ি মুখো না হতে।এখন অবাক লাগে করুনার।কি করে যে সবাইকে ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে অর্নবের হাত ধরলো নিজেও জানেনা।দুই ভাইয়ের এক বোন ছিলো করুনা।ওদের মা ছোটোবেলাতেই মারা যায়।বাবা ভাইদের চোখের মনি পরে দাদাদের বিয়ের পর বৌদিরাও আগলে রাখতো ওকে।
অর্নবের সাথে দেখা হয়েছিলো তিয়াশাদের বাড়িতে গিয়ে।তিয়াশার মাস্তত দাদা ছিলো অর্নব।প্রথম প্রথম দু একটা কথা হতো,তারপর কিভাবে যেন দুটো মন মিলেমিশে এক হয়ে গেলো।
অর্নব সবসময় বলতো,’তুমি আমায় বিয়ে না করলে চিরকুমার হয়ে থাকবো’।অথচ ওকে বিয়ে করেও সাধ মেটেনি লোকটার।আবার বিয়ে করে সংসারী হয়েছে।
বুকটা মুচড়ে ওঠে করুনার।চোখ দিয়ে আজ আবার অঝোরে জল পরে যাচ্ছে।মন থেকে আকুল হয়ে ভগবানের উদ্দেশ্যে বললো,’ তুমি শুধু আমার মেয়েদের রক্ষা করো,আমি আর কিচ্ছু চাইনা তোমার কাছে,কিচ্ছুটি না’।
(চলবে)
#অশান্ত বসন্ত
(তৃতীয় পর্ব)
জয়া চক্রবর্তী
(#প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য)
**********************
বেলা হয়ে গেছে।তবুও বালিশটাকে আঁকড়ে পরে আছে বহ্নি। রান্নাঘর থেকে টুংটাং একটানা বাসনের আওয়াজ আসছে।
মাকে সাহায্য করবে ভেবেও উঠতে ইচ্ছে করছে না বহ্নির। দিদিয়াটা পাশে বসে লালা মুছে যাচ্ছে নিজের মতো।
শরীরটাও কেমন ম্যাজম্যাজ করছে বহ্নির।
আসলে ঘুমটাই সেভাবে আসছেনা আজকাল।
বিছানায় শুলেই রাজ্যের চিন্তা চলচ্চিত্রের মতো ভেসে ওঠে মনে।
আসলে মনের সঙ্গে শরীরের একটা বিশাল সম্পর্ক আছে। মন ফুরফুরে থাকলে শরীরটাও ঝরঝরে লাগে। সব কিছুতেই তখন দারুন এনার্জি।
‘আহা! জীবনটা যদি সিনেমার মতো হতো তাহলে বেশ ভালো হতো। আমিও সুন্দর ভাবে একের পর এক ধাপ উপরের দিকে উঠতে থাকতাম।
মা বলে,’প্রতিদিনই নাকি আলৌকিক কিছু ঘটনা ঘটে এই সংসারে, আমাদের অবশ্বাসী মন সেটা মানতে চায়না, তবুও ঘটে’, এবার আমাদের জীবনেও তেমনই কিছু আলৌকিক ঘটনা ঘটুক এমনই চাইছে মন।
মা বলে,’ঈশ্বর তোমাকে যা দিয়েছেন তা দিয়ে তোমায় সবচেয়ে ভালোটা করতে হবে’, এসব ভাবতে ভাবতেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে বসে বহ্নি।
‘কি যে করবে!’দীর্ঘক্ষন ধরে ভেবেও এই সমস্যার কোনো সমাধান বের করতে পারছেনা। বর্তমানে ওর একটাই চিন্তা, ‘কি করে কলেজে ভর্তি হবে!
টাকার অভাবে মাত্র দুটো কলেজেরই ফর্ম তুলতে পেরেছিলো। খুব চাপ ছিলো নাম উঠবে কিনা! তবে ভগবানের কৃপায় রেজাল্ট ভালো হওয়াতে দুটো জায়গাতেই নাম উঠেছে ওর।কিন্তু ভর্তির টাকাটা যে কোথা থেকে আসবে, সেটাই বুঝে উঠতে পারছেনা। ভগবান যে কেন কিছু করছে না এই ব্যাপারটায়!
মাকে বললে মা চিন্তায় পরবে তাই মাকেও টাকা নিয়ে কিছুই জানায়নি বহ্নি।
ফর্মের টাকাটাও যে অনেক কষ্টে জোগাড় করে দিয়েছিলো মা।
অস্তিত্ব প্রমানের লড়াই করতে করতে মাঝেমাঝে বড্ড ক্লান্ত লাগে। তবু পরাজয়ের আখ্যান গাইতে হয়নি কখনো। কোনো না কোনো ভাবে প্রয়োজনটা ঠিকই মিটে গেছে। মিটে গেছে বললে ভুল বলা হবে আসলে প্রয়োজন গুলোই কমিয়ে ফেলেছে জীবনের থেকে। তবে কলেজে ভর্তির প্রয়োজনটা তো আর বাদ দেওয়া যায়না।
অস্থির লাগছে বহ্নির। কান্না পাচ্ছে প্রচন্ড।
তার কথা বলতে না পারা দিদিয়াটাও বোধহয় বুঝতে পেরেছে ওর মনে বয়ে যাওয়া ঝড়ের কথা। লালা মুছতে থাকা ভেজা হাতটা দিয়েই চেপে ধরেছে বহ্নির হাত। যেন ভরসা দিতে চাইছে।
দিদয়ার ভেজা হাতের ছোয়ায় হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পরে বহ্নি। মনের মধ্যে আলোড়ন চলছে,’কি করে আমি কলেজে ভর্তি হবো! কি করে চাকরি পাবো! কি করে তোর অপারেশন করাবো! কি করে নিজেদের বাড়ি বানাবো!’
দিদিয়ার হাতটা এবার বহ্নির পিঠের ওপর উঠে আসে। হাত বুলিয়ে দিচ্ছে দিদিয়া, জল মুছে দিচ্ছে চোখের।হঠাৎই দিদিয়ার হাতটা সরিয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো বহ্নি। আলনা থেকে ওড়নাটা নিয়ে,মাকে কিছু না জানিয়েই, দরজাটা বাইরে থেকে টেনে দিয়ে বেরিয়ে পরলো।
এই ভাবে তো ঘরে বসে থাকলে চলবেনা। একটা ব্যবস্থা তো করতেই হবে। বেশ কয়েকজনকে টিউশন পড়ায়।যদি ওরা অন্তত দুমাসের টাকাটা ওকে অগ্রিম দিয়ে দেয় তাহলে হয়তো ভর্তিটা আটকাবে না।
কিন্তু তারপর? তারপর কি হবে? এই দুমাস তো তাহলে টাকা দিতে পারবে না মাকে।
সংসারের একটা খরচ যে বহ্নির টিউশনের টাকা থেকেই উঠে আসে। আজকাল মা তেমন অর্ডারও পায়না ব্লাউজের। আসলে কাজ জানা লোকের পরিমাণ বেশি আর কাজের পরিমান কম থাকলে যা হয় আর কি!তবুও দোকানে দোকানে ঘোরা আটকায়না মায়ের।
প্রতিদিন ঘরের কাজ সেরে নতুন উদ্দ্যোগ নিয়ে কাজ খুঁজতে বের হয় মা।
ওদিকে কাঁথি থেকে ফিরবার পর থেকে সারাদিন অফিসেই কেটে যাচ্ছে পল্লবের। কাজের চাপটা এতোটাই বেড়ে গেছে যে অনেক সময় বেশ রাত হয়ে যায় ফিরতে। ওর তুলনায় বাকিদের কাজের লোড অনেক কম। ঋতম বলে,’প্রথম দিকে বেশি কাজ দেখিয়ে ফেলেছিস বলেই বেশিরভাগ কাজই এখন তোর ঘাড়ে’।
বস বলেন,’আমাদের ব্যাঙ্গালোরের অফিসে তোমার মতোই একজন কাজ জানা লোক চাই,কবে যাবে বলো?আমরা তোমাকে ফ্ল্যাট,গাড়ি দুটোই প্রোভাইড করবো’,পল্লব বাহানা করে কাটিয়ে দেয়, ব্যাঙ্গালোরে যেতে চায়না কিছুতেই।
প্রতিদিনই অফিস থেকে বাড়ি ফিরে একটু জিরিয়ে নিয়ে স্নান সারে পল্লব। তারপর ক্লান্ত শরীরটাকে নরম বিছানার ওপর ফেলতেই দু-চোখ জুড়ে ঘুম চলে আসে পল্লবের। তবুও ঘুমটাকে দুরে সরিয়ে সেই নাম না জানা মেয়েটার কথা ভাবে। মনে মনে ওর হাতে হাত রেখে গল্প করে। সারাদিনের ভালো খারাপ লাগা গুলোকে শেয়ার করে। সেখান থেকেই ভুল গুলোকে পাশে সরিয়ে রেখে নতুন দিনের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে।
এসবের ভিতরেই মা এসে দাঁড়ায় খাওয়ারের থালা হাতে। পল্লব শুয়ে শুয়েই বায়না করে খাইয়ে দেওয়ার জন্য। মা মাথার চুলে হাত ডুবিয়ে বলেন,’তুই কি আর বড়ো হবিনা?’,মুখে এমন বললেও এক আশ্চর্য প্রশান্তি আর গর্বের ঝলক খেলা করে মায়ের মুখমন্ডল জুড়ে।
মা সারাদিন নিজের কাটানো সময়ের গল্প শোনাতে শোনাতে পল্লবের মুখে ভাতের দলা তুলে দিতে থাকেন।খাওয়ানোর পরে থালা রেখে নিজে হাত ধুয়ে আসেন। আর পল্লবকেও বেসিনে মুখ ধুয়ে আসতে বলে, ব্যস্ত হাতে বিছানার চাদর পাল্টে, মশারির দড়ি লাগাতে থাকেন। পল্লব পিছন থেকে মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,’আমার মায়ের মতো ভালো মা আর কোথাও পাওয়া যাবেনা’,মা হেসে বলেন,’মায়েরা এমনই হয়’।
মা লাইট নিভিয়ে চলে যাওয়ার পরেই পল্লব কোলবালিশটাকে আবার জড়িয়ে ধরে বুকে। চোখ দুটো বুজে মুখ ঘষতে থাকে কোলবালিশে। কোলবালিশটাকেই চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয়। মনে মনে বলে,’তুমি কোথায়?’
কিন্তু এভাবে একতরফা আর কতোদিন! ভিতরে ভিতরে অস্থির হতে থাকে পল্লব। যে মেয়েটাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের স্বপ্ন দেখছে,তার নামটা পর্যন্ত জেনে আসতে পারেনি সে। মেয়েটা আবার তাকে ছেলেধরা বা ধর্ষক ভেবে প্রানপনে ছুটছিলো নিজেকে বাঁচাতে…
কথা গুলো মনে হতেই দম বন্ধ লাগে পল্লবের।কোলবালিশটাকে দুরে সরিয়ে মশারির বাইরে আসে।জানলার পাশে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরায়।
পল্লব ভাবে ফুলমানিকেই দেখাতে হতো মেয়েটাকে। দেখলে নিশ্চয়ই ফুলমানি মেয়েটার সাথে কথা বলে ওর নাম ঠিকানা সব জোগাড় করতে পারতো। তেমন হলে সম্বন্ধ করেই না হয় বিয়েটা হতো দুজনের। যদিও পল্লবের ইচ্ছে ছিলো ভবিষ্যৎ সঙ্গিনীর সাথে চুটিয়ে প্রেম করবে।
গঙ্গার ধারে হাত ধরে দুজনে ঘুরবে, গঙ্গার পারে বসে পা দোলাতে দোলাতে ঘাস ছিঁড়বে, বাদাম- ঝালমুড়ি চিবোবে।
পরন্ত বিকেলে ডুবন্ত সূর্যকে সাক্ষ্মী রেখে চুমু খাবে প্রেমিকার ঠোঁটে। উষ্ণ আলিঙ্গনে প্রেমিকার খোলা চুলে মুখ ডুবিয়ে নিজেদের নতুন জীবনের সূর্যোদয়ের স্বপ্ন দেখবে, ভালোবাসা আর বিশ্বাসের ভিতের উপর গড়ে তুলবে পরম নির্ভরতার ঘর।
স্কুল-কলেজ জীবনে প্রচুর বান্ধবী ছিলো পল্লবের। কেউ কেউ তো পল্লবকে প্রপোজ ও করেছিলো। পল্লবের ওদের ভালো লাগতো কিন্তু ভালো লাগার তীব্রতাটা ততোটা ছিলোনা, যতোটা থাকলে কারো কথা আলাদা করে ভাবার ইচ্ছে হয়। ঋতম বলেছিলো, কাউকে ভালোবাসলে নাকি তার কথা শয়নে,স্বপনে,জাগরনে মনের মধ্যে ঘুরে বেড়ায়।
এতো ব্যস্ততার ভিতরেও সারাদিন মেয়েটা মনের বাগানের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে, একা হলে নিজে থেকেই মেয়েটাকে নিয়ে ভাবতে ইচ্ছে করছে।তারমানে পল্লব ও তবে প্রেমে পরলো।
মনে মনে বলে ওঠে,’ভীষণ ভীষণ ভালোবাসি তোমায় অনামিকা’।
‘প্রেম কথাটাই ছোটো, অক্ষর তার দুটো/যেন একটি কোনো পাখির ঠোঁটে/ছোট্ট সে খড়কুটো’, পিউয়ের মিষ্টি গলায় গানটা অসাধারণ লাগছে পল্লবের।
পিউ ছাদে ঘুরতে ঘুরতে গানটা গাইছে। পল্লব গিয়ে বোনের পিছনে চুপটি করে এসে দাঁড়ালো। হঠাৎ মাথায় আসলো,পিউ প্রেমে পরেনি তো!(চলবে)