হৃদয়েশ্বরী পর্ব-৪৩+৪৪

0
978

#হৃদয়েশ্বরী – ৪৩
সাদিয়া মেহরুজ দোলা

পুবাকাশে লাল আভা ফুটেছে মিনিটখানেক হয়নি। বাতাবরণ এখন স্নিগ্ধ, সতেজ। প্রশান্তিদায়ক প্রভাত বিরাজমান। রাতে এক পশলা বৃষ্টি নামার পর মিনিট দশেক পূর্বে বৃষ্টির তেজ কমেছে। মেঘলা অন্তরীক্ষে তখন ধূসর মেঘের পায়চারি। পূর্ব দিকে বহু কষ্টে কালশিটে মেঘ সরিয়ে সূর্য উঁকি দিচ্ছে। নাম না জানা হরেক রকমের পাখির গুঞ্জনে মুখোরিত তখন বাতাবরণ।শীতল, প্রাণ জুড়ানো সমীরে তখন ভেজা মাটির ঘ্রাণ দমকে ছুটছে। পুরো মহল্লা হিমশীতল আবহাওয়া পেয়ে তন্দ্রায় বিভোর। নির্ঘুম ছটফটে, উড়ন্ত পাখিদের সাথে তখন বোধহয় জেগে কেবল উশান। মুখোশ্রীতে তার চরম ব্যাস্ততা। একবার কল দিচ্ছে কাওকে। তো আরেকবার দ্রুত হাতে টাইপিং করছে ট্যাবে। ল্যাপটপ স্ক্রিনে ভাসা শত শত ছোট্ট অক্ষর গুলোর প্রতি গভীর দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করে মাঝেমধ্যে আবার অবিন্যস্ত ধোঁয়া ওড়া কফির মগে অধর ছোঁয়াচ্ছে।

উজান হেলেদুলে হাঁটছে। আচানক এই ভোরবেলা তাকে উশান জরুরি তলবে ডেকে পাঠিয়েছে তীব্রের মাধ্যমে। পদচারণ কালীন বারংবার ঘুম কাটানোর প্রয়াসে দু’হাত দিয়ে চোখ ডলছে। উশানের কামড়া আরেকটু দূরে। উজান লম্বা কদম ফেললো এবার। ভাই যা বলে তা চট করে শ্রবণ করে ফের রুমে এসে ঘুম দিবে।

-‘ ডেকেছিলি ভাই? ‘

উজান অপ্রতিভ। উশানকে হটাৎ করে গম্ভীর রূপে দেখে সে সকাল সকাল দারুণ ভড়কেছে! উশান তো শান্ত মানুষ। তার মুখে গাম্ভীর্যতা কেনো?নিশ্চিত
গুরুতর কিছু হয়েছে। উজানের অন্তঃকরণ ভীষণ ছটফটে, উচাটন হলো লহমায়। উশানকে মৌন দেখে ফের প্রশ্ন করল,

-‘ ভাই? ‘

-‘ সিয়াকে চিনিস কি করে? কবে থেকে তোদের পরিচয়? ‘

ভরাট কন্ঠস্বর এবং পিছে ফেলা আসা নিজের আবেগকে নিয়ে প্রশ্ন শুনে উজান চমকালো একটু। সে চাইছিল না সিয়াকে নিয়ে আর কোনোরূপ প্রশ্ন বা ঐ মেয়েটা সম্পর্কিত কোনোকিছুই শ্রবণ করতে৷ উজান গিয়ে তীব্রর পাশে বসলো। তীব্রও তখন তার ভাইয়ের মতো গম্ভীর হয়ে।

-‘ সিয়ার প্রসঙ্গ টানছিস হটাৎ। তুই কি করে জানলি ওর কথা?’

উশান বিরক্তবোধ করলো। কড়া দৃষ্টিপাত নিক্ষেপ করে সে শুধালো,

-‘ যা জিজ্ঞেস করেছি, তার উত্তর দে! ‘

-‘ সিয়ার সাথে আমার পরিচয় মীরা ভাবীর মাধ্যমে। সিয়া একটা কেস নিয়ে আমার কাছে এসেছিলো।ও ঢাকার একজন দায়িত্ববান পুলিশ অফিসার খুঁজছিল যে ওর হেল্প করতো। তখন হয়তো মীরা ভাবীর সাথে ওর কথা হয়েছে আর ভাবী আমার নাম সাজেস্ট করেছে। পরিচয় সাতমাস ধরে। তবে কথা হতো মাঝেমধ্যে। ‘

-‘ কেস কতদিন ধরে চলছিলো?’

-‘ এক সপ্তাহ। তেমন মেজর ইস্যু ছিলো না তাই তাড়াতাড়িই সল’ভ হয়ে গেছে। ‘

-‘ কেস যদি এক সপ্তাহেই শেষ হয় তাহলে পরিচয় ৭ মাস ধরে কেনো? মাঝে তোদের কি নিয়ে কথা হতো?’

তীব্রর প্রশ্নে উজানের অবস্থা করুণ। সে এই বিষয়ে কিছুতেই কথা বলতে চাচ্ছিলো না। বিষয়টা থামাচাপা দেয়ার প্রয়াসে উজান শুধালো,

-‘ হটাৎ এসব প্রশ্ন কেনো? তোমরা আমাকে সি.আই.ডি অফিসারদের মতো জেরা কেনো করছো? ‘

উশান নিজের কাজে ব্যাস্ত হলো। নেত্র ইশারায় তীব্র কে বলল কিছু। পরপর তীব্র কর্কশ কন্ঠে বলল,

-‘ শালা গর্দভ! এতকিছু হইতেছে তার খবর রাখস না তুই। সিয়া কাল এসে উশানকে আঘাত করে গেছে। ও আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন ও নিয়ে গেছে! সিয়া রাহনুমার লোক। ইভেন রাহনুমার মেয়ে সিয়া। আমরা এতদিন ধরে যার পিছনে পড়ে আছি, যেই সন্ত্রাসী দলটাকে খুঁজতে এতো কষ্ট, এতো পরিশ্রম তারই লোক তোর সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়ালো তুই টের পেলি না? ‘

উজান চরম আশ্চর্য! অবাকতার রেশ তার রঞ্জে রঞ্জে প্রবাহিত হলো। অন্তঃস্থলের কোথাও মৃদু যন্ত্রণা অনুভূত হলো তার। পরক্ষণেই নিজেকে সামাল দিয়ে বলে উঠলো,

-‘ রাহনুমার মেয়ে সিয়া! জানলে কি করে? ‘

-‘ উশান জেনেছে। ‘

-‘ আমি আসলে এতোটা জানতাম না তবে এটা জানতে পেরেছিলাম সিয়া ঊষা অথবা রাহনুমার লোক। পদক্ষেপ নিতে গিয়ে দেখি ও গায়েভ। তার কয়েকদিন পর ওর দেখা পেয়েছিলাম। থানায় এসে আমার পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলো ওকে বাঁচাতে ওকে কেও নাকি ধ’র্ষ’ণ করেছে। তারপর সেভাবেই কাঁদতে কাঁদতে সেন্সলেস হলো। ডাক্তার কাছে নিয়ে আমি ডাক্তারের সাথে কথা বলার জন্য কেবিন থেকে বাহিরে গিয়েছে পাঁচ মিনিটের মাথায় ফিরে আসতেই দেখি ও নেই। খোঁজার চেষ্টা করেছি এতোদিন। খুঁজে পেলাম না। ‘

মিনিটখানেক সময়ের ঘোরতর মৌনতা বিস্তার। উজান হাসঁফাসঁ করছে কেমন তবে তা উপস্থিত দু’জন ব্যাক্তির অগোচরে। তীব্র মনোযোগ সহিত ভাবছে কিছু। উশান ব্যাস্ত ল্যাপটপে। কয়েকপল সেভাবেই কাটল। অতঃপর ল্যাপটপ স্ব- শব্দে বন্ধ করে উশান ভরাট কন্ঠে বলে উঠলো,

-‘ সিয়া রাহনুমার মেয়ে। রাহনুমা সিয়ার বাবাকে আঁটকে রেখেছি। ক্লিয়ার করে বললে ধরা হয় তাকে কিডন্যাপ করে রেখেছে। সিয়ার বাবা ভালো ছিলো না। বিয়ের পর থেকে রাহনুমা আর সিয়াকে মারধর, অত্যাচার – নির্যাতন করতো। রাহনুমার এ নিয়ে আক্ষেপ ছিলো। তবে কিছু বলতে পারেনি। সুযোগ বুঝে তাকে আঁটকে ফেলেছে যখন থেকে সে সন্ত্রাসী দলটায় যুক্ত হলো। সিয়া কোনো এক কারণে বাবা তাকে এতো অত্যাচার করার পরও সে বাবাকে পাগলের মতো ভালোবাসতো। রাহনুমা প্রতিনিয়ত সিয়াকে দিয়ে খু’ন করায়। টাকার বদলে!ব্লাকমেইল করে সিয়ার বাবাকে দিয়ে। সিয়া টাকার বদলে মানুষ খু’ন না করলে সিয়ার বাবাকে মে’রে ফেলবে এরূপ হুমকি – ধামকি দেয়। মা’ফিয়া টিমটা চলার জন্য বেশ অনেক টাকা লাগে। মোটা অঙ্কের টাকা। তাই ঐ টিমে যারা যুক্ত তারা মূলত এভাবেই নিকট আত্মীয়কে ব্লাকমেইল করে টাকা জোগাড় করে। নয়তো দেখা যায় চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, টাকার বদলে মানুষ খু’ন এসব করে টাকা উপার্জন করে। ‘

উজানের শিরায় প্রবাহিত রক্তের স্রোতে কে যেনো মরিচ ডলে দিয়েছে বোধহয়। তার হটাৎ করেই উশানের কথা শ্রবণ মাত্র পুরো শরীর জ্বলছে।হাতের রগ ফুলে ফেপে উঠছে। ‘ রাহনুমা ‘ নামক ব্যাক্তিটা কে গলা চেপে কঠিন মৃ’ত্যু দেয়ার প্রবল ইচ্ছে উদয় হয়েছে মনের অন্দরমহলে। সে যথাসম্ভব নিজেকে সামলালো। তীব্র অবাকের লেশ নিয়ে বলল,

-‘ তুই এতোকিছু আসতে না আসতেই জানলি কি করে ভাই? ‘

-‘ ক্যালিফোর্নিয়া কি আমি ঘাস কাটতে গিয়েছি?’

গলায় শব্দ করে হাসতে গিয়েও থেমে যায় উজান। প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি তার। উশানের নজরবন্দী হলো তার দৃষ্টি। ভ্র নাচিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ কি? ‘

-‘ ভাই আগে বল তো! তুই ক্যালিফোর্নিয়া ট্রেনিং নিতে গেছিস নাকি স্ট্যাডি লিভ? তুই না তোর পড়া কমপ্লিট করতে গেলি? তাইলে মীরা ভাবী যে কথায় কথায় বলতো তুই ট্রেনিং এ। ‘

উত্তরটা আসলো তীব্রর পক্ষ হতে,

-‘ আরে ব্যাটা! তোর ভাই একটা চিজ বুঝলি? ৩২ বছর বয়সে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট হয়ে আবার ট্রেনিং নিতে গেলো। কতৃপক্ষের কাছে আবেদন করলো তার আরও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন তাই সে ট্রেনিং নিতে চায়। এরই মাঝে স্ট্যাডি লিভ ও। ওখানে গিয়ে পড়াশোনা শেষ করলো। তারপর আবার ১ মাসের ট্রেনিংও নিলো। আমি হইলে তো, একবার ট্রেনিং নিয়ে পড়াশোনা কমপ্লিট করে দেদারসে পদে বসে থাকতাম। কোনো নড়াচড়া নেই। আর এই ব্যাটা, এতোবড় মিশন হ্যান্ডেল করলো। সল’ভ ও করলো তবুও নাকি তার অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। ‘

-‘ ট্রেনিং করেছে কে? ‘

শীতল কন্ঠে প্রশ্ন ছুড়লো উশান। তীব্র হুড়মুড়িয়ে সটান হয়ে বসলো। জিজ্ঞেস করল,

-‘ ট্রেনিং নিস নাই? ‘

-‘ না। ট্রেনিং নাম মাত্র। পড়া শেষ করেছি। ‘

-‘ মাঝে ঐটা কি ছিলো? মিথ্যা ক্যান বললি? ‘

জবাবে অদ্ভুত হেঁসে উঠে দাঁড়ালো উশান। প্রতিত্তুর করলো না। কিছু বুঝতে না পেরে হতবিহ্বল হয়ে রইল তীব্র, উজান। তীব্রর ট্রেনিং ছিলো অন্যত্রে।তাই সে উশানের দিকটা ধ্যান দিতে পারেনি।

___

মীরার মাস্টার্স প্রায় শেষের পথে। ফাইনাল এক্সাম তার সামনের সপ্তাহ থেকে শুরু। তারপরই তার মাস্টার্স কমপ্লিট। আগেই শেষ হতো। সে এখন তার জুনিয়রদের সাথে ক্লাস করছে। তার সহপাঠীরা বহু আগেই মাস্টার্স শেষ করে এখন চাকুরীরত। মাঝে ৬ মাসের জন্য সে কোমায় যাওয়াতে সবটা এলোমেলো হয়েছে। নয়তো এতোদিনে তার মাস্টার্স শেষ হয়ে যেতো।চোখের পলকে কিভাবে দুই বছরের বেশি সময় সমাপ্ত হয়ে গেলো তার হিসাবনিকাশ মিলাতে পারছে না কিছুতেই সে। তার এখনো মনে হয়, এইতো সবেমাত্র ক্যালিফোর্নিয়ায় পা দিলো সে। সবটা নতুন, অপরিচিত, অচেনা!

-‘ ভাই জীবনটাই রঙহীন। কোনো বিনোদন নাই।এই জীবনে কি করলাম? ‘

রুহির হতাশ কন্ঠস্বর। এই কথাটা সে সকাল হতে বলছে। কেনো বলছে? তা জানা নেই মীরার। তবে সে আশঙ্কা করেছে হয়তো রুহির ব্রেকআপ হয়েছে আবার। তাই এসব উদ্ভট কথা বলছে বারংবার।

-‘ মীরা? দোস্তও! আমার দিকে একটু তাকা না? ‘

মীরা ঘুরে বসলো। হাতের কলম শব্দ করে রাখলো টেবিলে। জিজ্ঞেস করল,

-‘ চড়াবো ধরে বেয়াদব! কি সমস্যা? ‘

-‘ লাল মুরগীর সাথে আমার ব্রেকআপ হইছে জান।’

‘ লাল মুরগী ‘! উদ্ভট শব্দ দু’টো শুনে মীরার উচিত এখন শব্দ করে হাসা। কিন্তু সে হাসলো না। গম্ভীর রইল। গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,

-‘ লাল মুরগী কে? তোর বয়ফ্রেন্ড? ‘

-‘ এক্স! এক্স বয়ফ্রেন্ড। ‘

-‘ তোর কি আর কোনো কাজ নাই রুহি? কেনো এসব করিস? আর কতদিন! আর কতো গুলো দিন এভাবে চলবি? ‘

নিরুত্তর রুহি। জবাব আসলো না। বিড়বিড় করতে করতে সে প্রস্থান করলো কামড়া হতে। আপাতত প্রশান্তি! মীরা ঘুরে বসে পড়া শুরু করতেই তার মাথায় ‘উশান ‘ নামক পোকা গুলো আচানক চেচামেচি করে উঠলো। মীরা বুঝলো, এখন যদি সে উশানের সাথে কথা না বলে তাহলে সে শান্তি পাবে না কিছুতেই।

রিং বাজছে অনবরত। ফোন তুলছে না উশান। মীরা হতাশ হয়ে কান থেকে ফোন নামাতে নিবে তৎক্ষনাৎ অপাশ হতে ভেসে আসলো উশানের দূর্বল কন্ঠ,

-‘ বলো মীরা। শুনছি! এনিথিং সিরিয়াস? ‘

ভেবেচিন্তে মীরা জবাব দিলো কিছুক্ষণ পর।

-‘ সিরিয়াস কিছু ছাড়া কি তোমাকে ফোন করা যাবে না? নিষেধাজ্ঞা আছে? ‘

-‘ তা না মীরা। আচ্ছা লেট ইট বি! হটাৎ ফোন দিলে যে? ‘

-‘ আমার পড়াশোনা প্রায় শেষ উশান। সামনের সপ্তাহ থেকে এক্সাম তারপর ফুলফিল ফ্রী! আমি বাংলাদেশে ফিরবো। ‘

কিয়ৎক্ষণ বুক ধরফর করা মৌনতা চলল। আচানক অপাশ থেকে উশান রসিকতার সুরে বলল,

-‘ বাব্বাহ! আমার আদর পাওয়ার জন্য এতো উতলা? এক্সাম শেষ হতে না হতেই ফিরে আসার বার্তা জানাচ্ছো? ওকে, কাম টু মি জান! আই ওয়ান্ট টু লাভ ইউ। ‘

মীরা কপাট রাগ দেখিয়ে তৎক্ষনাৎ শুধালো,

-‘ এসব আজেবাজে কথা ছাড়া তোমার মাথায় কি কোনোকিছুই আর ঘুরেনা? আশ্চর্য! ‘

-‘ না তো। সবসময় এসবই ভাবি। মেইন কথা কি জানো? তুমি আপাদমস্তক মানুষটার কথা আমার মনে পড়লে শুধু আদর, ভালোবাসা পায়। বুঝেছো? ‘

চলবে~

[ রি – চেইক করিনি। ]

#হৃদয়েশ্বরী – ৪৪
সাদিয়া মেহরুজ দোলা

উশানের মাত্রাতিরিক্ত ব্যাস্ত সময় কাটছে। ব্যাস্ততার দরুন খাওয়া – দাওয়াও সে করতে পারছে না ঠিক মতো। ঘুম তো দূরে থাক!উশান যেই মিশনের দায়িত্ব পেয়েছে সেই মিশনে যাওয়ার জন্য পূর্ব প্রস্তুতি এবং একটা টিম গঠন করতে হয়েছে তাকে। টিমকে প্রতি মূর্হত সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞান দেয়া, কিভাবে কি করতে হবে তা সম্পর্ক বিশদ বর্ণনা সাথে মিশনে কিভাবে সফল হওয়া যায় পূর্ণ রূপে তার পরিকল্পনা তৈরি! সব মিলিয়ে শ্বাস ফেলার সুযোগটুকু তার নেই আপাতত। মীরার সাথে উশানের কথা হয়না বেশ কয়েকদিন। উশান সুযোগ পাচ্ছেনা ফোন দেয়ার। মীরাও ফোন দিচ্ছে না। দুই, একবার যা দিয়েছিলো সেই ফোনকল রিসিভ করতে পারেনি সে! তারপর হতেই মীরা তাকে আর কল দেয় না। উশান ভেবেই নিয়েছে, মেয়েটা নিশ্চিত অভিমানে গাল ফুলিয়ে রয়েছে।

-” স্যার আপনার গাড়ি বের করেছি। ”

উশান ল্যাপটপ হতে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত সরালো। সামনে দাঁড়ানো অল্প বয়স্ক তরুণ যুবক। সে মূলত এখানকার পরিচ্ছন্ন কর্মী এবং সিকিউরিটি গার্ড। নাম তুরান! বয়স খুবই কম।

-” যাও আসছি আমি। ”

প্রতিত্তুর শ্রবণ করা মাত্র তুরান সালাম দিয়ে প্রস্থান করলো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কামড়া থেকে। উশান উঠে দাঁড়ায়।আজ তাকে নিজের ফ্লাটে ফিরতে হবে।গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু তথ্য বাসায় রাখা। যা এ মূর্হতে প্রয়োজন তার। তথ্যভর্তি ফাইলটা দিগন্তকে আনতে বলেছিল উশান। কিন্তু এই দিগন্ত একবার ফোন তুলে ‘ হ্যা স্যার, আনছি স্যার। ‘ বলা শেষে ফোন সেই যে কাটলো, বর্তমানে তিন ঘন্টা পেরিয়ে গেছে দিগন্ত আসেনি। উশানের ফোনও ধরেনি। দিগন্তের এমন হেয়ালিপনায় উশান ক্ষুদ্ধ ভীষণ! ছেলেটা গেলো কোথায়? তাকে কিছু না বলে এভাবে হুট করে গায়েভ হওয়ার মানেটা কি? আশ্চর্য!
মাত্রাতিরিক্ত বিরক্তি, একরাশ রুষ্ঠতা নিয়ে নিজের ফ্লাটে পৌঁছাতে উশানের প্রায় আধাঘন্টার মতো সময় লাগল। কাঙ্ক্ষিত পৌঁছাতেই লম্বা লম্বা পা ফেলে সে নিজের ফ্লাটের উদ্দেশ্য চলল। বহুদিন আসা হয়নি তার এখানে। ঢাকায় আসার পর সে উজান, উমাইশার সাথেই থাকতো। উশান ঠিক করলো এ মাসেই ফ্লাটটা ছেড়ে দিবে। অযথা তাকে মোটা অঙ্কের ভাড়া দিতে হচ্ছে প্রতিমাসে।

ফ্লাটের সামনে এসে উশান বুঝতে পারলো কিছু একটা ঠিক নেই। গড়বড়, ঝট পেকেছে বিশাল!তার ফ্লাটের দরজা উন্মুক্ত। নবের লক ভাঙা। কোমড়ের কাছে গুঁজে রাখা পি’স্তলটা আলগোছে হাতে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো উশান। ফ্লাটে পুরোদস্তুর মৌনতার বিস্তার। আঁধার লেপ্টে আছে চারিপাশে। গুমোট পুরো ফ্লাট! দক্ষিণ দিকের উন্মুক্ত কপাট দিয়ে বাতাস আসছে। সতেজ বাতাস। সাইঁ সাইঁ শব্দ তুলছে প্রাণবন্ত অনিল। অনিলে বইছে পোড়া গন্ধ। কোনো কাঠ অথবা পাতা পোড়ানোর গন্ধ না পোড়া লা’শের গন্ধ। উশানের মস্তিষ্ক সচেতন হলো তুমুল। তার স্নায়ুকোষ উদগ্রীব হয় জানতে, আবার কার প্রাণ ঝড়লো?
উশান খেয়াল করলো পোড়া লা’শের গন্ধটা তার শয়নকক্ষ হতে ভেসে আসছে। উশান নিঃশব্দে এগোল সেদিকটায়। শয়নকক্ষে প্রবেশ করতেই আচানক স্ব-শব্দে দরজা বন্ধ হয়ে যায় কামড়ার। তৎক্ষনাৎ কামড়ায় থাকা লাইটের সুইচ অন করে কেও। আঁধারে বিলীন কক্ষে রশ্মির উৎপত্তি হওয়ার পর উশানের সর্বপ্রথম দৃষ্টি আটকায় মেঝেতে পড়ে থাকা দিগন্তের পোড়া লা’শের পানে। দিগন্তের পুরো দেহ ঝলসানো! শুধুমাত্র মুখোশ্রী বাদে। যার দরুন দিগন্তকে চিনতে বেগ পেতে হয়নি উশানের। শান্ত দৃষ্টিপাতে দিগন্তের প্রাণহীন দেহ পরখ করে সম্মুখে তাকাল। এরিক বসে! পায়ের ওপর পা তুলে। তার পাশে দাঁড়িয়ে চারজন রা’ইফেল হাতে।

এরিক বিদ্রুপ হেঁসে বলল,

-” বুকে লাগল লা’শ দেখে?”

উশান তখনও শান্ত। নেত্রযুগলে কোনো অস্থিরতা নেই। রাগ নেই! নেই কোনো তাড়া। অতীব শীতল গলায় সে প্রশ্ন ছুড়লো,

– ” মে’রেছিস কেনো ওকে? ”

-” জানিস না কেনো মে’রেছি? তুই আমার তূর্শীকে জেলে পাঠিয়েছিস। ওকে অযথা শাস্তি দিয়েছিস। ”

-” অযথা? তূর্শী মীরাকে মা’রতে এসেছিলো। স্পষ্টত প্রমাণ আছে। আদালতে ও দোষী সাব্যস্ত হয়েছে। শাস্তি পেয়েছে! এখানে দিগন্তের কি দোষ?কাপুরুষ এর মতো ওর প্রাণ কেনো নিলি? ”

এরিক দাঁত কিড়মিড় করে উঠে দাঁড়ালো। পারে না সে এখনি মে’রে ফেলে উশানকে। ভীষণ কষ্ট দিয়ে! মীরার ব্রেইন স্ট্রোক করার পিছনে তূর্শীর হাত আছে সহজ ভাষায় তূর্শী ইচ্ছাবশত মীরাকে অসুস্থ অবস্থায় মানষিক চাপসহ আঘাত করেছে। যার ফলস্বরূপ মীরা তৎক্ষনাৎ ব্রেইন স্ট্রোক করে বসে। তারপর কোমা। উশান ভাবেনি তূর্শী এমনটা করতে পারে। তার ধ্যান ছিলোনা তূর্শীর প্রতি। তবে সেদিন পার হওয়ার কয়েকদিন পর মীরা যেই আই.সি.ইউ তে এডমিট ছিলো সেই আই.সি.ইউ কক্ষে সিসি ক্যামেরা ছিলো। সেখান থেকেই যাবতীয় সব প্রমাণ পেয়েছে সে। মীরার ব্যাপারটা শুধুমাত্র তূর্শীর দ্বারা সংঘটিত বাকিদের ওপর আক্রমণ করার চিন্তাটা আসলে রাহনুমাই করেছে।পূর্ণ ঘটনা জানার পর উশান সেখানকার থানায় মামলা করে। মামলা চলে বেশ কয়েকমাস।অবশেষে কোর্টে সকল প্রমাণ সাপেক্ষে তূর্শীর শাস্তি হয়! ১২ বছরের জেল। এই সম্পূর্ণ বিষয়টি উশান সবার থেকে গোপন রেখেছে। কাওকে জানায়নি। জানতে দেয়নি!

-” তুই তূর্শীকে ইচ্ছে করে জেলে পাঠিয়েছিস। ইচ্ছে করে! এই দিগন্ত আমার তূর্শীকে ধরে নিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছিল। তাই ওকে পুড়িয়ে মে’রেছি। তোকে তো মারবো টুকরো টুকরো করে কেটে। ”

উশান গলায় শব্দ করে হেসে ফেলল। যেনো সে কোনো কৌতূক শ্রবণ করেছে সবেমাত্র। হাস্যরত অবস্থায় সে জিজ্ঞেস করল,

-” আচ্ছা? দারুণ তো! আমাকে টুকরো টুকরো করে কা’টবি তুই? তোর মতো কাপুরুষ? ভীতু? বাহ! ”

এরিক উশানের পায়ে লাথি মারলো। উশান নড়লো না একটুও। নিজের স্থানে সে অটল। ওষ্ঠাধর কোণে তার তেরছা হাসি। এরিক রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শুধালো,

-” তোর মতো কুত্তা’কে ধরবো আমি?এই এরিক ইহরাম? হাহ্! তোকে মারবে এরা।”

মোটাসোটা চারটে পুরুষের দিকে ইঙ্গিত করলো এরিক। উশান সোজাসুজি দৃষ্টি ফেলল এবার সেই চারটে দানবীয় মানবের প্রতি। আকার – আকৃতিতে এক একজন বিশাল! দেখে মনে হবে কাবুলের সেই দানবীয় লম্বা চওড়া পুরুষ। উশান গাল চুলকালো। বলল,

-” তোরা মার’বি আমাকে? ফাইন! কতো টাকা দিল এই এরিক আমায় মা’রতে? ”

চারজন একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলো। শেষে সত্য কথাটাই বলে ফেলল,

-” ১০ লাখ! ”

তৎক্ষনাৎ মুখোশ্রী বেজায় বিরক্তি, একরাশ তিক্ততা নিয়ে কুঁচকালো উশান। মুখোশ্রীতে তার অসন্তুষ্টতা। বিরক্ত গলায় শুধালো,

-” আমাকে মা’রার জন্য এতো কম রেট? ”

উপস্থিত চারজনকে সুক্ষ্ম নজরে অবলোকন করল উশান। অতঃপর নীরবতা বিরাজ ফ্লাটটায় ছোট্ট খাটো বিস্ফোরণ ঘটালো। লুকিয়ে রাখা পিস্তলটা হাতে নিয়ে পিঠ পিছ থেকে দু’জনকে গুলি করল। আচানক গুলি বর্ষণে প্রথম কেও কিছুই বুঝলো না।যখন বুঝলো তখন অনেক দেরী হয়ে গিয়েছিলো। লহমায় চারটে তাগড়াই পুরুষের প্রাণহীন দেহ পড়ে রইল মেঝেতে। এরিক বিষ্মিত! উশান এরিকের হতভম্ব মুখোশ্রী দেখে হাসলো কতক্ষণ।

-” তুই কি ভেবেছিস? তোকে মা’রার জন্য আমি মাত্র চারজন এনেছি? হু? পিছে দেখ! ”

উপস্থিত হলো আরো পাঁচজন। উশান ভ্রু’কুটি একত্র করলো বিরক্তিতে! তাকে ফিরে যেতে হবে যত দ্রুত সম্ভব। আর এই এরিক গর্দভটার এখনি কাহিনি শুরু করতে হলো? উশান বিরক্তিমাখা কন্ঠে শুধালো,

-” শুধু শুধু নিজের টাকা ওয়েস্ট করছিস ভাই। এই পাঁচজনকে মার’তে আমার পাঁচ মিনিটও লাগবে না।”

কলিংবেলের তীক্ষ্ণ শব্দ!
সজাগ, সচেতন হলো এরিক। উশানের মনটা তখন খচখচ করছে। কে এলো? তাও এসময়! মনে মনে সে দুআ করলো যেনো আপনজন না হয়। তাহলে তাকে দূর্বল হয়ে পড়তে হবে। এরিক সুযোগ বুঝে দেখা যাবে আক্রমণ করে বসেছে।

.
দুই, তিনবার উশানের ফ্লাটের কলিংবেল বাজিয়ে থামলো মীরা। অপেক্ষায় রইল কখন উশান দরজা খুলবে। আজই ঢাকা ফিরেছে সে। একটু আগে। ফিরেই সে তীব্রর থেকে উশানের খবরা-খবর নিয়েছে। যখন জানতে পারলো উশান তার ফ্লাটে। তখন বিন্দুমাত্র সময় অপচয় না করে সে দ্রুত পদে এসে পৌঁছালো এখানে। তার মনের অন্দরমহল উচাটন হয়ে। আচ্ছা উশান যখন তাকে প্রথম দর্শন করবে তখন তার প্রতিক্রিয়া কেমন হবে?
মীরা ধৈর্যহারা হয়! পরপর দুইবার বেল বাজায় পুনরায়। আশ্চর্য তো! উশান কেন এতো দেরী করছে দরজা খুলতে? লোকটা কি ঘুমে?

উশানের মাথার পিছে এরিক পি’স্তল ধরে। হেলে দুলে আলসেমি নিয়ে হাঁটছে উশান। এরিক বার কয়েক ধমকেছিল উশানকে এতোটা আস্তে হাঁটার জন্য। কিন্তু উশান তো উশানই! সে কি কারো কথা শোনে?

কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা আতঙ্ক সহিত উশান সদর দরজা খুললো। সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হলো তার মীরার হাস্যজ্বল মুখোশ্রী। কন্ঠের খাদ নামিয়ে সে বলল,

-” মীরা..,”

মীরা জড়িয়ে ধরতে নিচ্ছিলো উশানকে। তবে তা সম্ভব হয়না। তার হাস্যজ্বল মুখোশ্রী অমাবস্যার আঁধারে ছেয়ে যায় লহমায় যখন সে উশানের পেছনের দৃশ্য দর্শন করল। হতবুদ্ধি হারিয়ে পল্লব ঝাপটালো কয়েকবার মীরা। প্রতিক্রিয়া দেখানোর পূর্বে, উশান যখন মীরাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দরজা আঁটকে দেয়ার ফন্দি আটঁছিলো তখনি এরিক মীরার হাত ধরে হেঁচকা টানে মীরাকে ছিটকে ফেলে মেঝেতে। শব্দ করে দরজা লাগিয়ে দেয় চটজলদি।
কন্ঠ দিয়ে অস্ফুটে আর্তনাদ করল মীরা আঘাত পেয়ে। হাতে লেগেছে তার! এতোটা জোড়ে ছুঁড়ে মারার কারণে। উশান ঝটপট এগোল মীরার নিকট। মীরাকে তুলে নিজের কোলে বসিয়ে শুধালো,

-” লেগেছে কোথাও? ”

এরিক উশানের মুখোশ্রীর অস্থিরতা নিখুঁত ভাবে পর্যবেক্ষণ করল। পরপর সে হাসলো। উদ্ভট হাসি। এইতো! সে পেয়ে গেছে উশানের দূর্বলতা কে। আর কি চাই তার?

চলবে~

#হৃদয়েশ্বরী
সাদিয়া মেহরুজ দোলা

৪৪. | বর্ধিতাংশ |

কামড়া জুড়ে পিনপন নীরবতা। দূর – দূরান্ত হতে ভেসে আসা যানবাহনের শব্দ ব্যাতীত ফ্লাটটায় আর কোনো শব্দ নেই। মীরা মেঝেতে বসেছিল এতক্ষণ। উশানের চক্ষু ইশারা পেয়ে চটজলদি উঠে দাঁড়ালো। উশান অন্যত্রে দাঁড়িয়ে। তার হাত দু’টো পিছমোড়া করে বাঁধা। মুখের ভেতর রুমাল ঢোকানো।চেঁচানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ রাখা যাবেনা বলে এরিক এমনটা করেছে। মীরা ডান হাত জখম হয়েছে। ছিলেঁ গিয়ে র’ক্ত পড়ছে। সে আশপাশ তাকাল। তার অস্থির দৃষ্টি গিয়ে নিবদ্ধ হলো শয়নকক্ষে। শয়নকক্ষের মেঝেতে পড়ে থাকা দিগন্তের লা’শ দর্শন মাত্র মীরা প্রায় লাফিয়ে উঠলো! কাঁপা কন্ঠে অস্ফুটস্বরে বলল,

-” দিগন্ত? ”

এরিক এগিয়ে আসল। হেলতে দুলতে উশানের কপি করে। দুই পকেটে হাত পুড়ে বলে উঠলো,

-” মে’রে ফেলেছি! পুড়িয়ে মে’রেছি আগুনে। ভাবছি তোমাকেও ওভাবে মা’রবো। কি বলো? নাকি অন্য কোনোভাবে মরতে চাও? ”

মীরা স্থিরচিত্তে তাকাল। জমাট গলায় শুধালো,

-” আপনি কে?এমন কেনো করছেন? ”

আকাশ’সম বিরক্তি সহিত এরিক মুখোশ্রী কুঁচকে নিল। তার চোখেমুখে দারুণ বিরক্তি! কন্ঠে বিরক্তি মাখিয়ে বলল,

-” এতবার একই কথা রিপিট করতে পারবো না। এই একে ধর তো!আগে উশানের প্রাণ ভোমরাকে সুন্দর করে মে’রে নেটওয়ার্কে বাহিরে পাঠাই। ”

মীরা হতবিহ্বল চোখে চাইল। উশানের পানে দৃষ্টি ফেলতেই উশান তাকে নেত্র ইশারায় কিছু বলল। মীরা বুঝতে পারল তা।শুকিয়ে চৌচির হওয়া গলায় সিক্ততা প্রদানের জন্য পরাপর তিন, চারটা ঢোক গিললো সে। দু’জন লোক যখন তাকে ধরার জন্য আসছিলো তখন মীরা উপস্থিত পাঁচটি মানুষের চক্ষু অগোচরে নিজের হিজাবের লম্বা লম্বা পিন গুলো খুলে হাতে নিল। পিন গুলো বেশ বড়! দু’জন ব্যাক্তি এগিয়ে আসা দেখে উশান তার হাতের রশি গুলো সম্পূর্ণ রূপে খুললো। প্রায় অনেকক্ষণ যাবৎ পিছন হতে তার ছু’রিটা দিয়ে অল্প অল্প করে রশি কাটছিল সে। অবশেষে কাটা শেষ! তার দু’হাত বর্তমানে মুক্ত।
মীরার পেছন হতে দু’জন এগিয়ে আসার পরপরই মীরা সামনে ঘুরে থাকা অবস্থায় হাতের ডগায় সুক্ষ্ম পিন দু’টো নিয়ে হাত উল্টো করে দু’জনের চোখের মাঝ বরাবর ঢুকিয়ে দেয়। তৎক্ষনাৎ লোক দুটো আর্তনাদ উঠে।মেঝেতে পরে থাকা পি’স্তল হাতে নিয়ে মীরা এবার গু’লি ছুঁড়ে দিল। সেকেন্ডের মাঝে দুইজন মৃ’ত্যুবরণ করে। মীরার হাত তখন কাঁপছে।ক্রমাগত, বিরতিহীনভাবে। উপস্থিত বাকি সকলে স্তব্ধ! তারা ভাবতে পারেনি মীরা এমনটা করতে পারবে।

উশান উঠে দাঁড়িয়ে বাকি তিনজনের মাঝে দু’জন কে গু’লি ছুঁড়ে মারে। গু’লি দু’টো সঠিক নিশানা অনুসারে গিয়ে লাগে সেই দু’জনের মাথার মাঝখান বরাবর। বাকি রইল একজন! সে এগোচ্ছিল মীরার প্রতি। মীরা অপ্রতিভ চোখে চেয়ে নিচে পড়ে থাকা পি’স্তল পল্লব ফেলার পূর্বেই হাতে তুলে গু’লি ছুঁড়ে পঞ্চম জনের দিকে। অতঃপর আরও একটি এবং অবশিষ্ট সেইজন তার প্রাণহীন দেহ নিয়ে মেঝেতে আছড়ে পড়ে৷ এরিক নির্বাক ভূমিকায় সবকিছু দেখছিল এতক্ষণ যাবৎ! মস্তিষ্ক তার শিথিল হয়ে। পরপর সে সজাগ হলো। তাকে কিছু একটা করতে হবে। নয়তো মৃ’ত্যু নিশ্চিত!

এরিক তার হাতের পি’স্তলটা নিয়ে দৌড় লাগালো মীরার নিকট। মীরার পিছে গিয়ে মীরার মাথায় পি’স্তল ঠেকালো। মূর্হতেই সে তৈরি করে ফেললো একটি ‘ সিনেমাটিক ‘ পরিবেশ! উশান মীরার দিকে এগোতে নিয়ে থামলো৷ এরিকের কাণ্ডজ্ঞান দেখে সে হেঁসে ফেলল।

-” তোর মতো পুরুষের কাছে আসলে এটাই আশা করা যায়। সরাসরি পারলে আমার মুখোমুখি হ! ”

উশানের কথা শ্রবণ মাত্রই এরিক রাগে ফেটে পড়ল। সে মীরার কাঁধ ঝাপটে ধরে উশানের বাম হাতে গু’লি ছুড়লো।গু’লিটা লাগল উশানের বাহুতে।মীরা চেঁচাল! তার নেত্রযুগল অস্থিরচিত্তে উশানের পানে নিবদ্ধ হলো। ব্যাকুল কন্ঠে শুধালো,

-” আল্লাহ!উশান, তুমি ঠিক আছো? ”

দাঁতে দাঁত চেপে ব্যাথা সহ্য করে নিয়ে উশান তাকাল সম্মুখে। মাথা উপর – নিচে হেলিয়ে জানাল, সে ঠিক আছে। কিন্তু মীরার মন মানলো না। উশান এর বাহু থেকে অনবরত র’ক্ত ঝড়ছে! মুখোশ্রীতে তার যন্ত্রণার আচঁ। উশান নিজেকে সামলে নিলো মূর্হতে। আঘাতপ্রাপ্ত স্থান চেপে ধরে সটান হয়ে দাঁড়াল। কঠিন গলায় বলল,

-” ওকে ছাড় এরিক। তোর সমস্যা আমার সাথে ওর সাথে না। ওকে যেতে দে! ”

-” সমস্যা আমার তোদের দু’জনের সাথেই। ওকে তো পরে মা’রবো ভাবছিলাম। আজ হুট করেই পাখি খাঁচার ধরা দিল। তূর্শীর বর্তমান হাল ওর জন্য।ওকে আমি কি করে ছাড়ি? ”

‘ তূর্শী ‘ নামটা বিদুৎস্পষ্টের ন্যায় মীরার মস্তিষ্কে বাড়ি খেলো। তাহলে এতক্ষণ যাবৎ যা হচ্ছে তার মূল হোতা কি তূর্শী? মীরা সচেতন চাহনি মেললো পিছনে একবার। এরিক তৎক্ষনাৎ মীরার ঘাড়ে গুঁতো দেয় পি’স্তল দিয়ে।মীরা ফের সম্মুখে দৃষ্টিপাত আবদ্ধ করে। খুবই সন্তপর্ণে পরিহিত পোশাকের নিচে গুঁজে রাখা উশানের দেওয়া ছোট্ট ছু’রিটা সে বের করে নেয়। আস্তে ধীরে! এরিককে বুঝতে না দিয়ে। উশান বেসামাল চাহনি নিক্ষেপ করে রয়েছে। মীরা ঠিক কি করতে চাচ্ছে? তা হয়তো সে বুঝতে পারল। চট করে দৃষ্টি সরালো। মীরা ততক্ষণে হাতের ছু’রিটা হাত পিছে নিয়ে কায়দা করে এরিকের পেটে ঢুকিয়ে দিয়েছে। এরিক হাতের পি’স্তলটা মাটিতে ফেলে আর্তনাদ করে পিছু সরলো। পেট দিয়ে তার গলগল করে রক্তিম তরল পদার্থ দেহের বাহিরে বের হচ্ছে। উশান দৌড়ে গেল এরিকের নিকটবর্তী। হাতে থাকা নিজস্ব পি’স্তলটা দিয়ে এবার দুটো গু’লি ছুঁড়ে দিল এরিকের বক্ষঃস্থলে। তৃতীয় গু’লি ছুড়লো মাথা বরাবর। মাঝখানটায়! শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির ইতি হলো সে লহমাতেই।

-” তোমার হাত দিয়ে তো অনেক রক্ত পড়ছে। ”

মীরার উদগ্রীব’তা দেখে উশান ম্লান হাসলো। তার বাহুতে এখন তেমন একটা ব্যাথা অনুভূত হচ্ছে না।উশান হাত বাড়িয়ে মীরাট গাল স্পর্শ করল। মীরা কাঁপছে তখন।কাঁপাকাপিঁর কারণটা উশানের জানা আছে। মোলায়েম কন্ঠে সে শুধাল,

-” ঠিক আছো তুমি? ভয় লাগছে? ”

মীরা ফ্যালফ্যাল করে তাকাল৷ প্রশ্ন করল,

-” ভয় কেনো লাগবে?”

-“উঁহু! বাদ দাও। ছু’রিটা রেখেছিলে কাছে? আমি তো ভেবেছিলাম ফেলে দিয়েছ। ”

-” ফেলেই দিতে চাইছিলাম। পরে মনে হলো রেখে দেই। ”

-” ভালো করেছ। আজ কেমন দারুণ কাজে লাগল দেখলেনা? আমার কথা তো শোনো না! বদমাশ! ”

উশানকে টেনে মীরা একটা কামড়ায় নিয়ে গেল। সে এগোল কার্বাডের কাছে। এখানে ফাস্ট এইড বক্স আছে। মীরা জানত তা। ফাস্ট এইড বক্স এনে মীরা উশানকে উদ্দেশ্য করে বলল,

-” শার্ট খুলো তো! ড্রেসিং করতে হবে। ”

উশান বিনাবাক্যে তাই করল। শুয়ে ছিলো সে। উঠে বসে শার্ট খুলে ফেলল। ইউনিফর্ম পড়া ছিল সে।নষ্ট হয়ে গিয়েছে তার ইউনিফর্মটা র’ক্ত মেখে।

প্রথমবার উশানকে মীরা বোধহয় শার্টলেস অবস্থায় দেখল। মীরার উচিত এখন লজ্জা পাওয়া!চরম লজ্জা।কিন্তু সে পেল না।স্থিরচিত্তে কাঁপাটে হাতে র’ক্ত পরিস্কার করছিল। ড্রেসিং শেষে ব্যান্ডেজ করতে নিবে তৎক্ষনাৎ উশান বলল,

-” উহ্! ব্যান্ডেজ করোনা। গু’লি ভেতরে রয়ে গেছে। বের করতে হবে। ”

মীরাকে এ মূর্হতে ভীষণ অসহায় রূপে দেখা গেলো।তার পক্ষে কিছুতেই মাংস খুঁচে গু’লি বের করা তো আর সম্ভব না। কিছুতেই না! সে ধরা গলায় বলল,

-” চলো হসপিটালে যাই। আমার পক্ষে গু’লি বের করা সম্ভব না। দ্রুত ওঠো। ”

আলসেমি নিয়ে উশান উঠে বসল। মুখোশ্রীতে তার বিরক্তি মাখামাখি। ফাস্ট এইড বক্স থেকে সার্জিক্যাল ইন্সট্রুমেন্ট নিয়ে সে এগোল ড্রেসিং টেবিলের দিকে। যেতে যেতে বলল,

-” এটা আমি নিজেই করতে পারবো। হসপিটালে যাওয়ার দরকার নেই। ”

আরশিতে নিজের ক্ষতস্থানটা গভীর চোখে দেখল কতক্ষণ উশান। গু’লিটা আঁটকে রয়েছে হাড্ডিতে। বের করতে বেশ বেগ পেতে হবে। সে সার্জিক্যাল ছু’রিটা হাতে নিল। খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বের করতে লাগল গু’লিটাকে। মীরা তখন থ! হাত পা অবশ হয়ে তার। লোকটা কি মানুষ? এভাবে গু’লি বের করছে।ব্যাথা পাচ্ছে না? উঁহু!চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে খুব মনোযোগ সহকারে সাধারণ কোনো কিছু করছে।যন্ত্রণার বিন্দুমাত্র আচঁ নেই মুখোশ্রীতে।ছু’রি দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গু’লি বের করা শেষে উশান ফিরে এলো নিজের আগের স্থানটায়।

-” তুমি কি মানুষ? ”

উশান দুর্বোধ্য হাসলো৷ মোলায়েম কন্ঠে শুধাল,

-” নাহ তো! আমি মানুষ না। আমি জ্বিন, ভ্যাম্পায়ার অর সামথিং। তোমার আমাকে কোনটা মনে হয়? ”

-” ফাজলামো করবে না! ”

-” ফাজলামো কই করছি জান? ”

-” টিপিক্যাল ওয়ার্ড ইউজ করবে না। ”

উশান শব্দ করে হেঁসে ফেলল। ক্লান্ত দেহ এলিয়ে দিল তুলতুলে বিছানায়। মীরা এবার নরম হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল। মীরাকে দেখতে দেখতে উশান জিজ্ঞেস করল,

-” হটাৎ আমাকে মানুষ মনে হলো না কেন তোমার?কিসের পরিপ্রেক্ষিতে এই কথা বললে? ”

মীরা ব্যান্ডেজ করা শেষ করল। জবাব দিল,

-” যেভাবে গু’লি বের করছিলে..! ব্যাথা লাগেনি?”

-‘ উঁহু তো! নাহ্।” হাসতে হাসতেই গম্ভীর হলো উশান। কেমন অন্যমনস্ক হলো। ফের বলে উঠলো,

-” রাহনুমা আম্মুর চোখ দু’টো ঠিক এভাবেই উঠিয়ে নিয়েছিল মীরা জানো? ”

আহত দৃষ্টিতে তাকাল মীরা। উশানের অন্তঃস্থলে প্রতি ক্ষণে ঠিক কিরূপ প্রলয় বইয়ে যায় তা বুঝি সে আন্দাজ করতে পেরেছে। তার মাঝেমধ্যে শ্বাস রুখে আসে এই ভেবে, উশান আসলে কেমন আছে?আসলেই কি ভালো আছে? মীরার তো মনে হয় না তা। উশান রুমিশার কঠিন মৃ’ত্যু দেখেছে নিজের আঁখিদ্বয় সম্মুখে। লোকটার কি ভালো থাকার কথা? স্থিরচিত্তে প্রশান্তি পাওয়ার কথা?

উশান উঠে বসলো। কাবার্ডে গিয়ে ইউনিফর্ম খোঁজা শুরু করল। কর্মস্থলে অন্য শার্ট পড়ে তো আর যাওয়া যায় না। কিন্তু তার ইউনিফর্ম নেই এখানে।সব উজানের বাসায়। তপ্তশ্বাস ফেলে বিরক্তিতে অধর জোড়া ‘ চ’ এর ন্যায় করল সে। এরিকের জন্য তার আজকের পুরো দিনটাই মাটি!

-” ঢাকায় এসেছ কেন?তোমাকে না বললাম চট্রগ্রাম যেতে? কেনো কথা শুনো না মীরা! চলো। তোমাকে উজানের ফ্লাটে দিয়ে আসি। কাল সকালেই ঢাকা ছাড়বে তুমি। কথার হেড়ফেড় যেনো না হয়! ”

মীরা নড়েচড়ে বসল। জেদ ধরে বলল,

-” যাবোনা। কি করবে? মারবে?”

-” দরকার পড়লে তাই করবো। চড়াবো ধরে মেয়ে! ”

আঁড়চোখে উশানকে দেখে উঠে দাঁড়াল মীরা। কি পরিমাণে বদ লোকটা ভাবা যায়? মীরা – উশান ড্রইং রুমে আসতেই লা’শ গুলো দেখে মীরা কিয়ৎ কেঁপে উঠলো। মনে পড়লো সে জীবনে প্রথমবারের মতো মানুষ মে’রেছে। বিনা দ্বিধায়! মীরাকে থামতে দেখে, অন্যমনস্ক হয়ে মনমরা হতে দেখে উশান বিষয়টা ধরতে পারল। সে মীরার নিকট এগিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

-” রিলাক্স মীরা! ওরা খারাপ মানুষ। খারাপ মানুষ কে মা’রা কোনো গুনাহের কাজ না। কোনো দোষের ও কাজ না। মাইন্ড ফ্রী করো। দেখি তাকাও আমার দিকে। এই মেয়ে! ”

মীরা তাকাল। নেত্রপল্লব ফেলছে সে বারংবার। কোনো মতে নিজেকে সামলে বলল,

-” ওদের লা’শ কি করবেন? ”

-” আমি কিছুই করবো না।উজানকে আসতে বলেছি ম্যাসেজ করে। ও দেখবে বাকিটা। আর ওদের মে’রে ফেলার উপযুক্ত কারণ আমি হেড কোয়ার্টারে দেখিয়ে দিব যদিও প্রয়োজন হবে বলে মনে হয়না। এখন চলো। আমার লেট হচ্ছে। ”

যাত্রাপথে এরিকের এরূপ আচানক হামলা করার কারণটা উশান মীরাকে খুলে বলল। কায়দা করে, চতুরতার সাথে এড়িয়ে গেলো সে তূর্শী কেনো মীরা কে মা’রতে চেয়েছে সেই ব্যাপারটা। মীরাও তেমন ধ্যান দিল না। সে ভাবছে অন্যকিছু। হটাৎ করেই নিজে খু’ন করার ব্যাপারটা তার মাথায় ঝেকে বসেছে পাকাপোক্ত ভাবে।

কাঙ্ক্ষিত স্থানে পৌঁছাতেই মীরা হুঁশে আসল। নেমে যেতে গেলে উশানের পেছন হতে বাধা প্রদানে সে থামল। পিছন ফিরে বলল,

-” কি হয়েছে? ”

জবাব দিল না উশান। সে মীরাকে কাছে টেনে কপালে অধর ছোঁয়ালো। পরপর মীরাকে তাড়া দিয়ে গাড়ি থেকে বের করে একটানে মীরার দৃষ্টিসীমার বাহিরে চলে গেল। মীরা সেদিকে তাকিয়ে রইল কতক্ষণ। একরাশ ত্রপাকে মনের অন্দরমহলে পুড়ে নিয়ে সে ফিরে চলল।

চলবে~