#দূর_দ্বীপবাসিনী (কপি করা নিষিদ্ধ)
#৪০তম_পর্ব
কথাটা বুঝতে সময় লাগলো চারুর। কিছুক্ষণ চুপ রইলো, তারপর তার চোখ চলে গেলো শ্রাবণের দিকে। শ্রাবণ তখন বিছানায় বসে নিজের রাগ নিবারণে ব্যাস্ত। চিত্রা বলতে লাগলো,
“বুবু কি শুনছিস?”
চারু উত্তর দিলো না, তার চাহনী শ্রাবণের দিকে স্থির। ম্লান স্বরে বললো,
“কিভাবে জানলি?”
“পুলিশ এসেছিলো, ধ্রুব ভাই এর অনুরোধে তারা বাবার মৃত্যু তদন্ত করে। ফলে জানতে পারে, একটা গাড়ি ইচ্ছে করে বাবার উপর দিয়ে গিয়েছে। বুবু, বাবা মানুষটা কি এতো খারাপ ছিলো যে তাকে খু/ন করার প্রয়োজন?”
“তদন্ত কতদূর এগিয়েছে, গাড়ি টি কার জানা গেছে?”
“নাহ, সেটাই খুজে বের করছে তারা। গাড়িটির চালক বের হলেই কেস সলভ হয়ে যাবে”
চিত্রা কাঁদছে। তার কন্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছে বারে বারে। কিন্তু চারু স্থির। স্বাভাবিক তার দেহভঙ্গিমা। যেনো কিছুই হয় নি। সে স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“মা আর চাচীর দিকে খেয়াল রাখিস। কাঁদিস না, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এখন আসল কালপ্রিটকে ধরার পালা। চিন্তা করিস না। ইনশাআল্লাহ সে ধরা পড়বেই”
চারুর কথা বলতে ভালো লাগছে না। মাথাটা তীব্র যন্ত্রণায় ছেয়ে গেছে। সেই সাথে বক্ষস্থলে চরম চিনচিনে ব্যাথা। একটা নিকষকৃষ্ণ অভিশঙ্কা তা ভেতরটাকে তোলপাড় করছে। শ্রাবণ তো সেই রাতে তার সাথেই ছিলো। তবুও সূক্ষ্ণ সন্দেহ ডানা মেলছে। যে মানুষটা শুধু তাকে বিয়ে করার জন্য এতো কিছু করতে পারে, এতো ছলের জন্ম দিতে পারে, নিজের গায়ে ছোরাঘাত নিতে পারে; সেই মানুষটির পক্ষে অসম্ভব কিছুই না। চারু শান্ত মস্তিষ্কে সাজাতে লাগলো সকল কিছু। প্রথমত শ্রাবণ তাকে অজ্ঞাত প্রেমিকের নামে চিঠি পাঠাতে শুরু করলো, তার পিছু নিলো। এক অদৃশ্য বলয় তৈরি করলো তার আশেপাশে। নিজেকে অজ্ঞাত রেখেই তার প্রতি আবেগগুলো সে প্রকাশ করতো। কিন্তু এর মাঝে ঘটলো অঘটন, তার আবেগ মাত্রা ছাড়ালো। কলেজের ছেলেটিকে যখন নিষ্ঠুরের মতো মেরে হাসপাতালের আইসিউ তে ভর্তি করলো তখন এই অজ্ঞাত প্রেমিকের প্রতি আবেগটা মিয়ে গেলো চারুর। অজ্ঞাত প্রেমিক ক্ষান্ত হলো না। তার পাগলামি আরোও দ্বিগুণ উৎসাহে প্রকাশ পেতে থাকলো। এর মাঝে হুট করেই কিছুদিন লোকটির হদিস পাওয়া গেলো না, সেই ফাকে মনিরুল সাহেব নাহিয়ানের প্রস্তাব নিয়ে হাজির হলেন। সব ঠিক ই চলছিলো, চারুও অজ্ঞাত প্রেমিকের কথা ভুলতে বসেছিলো। কিন্তু অঘটন ঘটলো বিয়ের দিন। নাহিয়ানের গাড়ির দূর্ঘটনা, মা/রা গেলো নাহিয়ান। পরে অবশ্য সকল দোষটা আরিফের উপর বর্তানো হলো। আরিফ মূলত আর কেউ নয়, শ্রাবণের একজন বিশ্বস্ত লোক ছিলো। বিশ্বাসঘাতকতা এবং চারুর প্রতি অযাচিত লোভের দরুন তার এই পরিণতি। আশারাফ গণি, পুত্রশোকে পাগলপ্রায় হলেন, তিনি সকল কিছুর দোষ চাপালেন শ্রাবণের উপর। তিনি শ্রাবণকে মারার প্রচেষ্টা ও চালান। ব্যর্থ হবার কারণে চারুকে অ/প/হ/র/ণ করেন তিনি। গণি এবং আরিফ উভয় শ্রাবণের মাথা ব্যাথা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো৷ ফলে একটা নিপুন পরিকল্পনায় দুটোকে গোড়া থেকে সে শেষ করে দিয়েছে। যদিও শ্রাবণ নিজ হাতে কখনোই কিছুই করে নি। “সাপ ও মরলো, লাঠিও ভাঙ্গলো না” এই প্রবাদ তার ক্ষেত্রে বেশ ভালো করেই খাটে। চারুর প্রতি এই পাগলামিটাই চারুর মনে সন্দেহের বীজ বুনেছে। সেদিন মনীর সাহেব তাকে মারতে উদ্ধত হয়েছিলেন। সেই সামান্য ভুলের জন্য ই কি তাকে জীবন হারাতে হলো! অসম্ভব মনে হলেও সন্দেহটা অবান্তর নয়। তবুও কেনো যেনো চারুর বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করছে শ্রাবণ নির্দোষ, সে সত্যিই কোনো অন্যায় করে নি। অন্তত কাউকে খু/ন করার মতো অন্যায় সে করে নি।
চারু চোখ তুলে চাইলো শ্রাবণের দিকে। সে এখন শান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। বড্ড বেশি অস্থিরতাকে দমানোর প্রচেষ্টা। প্রেয়সীকে আঘাত করতে পারছে না। তবে ক্রোধের আগ্নেয়গিরি তার মাঝে বিদ্যমান। সেই ক্রোধ সংবরণ ও করা তার পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই কপালে মুষ্টিবদ্ধ হাত ঠেকিয়ে রেখেছে সে। চোখ বন্ধ, প্রগাঢ় নিঃশ্বাস ছাড়ছে সে। চারু কিছুসময় চুপ করে রইলো, তারপর নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে বললো,
“চিত্রা ফোন করেছিলো”
চারুর কন্ঠ কর্ণপাত হতেই তড়াক করে উঠে বসলো শ্রাবণ। গম্ভীর কন্ঠে বললো,
“ও বাড়ির সবাই ঠিক আছে, আমি কিছু করি নি”
শ্রাবণের স্বগোতক্তিতে ঈষৎ অবাক হলো চারু, কিন্তু প্রকাশ করলো না। স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,
“আসলে ও একটা খবর জানাতে ফোন করেছে। আজ ওদের বাড়ি নাকি পুলিশ এসেছিলো। অদ্ভুত একটা খবর তাদের দিলো, বড় চাচাকে নাকি খু/ন করা হয়েছে!”
চারুর কথায় খুব একটা ভাবান্তর হলো না শ্রাবণের। সে গলার টাইটা খুলতে খুলতে বললো,
“দুঃখজনক সংবাদ”
“ওরা গাড়িটির খোঁজ পেয়েছে, চালকের খোঁজ পেলেই কেস সলভ”
“খুব ভালো কথা, তাড়াতাড়ি খোঁজ পাক এই কামনা করি”
শ্রাবণের নির্লিপ্ত কথাগুলো বড্ড উটকো শোনাচ্ছে। তার কথার ধরণে দুটো ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়, এক, শ্রাবণ এই খু/নের কোথাও জড়িত নয়, অহেতুক সন্দেহ করছে চারু। দ্বিতীয়ত শ্রাবণ এতোই গভীর জলের মাছ যে সে ধরা ছোয়ার বাহিরে। চারু কিছু বললো না। শুধু সরু নয়নে দেখে গেলো শ্রাবণকে। মনে মনে সেও চায় যেনো শ্রাবণ নির্দোষ হয়। যতই হোক, মানুষটাকে আজও বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়। হৃদয়ের আঙ্গিনায় যে প্রণয়ের ফুলটি ছিলো, মূর্ছা গেলেও সেটা যে এখনো জীবন্ত। শুধু অদৃশ্য দেয়াল তৈরি হয়েছে দুজনের মাঝে। যা প্রচন্ড শক্ত, যা ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবার সাহস হচ্ছে না চারুর____________________
*******
নিগূঢ় রাত, ঠান্ডা পরিবেশ। আলোবিহীন ঘরে মায়াবী আলো আঁধার খেলা তৈরি হয়েছে। বাহিরের বাগানের লাইটের সরু আলো রেখা প্রবেশ করছে ঘরে। এসির তাপমাত্রা বাইশ ডিগ্রী। গলা অবধি কম্বল টানা শ্রাবণের। তার ঘুম গাঢ়, হঠাৎ অনুভূত হলো তার গলায় তীক্ষ্ণ, ধারালো কিছু কেউ ধরে আছে। ঘুম গাঢ় হলেও তার ইন্দ্রিয়গুলো সজাগ। চট করে চোখ খুললো সে। মুখের উপর মায়াবী মুখশ্রী। কপালে ঘাম, ঠোঁটের কোনে বিষাদের রেখা। হাতে তার মাখন কাটার ছুরি। শ্রাবণ ভড়কালো না। বরং বা হাতে মানুষটির অবিন্যস্ত চুলগুলো গুজে দিলো কানের পেছনে, মুচকি হেসে বললো,
“মাখন কাটার ছুরি দিয়ে স্বামীকে ব/ধ করতে চাও দূর দ্বীপবাসিনী?”
চারু নড়লো না, দৃঢ়তা তার মাঝে পরিলক্ষিত হলো। কাঁপা স্বরে বলল,
“আপনি ই মেরেছেন চাচাকে, তাই না? সত্যি করে বলুন”
“যদি বলি হ্যা, কি করবে?”
শ্রাবণের ঠোঁটে বিচিত্র হাসি, হাসিটা বিচিত্র নয় শুধু ভয়ংকর ও বটে। চারুর বুকে তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হলো, সত্য জিনিসটা এতোটা বিষাক্ত এই ভয়ানক ব্যাপারটা আজ উপলব্ধি করলো সে। চোখ জ্বলছে, দম বন্ধ যন্ত্রণা। কিন্তু সেই সাথে প্রচন্ড ক্রোধে মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ছাই চাপা আগুনটা দপ করে জ্বলে উঠেছে যেনো। ছু/রিটা শ্রাবণের ন/লি বরাবর ঠেসে ধরে বললো,
“আরিফ ঠিক বলেছিলো, আপনার মতো জা/নো/য়া/রে/র বাঁ/চা/র অধিকার নেই। ইচ্ছে করছে”
“এই ছু/রি দিয়ে আমার গ/লা কেঁ/টে ফেলতে তাই তো? কিন্তু একটু পাশে তাকিয়ে দেখো তো চারুলতা, আসলেই কি আমাকে মা/র/তে পারবে?”
এবার কিঞ্চিত ভয় পেলো চারু। ভীত নজরে পাশে তাকালো। তাকাতেই হীম বয়ে গেলো শিরদাঁড়ায়। মেঝেতে লুটিয়ে আছে চারটে লা/শ। প্রতিটি রক্তস্নাত, বিশ্রীভাবে থেতেল গেছে। কালো রক্তে ভেসে যাচ্ছে মাঝে। সাদা কাপড়ের নিচের মানুষগুলো আর কেউ নয়, জাহানারা, মারুফা, চিত্রা এবং ধ্রুব। চারটা মুখশ্রী দেখতেই লাফিয়ে উঠলো চারু। তরতর করে ঘামছে সে। তার গলা কাঠ হয়ে গেছে। প্রচন্ড শীতলতায় ও তার ঘা ভিজে গেছে। চুলের গোড়ায় ঘাম জমছে। এলোমেলো নজর ফেরালো চারপাশে। না সব কিছু শান্ত, শ্রাবণ পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছে। মেঝেতে কিছুই নেই। স্বপ্ন ছিলো সব, বিশ্রী বাজে স্বপ্ন। চারুর বুক কাঁপছে। জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে সে। সময় লাগলো নিজেকে শান্ত করতে। তারপর হাত বাড়িয়ে পাশে রাখা পানির বোতল থেকে পানি খেলো সে। কতটা ত্রাশ বুকে জমলে এতো ভয়ানক স্বপ্ন দেখতে পারে কেউ। চারু বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানি দিলো। নিজেকে শান্ত করলো জোর করে। তারপর শুয়ে পড়লো সে। চোখ বুঝতেই অনুভব করলো একজোড়া শীতল হাত তার কোমড় চেপে ধরেছে। কিছু বুঝার আগেই অনুভব করলো তার কাঁধ ভিজে যাচ্ছে শীতল জলে, তবে কি শ্রাবণ কাঁদছে……………
চলবে
মুশফিকা রহমান মৈথি