ইট পাটকেল পর্ব-১৬+১৭

0
1150

#ইট_পাটকেল
#সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_১৬

আশমিন কে হসপিটালে সিফট করা হয়েছে।খুব গোপনে ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছে আশমিনের। অমি এখনো নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। নূর এমন কিছু করবে তা স্বপ্নে ও ভাবতে পারেনি সে।সানভি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। শূন্য দৃষ্টিতে অপারেশন থিয়েটারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমজাদ চৌধুরী কেউ জানায়নি। বিষয় টা কোন ভাবেই মিডিয়ায় ফাস হতে দেয়া যাবে না। চারিদিকে শত্রুর অভাব নেই। আশমিনের অসুস্থতা তাদের একটা নতুন সুযোগ করে দেয়া হামলা করার জন্য।

— আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ম্যাম এমন কিছু করতে পারে।

সানভি চোখ ঘুরিয়ে অমির দিকে তাকালো। অমি অপরাধীদের মতো মাথা নিচু করে বারান্দার চেয়ারে বসে আছে। সানভি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

— সময় মানুষ কে বদলে দেয় অমি।রাফসান শিকদারের মেয়ে সে।হিংস্রতা তার রক্তে মিশে আছে। সে যেমন মায়া দেখাতে জানে তেমন হিংস্র বাঘের ন্যায় খুব*লে খেতে ও জানে।অবিশ্বাস করার কিছু নেই।

পরিস্থিতি অনেক বিগড়ে যাচ্ছে সানভি।সব কিছু হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তোমার মনে হয় স্যার ম্যাম কে ছেড়ে দিবে? পাল্টা আঘাত সে ও করবে।এরকম চলতে থাকলে তাদের একজনের হাতে আরেকজনের বিনাশ নিশ্চিত।

— সব কিছু সামনে আসলে ম্যাম নিজেকে সামলাতে পারবে না অমি।সত্যি মাঝে মাঝে খুব নিষ্ঠুর হয়।ম্যাম যেই সত্যির তালাশ করছে তা জানলে সে নিজেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে। কিছু কিছু সত্যি গোপন থাকাই সবার জন্য মঙ্গল।

অমি নির্মিশেষে তাকিয়ে রইলো সানভির দিকে।তার নিজের সত্যিটাই তো নূর কে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বয়সে সে নূর থেকে তিন বছরের বড়।ছোট বেলা থেকেই আমজাদ চৌধুরীর অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। নূর কে প্রথম প্রথম সে খুব একটা পছন্দ করতো না। কিন্তু ছোট্ট নূর যখন আশ্রমে আসতো তখন সে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারতো না। ধিরে ধিরে নূরের মায়ায় নিজেকে জরিয়েই নিল।নূর যখন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল তখন সে ও নূরের সাথেই ছিল।একা ছাড়ে নি নূর কে। চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো অমি।সত্যি যেন কখনো নূরের সামনে না আসে সেই দোয়াই করতে লাগলো।

~

রাফসান শিকদার কে ব্যবসার কাজে মাঝে মধ্যে অনেক দেশেই ঘুরতে হতো। নূরের মা আর রাফসান শিকদারের ভালোবাসার বিয়ে ছিল।অসম্ভব ভালবাসতো সে নূরের মাকে।সুদর্শন রাফসান শিকদার কে অনেকেই নিজের রুপের জালে ফাসাতে চাইতো।কিন্তু রাফসান শিকদার কাউকে পাত্তা দিত না।বিয়ের অনেক বছর হয়ে যাওয়ার পরেও তাদের কোন সন্তান হচ্ছিল না।নূরের মা সব সময় ডিপ্রেশনে ভুগতো।অনেক ডাক্তার দেখিয়ে ও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন সে রাফসান শিকদার কে আরেকটা বিয়ে করতে বলে। সেদিন রাফসান শিকদারের ভয়ংকর চেহেরা দেখেছিল সবাই।জীবনে প্রথম বারের মতো প্রিয়তমা স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে সে।রাগ করে চলে যায় কানাডায় কামিনী চৌধুরীর কাছে।এখানেই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসে সে।হতাশায় কষ্টে নিজেকে সামলাতে না পেরে নিয়মিত বারে যাওয়া শুরু করে। কামিনী চৌধুরী সব দেখে ও কিছু বলতেন না।উল্টো ভাই কে আরো উস্কে দিতেন বউয়ের বিরুদ্ধে। নিজের কানাডিয়ান বান্ধবী লিন্ডা কে সারাক্ষণ রাফসান শিকদারের আশেপাশে রাখতেন। লিন্ডা সারাদিন চিপকে থাকতো রাফসান শিকদারের সাথে। রাফসান শিকদার বিরক্ত হলেও কিছু বলতো না। কয়েকবার কামিনী চৌধুরীর কাছে নিষেধ করেছিলেন যেন লিন্ডা তার আশেপাশে না আসে। কামিনী চৌধুরী কানে নেন নি সে কথা। অবশেষে রাফসান শিকদার সিদ্ধান্ত নেন সে বিডি তে ফিরে আসবে।নিজের স্ত্রীর থেকে আর দূরে থাকতে পারছেন না তিনি।তখন ই কামিনী চৌধুরী জঘন্য এক পরিকল্পনা করেন।রাতের খাবারের সাথে ড্রাগস আর উত্তেজক মেডিসিন খাইয়ে দেন রাফসান শিকদার কে। আর লিন্ডা কে পাঠিয়ে দেন রাফসান শিকদারের রুমে।ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। অপরের বোধে পাগলপ্রায় রাফসান শিকদার লিন্ডা কে সেই অবস্থায় গলা চেপে ধরলেন।লিন্ডা কে কোন ভাবে বাচিয়ে নিলেও নিজের পরিকল্পনা সফল করতে পারলেন না কামিনী চৌধুরী। আমজাদ চৌধুরী শুধু স্ত্রীর দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল।প্রেয়সীর এমন বিনাশিনী রুপ তাকে ক্ষনে ক্ষনে মৃত্যু দিচ্ছিল। কামিনী চৌধুরী ভেবেছিল ভাই কে ফাসিয়ে লিন্ডা কে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবেন।কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। রাফসান শিকদার হুংকার ছেড়ে কামিনী চৌধুরী কে প্রশ্ন করলেন,

— এই প্রস্টি*টিউট রাতে আমার রুমে ঢুকলো কি করে কামিনী?আমি রুম লক করে ঘুমিয়ে ছিলাম।

রাফসান শিকদার পাগলা ঘোড়ার মতো আক্রমণ করতে চাইছিল লিন্ডার উপর। অবশেষে কোন কুল কিনারা না পেয়ে সমস্ত দোষ লিন্ডার ঘারে দিয়ে দিলেন কামিনী চৌধুরী। ভাই কে আশ্বস্ত করলেন এই কথা আর কেউ জানবে না। রাগে ঘৃণায় জর্জরিত হয়ে রাফসান শিকদার দেশে ফিরে আসেন। আশমিন তখন হোস্টেল থেকে পড়াশোনা করে। ছোট থেকেই সে হোস্টেলে থাকতো। তাই বাড়িতে কি হতো তা সে জানতো না।

দেশে আসার পর নিজের স্ত্রীর দিকে তাকাতে পারতো না রাফসান শিকদার। তবে স্ত্রীর ভালোবাসায় বেশিদিন তাকে দূরে সরিয়ে ও রাখতে পারে নি। এর মধ্যেই খবর আসে লিন্ডা প্রেগন্যান্ট। রাফসান শিকদার এক কোটি টাকা দিয়ে লিন্ডার মুখ বন্ধ করে দেন। লিন্ডার জমজ ছেলে হয়।ডেলিভারির সময় ই লিন্ডা মারা যায়। কামিনী চৌধুরী একটা ছেলে কে নিজের কাছে নিয়ে এলেও আরেকজন কে হসপিটালেই ফেলে আসেন।তার কার্জ হাসিল করার জন্য একজন ই যথেষ্ট। অযথা টাকা খরচ করে দুজন পালার মানেই হয় না। আমজাদ চৌধুরী তখনও স্ত্রীর ভালোবাসায় চুপ ছিলেন।আরেকটা ছেলে কে সে নিজের অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেন।আর সেই ছেলেটাই হচ্ছে অমি।রাফসান শিকদার কে এ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। অমি কিছুটা বড় হতেই আমজাদ চৌধুরী তাকে সমস্ত সত্যি জানিয়ে দেন।নিজের মায়ের উপর রাগ হলেও রাফসান শিকদার কে কখনো ঘৃণা করেনি অমি।তার মনে হয়েছে রাফসান শিকদার যা করেছে তা একেবারে সঠিক।
তিন বছর পরে নূর হলো।তাদের সংসারে সত্যিকারের খুশি এসে ধরা দিল।সব কিছু ভালোই চলছিল। নূরের মায়ের এক্সিডেন্টে মৃত্যু আবার সব কিছু এলোমেলো করে দিলো। প্রথম প্রথম নূর কে হিংসে করলেও পরে নূর কে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে অমি।কখনো ভাই হওয়ার দাবি নিয়ে তার সামনে দাঁড়ায় নি।তবে তার আরেক ভাই ই তার বাবার জান কেড়ে নিয়েছে এ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই অমির।কিছু কিছু সত্যি শুধু ধ্বংস ডেকে আনে।তাই রাফসান শিকদার আশমিনের কাছে নিজের জীবন কে খোলা বইয়ের মতো উপস্থাপন করেছিলেন। তার এই জঘন্য অতীত আশমিনের কাছে হেফাজতে রেখে বলেছেন নূর যেন কখনো এই সম্পর্কে জানতে না পারে। তাহলে সে আর তার আব্বু কে ভালোবাসবে না। রাফসান শিকদারের মৃ*ত্যুর পরেও আশমিন তার অতীত কারোর সামনে আসতে দেয়নি। নিজের বাবার প্রতি রাগটা এতো দিন কথায় প্রকাশ করলেও এবার সে হাতে কলমে করার জন্য উঠে পরে লেগেছে। আমজাদ চৌধুরীর নীরবতা ই কামিনী চৌধুরী কে এতটা বিনাশীনি বানিয়ে দিয়েছে।যার শাস্তি তাকে পেতে হবে।

~

আশমিনের অপারেশন সাক্সেসফুল হয়েছে।গুলি হার্টের এক ইঞ্চি উপর দিয়ে বেড়িয়ে গেছে।তাই খুব একটা ক্ষতি হয়নি।তবে অতিরিক্ত ব্লিডিং এর জন্য এখনো জ্ঞান ফিরেনি।কয়েকদিন হসপিটালেই থাকতে হবে। আশমিনকে কেবিনে সিফট করা হলে সানভি আর অমি গিয়ে দেখে আসে তাকে। আশমিনের জ্ঞান ফিরে ছয় ঘন্টা পরে। পিটপিট করে চোখ খুলে চারিদিকে তাকাতেই চোখ পড়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে ম্যাগাজিন পড়া নূরের দিকে। আশমিনের দিকে না তাকিয়ে ই উঠে আসে নূর। হাতে একটা বুফে নিয়ে আশমিনের দিকে এগিয়ে যায়।আশমিন এখনো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে। নূর বাকা হাসলো। বুফে টা আশমিনের বেডের পাশে রেখে মোহনীয় গলায় বলল,

— মৃত্যুর যাত্রা কেমন ছিল মন্ত্রী সাহেব?

আশমিন ক্রুর হাসলো। সন্তপর্ণে সার্জিক্যাল নাইফ হাতে তুলে নিলো।নুর বেডে এক হাত ভর দিয়ে আশমিনের দিকে ঝুকে আছে।আশমিন নূরের ভর দেয়া হাতের রগ বরাবর এক টান দিয়ে বাকা হেসে বললো,

— সেটা নাহয় একটু উপভোগ করে আসো সোনা।আমি এখানেই ওয়েট করছি তোমার জন্য। হ্যাপি জার্নি।

নূরের হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।নূর হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে আশমিনের দিকে। আশমিন ভ্রু কুচকে ফেললো। মুচকি হেসে বললো,

— কয়েক ঘন্টা আগে আমি ও এমন অবাক হয়ে ছিলাম।আমাদের ফিলিংস গুলো ও কতো মিলে যায় তাই না!

সানভি আর অমি কেবিনে ঢুকে হতভম্ব হয়ে গেলো। নূর ততক্ষণে ঢলে পরেছে ফ্লোরে। আশমিন হালকা হেসে আস্তে করে বললো,

— পাচ মিনিট পর আমার বউকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাবে সান। এখানে আরেকটা বেডের ব্যবস্থা করো। আমি এখানে শুয়ে থাকবো আর সে বাইরে বাইরে ঘুরবে তা হবে না।আর একটা কালো গোলাপের বুফের ব্যবস্থা করো।

চলবে,,

#ইট_পাটকেল
#সানজিদা_বিনতে_সফি
#পর্ব_১৭

নূর কে নিয়ে যাওয়ার পর আশমিন হালকা হাসলো। অমি নিয়ে গেছে নূর কে। সানভি নিস্তেজ নূর কে কোলে নিতে গেলেই আশমিনের ভয়ংকর ধমক খেয়ে থেমে গেছে। চাকরি জীবনে এই প্রথম আশমিন এভাবে হুংকার দিয়ে ধমক দিয়েছে ওকে।ভয় দ্বিধা সব নিয়ে যখন সানভি আশমিনের দিকে তাকিয়ে ছিল তখন আশমিন গম্ভীর গলায় অমি কে বললো নূর কে ডক্টরের কাছে নিয়ে যেতে।অমি এই অপেক্ষায় ই ছিল। নূরের কাটা হাত দেখে কলিজা ছিড়ে যাচ্ছিল ওর।আশমিনের ভয়ে এতক্ষণ অস্থির হলেও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিল।অনুমতি পাওয়ার সাথে সাথে নূর কে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেছে সে।সানভি মুখ ভোতা করে আশমিনের দিকে তাকিয়ে আছে। আশমিন ভ্রু কুচকে বললো,

— কি?

— ম্যাম কে এভাবে আঘাত করলেন কেন স্যার??(করুন গলায়)

আশমিন হালকা হাসলো। উঠে বসার চেষ্টা করতেই সানভি এসে সাহায্য করলো আশমিন কে। বেডে হেলান দিয়ে বসে সানভির দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বললো,,

— বাইরে তোমার ম্যাম সেফ নয় সান।আমার অনুপস্থিতিতে নূরের উপর আক্রমণ হতে পারে। আমি এখনো জানিনা শত্রু কোথায় লুকিয়ে আছে,দেখতে কেমন তাও জানি না। আমি চাই না আমার অনুপস্থিতিতে নূর বাইরে থাকুক। এমনি তে তো তোমার ম্যাম থাকবে না। তাই এই ব্যবস্থা। তোমার ম্যাম ম্যাম যেমন জেনে বুঝে আমার হার্টের ঠিক এক ইঞ্চি উপরে গু*লি করেছে। আমি তেমনি ওর হাতের শুধু চামড়া টাই কে*টেছি।ব্লাড লসের জন্য কিছুদিন দুর্বল থাকবে।এই বাহানায় ওকে এখানে আটকে রাখা যাবে। এখানে আরেকটা বেডের ব্যবস্থা করো।

সানভি হা করে তাকিয়ে রইলো কিছুকাল। তারপর ঘোরের মধ্যেই বেরিয়ে গেল। আশমিন চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে বসে আছে। বুকে হালকা ব্যথা করছে। যেখানে তোকে এতো যত্নে রাখি সেখানেই আঘাত করলি বউ!এই যন্ত্রণা আমি ভুলবো কি করে! আর ভুল করিস না জান।তোকে ক্ষমা করতে করতে আমি না আবার ক্লান্ত হয়ে যাই।আমার অভিমান আমার ভালোবাসার মতোই তীব্র। সহ্য করতে পারবি না।
আপন মনে বিরবির করে বুকের ক্ষতস্থানে হাত বুলালো আশমিন। প্রেয়সীর নিষ্ঠুরতা কষ্ট দিচ্ছে। উহু,কষ্ট নয়।মরণ যন্ত্রণা দিচ্ছে।

সকাল হয়েছে অনেকক্ষণ আগে। নূরের এখন ঘুমাচ্ছে। আশমিন এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কপাল কুচকে নিল সে।নাহ!দুইটা বেড নেয়া মোটেই উচিত হয় নি। তার বেড টা যথেষ্ট বড়। এখানেই রাখা যেত নূর কে। দূরে রেখে হয়েছে এক জ্বালা। বউ কে চুমু খাওয়া যাচ্ছে না। কাছে থাকলে টপাটপ কয়েকটা চুমু খেয়ে ফেলা যেত।ঘুমিয়ে আছে,কিছু বলতে ও পারতো না।
আশমিন আনমনে ভাবলো, সে কি তার বউয়ের ঘুমের সুযোগ নিতে চাইছে?নিজের ভাবনা কে জানালা দিয়ে ছুড়ে মেরে ভাবলো, এখানে সুযোগের কি আছে? আজব! বউ কে চুমু খেতে ইচ্ছে হলে খেয়ে ফেলবে।জেগে থাকলে ও খাবে ঘুমিয়ে থাকলে ও খাবে। বাধা দিলে অজ্ঞান করে খাবে।সে জন্মগত নির্লজ্জ। এখন কয়েকটা চুমুর অভাবে তো আর সে শুকিয়ে মরতে পারে না!সে বাংলাদেশের জাতীয় সম্পদ।একজন গণ্য মান্য মন্ত্রী হয়ে সে নিজেকে শুকিয়ে মেরে তো আর জনগণের ক্ষতি করতে পারে না।

সকাল দশটায় হন্তদন্ত পায়ে কেবিনে ঢুকলো আমজাদ চৌধুরী আর কামিনী চৌধুরী। কামিনী চৌধুরী তো এসেই নূরের দিকে তেড়ে গিয়েছে।নূর এতক্ষণ কটমট করে তাকিয়ে ছিল আশমিনের দিকে। আশমিন ও এক ভ্রু উঁচু করে তাকিয়ে ছিল নূরের দিকে। দেখে মনে হবে এখানে তাকিয়ে থাকার প্রতিযোগিতা চলছে।সেসময় কামিনী চৌধুরীর এভাবে তেড়ে আসা নূরের রাগের আগুনে ঘি ঢাললো।পাশে ফলের ছু*ড়ি টা হাতে নিতেই থেমে গেলো কামিনী চৌধুরী। নূর চোখ লাল করে কামিনী চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে থেকেই একটা আপেলে ছু*রি চালিয়ে দিল। আমজাদ চৌধুরী অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে আশমিনের দিকে। আশমিন সেদিকে পাত্তা না দিয়ে মুখ কুচকে তাকিয়ে রইলো তার বাবার দিকে। এরকম একটা রোমান্টিক সময়ে তার বাবা এসে বাগড়া দিল!

— এখন কেমন আছো?

আমজাদ চৌধুরীর কোমল গলা শুনে মনে মনে ফুসে উঠলো আশমিন।তবে তার ফেস আগের মতোই শান্ত।বাবা কে নিজের পাশে বসিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

— ভালো আর থাকতে দিলে কই? একটা নব দম্পতির হানিমুনে বাগড়া দিতে তোমার লজ্জা করলো না?আমি নিশ্চয়ই তোমার হানিমুনে গিয়ে বাগড়া দেই নি?দিলে আমাকে দুনিয়ায় এতো তারাতাড়ি আনতে পারতে না নিশ্চয়ই। তোমার যন্ত্রণায় আমি আর বাচ্চাকাচ্চার মুখ দেখতে পারবো না।তারা পড়াশোনায় কতো পিছিয়ে যাচ্ছে জানো?এতটা দায়িত্ব জ্ঞানহীন দাদু হয়ে তুমি নিশ্চয়ই গর্বিত নও।

ছেলের কথা শুনে এতক্ষণের কষ্ট পাওয়া বৃথা মনে হলো আমজাদ চৌধুরীর। বাকরুদ্ধ হয়ে তিনটা প্রাণী তার দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে তার কোন খেয়াল নেই।সে নাক মুখ কুচকে চোখ বন্ধ করে আছে।আমজাদ চৌধুরী এবার কামিনী চৌধুরীর দিকে আহত চোখে তাকালো। ঝড়ে পরে যাওয়া পাখির
মতো ছটফট করতে করতে বললো,

— এ আমার ছেলে নয় কামিনী!সত্যি করে বলো এটা কার ছেলে?হসপিটাল থেকে বদলে দেয় নি তো(সন্দিহান গলায়)।

কামিনী চৌধুরী অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর দিকে।এই ভয়াবহ ঠোঁট কাটা ছেলের সামনে সে নিজেই ভয়ে ভয়ে আসে।কখন কি শুনিয়ে দেয় আল্লাহ মালুম।

নূর গা এলিয়ে দিলো। এসব শুনে মাথা ঘুরছে। তার এখন ঘুম প্রয়োজন। যতদিন এখানে থাকবে সে সারাদিন ঘুমাবে।ডিসিশন ফাইনাল।এসব ছিঃ মার্কা কথা শুনার চেয়ে মটকা মেরে পরে থাকা ভালো। এতে পিঠ আর কোমড় বাকা হলেও কিছু যায় আসে না।

কামিনী চৌধুরী বাসায় চলে গেছে। আমজাদ চৌধুরী দুজনের বেডের মাঝখানের ফাকা যায়গায় বসে আছে। আশমিন কয়েকবার বিরক্ত চোখে তাকালেও সে সেভাবেই বসে আছে। আশমিন ও আর কথা বাড়ায় নি।কেবিনে সানভির সাথে এক মহিলার প্রবেশ ঘটতেই ভ্রু কুচকে ফেললো আমজাদ চৌধুরী।তার জানা মতে আশমিনের খবর গোপন রাখা হয়েছে। তাহলে এই মহিলা কে?তাদের পরিচিত কেউ তো মনে হচ্ছে না।

মহিলাটি গিয়ে আশমিনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই আশমিন চোখ খুললো। মিষ্টি হেসে কুশল বিনিময় করে বসতে বললো তাকে।সানভি একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। অমি অফিসে গিয়েছে। নূরের অবর্তমানে সেই সব কিছু সামলাচ্ছে। আশমিন তার বাবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

— আব্বু, ইনি মায়া আন্টি। ওনার সাথেই আগামী শুক্রবার বিয়ে হবে তোমার।

আমজাদ চৌধুরী নিজের রাগ সংবরণ করতে পারলেন না। ছেলের এই পাগলামি আর মেনে নেয়া যাচ্ছে না। চিৎকার করে বললো,

— একদম বারাবাড়ি করবে না আশমিন।পাগলামির একটা লিমিট থাকে। এসব বলতে তোমার বিবেকে ভাধছে না?তোমার মা শুনলে কতটা কষ্ট পাবে ভেবে দেখেছো? আমাকে রাগীয়ে দিয় না আশমিন।আমি যদি আদর করতে পারি তাহলে শাসন ও করতে পারবো।

আশমিন তার বাবার চোখের দিকে তাকালো। আশমিনের চোখে আজ শুধু ক্ষোভ তার বাবার প্রতি।আশমিন আমজাদ চৌধুরীর চোখে চোখ রেখে ভয়ংকর ঠান্ডা গলায় বলল,

— তাহলে পচিশ বছর আগে কেন শাসন করো নি আব্বু?তখন যদি শাসন করতে তাহলে আজ এই দিন দেখতে হতো না। আর মিসেস চৌধুরীর স্বামী হারানোর কোন ভয় নেই।থাকলে সে অন্যের স্বামী এভাবে কেড়ে নিতো না(তাচ্ছিল্যের হেসে) । আমার মুখ খুলিও না আব্বু।তাতে শুধু ধ্বংস ই হবে। বিয়ের জন্য তৈরি হও।নিজেকে ঠিক ততটা উৎফুল্ল করো যতটা নিজের প্রথম বিয়েতে ছিলে। বছর ঘুরতেই নূরের জন্য ননদ চাই।আর এটাই আপাতত তোমার শাস্তি।

চলবে,,,