মনমোহিণী পর্ব-০৩

0
349

#মনমোহিণী
#Part_03
#Writer_NOVA

সকাল সকাল উঠে পরেছি আজ। নিজের কাজে নিজেই অবাক৷ যেখানে সকাল দশটা বাজে আমাকে ডেকে উঠাতে পারে না। সেখানে আমি সকাল সাতটা বাজে ঘুম থেকে উঠে পরেছি।নিজের কাধে হাত দিয়ে বাহবা দিয়ে বললাম, হাউ, গুড গার্ল আই এম! ব্রাশ হাতে দাঁত মাজতে মাজতে বাড়ির আনাচে কানাচে হাঁটছি। তন্বী কুম্ভকর্ণের মতো পরে পরে ঘুমাচ্ছে। খালামণিকে দেখলাম রান্নাঘরে রুটি বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

দূরের ক্ষেতে কৃষকের আনাগোনা দেখা যাচ্ছে।বাড়ির পাশেই ফসলি ক্ষেত। যতদূর চোখ যায় শস্য শ্যামল জমির দেখা মিলে।গাছের ডালে বসে শালিক কিচিরমিচির করছে। গ্রাম এলাকা ছাড়া আজকাল শহরে পাখিদের তো দেখাই যায় না।আমি এখন আছি তায়াং ভাইয়াদের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে।মাদারীপুর পদ্মা বিধৌত নিম্ন পলল ভূমি এলাকা। এর ভু-ভাগ বেলে দোআঁশ মাটি দ্বারা গঠিত। এটি একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চল।চারটি উপজেলা নিয়ে গঠিত মাদারীপুর জেলাটির জনগোষ্ঠীর আয়ের প্রধান উৎস কৃষি। যা মোট আয়ের ৫২%। এ অঞ্চল মূলত খেজুর রস ও খেজুর গুড়ের জন্য বাংলাদেশে বিখ্যাত। এছাড়াও এখানে নারিকেল, সুপারি, পাট, সরিষা, ডাল এবং গম বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। রবি ও খরিফ ফসল হিসেবে চীনাবাদাম চাষ হয়।

পুকুর পাড় ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে তিনটা খেজুর গাছ।সেদিকে তাকিয়ে পাড়ের মাটির রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আফসোস করতে লাগলাম। কেনো শীতের দিনে আসলাম না। শীতের সময় এলে খেজুরের রস খেতে পারতাম। গাছ থেকে নামানো ঠান্ডা কাঁচা খেজুরের রস খাওয়ার স্বাদই অন্য রকম। একেবারে মনে হয় অমৃত। আর খালামণির হাতের কাঁচা রসের পায়েসের তো জুড়ি নেই। মনোযোগ সহকারে দাঁত মাজতে মাজতে খেজুর গাছ দেখতে লাগলাম।

‘এতো ঘষলে তো দাঁত ক্ষয় হয়ে যাবে।’

‘আল্লাহ গো! কে?’

চিৎকার দিয়ে দুই কদম পিছিয়ে গেলাম। কানের কাছে হঠাৎ কারো কন্ঠস্বর পেয়ে আমি সত্যি ভয় পেয়ে গেছি৷ একদলা থুথু মাটিতে ফেলে চোখ বড় করে পাশ তাকিয়ে আরেকদফা অবাক। এনাজ মুখ টিপে হাসছে। আহা, ফের এই লোক! ইনিয়ে বিনিয়ে নানা কথা বলে গতকাল কোনরকম বাঁচতে পেরেছি। কানে ধরেছিলাম জীবনে এই লোকের সম্মুখীন হবো না।কিন্তু ঘুরেফিরে উনি আমার সামনে কেন পরেন?

‘এভাবে কেউ কথা বলে?’

‘কেন কি হইছে?’

‘দেখেন না ভয় পেয়ে গেছি।’

চোখ নাচিয়ে এনাজ ফের হেসে উঠলো। হঠাৎ খেয়াল হলো স্বপ্ন-টপ্ন দেখছি না তো? এই লোক এখানে কি করে এলো? রাতে ঘুমানোর আগেও তো বাসায় ভাইয়ার কোন বন্ধু ছিলো না।

‘তায়াং এর থেকে শুনছিলাম তুমি নাকি কাউকে ভয় পাও না।’

নিজেকে স্বাভাবিক করে জোর গলায় বললাম,
‘জ্বি ঠিকই শুনেছেন।পথ ছাড়েন বাসায় যাবো।’

‘যাক বাবা, আমি আবার পথ কখন আটকালাম?’

‘তারখাম্বার মতো রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকলে আমি যাবো কোথা দিয়ে?’

‘এতো মোটা তুমি? সারা রাস্তা লাগে?’

ভ্রু নাচিয়ে কৌতুকের স্বরে এনাজ বললো। আমি ব্রাশটা ডান হাত থেকে বাম হাতে নিয়ে তর্জনী আঙুল উঠিয়ে শাসিয়ে বললাম,

‘বেশি হচ্ছে কিন্তু!’

এনাজ ভয় পাওয়ার ভান করে দুই হাত নাড়িয়ে বললো,

‘ওরি বাবা, ভয় পাইছি।’

তার রিয়েকশন দেখে আমি মুখ লুকিয়ে হাসতে হাসতে সাইড কাটিয়ে চলে এলাম। এর থেকে আমার দূরে থাকাই মঙ্গল। গতকাল বিকেলের কথা ভুলিনি আমি। অল্পের জন্য নাকানিচুবানি খাইনি।

পুকুর ঘাট থেকে মুখ ধুয়ে উপরে উঠতে নিলেই এনাজ ‘ভাউ’ বলে চেচিয়ে উঠলো। আচমকা এমন হওয়ায় এবারও ভয় পেয়ে গেছি। টাল সামলাতে না পেরে পা পিছলে পরে যেতে যেতে পাশের এক ছোট আমগাছ ধরে বেঁচে গেলাম। এনাজ তার হাত বারিয়ে দিয়েছিলো কিন্তু আমি তার হাত ধরিনি। আমি আবার যারতার হাত ধরি না, হুহ! চোখ লাল করে তার দিকে তাকালাম। উনি হু হা করে হাসতে হাসতে আমাকে বললো,

‘তুমি নাকি কাউকে ভয় পাও না? এই ভয় না পাওয়ার উদাহরণ?’

এই লোকটার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে আমার মান-ইজ্জ্বত ফালুদা হয়ে যাচ্ছে। মুখ বাঁকিয়ে ভেংচি কেটে সেখান থেকে চলে এলাম।আসার আগে বললাম,

‘সাবধানে হাসেন। নয়তো লুঙ্গি খুলে যাবে।’

‘খালামণি, এই লোক এখানে কেন?’

‘কার কথা বলছিস?’

তাওয়ায় রুটি সেকতে দিয়ে খালামণি আমার দিকে তাকালো। আমি তার পাশে পিঁড়ি টেনে বসে পরলাম। হাত দিয়ে মাটির চুলোর ভেতরে লাড়কি ঠেলে দিয়ে বললাম,

‘তোমার ছেলের বন্ধু।’

‘এনাজের কথা বলছিস?’

‘হুম!’

‘রাতে এসেছে।’

‘কখন?’

‘তোরা ঘুমিয়ে পরার পর।’

‘কখন যাবে?’

‘কেমন কথা এগুলা?’

‘বন্ধুর বাড়িতে এতো থাকে নাকি মানুষ?’

‘শুনো বেআক্কল মেয়ের কথা। ছেলেগুলো এমনি আসে না। প্রায় দুই বছর পর এসেছে। দুদিন থাকতে না দিয়ে যেতে দিবো নাকি?’

‘ওহ, এখন কি জামাই আদর করবা নাকি?’

‘তোর হয়েছে কি বল তো? হঠাৎ ওদের ওপর চেতলি কেন?’

‘কিছু হয়নি। তুমি বরং তন্বীকে বিয়ে দিয়ে ঘর জামাই রেখে দাও।’

‘এই কি হয়েছে তোর বলতো? এমন কথা বলছিস কেন?’

‘কিছুই হয়নি। নাও তুমি কাজ করো। রুটি বেলে দাও আমি সেকে দিচ্ছি।’

খালামণি রুটি বেলতে মনোযোগ দিলো। আমি ওড়নাটা কোমড়ে বেঁধে রুটি সেঁকতে লেগে পরলাম।

‘এই নোভা এক কাজ করতো তুই।’

‘হুম বলো।’

‘গরম গরম রুটিগুলো ওদের দিয়ে আয়। কড়াইতে আলু ভাজি আছে। সেগুলোও দিস।’

‘আমি পারবো না। তুমি দিয়ে আসো।’

‘হাতের কাজ ফেলে যাই কি করে?’

‘তুমি তোমার ছেলেদের আদরযত্ন করো। আমি এদিক সামলাচ্ছি।’

চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললাম। আমি এনাজের সামনে কিছুতেই যাবো না। আমাকে নিয়ে হাসাহাসি করা! এর উসুল আমি খুব শীঘ্রই উঠাবো। খালামণি জোড়াজুড়ি করেও আমাকে উঠাতে পারলো না। তাই বাধ্য হয়ে উনি চলে গেলেন।

দুই হাতে দ্রুত গতিতে রুটি বেলছি। কতগুলো রুটি বানালাম। আরো বাকি আছে। রাক্ষসগুলা না জানি কতগুলো রুটি খায়। বিরবির করে এনাজকে একগাদা বকে নিলাম। মাঝে মাঝে রুটি উল্টে দিচ্ছি।কিছু সময় পর এনাজ এসে রান্নাঘরের বাইরে মোড়া পেতে বসলো। আড়চোখে একবার তার দিকে তাকিয়ে নিজের কাজে মন দিলাম। এমন ভান ধরেছি তাকে আমি দেখতে পাইনি।

‘তুমি কি রুটি বেলছো নাকি মসলা বাটছো?’

কপাল কুঁচকে তার দিকে এক পলক নজর দিয়ে আমার কাজ আমি করতে থাকলাম।আমার আশেপাশে ঘুরঘুর করছে কেন? কাহিনি কি? এনাজ আমার উত্তর না পেয়ে চুপ হয়ে গেলো।

‘মেয়ে অনেক কাজের বিয়ে দিতে হবে।’

তার খোঁচা মারা কথায় আর চুপ করে থাকতে পারলাম না। দাঁতে দাঁত চেপে বললাম,

‘আমার বিয়ে নিয়ে আপনার চিন্তা করতে হবে না।’

‘অবশ্যই করতে হবে। শতহোক বন্ধুর বোন বলে কথা।’

ইশ, দয়াবান সাজা হচ্ছে! কত চিন্তিত মানুষ। মুখ খুলে ছিলাম বেশ কতগুলো কড়া কথা শুনিয়ে দিবো। তার আগেই খালামণি হাজির।

‘তুমি এখানে? আমি আরো ইমরানকে জিজ্ঞেস করছি এনাজ কোথায়। হাত-মুখ ধুয়ে নাস্তা খেয়ে নাও।’

খালামণি বললো। এনাজ মাথা চুলকে নিচু গলায় বললো,

‘পরে খাবোনি আন্টি।’

‘পরে না। রুটি ঠান্ডা হয়ে যাবে। গরম গরম খেয়ে নাও।’

‘হাত-পা ধুতে হবে আন্টি।’

‘তাহলে ধুয়ে নাও।’

‘আসলে আপনাদের কল এত শক্ত। আমি চাপতে পারি না।কেউ যদি একটু চেপে দিতো।’

কতবড় মিথ্যা কথা! এত বড় দামড়া খাসি পোলা নাকি সামান্য টাইট চাপকল চাপতে পারে না। এটা কি আদোও বিশ্বাসযোগ্য? শরীরটা কি খেয়ে খেয়ে নাদুসনুদুস এমনি হয়েছে? আর আমার খালামণিও আছে। ছেলের বন্ধু বলতে অজ্ঞান। তাই সে আমার দিকে ফিরে বললো,

‘নোভা উঠ। এনাজকে কল চেপে দিয়ে আয়।’

‘কেন তোমার ছেলের কি হাত নেই?’

‘শুনলি তো ও কি বললো!’

‘দেহটা কে শুধু খাবার খেতে কাজে না লাগিয়ে এসব কাজেও লাগাতে পারে।’

এনাজ ইনোসেন্ট ফেস করে খালামণিকে ডেকে উঠলো,

‘আন্টি!’

‘আহ কি শুরু করলি?’

খালামণি আমাকে ধমকে উঠলো। আমি ফোঁস করে উঠে বললাম,

‘কল চাপতে না পারলে ঘাটে যেতে বলো। পুকুর ভর্তি পানি আছে।’

‘পুকুরে যদি আমি পরে যাই আন্টি।’

মুখটা হা হয়ে গেলো। পোলা মানুষ এতো ন্যাকামি করতে পারে তাকে না দেখলে জানতামই না। আর আমার খালাও আছে। এর তালে তালে নাচতাছে। খালামণির পিড়াপিড়িতে আমাকে যেতেই হলো। যাওয়ার আগে এক হাতে লুকিয়ে একটা জিনিস নিয়ে নিলাম। সময়মতো কাজে লাগাবো।

এনাজ বিটকেল হাসি দিয়ে বুঝালো সে জিতে গেছে। তোমার জিত আমি বের করছি। একটু অপেক্ষা করো। সে এক হাতে লুঙ্গি উঁচিয়ে ধরে কলের মুখের সামনে দাঁড়ালো। তার দুই হাত দূরে আমি ঠায় মেরে দাঁড়িয়ে আছি।

‘কি হলো কল চাপ দাও।’

‘জ্বি দিতেছি।’

‘তাহলে দাঁড়িয়ে আছো কেন?’

কলের হাতলে এক হাতে ধরে তার দিকে কিছুটা ঝুঁকে গেলাম। মিষ্টি হাসি দিয়ে চোখের পাতা এক নাগাড়ে কিছু সময় নাড়িয়ে কোকিল কন্ঠে বললাম,

‘আপনাকে দেখছি।’

আমার আচারণ আর কথা শুনে এনাজ ঘাবড়ে গেলো। ইতস্তত করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। এই মুহুর্তে আমার দ্বারা এসব যে সে ভাবেনি তা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।

‘একটু চোখ বন্ধ করুন না।’

লাজুক হাসি দিয়ে কথাটা বলতেই বেচারা বিষম খেলো। মাথার তালুতে হাত ডলতে ডলতে বললো,

‘কেনো?’

‘আরে করুন না। একটা জিনিস দেখাবো।’

‘না করবো না। তায়াং বলেছিলো যখন তুমি অতিরিক্ত ভালো ব্যবহার করবে তখন বুঝতে হবে ঘাপলা আছে।’

‘আচ্ছা, তাহলে চোখ বন্ধ করতে হবে না। তাকিয়ে থাকেন।’

বলে হাতের মুঠ থাকা বস্তুটা তার মুখে ছুঁড়ে মেরে হাসতে হাসতে ঘরে দৌড় দিলাম। আচমকা এমন আক্রমণে সে হতভম্ব। যখন বুঝতে পেরেছে তখন পুরো মুখ, চোখ আটায় মাখামাখি।

#চলবে