#গোধূলি_রাঙা_আলোয়
#পর্ব_১৩
আতিয়া ডিউটি শেষে আজ বাসায় যায়নি। বাসায় আগেই জানিয়েছে যে আজ ওভারটাইম আছে, ফিরতে দেরি হবে। আতিয়া সোনিয়ার সাথে তার হোস্টেলে আসে। রুমে ঢুকে ব্যাগ খোলে আতিয়া। নিউমার্কেট থেকে ছয়শো টাকা দিয়ে কেনা এই ব্যাগটা সাইজে বেশ বড়ো। ব্যাগের বয়স হয়েছে দুইবছর। টিফিন বক্স, টুকটাক জিনিসপত্র সহ অনেককিছুই আঁটে বলে এ-ই ব্যাগটাই আতিয়া সবসময় ব্যবহার করে। আজ টিফিন বক্স আনেনি। হসপিটালে খাওয়া আছে বলেছে। যদিও মা দেলোয়ারা বেগম বলেছিলেন টিফিন বক্স নিতে, ভালো খাওয়া হলে বরং প্যাকেট বাসায় নিয়ে আসতে। কিন্তু বুঝিয়েছে আজ কোন অনুষ্ঠান নাই, বরং ওটি রুমের দায়িত্ব আছে। ওটি শেষে অপারেশন রুমে কাজ করা সবাইকে বিরিয়ানি দেয় না বরং ভাত, ডাল, মুরগী বা রুই মাছ দিবে খেতে। এগুলো এত ভালো কিছু না। রাত পর্যন্ত রাখলে বরং টক হয়ে যাবে।
আতিয়া আজ ব্যাগে টিফিন বক্সের বদলে যত্ন করে ভাঁজ করা শাড়ি ঢুকিয়েছে। এই শাড়িটা নতুন। মিসবাহ উপহার দিয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে দামি শাড়ি। হাওয়াই মিঠাই রঙের জামদানিতে রূপালি সুতোর কাজ। আড়ং থেকে কেনা। কত টাকার শাড়ি কে জানে! এত দামি উপহার নিতে ভীষণ সংকোচ হচ্ছিল আতিয়ার। কিন্তু মিসবাহর পিড়াপিড়িতে নিয়েছে। না এখনো তারা একে অপরকে ভালোবাসি বলেনি। এই বয়সে এসে এসব আবেগমাখা কথা বলতে দু’জনই লজ্জা পায়। তাদের কথাগুলো দৈনন্দিন খোঁজ খবরেই সীমিত। কিন্তু দিনদিন তার পরিধি বাড়ছে। ভোরে মিসবাহ আসতে না পারলেও ডিউটি শেষে ঠিকই হাসপাতালের অপজিট রাস্তায় বাইক নিয়ে হাজির হয়। আতিয়া লাজুক মুখে বাইকের পেছনে গিয়ে বসে।
“আচ্ছা, আপনি আসেন কেন? আমি তো বাসেই যেতে পারি। রোজ রোজ দোকান ফেলে আসলে আপনার ক্ষতি না?”
“আধাঘন্টার বিরতি ক্ষতির কিছু নাই। কাজের ফাঁকে আগেও বিরতি নিতাম। তখন অন্য দোকানি বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতাম। এখন বরং ভালো হলো। একটা পার্ট টাইম কাজ পেলাম।”
“পার্সোনাল পাঠাও ড্রাইভার হতে চান?”
“রাইডার চাইলে অবশ্যই।”
লাজুক মুখে হাসি আতিয়া। কিছুক্ষণের জন্য ভুলে যায় যে মাকে কথা দিয়েছিল আর নতুন জীবনের কথা ভাববে না। অন্ততঃ ভাইবোনগুলোর গতি না হওয়া পর্যন্ত ভাববে না। কিন্তু মন আর মস্তিষ্ক দুই আলাদা পথে চলে। এখনি বয়স পঁয়ত্রিশ। এই সময় জীবন গুছিয়ে না নিলে আর কখনোই গোছানো হবে না। ওর অবস্থা হবে সায়মা দিদির মতো। সায়মা দিদি সিস্টার ইনচার্জ ছিলেন। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলের কথা ভেবে আর বিয়েশাদি করেননি। ছেলে বড়ো হয়ে বিদেশে চলে যায়। একসময় বেদেশি এক মেয়ে বিয়ে করে সেখানেই সেটেল্ড হয়ে যায়। নাতি নাতনিদের দেখার সৌভাগ্যও সায়মা দিদির হয়নি। দীর্ঘদিনের একাকিত্বে শরীরে অসুখ বাসা বেঁধেছিল। শেষের দিকে দিদি প্রায় মৃত স্বামীর স্মৃতিচারণ করতেন। আতিয়াকে বলতেন, একটা বয়সের পর আসলে সন্তান, মা বাবা শুধু নয় বরং একজন সঙ্গীরও প্রয়োজন হয়। না শুধু শারীরিক চাহিদার সঙ্গী নয়, বরং মানসিক চাহিদার জন্যও সঙ্গী প্রয়োজন। সঙ্গী খাবে বলে তখন রাঁধতে মন চায়। একা একা তখন পোলাও বিরিয়ানি দূর ডাল ভাতটাও আর নিজের জন্য প্রতিবেলায় তৈরি করতে মন চায় না। দিনশেষে বিছানায় গিয়ে সারাদিনের ঘটে যাওয়া সমস্ত ঘটনা কারও সাথে বলতে মন চায়। কথাগুলো না হলে বুকের ভেতরই গুমরে মরে। অসুস্থতায় কপালে প্রিয়জনের কুঁচকানো চামড়ার অমসৃণ হাত তখন অপরিসীম শান্তি যোগায়। দিদি আতিয়াকে বলতেন একসময় আতিয়ার মা বেঁচে থাকবেন না, ভাইবোনগুলোর নিজের সংসার হবে। তখন আতিয়া নিজের জন্য একা নিজেকে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখবে! ঝগড়া করার জন্য হলেও একজন সঙ্গী লাগে। রোজকার নিত্যকার অশান্তিও মানুষকে বাঁচার জন্য জ্বালানি দেয়। সায়মা দিদি হয়তো এসবের অভাবেই ফুরিয়ে গিয়েছিলেন। কিডনি ড্যামেজে অকালেই মৃত্যু হয় তার। মৃত্যুর পর ছেলে এসে জায়গা জমি বিক্রি করে একবারে টাকাপয়সা নিয়ে চলে গিয়েছিল। মায়ের কবরে গিয়ে দু’ফোঁটা চোখের পানি ফেলেছিল কিনা তা আর জানা হয়নি। সায়মা দিদিকে দেখেই মূলত একাকিত্বের ভয় জাঁকিয়ে বসেছিল আতিয়ার মনে। তার তো নিজের সন্তানও নেই। সত্যি সত্যি সে একসময় সম্পূর্ণ একা হয়ে যাবে না তো! মা দেলোয়ারা বেগম মিসবাহর কথা জানতে পারলো ভাববেন আতিয়া স্বার্থপরের মতো শুধু নিজের জীবন যৌবন নিয়ে ভেবেছে। কিন্তু আতিয়া তো বোঝাতে পারবে না যে তার চাহিদা শুধু শারীরিক নয়, বরং নিজের মতো করে নিজের একজন মানুষকে পাওয়ার। আর এই চাওয়াটা তো অপরাধ নয়।
কাঁঠালবাগানের ঢালের মুখেই নেমে যায় আতিয়া। বাকি পথটুকু হেঁটে যায়। কোন এক অজানা অস্বস্তিতে বাসার সামনে পর্যন্ত মিসবাহকে নেয় না। কার কাছে যেন ধরা পড়ে যাওয়ার ভয়। অথচ আতিয়া বাচ্চা মেয়ে নয়, মিসবাহও পরিণত মধ্যবয়সী একজন। তবু কিশোর কিশোরীর মতোই স্বল্প সময়ের জন্য লুকিয়ে চুরিয়েই প্রেম করছে যেন! যেই প্রেম এখনো নিজেরাই নিজেদের কাছে স্বীকার করেনি। তবু সেই প্রেমকে স্বীকৃতি দিতে আর স্বীকৃতি পেতে দু’জনই মরিয়া। আতিয়াকে নামিয়ে দিয়ে মিসবাহও বসুন্ধরায় নিজের দোকানে ফিরে যায়। রোজকার এই বিশ পঁচিশ মিনিটের জন্য আতিয়া সারাদিন মান অপেক্ষা করে থাকে। বন্ধু তেমন কেউ নেই যার সাথে মিসবাহকে নিয়ে নিজের অনুভূতিগুলো শেয়ার করতে পারে। আশিককেও জানায়নি এখনো। ভাইয়ের সাথে এসব কথা বলতে লজ্জা লাগে। আজ প্রথম একসাথে বেড়াতে যাচ্ছে। বেড়িবাঁধে যাবে। নৌকায় মিসবাহর সাথে ঘুরবে বলে এই প্রস্তুতি নিয়ে আসা। চিন্তা আর উত্তেজনায় কাজে ভুল হয়েছে বারবার। তবু ভীষণ ভালো লাগছে। মেট্রনের বকাও আজ গায়ে লাগেনি। আতিয়ার বয়স যেন এক ঝটকায় দশবছর কমে তরুণী হয়ে গিয়েছে। এই শাড়ি কই পরবে তা নিয়ে একটু চিন্তায় ছিল। হাসপাতাল থেকে সেজেগুজে বের হলে সবার চোখে পড়বে আর মায়ের কানে যাবেই। কেননা হাসপাতালের পুরনো কর্মীদের সাথে বাবার বদৌলতে মায়ের আগে থেকে পরিচয় আছে। তারাই নিজ উদ্যোগে মাকে ফোন দিয়ে গরম গরম ঘটনা জানিয়ে দিবে। এতদামি শাড়ি, ঘুরতে যাওয়া এসব দেখে মা দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়ে অশান্তি শুরু করবেন। আতিয়া আর বিয়ে করতে আগ্রহী নয় ভেবে মা ইদানীং ভালো মেজাজে আছেন! মাকে আতিয়া অপরাধী করতে পারে না। স্বার্থপর ভাবতে পারে না। স্বামীহারা, কোন রকম আয়হীন একজন মহিলার জায়গায় আতিয়া থাকলে আতিয়াও হয়তো এমনই ভাবতো। কর্মক্ষম, আয় করা সন্তানকে তখন ছাড়তে চাইতো না। নিজের ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তাই হয়তো মানুষকে এমন বানিয়ে দেয়।
সোনিয়া মেয়েটা ভালো। আতিয়ার চেয়ে অনেক ছোট। মাত্রই জয়েন করেছে হাসপাতালে। বয়স বাইশ তেইশ। এখনো বিয়েশাদি হয়নি। হোস্টেলে থাকে। আতিয়া আড়ালে নিয়ে অনুরোধ করতেই খুশিমনে আতিয়াকে নিয়ে এসেছে রুমে। এখন আগ্রহ নিয়ে আতিয়াকে রেডি হতে সাহায্য করছে। তেমন কোন সাজগোছের জিনিস আতিয়ার নেই। কাজল, ক্রিম, পাউডার আর লিপস্টিক। এই আতিয়ার সাজের জিনিস। সোনিয়া এটাসেটা সাজের জিনিস বের করে দেয়।
“সোনিয়া, বোন এত কিছু লাগবে না। আমি এগুলো আগে লাগাইনি। এখন লাগালে নিজেরই আজব লাগবে। তুমি শুধু আমাকে একটু ফেসপাউডার দাও।”
“আপু আপনি চুপচাপ বসে থাকেন তো। আপু এত সুন্দর শাড়ির সাথে একটা সুন্দর ব্লাউজ বানাতেন।”
“শাড়িটা ভাঁজই খোলা হয়নি। আচ্ছা সাদা ব্লাউজে কি মানাবে না বোন?”
“মানাবে আপু। চুল ছেড়ে রাখবেন না আপু?”
“না খোঁপাই ভালো। চুল ছাড়তে লজ্জা লাগে। সোনিয়া কাউকে আজকের গল্প করো না বোন। জানোই তো আমি সেজেগুজে কারও সাথে বেড়াতে গিয়েছে শুনলে সবাই কেমন পেছনে উল্টাপাল্টা কথা বলবে।”
“আপু আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন। আর আপনি ঘুরতে যাচ্ছেন এতে মানুষের এত জ্বালা কেন হবে। সবার কাহিনি জানি। যেগুলো ঘরে বৌ জামাইয়ের সার্টিফিকেট ঝুলিয়ে অন্য কলিগদের সাথে পরকীয়া করে। সেগুলোরই এসব বিষয়ে নাচানাচি বেশি।”
“থাক বাদ দাও। ওরা তো আর একলা না। সংসার আছে, বাচ্চা কাচ্চা আছে। ওদের তাই সংসারের বাইরে দুইনম্বরি করারও লাইসেন্স আছে মনে করে। যত নজর আমার মতো মধ্যবয়সী একা মহিলাদের দিকে। আমরা কারও সাথে হাসলেও নটি বেটি হয়ে যাই। কারও সাথে ঘুরতে গেলে আমাদের চরিত্র খারাপ হয়ে যায়। ওদের ধারণা একা মহিলাদের কোন মান ইজ্জত নাই। আমি এদের ভয় পাই।”
“ভয় পাওয়ার কিছু নাই আপু। আপনি হবু দুলাভাইয়ের সাথে নিশ্চিন্তে ঘুরতে যান। দাঁড়ান তো আপু। দেখি আপনাকে। মাশাল্লাহ মাশাল্লাহ, আমিই তো নজর ফেরাতে পারছি না আপু। এত সুন্দর লাগছে।”
আতিয়া নতুন বৌয়ের মতো মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিচে নামে। হাতে শুধু ছোটো একটা পার্স। বোরখা, বড়ো ব্যাগ সব সোনিয়ার হোস্টেল রুমে রেখে এসেছে। যাওয়ার সময় পাল্টে যাবে। মিসবাহ বাইক নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আয়নার ফোনে যদিও তার মনোজগৎ সামান্য এলোমেলো হয়ে গিয়েছে। তবু রিনঝিন কাঁচের চুড়ির শব্দে ধ্যান ভাঙে। সামনে দাঁড়ানো আতিয়াকে দেখে একমুহূর্তের জন্য থমকে যায়। এই আতিয়া যেন অন্য কেউ। মাথায় ঘোমটা দেওয়ায় কেমন বৌ বৌ মনে হচ্ছে।
“আতিয়া আমাকে বিয়ে করবে?”
আর এক মুহূর্ত দেরি করে না মিসবাহ। ঘাড় নেড়ে সায় দেয় আতিয়া।
(চলবে)
#গোধূলি_রাঙা_আলোয়
#পর্ব_১৪
আলো আজ আবার একটা কাজ করেছে। টাকা না, মায়ের একটা সোনার আঙটি চুরি করেছে। এবার অল্পতে পোষাবে না। পাঁচ ছয় হাজার টাকার মামলা। এত টাকা আতিয়া বা আশিক কারও ব্যাগে পাবে না। রাতুলের বন্ধুরা তাদের গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে রিসোর্টে যাচ্ছে। রাতুলের ইচ্ছে আলোও তার সাথে যাবে। আলোর আপত্তি নেই। আলো আগে কখনো দামি রিসোর্টে যায়নি। আতিয়ার সাথে আতিয়ার হসপিটাল থেকে আয়োজিত পিকনিকে দু’বার গিয়েছে। তবে সেগুলো আসলে কম খরচের পিকনিক স্পট, রিসোর্ট না। রিসোর্ট নাকি খুব সুন্দর। রাতুল বলেছে এসি রুম আছে, সাথে সুন্দর বাথরুম আর তাতে বাথটাবও আছে। সুইমিং পুলে নেমে গোসল করা যায়। রিসোর্টের ভেতরেই মিনি চিরিয়াখানা, ফল, ফুলের বাগানসহ কী নেই! আলোর মন তো তখন থেকেই নাচছে। একেকটা রুমের ভাড়া নাকি দশ পনেরো হাজার! রাতে থাকবে না তারা। সকালে যাবে, সন্ধ্যায় আসবে। বাসায় বলেছে বোর্ড পরীক্ষার আগে স্কুল থেকে র্যাগ ডে হবে। দেলোয়ারা বেগম অবশ্য বলেছেন,
“কয়দিন আগেই না তোদের বিদায় দিলো! আবার কী বিদায়! দুইদিন পর এসএসসি পরীক্ষা।”
“এবার পিকনিকের মতো হবে আম্মা। আমরাই খাওয়া দাওয়া নাচ গানের আয়োজন করবো।”
“এত কিসের নাচ গান বুঝি না। বোর্ডের পরীক্ষার আগে মানুষের পড়তে পড়তে নাকের পানি চোখের পানি এক কইরা ফালাই। তোদের দেখি নাচ, গান খানাপিনা শ্যাষ হয় না। আমি কোন চান্দামান্দা দিতে পারুম না।”
“ক্যান পারবা না? যাই বলি পারবা না পারবা না করো। এখন তো ভাইয়াও কামাই করে। তোমার হাতে আট হাজার টাকা দিছে মাসের শুরুতে।”
“তোরোও এক হাজার দিছে না? কী করছস! জুতা কিইন্না নষ্ট করছস। আর আমার আট হাজারও তোদের পেটেই গ্যাছে। এই যে মুরগী রাঁধছি, সেইটা বিনা পয়সায় আসছে? আতিয়ার টাকা দিয়া ঘর ভাড়া, কারেন্ট ভাড়া দিছি। আশিকের টাকা বাজার করতে খরচ হয়। জিনিসের দাম জানছ?”
“যাই চাই, তাই এমনে মানা করো। এক জোড়া ভালো জুতা ঈদ ছাড়া কিনে দাও না। জামার কথা বাদই দিলাম।”
আলো ঘ্যানঘ্যান করলেও দেলোয়ারা বেগম নরম হন না। আশিকের কাছে টাকা চাইলে আশিক দুইশো দেয়, আর আতিয়া একশো। তিনশো টাকায় কী হয়! একটা ভালো টপসও হবে না। রাতুল বারবার বলেছে সুইমিং এর জন্য আলাদা কাপড় নিতে। আলোর মেজাজ খারাপ হয়। ইদানীং আশিকও মানিব্যাগে টাকা কম রাখে। শেষবার পাঁচশো টাকা হারানোর পর অনেক মন খারাপ করেছে। যদিও বলেছে টাকা হারিয়ে গিয়েছে। চুরি হয়েছে বুঝতে পারেনি। দু’দিন আলো ভয়ে ভয়ে ছিল, কিন্তু যখন দেখলো হারানো টাকা নিয়ে ওকে কোন প্রশ্ন করা হয়নি, তখন নিশ্চিন্ত হয়েছে। আজ বাসায় মেজোবোন আয়েশা এসেছে অনেকদিন পর। আতিয়া আর আয়েশার ভেতর ঠান্ডা যুদ্ধ চলে বলে আতিয়া বাসায় থাকলে আয়েশা স্বামী খলিলকে নিয়ে আসে না। আজ আতিয়া বাসায় আসতে দেরি হবে শুনে মাকে দেখতে এসেছে। মা অন্য ঘরে শুয়ে আয়েশার সাথে গল্প করছে। আলমারির চাবিটা বালিশের নিচেই পেয়ে যায়। আলমারি খুলে কাপড়ের নিচ থেকে ছোটো বাক্সটা বের করে। দেলোয়ারা বেগমের গয়নাগাটি এই বক্সেই রাখা। মা একদিন বলেছেন আতিয়া আর আয়েশার জন্য যা করার করেছেন। আশিক বিয়ে করলে নিজের বৌয়ের গয়না নিজেই দিবে। এখানে যে টুকটাক গয়না আছে সেগুলো তিনি আলোর বিয়েতে দিবেন। তাই আলোর মনে হয় কোন চুরি করছে না। এগুলো তো তারই হবে একসময়। চেইন ওঠাতে গিয়েও সাহস হয় না। এত দামি জিনিস বিক্রি করতে পারবে না, ভয় লাগে। তারচেয়ে ছোটো একটা আঙটি নিলেই ভালো। আপাততঃ কাজ চলে যাবে।
আঙটি নিয়েই ব্যাগ গুছিয়ে বের হতে যায়,
“আম্মা, কোচিং এ গেলাম। গেট লাগাও।”
“যা। দরজা টাইন্না যা। আর রাইত করবি না।”
আলো ধুপধাপ নিচে নেমে হাঁটা দেয়। কোথায় বিক্রি করা যায় আঙটি তাই ভাবছে। এই আঙটি ব্যাগে রাখা যাবে না। দ্রুত বিক্রি করে টাকা নিতে হবে। তারপর রাতুলের সাথে শপিং এ যাবে। রিসোর্টের খরচ রাতুলই দিবে। কিন্তু রিসোর্টে পরার জন্য ভালো পোশাক কিনবে। সাজের জিনিস কিনবে। রাতুলের বন্ধু বান্ধবদের গার্লফ্রেন্ডরা খুব টিপটপ। রাতুল বারবার বলে দিয়েছে, তার গার্লফ্রেন্ডকে যেন সবার চেয়ে সেরা লাগে।
আতিয়া বিয়ের জন্য হ্যাঁ তো বলে দিয়েছে। কিন্তু এখন লজ্জায় মাথা তুলে মিসবাহর দিকে তাকাতে পারছে না। মিসবাহ নৌকা দরদাম করে ঠিক করছে। নৌকায় উঠে আতিয়াকে ইশারায় নৌকার কাছে আসতে বলে। আতিয়া নৌকায় পা দিতে কেমন দুলে ওঠে। ভয় পেয়ে সরে যায় আতিয়া। আগে কখনও নৌকায় ওঠা হয়নি।
মিসবাহ হাত বাড়িয়ে দেয়,
“আসো ভয় নাই হাত ধরো।”
“শক্ত করে ধরে রাখো। আমি সাঁতার জানি না।”
“বোকা হাঁটু পানি এখানে। ডুববে না। আর ডুবলেও আমি আছি।”
দু’জন দু’জনের অজান্তেই তুমি করে বলতে শুরু করেছে। মিসবাহর হাত ধরে নৌকায় উঠে আসে আতিয়া। মনে পড়ে এমনই একটা স্বপ্ন দেখেছিল একদিন। সেদিন হাত ধরা পুরুষটির চেহারা বোঝা না গেলেও আজ বুঝতে পারছে সে মিসবাহই ছিল!
নৌকা চলতে শুরু করেছে। নদীর মিষ্টি বাতাসে মাথার ঘোমটা পড়ে যায় আতিয়ার। মিসবাহ হাত দিয়ে খোঁপাটা খুলে দেয়। আতিয়া বাঁধা দিতে গেলে বলে,
“খোলা চুলে দেখিনি কখনো। থাকুক না এভাবে।”
আতিয়ার একমাথা কালো চুলে আজ শ্যাম্পু করেছিল। চুলের ধরন বেশ ভালো আতিয়ার। এখনো বয়সের সাদা দাগ লাগেনি। ঝরঝরে চুলগুলো বাতাসে ওড়াউড়ি করছে। কয়েকগাছি চুল বারবার এসে পড়ছে মুখের উপর। মিসবাহ মুগ্ধ হয়ে দেখে। ঘন ভ্রু, দীঘল পাপড়ির বড়ো বড়ো চোখ, আর উজ্জ্বল ত্বকের আতিয়াকে কী ভীষণ সুন্দর লাগে মিসবাহর। পায়রাও সুন্দরী ছিল, সুন্দরী আয়নাও। কিন্তু তাদের কারও সৌন্দর্য যেন এমন হৃদয়ে কাঁপন তোলার মতো লাগেনি কখনো। এ কি শুধুই মায়া আর ভালোবাসার খেলা! হয়তো আতিয়াকে মন থেকে ভালোবাসে ফেলেছে বলেই আতিয়াকে সাধারণের মাঝেও অসাধারণ লাগে মিসবাহর। এমনটা আর কারও জন্য অনুভব করেনি এই চল্লিশ বছরেও। হয়তো আর করবেও না। সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় মিসবাহ। আয়নার ভালোর জন্য একটা ব্যবস্থা মানবিক দিক থেকেই করবে। কিন্তু বিয়ে যদি করতে হয় তবে আতিয়াকেই করবে। আয়নাট ব্যাপারটা ঠিক করে তবেই আতিয়াকে বিয়ে করতে হবে। আপাততঃ আতিয়াকে আয়নার কথা কিছু বলে পরিবেশটা নষ্ট করতে চায় না মিসবাহ।
“আতিয়া।”
“জ্বি।”
“আমি তোমার বাসায় লোক পাঠাবো। তোমার বাসায় মুরুব্বি তো তোমার আম্মা শুধু তাই না?”
“মিসবাহ তোমাকে একটা কথা বলা হয় নাই।”
“কী কথা?”
“আমার চাকরিটা খুব দরকার।”
“তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে তো বলিনি। হ্যাঁ আমার মা রাগারাগি করবেন। আগের দিনের মানুষ তো। কিন্তু তুমি সামলাতে পারবে না?”
“সমস্যা আমার মা নিজে। চাকরি আমার নিজেরই আর করতে ভালো লাগে না। চাকরি করা কোনদিনও আমার স্বপ্ন ছিল না। সারাজীবন শুধু একটা ঘর চেয়েছি। গুছিয়ে সংসার করতে আমার খুব ভালো লাগতো। আজ হাসান বেঁচে থাকলে আমাদের সংসারের তেরো বছর চলতো, আমার বাচ্চাটা বেঁচে থাকলে এখন স্কুলে পড়তো। বিশ্বাস করো আমি এই জীবনটাই চেয়েছি। দুটো মায়া মায়া সন্তান আর একজন ভালো জীবনসঙ্গী। ঠিক যেন একটুকরো চাঁদের হাট। পৃথিবীটা হঠাৎ এলোমেলো হয়ে গেল। আমি হঠাৎ গৃহিণী থেকে ঘরের একমাত্র আয় করা সদস্য হয়ে গেলাম। আমার চাকরিটা আমার পরিবারের চলার অবলম্বন। অন্ততঃ যতদিন আমার ভাইবোনগুলো দাঁড়িয়ে না যায়। আর এখানেই আমার আম্মার ভয়। আম্মা ভাবেন আমি আবার বিয়ে করলে আমার শ্বশুর শাশুড়ি আর চাকরি করতে দিবে না। দিলেও আমার চাকরির টাকা আমি আর বাবার বাড়িতে দিতে পারবো না। আমি আপনার কাছে খালি এইটুকু চাই যে আমি যেন প্রতিমাসে মায়ের হাতে বাড়ি ভাড়া আর বাজার খরচের জন্য বিশ হাজার তুলে দিতে পারি। আমি মন থেকে চাই তোমার সংসারটা করতে। স্বামী সন্তান নিয়ে একটু সুন্দর জীবন কাটানোর বড়ো শখ আমার।”
টলমল চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে আতিয়ার। ঠোঁটগুলো কান্না আটকাতে কাঁপতে থাকে। মিসবাহর কী যেন হয়। দু হাতে মুখখানি তুলে গভীর মমতায় চুমু এঁকে দেয় আতিয়ার ঠোঁটে। যেন শুষে নিতে চায় আতিয়ার সমস্ত কষ্ট আর কান্না।
(চলবে)