#মেঘভেজা_দুপুরের_নিমন্ত্রণে_ফিরে_এসো
#পর্ব-১৩
ফোনের ওপাশে রঙ্গন ‘হ্যালো’ বলতেই আমি বলি-“রঙ্গন, এখনি একটু হোটেল আগ্রাবাদে আসতে পারবি? রুম নাম্বার পাঁচশো সাত এসে নক দিবি। আর শোন, আসার সময় একটু মোমেনা খালাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে আয়। তাড়াতাড়ি আসিস প্লিজ।”
রঙ্গনকে কিছু বলার সুযোগ দিলাম না। ফোন নামিয়ে রেখে সারোয়ারের দিকে তাকিয়ে বলি-“তথ্য যাচাইয়ের সু্যোগ যখন আছে তখন সময় নষ্ট করে লাভ কি। তাছাড়া রঙ্গনের উপর এতো বড় অভিযোগ দিচ্ছ ওর কথা না শুনে কোন সিদ্ধান্তে আসা ঠিক হবে না।”
দেখলাম সারোয়ার আর ওর মা দৃষ্টি বিনিময় করলো। আমি হেসে ওনাকে জিজ্ঞেস করি-“এতো অসুস্থ শরীর নিয়ে এসব করতে খারাপ লাগে না আপনার? এতো এনার্জি পান কোথায়?”
উনি জবাব দিলেন না। আমি সারোয়ারকে বলি-“তুমি সত্য বলতে ভুলে গেছো। তাই বলে আমি মিথ্যেটা মেনে নেব এমনটা ভাবা বোকামি না বলো? সেই পাঁচ বছর আগের আমার সাথে আজকের আমাকে তুলনা করলে ভুল করবে।”
সারোয়ার শুধু বললো-“রঙ্গন আসুক সত্য মিথ্যা প্রমান হয়ে যাবে।”
আধাঘন্টা বাদে রঙ্গন এলো। স্বভাবতই সারোয়ারকে দেখে ও ভীষণ রকম চমকে উঠলো। আমি তিতুনকে মোমেনা খালার সাথে বাইরে পাঠিয়ে দিলাম। রুমে আমরা চারজন মুখোমুখি বসলাম। সবাই চুপচাপ হয়ে আছে। আমিই কথা শুরু করলাম-“রঙ্গন, সারোয়ার তোর বিরুদ্ধে একটা গুরুতর অভিযোগ তুলেছে। সে বলছে রেবা সারোয়ারকে সাথে নিয়ে আমেরিকায় পালিয়ে যায় তোর সহযোগিতায়। সেখানে সারোয়ারকে বন্দী করে রাখতো রেবা। কথাগুলো কতটুকু সত্য সেটা জানতেই তোকে ডাকা।”
রঙ্গন চুপচাপ আমার কথা শুনলো। এর মাঝে কয়েকবার ওর মুখায়বর পরিবর্তন হয়েছে। শেষের দিকে এসে আমি যখন জবাবের আসায় ওর দিকে চাইলাম ও হেসে দিলো-“সত্যতা যাচাই করার আগে আমি তোর কাছে জানতে চাই, তুই ওর কথাগুলো কতটা বিশ্বাস করেছিস? তোর কি আদৌও মনেহয় ও সত্য বলছে?”
আমি ওর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে আবারও জানতে চাই-“তুই বল প্লিজ। তোর বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগ মেনে নিতে পারছি না।”
রঙ্গন হেসে দিলো-“তোকে মাঝে মাঝে আমার এতো বোকা মনেহয় দুপুর। তুই একজন শিক্ষিত মেয়ে হয়ে উজবুকের মতো কাজ করিস কি করে? তবুও তোর জানার জন্যই বলছি, আমেরিকায় কাউকে জোর করে ধরে বেঁধে নিয়ে যাওয়া যায় না যদি না সে নিজে না যায়। কিংবা কাউকে বন্দী করে রাখাটাও এতোটা সহজ নয়। সারোয়ার তোকে গাঁজাখুরি গল্প বলে আর তুই বিশ্বাস করিস? তুই এতো বোকা কেন দুপুর?”
আমি কিছু বলার আগেই সারোয়ার চেচিয়ে উঠলো-“ও কথা ঘোরাচ্ছে দুপুর। ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বলে ফাঁকি দিচ্ছে।”
রঙ্গনের চোখ দুটো জ্বলে উঠলো, চোয়াল শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো-“দেখ দুপুর, মিথ্যেবাদীদের সাথে কথা বলে সময় নষ্ট করার কোন মানে দেখি না। খালা প্রথমে বললো সারোয়ার নিরুদ্দেশ। এখন দেখা যাচ্ছে সে বহাল তবিয়তে আছে। আবার এসে উল্টো পাল্টা বকছে। তুই কেন এখনো ওদের সাথে আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিস আমি সেটাই বুঝতে পারছি না।”
সারোয়ার চেচিয়ে উঠে বললো-“কারন ও আমার বিয়ে করা বউ। অধিকার আছে ওর উপর আমার।”
রঙ্গন চরম মেজাজ খারাপ করে হাততালি দিলো-“বাহ চমৎকার। তাহলে আর কি, দুপুর তুই এখন ওর সাথে সংসার পাত।”
সারোয়ার বললো-“ওর কাছে জানতে চাও দুপুর, আমেরিকায় আমার সাথে ওর দেখা হয়েছে কিনা। এই এতোদিনে ওকি একবারও আমার কথা বলেছে তোমায়?”
আমি ভাবলেশহীন নয়নে রঙ্গনকে দেখলাম। আমায় দেখে ও কি বুঝলো কে জানে চট করে চেয়ারে বসে আমায় ডাকলো-“শোন দুপুর, সারোয়ারের মিথ্যাচার নিয়ে জবাবদিহির কোন ইচ্ছে আমার নেই। তবে আজ এটুকু বুঝলাম সত্যিটা ওরা কখনোই তোকে বলবে না। তাই আমি আজ তোকে সত্য বলবো। তুই বলেছিলি ওদের খবর নিতে আমি নিয়েছি আর কিছু তথ্য আগে থেকেই জানি। তুই পালিয়ে আসার পর সারোয়ার আর রেবা বিয়ে করে আমেরিকায় পাড়ি জমায়। ওখানে সারোয়ার লাগামহীন জীবন যাপন করতে শুরু করে। সারোয়ারের চাহিদা পূরণে দেশ থেকে খালাকে টাকা পাঠাতে হয়। ব্যবসায় ধস নামে। একবার মাতাল হয়ে কার সাথে মারামারি করে জেলে যায় সারোয়ার। তাকে ছাড়াতে খালার গ্রামের জমি বিক্রি করতে হয়। আর বাড়িটা সারোয়ারের দাদীকে তার অংশ হিসেবে লিখে দিতে হয় বাধ্য হয়ে। রেবা শুরুতে সারোয়ারের সাথে তাল মেলালেও পরে হাঁপিয়ে গেছিল। ওখানেই আরেক বাঙালি ছেলের সাথে সম্পর্ক হয়ে পালিয়ে যায়। তারপর সারোয়ার কিছুদিন চেষ্টা করে একা একা ভিন দেশে সারভাইভ করতে কিন্তু না পেরে ফিরে আসে। সোমা আর স্বাতী খালার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে সবকিছু থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেয়। বাবার সম্পদে ওদের হক ছিলো যা সারোয়ারের কারণে ওরা পায়নি। খালার অসুখ কবে থেকে সেটা কেউই বলতে পারে না। ওদের এখন ঘর নেই, ঠিকানা নেই। আজ এখানে কাল ওখানে ভাড়া থাকে। এবার বুঝে নে ওরা কেন তোর কাছে এসে এতো নাটক করছে। ওদের তোকে দরকার দুপুর। সেই দরকার থেকেই তোর কাছে ফিরেছে। আমি চাইনি তুই আবার এই জঞ্জালে পা রাখিস তাই সবকিছু তোর থেকে আড়াল করেছি। তাছাড়া তুই নিজেও কিন্তু কখনো জানতে চাসনি। এখন এটা নিশ্চিয়ই আমার অপরাধ নয়?”
রঙ্গন থামলো, আমার কাছ থেকে কিছু শোনার আসায় তাকায়। আমি কিছু না বলে চুপ করে আছি। সারোয়ার বললো-“ও মিথ্যে বলছে দুপুর। নিজের দোষ ঢাকতে এসব বলছে। ও আসলে তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নিজের করে পেতে চায় এইজন্য এসব বলছে।”
আমি তবুও চুপ করে রইলাম। সারোয়ারের কথায় একটা শব্দও প্রতিউত্তর করলো না রঙ্গন। হতাশ কন্ঠে বললো-“তোর সিদ্ধান্ত কি হবে আমি জানি না তবে আমি একটা কথা পরিস্কার করে দেই, সব ছেড়ে আমি দূরে চলে এসেছিলাম দুপুর। কাকতালীয় ভাবে যেদিন দ্বিতীয়বার সাহায্য চেয়ে তোর ফোন এসেছিল সেদিন আবারও তোর ডাক উপেক্ষা না করে সাড়া দিয়েছিলাম। এতোগুলো বছর নিঃস্বার্থ ভাবে তোর পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছি। আমাকে বিয়ে না করলেও কোন আপত্তি নেই কিন্তু আমি চাইবো না দ্বিতীয়বার সারোয়ার তোর জীবনে আসুক। যদি তুই এরকম কোন সিদ্ধান্ত নিস তবে চিরজীবনের মতো আমাকে হারিয়ে ফেলবি। এখন তুই ভেবে দেখ কি করবি। আমি চললাম। এই ক্লাউনদের মাঝে থাকার কোন ইচ্ছে আমার নেই।”
রঙ্গন কোন সুযোগ না দিয়ে বেড়িয়ে গেলো। শাশুড়ী মা মুখ নিচু করে বসে আছে। আমি উঠে দাঁড়িয়ে ওনাকে ডাকি-“আপনি যাবেন না থাকবেন?”
উনি সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ওনার চোখে অবিশ্বাস। সারোয়ারের সাথে নিঃশব্দে দৃষ্টি বিনিময় করে আমার পিছু পিছু বেরিয়ে এলেন। বাসায় ফিরে নিজের রুমে ঢোকার আগে ওনাকে বললাম-“এখন থেকে আমার অনুমতি ব্যাতীত আমার মেয়েকে বাসার বাইরে নেবেন না। এতোদিন সম্পর্কের লেহাজ দেখিয়ে চুপ ছিলাম কিন্তু আর না। আমার কথার বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না আর। ফল ভালো হবে না। অন্তত আমার মেয়ের ক্ষেত্রে কোন ধরনের ফালতু আচরণ আমি মেবে নেব না।”
উনি বিনা বাক্যে মাথা দুলালেন। আমি মনে মনে হাসলাম। খুব বুঝতে পারছি, অতি ভক্তি চোরের লক্ষণ। ওনার মাথায় নিশ্চিত কিছু চলছে। আমিও দেখতে চাই শেষটা। এরা আর কতদূর যেতে পারে এটা দেখতে চাই। আমি হুট করে বলি-“একটা কথা বলবো?”
উনি তাকিয়ে থেকে মাথা দুলায়। আমি বলি-“সারোয়ারকে অন্ধভাবে ভালোবাসার কোন আলাদা কারণ আছে? আপনার একটু শাসন ওকে মানুষ বানাতে পারতো। কেন এতোটা ছাড় দিলেন?”
উনি কিছুক্ষণ ছলছল নয়নে আমার দিকে তাকিয়ে থেকে ঝরঝর করে কেঁদে দিলেন। এই প্রথমবার ওনার কান্না আমার কাছে মেকি মনে হলো না। মনে হলো মানুষটা অনেকদিন পরে মন থেকে মন খুলে কাঁদছে।
★আসন্ন বইমেলা উপলক্ষে আমার দু’টো বই আসছে। একটা পলিটিকাল মার্ডার মিস্ট্রি থ্রিলার ‘অন্ধকারে জলের কোলাহল’ অন্যটা সমকালীন রোমান্টিক জনরার ‘আমি ডুবতে রাজি আছি’। চমৎকার বইদুটোর প্রি অর্ডার চলছে রকমারিসহ আপনার পছন্দের বুকশপে। আমার লেখা ভালো লাগলো বইদুটো সংগ্রহ করুন। আশা করছি বই পড়ে নিরাশ হবেন না।★
চলবে—
© Farhana_Yesmin