অপ্রিয় রঙ্গনা পর্ব-২৮+২৯

0
357

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৮

দিনগুলো কঠিন বিষাদে পরিপূর্ণ।
আগের মতো স্ফূর্ততা নেই কোথাও। সবার সাথেই সম্পর্কগুলো নড়বড়ে হয়ে গেছে তাখলিফের। তার পেছনে অবশ্য পাখি বেগমের হাত আছে। সাজেদা বেগমের অসুস্থতা আর সানওয়ার হকের অনুপস্থিতিতে এই বাড়িতে কর্ত্রী হিসেবে এখন রাজত্ব তারই। তাই সবাইকে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি হাসিল করতে চান। সাথে আবার যোগ হয়েছে তার তালাক প্রাপ্তা ছোটবোন কোকিলা বেগম। পাখি বেগম একা, তাকে বোঝার কেউ নেই এইসেই দোহাই দিয়ে আপাতত তিনি এ বাড়িতেই থাকছেন। তাখলিফের কাছ থেকে মেয়েকে সরিয়ে আনতে না পেরে পাখি বেগম ভীষণই নাখোশ। তিনি কিছুতেই আর এসব নিতে পারছেন না। ওই জন্মপরিচয়হীন ছেলের তার মেয়ে জামাই ভাবলেই তার গা গুলায়। শরীরের শিরায় শিরায় আগুন জ্বলে। তার কেন এত ঠেকা পড়েছে ঐ ছেলের কাছে? তার মেয়ে সুন্দরী, মার্জিত, শিক্ষিত, শিষ্টাচারী,
নরম দিলের মানুষ। হাত বাড়ালেই পাওয়া যাবে একটা কলঙ্কহীন, বড়লোক ঘরের ছেলে। অথচ মেয়েটার মাথাটা এমনভাবে খেয়েছে ঐ ছেলে যে তার মেয়ে কিছুই চোখে দেখতে পাচ্ছে না। পাখি বেগম এসব নিয়ে কেঁদেকেটে অভিযোগ করছিলো তার ছোটবোন কোকিলা বেগমের কাছে। বড় বোনের কথাগুলো শুনে কোকিলা বেগম সান্ত্বনা দিয়ে তাকে বলে, “আমার বোনজিরে ঐ বেজন্মার কাছে বেশিদিন থাকতে দিমু না আফা। এই আমি তো আছি।”

পাখি বেগম হতাশ গলায় কেঁদে বলেন, “এতদিন আমি তো নানাভাবে চেষ্টা করলাম। এত বুঝালাম, মাইয়া আমারে বুঝে না। খালি কয়, মাইনা নিতে। ওরা সুখে আছে৷ তাতে কী? সুখই তো সব না। মানসম্মান বইলা ও তো কিছু আছে। এইসব জানলে মানুষ আমাগী কি কইবো? কলঙ্ক লাগবো এইডা মাইয়া বুঝে না। তুই ক, এই পোলারে আমি কি দেইখা মানুম? জাইনাশুইনা একটা জন্মের দোষ পোলারে আমি কেমনে জামাই বইলা মানুম? এরপর হের বাপ, চাচা। এই অঢেল সম্পত্তির বেশিডাও নাকি হেয় পাইবো। আমার পোলার চাইতেও বেশি। আমার শ্বশুরে নাকি সেই ব্যবস্থা কইরা গেছে। সারা জীবন এই সংসারে খাইটা খুইটা এহন এই দিন দেহন লাগবো? আর পারতাছি না সহ্য করতে।”

কোকিলা বেগম একটু চুপ থেকে এরপর রহস্যময় গলায় বলে, “এই আফা, একটা কথা কমু?”

পাখি বেগম চোখ মুছে এরপর বলে,
“হুম, ক।”

কোকিলা বেগম ভাবুক গলায় বলেন,
“তোমার কথা হুইনা বুঝলাম অত সহজ হইবো না সবকিছু। তয় একটা উপায় আছে…”

“কী?”

কোকিলা বেগমের চোখ চকচক করে ওঠে,
“কালাম হুজুরের পরামর্শ নিবা? এইডা সহজ হইবো। কেউ কিছু বুঝবো না, আর তোমার চাওয়াডাও পূরণ হইবো। এর আগেও তো হইসিলো।”

পাখি বেগম বোনের কথা শুনে আঁৎকে ওঠেন।
তার মনে পড়ে যায় অতীতের করা কাজগুলো। সংসারে নিজের কর্তৃত্ব সবার ওপরে রাখতে তমালিকার সাথে যা করেছিলেন তিনি! ছোটবোনের কথায় বড় জা’কে সরাতে নিয়েছিলেন কালাম হুজুরের পরামর্শ। সেই পরামর্শ মোতাবেক তিনি তমালিকার ব্যবহৃত পোশাকের অংশ, মাথার চুলসহ আরো কিছু জিনিস সবার অগোচরে জোগাড় করেছিলেন। এরপর নিয়ে গিয়েছিলেন কালাম হুজুরের কাছে। তমালিকাকে রাস্তা থেকে সরাতে তার উপর কালো জাদুর প্রয়োগ করেছিলেন। এর প্রভাব অবশ্য ভালোভাবেই পড়েছিলো তমালিকার জীবনে। ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন তিনি, সারাক্ষণ চিন্তায় থাকতেন, অন্যমনস্ক থাকতেন। গায়ে জ্বর থাকতো। পাখি বেগম চেয়েছিলেন তাকে শয্যাশায়ী করে দিতে। তমালিকা মরে যাবে এটা তার পরিকল্পনায় ছিলো না। তবে এতে তিনি অখুশিও হননি। পরে অবশ্য এই ঘটনায় পাখি বেগম ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভয় পেয়েছিলেন। ধরা পড়ে যাবে ভেবে এই কালো জাদুর ব্যাপারে দ্বিতীয়বার আর কখনো আগাননি। শুধু তমালিকাকে সরাতে পেরেই স্বস্তি পেয়েছিলেন। পথের কাঁটা সরেছে এটুকুতেই তার শান্তি। এসব অবশ্য তার আর কোকিলা বেগমের কাজ। কেউ জানে না, জানবেও না। বহু বছর পর বোনের মুখে এই কথা শুনে পাখি বেগম ভীতু কন্ঠে বলেন, “কি কস? এইডা সম্ভব না আর। হেইবারই আমার শ্বাশুড়ি ঝামেলা করছিলো। আরেকটুর লাগি সন্দেহ করে নাই।”

“আরে অহন তো আর মাওই মা নাই। কেডা বুঝবো? কেউ না। আর এটুকুনি কাজ, করতে পারলে তোমার চাওয়া পূরণ অইবো৷ ভাইবা দেইখো…”

পাখি বেগম দ্বিধায় পড়ে যান৷ কি করবেন বুঝে না পেয়ে নাকি কান্নার সুরে বোনকে বলেন,
“তুই যা ভালো বুঝ কর। আমার খালি ঐ পোলার থেইকা নিস্তার পাইলেই চলবো।”

কোকিলা বেগম বোনের সায় পেয়ে মাথা দোলান। পাখি বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। তাদের মধ্যে আরো গোপন কিছু কথাবার্তা চলে। দরজায় বাইরে দিয়ে যাওয়ার সময় খালা শ্বাশুড়ির কিছু রহস্যময়ী ভাসাভাসা কথা কানে আসতেই না চাইতেই দাঁড়িয়ে পড়েছিলো তুসি। ঝুমুর আর তাখলিফের বিরুদ্ধে এই মহিলা এমন ষড়যন্ত্র করছে শুনেই থমকে যায় সে। পরবর্তী কথাগুলো অবশ্য আর কানে আসে না তুসির। মনে মনে শুধু আঁৎকে ওঠে। ওর বিশ্বাসই হয়না নিজের এই সাধাসিধে শ্বাশুড়ি মায়ের এই রুপ। নিজের মেয়ের সংসার ভাঙতে শেষ পর্যন্ত কালো জাদুর দারস্থ হবেন? আজ পর্যন্ত এমন মা দেখেনি তুসি। মায়ের হয় নিঃস্বার্থ! যারা নিজের সুখ ত্যাগ করে হলেও ছেলে-মেয়েদের জীবন সুখে মুড়িয়ে দেওয়ার জন্য জীবন দিয়ে দিতে পারেন। সেখানে পাখি বেগমের এই রুপ? নিজ হাতে মেয়ের জীবন নষ্ট করার কথা ভাবছেন? এরকমও মা হয়? তুসির মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। ব্যাপারটা কাকে জানানো উচিৎ বুঝে ওঠতে পারে না। ইয়াসিফকে বলবে? বিশ্বাস করবে তো ওকে? না-কি ভুল বুঝবে? তুসি দ্বিধা পড়ে যায়। তবুও ইয়াসিফ অফিস থেকে ফিরলে ওকে জানাবে বলে মনোস্থির করে।

.

গ্রামগঞ্জে কালোজাদু বিষয়টা নিয়ে খুবই চর্চা হয়।
বিশেষ করে বউ-শ্বাশুড়িদের মধ্যে কালোজাদু ব্যবহারের প্রবণতাটা লক্ষ্য করা যায় বেশি।
কাউকে বশে আনা, কারো ক্ষতি করা ইত্যাদি চলে আসছে বহুকাল ধরে। গ্রামের রক্ষণশীল অথচ পারিবারিক নোংরা রাজনীতিতে ভরপুর পাখি বেগমের পরিবারের মধ্যেও ছিলো কালো জাদুর ব্যবহার। আর ঠিক এক কারণেই পাখি বেগমের ছোটবোন কোকিলা বেগমের সংসার ভেঙেছে।
নিজের পয়সাওয়ালা স্বামীকে হাতের মুঠোয় রাখতে তিনি নিয়েছিলেন এই ঘৃণ্য পদক্ষেপ। কিন্তু একটু ভুলচুক হওয়ায় তার বিরুপ প্রতিক্রিয়া পরে কোকিলা বেগমের স্বামীর ওপর। প্রায় মরতে মরতে সেবার বেঁচে গিয়েছিলেন কোকিলা বেগমের স্বামী। পরবর্তীতে ব্যাপারটা জানাজানি হয়ে গেলে কোকিলা বেগমের শ্বশুরবাড়ির লোকেরা তাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়, স্বামী দিয়ে দেয় তালাক।
তবুও কয়লা ধুইলে ময়লা যায়না এই প্রবাদের সত্যতা অনুযায়ী কোকিলা বেগম এরপরেও শুধরায়নি। বিয়ের দু’ বছরেই ডিভোর্সি তকমা পাওয়া এই মহিলা বাপের বাড়িতে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করতে, সবাইকে নিজের হাতের মুঠোয় রাখতে ভাই, ভাবি, আপনজনদেরকেও কালোজাদুতে আছন্ন করে রেখেছেন। এখন বাড়ির সবাই তার পরামর্শ মতোই চলাফেরা করে। এমনকি তার ভাইয়েরাও। নিজ বাড়িতে তার আধিপত্য এমনই বেশি যে, ভাই-বোনের ছেলেমেয়েদেরও তার কথায়ই ওঠবস করতে হয়। আর তার কথা শুনে শুনেই পাখি বেগমও চলেন।
নির্বোধ এই মহিলাটির চোখে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিমান আর বাস্তববাদী মহিলা হলো তার ছোটবোন
কোকিলা বেগম। তার কথা শুনে চললেই যা চায় সব পাওয়া যায়। ওর কথার অন্যথা হলেই হিতে বিপরীত হয়। তাই বোনের প্রতি এক অদ্ভুত অন্ধবিশ্বাস আছে পাখি বেগমের। কোকিলা বেগম ইয়াসিফের ব্যাপারেও তাকে বুঝিয়েছে, ‘তোমার পোলার শ্বশুরবাড়ি বড়লোক। টাকাপয়সা বহুত আছে। খালি মাইয়াডাই কালো। এইডা তেমন সমস্যা না। একটা মাত্র পোলা তোমার, ওরে হাতের মুঠোয় রাখার লাগি ও যা চায় আপাতত তা-ই করো। নয়তো একমাত্র পোলাডারেও হারাইবা। কালো বউয়ের ব্যবস্থা আমি পরে কইরা দিমু। তুমি টেনশন কইরো না।’
তাই মস্তিষ্কবিহীন পাখি বেগম নিজের বোনের কথামতোই ইয়াসিফের কালো বউকে তিনি মেনে নিয়েছেন৷ নয়তো তার বয়েই গেছিলো এই মেয়েকে মেনে নিতে।
.

রাতে ঘুমুতে যাওয়ার সময় তুসি অনেক ভেবেচিন্তে, ভয়ে ভয়ে ইয়াসিফকে ওর মা, খালার গোপন পরিকল্পনার কথা জানায়। মায়ের বিরুদ্ধে তুসির মুখে এসব কথা শুনে ইয়াসিফ প্রথমে বিশ্বাস করেনি। রেগে ঠাস করে চড় মেরেছিলো তুসিকে। তুসি অবশ্য প্রস্ততই ছিলো। চড় খেয়ে কষ্ট পেলেও নিজেকে এটা বলে বুঝিয়েছে যে মায়ের বিরুদ্ধে কেউ হঠাৎ এসব কথা শুনলে স্বভাবতই রেগে যাবে। আর ইয়াসিফ তো মা’কে কত ভালোবাসে! তুসি তাই কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ে। কিন্তু পরক্ষণেই ইয়াসিফের একনাগাড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলার শব্দ শুনে হকচকিয়ে ওঠে বসে, “কী হয়েছে? এমন করছিস কেন?”

ইয়াসিফ চোখ তুলে তাকাতেই তুসি ভড়কে যায়, “তুই সত্য বলছিস?”

তুসি ঢোক গিলে বলে, “আমি যা শুনেছি বলেছি, এখানে একবিন্দুও মিথ্যে নেই।”

ইয়াসিফ অনেকক্ষণ পর আহত স্বরে বলে, “আমার মা’কে আমি চিনতে পারছি না। এটা আমার মা? এমন পালটে গেলো কি করে… ”

তুসি অসহায় স্বরে বলে, “মায়ের মাথার ঠিক নেই৷ ভাইয়াকে মানতে পারছে না বলেই এমন করছে। আমরা পরে ভেবে একটা উপায় বের করবো। এখন এসব ভাবিস না। প্লিজ শুয়ে পড়।”

ইয়াসিফ এগিয়ে গিয়ে ওর চড় দেওয়া গালে হাত বুলাতে বুলাতে করুণ গলায় বলে, “সরি তুসি। আমি রেগে গেছিলাম।”

তুসি আলতো হেসে ওর চুলে বিলি কেটে বলে,
“ইট’স ওকে। প্লিজ ঘুমা।”

ইয়াসিফ চোখদুটো বুজে নিজেকে সামলে বলে,
“হুম…”

ইয়াসিফ শুয়ে পড়লেও ওর চোখে ঘুম নেই। মাথা কাজ করছে না ওর। ভাবতো ওর মা পৃথিবীর সেরা মা। অভিমানী একজন নারী। যার মধ্যে বাস্তবের থেকে আবেগ কাজ বেশি। ছেলে-মেয়েদের কিছু হলে এই নারীটি পাগলের মতো আচরণ করতো। এসবকে ও মাতৃস্নেহ ভাবতো! সেজন্য সবসময় চেষ্টা করতো মা’কে দুঃখ-কষ্ট না দেওয়ার। যতটুকু সম্ভব খুশি রাখার। মা-টাকে বেশ সহজসরল ভাবতো ও, সেইসাথে ভালোও বাসতো। সেইসাথে মনে করতো তাখলিফকে পছন্দ না করার একমাত্র কারণ করতো হলো বড় চাচীর মৃত্যু! এর জন্যই বুঝি মা ওমন করে তাখলিফের সাথে। তাই মায়ের এমন বাড়াবাড়িটাকেও স্রেফ অযাচিত ধরে সহ্য করে এসেছে। ধৈর্য ধরেছে, অপেক্ষা করেছে, মনকে বুঝিয়েছে মা একদিন ঠিক সব মেনে নিবে। ঝুমুরকে তাখলিফ ভাইয়ার সাথে সুখী হতে দেখলে মা নিশ্চয়ই আর কোনো রাগ-ক্ষোভ মনে পুষবে রাখবে না। মেনে নেবে বলেই বিশ্বাস ছিলো ওর। যেমনটা মা ওর আর তুসির বিয়েটা মেনে নিয়েছে৷ ছোটখালা! যাকে দু-চোখ সহ্য করতে পারে না তার সাথে মিলে মা কুপথে পা বাড়িয়েছে? মা যে এতটা পালটে গেছে, এতটা কুৎসিত মানসিকতা নিয়ে নিজেই নিজের মেয়ের সুখ নষ্ট করতে ওঠেপড়ে লাগবে এমনটা তো কস্মিনকালেও ভাবেনি সে। তাহলে? সমীকরণে ভুল ছিলো ওর?

.

তিনতলায় ছোট্ট সংসার।
তিনজন থেকে মানুষ কমে দু’জন হয়েছে। ঝুমুর যেটা কোনোদিনই চায়নি। ও তো চেয়েছিলো সবাইকে নিয়ে হাসিখুশি থাকতে। কিন্তু নিজের মা’ই থাকতে দিচ্ছে না। প্রতিনিয়ত কথার আঘাতে তাখলিফকে, ওকে ভেঙেচুরে দিতে চাইছে। আর মায়ের সাথে একত্রে মিলে ছোট খালাও ওঠে পড়ে লেগেছে ওদের দু’জনকে আলাদা করতে। কোকিলাকে ঝুমুরের আজীবনেরই অপছন্দ। সবকিছুতে এই মহিলার মাতব্বরি, খোঁচা মারা কথাবার্তা সে নিতে পারে না৷ তবুও বড়দের সাথে মুখে মুখে তর্ক করতে পারে না বলে এতকাল যাবৎ কিছু বলার সাহস করেনি। তবে তুসির কাছ থেকে মা-খালার নতুন পরিকল্পনার কথা শুনে ঝুমুর আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারেনি। এত ঘৃণ্য ওর মা? এত খারাপ? ও খুব কেঁদেছে। সেই কান্না আবার বাবার ঘর থেকে তাখলিফ শুনেছে। আচমকা গুনগুনিয়ে কান্নার শব্দে ওর ওর সদ্য কাঁচা ঘুমটা ভেঙেছে। ও ওঠে গেলো নিজের ঘরে। গিয়ে দেখলো ফোন হাতে নিয়ে ঝুমুর বসে কাঁদছে। তাখলিফ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কপাল চেপে ধরে ওকে বলল,
“কি হয়েছে?”

ঝুমুর ওর আগমন টের পেয়ে চুপ করে গেলো। থতমত খেয়ে বলল, “কি কিছু না…”

“তাহলে কাঁদছিলি কেন?”

“কষ্ট হচ্ছিলো বলে…”

“কেন?”

“আমার কি কষ্ট হতে পারে না?”

“এভাবে কাঁদবি না। আমার মাথা ধরেছে তোর জন্য।”

“আচ্ছা কাঁদবো না।”

“কিছু রেঁধেছিস? ক্ষিধে পেয়েছে।”

ঝুমুর বোকার মতো তাকালো। মানুষটা নিজে থেকে খাবে বলছে? ও স্বস্তি পেলেও মিনমিন করে বলল,
“আপনি গিয়ে বসুন, আমি দিচ্ছি…”

“দে!”

বলে তাখলিফ আলুথালু পায়ে ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ালোম এদিকে ঝুমুর ভাবছে সে তো কিছুই রাঁধেনি, কি করবে? ও তাড়াতাড়ি গিয়ে ফ্রিজ চেক করলো। কিন্তু ডিম ছাড়া তেমন কিছুই পেলো না। ভাত রাঁধতে বেশ সময় লাগবে বলে তুসিকে ফোন করে বললো ভাত দিয়ে যেতে। তুসি অবশ্য আগেই বলে রেখেছিলো। অগত্যা কল কেটে ঝুমুর ডিম ভাজতে গেলো। কিন্তু তাড়াহুড়োয় লবণ দিতে ভুলে গেলো।ততক্ষণে তাখলিফ এসে বসে পড়েছে ডাইনিংয়ে। ঝুমুর শুকনো মুখে অমলেটটা ওর সামনে রাখলো।তাখলিফ একপলক ওর দিকে তাকিয়ে খাবারে মন দিলো। আর ওমন বিস্বাদ অমলেট মুখে দিয়েই কেশে ওঠলো। ঝুমুর তাড়াহুড়ো করে পানি এগিয়ে দিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, “কি হয়েছে?”

তাখলিফ বলল, “কিছু না।”

“ভাত রাঁধিনি। এক্ষুণি বসালে দেরি হয়ে যাবে। তাই তুসি ভাবিকে বলেছি, নিয়ে আসবে এক্ষুণি…”

তাখলিফ অমলেটটা শেষ করে পানি খেয়ে বলল,
“না করে দে। আমার খাওয়া শেষ… ”

ঝুমুর কিছু বলতে যাবে তার আগেই তাখলিফ আবারও বলল, “তুই খেয়েছিস?”

“‘হ্যাঁ।”

“কখন, কবে?”

“আপনি ওঠার আগে।”

“সত্যি?”

ঝুমুর মাথা নাড়ালো, “হুম।”

এরপর প্রসঙ্গ পাল্টাতে বলল, “কিছু বাজার দরকার।”

তাখলিফ গম্ভীর গলায় বলল,
“কি কি লাগে বলিস আমি সব আনার ব্যবস্থা করবো। কিন্তু একটা কথা শোন, দোতলার কোনোকিছুই যাতে এখানে না আসে…”

“আসবে না…”

তাখলিফ ‘ঘুমুবে’ বলে এরপর বাবার ঘরে গিয়ে দরজা চাপিয়ে দিলো। আটকালো না। নয়তো ভয় পেয়ে ঝুমুর হার্ট অ্যাটাক করে ফেলবে। ও যেতেই ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেললো। প্লেট গুছাতে যাবে তখনি বেল বাজলো। তুসি খাবার নিয়ে এসেছে ভেবে ও দরজা খুলতে গেলো৷ কিন্তু খুলে দেখলো তুসির বদলে খাবার নিয়ে পাখি বেগম দাঁড়িয়ে আছে। ঝুমুরের মুখ গম্ভীর হলো। প্রশ্নোক্ত চোখে তাকাতেই পাখি বেগম মুখটা কালো করে বললেন, “কিছু নাকি রাধস নাই? বউয়ে কইলো৷ এর লাগি নিয়া আইছি।”

ঝুমুর জিজ্ঞেস করল, “তোমাকে তো বলিনি। কেন এসেছো? নিয়ে যাও এসব।”

পাখি বেগম খ্যাঁকিয়ে ওঠলেন, “কেন আমি আনছি দেইখা কি হইছে? বি’ষ মিশাই আনছি ভাবছোস?”

ঝুমুরের রাগে ওর কপালের রগ ফুলে ওঠলো। ফর্সা মুখখানা লাল হয়ে গেলো রাগে। কাঠ গলায় বলল, “আনতেও পারো।”

পাখি বেগম মেয়ের গলার স্বর শুনে অবাক হলেন। চিড়বিড়িয়ে বললেন, “থাপ্পড় দিয়া গাল লাল কইতা ফালামো শ’য়’তান মাইয়া। রাস্তার পোলা ভালা কইরাই মাথাডা খাইসে তাইলে।”

ঝুমুর গলা চড়িয়ে বলল, “ওনি তোমার মতো না। বরং তুমিই আমার মাথা খাচ্ছো…”

পাখি বেগম ঝাঁঝালো গলায় বললেন,
“এমনে কথা কইতেছোস আবার? তোর মা লাগি ভুইলা যাইস না।”

ঝুমুর তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল, “ভুলে গেলেই ভালো হতো। কিন্তু সেই সুযোগ নেই। তোমার মতো একজন মহিলা আমার মা ভাবতেই আমার গা গুলাচ্ছে…”

“কেন আমি কি করছি তোরে? তোর ভালা চাই তাই…”

“ভালো চাও? ভালো চাইলে তুমি তোমার নোংরামো বন্ধ করো মা। আর তোমার বোনকেও এসব নোংরামো বন্ধ করতে বলো। আমি চুপ আছি তার মানে এই না যে, তুমি আমার সংসার নষ্ট করবে। আমার স্বামীর ক্ষতি করবে।”

পাখি বেগম তাজ্জব বনে গেলেন, “মানে?”

ঝুমুর এবার কঠোর গলায় বলল, “তুমি অতি চতুর নারী। আমার মতো বোকার কথা বুঝতে পারছো না? ওকে ফাইন। আজ বাবা রাতে বাড়ি ফিরুক, আমি তার সামনে, বাড়ির সকলের সামনেই তোমাকে বুঝিয়ে বলবো। আশা করি সেসবের ব্যাখা তুমি আর তোমার বোন সবার সামনে ভালোই দিতে পারবে।”

পাখি বেগম বুঝলেন না মেয়ে ঠিক কোন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন। তিনি ধোঁয়াশা কাটানোর জন্য চিৎকার করে বললেন, “কিয়ের ব্যাখা? কি করছি আমি? আমার বোন?”

“রাতেই জানতে পারবে…”

পাখি বেগম মেয়ের বাহু চেপে ধরলেন। কটমট করে জানতে চাইলেন, “এহনি ক। কি অপরাধ করছি তা জানবার অধিকার আমারও আছে।”

মায়ের ছোঁয়া ঝুমুরের অসহ্য লাগলো। ও মা’কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো। এরপর কঠোর গলায় বলল, “অপরাধ তো করেই চলেছো, ভবিষ্যতেও করবে। তোমার মতো বিষাক্ত নারীরা নিজের স্বামী, সন্তান বোঝে না। তারা শুধু নিজেদের স্বার্থই বোঝে। আমার তো ভাবতে ঘৃণা হয় তোমার গর্ভে আমি কেন হলাম! কেন তোমার মেয়ে হলাম! একটা মানুষকে অপছন্দ করো বলে তাকে সবদিক দিয়ে শেষ করে দিতে বোনের সাথে মিলে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করো। এর হিসাব তুমি দিও মা। আমার কাছে না, বাবা আর ভাইয়ার কাছে…”

পাখি বেগমের হাত থেকে খাবারের থালাগুলো পড়ে গেলো। ঝুমুর কীভাবে জানলো এসব কথা? মা’কে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠতে দেখে ঝুমুর এবার পুরোপুরিই নিশ্চিত হলো ব্যাপারটায়। ইচ্ছে করলো না মায়ের চেহারা দেখতে, ও ঠাস করে পাখি বেগমের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো। ও ঠিক করলো, এবার আর চুপ থাকবে না। বাবা আর ভাইয়ার কাছে সব বলে দেবে। এমনকি দাদীর বলা কথাগুলোও…
______

চলবে…

#অপ্রিয়_রঙ্গনা
#লেখনীতে -ইসরাত জাহান ফারিয়া
#পর্ব-২৯

ঝুমুরকে সঙ্গে নিয়ে তাখলিফ বাজার করতে বেরিয়েছিলো। ইতোপূর্বে দু’জনের বাজার করার অভিজ্ঞতা না থাকায় সবকিছু বেশি দাম দিয়ে কিনতে হলো ওদের। প্রায় মাসখানেকের বাজার একসাথে করে রিকশা করে বাড়ি ফিরলো তারা। এটুকু সময়ের মধ্যে ঝুমুর লক্ষ্য করেছে তাখলিফ বেশ অনেকটাই স্বাভাবিক। হয়তো কাজে ডুবে ছিলো বলে। ও অনেকটা স্বস্তি পেলো। বিষাদে যেন পুরোপুরি গিলে নিয়েছে মানুষটাকে। জীবনটা পুরোপুরি পালটে দিয়েছে। ঠিকমতো খাওয়া, ঘুম, কাজ কিছুই হয় না। ঝুমুরই জোর করে সব করাতে যায়, বিনিময়ে কখনোসখনো তাখলিফের রাগের শিকারও হতে হয় ওকে। তবে ঝুমুর এসবে মানিয়ে নেয়। সেতো জানে, ও ছাড়া এখন এই পৃথিবীতে মানুষটাকে ভালো রাখার কেউ নেই!

বাড়ি ফিরে ঝুমুরকে সব গোছগাছে সাহায্য করলো তাখলিফ। এরপর ফ্রেশ হয়ে আসতেই আচমকা ভীষণ মাথা ধরলো। যেন মাথার ভেতরটা ছিঁড়ে যাবে। নিজেই কড়া লিকারের চা করে খেলো। ঝুমুরের কথা শুনলো না। ওর এতে ভীষণ অভিমান জন্মালো। কিন্তু পরক্ষণেই সব ভুলে গেলো। এখন অভিমান করার সময় নয়। মানুষটা যে স্বাভাবিক নেই৷ ঝুমুর চুপচাপ ঔষধ এনে মালিশ করে দিতে চাইলো। তাখলিফের চুলগুলো আধভেজা। ঝুমুর ওর কপালে হাত দিতেই চমকে ওঠলো। শরীর উত্তপ্ত। ও আঁৎকে ওঠে বললো, “একি! এত জ্বর আপনার? আর এভাবে চুপ করে বসে আছেন?”

তাখলিফ চোখ বন্ধ করে বলল, “তো কি চিৎকার করবো?”

ঝুমুর উদগ্রীব কন্ঠে বলল, “ডাক্তারের কাছে যাবেন চলুন…”

“না।”

“এখন কি জেদের সময়? কি করবো আমি?”

“এত উতলা হবার কিছু নেই। বক্স থেকে ঔষধ নিয়ে আয়।”

ঝুমুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঔষধের বক্স নিয়ে এলো।
তাখলিফ সেখান থেকে মাথাব্যথার একটা ঔষধ বের করে খেলো। সাথে কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধও খেয়ে নিলো। এরপর বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়তে পড়তে বলল, “জ্বালাস না আমাকে। একটু শান্তিতে ঘুমাতে চাই…”

“আমি একটু হাত বুলিয়ে দিই আপনার মাথায়? ভালো লাগবে।”

তাখলিফ চোখ বন্ধ করে ফেললো। উত্তর দিলো না। ঝুমুর ওর শিয়রে বসে মাথায় বিলি কাটতে লাগলো।
ওর ভীষণ দুঃখ হয় যখন তাখলিফ ঘুমাতে চায়, কিন্তু ঘুমাতে পারে না। রাতে কতবার যে ওঠে যায়! তখন জোর করে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর জন্য ছটফট করে। তাতেও ঘুম আসতে চায় না। কখনো ঘুম এলেও মিনিট না গড়াতেই ভেঙে যায়। তখন অশান্তি কমাতে সারা ঘরময় পায়চারি করে, দশবার গোসল করে এসে ঝুমুরকে বলে, “শান্তি পাচ্ছি না রে। এই দেখ, আমার বুকটা জ্বলছে…”

ঝুমুর তখন নিজের কান্না আটকে ওর মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে হাত বুলিয়ে দেয়, কপালে চুমু এঁকে দেয়।
তাখলিফ বিষন্ন গলায় শুধু বলে, “আমি একটু ঘুমাতে চাই ঝুমুর।”

অনেক কষ্টে হয়তো কোনোদিন ঘুম আসে, কখনো আসে না। ইদানীং তাই ঘুমের ঔষধই ওর ভরসা। ঝুমুর ভাবনা থেকে ফিরে আসে। তাখলিফ বেগোড়ে ঘুমাচ্ছে।
ঝুমুর নিজের উষ্ণ ঠোঁটের ছাপ বসিয়ে দিলো ওর কপালে, চোখে, ঠোঁটে। এরপর শব্দ না করে আলো নিভিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে গেছে। আকাশ অদ্ভুত রঙিন আলোয় ঢেকে আছে। ঝুমুর বসার ঘরের ব্যলকনিতে একা একা বসে রইলো। ওরও মনটা খারাপ। মায়ের কান্ড কীর্তিগুলো বাবার কাছে কীভাবে বলবে তা নিয়েও চিন্তিত। ইয়াসিফ ওকে ফোন করেছিলো, সে রেগে অস্থির মা আর খালার কর্মকান্ডে। ঝুমুরই দাদাভাইকে বারণ করেছে, যা বলার সে নিজেই বাবাকে বলবে। কিন্তু কীভাবে বলবে এটাই ভেবে ওঠতে পারছে না ঝুমুর। এরমধ্যেই কাকতালীয়ভাবে ঘরের দরজায় টোকা পড়লো। বেল না বাজিয়ে নক করার শব্দ হওয়ায় ঝুমুর খানিকটা অবাক হয়েই দরজা খুলে দেখলো কোকিলা বেগম এসেছেন। ঠোঁটমুখ লাল হয়ে আছে। পান চিবুচ্ছেন বিশ্রভাবে। ঝুমুর ভ্রুকুটি করে তাকালো। কোকিলা বেগম ওর বলার অপেক্ষা না করেই ভেতরে ঢুকে পড়লেন। ঘুরেফিরে সবকিছু দেখতে দেখতে একসময় ঝুমুরের দিকে তাকালেন। এরপর দাঁত বের করে হেসে বললেন, “একলা একলা এতবড় ফ্লেটে কেমনে থাকস রে? একটু নিচেটিচে নাম। তোগো বাড়ি আওয়ার পর থেইকাই দেখতেছি তুই তোর জামাই লইয়াই খালি ব্যস্ত…”

ঝুমুর কাঠ গলায় বলল, “তাতে কোনো সমস্যা?”

মুখে মুখে জবাব পেয়ে কোকিলা বেগম কপালে ভাঁজ ফেলে তাকান। ইতোপূর্বে ঝুমুর তার সাথে কখনো এমন স্বরে কথা বলেনি। মেয়েটার বড্ড সাহস বেড়েছে। তিনি নিজের ক্ষোভ ভেতরে রেখেই হাসিমুখ করে বলেন, “আরে না। তো তোর জামাই কই?”

“ঘুমাচ্ছে।”

কোকিলা বেগম পানের পিক ফেলে এসে সোফায় বসতে বসতে বললেন,
“ওহ! ও ঘুমাক। তুই এদিকে আয় তো। খালা-ভাগ্নি গল্প করি বইয়া। সময় কাটতেই চায় না তোগো বাড়িতে। আমাগো গেরামই ভালা।”

ঝুমুর নিজের খালাকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করলো। ওর বুঝতে অসুবিধা হলো না যে এই মহিলাকে ওর মা’ই পাঠিয়েছে। যাতে বাবার কাছে নালিশ দেওয়ার সুযোগটুকুও না পায়। ছোট খালা এমন একজন মহিলা, যার কাছে থাকতে ঝুমুর অস্বস্তিবোধ করলেও মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না। ওকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কোকিলা বেগম আবারও বললেন, “দাঁড়াই আছোস কেন? আইয়া এইখানে বয়। আইজ সুখ-দুঃখের গল্প করি…”

ঝুমুরের মনে মনে খুব রাগ হলেও মুখে বলল, “পারবো না ছোটখালা। আমার কাজ আছে৷ আচ্ছা, বাবা ফিরেছে?”

কোকিলা বেগম নড়েচড়ে বসলেন, “কেন? কোনো দরহার?”

ঝুমুর ব্যস্ত গলায় বলল,
“আছে একটা দরকার। এসেছে বাবা? আচ্ছা আমিই দেখে আসছি…”

কোকিলা বেগম তড়িঘড়ি করে ওঠা থেকে দাঁড়ালেন। এরপর এসে ঝুমুরের সামনে দাঁড়িয়ে ওর পথরোধ করে বললেন, “তুই নাকি আপারে কি হুমকি দিছস? দুলাভাইয়ের কাছে নাকি বিচার দিবি? কি কবি তুই?”

ঝুমুর খালার ভীতু মুখখানি দেখে কঠিন গলায় বলল,
“সেটা আমি বাবাকেই বলবো।”

“না আমারে ক, তুই নাকি আমার নামেও বিচার দিনি?”

ঝুমুর চুপ করে থাকলো না। প্রথমবারের মতো খালার মুখের ওপর বলল, “সেজন্য মা তোমাকে পাঠিয়েছে যাতে আমার মুখ বন্ধ রাখতে পারো? যাতে আমায় হ্যান ত্যান বুঝিয়ে চুপ করিয়ে রাখতে পারো? না খালা, আমি বাবাকে বলবোই যে আমার সংসার ভাঙার জন্য তুমি আর মা মিলে কি কি করবে ভেবেছো…”

“শোন ঝুমুর, এইসব ভুল শুনছস তোরা…”

“আমি তোমাকে চিনি খালা, কি করতে পারো, না পারো সবই জানি। তুমি তো তোমার নিজের স্বামীকেও মেরে ফেলতে চেয়েছিলে…”

কোকিলা বেগম চেঁচিয়ে ওঠলেন,
“ঝুমুর!”

“আস্তে চেঁচাও খালা, ওনি ঘুমাচ্ছেন।”

কোকিলা বেগম বেপরোয়া হয়ে ওঠেলন,
“গুষ্ঠি কিলাই ওর ঘুমের। তুই আগে ক, দুলাভাইরে কিছু কবি না।

ঝুমুর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো খালাকে পাশ কাটিয়ে। কোকিলা বেগমও ওর পিছু পিছু ছুটে এলো। সিঁড়িকোঠায় এসে টেনে ধরলো ওর হাত। ওকে থামাতে না পেরে একপর্যায়ে উত্তেজিত হয়ে তাখলিফকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিতে লাগলেন। ঝুমুরের রাগে তখন হাত-পা কাঁপছে। ও বড় বড় পা ফেলে চলে এলো দোতলায়। দরজা খোলাই ছিলো, বসার ঘরে চায়ের আয়োজনে বাড়ির সকলেই ছিলো। এরমধ্যেই ঝুমুর রাগে রক্তিম হয়ে এসে স্থান, কাল পাত্র ভুলে বাবাকে এসে কাঁদতে কাঁদতে সব খুলে বলতে লাগলো। ইয়াসিফ বোনকে এসে ধরলো, হাতে হাত রেখে পাশে আছি বোঝালো। পাখি আর কোকিলা বেগম দুই বোন ওর কান্ডে আহাম্মক বনে গেলেন।

.

শামসুল হক সাহেব অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন স্ত্রী’র দিকে। তিনি ভাবতেই পারছেন না তার স্ত্রী এরকম কিছু করতে পারে। সহজসরল, বোকাসোকা, সংসারের মায়াজালে দুই যুগেরও বেশি সময় পার করে দেওয়া নারীটি, তার স্ত্রী; সত্যিই এরকম কোনো খারাপ কাজ করতে পারে? একজন মা হয়ে? একজন মা হয়ে কীভাবে নিজের মেয়ের জীবনের সাথে ছিনিমিনি খেলতে পারে!

এদিকে পাখি বেগমের হাত-পা কাঁপছে। বুক ধড়ফড় করছে। মনে হচ্ছে এক্ষুনি বুঝি দম বন্ধ হয়ে যাবে।
সব শেষ হয়ে যাবে। তার অস্বাভাবিক কাঁপাকাপি দেখে শামসুল হক চোখ বন্ধ করে নিজেকে সামলালেন। স্ত্রী’র এই রুপটি তার চেনা। যখন খুব বেশি নার্ভাসনেস বা ভয় কাজ করে তখনই পাখি বেগম কাঁপতে থাকেন। ভেতরে ভেতরে শামসুল হক মর্মাহত হলেন ভীষণ। পরপর বাড়ির মানুষগুলোর সাথে ঘটে গেছে তিক্ত কিছু ঘটনা। যার কারণে শ্রদ্ধেয় বড় ভাইটিকে তিনি হারিয়েছেন, মা হয়েছেন শয্যাশায়ী। মেয়েটা হয়েছে ডিভোর্সি। ছোট মেয়েটার ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। এসবের পেছনে অবচেতন মনের কোণের কোথাও স্ত্রীর করা সেদিনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণকেও দায়ী করেন তিনি। ইদানীং স্ত্রী’র পালটে যাওয়া মনোভাবও লক্ষ্য করেছেন, কিন্তু ভাবেন নি আড়ালে-আবডালে এতকিছু করে ফেলেছেন তার স্ত্রী! ঝুমুরের কথাগুলো সত্যি হলে তার এত বছরের বিশ্বাস, ভরসা সব ধুলো হয়ে মাটির সাথে মিশে যাবে। শামসুল সাহেব প্রথমেই হৈচৈ করলেন না। মেয়ের অভিযোগ শুনলেন। এরপর দীর্ঘক্ষণ চুপ করে কীসব ভাবলেন। কেউ কোনো কথা বললো না। বসার ঘরের বিমূঢ় পরিস্থিতির মধ্যে শামসুল সাহেব স্ত্রীর দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন। পাখি বেগম স্বামীর চাহনি দেখে ঢোকের পর ঢোক গিলতে লাগলেন। শামসুল হক কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “ঝুমুর এইসব কি বলছে? তুমি তাখলিফরে দেখলে উল্টাপাল্টা বকো?”

পাখি বেগম চমকিত হলেন। তিনি কি উত্তর দেবে ভেবে পেলেন না। অতি গোপনীয় এইসব কথা তার মেয়ে কোথা থেকে জেনেছে এটাই বুঝতে পারছেন না। তার ওপর স্বামীর ওমন চাউনি দেখে তার সব গুলিয়ে আসছে। মুখ দিয়ে শব্দ বেরুচ্ছে না। কোকিলা বেগম তার হাত চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছেন পাশে। তার মুখটাও আতঙ্কে কালো হয়ে আছে।

স্ত্রীর থেকে কোনোরুপ জবাব না পেয়ে শামসুল হক গর্জে ওঠলেন, “চুপ করে না থেকে আমার কথার উত্তর দাও। তোমার মেয়ে যা বলছে সব সত্যি?”

পাখি বেগম কেঁপে ওঠলেন। চোখের জল ছেড়ে দিয়ে বললেন, “ন না মিথ্যা। আমি তো ওর মায়ের মতো, ঐদিন হয়তো একটু কইছি, তা আপনাদের সামনেই।
আর তো কিছু কই নাই…”

মায়ের সোজাসাপটা মিথ্যে কথা শুনে বিস্ময়ে ঝুমুরের চোখ ফেটে জল বেরুলো। এই মা’কে সে চেনে না।শামসুল হক অবশ্য স্ত্রী’র মুখভঙ্গি দেখেই যা বোঝার বুঝে গেলেন। কঠোর দৃষ্টিতে তাকালেন স্ত্রীর দিকে। আশাহত হলেন। এতবছরের সংসারে স্ত্রীর আচরণ তার একটু হলেও চেনা হয়েছে। এইযে, এভাবে মুখ লুকিয়ে কথা বলছে, চোখে চোখ রেখে তাকাচ্ছে না এসবই প্রমাণ করে দিচ্ছে পাখি বেগমের নামে যে অভিযোগগুলো এসেছে তা শতভাগ সত্য। শামসুল সাহেবের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। তার এতিম ভাইপোটাকে কষ্ট দিচ্ছে তার স্ত্রী? ভেবেই তার রাগ হলো। তিনি আগের মতোই কঠোর গলায় বললেন, “ঝুমুর আর তাখলিফের সংসার ভাঙার জন্য তুমি কীসব জাদুটোনা করার কথা নাকি বলছো? তাতে আবারও সঙ্গী করছো তোমার বোনকে? এসবও মিথ্যা?”

পাখি বেগম মাথা নেড়ে সায় জানালেন, “মিথ্যা। আমি এমন কিছু করি নাই। কোকিলারেই জিজ্ঞাস করেন।”

কোকিলা বেগম নিজেদের নির্দোষ প্রমাণ করতে সঙ্গে সঙ্গেই বোনের সাথে তাল মেলালেন, “বিশ্বাস করেন দুলাভাই, এইসব মিথ্যা। এমন কোনো কথা আমাগো মইধ্যে হয় নাই। কে এইসব আপনেগো হুনাইছে তারে সামনে আইতে কইন। এরপর হিসাব বরাবর হইবো।”

তুসি ইয়াসিফের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলো। ও আচানক দৃষ্টিতে তাকালো কোকিলা বেগমের দিকে। কী অবলীলায় মিথ্যা বলে যাচ্ছে এই মহিলা! ওর কেন জানি সহ্য হলো না। মুখ ফসকে কিছু বলতে যাবার আগেই ইয়াসিফ দৃঢ় গলায় কোকিলা বেগমকে বলল, “আমি শুনছি। তুমি আর আমার মা মিলে পরামর্শ করছিলে ঘরে বসে। আর তখনি তুমি মা’কে এসব বলে কুবুদ্ধি দিচ্ছিলে। এইযে, আমি সামনে এলাম, এবার বলো কি করবে তুমি? কীভাবে করবে হিসাব বরাবর?”

কোকিলা বেগম থতমত খেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই চেঁচিয়ে ওঠলেন, “তুই হুনছস? কি হুনছস? কি কইছি আমি? তোর কাছে কিয়ের প্রমাণ আছে যে আমি ঝুমুরের ঘর ভাঙার লাগি এইসব কইছি? তোর মারে জিগা আমি তারে কি কইছি! আরে ঝুমুর তো আমার সন্তানের মতো…”

ইয়াসিফ চিৎকার করে বলল,
“নাটক করো না ছোটখালা। তোমার এসব অভিসন্ধি আমার জানা আছে।”

অপমানিত বোধ করলেন কোকিলা বেগম। কিড়মিড় করে বললেন, “নাটক করি আমি? এতবড় সাহস তোর? কি জানস তুই আমার সম্পর্কে? কি জানস? হাতে পায়ে পাইলা বড় করছি তোগো রে এহন আমারই গলায় পাড়া দিয়া কথা কস? বড় আফা এই তোমার সোনার টুকরা ছেঁড়া?”

পাখি বেগম চুপ করে দাঁড়িয়ে। আপাতত মুখ বন্ধ রাখাটাই তার জন্য ভালো হবে ভেবে তিনি গলা দিয়ে শব্দ বের করছেন না। বোনের সাপোর্ট না পেয়ে কোকিলা বেগম রাগে কিড়মিড় করতে লাগলো। ইয়াসিফও তাকে ছেড়ে কথা বললো না। দু’জনের বাকবিতন্ডায় শামসুল সাহেব ভাষাহীন হলেন। পুত্রকে থামতে বলে তিনি কঠোর গলায় কোকিলা বেগমকে বললেন, “তুমি অস্বীকার করতে পারবে যে এইসব কাজে তোমার সংযোগ নাই? মুখ খুলতে চাচ্ছি না, কিন্তু তোমার অতীত জানা আছে সবারই। তাই মিথ্যা বলে আর পাপ বাড়িও না।”

কোকিলা বেগম নাঁকিকান্না শুরু করলেন, “দুলাভাই আপনি আমারে এই ভাবলেন?”

“ভাবা-ভাবির তো কিছু নেই। কিন্তু তোমার কাছ থেকে এইসব আশা করি নাই।”

“আগে কি করছি না করছি হেই রেশ ধইরা আমারে বিচার করতেছেন? মানুষ ভালা হয় না? এই বাড়িতে আইয়া অত অপমানের ভাগিদার হইবারই বাকি ছিলো? ছি ছি ম’রলাম না কেন…”

কোকিলা বেগম মায়াকান্না ক্রমেই বাড়তে লাগলো। তিনি বিলাপ জুড়ে দিয়েছেন ইতোমধ্যেই। বিচার চাইতে লাগলেন খোদাতায়ালার দরবারে। পাখি বেগম বোনের অবস্থা দেখে নির্লিপ্ত গলায় স্বামীকে বললেন, “আমরা এইসব কই নাই। এইসব নিয়া কোনো আলোচনা হয় নাই আমাগো মইধ্যে সত্য কইতাছি। কসম।”

ঝুমুর এবার আর ধৈর্য্য রাখতে পারলো না। একের পর এক মিথ্যে বলেই যাচ্ছে মা। ও জীবনে যা করেনি তাই করলো। একঘর মানুষের সামনেই গলার জোর বাড়ালো, “কীভাবে এত মিথ্যে বলছো মা? আমাকে, ভাইয়াকে মিথ্যে প্রমাণ করছো মানলাম, তাই বলে বাবাকেও? ভেবেছিলাম কথাগুলো বলবো না। কিন্তু এবার না বলেও পারছি না মা। তুমি আমাকে এই ঘৃণ্য কথাগুলো জানাতেও বাধ্য করলে মা…”

পাখি বেগম আগুন চোখে মেয়ের দিকে তাকালেন।। আবার কি বলবে এই মেয়ে? ঝুমুর অবশ্য মায়ের দৃষ্টি গ্রাহ্য না করেই বাবার দিকে তাকালো। এরপর মাথা নিচু করে খুলে বললো দাদীর বলা কথাগুলোও। এসব শুনে পাখি বেগমের মুখ পান্ডুর বর্ণ হয়ে গেলো। মানে কি? ও এসব কীভাবে জানে? এসব তো তিনি কোকিলাকে পর্যন্ত বলেন নি। তাহলে? তার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো। কম্পিত, ক্রোধিত গলায় ঝুমুরকে বললেন, “তোর মা হই, এমনে মিথ্যা বলতাছোস আমার নামে?”

ঝুমুর দৃঢ় গলায় বলল,
“আমি মিথ্যা বলছি না মা, সেটা তুমিও জানো। আচ্ছা, দাদাভাইকে বলি? দাদাভাই আপুর দেবরকে নিয়ে আসুক, ওনিই না হয় বলে দেবেন সত্যটা…”

ঝিনুক শুধু চুপ করে সব শুনে যাচ্ছিলো। ওর কোনো হেলদোল হলো না। পাখি বেগম ঝুমুরের ধৃষ্টতা সহ করতে না পেরে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হলেন। আচমকা ওর ওপর আক্রমণ করে বসলেন। সবাই বাক্যহীন হলো। ইয়াসিফের কান দিয়ে এতক্ষণ ধোঁয়া বেরুচ্ছিলো। ঝুমুর আগে কেন ওকে বলেনি?ওর তো বিশ্বাসই হচ্ছে না মা এমন নিচু কোনো কাজ করেছে। ঝিনুকের সাথে যারা অন্যায় করলো তাদের সাথেই গোপনে হাত মিলিয়েছে ওর মা? এটাও ওর শুনতে হলো? সহ্য করতে হলো? ওর মাথা খারাপ লাগলো। ঝুমুরকে গিয়ে মায়ের হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু মায়ের গায়ে যেন অসীম শক্তি। ঝুমুরের চুল টেনে ধরে গালে, মুখে ইচ্ছেমতো মেরেই যাচ্ছেন তিনি। ইয়াসিফ, তুসি, প্রমিলা সামলাতেই পারছিলো না পাখি বেগমকে। শামসুল সাহেব এতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিলেন। কিন্তু মেয়ের আর্তনাদ শুনে এবার তার সংবিৎ ফিরলো। তিনি আচমকাই গর্জে ওঠলেন। তার বিকট ধমকে পাখি বেগম হকচকিয়ে ওঠে মেয়েকে ছেড়ে দিলেন। ঘরে অবস্থানরত সবাই কেঁপে ওঠলো। শামসুল হকের এই রুপ আগে কখনো দেখেনি কেউ। সাঈদ হক এসে ভাইকে ধরলেন। শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি শান্ত হলেন না। গর্জে ওঠে বললেন, “কি শান্ত হমু রে? কি শান্ত হমু? এই মহিলাকে আমি চিনি না। এত বছর ধরে সংসারে আমি যে পাখিরে চিনতাম তারে আর চিনতেছি না। এমনিতেই এক খারাপ পরিবারে সম্বন্ধ কইরা ঝিনুকের জীবন শেষ করছি। এখন আবার ঐ পরিবারের চরিত্রহীনটার সাথে আমার ঝুমুরের বিয়ে? তাও আবার তাখলিফের সাথে ওর ডিভোর্স করিয়ে? আর এসব করতেছে আমার নিজের বউ? শেষ পর্যন্ত এই দিনও দেখতে হইলো আমার? এত নিকৃষ্টতা, নির্লজ্জতা? ছি ছি…”

পাখি বেগম স্বামীর পায়ে এসে পড়লেন। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “আ আমি কিছু করি নাই। আপনে আমায় অবিশ্বাস কইরেন না। আমি জীবনেও ঝিনুকের শ্বশুরবাড়ির কারো সাথে যোগাযোগ করি নাই। মা হই তো ওর, ও তা ভুইলা গেসে। ঐ রাস্তার বে’জ’ন্মা পোলার লাগি আমার নামে উল্টাপাল্টা কথা রটাইতেও ছাড়তেছে না। আমার মাইয়ারে পর্যন্ত আমার বিরুদ্ধে লইয়া গেসে৷ আপনে ওরে তাড়ায় দেন বাড়ি থাইকা, আমার মাইয়ার জীবনডা বাঁচান ঝুমুরের আব্বা…”

শামসুল সাহেব ক্রোধে ফেটে পড়লেন। স্ত্রীকে ওঠিয়ে সপাটে তার গালে ঠাস করে চড় বসালেন। পাখি বেগমসহ উপস্থিত একঘর মানুষ হতভম্ব হয়ে গেলো। সাঈদ হক হতবিহ্বলতা কাটিয়ে এসে ভাইকে ধরলেন আবার। শামসুল সাহেব শরীরের ভার ছেড়ে বসে পড়লেন। ভাই আর ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, “দেখ, কি অবলীলায় মিথ্যা কথা বলতাছে ও আমার সামনে দাঁড়াইয়া। একটুও মুখে-ঠোঁটে আটকাচ্ছে না। ওর বোনের সাথে মিলে বিপথে যাইতেছে, আর আমি নাকি এতদিন কিছুই বুঝি নাই! নিজের ওপরই তো আমার রাগ হইতাছে, লোকেরা তো প্রশ্ন তুলবো। বলবো, দেখ এই লোক তার বউরে সামলাইতে পারে না। কাপুরুষ একটা! হ মানছি, আমি তাখলিফের সাথে ঝুমুরের বিয়াডা মানতে পারি নাই প্রথমে। কিন্তু তার মানে তো এই না যে, আমি সেইডা অস্বীকার করি? আমি সেইডা মানি, আর সেইজন্য ওদের লিগ্যালি ছাড়াছাড়ি করাইতে চাইছি তোরা সবাই সেইডা জানোস। কিন্তু পরে বড় ভাইজানে আমারে বুঝাইছে, তাখলিফ যে-ই হোক, সে আমার বড় ভাইয়ের ছেলে। মানে আমাদের বাড়িরও ছেলে। জন্মের পর থেইকা ও আমাদের চোখের সামনে সে বড় হইছে, মানুষ হইছে। ভুলত্রুটি করছে, শুধরানোরও চেষ্টা করছে। এমনকি আমার মাইয়ার বিপদেও সে পাশে ছিলো, ও না থাকলে আমার মাইয়ার সেইদিন সর্বনাশের শেষ থাকতো না। তাই একবার যখন বিয়া হইয়াই গেসে তখন থাক, ওরা যখন একসাথে ভালো থাকতে চায় তো থাকুক! ঝুমুর আমার বড় আদরের, ওরেও কাছাকাছি রাখতে পারমু। বড় ভাইয়ের এসব কথা শুইনা আমিও পরে সময় নিয়া ভাবছি, ভেবে আমি পরে নিজের সিদ্ধান্ত পালাটাইছি। মেয়ে জামাই হিসেবে তাখলিফরে মানতে সময় লাগলেও মাইনা নিসি। বড় ভাই যাওয়ার পর ছেলেটা একেবারে একা হইয়া পড়ছে। আমি তো ওর চাচা, মেজোআব্বা বলে ডাকে। রাগটাগ করলেও ফালাই দিতে তো আর পারি না। এইডা তোর ভাবিরেও সেদিন বুঝাইছি। সেও বুঝছে। আমায় বলছে সে আর ঝামেলা করবো না। অথচ, অথচ দেখ তিনদিন আগে আমারে দেওয়া কথা সে ভুইলা গেসে। আমারে মিথ্যা বইলা ও কিসব কুকর্ম করার চিন্তা করতেছে। এই মহিলারে তো আমি চিনি না। আমি কেমনে মাইনা নিমু, বল তোরা…’

পাখি বেগম সবার চোখেই তার প্রতি অবিশ্বাসের দৃষ্টি দেখতে পেলেন। ধরা পড়ে গেছেন তিনি বেয়াহ ভালোভাবেই বুঝেছেন। তাই উপায় না পেয়ে স্বামীর পায়ে লুটিয়ে পড়ে উচ্চ রবে কেঁদে ওঠলেন, “মাফ কইরা দেন আমারে। আমি তো আমার মাইয়ার ভালো চাইছি…”

শামসুল হক ঘৃণায়, রাগে, কষ্টে কাঁটা হলেন। স্ত্রী’র ছোঁয়া তার অসহ্য লাগছে। তিনি পা সরিয়ে নিয়ে কঠিন গলায় বললেন, “আমারে ছুঁইবা না তুমি। তোমারে চিনতে ভুল করছিলাম। ছি ছি…”

পাখি বেগম কেঁদে কেঁদে বললেন,
“আমি মাফ চাইছি তো…”

“মাফ চাইলেই সব আগের মতো ঠিক হবে না। তোমার জন্য, তোমার জন্য ঝিনুকের সংসার ভাঙছে। এরজন্য তুমি দায়ী। এখন মাফ চাইলেই ওর ঘর জোড়া লাগবে? লাগবে না। তাই এইসবের দায় এড়াইতে পারো না কিছুতেই…”

পাখি বেগমের রাগে গা জ্বালা করতে লাগলো,
“আপনি ভুইলা গেসেন আমি এ বাড়ির বউ, আপনের স্ত্রী। সবার সামনে এমনে অপমান করতে পারেন না…”

শামসুল হক শীতল গলায় বললেন,
“এইসব ন’ষ্ট চিন্তাভাবনা যার মাথায় ঘুরে সে কখনো এ বাড়ির কেউ হইতে পারে না। তুমি আর তোমার বোন আমার সংসার ছাইড়া বের হইয়া যাও। এরচেয়ে কঠিন হইতে বাধ্য করিওনা আমায়, ভালো হইবো না কিন্তু… ”

পাখি বেগম আঁৎকে ওঠলেন, “মানে?”

শামসুল সাহেব কঠিন কন্ঠে জানালেন,
“মানে তোমার মতিগতি ঠিক না হওয়া পর্যন্ত তুমি আমার সংসারে ফিরবা না। এই অনাচার, পাপের জায়গা আমার বাড়িতে আমি দিবো না।”

এতকিছুর পরেও পাখি বেগমের মধ্যে অনুশোচনা দেখা গেলো না। বরংচ এবার তিনি তেঁতে ওঠে বললেন, “দেখেন ঝুমুরের আব্বা, আপনি ঠিক করতাছেন না। আমি আমার সংসার ছাইড়া কোথাও যামু না…”

শামসুল হক গর্জে ওঠলেন, “তোমার সংসার? যে নিজের স্বামী-সন্তানের সাথে মিথ্যা বলে, অন্যায় করে তার আবার কিসের সংসার?”

পাখি বেগম হেরে যাওয়ার পাত্রী নন। তিনি যেন নিজের আঠাশ বছরের খোলস ছেড়ে স্বামীর কথার পিঠে জবাব দিতে লাগলেন। শামসুল হক শুধু তাকে দেখে হতভম্ব, স্তব্ধ, বিমূঢ হলো। রাগে একপর্যায়ে তার গা কাঁপতে লাগলো। স্ত্রীর উল্টাপাল্টা কথাবার্তা, ধৃষ্টতা সহ্য করতে না পেরে দ্বিতীয়বারের মতো তার শক্ত হাতের থাপ্পড় বসালেন স্ত্রীর গালে। পাখি বেগম এবার চূড়ান্ত অপমানিত হয়ে এক অভাবনীয় কান্ড করে বসলেন। কান্নাকাটি, চিৎকার, চেঁচামেচিতে বাড়ির পরিবেশ ভারী করলেন এবং একছুটে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা আটকে দিলেন। সকলেই তাকে আটকানোর চেষ্টা করলো। কিন্তু পারলো না। এরপর নিজের রাগ,জেদের বশবর্তী হয়ে কিছু চিন্তা না করেই পাখি বেগম ভয়ানক একটা পদক্ষেপ নিলেন। ফ্যানের সাথে ওড়না বাঁধতে লাগলেন। দরজার একটুখানি ফুটো দিয়ে তুসি যখন এই কান্ড দেখলো তখন ওর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এলো। ও অস্থির হয়ে সবাইকে জড়ো করলো। সকলেই পাখি বেগমের রাগ আর অভিমান সম্বন্ধে জ্ঞাত। শামসুল হক দিশেহারা বোধ করলেন। সকলেই পাখি বেগমকে এটা-সেটা বলে বোঝাতে লাগলো, দরজা খুলতে বললো কিন্তু পাখি বেগম সেসব কানেই তুললেন না। ইয়াসিফ আর সাঈদ হক তড়িঘড়ি করে দরজা ভাঙার ব্যবস্থা করলেন। ততক্ষণ সময়ের মধ্যে পাখি বেগম অবশ্য ঝুলে পড়েছেন। সকলে কান্নাকাটি জুড়ে দিলেন। ইয়াসিফ মায়ের অবস্থা দেখে ভেঙে পড়লো। আর স্ত্রী’র এই কান্ডে মর্মাহত হয়ে শামসুল সাহেব পাগল প্রায় হয়ে গেলেন। সাঈদ হক পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করলেন। ইয়াসিফকে নিয়ে ধরাধরি করে নামালো পাখি বেগমকে। এরপর তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলো। ঘরে রয়ে গেলো ঝুমুর আর নিশি। আচমকা ঝিনুক এসে রাগান্বিত হয়ে এলোপাথাড়ি থাপ্পড় বসালো ঝুমুরের গালে। তুসি-প্রমিলা এসে ঝিনুককে ছাড়িয়ে অন্যঘরে নিয়ে গেলো। এতক্ষণের এসব চেঁচামেচি, একে-অপরকে করা দোষারোপ, অসুস্থ পারিবারিক জটিলতার পর মায়ের নির্জীব দেহখানি দেখে ঝুমুরের মস্তিষ্কশূন্য হয়ে গেলো। বিধস্ত অবস্থায় শরীরের ভার ছেড়ে মেঝেতে বসে পড়লো ধপ করে। দু’হাতে মুখ ঢেকে কেঁদে ওঠলো, ‘ম’রে যাবে, এরপরেও স্বীকার করবে না তুমি দোষী? এত জেদ তোমার মা?’

_____

[ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি।]

চলবে…