
#কারণ_আমি_মেয়ে
(পর্ব ৮)
#সমুদ্রিত_সুমি
ভেবেছিলাম শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে হয়তো অনেক কথা শুনতে হবে। কিন্তু শুনতে হয়নি। কিন্তু পাড়াপ্রতিবেশিরা শাশুড়ীকে বললো,
“কি’গো ভাবি! বউয়ের বাড়ি থেকে নাকি কি কি দিবে?”
উত্তরে আমার শাশুড়ী চুপ করে ছিলো। আমাকেও তেমন কেউ কিছু বলেনি। আমি ভেবেছিলাম তারা হয়তো আমাদের পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেছে। আমার বরের ব্যবহার আচরণ দেখে কয়েক মুহূর্তে মনে হলো হয়তো উদাসকে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা ভুলে যাবো। আমি আস্তে আস্তে সব মানিয়ে নিলাম নতুন সংসারে। যেহেতু আমি বাড়ির একমাত্র বউ তাই আমার অনেক দায়িত্ব। আমি সব কিছু মাথা পেতে নিলাম। এভাবে কেটে গেলো এক মাস, এরমধ্যেই সব মেহমান চলে গেলো, চলে গেলো আমার মামা শ্বশুরও। কিন্তু কে জানতো সেদিন থেকেই আমার জীবনে কালো অধ্যায়ের শুরু। মা অন্যের বাড়িতে কাজ করার সুবাদে আমি ঘরের সব কাজই পারতাম। কিন্তু তবুও আমার কথা শুনতে হতো, কখনো তরকারিতে নুন বেশি কখনো ভাত নরম হ’য়ে গেছে, কখনো বা ভাত বেশি কেন রান্না করেছি। সাথে তো কথায় কথায় বাপের বাড়ির খোঁটা।
জীবনটা পুরো ময়লার বস্তা হয়ে গেলো।
একদিন হলো কি, আমি রান্না করছি ভুল বসত হাত থেকে একটা গ্লাস পরে ভেঙে যায়। শব্দ শুনে শাশুড়ী মা দৌড়ে এলেন।
“কি ভাঙলে?”
“মা, আসলে হাত ফস্কে গ্লাসটা পরে ভেঙে গেছে।”
“বাপের বাড়ি থেকে একটা নুনের বাটিও আনোনি, তাহলে ভাঙো কি করে?”
“মা, আমি…”
“একদম আমার মুখে মুখে তর্ক করবে না।”
“মা আমি তর্ক কোথায় করলাম…?” কথাটা শেষ করতে পারিনি। তার আগেই নিজের গালে চড় অণুভব করলাম। ছিটকে পরে গেলাম মেঝেতে। গালে হাত দিয়ে উপরে তাকাতেই দেখতে পেলাম আমার বর রক্তচক্ষু নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বুঝতে চেষ্টা করছি সে আমায় চড় কেন মারলো।
“তুমি আমায় মারলে কেন?”
“তুই আমার মায়ের মুখে মুখে তর্ক করছিস!”
“আমি তর্ক করছি না শুধু বলেছি আমি ইচ্ছে করে করিনি।”
“আবার?”
এই কথা বলেই সোহাগ আরো একটি চড় মারলো আমায়। আমি মুখথুবড়ে পরলাম। ঠোঁট কেটে রক্ত পরতে থাকলো। কিন্তু কেউ আমাকে উঠালো না, সবাই চলে যেতেই আমি উঠে হাতের কাজ গুলো সেরে নিলাম। সোহাগের কাছে আমার কোন শখ আবদার ছিল না। যা দিতো আমি তাই নিতাম। এমন কি আমার খাবারটা পর্যন্ত ওরা মেপে দিতো। আমি তবুও কিছু মনে করতাম না এটা ভেবে তাদেরও তো শখ ছিলো অনেক, কিন্তু কিছুই তো পূরণ হয়নি। আমার বরের আশা ছিলো শ্বশুর শাশুড়ী তাকে অনেক আদরযত্ন করবে, সোনার জিনিস দেবে। সে বুক ফুলিয়ে বলবে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে কত কি দিয়েছে। কিন্তু কিছুই তো আমার পরিবার দিতে পারেনি আর পারবেও না। তাই আমিই সব মেনে নিলাম। সব কিছু ভুলে সবার খেয়াল রাখতাম। শ্বশুরের ঔষধ শাশুড়ী মায়ের সেবা, ননদের পড়াশোনা সব। কিন্তু দিনশেষে আমি তাদের ঘরের কোণেই পরে রইলাম। সোহাগ কখনো নিজের প্রয়োজন ছাড়া আমার সাথে কথা বলতো না। আমি জোর করে কখনো কথা বলতে গেলে হয় ঝাড়ি না-হয় দু’একটা চড় খেতাম। মা প্রায় ফোন দিয়ে জানতে চাইতো আমি কেমন আছি, উত্তরে নিজের চাপা দীর্ঘশ্বাস লুকিয়ে বলতাম, অনেক ভালো আছি। মা খুশি হয়ে বলতেন আল্লাহর অশেষ রহমত তুই ভালো আছিস। আমি কান্না চেপে ধরে বলতাম হ্যাঁ মা।
মা তখন বলতো
“হে রে মা জামাই আমাদের ফোন দেয় না কেন?”
“মা ও তো অনেক ব্যস্ত মানুষ বাড়িতেই তো ঠিক মতো আসে না।”
“ওওও”
“হে মা, তুমি কষ্ট পেও না আমি ওকে বলবো তোমায় ফোন দিতে।”
“আচ্ছা।”
“মা ফোন রেখে দিতেই আমি ভাবতাম সত্যিই কি সোহাগ ব্যস্ত! মা’কে তো মিথ্যা বললাম কিন্তু কতদিন?”
একদিন সোহাগকে বললাম,
“সেদিন মা বলছিলো তোমাকে ফোন দেওয়ার কথা।”
“তো?”
“তো কিছু না, আসলে তাদেরও তো ইচ্ছে করে তার জামাই তাদের একটু খোঁজখবর নিবে।”
“শুধু তাদের ইচ্ছে আছে আমার নেই। আমার অফিসের এক কলিগ বিয়ে করেছে। তাকে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে গলার চেন হাতের আংটি থেকে শুরু করে ঘরের যাবতীয় সব জিনিস দিয়েছে। আর তোমার বাবা-মা আমায় কি দিয়েছে?”
“আমার বাবা-মায়ের দেওয়ার তৌফিক নেই। আর তুমি ভালো করেই জানো তাদের দেওয়ার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু আমি দিতে দেইনি। সেই টাকা দিয়ে বাবার চিকিৎসা চলছে।”
“এই থামোতো, মরা গাছে পানি ঢাল্লে কখনো গাছ বাঁচে না। তোমার বাবা তো এক প্রকার মরেই গেছে। তার পিছনে টাকা ঢালা আর ছাগল দিয়ে হালচাষ করা একি কথা।”
“কি বলছো তুমি!”
দেখো তোমার সাথে ঝগড়া করার কোন মুড আমার নেই। তাই চুপ থাকো। আর হ্যাঁ, আমার কাছে কোন ফালতু সময় নেই তোমার বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়ার জন্য।”
সোহাগের এতো কথা শুনে শুধু এটাই মনে হতো আমি তো কতো অত্যাচার সহ্য করে ওদের পরিবারের প্রতিটা সদস্যের খেয়াল রাখি আর ও!
দিনের শুরু হতো শাশুড়ির মুখঝামটা খেয়ে আর রাতে সোহাগের শারীরিক নির্যাতন। এগুলো হয়ে গেলো আমার জীবনের সঙ্গী। হঠাৎ আমার পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলো। টেস্ট করে জানলাম আমি প্রেগনেন্ট। কথাটা শাশুড়ীকে জানালে তিনি বলেন, নিজের জায়গাটা শক্ত করার জন্য এই প্ল্যান।
“কি বলছেন মা!”
“এই তোমার ওই ন্যাকা স্বরে আমায় মা ডেকো না, আমার গা জ্বলে যায়।”
শাশুড়ী মা আর কিছু বললেন না। তিনি নিজের ঘরে চলে গেলেন। আমি ভাবলাম হয়তো সোহাগ খুশি হবে, কিন্তু সোহাগ খবরটা শুনে কয়েক মুহূর্তে চুপ থেকে বলে উঠলো,
“রেডি হও, হাসপাতালে যাবে।”
“এখন হাসপাতালে গিয়ে কি হবে?”
“এ্যাবোরসন।”
“মানে কি বলছো?”
“আমি বাংলা বলছি।”
“আমি কোথাও যাবো না।”
“তুই যাবি, তোর ঘাড় যাবে।”
“আমি যাবো না বললাম তো।”
“তুই যাবি না?”
“না।”
“খা—-মাগি তুই যাবি তোর মা যাবে”
“আমার মা’কে তুলে কথা বলবে না”
“একশোবার বলবো, কি করবি তুই খান—- ঘরের খান—-”
“যে বলে সে”
“ওরে চুতমারানি কি বললি তুই আমার মা’কে?”
এই কথা বলেই সোহাগ আমি কিছু বোঝার আগেই আমার তল পেটে লাথি মারে। আমি মা বলে চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে মাছের মতো ছটপট করতে থাকি। আমার হাঁটু বেয়ে গড়িয়ে পরতে শুরু করে রক্ত, কিন্তু সোহাগ কিছু না দেখার ভান করেই চলে যায়। আমি পেট চেপে ধরে যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি। একসময় আমি সেন্স হারিয়ে পরে থাকি মাটিতে। সেদিন ওরা কেউ আসেনি আমাকে ধরতে, শাশুড়ী ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। আর শ্বশুর তো মসজিদে মসজিদে তাবলীগ করে। তাই তিনি ঘরের বিষয়ে খুব কম মাথা ঘামান। আমি ওভাবেই পাঁচ ঘন্টা পরে ছিলাম মাটিতে। পরে আমার ননদ বিপদে পরার ভয়ে বাড়িতে একজন ডাক্তার ডেকে আনেন। তিনি বলেন বাচ্চাটা নষ্ট হয়ে গেছে এবং আমার পেটে গুরুতর আঘাত লেগেছে যার ফলে পরবর্তীতে আমার মা হওয়ায় সমস্যা হতে পারে। সেদিন প্রথম ঘৃণা হয়েছে বিয়ে নামক পবিত্র সম্পর্কের উপর। তারপর কেটে যায় ছ’মাস। আমার বিয়ের প্রথম ঈদ, কর্তব্যের খাতিরে হলেও তো আমাকে কিছু কিনে দিতে হয়। তাই সোহাগ জানতে চাইলো আমার কি চাই, আমি বললাম,
“আমাকে যা দাও সেটা থেকেই আমার বোনের জন্য কিছু নিয়ে এসো, আমার কিছু লাগবে না।”
“মানে?”
“আসলে বোনটা তো ছোট প্রতি বছর আমিই কিছু না কিছু কিনেদেই। এবার তো আমি নেই, তাই বলছিলাম আর কি আমাকে যে টাকা দিয়ে কিছু দিবে সেটা দিয়ে ওকে কিছু কিনে দাও।”
“তুই যদি কিছু না নিস আমার টাকা বেচে যাবে, কিন্তু তোর মা, বোনদের কিছু দেওয়ার জন্য আমার কাছে ফালতু টাকা নেই।”
“কি বলছো!”
“যা বলছি সত্যি বলছি”
এই কথা বলেই সোহাগ বেরিয়ে গেল। আমি চুপ করে চোখের জল ফেলতে থাকলাম। এতো কষ্ট আল্লাহ আমায় না দিলেও পারতো। ছোট্ট বোনটা এবার কি নতুন কাপড় পাবে না। এটা ভেবেই বুক ফেটে কান্না আসছিলো, তবুও চিৎকার করে কাঁদতে পারিনি। সোহাগ ঠিক সবার জন্য শপিং করে নিয়ে এলো, কিন্তু আমার বা আমার বোনের জন্য কিছু আনেনি। এটা দেখে আমার শ্বশুর বললো,
“কিরে সোহাগ! বউমার জন্য কিছু আনিসনি?”
“কি লাগবে জানতে চেয়েছিলাম, বললো কিছু লাগবে না তাই কিছু আনিনি।”
কি সুন্দর মিথ্যা কথা সাজিয়ে বললো, ভাবতেই হাসি পেলো।
এভাবেই দিন গড়িয়ে মাস এবং বিয়ের একবছর পূর্ণ হলো। কিন্তু ওরা কেউ পরিবর্তন হয়নি, ঠিক আগের মতোই ছিলো।
একদিন হঠাৎ মা ফোন দিয়ে বললো।
চলবে…