অতঃপর গল্পটা তোমার পর্ব-১৮

0
179

#অতঃপর_গল্পটা তোমার
সমুদ্রিত সুমি
১৮

পূর্ব দিকে সূর্য মামার সাক্ষাৎ আজ নেই বললেই চলে। সে যেন মেঘের আড়ালে আজ লুকিয়েছে। গোটা একটা রাত জেগে ফজরের নামাজ পরে বেলা এগারোটা অবধি ঘুমিয়েছে তোহফা। সকাল থেকে তার মা চারপাঁচ বার ডেকেও কোনো সাড়া না পেয়ে বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। সকালের নাস্তা এবং দুপুরের রান্নার জোগাড় করতে করতে মেয়েকে বকতে পিছুপা হলেন না। লিমা ও ইলা নীরব দর্শক হয়ে পুরোটা সময় সব শুনে গেলো । গুনে গুণে ঘড়ির কাঁটা যখন একটা পাঁচের ঘরে তখন তোহফার ফোনটা বেজে ওঠে। তোহফা নড়েচড়ে ঘুম ঘুম চোখে ফোনটা কানে তুলে।

“তোহফা তোর পার্সেল রেডি নিয়ে যা। তুই পাগলই রয়ে গেলি তোহফা। ভোর পাঁচটায় কেউ ফোন করে আজ পর্যন্ত কেউ আমায় বলেনি বারোটার মধ্যে তাকে স্কেচ এঁকে দিতে হবে। ভাই সকালের নাস্তাটা অবধি আমি করিনি এখনো তোর প্যারায়। গার্লফ্রেন্ডও বোধহয় এত প্যারা দেয় না তুই যা দিলি আজ। তোর জিনিস তুই নিয়ে যা আমার মা।”

পরিচিত কন্ঠে তোহফা চোখ খুলে নাম্বার দেখে নেয়। জ্বলজ্বল করছে সিয়াম লেখা নামটা। তৎক্ষনাৎ মনে পরে সিয়ামকে সে ছবি আঁকতে দিয়েছে। সিয়াম ছোট থেকেই খুব সুন্দর ছবি আঁকতে পারে। এরপর তো আর্ট নিয়ে পড়াশোনা শুরু করলো। গতকাল রাতের ছোট্ট একটা বিশেষ মুহূর্ত বন্দী করতে চেয়েছে তোহফা। যেটা সারপ্রাইজ হিসেবে আওয়াদকে সে দিবে। সেটাই হয়ে গেছে শুনে ঝটপট শোয়া থেকে উঠে বসলো,

“কোথায় আছিস তুই?”

“তোদের বড় রাস্তার মোড়ে। তোদের বাড়িতে তো আবার ছেলেদের এন্ট্রি নিষেধ। এই দুপুর বেলা গেলে হয়তো আন্টির হাতের ঝাড়ুর বারি একটাও মাটিতে পরবে না সব আমার পিঠে পরবে।”

“ঠিক আছে। তুই অপেক্ষা কর আমি পাঁচ মিনিটে আসছি।”

তোহফা ঝটপট চোখেমুখে পানি ছিটিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। সদর দরজার কাছে যেতেই ইলা তোহফা বলে ডেকে ওঠে।

“কোথায় যাচ্ছো এই অবস্থায়? মা দেখলে আস্ত রাখবে না। মা কিন্তু এমনই তোমার উপর রেগে আছে।”

“পাঁচ মিনিট ভাবি! মাত্র পাঁচ মিনিট। যাবো আর আসবো। প্লিজ ম্যানেজ করো একটু মা’কে। ”

“তোমার এই ম্যানেজের চক্করে প্রতিবার আমি ফেঁসে যাই। আর সকাল থেকে তোমাকে একটা খবর দিবো বলে ঘুরছি তোমার তো ঘুম ভাঙার নামই নেই।”

“সব কথা এসে শুনবো ভাবি। প্লিজ যাই।”

তোহফার অনুরোধ দেখে ইলা হেসে মাথা নাড়ায়। তোহফা ইলাকে চুমু ইাশারা করে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। ইলা হাসতে হাসতে বলে,

“এই খবরটা আমি এখনো কাউকে দেইনি তোহফা! কারণ এই কথাটা শোনার অধিকার সর্বপ্রথম তোমার। কারণ তোমার প্রতিটা মোনাজাতে আমার আমি যে থাকি। তোমার মোনাজাতে যে কারণে আমি থাকি তোহফা আল্লাহ তা শুনেছে। তাড়াতাড়ি এসো এবং এই খুশির খবরটা শুনে তুমি আমায় জড়িয়ে ধরো।”

জোহরেরে সালাত শেষ করে যখন মোনাজাতে আল্লাহর শুকরিয়া করে মাত্র নামাজ শেষ করে ইলা তখনই দরজার কাছে দাঁড়িয়ে লিমা বলল,

“ভাবি নামাজ শেষ হলো তোমার?”

ইলা চোখমুখ মুছে হাসিমুখে বলল,

“হুম। কেন?”

“বাড়ির সবাই খেতে এসেছে কিন্তু তোহফা ঘরে নেই তুমি কি জানো তোহফা কোথায়?”

লিমার কথায় টনকনড়া দিয়ে উঠে। তোহফা বেরিয়ে যাওয়ার সাথে সাথেই তার মা ফোন করলো। তারসাথে কথা শেষ করে গোসল করে নামাজ পরলো। এখনো তোহফা ফেরেনি শুনে খানিক অবাক হলো। দ্রুত পায়ে লিমার সাথেই এগিয়ে ড্রইংরুমে যায়। সেখানে উপস্থিত সবাইকে দেখে ইলা একটু ঘাবড়ে যায়। দুপুরের খাবার খাওয়ার জন্য সবাই চলে এসেছে। ইলা আসতেই জাহানারা বেগম বললেন,

“তোহফা কোথায় ইলা? লিমা বলল ও ঘুম থেকে উঠে তোমার সাথে কথা বলেছে।”

ইলা বলল,

“মা তোহফা বলল ও বড়রাস্তায় যাচ্ছে। যাবে আর আসবে। কিন্তু এখনো আসেনি শুনে তো আমারও ভয় হচ্ছে। ”

ইলার কথায় তৌসিফ ও তৌহিদ দু’জনেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। কারণ তারা দু’জনেই ওখান থেকে এসেছে কোথাও তোহফাকে তো দেখতে পায়নি। তৌসিফ বলল,

“তুমি শিউর ইলা তোহফা বড় রাস্তার মোড়ে গেছে?”

“হ্যাঁ। তোহফা আমাকে মিথ্যা কেন বলবে?”

তৌসিফ ও তৌহিদ দু’জনেই একসাথে বাহিরে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। তখনই কলিং বেল বেজে উঠতেই সকলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে তোহফা ফিরে এসেছে ভেবে। লিমা দৌড়ে দরজা খুলে দিতেই অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষকে দেখে একটু অবাক হয়। তৌহিদ এগিয়ে গিয়ে দেখে তোহফা নয় একটি ছেলে দাঁড়িয়ে দরজার ওপাশে। তৌহিদ নিজের চিন্তা দূরে রেখে বলে,

“সিয়াম তুমি অসময়ে? ”

তৌহিদের কথায় সবাই একে একে দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সিয়াম দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে,

“ভাইয়া পাঁচ মিনিটের কথা বলে তোহফা আমাকে অপেক্ষা করতে বলে। কিন্তু ও না আসায় বাধ্য হয়ে আমি নিজেই চলে আসছি। এটা ওকে দিয়ে দিবেন।”

তৌসিফের চোখমুখ শক্ত হয়ে যায় সিয়ামের কথা শুনে।

“তোহফা তোমার সাথে দেখা করবে বলেছে?”

“হ্যাঁ ভাইয়া। ও আমাকে একটা ছবি আঁকতে দিয়েছিলো। সেটাই ওকে দিতে এসেছিলাম। আপনাদের বাড়িতে আসা নিষেধ এজন্য ওকে ফোন করে ডাকলাম। কিন্তু ওর কোনো খোঁজ নেই দেখে নিজে বাধ্য হয়েই এখানে…..

সকলের মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো। সিয়ামকে কিছু না বলেই তৌহিদ, তৌসিফ, আরিফুল ইসলাম তিনজনেই বেরিয়ে গেলেন। অজানা এক ভয় সকলকে তাড়া করে বেড়াতে রইলো। সিয়াম অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“ভাবি কি হয়েছে? ”

“তোমার সাথে দেখা করবে বলেই ও আরো এক ঘন্টা আগেই বের হয়েছে। ”

ইলার কথায় সিয়াম অবাক হয়ে বলল,

“কি বলেন! আমার সাথে দেখা করার কথা বলে তাহলে কোথায় গেছে?”

জাহানারা বেগম থম মেরে বসে রইল। তিনি আপাতত কিছু বলতে পারলেন না। ইলা ও লিমা দরজা বন্ধ করে শাশুড়ীর পাশে গিয়ে বসলেন। চিন্তা ক্রমশ তাদের বাড়তে রইলো। অন্যদিকে চেনা পরিচিত সকল রাস্তা এবং বাড়িতে তৌসিফরা খোঁজ নিলো তবে তোহফার খোঁজ কোথাও পেলো না। অবশেষে উপায় না পেয়ে ভাবলো হয়তো তোহফা লুকিয়ে আওয়াদের সাথে দেখা করতে গেছে। তৌহিদ দ্রুতই আওয়াদের নাম্বারে কল করলো। তিনবার রিং হতেই আওয়াদ ফোনটা রিসিভ করে,

“ আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া। কেমন আছেন?”

“ ওলাইকুমুস সালাম। আলহামদুলিল্লাহ। আওয়াদ তোহফা তোমার কাছে?”

প্রশ্নটা শুনে যেন আওয়াদ খানিক অবাক হলো। তোহফা তার কাছে আছে কিনা? মানে তোহফাকে ওদের কাছে নেই?

“না ভাইয়া। আমি তো মিটিংয়ে আছি।”

তৌহিদের হাত থেকে আরিফুর ইসলাম ফোনটা কেঁড়ে নিলেন,

“বাবা আমার মেয়েটাকে খুঁজে পাচ্ছি না। আমার মেয়েটা কোথায় গেলো। কিছু একটা করো!”

আওয়াদ ভেবে পেলো না এই মুহূর্তে তার কি উত্তর দেওয়া উচিত। এই ভয়টাই কি গতকাল তাকে তাড়া করে বেরিয়েছে। ও আল্লাহ। আওয়াদ আমি আসছি বলেই ফোনটা কেটে দিলো। দুই ছেলেকে নিয়ে পাগলের মতো এদিক ওদিক খুঁজতে রইলো মেয়েকে আরিফুল ইসলাম। তবে তারা ব্যর্থ। ঘড়ির কাঁটায় যখন সময় বিকাল চারটার ঘরে তখন অস্থির হয়ে আওয়াদ তোহফা দের কলিং বেল বাজাতে থাকে। ইলা দৌড়ে দরজা খুলে দিয়ে হতাশ চোখে তাকায়। সবাই থাকলেও তোহফা নেই।

“ভাইয়া তোহফার কোনে খোঁজ পেলেন?”

আওয়াদ মাথা নিচু করে রইলো। তৌসিফ, তৌহিদ, আরিফুল ইসলাম সকলে ঘরে ঢুকে। তবে আচমকা আওয়াদ কিছু একটা ভেবেই বলে উঠলো,

“ভাইয়া আমার সাথে চলুন। তৌহিদ ভাইয়া আপনি বাড়িতেই থাকুন। আমরা আসছি।”

তৌসিফ যেন আওয়াদের ইশারা বুঝলো। সে আওয়াদের সঙ্গ নিলে আরিফুল ইসলাম বাঁধ সাধলো।

“আমি যাবো তোমাদের সাথে।”

তৌসিফ বলল,

“বাবা আমি আওয়াদ যাই প্রয়োজন পরলে না-হয় তোমাকে ডেকে নিবো।”

আরিফুর ইসলাম চিৎকার করে উঠে,

“আমার মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না আর তুই আমাকে চুপচাপ ঘরে থাকতে বলছিস। ”

বাবাকে চিৎকার করতে দেখে সকলেই কেঁপে ওঠে। কারণ শান্তিপ্রিয় তাদের বাবার এই অগ্নিমূর্তি তারা কখনোই দেখেনি। আওয়াদ এগিয়ে আসে।

“আঙ্কেল আপনি উত্তেজিত হবেন না। আমি আর ভাইয়া দেখছি তো। প্লিজ একটু ভরসা করুন।”

আরিফুর ইসলাম আওয়াদের কথায় ভরসা পেলেন্ তিনি আওয়াদের দু-হাত আগলে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন,

“আওয়াদ আমার মেয়েটাকে নিয়ে আসো। আমার মা টাকে নিয়ে এসো। ওকে ছাড়া আমরা কীভাবে থাকবো বলো। ওকে নিয়ে আসো।”

আওয়াদ ভরসা সরূপ আরিফুল ইসলামের হাত চেপে ধরলেও তার ভেতরে ঠিক কি হচ্ছে একমাত্র তো সেই জানে। নিজেকে সামলাতে গিয়ে যে পুরোপুরি ভেতর থেকে অস্থির হয়ে পরছে। কোথায় গেলো তোহফা? কেউ তার ক্ষতি করার জন্য তাকে তুলে নিয়ে গেছে কি? কত প্রশ্ন অথচ উত্তর একটাই! তোহফা যেখানেই থাকুক যেন ভালো থাকে সুস্থ থাকে।

ইন শা আল্লাহ চলবে……