আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৬৫+৬৬

0
4620

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬৫
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

” আবির, এখন বিয়ে করতে তোমার কোনো আপত্তি আছে?”

শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে আবিরের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেছে, মস্তিষ্ক জুড়ে বিচরণ করা পরিকল্পনা গুলো এলোপাতাড়ি ছুটছে। পিঞ্জরে আবদ্ধ হৃদপিণ্ডটা দপদপ করে কাঁপছে। আব্বু, চাচ্চু সহ খান বাড়ির প্রায় সব সদস্য আজ এখানে উপস্থিত। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে আবির ফুপ্পিকে প্রথমবারের মতো বাসায় আনতে সফল হয়েছে, আবির যতটা চেষ্টা প্রকাশ্যে করেছে তার থেকে অনেক বেশি চেষ্টা গোপনে করেছে। ফুপ্পির সাথে প্রথমবার দেখা হওয়ার পর থেকে, মালিহা খানকে দিয়ে আবির যথাসাধ্য আলী আহমদ খানকে বুঝানোর চেষ্টা করে আসছে। এতদিনে ভাই বোনের সম্পর্ক মোটামুটি ঠিক হতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় আবির কোনোভাবেই নতুন কোনো ঝামেলা চাচ্ছে না। বর্তমানে আবিরের অবস্থান অনুসারে, মেঘের কথা বাসায় জানানো বা আব্বু, চাচ্চুর কাছে মেঘকে চাওয়ার মতো মিনিমাম যোগ্যতাও আবিরের নেই। আর যাই হোক, আবির মেঘের ব্যাপারে “নাহ” শব্দ শুনতে নারাজ। এদিকে টেনশনে মেঘের হাত পা ঠান্ডা হয়ে গেছে। আবির বিয়েতে রাজি হয়ে গেলে আর যে কোনো ক্রমে অন্য মেয়ের সাথে আবিরের বিয়ের কথা হলে মেঘের কি হবে সেটা ভেবেই মেঘ ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে। পাশাপাশি বসায় আবিরের দিকে ঠিকমতো তাকাতে পারছে না,আবিরের রিয়াকশন ও বুঝতে পারছে না। কিছু মুহুর্তের জন্য খাবার টেবিলে পিনপতন নীরবতা চললো৷ অবশেষে আবির ছোট করে শ্বাস ছেড়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,

” আমি আপাতত বিয়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত না। ”

” আমি কি তোমাকে এখনই বিয়ে করতে বলছি নাকি? ঈদ পর্যন্ত সময় নাও, মানসিক ভাবে প্রস্তুত হও।”

আবির আগপাছ না ভেবে বলে উঠল,
“সরি আব্বু ৷ ঈদ নাগাদ সময়ে আমি নিজেকে গুছাতে পারবো না। আমার আরও সময় লাগবে।”

“কতদিন? ”

“আগামী ১ বছর আমি বিয়ে নিয়ে ভাবছি না।”

” আরও একবছর? তুমি বাড়িতে আসছো প্রায় ১ বছর হতে চললো। তাছাড়া তোমার বিয়ের বয়সও হয়েছে, তোমার আম্মু অনেকদিন যাবৎ ই আমাকে বলছিল। আমার উচিত বাবা হিসেবে নিজের দায়িত্ব স্বীয় ভাবে পালন করা। ”

” কিন্তু আব্বু আমি এখন কোনো অবস্থাতেই বিয়ে করতে পারবো না৷ বিয়ে করার মতো যোগ্যতা আমার এখনও হয় নি৷ ”

“কেন হবে না? যদি ইনকামের কথাও চিন্তা করি, তুমি প্রায় ৮-৯ মাস যাবৎ আমাদের পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি নিজস্ব ব্যবসা সামলাচ্ছো। তোমার পার্সোনাল ইনকাম বাদ দিলাম, আমাদের কোম্পানি থেকে প্রতিমাসে তোমাকে যে স্যালারিটা দেয়া হয় আমি আশাবাদী তা দিয়ে তুমি তোমার বউ নিয়ে দিব্যি চলতে পারবে। প্রয়োজনে বিয়ের পর তোমার স্যালারি বাড়ানো হবে। ব্যবসার দায়িত্ব এখন তোমার কাছ, তোমার যা প্রয়োজন তার সবটায় তুমি নিতে পারো। এরপরও যদি সমস্যা মনে হয় তাহলে আমি তো আছিই। বিয়ের সম্পূর্ণ খরচ না হয় আমিই দিলাম। ”

আবির মলিন হেসে বলল,
” আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ এবং আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। প্রয়োজনে ১ বছরের জায়গায় দুই বছর পর বিয়ে করবো তবুও বিয়ের জন্য আমি কারো কাছ থেকে এক পয়সাও নিব না। ”

মোজাম্মেল খান রাশভারি কন্ঠে বলে উঠল,
” যদি টাকার জন্য ই বিয়ে করতে সমস্যা হয় তাহলে তোমার আব্বুর বা আমার একাউন্ট থেকে চাইলে তুমি তোমার প্রয়োজনীয় এমাউন্ট ধার নিতে পারো। তারপর ধীরে ধীরে পরিশোধ করে দিও। তোমার আব্বু তোমাকে বিয়ে করাতে চাইছেন, তোমার রাজি হওয়া উচিত। ”

মোজাম্মেল খান একটু থেমে পুনরায় বললেন,
” আর মেয়েটা তোমার অপরিচিত কেউ না!”

মোজাম্মেল খানের কথায় আবির আঁতকে উঠল। মুহুর্তেই মাথায় চিন্তারা ঘুরপাক খেতে শুরু করলো। সহসা হৃৎস্পন্দন জোড়ালো হয়ে গেছে। মনের গহীনে একটা চিন্তা বার বার উঁকি দিচ্ছে,
“আব্বু- চাচ্চু কি কোনোভাবে মেঘের কথা বলতে চাচ্ছেন?”

অন্যমনস্কতায় আবিরের ওষ্ঠ যুগল কিছুটা প্রশস্ত হলো।নিপুন কৌশলে আবির নিজের অল্পবিস্তর হাসিটাকে আড়াল করে গুরুতর কন্ঠে শুধালো,
“কে সে?”

মোজাম্মেল খান অবলীলায় বলতে শুরু করলেন,
” শাকিল সাহেবকে তো তুমি চিনোই । ওনার মেয়ে সারা কেও নিশ্চয়ই দেখেছো, মাঝে মাঝে অফিসেও আসে। গতকাল তোমার অসুস্থতার কথা শুনে শাকিল সাহেব অফিসে আসছিলেন, তারপর নিজে থেকেই সারা র সঙ্গে বিয়ের সম্বন্ধের কথা বলেছেন। যদিও ভাইজান তেমন কিছু বলে নি, বাসায় আলোচনা না করে ওনাকে কিছু জানানো ঠিক হবে না। বাসার সবার ও তোমার মতামত থাকলে ওনাদের বাসায় দাওয়াত করা হবে। মেয়ে অপছন্দ হওয়ার মতো কিছু নেই, তারা আসলে এনগেজমেন্ট টাও না হয় করে নেয়া যাবে। ”

সারার কথা শুনে আবিরের মেজাজ চরম মাত্রায় খারাপ হয়ে গেছে। মনের কোণে যে একটুকরো সুখের আভাস উঁকি দিয়েছিল তা যেন মুহুর্তেই বিলুপ্ত হয়ে গেছে৷ পায়ের রক্ত মাথায় উঠে গেছে, গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটছে । মেঘ, তানভির দুই ভাই বোনই অসহায় মুখ করে আব্বুর অভিমুখে চেয়ে আছে। মেঘ পাশে তাকিয়ে একপলক আবির কে দেখছে পুনরায় একপলক আব্বুকে দেখছে। উপস্থিত সকলের মনে অস্থিরতা। এতক্ষণ যাবৎ একটুর জন্য হলেও মনে হয়েছিল, তারা আবিরের মতামত জানতে চাইবে৷ কিন্তু মোজাম্মেল খানের মুখে এনগেজমেন্টের কথা শুনে সকলেই থতমত খেয়ে গেছে। ফুপ্পিরা সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। সবাই সবার দিকে তাকালেও আবিরের দৃষ্টি প্লেটের দিকে স্থির। রাগে আবির দাঁতে দাঁত চেপে ধরেছে, কপালের দুপাশের শিরা-উপশিরা গুলো দ্রুতগতিতে লাফাচ্ছে, গলার রগ গুলো ফুলে উঠেছে৷ সারা মেয়েটা ইদানীং ঘনঘন অফিসে আসছিল, ওনাদের সাথে কোনো মিটিং বা যেকোনো আলোচনাতেই সারা শাকিল সাহেবের সঙ্গে আসতো। প্রথম দিন ফরমালিটি করে আবির সারার সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে কথা বলেছিল, এক কাপ কফিও অফার করেছিল, মিটিং এ যাওয়ার আগে আবির কাউকে কফি দেয়ার কথা বলেও গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ব্যস্ততার জন্য সারা র সঙ্গে আর কোনো কথা হয় নি। সেই থেকে সারা প্রায় ই অফিসে আসতো, যেচে আবিরের সাথে কথা বলার চেষ্টা করতো, আবির ব্যস্ততা দেখিয়ে সবসময় ইগ্নোর করতো। সারা বেশ কয়েকবার আবিরের নাম্বারও চেয়েছে, কিন্তু আবির দেয় নি। সেই মেয়ের সঙ্গে বাবা-চাচা আবিরের বিয়ের কথা ভাবছে এতেই আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। আবির মুখ ফুলিয়ে শ্বাস টানলো, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার শেষ চেষ্টা করল, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কন্ঠ চারগুণ ভারী করে বলল,

” আমি বিয়ে করবো না মানে করবোই না। আগামী এক বছর এই বাড়িতে কোনো প্রকার বিয়ের আলোচনা শুনতে চাই না। শাকিল সাহেবের মেয়েই হোক আর যে সাহেবের মেয়েই হোক, আজকের পর থেকে অফিসিয়াল কার্যক্রমের সদস্য ব্যতীত অফিসে যেন কোনো মেয়ে না আসে। আর অনুগ্রহ করে আমার বিয়ে নিয়ে আপনারা আলোচনা বন্ধ করুন।”

আলী আহমদ খান রাশভারি কন্ঠে বললেন,
“তুমি কথা শেষ করতে তো দিবে। ”

“আব্বু,আমি আর কোনো কথা শুনতে বা বলতে চাচ্ছি না। ”

“তোমার কিছু বলার থাকলে বলতে পারো।”

আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলে উঠল,
“আপনারা আপনাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে, এনগেজমেন্ট পর্যন্ত ফিক্সড করে ফেলছেন আর এখন আমার মতামত জানতে চাচ্ছেন। বাহ! অসাধারণ। ”

মালিহা খান শান্ত স্বরে বললেন,
“আবির, আব্বুর সাথে এভাবে কথা বলছিস কেন? কথা বললেই তো বিয়ে হয়ে যায় না। ওনারা তে তোর সিদ্ধান্ত জানতেই চাচ্ছেন। ”

“আম্মু এটাকে সিদ্ধান্ত জানতে চাওয়া বলে না। ওনারা ওনাদের মর্জি আমার উপর চাপালেই আমি ওনাদের সব সিদ্ধান্ত মানতে পারব না। আর যদি আমার সিদ্ধান্ত জানতেই চাও, তাহলে আমি আবারও বলছি আগামী এক বছর আমি বিয়ে করতে পারব না৷ এ ব্যাপারে আমার সামনে অথবা আড়ালে আর কোনো কথা যেন না হয়!”

আলী আহমদ খান উঠে যেতে যেতে ভারী কন্ঠে বললেন,
” ঠিক আছে, তোমার বিয়ে নিয়ে আর কোনো কথা হবে না। ”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে জবাব দিল,
“ধন্যবাদ।”

মোজাম্মেল খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেলে নিজের মর্জিতে চলতে চায়, বাবা-মায়ের অবাধ্য সন্তান হয়ে যায়, বড়দের সিদ্ধান্ত তখন তাদের কাছে মূল্যহীন মনে হয়। কাউকে পরোয়া করে না। ”

আবির ঠোঁট বেঁকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,

“পারলে নিজের মেয়েকে আমার কাছে দেন বিয়ে, তারপর দেখুন আপনাদের সিদ্ধান্তের মূল্য দেয় কি না! নিজের মেয়ের কথা তো একবারও বললেন না! কোথাকার কোন মেয়েকে আমার ঘাড়ে গছিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছেন, তাতে রাজি হয় নি বলে আমি অবাধ্য সন্তান হয়ে গেছি। বাহ! শ্বশুর আব্বু, বাহ! আপনার মেয়েকে বিয়ে দিলে ঈদ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না, আজ, এই মুহুর্তেই বিয়ে করে ফেলবো। ”

মোজাম্মেল খান বিড়বিড় করতে করতে খাবার টেবিল ছেড়ে উঠে চলে গেছেন। আবির একপলক চাচ্চুর দিকে তাকালো, বিড়বিড় করে বলা কথার কিছুই আবির বুঝবো না। চোখ ঘুরাতেই তানভিরকে চোখে পরলো, আবির তানভিরকে দেখেই সিম্পলি স্মাইল দিল, তানভিরের মুখে গাম্ভীর্যতা লেগেই আছে। আবির ফুপ্পিদের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,

“তোমরা খাচ্ছো না কেনো? খাও খাও।”

সবাই স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, শুধু আশপাশে চোখ বুলাচ্ছে। ইকবাল খান, মালিহা খান, আকলিমা খান উপস্থিত আছে বিধায় কেউ কিছু বলতে পারছে না। সবার মনমরা ভাব দেখে আবির ঠাট্টার স্বরে বলল,

“সামনের বছর আমার বিয়ে। তোমাদের সবার দাওয়াত, এখন থেকেই বিয়ের প্রিপারেশন শুরু করো। বিয়ে আমার ধুমধাম করেই হবে। ”

আইরিন আর মীমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“তোরা ডান্স শেখা শুরু কর, আমার বিয়েতে ঠিকমতো নাচতে না পারলে তোদের খবরই আছে।”

আবিরের কথা শুনে সবাই না চাইতেও হেসে ফেললো। নিজের বিয়ের দাওয়াত নিজেই দিচ্ছে, আবার নাচার জন্য বোনদের রীতিমতো থ্রেট দিচ্ছে। এমন কান্ড একমাত্র আবিরই করতে পারে। আরিফ মজা করে বলল,

“ভাইয়া আমরা কি দোষ করেছি? ছেলে বলে কি আমরা নাচতে পারবো না?”

আবির হেসে বলল,
” অবশ্যই নাচবি৷ তোদের বেশকিছু লুঙ্গি কিনে দিব। তখন সবগুলো মিলে লুঙ্গি ডান্স দিস। ”

মালিহা খান তপ্ত স্বরে বললেন,
” আবির, তোর আব্বুর কথা…”

আবির গম্ভীর কণ্ঠে শুধু বলল,
“আম্মু…!”

মালিহা খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
“ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমি আর কিছুই বলবো না। ”

“এইতো আমার লক্ষ্মী আম্মু।”

আলী আহমদ খান কিছুক্ষণ আগেই রুমে গেছেন, আলী আহমদ খানকে দেখতে মালিহা খানও এবার নিজের রুমে চলে গেছেন। আবির আড়চোখে নিজের প্রেয়সীর দিকে এক নজর তাকালো। মেঘ মাথা নিচু করে ভাতের প্লেটে আঙুল বুলাচ্ছে। বাকিদের মুখে হাসি থাকলেও মেঘের মনে কালবৈশাখী ঝড় বইছে। আব্বু আর বড় আব্বু যেভাবে বিয়ের কথা বলছিল, আবির ভাই রাজি হলেই বিয়ে হয়ে যেত। এদিকে আবির ভাইয়ের মনে মেঘ আছে কি না এ বিষয়েও মেঘের মনে সন্দেহ আছে। মেঘের প্রতি আবিরের মনে ভালোবাসা নাকি ভালো লাগা,এক বছর পর আদো আবির কি মেঘকে বিয়ে করবে? নাকি অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করে ফেলবে সেসব ভেবেই মেঘের মন আরও বেশি খারাপ হয়ে যাচ্ছে। মেঘের বার বার শুধু মনে হয় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পেছনে ছুটছে সে। আবিরের মনের কথা জানতে করা এক কর্মকান্ডে আবিরের এই অবস্থা হয়েছে। এখন সে কি করবে!

মেঘের হাবভাব দেখে আবির মেঘের দিকে সরাসরি তাকালো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,
” ভাতের প্লেটে আবার কি চাষ করবি?”

মেঘ বিস্ময় সমেত চোখ তুলে তাকালো। মোহনীয় সেই দৃষ্টি। ফুপ্পিরা আসবে শুনে মেঘ সকাল সকাল গোসল করে সাজুগুজু করেছিল, এখন সেই সাজ অনেকটায় বিনত হয়ে গেছে তবুও আবির মেঘের চোখের গভীরে অক্লান্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। আশপাশ থেকে অন্যদের কন্ঠস্বর কানে আসতেই আবির নড়েচড়ে বসল, চোখে চোখ রেখেই শান্ত স্বরে বলল,
” পারিপার্শ্বিক ব্যাপারে কান না দিয়ে, চুপচাপ খাবার শেষ কর।”

মেঘ অসহায় দৃষ্টিতে আবিরকে পরখ করলো৷ মনে মনে নিজেকে আওড়ালো,
“মানুষটা এমন কেন? এত কিছুর পরেও একটা মানুষ এতটা স্বাভাবিক কিভাবে থাকতে পারে?”

মেঘ পুনরায় মাথা নিচু করে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। খাবার টেবিলে তেমন কোনো কথা হলো না। খাওয়াদাওয়া শেষ করে ফুপ্পিরা কিছুক্ষণ গল্প করে বিকেলের দিকে বাসায় চলে গেছেন। যাওয়ার সময় আলী আহমদ খান গিফটের পরিবর্তে সবাইকে টাকা দিয়ে দিয়েছেন। সন্ধ্যার পর পর মেঘ ঘুমিয়েছিল, সেই ঘুম ভেঙেছে রাত ১১.৩০ নাগাদ।

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৬৬
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

মেঘের ঘুম ভাঙতেই দেখল, ফুপ্পির নাম্বার থেকে দুটা কল, আরিফ আর জান্নাত আপুর নাম্বার থেকেও বেশ কয়েকটা কল আসছে সেই সাথে আবিরের নাম্বার থেকে প্রায় দুই ঘন্টা আগে ৩ বার কল আসছিল। আবিরের নাম্বার টা চোখে ভাসতেই মেঘের বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল, কানে বাজছে দুপুরে খাবার টেবিলের কথাগুলো সেই সঙ্গে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে বড় আব্বুর পায়ে ধরে ফুপ্পিদের কান্নার দৃশ্য। মেঘ শুয়ে রুমের ছাদের দিকে তাকিয়ে আছে আর হাবিজাবি ভাবছে, বেশ কিছুক্ষণ পর শুয়া অবস্থায় ফুপ্পিকে কল দিলো। ফুপ্পির সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল, মনের অবস্থা ভালো না বলে বেশি কথাও বললো না। আরও ঘন্টাখানেক চুপচাপ বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে রইলো৷ কি ভাবছে, কেন ভাবছে তার সবটায় অজানা৷ এরমধ্যে দুএকবার রুম থেকে বেড়িয়ে বেলকনি পর্যন্ত গিয়েওছে৷ কিন্তু বাড়ির পরিবেশ বেশ নিরব, কেউ কোথাও নেই, প্রতিদিনের মতোই ড্রয়িংরুম শুধু একটা বাল্ব জ্বলছে। ড্রয়িংরুম পেরিয়ে আবিরকে দেখতে যাওয়ার সাহস ছোট্ট মেঘের হচ্ছে না৷ তাই দুবার ই রুমে ফিরে আসছে৷ আবিরের নাম্বারে একবার কলও দিয়েছিল, আবির কল রিসিভ করে নি৷ প্রায় ঘন্টাখানেক রুমে পায়চারি করার পর অবশেষে মেঘ বুকে সাহস নিয়ে আবিরের রুমের দিকে পা বাড়ালো।
মেঘ উপরে থাকাকালীন এতবছরে আজ অবধি ভয়ে রাতের বেলা নিচে নামে নি। পানি সহ প্রয়োজনীয় সব জিনিস সন্ধ্যের আগেই রুমে নিয়ে আসে। আবিরকে দেখার জন্য মেঘ এত রাতে ভয়ে ভয়ে নিচে নামছে৷ রুমের দরজা ধাক্কা দিতেই মৃদু আলোতে আবিরের ঘুমন্ত ধৃষ্টতা ভেসে উঠল। মেঘ ধীর গতিতে রুমে প্রবেশ করল। নিস্তব্ধ আঁখিতে বেশকিছু সময় আবিরকে পরখ করল। বৈদ্যুতিক পাখার বাতাসে আবিরের চুল গুলো উড়ছে, গাল ভর্তি দাঁড়ি গুলো অনেকটায় বড় হয়ে গেছে সেই সাথে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে শ্যামবর্ণের চেহারা তামাটে বর্ণ ধারণ করেছে৷ মেঘ অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে আচমকা বিছানার পাশে ধপ করে ফ্লোরে বসে পরলো।

মাঝরাতে নিস্তব্ধ পরিবেশে বাসার পাশে গাছের ঢালে দুটা পাখির কিচিরমিচির শব্দ ব্যতীত আর কোনো শব্দ নেই৷ অকস্মাৎ আবিরের ঘুম ভেঙে গেছে, অনুভব করে একজোড়া তুলতুলে হাত আবিরের একহাত আঁকড়ে ধরে রেখেছে, আবিরের হাতের আঙুল গুলো কোমল গাল স্পর্শ করে রেখেছে৷ আবিরের অনুভূতিরা জানান দিচ্ছে আবিরের প্রেয়সী আবিরের হাতকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে। সবই ঠিক ছিল, কিন্তু মেঘের হঠাৎ কান্না সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে৷ প্রথম দিকে আস্তেধীরে কাঁদলেও ধীরে ধীরে মেঘ নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে। মেঘের নিরবচ্ছিন্ন কান্নায় চোখ বেয়ে গড়িয়ে পরা পানিতে মেঘের গালে রাখা আবিরের আঙুল গুলো ভিজে গেছে৷ মেঘের কান্নার শব্দে আবিরের বুকের ভেতর তোলপাড় চলছে। মাঝরাতে মেঘ কেন কাঁদছে, কেউ কিছু বললো কি না, আগে আবিরের কল কেন রিসিভ করল না সেসব ভেবে আবির অস্থির হয়ে যাচ্ছে। এদিকে মেঘের কান্না থামার কোনো নাম নেই৷
মেঘের হাতে থাকা আবিরের আঙুল গুলো তিরতির করে কাঁপছে, মেঘ কান্নার জন্য তা বুঝতেই পারছে না। আবির কাতর স্বরে মনে মনে বলল,

” মেঘ, তুই এভাবে কাঁদিস না প্লিজ। তোকে কিভাবে বুঝায়, তুই কাঁদলে যে আমার ভেতরটা পুড়ে ছারখার হয়ে যায়৷ তুই জানিস না, তোর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি ঝড়লে এই আবিরের হৃদয় থেকে কত ফোঁটা র- ক্ত ঝড়ে৷ তোর কান্না দেখলে খু-* ন না করেও নিজেকে খু*-নী মনে হয়। তোর কাছে থেকেও আজ আমি বহুদূরে, তোকে ছোঁয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও আজ আমি বড্ড অসহায়। ”

মেঘ আপনমনে কেঁদেই চলেছে, মাঝরাতে আবির মেঘকে কি বলবে, মেঘকে ডাকলে মেঘ অস্বস্তিতে পরে যাবে। সেসব ভেবেই আবির মেঘকে ডাকার সাহস পাচ্ছে না। মেঘ কাঁদতে কাঁদতে আবিরের হাতে অধর ছুঁয়ে দিচ্ছে, পুনরায় গালে হাত চেপে ধরে ব্যগ্র
কন্ঠে বলল,
” আবির ভাই, আপনি আমার প্রাণচঁচল্যের একমাত্র শখের পুরুষ, আমার হৃদয়ের একান্ত ব্যাকুলতা। চিত্তচাঁচল্য নয় বরং আমি আপনার প্রণয়ের পরিণীতা হতে চাই৷”

মেঘের কান্না জড়িত কন্ঠে বলা একেকটা কথা শুনে আবিরের হৃদস্পন্দন কয়েকগুণ বেড়ে গেছে। ইচ্ছে করছে সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কাদম্বিনীর দুচোখের পানি মুখে, মায়াবী দুচোখে চোখ রেখে অনুরক্ত কন্ঠে বলতে,

“মাহদিবা খান মেঘ, আপনিও আমার অস্তিত্বে নিবদ্ধ একমাত্র শখের নারী, আমার আত্মাকে প্রশান্ত করার অনন্য পন্থা। পৃথিবীর সব নারীকে অবহেলা করতে পারলেও মাহদিবাকে উপেক্ষা করার সাধ্যি এই আবিরের নেই। চিন্তা নেই ললনা, আপনি আমার প্রণয়ের একমাত্র পরিণীতা হবেন, শুধু সময়ের প্রতীক্ষা। ”

মেঘ অতর্কিতে আবিরের হাত ছেড়ে নিস্তরজ আঁখিতে
আবিরকে আপাদমস্তক পরখ করে, নিসাড় মাথা নিচু করে বেড়িয়ে যাচ্ছে। আবির অক্রুর দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে,চোখে উপচে পড়ছে প্রশান্তি। মেঘ অতি সন্তর্পণে হাঁটছে যেন কারো নজরে না পরে। ড্রয়িং রুম পার হয়ে দুটা সিঁড়ি উঠতেই পাশ থেকে ভারী পুরুষালি কন্ঠস্বর ভেসে আসলো,

“এত রাতে নিচে কি করছিস?”

মেঘ আঁতকে উঠে পাশ ফিরে তাকাতেই দেখল ইকবাল খান সোফার পাশে দাঁড়ানো৷ ভয় পেয়ে তড়িঘড়ি করে মেঘ জামার উপর দিয়েই বুকে থু থু দিল। দাঁত দিয়ে জিভ কেটে, চোখ নামিয়ে মেঘ ধীরস্থির কন্ঠে আমতা আমতা করে বলল,
” পা. পানি খেতে আসছিলাম।”

ইকবাল খান গুরুভার কন্ঠে বললেন,
” অনেক রাত হয়েছে ঘুমাতে যা এখন।”

মেঘ ঘাড় কাত করে “আচ্ছা” বলে গুটিগুটি পায়ে উপরে উঠে গেছে।

সময় চলমান৷ মেঘ নিজের মতো ভার্সিটিতে যায়, বন্যার সাথে টুকিটাকি কথা বললেও মিনহাজ, তামিম, মিষ্টি কারো সঙ্গেই তেমন কথা বলে না,ওদের দেখলেই এড়িয়ে যায়৷ নিজের প্রতি তীব্র ক্ষোভ থেকেই মূলত মেঘের এই কাজ করা। তানভিরও নিজের কাজে ব্যস্ত, বাসায় ফিরে আবিরের সাথে টুকটাক কথা বলে খাওয়াদাওয়া করে ঘুমায়। দেখতে দেখতে ২১ দিন পেরিয়ে গেছে, আবিরের পা অনেকটায় ঠিক হয়ে গেছে৷ মোটামুটি হাঁটা চলাও করতে পারে৷ এরমধ্যে একদিন সন্ধ্যের দিকে সাকিল সাহেব আলী আহমদ খানকে কল ও দিয়েছেন। আবিরের খোঁজ খবর নেয়ার জন্য, তাছাড়া ওনারা খুব শীঘ্রই আবিরকে দেখতে আসতে চাচ্ছেন। কিন্তু আবিরের রাগ দেখে আলী আহমদ খান ডিরেক্ট নিষেধ করে দিয়েছেন। আবির কিছুটা সুস্থ হওয়ার পরেই নিজের রুমে চলে আসছে। এত দিনের মধ্যে মেঘ আবিরকে দেখতে যতবারই আবিরের রুমে যায় ততবার ই মীম মেঘকে নিয়ে মজা করে, মীমের দুষ্টামির জন্য এখন, আবির রুমে একা থাকলে মেঘ লজ্জায় রুমেই যায় না।

অনেকদিন ধরে ছাদে যাওয়া হয় না, গাছ গুলোর তেমন যত্নও নেয়া হয় না। মীম আর আদি মাঝে মাঝে গাছগুলোতে পানি দেয়। আজ বিকেলের দিকে মেঘ আর মীম ছাদে গেছে, গাছগুলোর আগাছা পরিষ্কার করছে আর দু বোন নিজেদের মতো গল্প করছে৷ মীম মেঘকে উদ্দেশ্য করে বলল,
” আপু সামনে ঈদ, তুমি ভাইয়াকে কিছু দিবা না?”

“একটা পাঞ্জাবিতে হ্যান্ডপ্রিন্ট করে দিব ভাবছিলাম। ”

“এটা তো খুব ভালো আইডিয়া৷ ডিজাইনের মাঝে তোমার নামটাও লিখে দিও৷ ”

“নাহ নাহ। এসব করা যাবে না। কেউ দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে৷ ”

“তোমাকে বড় করে লিখতে বলছে কে? একদম ছোট ছোট অক্ষরে লিখবা। মানুষ কি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখবে নাকি?”

“আমার ভয় লাগে। আবির ভাই দেখলে খুব বকা দিবেন।”

“কে বকা দিবে? ভাইয়া?”

“হ্যাঁ”

“ভাইয়া দিবে তোমাকে বকা? এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? শুনো আপু, আর যাই বলো আমি চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে নিবো৷ কিন্তু ভাইয়া তোমাকে বকবে এটা আমি জীবনেও বিশ্বাস করব না। ”

মেঘ মুখ গোমড়া করে বলল,
“সত্যি ই ওনি আমাকে বকা দেন। ”

“তুমি হয়তো খেয়াল করো না তবে আমি খেয়াল করেছি, বাসার মধ্যে ভাইয়া একমাত্র তোমার সাথে কথা বলার সময় ই মাধুর্য মিশিয়ে মনোরম কন্ঠে কথা বলে, তোমাকে দেখলেই ভাইয়ার ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠে। ”

“বলছে তোরে! ”

“আল্লাহ! বিশ্বাস করো না? তুমি আমাকে ভাইয়ার কথা বলছো পর থেকে আমি বিষয়টা গুরুত্ব দিয়ে খেয়াল করেছি৷ তোমার প্রতি ভাইয়ার অন্য লেবেলের টান আছে। ভাইয়াকে কিছু আনতে বললে ভাইয়া যতই ব্যস্ত থাকুক, তোমার কথা শুনা মাত্রই সব ব্যস্ততা সাইডে রেখে সাথে সাথে নিয়ে আসে৷”

মেঘ কপাল কুঁচকিয়ে বলল,
“ভাবের কথা বাদ দে৷ ”

“আমার ভাইয়ার এত কেয়ার তোমার কাছে ভাব মনে হয়? এমন করলে তোমাকে আমার ভাইয়ার বউ বানাবো না বলে দিলাম।”

“আর বউ! বাসার আর আবির ভাইয়ের যে অবস্থা, আমার ভালোবাসা কোনোদিন পূর্ণতা পাবে বলে মনে হয় না!”

“বললেই হলো। সত্যিকারে ভালোবাসা থাকলে পূর্ণতা পাবেই, ইনশাআল্লাহ। এখন তোমাকে যা বলছি তা করো, ঈদে ভাইয়াকে একটা পাঞ্জাবি গিফট সেটাতে অবশ্যই তোমার নাম থাকতে হবে। আগে আমাকে দেখিয়ে নিবা, বুঝছো? ”

“বুঝছি। কিন্তু পাঞ্জাবি কিনতে হবে তো, পাঞ্জাবির সাইজ জানি না তাছাড়া পাঞ্জাবি কিনবো কিভাবে?

“ভাইয়াকে দেখেছিলাম নিচে গেছে, তুমি এখন ভাইয়ার রুমে যাও, ভাইয়ার পাঞ্জাবি থেকে সাইজ টা দেখে আসো, আমি বাহিরে পাহারা দিব। ভাইয়া আসলেই তোমাকে ডাকবো। পরে আম্মুকে নিয়ে শপিং এ গিয়ে পাঞ্জাবি কিনে নিয়ে আসবো।”

“আচ্ছা, চল।”

আবির নিচে সোফায় বসে কফি খাচ্ছে আর ল্যাপটপে কাজ করছে, ইকবাল খান পাশের সোফায় বসে আবিরের সাথে অফিসের বিভিন্ন টপিক নিয়ে কথা বলছেন। মীম বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আবিরের দিকে নজর রাখছে, মেঘ আবিরের রুমে ঢুকে ওয়ারড্রবে পাঞ্জাবি খোঁজছে৷ আবির কাজের ফাঁকে হঠাৎ উপরে হালকা তাকাতেই মীম থতমত খেয়ে পেছনে সরে গেছে। মীমের এমন কান্ডে আবির কপাল কুঁচকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালো। কিছু একটা ভেবেই আবির বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। ইকবাল খান স্বাভাবিক কন্ঠে বললেন,
“কোথায় যাচ্ছিস?”

“আসছি একটু।”

“তাড়াতাড়ি আসিস, কাজ শেষ করতে হবে।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ আসছি এখনি ”

আবির তড়িঘড়ি করে উপরে উঠছে৷ আবিরের ভয়ে মীম আর নিচে দেখতেই পারে নি। আচমকা আবিরকে বেলকনিতে দেখে মীম আঁতকে উঠল। গলা থেকে কোনো কথায় বের হচ্ছে না, মেঘকে ডাকতেও পারছে না। আবির বড় বড় কদম এগিয়ে এসে ভারী কন্ঠে শুধালো,
“এখানে কি করছিস?”

মীম এপাশ ওপাশ মাথা নেড়ে বুঝালো,”কিছু না”

আবির ফের বলে উঠল,
” যা এখান থেকে। ”

মীম বার বার পেছন ফিরে তাকাচ্ছে, আবিরের তপ্ত দৃষ্টির ভয়ে মেঘকে আর ডাকতে পারছে না। আবির পুনরায় বলল,
“কি হলো?”

মীম মাথা নিচু করে দৌড়ে চলে গেছে। আবির রুমের দরজা চাপিয়ে নিচে গিয়েছিল, এখন দরজা কিছুটা খোলা দেখেই অনুমান করতে পারছে রুমে কেউ আছে। আবির দরজা থেকে রুমে চোখ বুলালো। হঠাৎ আবিরের নজর স্থির হলো, মেঘ আবিরের রুমের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। আবির ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল সেদিকে। বেলকনিতে আবির আর মীমের কথোপকথন শুনেই মেঘ তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবি লুকিয়ে কি করবে বুঝতে না পেরে বারান্দায় চলে গেছে। আবির গুরুতর কন্ঠে শুধালো,
” আমার রুমে কি করছিস?”

মেঘ নিশ্চুপ থেকেই আবিরের পাশ কেটে চলে যেতে নিল। আবির আবারও প্রশ্ন করল,
” আমার রুমে কেন আসছিলি? তাও আবার পাহারাদার রেখে?”

মেঘ ভয়ে ঢোক গিলে ধীর কন্ঠে বলল,
“এমনি আসছিলাম। ”

মেঘ চলে যেতে নিলেই আবির মেঘের হাত চেপে ধরে। মেঘ আতঙ্কিত নয়নে তাকিয়ে বলল,
“ছাড়ুন, যাবো।”

” রুমে কেন আসছিলি সেটা বল,তাহলে ছেড়ে দিবো।”

মেঘ আমতা আমতা করে বলল,
“আপনারা রুমে আসা কি নিষেধ? ”

“নিষেধ কেন হবে, তোর যখন ইচ্ছে রুমে আসবি কিন্তু পাহারাদার কেন বাহিরে থাকবে? কি করতে আসছিলি বল”

“চুরি করতে আসছিলাম, হয়েছে!”

আবির অন্যমনস্ক হয়ে বলল,
” আর কি চুরি করার বাকি আছে?”

“মানে?”

আবির মেঘের হাত ছেড়ে মুচকি হেসে বলল,
” আমার রুমে কি এমন জিনিস আছে যা তোর চুরি করে নিতে হয়, তোর কি লাগবে নিয়ে যা। ”

মেঘ মনে মনে বিড়বিড় করে বলল,
“সম্পূর্ণ আপনি টা কেই আমার লাগবে, কিভাবে নিব বলুন।”

আবির কিঞ্চিৎ হেসে বলল,
” কি হলো? কিছু খোঁজে পাচ্ছিস না?”

মেঘ কপাল গুটিয়ে রিনিঝিনি হেসে আবিরের দিকে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বলল,
” আমি যা নিতে চাই তা আপনাকে দেখিয়ে নিতে পারবো না৷ ”

আবির চোখ বড় করে সম্পূর্ণ রুমে নজর বুলিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
” তাহলে কি আমি ঘুমালে নিতে পারবি?”

মেঘ ছোট করে ভেংচি কেটে বিড়বিড় করতে করতে চলে যাচ্ছে, আবির ঠোঁট কামড়ে হাসছে। মেঘ দরজা পর্যন্ত গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। কয়েক পা পিছিয়ে দরজার পাশে দেয়ালে তাকালো। দেয়ালে একটা হাতের ছাপ দেখে মেঘের নজর স্থির হলো, সরু নেত্রে খেয়াল করল, হঠাৎ মনে পরে গেল প্রায় ২-৩ মাস আগে রুমে রঙ করার ঘটনা। ভেজা রঙে মেঘের হাতের ছাপ পরেছিল, সেই ছাপ শুকিয়েছে বহুদিন আগেই৷ দরজার আড়ালে ছিল বলে আজ পর্যন্ত মেঘের চোখে পরে নি। আজ দরজাটা চাপানো ছিল বিধায় মেঘের নজর আটকেছে। মেঘ আবিরের দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
” এই দাগ টাতে রঙ করান নি কেন?”

মেঘের কন্ঠে আবির পেছন ফিরে তাকিয়েছে, মেঘের দৃষ্টি খেয়াল করে নিজেও সেদিকে তাকালো। আবির মুখের ভঙ্গি স্বাভাবিক রেখে বলল,

” লোকের কি খেয়ে কাজ নেই, তুই নষ্ট করবি আর তারা বার বার রং করবে!”

“বার বার করবে কেন? একবার ই তো নষ্ট করেছি তাও পরে গেছিলাম বলে ।”

আবির উদাসীন কন্ঠে বলল,
” বেরঙিন জীবনে রুমে রঙ করে আর কি হবে?”

মেঘ প্রখর নেত্রে আবিরের দিকে তাকিয়ে অকস্মাৎ বলে উঠল,
” আমার কাছে রঙ আছে, আমি এখনি নিয়ে আসছি। হাতের ছাপ মুছে সুন্দর ডিজাইন করে দিব। ”

আবির বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
” যেভাবে রুমে আসছিলি সেভাবে বেড়িয়ে যা, আমার রুম যেমন আছে তেমনই থাকবে, মাতবরি করে নষ্ট করতে হবে না ”

মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে মৃদুস্বরে বলল,
“বিশ্বাস করুন নষ্ট করব না। সুন্দর লাগবে। ”

আবির রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“মেঘ, কথা বললে কথা শুনবি না?”

“শুনবো। ”

“তাহলে যা এখান থেকে। আমার অনুমতি ব্যতীত আমার রুমের কোনো জিনিস যদি এদিকসেদিক হয়, সেই কাজ যেই করে থাকুক না কেন, তার দায়ভার কিন্তু তোর হবে। সো বি কেয়ার ফুল। ”

মেঘ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। নিচ থেকে ইকবাল খান আবিরকে ডাকছেন। আবির এগিয়ে গিয়ে মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে অনুগ্র কন্ঠে বলল,
” সারারাত ভাবেন, আগামীকাল আমার রুমের দুটা দেয়াল আপনাকে ডিজাইন করে দিতে হবে। ডিজাইন ভালো না হলে…. ”

“….না হলে কি?”

“সেটা না হয় কালকেই বুঝাবো। ”

আবির রুম থেকে বেরিয়ে গেছে। মেঘ দেয়ালের হাতের ছাপের দিকে একবার তাকালো, আবার পাশের দুটা দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখলো। তারপর রুম থেকে বেড়িয়ে সোজা মীমের রুমে ঢুকলো। মীম বিছানায় বসে চোখ বন্ধ করে, “আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও” বলতেছে।

মেঘ মীমকে আলতো চাপড় মেরে বলল,
“আমাকে বিপদে ফেলে নিজে বাঁচাও বাঁচাও করছিস। লজ্জা লাগে না তোর?”

” লজ্জার যেমন বয়স নাই তেমনি মা-ইর খাওয়ারও বয়স নাই৷ ভাইয়া যেভাবে তাকাইছিল, ভয়েই আমার গলা শুকিয়ে গেছিল। তোমাকে কিভাবে ডাকবো! কথায় আছে, জান বাঁচানো ফরজ৷ ”

মেঘ রাগী ভাব নিয়ে বলল,
” তুই বিপদে পড়লে আমিও বলল, জান বাঁচানো ফরজ৷ ”

মীম আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
“আপু….. সরি”

মেঘ ভেঙচি কেটে চলে গেছে। মীম পেছন পেছন আপু আপু ডাকছে।

#চলবে