#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮৭
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
তানভির চোখ ছোট করে গম্ভীর কণ্ঠে জানতে চাইল,
“আমি পস্তাবো কেনো?”
মেঘ এপাশ ওপাশ মাথা দুলিয়ে আস্তে করে বলল,
“বলবো না।”
“না বললে যেতে দিব না কিন্তু। ”
মেঘ চুল উড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে যেতে মেকি স্বরে বলল,
“তুমি যে ভেটো দিবে এটা আমি আগে থেকেই জানতাম। তাই গতকাল রাতেই বড় আব্বু, আব্বু, কাকামনি, বড় আম্মু, আম্মু, কাকিয়া এমনকি আবির ভাইয়ের থেকেও অনুমতি নিয়ে ফেলেছি। কোথায় বিচার দিতে যাবে, যাও।”
মেঘ এক প্রকার নাচতে নাচতে রুমে চলে গেছে। মীম ও তার পিছু পিছু ছুটলো। তানভির রাগে কটমট করছে। ইদানীং মেঘের দুষ্টামির মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে, একা সামলানো যাচ্ছে না। মেঘ আগেও দুষ্টামি করতো তবে লিমিটেড। আবির আসার পর মেঘ অনেকটায় শান্ত হয়ে গিয়েছিল। আবিরের সাথে মনোমালিন্যের কারণে ৮-৯ বছর কথা হয় নি বলে সেই দূরত্ব টা কমাতে একটু সময় লেগেছে। এডমিশন টেস্ট আর আবিরের প্রেমে হাবুডুবু খেতে খেতে দুষ্টামির চিন্তা মাথায় ই আসে নি। এখন সেই দুষ্টামির ভূত টা আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আবির কোনো কারণে অভিমান করলেও মেঘের সামনে সেই অভিমান ১ মিনিটের বেশি টিকতেই পারে না। আবির যতক্ষণ না হাসবে ততক্ষণ পর্যন্ত মেঘের আজগুবি কথাবার্তা চলতেই থাকে। গতকালও তেমনটায় ঘটেছে। মেঘের একা ঘুরতে যাওয়ার ব্যাপারে আবির রাজি ছিল না তাই আবিরকে রাজি করাতে মেঘকে বহু কাঠখড় পুড়াতে হয়েছে। এক পর্যায়ে “তেলাপোকার আর্তনাদ” গল্প শুনিয়ে আবিরকে পটিয়ে ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি নিয়েছে। তবে অবশ্যই শর্তসাপেক্ষে। আবির মেসেজে তিন পাতার এক লিস্ট পাঠিয়েছে যেখানে কি করা যাবে না, কি করা যাবে, কিভাবে চলতে হবে সব নির্দেশনা দেয়া। মেঘ সব শর্ত মেনেই রাজি হয়েছে।
মেঘ আর মীম রেডি হতে রুমে চলে গেছে। তানভির আবিরকে কল দিয়ে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“ভাইয়া, তোমার কলিজাকে আমি আর সামলাতে পারছি না। সে এখন আমার কলিজা ছিদ্র করে ফেলতেছে।”
আবির মৃদু হেসে বলল,
“আর তো কয়েকটা দিন। একটু সহ্য করে নে।”
“তুমি নাকি ঘুরতে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছো?”
“কি করবো বল! এমন ভাবে আবদার করে যে না করতে পারি না।”
“কোথায় যাবে কিছু বলছে?”
” বন্যা, মিনহাজ ওদের সাথেই বের হবে বললো।”
” আমি নিয়ে গেলে কি হতো? ইদানীং মনে হয় দুই বান্ধবীর মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। ভার্সিটিতে কেউ কারো সাথে কথা বলে না। গত দুদিন বন্যা ভার্সিটিতেও আসে নি। কল দিলাম রিসিভও করে নি। আজ আবার ঘুরতে যাচ্ছে বিষয়টা ঠিক ভালো লাগছে না।”
” তুই ওদের চিনিস না? মনোমালিন্য থাকলেও দেখবি আজকে ঠিক মিলে গেছে। ”
“সেটাও ঠিক। আচ্ছা, পরে কথা হবে। ”
“ওকে। ”
৩ টার দিকে মেঘ আর মীম সেদিনের কেনা ড্রেস পড়ে সেজেগুজে বেরিয়েছে। তানভির সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে আছে কিন্তু কিছু বলছে না। মেঘ যেতে যেতে তানভিরের দিকে তাকিয়ে জিভ বের করে ভেঙচি কাটলো৷ তানভির চোখ রাঙাতেই মেঘ দাঁত কেলিয়ে চলে গেছে। বাসার সামনে থেকে রিক্সা করে দুই বোন গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিল। ফোনের লোকেশন দেখে মিনহাজদের দেয়া ঠিকানা পর্যন্ত পৌঁছেছে। বন্যারা আগে থেকেই সেখানে উপস্থিত। মিনহাজ আর তামিম কাছেই একটা বাসায় থাকে। সেখান থেকে একটা টেবিল এনে একটা খালি জায়গায় রেখে তারউপর কেক এর বক্স রেখেছে। আজ তামিমের মিথ্যা জন্মদিন, সেই উপলক্ষে ই এই আয়োজন। গত পাঁচদিনে বন্যার সাথে মেঘের ফোনে কথা হয় নি বললেই চলে৷ ক্লাসে দেখা হলেও মেঘ সারাক্ষণ শুধু ভাইয়ের বিয়ে নিয়েই বকবক করেছে৷ গত দুদিন বন্যা ক্লাসেও আসে নি৷ বন্যার ব্যাপারে কথা বলার জন্য গত পরশুদিন বন্যার অনুপস্থিতিতে মিনহাজদের সাথে আলোচনায় বসেছিল মেঘ। মেঘের প্ল্যান জানিয়ে সবার মতামত নিয়ে সবকিছু রেডি করেছে। এমনকি মিনহাজদের থ্রেট ও দিয়েছে যেন আবির বা তানভির কিছু জানতে না পারে৷ সেদিন ই মিনহাজদের আনব্লক করে ফেসবুকে এড করে ওদের দিয়ে একটা গ্রুপ খুলিয়েছে। সেখানে গত দুদিনে মেঘ আর মীম যা যা করেছে সব আপডেট দিয়েছে। এমনকি গতকাল বিকেলে মীম, আদি আর মেঘ মিলে তানভিরকে জোর করে ফেসিয়াল করিয়েছে সেই ছবি তুলেও গ্রুপে দিয়েছে। বন্যা সব মেসেজ দেখলেও কোনো রিপ্লাই করে নি। তানভিরের ফেসিয়ালের ছবি দেয়ার পর থেকে বন্যা নেটেও নেই। মেঘ সন্ধ্যার পর মিষ্টিকে দিয়ে বন্যার নাম্বারে কল দিয়েছিল। ২-৩ বার কল দেয়ার পর বন্যার বোন কল রিসিভ করে জানিয়েছে বন্যার ১০৪° ফা জ্বর। রাতে মিষ্টি আরও ২-৩ বার কল দিয়ে খোঁজ নিয়েছে কিন্তু মেঘ একবারও কল দেয় নি। আজ দুপুরে মিনহাজ বন্যাকে কল দিয়ে খোঁজ খবর নিয়েছে। বন্যার শরীরে তখনও জ্বর ছিলই তবে কম। মিনহাজ তামিমের জন্মদিনের কথা জানিয়ে খুব জোরাজোরি করে রাজি করেছে সাথে এটাও বলেছে যেন মেঘের দেয়া ড্রেস টা পড়ে আসে৷ বন্যা তখন জিজ্ঞেস করেছিল,
“আমি যে অসুস্থ এটা কি মেঘ জানে?”
মিনহাজ স্বাভাবিক কন্ঠে উত্তর দিয়েছিল,
“জানলেই বা কি মেঘের এখন তোর কথা ভাবার সময় আছে নাকি। সে তার ভাবিকে নিয়ে ব্যস্ত৷ ”
বন্যা আর কিছু না বলেই কল কেটে দিয়েছিল। শুধুমাত্র বন্ধুদের কথা ভেবে শরীরে জ্বর নিয়েও বন্যা আসছে। মেঘ দু’হাত পেছনে রেখে সোজা টেবিলের কাছে দাঁড়ালো। মীম মেঘের পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে সালাম দিয়ে বন্যাকে উদ্দেশ্য করে জিজ্ঞেস করল,
“বন্যাপু তুমি কি অসুস্থ?”
বন্যা উত্তর দেয়ার আগেই মেঘ মীমের দিকে তাকিয়ে রাগী স্বরে বলল,
” তুই কি বন্যার খোঁজ নিতে আসছিস? যার জন্মদিন তাকে উইশ কর।”
মীম আস্তে করে বলল,
“সরি। ”
মীম পরপর মিনহাজের দিকে তাকিয়ে বলল,
“Happy birthday Tamim Vaiya”
মিনহাজ হেসে বলল,
“আমি তামিম না, মিনহাজ।”
“জানি। এখন আমি কি করব? ”
“না মানে আমার দিকে তাকিয়ে উইশ করলা তাই বললাম। ”
“ইচ্ছে করেই করেছি।”
“মানে?”
মীম মেকি স্বরে শুধালো,
“আজ কার জন্মদিন ?”
মীম মনে মনে বিড়বিড় করল,
“জন্মদিনের নামগন্ধ নেই উইশ নিয়ে পড়ে আছে।”
তামিম কথা কাটিয়ে বলল,
“আরে বাদ দে। জন্মদিন যার ই হোক কেক সবাই মিলে খাবো।”
বন্যা চাপা স্বরে বলল,
“তাড়াতাড়ি কর। বাসায় যেতে হবে।”
তামিম তপ্ত স্বরে বলল,
“বাইকে আসার সময় ছু*রি টা রাস্তায় পরে ভেঙে গেছে। মেঘকে বলছিলাম ছু*রি নিয়ে আসতে৷”
মেঘকে উদ্দেশ্য করে শুধালো,
“ছু*রি আনছিস?”
মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে পেছন থেকে এক হাত সামনে এনে টেবিলে রাখতেই মিনহাজ চেঁচিয়ে উঠলো,
“তোকে কেক কাঁটার প্লাস্টিকের ছু*রি আনতে বলেছিলাম। তুই মানুষ কাঁ*টার ছু*রি নিয়ে আসলি কেন?”
মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে থেকেই উত্তর দিল,
“কোন কাজে লাগে বলা যায় না।”
তামিম চোখ বড় করে বলল,
“ভাবি আমাদের সেই মুডে আছে। আজ এসপারওসপার করেই ছাড়বে।”
বন্যা ঢোক গিলে শান্ত স্বরে বলল,
“ওর মুডে থাকার দিন, ও তো মুডেই থাকবে। কেক কাটলে কাট না হয় আমি চলে যাব।”
মেঘ ছু*রি টা এপাশ ওপাশ ঘুরিয়ে কাঠের টেবিলের মাঝ বরাবর ছু*রিটা কুপতে কুপতে রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিল,
“আজ এখানে আমি ছাড়া কারো কথা চলবে না।”
মেঘের এমন আচরণে বন্যা সহ সবাই কেঁপে উঠলো। মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে ধীর কন্ঠে বলল,
” তোকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিচ্ছি, আমার সাথে নাটক করার চেষ্টাও করবি না। তালবাহানা করলে একদম মে*রে গাছতলায় ফেলে চলে যাব৷”
বন্যা ভ্রু গুটিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“কি হয়েছে তোর?”
স্নিগ্ধ শীতল হাওয়া বইছে, মেঘ টেবিলের পাশ কাটিয়ে বন্যার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। মেঘের দু হাত পেছনে। মিষ্টি ফোন বের করে ভিডিও অন করলো। বাকিরা উৎসুক দৃষ্টিতে মেঘকে দেখছে। মেঘের বিধ্বংসী মনোভাব দেখে বন্যা কিছুটা ভীত হয়ে আছে। মেঘ রক্তিম আকাশের পানে তাকিয়ে উষ্ণ নিঃশ্বাস ছেড়ে বন্যার অভিমুখে তাকিয়ে বলতে শুরু করলো,
“আমার হৃদয়ের সবটুকু জুড়ে যাদের অস্তিত্ব আছে তাদের মধ্যে তুই একজন। আমার প্রাণচঁচল্যে তোর অবস্থান রক্তিম অরুণের মতোন। তুই পাশে আছিস বলে আমি বারংবার ভেঙেচুরে নবরূপে রাঙিয়েছি নিজেকে। তোর প্রতি আমার বিশ্বাস সুবিশাল সমুদ্রের গভীরতায় ন্যায় দৃঢ়। তোকে বন্ধু হিসেবে পেয়ে আমার প্রাপ্তির খাতা পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। আমি জানি, তুই নিজের থেকেও বেশি আমায় ভালোবাসিস আর আমার থেকেও বেশি ভালোবাসিস আমার ভাইকে। তুই বুঝতেও পারছিস না, তানভির ভাইয়ার জন্য তোর বুকের বা পাশে বিদ্যমান ৩০০ গ্রামের হৃদপিণ্ডটা প্রতিনিয়ত ঠিক কতটা অস্বাভাবিকভাবে স্পন্দিত হচ্ছে। ভাইয়ার তমসাচ্ছন্ন ক্ষয়িষ্ণু হৃদয়ের একগুচ্ছ আতশবাজি তুই, বিষাদে ন্যস্ত অভিপ্রায়ের একমাত্র প্রণয়িনী তুই।ভাইয়ার বেপরোয়া জীবন নবলব্ধে সাজানোর উত্তমা উপদেষ্টা হবি তুই। কথা দিচ্ছি, ভাইয়ার জীবনে অদ্বিতীয়া হয়ে থাকবি সারাজীবন।”
বন্যা হতবিহ্বল। দৃষ্টি নিরেট। বন্যার নিস্তব্ধ আঁখি যুগল মেঘের অভিমুখে স্তব্ধ হয়ে আছে। মেঘ হাঁটু গেড়ে বসে পেছন থেকে গোলাপ ভর্তি হাত সামনে এনে বন্যার দিকে ধরে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মোলায়েম কণ্ঠে শুধালো,
” তুই কি ভাইয়ার কল্পনার রাজ্যের কল্পতরু হবি? তার সঙ্কীর্ণ সাম্রাজ্যের মহারানী হবি?”
বন্যার চোখ টলমল করছে। জ্বরের ঘোরে ভার হয়ে থাকা মাথাটা অনবরত ঘুরছে। মসৃণ গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরতে বেশি সময় লাগল না। গত পাঁচদিন গুমরে গুমরে অনেক কেঁদেছে যেটা বন্যার চোখ মুখ দেখলেই বুঝা যায়। বন্যার দুচোখ বেয়ে অনর্গল পানি পরছে। মেঘ মীমের দিকে তাকিয়ে গুরুভার কন্ঠে বলল,
“তোকে কি দাওয়াত দিয়ে আনতে হবে?”
মীম থতমত খেয়ে বলল,
“সরি, সরি। তোমার কথা শুনে টাশকি খেয়ে ফেলছিলাম।”
মীম এগিয়ে এসে মেঘের পাশে হাঁটু গেড়ে বসে সেই ফুলের তোড়ায় হাত রেখে দু’জন একসঙ্গে উচ্চস্বরে বলে উঠল,
“আপনি কি আমাদের ভাবি হবেন? তানভির খানের একমাত্র বউ হবেন?”
বন্যার শরীর কাঁপছে। ভেজা চোখে মেঘ আর মীমের দিকে তাকিয়ে আছে। তামিম রাশভারি কন্ঠে বলল,
“বন্যা ভাবি তাড়াতাড়ি রাজি হোন, নয়তো মেঘ ভাবির মাথা আবারও গরম হয়ে যাবে।”
বন্যা সবার দিকে তাকালো। মিনহাজ, তামিম, সাদিয়া একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। মিষ্টি একায় ভিডিও করছে। বন্যা পুনরায় মেঘদের দিকে তাকালো। মেঘ স্ট্রং থাকলেও মীম এক পায়ের উপর নিজের ভর রাখতে না পেরে মেঘের উপর হেলে পড়ছে। মেঘ তড়িঘড়ি করে চেঁচিয়ে উঠল,
“আরে বেডি তাড়াতাড়ি হ্যাঁ বল, পড়ে যাচ্ছি তো।”
বন্যা ফুল ধরতে ধরতে বিহ্বলতায় উত্তর দিল,
” ইনশাআল্লাহ, তোমাদের ভাবি হবো আমি।”
ততক্ষণে মীমের শরীরের ভরে মেঘ মাটিতে পরে গেছে, মীম মেঘের উপর পরছে৷ বন্যার একহাতে ফুল অন্যহাতে মেঘের ঘাড়ে ধরে আটকাতে গিয়ে নিজের ওড়নায় টান খেয়ে বন্যাও মেঘদের উপর পরছে। বন্যা তখনও একহাতে মেঘের কাঁধ আঁকড়ে ধরে আছে যেন মাথায় চাপ না খায়। মিষ্টির ভিডিও তখনও চলমান। সাদিয়া, তামিম দ্রুত এগিয়ে গেছে৷ সাদিয়া মীমকে টেনে তুলেছে৷ মীমের পায়ে অল্প চাপ খেয়েছে তাই ব্যথায় আর্তনাদ করছে। মিষ্টি মিনহাজকে ফোন দিয়ে তাড়াতাড়ি মেঘ আর বন্যাকে টেনে তুলেছে। ব্যথা পেয়েছে যেমন তেমন নতুন জামাগুলোতে মাটি আর ময়লা লেগে যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে গেছে। মিনহাজ, তামিম আর সাদিয়া হাসতে হাসতে একদম বসে পরেছে। মিনহাজ হাসতে হাসতে বলল,
“আমার জীবনে দেখা সেরা প্রপোজ। সারাজীবন মনে থাকবে। দেখবি তোদের ননদ ভাবির সম্পর্ক সারাজীবন এমনই থাকবে। যাই করতে যাবি একটা করে অঘটন ঘটাবি। ”
মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
” চুপ থাক নয়তো তোর মুখে কসটেপ লাগায় দিব।”
মেঘ বন্যার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
“সরি, তুই ভাইয়াকে ভালোবাসিস এটা তোকে বুঝাতে পাঁচদিন তোর সঙ্গে খুব বাজে ব্যবহার করেছি। সরি বেবি ”
বন্যা কোনো কিছু না বলে আচমকা মেঘকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। কান্না ভেজা দুচোখ বেয়ে আবারও পানি ঝরছে। মেঘও বন্যার পিঠ বরাবর দুহাত পেঁচিয়ে ধরেছে। বন্যা এবার হাউমাউ করে কান্না শুরু করেছে। এত বছরের বন্ধুত্বে বন্যাকে কখনো এভাবে কাঁদতে দেখেনি মেঘ। বরাবরই চুপচাপ আর শান্তশিষ্ট থাকে, কাঁদলেও কখনো কারো সামনে কাঁদে না অথচ আজ সেই মেয়ে খোলা আকাশের নিচে অবাধে কেঁদে চলেছে। মেঘ শীতল কন্ঠে বলল,
” সরি তো। প্লিজ এভাবে কান্না করিস না। আমি জানতাম তুই ভাইয়াকে ভালোবাসিস কিন্তু তোকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলে তুই কখনোই স্বীকার করতি না তারজন্য আমাকে এসব করতে হয়েছে। প্লিজ সরি।”
বন্যা কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট কন্ঠে বলতে শুরু করল,
“আমি বুঝতেও পারি নি কবে আমি ওনাকে এত বেশি ভালোবেসে ফেলেছি। তুই সেদিন ঐ মেয়ের ছবি দেখানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারি নি, খেতে পর্যন্ত পারি নি। আমার নিঃশ্বাস নিতে পর্যন্ত কষ্ট হচ্ছিলো। সারাক্ষণ মনে হচ্ছিল আমি সব হারিয়ে ফেলছি। কি যেন নেই আমার৷ চারপাশ শূন্য লাগছিল আমার৷ আমি ওনাকে অনেক ভালোবাসি বেবি৷ ”
মেঘ বন্যাকে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দুচোখ মুছে শান্ত কন্ঠে বলল,
” আমার ভাবি হতে তুই সত্যি রাজি তো ? ”
বন্যা মলিন হেসে বলল,
“রাজি। কিন্তু… ”
মেঘ স্বাভাবিক কন্ঠে জানতে চাইল,
“কিন্তু কি?”
“তুই যে বলছিলি আজ মেয়ে দেখতে যাবি?”
” লে হালুয়া! তুই কি ছেলে নাকি?”
বন্যা শ্বাস ছেড়ে রাগী স্বরে বলল,
“দূর ফাজলামো করিস না। ঐ মেয়েটা কে ছিল?”
“আমি চিনি না। ফেসবুকে পেয়েছিলাম। ”
“ফাজিল মেয়ে। কিন্তু বললি যে তোর ভাই রাজি?”
“ওমা। ভাইয়া তোকে লাভ করলে রাজি হবে না?”
“তোর ভাই আমায় পছন্দ করে?”
“নাহ। ডিরেক্ট ভালোবাসে। ”
“তোকে বলছে?”
মেঘ বিষন্ন চিত্তে তাকিয়ে বলল,
“বললে আজ আমাদের জায়গায় ভাইয়া থাকতো আর আমরা ক্যামেরাম্যান থাকতাম। বুঝলি? অনেক চেষ্টা করার পরও ভাইয়া যখন কিছু বলছিল না তখন বাধ্য হয়ে আমাকে এই পথ বেঁচে নিতে হয়েছে। ভাইয়া কবে বলবে সে আশায় থাকলে আমি মরে ভূ*ত হয়ে যেতাম। তার থেকে নিজের মনের ভাব প্রকাশ করে ফেললাম।”
মেঘ একটু থেমে আবার বলে উঠল,
“আবির ভাইয়ের মতো ডায়লগ দেয়,
তোকে বৌমনি ডাকার জন্য যদি অধিকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয় তবে আমি সেই অধিকারনামায় স্বাক্ষর করে হলেও তোকে বৌমনি ডাকবো৷ তুই আমার ভাবি মানে আমার ই ভাবি। পৃথিবীর কেউ তোকে আমার ভাবি হওয়া থেকে আটকাতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। ”
বন্যা আনমনে হেসে বলল,
“ইনশাআল্লাহ। ”
মীম এক পা ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে মেঘদের কাছে আসতে আসতে বলল,
” বন্যাপু, আমি যে তোমার ছোট ননদ এটা কি তোমার মনে আছে?”
বন্যা আলতোভাবে মীমকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
“ওলে সোনা। তুমি আমার কিউট ননদী, তোমাকে আমি কিভাবে ভুলবো বলো। ”
মেঘ ভেঙচি কেটে বিড়বিড় করে বলল,
“আজ কিউট না বলে।”
মিনহাজ ঠাট্টার স্বরে বলে উঠল,
” আপনি কিউট না বলেই একজন নিজের জান জীবন দিয়ে আপনাকে আগলে রাখে। আপনার দিকে কেউ নজর দেয়ার আগেই আধমরা করে ফেলে। আপনাদের মুখে এসব সাজে না ভাবি। বরং আমি আর তামিম এসব বললে মানা যেতো। ”
তামিম পাশ থেকে বলল,
“সহমত বন্ধু।”
বন্যা হঠাৎ জিজ্ঞেস করল,
“তামিমের না জন্মদিন? কেক কাটব না?”
মেঘ ভেঙচি কেটে বলল,
” আমার ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ করে আসছি কি তামিমের জন্মদিন করতে নাকি?”
মেঘ নিজের হাতে বক্স থেকে কেক বের করল। কেক এর উপর লেখা,
প্রিয় বন্যা,
“ভাবি হবি?”
হ্যাঁ/হ্যাঁ
মেঘ বলল,
” দুটা অপশন দিলাম যেকোনো একটা বেছে নিতে পারিস। ”
“এখানে দুটা অপশন? ”
” অবশ্যই। একটা আমার অপশন আরেকটা মীমের অপশন। ”
কেক কেটে খেয়ে সবাইকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের উদ্দেশ্যে রওনা দিল৷ সন্ধ্যার আগে আগে বাসায় না গেলে নিশ্চিত বকা খাবে। রেস্টুরেন্টে বন্যা আর মেঘ পাশাপাশি বসে খাচ্ছে আর ফিসফিস করে গল্প করছে। মেঘ সবার উদ্দেশ্যে হুঙ্কার দিল,
” আমার ভাই কিংবা আমার ওনার কানে যদি আজকের ঘটনার একাংশ যায় তাহলে তোদের সাথে চিরদিনের জন্য বন্ধুত্ব ভেঙে দিব। আর বন্যা, তোকেও সাবধান করছি। তুই আমাদের ভাবি কিন্তু তানভির ভাই এর প্রেমিকা না। ভাইয়া প্রপোজ না করা পর্যন্ত তুই যদি কোনো প্রকার আলগা পিরিত দেখাস তাহলে তোকেও দেখে নিব।”
“ঠিক আছে। তাড়াতাড়ি কর। জ্বর বাড়তেছে, শরীর খারাপ লাগছে। বাসায় চলে যাব।”
“রিক্সা দিয়ে এতদূর গেলে আরও বেশি কষ্ট হবে। দাঁড়া ভাইয়াকে কল দিচ্ছি।”
“এই না না, প্লিজ। ওনাকে কল দিস না।”
“চুপ করে বসে থাক। আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে বউ বানানোর যোগ্যতা না থাকলে বিয়ে কিভাবে দিব?”
মেঘ তানভিরকে কল দিয়ে আসতে বলেছে। তানভিরও চটজলদি রেডি হয়ে রওনা দিয়েছে। ওদের খাওয়া শেষ হতে হতে তানভির চলে আসছে। সবার থেকে বিদায় নিয়ে তানভিরের সামনে আসতেই তানভির পর পর তিনজনের দিকে তাকালো। তিনজনের জামার অবস্থা দেখে তানভির গম্ভীর কন্ঠে শুধালো,
“তোরা কি ফুটবল খেলতে গেছিলি?”
মেঘ একটা বক্সে “হ্যাঁ” লেখা একটুকরো কেক তানভিরের মুখের সামনে ধরে বলল,
“এটা পুরস্কার। এবার হা করো”
“কিসের পুরস্কার? আর কেকে হ্যাঁ লেখা কেনো?”
“তুমি আমাদের ভালোবাসো না?”
“হ্যাঁ”
“এটায় লেখা। এখন হা করো।”
তানভির হা করতেই মেঘ কেক মুখে দিয়ে অস্থির হয়ে বলল,
“এখন চলো আমার বেবি অসুস্থ। ”
মেঘ আর মীম দ্রুত গাড়ির দিকে চলে গেছে। বন্যার মাথা ঘুরছে তবুও আস্তে করে পা বাড়ালো। তানভির উদ্বিগ্ন কন্ঠে জানতে চাইলো,
“কি হয়েছে তোমার?”
“জ্বর।”
জ্বর শব্দটা কানে বাজতেই তানভির এগিয়ে এসে বন্যার কপালে হাত রাখলো। সঙ্গে সঙ্গে বন্যার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। মেঘ আর মীম দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে মেঘ দ্রুত দু হাতে মীমের চোখ ঢেকে মেকি স্বরে বলল,
” রোমান্টিক সীন দেখার বয়স হয় নি তোর। ”
তানভিরের পেশিবহুল হাতে নজর পড়তেই বন্যা চোখ নামিয়ে আতঙ্কিত কন্ঠে বলল,
“হাত সরান।”
“হাত সরাবো কেনো? এত জ্বর নিয়ে বাহিরে ঘুরছো কোন সাহসে? আর হাতে এত ফুল কেনো? কে দিয়েছে? কেক ই বা কিসের ছিল?”
বন্যা কি বলবে বুঝতে না পেরে আস্তে করে বলতে নিল,
“তামিমের..”
এটুকু বলতেই তানভির কপাল থেকে হাত সরিয়ে চিৎকার করল,
“তামিম তোমায় ফুল দিয়েছে? ”
“না না।”
“তাহলে কে দিয়েছে?”
“মেঘ। ”
“সত্যি তো?”
“বিশ্বাস না হলে মেঘকে জিজ্ঞেস করুন।”
“বনুকে জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন নেই। ডাক্তার দেখিয়েছিলে?”
“না। ঔষধ খেলেই কমে যাবে।”
তানভির অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
” এই মেয়ে তুমি এত কেয়ারলেস কেনো? সেদিন যে বললাম প্রেশার কম, খাওয়াদাওয়া করতে ঠিক মতো৷ কথা মানলে না কেনো? উল্টো জ্বর বাঁধিয়েছো। ”
বন্যা কিছু না বলে মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছে। তানভির পেছন পেছন গজগজ করতে করতে যাচ্ছে,
“কল দিলে কল রিসিভ করে না, কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না, নিজের যত্ন পর্যন্ত নেয় না। এর থেকে রোবটও শতগুণে ভালো। ”
বন্যা সামনে যেতে যেতে তানভিরের কথা শুনে মুচকি হাসলো। বন্যাকে ডাক্তার দেখিয়ে, ঔষধ আর কিছু ফল কিনে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে তারপর ওরা বাসায় আসছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে মেঘ মাগরিবের নামাজ পড়েই ঘুমিয়ে পরেছে। ফোন টেবিলের উপর সাইলেন্ট অবস্থায় পড়ে আছে। আবির সন্ধ্যার পর সবার সাথে কথা বলার সময় মেঘের সাথে কথা বলতে চেয়েছিল, কিন্তু মেঘ আশেপাশে নেই শুনে তেমন জোরও করে নি। কিন্তু মেঘের সঙ্গে কথা বলার জন্য মনটা ছটফট করছে। মেঘদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে তানভির একটা কাজে শহরের বাহিরে গেছে আগামীকাল ফিরবে। মেঘের সাথে কথা বলার জন্য দুই তিনবার আম্মু, মামনির নাম্বারে কল দিয়েছে কিন্তু মেঘের কথা বলতে পারছে না। কাকিয়ার ফোন প্রায় সময় মীমের কাছে থাকে সেই ভেবে কাকিয়াকেও কল দিয়েছে কিন্তু আজ ফোন কাকিয়ার কাছেই। আবির এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে ফুপ্পিকে কল দিল। ফুপ্পি এশার নামাজ পড়ছেন তাই জান্নাত ফোন রিসিভ করে সালাম দিল৷ জান্নাতের কন্ঠ বুঝতে পেরে আবির সালামের উত্তর দিয়ে স্বাভাবিক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
” কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো তবে রেগে আছি। ”
“কেনো আপু?”
“ভাইয়া, আজ আমি তোমার ভাবি হিসেবে কথা বলছি।”
“জ্বি ভাবি বলুন।”
জান্নাত মনমরা হয়ে বলল,
“আমাদের বিবাহ বার্ষিকীতে মেঘকে আসতে দিলে না কেনো? আম্মুকে দিয়ে তোমাকে কতগুলো কল দিলাম, আমি নিজে দিলাম, তানভির ভাইকে পর্যন্ত কতগুলো কল দিয়েছি। এটা কি তুমি ঠিক করলে?”
আবির মুচকি হেসে বলল,
“আমি চিন্তা করেছি, আমার বউকে এখন থেকে একা কারো বাসায় যেতে দিব না। একা একা ঘুরলে আমার কথা ভুলে যাবে। এইযে আজ, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে বেড়িয়ে সারাদিনেও আমার খোঁজ নেয় নি।”
“একদম ঠিক করেছে। এত বউ পাগল যেহেতু বউকে নিয়েই চলে যাইতা।”
“আমি তো নিয়ে আসতাম ই। কিন্তু আপনার মামা শ্বশুর মানে আমার আব্বাজান শুনলে হার্ট অ্যাটাক করে ফেলবেন এই ভয়ে আনতে পারি নি। ”
“মেঘের আব্বু শুনলে মনে হয় হার্ট অ্যাটাক করতো না?”
“জ্বি না। আমার শ্বশুর অনেক স্ট্রং আর ওনাকে যদি আজ বলি মেয়েকে পাঠিয়ে দিতে ওনি এক কথায় রাজি হয়ে যাবেন। ”
জান্নাত উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
” সত্যি? মেজো মামা জানে? তুমি বলে ফেলছো?”
“আমি বলি নি কিন্তু ওনি রাজি। ”
“এটা আবার কেমন কথা?”
“এটা এমন ই কথা। সেসব বাদ দেন। এখন আমার বাসায় ফোন দিয়ে আমার বউটাকে ঘুম থেকে উঠিয়ে আমাকে কল দিতে বলুন। বউকে খুব মিস করছি। ”
“আমাকে এসব বলতে তোমার লজ্জা লাগছে না?”
“আপনি বললেন আজ আপনি আমার ভাবি৷ তাই দেবর হিসেবে ভাবির কাছে আবদার করায় যায়। রাখছি এখন।”
“আচ্ছা। ”
জান্নাত যথারীতি হালিমা খানকে কল দিয়ে মেঘের সাথে কথা বলার নাম করে মেঘকে ঘুম থেকে তুলে আবিরের কথা বলেছে। মেঘ তড়িৎ বেগে উঠে ওয়াশরুম থেকে চোখমুখে পানি দিয়ে এসে আবিরকে কল দিল। আবির অডিও কল কেটে ডিরেক্ট ভিডিও কল দিল। মেঘ ঘুম ঘুম চোখে তাকিয়ে সালাম দিল। আবির সালামের উত্তর দিয়ে তপ্ত স্বরে বলল,
” কারো কি আমার জন্য বিন্দুমাত্র চিন্তা হয়?”
“সরি ঘুমিয়ে পরেছিলাম।”
“আমিও সরি। ঘুম ভাঙানোর জন্য। ”
মেঘ মুচকি হেসে বলল,
” আপনার এই পরিবর্তনের পেছনে নিশ্চিত কোনো রহস্য আছে৷ কি রহস্য বলুন তো। ”
আবির লাজুক হেসে বলল,
” আমি বলুম না আমার শরম করে।”
মেঘ চক্ষু যুগল প্রশস্ত করে বলল,
“আপনার শরমও আছে?”
আবির উত্তর না দিয়ে মেঘের দিকে নিষ্পলক চোখে তাকিয়ে আছে। মেঘ বার বার ডাকছে কিন্তু আবিরের নজর স্থির৷ মেঘ এবার রাগী স্বরে বলল,
” এভাবে তাকিয়ে আছেন কেনো?”
” আপনার যেহেতু মনে হয় আমি নির্লজ্জ তাই আজ থেকে আমি নির্লজ্জের মতো আচরণ করব।”
মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে আছে। আবিরের দৃষ্টি মেঘকে বরাবরই নাজেহাল করে সেই সঙ্গে আবিরের উল্টাপাল্টা কথাতে মেঘ এখন হতবিহ্বল।
আবির খানিক চুপ থেকে মোলায়েম কন্ঠে শুধালো,
” শুনলাম কোথায় পরে গিয়ে জামাকাপড় নষ্ট করে আসছিস। শরীরে ব্যথা পেয়েছিস?”
“না। তেমন ব্যথা পায় নি। কোমড়ে একটু লাগছে।”
“কি করতে গেছিলি?”
“একটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করতে গেছিলাম। কাউকে বলা যাবে না।”
“আমাকেও বলা যাবে না?”
“আপনাকে অবশ্যই বলবো। কিন্তু এখন না প্লিজ। আপনি দেশে ফিরলে আপনাকে সারপ্রাইজ দিব।”
” এখন কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে।”
আবিরের মুখের অপ্রত্যাশিত কথা শুনে মেঘ বাগাড়ম্বরপূর্ণ হয়ে গেছে। গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে বলল,
” ওহ নো। আপনি আমায় ভয় পান? কতটা?”
আবির ভ্রু কুঁচকে চাপা স্বরে বলল,
” আপনাকে না আপনার কর্মকাণ্ডকে ভয় পায়।”
#চলবে
#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৮৮
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_
আবিরের আদুরে ভঙ্গির কথোপকথন শুনে মেঘ লজ্জায় নুইয়ে পড়ছে মুখ দিয়ে আর কোনো কথায় বের হচ্ছে না। মেঘের দুগাল লাল হয়ে গেছে, নাকের ডগায় ঘাম জমে চিকচিক করছে। অডিও কলে আর মেসেজে মেঘের কথার রাজত্ব চললেও ভিডিও কলে আবিরের সাথে কথা বলতে মেঘের হিমসিম খেতে হয়। গত দেড় বছরে আবির যতটা ভদ্র থাকার চেষ্টা করেছে, এই দুই তিনমাসে ভদ্রতার সেই মুখোশ সরে গেছে। সব বিধিনিষেধ ভুলে মেঘকে আপন করার এক বিচিত্র প্রচেষ্টা চলছে। আবিরের অব্যক্ত দৃষ্টি সর্বক্ষণ কিছু ব্যক্ত করতে চাই। আর সেই অবাঁচ্ছিত দৃষ্টিতেই মেঘ বারংবার ঘায়েল হয়। আবিরের সাথে যতবার কথা হয় কল কাটার আগে মেঘের শেষ কথা থাকে,
“I Miss You”
আবিরকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কল কাটে প্রতিবার। মেঘের এমন কর্মকাণ্ডে নিঃশব্দে হাসা ছাড়া আবিরের আর কিছুই করার থাকে না।
রাত ১১ টার দিকে তানভির বন্যার নাম্বারে কল দিল। আজ প্রথম কলটায় রিসিভ হলো। বন্যা মৃদু স্বরে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম ”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। জ্বর কমেছে?”
“কিছুটা।”
” ঔষধ খেয়েছো?”
“জ্বি। আপনি খেয়েছেন?”
“না।”
বন্যা উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলে উঠল,
“এত রাত হয়ে গেছে এখনও খান নি কেনো?”
“একটা কাজে শহরের বাহিরে আসছিলাম। অনেক রাত হয়ে গেছে তেমন দোকানপাট খোলা নেই। দু-একটা খোলা আছে কিন্তু খাবারের মান তেমন ভালো না। তাই খেতে ইচ্ছে করে নি।”
“সারারাত না খেয়ে থাকবেন?”
” তুমি হঠাৎ আমার খাবার নিয়ে এত চিন্তা করছো কেন? ঘটনা কি?”
“আমার সামান্য জ্বর দেখেই আপনি সন্ধ্যায় যেভাবে ডাক্তার দেখাতে উতলা হয়ে গিয়েছিলেন। তখন কি আমি কিছু বলেছি?”
“এটাকে সামান্য জ্বর বলে না বন্যা৷ ১০৩-১০৪° ফা জ্বর কখনোই স্বাভাবিক না। তার থেকেও বড় কথা এত জ্বর নিয়ে তুমি ঘুরতে বের হলে কোন বিবেকে? এই তোমার ম্যাচিউরিটি?”
“আমি কখন বললাম আমি ম্যাচিউর? তাছাড়া আজ না বের হলে হয়তো জীবনের সেরা মুহুর্তটা মিস করতাম। ”
“মানে? কিসের সেরা মুহুর্ত?”
“তেমন কিছু না তবে অনেক কিছু।”
” বনুর মতো তুমিও শুরু করো না প্লিজ। এমনিতেই খায় নি মাথা ঘুরছে তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে এখন ই বেহুঁশ হয়ে যাব। কি হয়েছে বলো, প্লিজ।”
বন্যা ফিসফিস করে বলল,
“আপু আসছে, বাই।”
বন্যা কল কেটে দিয়েছে। তানভির থম মেরে বসে আছে। একটু পর আবিরকে মেসেজ দিল, খানিক বাদেই আবিরের কল আসছে৷ রিসিভ করতেই আবির বলল,
” তোকে আমি একটা কাজ দিয়েছিলাম তা না করে এত রাতে কার সাথে কথা বলছিস?”
তানভির স্বাভাবিক কন্ঠে জানালো,
” বন্যার সাথে কথা বলছিলাম আর তোমার কাজ শেষ করেই কথা বলছি। আমি তো তোমার মতো না যে সব কাজ ফেলে বউয়ের সঙ্গে প্রেম করতে লেগে যাব। দূর! বেশি কিছু বলতেও পারি না কারণ বোনটাও আমার ই।”
আবির ঠাট্টার স্বরে শুধালো,
“এত রেগে আছিস কেন? কি হয়েছে ভাই..! ”
“রেগে থাকব না? একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনায় বসছি, সবকিছু ফাইনাল। তোমার সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য জাস্ট কল দিয়েছি। দুমিনিটের আলাপ সেখানে তুমি আমার কল তো রিসিভ করলাই না উল্টো আমায় ব্লক করে দিলা? এখন আবার আমায় বলতে আসছো, আমি কাজ ফেলে কার সঙ্গে কথা বলি? বাহ ভাই!”
আবির স্বভাব-সুলভ গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“প্রেমের সময় যারা বাগড়া দেয় তারা মানুষরূপী আগাছা। বুঝলি?”
“আমি আগাছা হলে তুমিও আগাছা। আমার প্রেমের সময় তুমিও বাগড়া দিয়েছো।”
“একদম না। আমি একবার কল দিয়ে ওয়েটিং পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে কল কেটে দিয়েছি। আর একটা কলও দেয় নি। তুই কথা শেষ করে মেসেজ দিয়েছিস তারপর আমি কল দিয়েছি। আর তুই? আমি বার বার কল কেটে দিচ্ছিলাম তারপরও তুই কল দিয়েই যাচ্ছিলি।”
“হয়েছে হয়েছে! আমি মানছি আমি আগাছা। শুধু তুমি না, সবার জীবনেরই আগাছা আমি। বেকুবের মতো এক মেয়ের প্রেমের প্রস্তাবে রাজি হয়ে বাসার সবার চোখে আগাছা হয়েছি, ঐ মেয়ের জন্য নিজের পড়াশোনা ধ্বংস করেছি। রাজনীতির নামে মুখোশধারী মানুষের সাথে প্রতিনিয়ত বাকবিতন্ডায় জড়াচ্ছি। এখন একজনকে মন থেকে ভালোবাসি কিন্তু তার জীবনেও আমি ভিলেন পদে আছি। আহারে! আগাছাময় জীবন আমার।”
আবির মোলায়েম কন্ঠে বেশ কিছুক্ষণ বুঝানোর চেষ্টা করলো। তানভিরের সভাপতি নির্বাচনের এক বছর কেটে গেছে। তিনবছরের কমিটি এই এক বছরেই তছনছ হয়ে গেছে। কমিটির সদস্যের ঐক্যবদ্ধ জোট ভেঙেছে আরও ৩-৪ মাস আগে। সহ সভাপতি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আর সাংগঠনিক সম্পাদকদের একের পর এক দ্বন্দ্বে প্রতিনিয়ত হিমসিম খাচ্ছে তানভির। স্থানীয় নেতা সহ এমপি, মন্ত্রীরাও সমস্যা সমাধান করতে পারছেন না৷ মিটিং এ সব মেনে নিলেও সুযোগে একজন আরেকজনের মা*থা ফা*টাতে ব্যস্ত। তানভিরের সঙ্গে কারো পার্সোনাল শত্রুতা নেই ঠিকই কিন্তু চোখের সামনে নীতিবিরোধী কর্মকাণ্ড সহ্যও করতে পারছে না। সেই সঙ্গে বন্যাকে নিয়ে আছে তার সুদূর চিন্তাভাবনা। বন্যার পরিবারে বন্যার বাবা সরকারি চাকরিজীবী, বড় বোনও তাই। এমনকি বন্যার আত্মীয়স্বজন বেশিরভাগ ই সরকারি চাকরিজীবী। বন্যার আপুর জন্য সরকারি চাকরিজীবী ছেলে খোঁজা হচ্ছে। সেখানে বন্যা তার বোনের থেকেও বেশি ব্রিলিয়ান্ট, দেখতে শুনতে মাশাআল্লাহ তাই স্বাভাবিকভাবেই বলা যায় বন্যাকে বিয়ে করার জন্য তানভিরের বিন্দুমাত্র যোগ্যতাও নেই। বন্যাদের বংশের কেউ কখনো রাজনীতি করে নি। সেখানে তানভিরদের বাসায় স্বয়ং আলী আহমদ খান এককালে এলাকার সুপরিচিত রাজনীতিবিদ ছিলেন। গ্রামের বাড়িতে এখনও অনেকে ওনাকে নেতা হিসেবেই চিনেন। পারিবারিক ও ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে একসময় রাজনীতি ছেড়ে, গ্রামের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ঢাকায় চলে আসেন৷ হয়তো বাবার রক্তের টানে কলেজ জীবনে আবিরও টুকটাক রাজনীতিতে জড়িয়েছিল তবে পুরোপুরি জড়ানোর আগেই কলেজের এক স্যার আবিরকে বুঝিয়ে রাজনীতির চিন্তা ছাড়িয়ে পড়াশোনার প্রতি মনোযোগী করেন। আব্বু আর স্যারের কথা মেনে আবিরও রাজনীতি নিয়ে তেমন ভাবে নি। কিন্তু তানভির আবিরের মতো না, ঐ মেয়ের কারণে বাসায় যখন ঝামেলা হয়েছিল তখন ২-৩ নেতা আলী আহমদ খান ও মোজাম্মেল খানকে বাজে কথা বলেছিলেন। সেখান থেকেই তানভিরের ভেতর জেদ কাজ করে আর সে রাজনীতি করার সিদ্ধান্ত নেয়। রাজনীতি করতে না দিলে পড়াশোনা করবে না বলে হুমকি পর্যন্ত দিয়েছিল।তখন বয়স কম ছিল আর তানভির এতটায় জেদি ছিল যে আবিরও তাকে মানাতে পারে নি তাই বাধ্য হয়ে তানভিরকে বেশ কিছু শর্ত দিয়ে আবির রাজি হয়েছিল। কয়েকবছরেই তানভিরের মন উঠে গেছে। একদিন কথায় কথায় মেঘের মুখে শুনেছে বন্যার রাজনীতি একদম পছন্দ না তাই ইদানীং তানভিরের মাথায় ভূত চেপেছে সে রাজনীতি ছেড়ে পড়াশোনা করবে, চাকরি নিয়ে বন্যাকে বিয়ে করবে। একটা সময় তানভিরের রাজনীতির জন্য আবিরকে প্রচুর বকা খেতে হয়েছিল তবে এখন সবাই মোটামুটি স্বাভাবিক। তানভিরকে নিয়েও কারো কোনো মাথা ব্যথা নেই অথচ তানভির হুট করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে এই অমার্জিত রাজনীতি আর করবে না। যেখানে এক কমিটির অন্তর্ভুক্ত সদস্যরা নৈতিকতা ভুলে একে অপরের সঙ্গে দাঙ্গায় জড়াতে পারে সেই নোংরা রাজনীতিতে তানভির থাকবে না। এমপি তানভিরের সঙ্গে কথা বলে বুঝানোর চেষ্টা করেছেন কিন্তু সে তার জেদ থেকে এক চুলও নড়বে না। আবিরকে কল দেয়ায় আবিরও নিরেট কন্ঠে বলেছিল,
” আমার ভাই যা বলবে তাই হবে। আমি আমার ভাইকে খুব ভালোবাসি। ও যখন যা চেয়েছে আমি তাই দিয়েছি, ও রাজনীতি করতে চেয়েছে আমি তাতেও সাপোর্ট করেছি আর এখন সে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাতেও সাপোর্ট করবো। কারণ আমি আমার ভাইকে কারোর প্রতিহিংসার আগুনে জ্বলতে দেখতে পারবো না। অতি সামান্য একটা বিষয় নিয়ে কমিটিতে যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়েছে তার প্রভাব যে আমার ভাইয়ের উপর পরবে না তার কি গ্যারেন্টি আছে? আজ নয়তো কাল কেউ যে আমার ভাইয়ের উপর অ্যাটাক করবে না তার কি নিশ্চয়তা আছে?”
এমপি আবিরকে বুঝাতেও ব্যর্থ হয়েছেন। ওনাদের ইচ্ছে ছিল তানভিরকে সভাপতি পদে রেখে, বাকি কিছু সদস্য যুক্ত করে জেলাভিত্তিক নতুন করে কমিটি গঠন করে ফেলা। কিন্তু তানভির রাজি না থাকায় নতুন করে আবারও সবকিছু করতে হবে সেসব ভেবেই সবাই কিছুটা চিন্তিত৷ আগামী সপ্তাহে মিটিং ডাকা হয়েছে, সেদিন সবকিছু ঠিকঠাক হলে কমিটি ঠিক থাকবে না হয় অফিসিয়ালি কমিটি বাতিল করা হবে।তানভিরের সেসবে চিন্তা নেই। আর তানভিরকে ব্যস্ত রাখতে আবির ইচ্ছে করেই অফিসের কাজ সহ বেশকিছু কাজের জন্য তানভিরকে চাপে রাখছে।
★
দুপুর থেকে রাকিবের ফোনে রিয়া আর জান্নাত এক নাগাড়ে কল দিয়েই চলেছে। বাধ্য হয়ে ৪ টা নাগাদ রাকিব অফিস থেকে বেড়িয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল৷ রিয়া আজ সারাদিন ধরে মেঘের জন্য রান্না করেছে। সেগুলোই রাকিবকে দিয়ে পাঠাবে। রিয়ার সঙ্গে সঙ্গে জান্নাতও বায়না ধরেছে মেঘের জন্য খাবার পাঠাবে। রাকিব এর কিছুই জানতো না। অফিস থেকে এসে এতো আয়োজন দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে। কারণ জিজ্ঞেস করায় রিয়া বলেছে মেঘের আব্বু বিয়েতে রাজি সেই খুশি তাদের সামান্য আয়োজন। আবিরের আব্বু রাজি হলে বিশাল আয়োজন করবে। রিয়ার কথা শুনে রাকিব রীতিমতো আশ্চর্যান্বিত হয়েছে। মেঘের আব্বু আবির-মেঘের সম্পর্কে রাজি এটা রাকিব জানে না অথচ রিয়া -জান্নাত জানে এটা ভেবেই হতাশ হচ্ছে। ফ্রেশ হয়ে আবিরকে কল দিল। আবির কল রিসিভ করতেই রাকিব বলল,
” ভালোই তো। আজ শ্বশুরকে রাজি করিয়ে ফেলেছিস কাল বাপকেও রাজি করিয়ে ফেলবি। পরশু বউকে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমাবি। এদিকে তোর যে রাকিব নামের একটা বন্ধু ছিল সেটা বেমালুম ভুলে যাবি। বন্ধুত্বের সম্পর্কও ভেঙে দিবি।”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,
” ৭ বছরের দূরত্বে যে বন্ধুত্ব ভাঙে নি, ৫ মাসে সে বন্ধুত্ব কি ভাঙবে? আর শ্বশুর রাজি এটা তোকে কে বলছে?”
“জান্নাত আর রিয়া বললো। তারা এই খুশিতে সারাদিন ব্যাপী রান্না করছে তোর বউকে খাওয়ানোর জন্য। ”
“মানে কি এসবের?”
“মানে রাখ। আগে বল তোর শ্বশুর কি আসলেই রাজি? কথা বলছিস তুই?”
“তুই কি পাগল হয়ছিস? এখন কথা বললে উপায় আছে? একদিন রিয়েক্ট করেই চিন্তায় আছি, রাগে ৬ মাসের হুমকি তো দিয়েছি ঠিকই কিন্তু মানলে বিশ্বাস। কবে না সব ভুলে বিয়ের আলোচনা শুরু করে দেন। আর এখন যদি এখান থেকে আমি এই কথা তুলি দেখা যাবে কাল সকালেই মেয়ের বিয়ের জন্য তোরজোর শুরু করে দিবেন। ”
“জান্নাতকে কি বলছিস তাহলে?”
“জান্নাতের সাথে মজা করছি। সে কাল ভাবির মতো আচরণ করেছে তাই আমিও দেবরের মতো দুষ্টামি করেছি৷ পুরোটা দুষ্টামি ছিল এমনটা নয় কারণ আমার শ্বশুরের এমন আচরণ আমাকেও বেশ ভাবাচ্ছে। ”
“কেনো কি হয়েছে?”
” আমি রাগ করে বাসা থেকে চলে যাওয়ার পর থেকে চাচ্চু অনেক শান্ত হয়ে গেছেন। মেঘের বিয়ের জন্য নিজেই উঠেপড়ে লেগেছিলেন আবার নিজেই চুপ হয়ে গেছেন৷ এমন কেনো করল আমি জানি না তবে সন্দেহ করছি। এত বছর আব্বুর সাথে আমার রেগুলার কথা হতো। চাচ্চুর সাথে ৭ দিনে ১ দিন কিংবা ১৫ দিনে একদিন ২ মিনিটের জন্য কথা হতো। অথচ এবার আমি এখানে আসার পর থেকে আব্বুর থেকে বেশি চাচ্চুর সাথে কথা হচ্ছে। রেগুলার দু’বেলা করে ওনি নিজেই ফোন দেন। এমন না যে শুধু প্রজেক্টের জন্য ওনি চিন্তিত। এমনিতেই খোঁজ নেন, কি করছি, খাচ্ছি কি না ঠিকমতো, কবে ফিরব, শরীর ঠিক আছে কি আরও অনেককিছু। আগে যেসব কথা আব্বু বলতো সে সব কথা এখন চাচ্চু বলেন। ওনার এমন আচরণে মাঝে মাঝে মনে হয়, আমি আসার সময় ওনার মেয়েকে সাথে নিয়ে আসছি। ওনার মেয়েকে যেন সুখে রাখি, তার সাথে যেন ভালো ব্যবহার করি সেজন্য দুবার করে ফোন দিয়ে এলার্ট করেন। ”
“ভালোই তো। ওনি রাজি থাকলে তোর টেনশন ই করতে হবে না।”
আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারী করে বলতে শুরু করল,
“ভাই ওনাকে আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করি না। হতেও পারে ৬ মাসের হুমকির জন্য এখন কিছুটা শান্ত আছেন। শুনেছি আব্বুর সাথে ঝামেলা হয়েছে, তারজন্য হয়তো কিছুদিন চুপচাপ আছেন। যতদিন না বাসর করতে পারছি ততদিন পর্যন্ত আমি কাউকে বিশ্বাস করি না৷ বাসর রাতের পরদিন বলতে পারব, আমার শ্বশুর আমাকে মেনে নিয়েছে কি না!”
রাকিব মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
“রিয়া আর জান্নাত যে খুশির ঠ্যালায় এতকিছু রান্না করল এখন কি আমিই খেয়ে ফেলব এসব?”
“সোজা আমাদের বাসায় নিয়ে দিয়ে আসবি। আমার বৌয়ের ভাগ থেকে একটা কিছু কমলে তোর কপালে শনি আছে। ”
রাকিব মুচকি হেসে বলল,
” তুই এখনও আগের মতোই আছিস। মেঘকে নিয়ে সামান্য একটু মজা করলেও যেভাবে রিয়েক্ট করিস আমার ভয় ই হয়। যেদিন বাসায় মেঘের কথা বলবি সেদিন ঠিক কি হবে!”
“কি আর হবে। আব্বুরা উল্টাপাল্টা করলে মেঘের হাত টা ধরে সোজা বাসা থেকে বেরিয়ে যাব।”
“মেঘ যেতে না চাইলে?”
“কোলে নিয়ে চলে যাব।”
” এটায় তো চাই। মেঘকে নিয়ে সোজা আমাদের বাসায় চলে আসিস।”
“সেসব পরে দেখা যাবে। এখন রাখি। বের হতে হবে। ”
“আচ্ছা ঠিক আছে। ”
রাকিব আর আরিফ খাবার নিয়ে একসঙ্গে মেঘদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। গেইটের ভেতর খোলা জায়গায় মীম আর আদি ক্রিকেট খেলছিল। মেঘও এতক্ষণ এখানেই ছিল কেবল ই ভেতরে গেছে। আদি বোলিং করছে আর মীম ব্যাটিং করছে। রাকিবের হাতে সব খাবার, ভেতরে ঢুকে আদিদের খেলতে দেখে তাড়াতাড়ি চলে গেছে। পেছনে ছিল আরিফ। গেইটের ভেতরে পা রাখতেই বল এসে ঠাস করে ঠোঁটে উপর লাগছে। একটুর জন্য নাকটা বেঁচে গেছে। আরিফ ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল, মাথা চক্কর দিয়ে উঠেছে। এদিকে মীম ব্যাট ফেলে দৌড়। আদি কি করবে বুঝতে না পেরে মেঘকে ডাকতে ছুটলো। আরিফ চোখে অন্ধকার দেখছে, ব্যথা সহ্য করতে না পেরে এখানেই বসে পরেছে। রাকিব ভেতর থেকে আরিফকে দুবার ডেকেওছে। কিন্তু মালিহা খানের সাথে কথা বলায় ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় বেড়িয়ে এসে দেখতে পারে নি। আদি মেঘকে বলতেই মেঘ দ্রুত ছুটে আসছে। ততক্ষণে আরিফ কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। কিন্তু দাঁতে আর মাড়িতে চাপ খাওয়ায় রক্ত বের হচ্ছে । মেঘ দৌড়ে এসে আরিফকে তুলে সাপ্লাই এর কাছে নিয়ে গেছে। চোখে-মুখে পানি দিয়ে আরিফকে ভেতরে নিয়ে গেছে। মেঘ ফ্রিজ থেকে বরফ বের করে ঠোঁটের উপর লাগাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই জায়গাটা ফুলে গেছে। মীম বেশকিছুক্ষণ পর নিচে আসছে। শীতল চোখে আরিফের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্য সময় ইচ্ছেকৃত ব্যথা দিলেও মীম আজ ইচ্ছেকরে কিছু করে নি৷ মীম ভেবেছিল রাকিব ভাইয়া একায় এসেছেন তাই রাকিব ভেতরে চলে যাওয়ায় আবার খেলতে শুরু করেছিল। মীম আর আদি চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, রাকিব আরিফের পাশে সোফায় বসে আছে। আলী আহমদ খান বাসায় ফিরে আরিফের অবস্থা দেখে চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,
“কি হয়েছে তোমার?”
আরিফ সত্যি কথা বলতে গিয়েও থেকে গেল। মীমের শীতল চোখদুটো আর অসহায়ের মতো চাহনি দেখে আরিফ আস্তে করে বলল,
“তেমন কিছু না বড় মামা।”
আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,
” বসো। আমি আসছি।”
মীম ভয়ে আরও বেশি সিঁটিয়ে গেছে। বড় আব্বু জোর গলায় জিজ্ঞেস করলেই আরিফ বলে দিবে। বড় আব্বু জানতে পারলে ওদের যে কি হাল করবে সেই ভেবেই মীমের হাত পা কাঁপছে। কিছুক্ষণ পর তানভির আসছে। রাকিব তানভিরের সাথে কথা বলতে তানভিরের রুমে চলে গেছে। মেঘ রান্নাঘরে শরবত করছে আর মালিহা খান ওদের জন্য নাস্তা রেডি করছেন। মীম সেখান থেকে এক গ্লাস শরবত নিয়ে আরিফের কাছে গেল৷ মীম চোখ নামিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,
“সরি, আমি আপনাকে সত্যি দেখি নি। হুট করে এসে ঢুকেছেন আর বলটাও সেসময় ই লেগেছে।”
আরিফ অগ্নিদৃষ্টিতে তাকিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে
বলল,
” আমি জানি তুমি ইচ্ছে করে এমন করেছো। আমি তোমার কি ক্ষতি করেছি যে তুমি সবসময় আমার সাথে এমন আচরণ করো।”
মীম ধীর কন্ঠে বলল,
” আপনি বিশ্বাস করুন, আমি ইচ্ছে করে এমনটা করি নি। ”
“মিথ্যাবাদী মেয়ে৷ চুপ করো। বড় মামা আসলে আমি সব বলে দিব।”
মীমের এবার রাগ উঠে গেছে। হাতে থাকা গ্লাসের সবটা শরবত শেষ করে গ্লাস রাখতে রাখতে রাগান্বিত স্বরে বলে,
“আপনি আমায় ভয় দেখাচ্ছেন? কি ভাবছেন আমি খুব ভীতু? একদম না। আমি কাউকে ভয় পায় না। আমার কারণে ব্যথা পেয়েছেন তাই মানবতার খাতিরে সরি বলতে আসছিলাম। এখন বুঝতে পারছি আপনি এই সরির যোগ্য ই না। ”
মীম রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমে চলে গেছে। আরিফ আর রাকিব নাস্তা করে সন্ধ্যার আগে আগে বেরিয়েছে। এরমধ্যে রাকিবের ফোন দিয়ে রিয়ার সাথে ভিডিও কলে কথাও বলেছে মেঘ।
সন্ধ্যা পর আবিরকে একটা ছেলের ছবি পাঠিয়ে মেঘ মেসেজ দিয়েছে,
“ছেলেটা কেমন?”
“ভালো। কে?”
মেঘ পরপর একটা বিয়ের কার্ডের ছবি পাঠিয়ে মেসেজ দিল,
“আগামী শুক্রবার বিয়ে। আপনার দাওয়াত রইলো। চলে আসবেন। ”
“মানে? কার বিয়ে?”
মেঘ মুচকি হেসে লিখল,
“আমার।”
“মা*র্ডার করে ফেলবো।”
মেঘ কতগুলোর হাসির ইমোজি পাঠিয়ে লিখল,
“মা*র্ডার করতে হলেও আপনাকে আমার সামনে আসতে হবে। বিয়ের দিন দেখা হচ্ছে তাহলে।”
আবির এবার কল দিল। মেঘ ভয়ে কল রিসিভ করছে না কারণ কল রিসিভ করলেই বকা খেতে হবে। তিনবারের মাথায় বাধ্য হয়ে কল রিসিভ করল। আবির রাগান্বিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,
“ছেলেটা কে?”
“বয়ফ্রেন্ড।”
“কার?”
“আমা…”
“রাগাবি না আমায়। ছেলেটা কে বল।”
“বললাম তো বয়ফ্রেন্ড। ”
“কার?”
“আমার বান্ধবী মায়ার বয়ফ্রেন্ড। ”
” কার্ড কার?”
“মায়ার বিয়ে শুক্রবারে। সেটার ই কার্ড।”
” বার বার নিজের কথা বলছিলি কেনো?”
” আমার বিয়ের কথা শুনে কতটা খুশি হোন তাই দেখছিলাম।”
আবির জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“বিয়ে করার খুব ইচ্ছে তোর?”
“হ্যাঁ। অনেক ইচ্ছে। বিয়ে করলে সাজতে পারবো, ছবি তুলতে পারবো, অনেকগুলো শাড়ি হবে, ড্রেস হবে, কত কত গিফট পাবো। আহ! সবগুলো নিয়ে পালায় যাব।”
“মানে? কোথায় পালাবি?”
মেঘ ফিসফিস করে বলল,
“আমি তো বিয়ে করবো শুধু গিফট গুলোর জন্য। যা যা পাবো সব নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাব।”
“বাহ! অসাধারণ চিন্তাভাবনা আপনার। টাকা পাঠায় বিয়ের শপিং করতে করতে রুম ভরে ফেলুন তবুও মানুষের গিফটের আশায় বসে থাকিয়েন না। ”
“আপনি বুঝতে পারছেন না। বিয়ের জিনিসপত্র নিয়ে পালানোর মজায় আলাদা। ”
আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মনে মনে বিড়বিড় করল,
” জিনিসপত্র না নিলেও আপনাকে নিয়ে আমি পালাবো, এটা নিশ্চিত। ”
আবির কিছু বলছে না দেখে মেঘ মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“একটা কথা বলি?”
“হুমমম।”
” বলছিলাম… না থাক।”
“কি হয়েছে? বিয়েতে যেতে চাচ্ছিস? ”
মেঘ চোখ বড় করে ভীত কন্ঠে বলল,
” আসলে মায়া খুব জোর করছে। না করে দিব?”
“না করতে হবে না৷ যাস সমস্যা নেই।আর কে কে যাবে?”
“বন্যা ভা, মানে বন্যা, আমি, মীম, আর পাখি। তানভির ভাইয়া যেতে চাইলে যাবে। ভাইয়াকে আর আপনাকেও দাওয়াত দিয়েছে। ”
“সে আমাকে চিনে?”
“হুম।”
“আচ্ছা। যেখানেই যান সাবধানে থাকবেন।”
“জ্বি অবশ্যই। আল্লাহ হাফেজ।”
শুক্রবার মীম, মেঘ, বন্যাকে নিয়ে বিয়ে খেতে গেছে। পাখি আলাদাভাবে ওর হাসবেন্ডের সাথে গিয়েছে। মেঘ তানভিরকে যেতে বলেছিল এমনকি মায়া নিজেও ফোন দিয়ে তানভিরকে বলেছে কিন্তু তানভির যেতে রাজি হয় নি। ছোট বোনের বান্ধবীর বিয়েতে যাওয়াটা তানভিরের কাছে কেমন যেন লাগে। পাখির বিয়েতেও তানভির যায় নি৷ মেঘ, মীম আর বন্যা বিয়ে বাড়ি থেকে খাওয়াদাওয়া করে ঘুরে ফিরে বন্যাকে বাসায় দিয়ে সন্ধ্যার দিকে বাসায় পৌঁছেছে। আজ বাড়ির পরিবেশ অন্যরকম। আবির যাওয়ার এতদিন পর তিন ভাই একসঙ্গে বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন। তিনভাই সোফায় বসে চা খাচ্ছেন আর গল্প করছেন৷ মেঘ আর মীম একসঙ্গে সালাম দিল। মোজাম্মেল খান উঠে গিয়ে দু’জনের মাথায় হাত বুলিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে শুধালেন,
“কেমন আছিস তোরা?”
“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো৷ তোদের জন্য জামা নিয়ে আসছি। দেখ পছন্দ হয় কি না।”
মেঘ আর মীম জামা পেয়ে খুশিতে গদগদ হয়ে রুমে চলে গেছে। ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ পর নিচে এসে সবার সঙ্গে গল্প করতে বসেছে। গল্প কিছুই না। ওনারা কথা বলছেন মেঘ আর মীম বসে বসে শুনছে। তানভির ছাড়া এখানে সবাই উপস্থিত আছে৷ কিছুক্ষণ বাদে তানভিরও নিচে আসছে। অনেকদিন পর ভাইদের পেয়ে আলী আহমদ খান মন খুলে কথা বলছেন৷ মোজাম্মেল খান তানভিরের উদ্দেশ্যে শান্ত কন্ঠে শুধালেন,
“শুনলাম তুমি নাকি রাজনীতি করবে না?”
“জ্বি। ”
“হঠাৎ এই চিন্তা মাথায় ঢুকলো কিভাবে?”
“এমনিতেই। ”
মোজাম্মেল খান এবার হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
“লক্ষ্য স্থির না করলে জীবনেও কিছু করতে পারবে না। এইযে ভাই ভাই করো, ভাই এর থেকে কিছু তো শিখতে পারো। আমাদের কোম্পানির বেশিরভাগ দায়িত্ব একা সামলিয়েও নিজের কোম্পানি দাঁড় করে ফেলেছে। শুধু তাই নয় এই যে গত দুইমাস রাজশাহী আর চট্টগ্রাম ছিলাম। আমার তেমন কোনো কাজ ই করতে হয় নি। আবির অলরেডি সবকিছু গুছিয়ে রেখে গেছে। এমনকি ওখানে থেকেও প্রতিনিয়ত এখানের খোঁজ নিচ্ছে। আর তুমি কি করছো? একবার পড়াশোনা ছেড়ে দিছো, আবিরের কথায় এখনও নামমাত্র পড়াশোনা করছো, হুট করে রাজনীতির ভূত চাপছে মাথায় এখন আবার বলছো রাজনীতি করবা না। তুমি আসতে কি চাও? কি করবা জীবনে? এমন করলে কোনো মেয়ের বাবা তোমার কাছে মেয়ে বিয়ে দিবে?”
তানভির মনে মনে বিড়বিড় করছে,
” কোনো মেয়ের প্রয়োজন নেই আমার। শুধু বন্যা হলেই হবে। আমি পড়াশোনা করে সরকারি চাকরি নিয়ে বন্যাকে বিয়ে করবো।”
কিন্তু মুখ ফোটে কিছুই বলতে পারলো না। মোজাম্মেল খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
” যদি কিছু করতে না পারো কাল থেকে আমাদের অফিসেই যেও। বাবা-চাচার ব্যবসা যেহেতু আছে সেটার ই হাল ধরো। ”
আব্বুর কথা বলার ধরন মেঘের একদম সুবিধা লাগছে না। মেঘ তানভিরকে এক পলক দেখে নিল। তানভির মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আব্বু, বড় আব্বুর সামনে কথা বলার স্বভাব আবির, তানভির কারোরই নেই। মেঘ কপট রাগী স্বরে বলল,
“ভাইয়া অফিসে যাবে না। পড়াশোনা করে চাকরি নিবে।”
মোজাম্মেল খান মেকি স্বরে বললেন,
“তোমার ভাই করবে চাকরি! ”
মেঘের মন খারাপ হয়ে গেছে। তানভিরের দিকে তাকিয়ে আছে। নিজের উপর কনফিডেন্স নিয়ে বন্যাকে প্রপোজ করেছে মেঘ । বন্যার ইচ্ছা অনিচ্ছা সবটায় মেঘ জানে। বন্যার আব্বু স্ট্রং মেন্টালিটির মানুষ। ওনি যদি একবার মন স্থির করেন চাকরিজীবী ছাড়া মেয়ে বিয়ে দিব না তাহলে আর কোনোদিন ওনাকে রাজি করানো সম্ভব না। তাই আগে থেকেই ভাইকে প্রস্তুত করতে হবে। মেঘ তানভিরের দিকে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল,
” ভাইয়া চাকরিই করবে। ভাইয়াকে কেউ কিছু বলবা না। ভাইয়া ব্যবসা করবে না, চাকরিই করবে।”
তানভির বিষ্ময় চোখে মেঘের দিকে চেয়ে আছে। মেঘ ফোপাঁতে ফোপাঁতে রুমে চলে গেছে। মনের বিরুদ্ধে কিছু ঘটলেই অভিমানী মেঘের বুক খুঁড়ে কান্না আসে। মোজাম্মেল খান তানভির এর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“তোমাকে নিয়ে ওরা তোমার থেকেও বেশি কনফিডেন্ট। অথচ তুমি কি দাম দিচ্ছো? আবির নিজের কারণে আজ পর্যন্ত যতবার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তার থেকে কয়েক হাজার গুণ বেশি তোমার জন্য দাঁড়িয়েছে। আমার এই টুকু মেয়েটা পর্যন্ত তোমার জন্য কান্না করছে। তুমি কি এগুলো বুঝো? তোমার কি উচিত না ওদের মুখে একটু হাসি ফুটানো? ”
আলী আহমদ খান কোমল কন্ঠে বললেন,
“বাদ দে। বাসায় ফিরে ছেলেটাকে না বকলে কি তোর শান্তি লাগে না?”
মোজাম্মেল খান চিন্তিত স্বরে বললেন,
” তোমার তো চিন্তা নাই। একমাত্র ছেলে তাও আবার প্রতিষ্ঠিত। ”
“আবির কি তোর ছেলে না?”
“আবির আমার ছেলের মতো কিন্তু তানভির আমার ছেলে। ওর ভবিষ্যৎ নিয়ে আমাকেই ভাবতে হবে।”
আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
“ছেলেমেয়েদের মাঝে বিবাদ সৃষ্টি করিস না। আবির, তানভির, মেঘ, মীম,আদি প্রত্যেকে আমাদের সন্তান। কেউ কারোর থেকে বেশি আদরের না, সবাই সমান।”
বাকবিতন্ডা চললো বেশকিছুক্ষণ।আলী আহমদ খান তানভিরকে রুমে চলে যেতে বলেছেন।। এদিকে মেঘ কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পরেছে। তানভির ডাকতে এসে ঘুমাচ্ছে দেখে চলে গেছে, আবিরকেও জানিয়ে দিয়েছে।
রাত ১.৩০ নাগাদ মেঘের ফোন ভাইব্রেশন হচ্ছে। দুবার বাজতেই মেঘ ঘুমের মধ্যে কল রিসিভ করল। অপর পাশ থেকে আবিরের আতঙ্কিত কন্ঠস্বর আসলো,
“মেঘ”
“এই মেঘ, তুই ঠিক আছিস?”
আবিরের গলা কাঁপছে, কন্ঠস্বর ভেজা। মেঘ থতমত খেয়ে বলল,
“হ্যাঁ। আপনার কি হয়েছে?”
আবির কথা বলতে পারছে না৷ চাপা কান্নার শব্দ আসছে। মেঘ শুয়া থেকে উঠে বসে উদ্বিগ্ন কন্ঠে ডাকল,
“আবির ভাই। ”
একটু থেমে আবারও শুধালো,
“কি হয়েছে আপনার? কাঁদছেন কেনো?”
আবির কিছু না বলে কল কেটে দিয়েছে। মেঘ দ্রুত ওয়াশরুম থেকে মুখ ধৌয়ে এসে নেট অন করে তাড়াতাড়ি আবিরকে ভিডিও কল দিল। খানিক বাদে আবির কল রিসিভ করল। বৈদ্যুতিক বাতির আলোতে আবিরের রক্তাভ চোখে চোখ পড়তেই মেঘের শরীর কম্পিত হলো। ফ্যাকাশে চোহারা, গালে পানির দাগ, চোখের নিচ ভিজে আছে এখনও। লাইটের আলোতে চিক চিক করছে। মেঘ আর্তনাদ করে উঠল,
“কি হয়েছে আপনার?”
“জানি না।”
“ঘুমাইছিলেন?”
“হুমম।”
“বাজে স্বপ্ন দেখেছেন?”
“হুমমমম।”
“ভয় পাইছেন?”
আবির ভ্রু কুঁচকে মেঘের দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে উত্তর দিল,
“আর একটু হলে আত্মা টা বেড়িয়ে যেত।”
মেঘ নির্বোধের মতো আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ ঠোঁট বেঁকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
” আপনি না খুব সাহসী। এত ভয় পেলে হবে?”
আবির চোখ মুখে রাশভারি কন্ঠে জবাব দিল,
” পৃথিবীর সবার কাছে আমি সাহসী হলেও আমার মন জানে একজনের জন্য আমার হৃদপিণ্ড ঠিক কতটা দূর্বল। তার কিছু হলে আমি সত্যি ম*রে যাব।”
#চলবে