আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৯৩+৯৪

0
4585

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৯৩ [প্রপোজ স্পেশাল]
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

মেঘের হৃদয়ের অন্তঃস্থল অনবরত কম্পিত হচ্ছে। হৃদপিণ্ডের দিগবিদিক ছুটাছুটিতে শরীর জুড়ে অস্থিরতা কাজ করছে। চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে আবিরের ফোনের স্ক্রিনে দেখা নাম আর শ্রাবণের বৃষ্টিতে জলসিক্ত দুজনার ছবিটা। গত দুবছরে জমে থাকা প্রেমানুভূতিগুলো আজ যেন স্বস্তি পেল। মেঘ ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আনমনে ভেবে যাচ্ছে, ঠোঁটজুড়ে তার লাজুক হাসি লেগেই আছে। বন্যা মেঘদের বাসায় আসতে আসতে দুপুর হয়ে গেছে । অনেক দোকান ঘুরে মেঘের জন্য একটা নীল রঙের শাড়ি নিয়ে আসছে। বন্যা আসতেই মেঘ হুটোপুটি করে শাড়ি বের করে দেখতে লাগলো। মূলত সেদিন পার্কে শাড়ি পড়া মেয়েটাকে দেখার পর থেকেই মেঘের মনে সেটা স্থির হয়ে আছে। মেয়েটা অন্য রঙের শাড়ি পড়লেও মেঘ নীল রঙের শাড়ি পড়ছে। কারণ সাদা, কালো ব্যতীত আবিরের প্রিয় রঙের তালিকায় নীল রঙটায় আসে। তাছাড়া মেঘ আগেও খেয়াল করেছে, সে নীল রঙের জামা পড়লে আবিরের অভিপ্রায় সম্পূর্ণ বদলে যায়, অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে৷ তাই আজ ইচ্ছে করে নীল রঙের শাড়ি পড়ছে যেন আবির ভাই মেঘকে দেখে ফিদা হয়ে যায় আর মেঘ যা বলে সব মেনে নেয়।বন্যায় মেঘকে সাজিয়ে দিচ্ছে বিশেষ করে শাড়িটা বন্যায় পড়িয়ে দিচ্ছে। খুব ভালো না পারলেও বন্যা টুকটাক শাড়ি পড়াতে পারে। মেঘ হঠাৎ প্রশ্ন করল,
“ভাইয়া কল দিয়ে তোকে কি বলছে রে?”

“তোর ভাই তো অনেককিছু বলতে চাইছিল কিন্তু আমি সেসবে পাত্তা দেয় নি।”

“কেনো?”

“সেদিন আমার কল আবির ভাইয়া রিসিভ করার পরেই বুঝেছিলাম, আবির ভাইয়া তোর ভাইকে বলবে আর তোর ভাই আমাকে কল দিবেই দিবে। তাই আমি মনে মনে প্রশ্ন সাজিয়ে রেখেছিলাম। তোর সঙ্গে এত বছর যাবৎ চলছি আমি, আজ পর্যন্ত তোর ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত ওনাকে একা নিতে দেখি নি। প্রথম প্রথম ভাবতাম আবির ভাইয়া ওনার বেস্ট ফ্রেন্ডের মতো, বড় ভাইও তাই হয়তো বলেন বা জিজ্ঞেস করেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সেটা বাড়লো, আবির ভাইয়ার প্রতি তোর ক্ষোভ ছিল এতবছর তাই আমি তোকেও ঐভাবে কিছু বলি নি। তবে ইদানীং ওনার সাথে আমার বেশ কয়েকবার আলাদাভাবে দেখা হয়েছে, বিভিন্ন টপিকে কথা হয়েছে কিন্তু তোর টপিক আসলে ওনার মুখে আবির ভাইয়ার নাম এমনিতেই চলে আসে। ভাইয়া বলেছে এটা করতে, ভাইয়া এটা করতে বারণ করেছে, ভাইয়াকে বলে দেখি । হয়তো মুখ ফস্কে বলে ফেলেন পরে বুঝতে পেরে কথা কাটিয়ে বলেন, বাসায় কথা বলতে হবে। তুই একদিন আবির ভাইয়ার কলেজ ফ্রেন্ডদের বিষয়ে বলেছিলি এই সবগুলো বিষয়ই আমায় মাথায় ছিল। সবচেয়ে বড় বিষয় সেদিন হাসপাতালে তুই যখন অজ্ঞান ছিলি তখন আবির ভাইয়া ফোনে ওনাকে যেভাবে ঝারছে, তুই বিশ্বাস করবি না ওনার চোখ-মুখ একদম অন্ধকার হয়ে গেছিল। তারপরও ওনি একটা টু শব্দ পর্যন্ত করেন নি। সেদিন ই সিউর হয়েছিলাম ওনি কিছু না কিছু হলেও জানেন । আমি শুধু ওনাকে জিজ্ঞেস করার সুযোগ খোঁজছিলাম। গতকাল ওনি কল দিলেন, আপুও বাসায় নেই এই সুযোগে রাত ৩ টার উপরে পর্যন্ত শুধু তোর বিষয়েই কথা বলেছি। তোকে কথাগুলো জানানোর জন্য আমার ভেতরটা ছটফট করছিল, কিন্তু ঘুমে চোখও টানতেছিল। ওনার সাথে কথা বলতে বলতে কখন জানি ঘুমিয়ে পরছিলাম৷ সকালে সজাগ হয়েই আগে তোকে কল দিয়েছি।”

মেঘ উত্তেজিত কন্ঠে শুধালো,
“ভাইয়া কি বলছে?”

“আমি প্রথমেই ওনাকে জিজ্ঞেস করেছি, সেদিন হাসপাতালে কি আবির ভাইয়া কল দিয়েছিলেন? ওনি উত্তরে ‘হ্যাঁ’ বলেছেন। আমি আবারও জিজ্ঞেস করেছি, “আবির ভাইয়া কি মেঘকে পছন্দ করেন?”
ওনি এর উত্তরেও “হ্যাঁ” ই বলেছেন। তখন আমি সরাসরি জিজ্ঞেস করি, ‘আবির ভাইয়া কি বাহিরে পড়তে যাওয়ার আগে থেকেই মেঘকে পছন্দ করেন? হ্যাঁ কি না৷’ ওনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিয়েছেন ‘হ্যাঁ’ তারপর আরও কয়েকটা প্রশ্ন করেছি, ওনি সবগুলোতেই ঠিকঠাক উত্তর দিয়েছেন।”

“তুই জিজ্ঞেস করিস নি ভাইয়া কবে থেকে জানে?”

“জিজ্ঞেস করেছি, ওনি বলেছেন ওনি অনেক আগে থেকেই সবকিছু জানেন।”

মেঘ চেঁচিয়ে উঠল,
“হোয়াট? ভাইয়া আমার সাথে এত বড় ধোঁকাবাজি টা করতে পারলো?”

বন্যা শান্ত স্বরে বলল,
“গতকাল রাতে এই কথা শুনামাত্র আমিও চিৎকার করেছিলাম৷ রাগে কটমট করে বলেছিলাম, আপনি সবকিছু জানার পরও মেঘকে এত কষ্ট কেনো দিচ্ছেন? আপনি জানেন মেঘ আপনাকে পাগলের মতো ভালোবাসে তারপরও আপনি এটা কিভাবে করতে পারলেন? তখন ওনি বলছেন, ওনি আবির ভাইয়ার কথার উপর কিছু বলতে পারতেন না আর কখনো পারবেনও না। আমার মেজাজ আরও বেশি খারাপ হয়ে গেছিল, আমি মুখ ফস্কে বলে ফেলছিলাম,

“আবির ভাইয়ার মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র মনুষ্যত্ববোধ থাকতো তাহলে মেঘকে এত কষ্ট দিতো না। ”

মেঘ শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়া ধমক দেয় নি তোকে?”

“না ধমক দেন নি তবে রাগে রাগে বলছেন, তুমি ভাইয়ার সম্পর্কে কতটা জানো যে ভাইয়াকে নিয়ে এসব কথা বলছো। ভাইয়া বনুকে যতটা ভালোবাসে আর বনুর ব্যাপারে যে পরিমাণ পসেসিভ আমি সারাজীবনেও তার একাংশ হতে পারব না।”

মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,
” এই অফুরন্ত ভালোবাসা কোথায় ছিল এতদিন?”

বন্যা মুচকি হেসে বলল,
“তারথেকেও বড় শকিং নিউজ শুনবি?”

“কি?”

” আবির ভাইয়ার অবর্তমানে ৭ বছর তুই যে রিলাক্স জীবন কাটিয়েছিস সেই সবটায় ছিল আবির ভাইয়ার প্ল্যান। তুই হয়তো প্রকাশ্যে বা স্বইচ্ছায় আবির ভাইয়ার সঙ্গে কোনোদিন কথা বলিস নি কিন্তু ওনি ঠিকই তোর কথা শুনেছে। এমন একটা দিন বাদ যায় নি যে তোর কন্ঠ না শুনে ভাইয়া ঘুমিয়েছেন। তুই রাগ করলে মাঝরাতে তোর ভাই ঘুম থেকে ডেকে নিজে রান্না করে বা তোর পছন্দের খাবার এনে তোকে সামনে বসিয়ে খাইয়ে তোর রাগ ভাঙানোর চেষ্টা করতো ঠিকই কিন্তু তখন ফোনের ওপাশে আবির ভাইয়া থাকতেন। শুধুমাত্র তোর কথা শুনার জন্য ওনি আলাদা ফোন ইউজ করতেন, ঘন্টার পর ঘন্টা তোর ভাইয়ের সঙ্গে অডিও কলে থাকতেন। তোর ভাইয়া আরও যা যা বলেছেন তা শুনে আমি রীতিমতো আকাশ থেকে পড়েছি। তোর অভিমানের তোপে পড়ে একপ্রকার বাধ্য হয়ে বাড়ি ছেড়েছিলেন ওনি, অথচ দূরে থেকেও পাগলের মতো ভালোবেসে গেছেন৷ তুই বোন অনেক লাকি। দোয়া করি, যেন সারাজীবন আবির ভাইয়ার স্প্যারো হয়ে থাকতে পারিস।”

মেঘ মিষ্টি করে হেসে শাড়ির আঁচল ছড়িয়ে ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকিয়ে বলল,
” ইনশাআল্লাহ। এখন বল আমায় কেমন লাগছে? ওনাকে পাগল করার জন্য যথেষ্ট না?”

বন্যা হিজাব ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
” মাশাআল্লাহ, তোকে খুব সুন্দর লাগছে। আবির ভাইয়া ছাড়া আর কারো নজর যেন না লাগে।”

দুপুরের পর থেকে ড্রয়িং রুম ফাঁকায় থাকে তবুও
মেঘ আর বন্যা চুপি চুপি বাসা থেকে বেড়িয়েছে। মেঘের আব্বু আজ বাসায় আছেন। মেয়ে এত সেজেগুজে বের হচ্ছে দেখলে নিশ্চিত শখানেক প্রশ্ন করতে শুরু করবেন। মুহুর্তেই তানভির, আবির সবাইকে জড়ো করে ফেলবেন। এই ভয়ে লুকিয়ে বের হতে হয়েছে। বাসা থেকে বেড়িয়ে দুজন দুই রিক্সা নিয়ে আলাদা আলাদা গন্তব্যে রওনা দিল। বন্যা সরাসরি বাসায় যাচ্ছে। মেঘ পার্কে যাচ্ছে, যাওয়ার সময় একগুচ্ছ লাল আর হলুদ গোলাপও সঙ্গে নিয়েছে। জ্যাম পার করে পার্ক পর্যন্ত আসতে মেঘের অনেকটায় সময় লেগেছে। আজ অফিস ডে হওয়ায় পার্কে খুব বেশি মানুষের ভিড় নেই আবার একেবারে ফাঁকাও না। শাড়ি পড়ে একা একা হাঁটতেও খুব বিরক্ত লাগছে, কিছুদূর গিয়ে গাছের নিচে একটা ব্রেঞ্চে বসলো। ফুলগুলো পাশে রেখে ফোনটা হাতে নিলো। আবিরকে ফোন দেয়ার খুব চেষ্টা করছে কিন্তু ভয়ে হাত কাঁপছে। বাসা থেকে খুব সাহস নিয়ে বের হলেও পার্ক পর্যন্ত আসতে আসতে সাহসের ছিটেফোঁটাও বেঁচে নেই। হাতের কম্পনের কারণে কাঁচের চুড়ি গুলো একে অন্যের সঙ্গে বারি খাচ্ছে। মেঘ সঙ্গে সঙ্গে ফোন পাশে রেখে চুড়ি খুলতে শুরু করলো। নিজের উপর প্রচন্ড রাগ হচ্ছে, শরীর ঘামছে, লাল টকটকে রঙের লিপস্টিকে রাঙা ওষ্ঠদ্বয় তিরতির করে কাঁপছে। অকস্মাৎ বন্যার কল আসছে। কল রিসিভ করতেই বন্যা বলল,
“আবির ভাইয়াকে কল দিয়েছিস?”

“সাহস পাচ্ছি না ।”

“আমি জানতাম তুই এমন কান্ড করবি। জোরে নিঃশ্বাস নিয়ে কল দে ওনাকে। যা হওয়ার হবে।”

মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“ঠিক আছে, দেখছি।”

মেঘ পার্কে এসেছে প্রায় ২০ মিনিট হয়ে গেছে। এখনও আবিরকে কলই দিতে পারছে না। বারবার ফোন হাতে নিচ্ছে আবার রেখে দিচ্ছে। সূর্য পশ্চিমা আকাশে অনেকটায় হেলে পড়েছে। পল্লবিত আঁখিতে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দেখছে। মেঘ আচমকা নড়েচড়ে বসলো। এরমধ্যে মেঘের থেকে কিছুটা দূরে একটা বাইক এসে থামলো কিন্তু মেঘের সেদিকে নজর নেই। মেঘ দীর্ঘনিঃশ্বাস ছেড়ে ফোন হাতে নিয়ে আবিরের নাম্বারে কল দিল। হাঁটুর উপর হাত রেখে ঝুঁকে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে মেঘ বারবার ঢোক গিলছে। আবির কল রিসিভ করলে কি বলবে মনে মনে তাই সাজাচ্ছে। অকস্মাৎ মেঘের ঠিক সামনে কেউ একজন দাঁড়াতেই মেঘ আঁতকে উঠল, নীল রঙের একটা আবছায়া চোখে লাগতেই মেঘ মেরুদণ্ড সোজা করে বসতে বসতে সূক্ষ্ম নেত্রে তাকাতে নিল। ততক্ষণে আবির মেঘের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পরেছে। আবিরকে দেখেই চমকে উঠল মেঘ। মেঘের অবিশ্বাস্য চাহনি দেখে আবির মুচকি হাসলো। আবিরের পড়নে নীল পাঞ্জাবি, সানগ্লাসটা বুকের উপর পাঞ্জাবিতে ঝুলানো, চুল দেখে বুঝায় যাচ্ছে বাইক থেকে নেমে হাতেই ঠিক করেছেন, ঠোঁটে লেগে আছে মায়াবী হাসি। আবির একমুহূর্ত দেরি না করে মেঘের সামনে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ ধরে নেশাক্ত কন্ঠে বলতে শুরু করল,

❝তুই আমার মন পিঞ্জরে
নিপট অপ্রমাদীতে থাকা
এক অন্ত:শীল ক্ষীণত্ব,
অনুভূতির রাজ্যের
তৃষ্ণার্ত কাব্য।
এলোকেশীর এলো চুল,
উত্তাল উদধির তরঙ্গের ন্যায়
কুহকিনী হাসি,
প্রণয়ীনীর নিখুঁত আত্ততা,
মৃগনয়নার মতো বিমুগ্ধ চোখে
বারংবার
হারিয়ে খোঁজেছি নিজেকে।
তুই আমার প্রণয়ের প্রদাহের সেই পূর্ণতা,
অপ্রমেয় নীলাম্বরের অসীমত্ব
ছাড়ানো স্নিগ্ধতা।
তুই কি আবিরের হৃদয় রাজ্যের
রাজ্ঞী হবি?❞

মেঘ দু’হাতে মুখ চেপে ডাগর ডাগর চোখে আবিরের অভিমুখে তাকিয়ে ছিল৷ হার্টবিট বেড়েছে কয়েকগুণ, সেদিকে কোনো খেয়াল নেই। আবিরের প্রশ্নে চক্ষুদ্বয় প্রশস্ত করে অবচেতন মনে চেঁচিয়ে উঠল,
“না। আমি মানি না। ”

মেঘের চোখে মুখে অল্প বিস্তর ক্রোধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আশেপাশে বসা ২-৪ জন মেঘ- আবিরের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন মেঘ আর একটা চিৎকার দিলেই ছুটে আসবে। আবির আশেপাশে তাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝে নিল। মেঘের মায়াবী দুই আঁখি আবিরের চোখে মুখে নিবদ্ধ। সকাল থেকে নেয়া মানসিক প্রিপারেশন, সাজগোজ সব যেন বৃথা হয়ে গেল। মেঘ মুখ ফুলিয়ে শ্বাস ছেড়ে বলল,

” আপনি আমার সব প্ল্যান ধ্বংস করে দিতে পারলেন?”

আবির তখনও হাঁটু গেড়ে বসে আছে। হাতে থাকা সাদা গোলাপগুলোর দিকে তাকিয়ে গলা খাঁকারি দিয়ে আস্তে করে আবারও বলল,
❝ আমি রূপকথার রাজকুমার হতে চাই না,
শুধু
তোর মনের রাজ্যের রাজা হতে চাই।
Will you be my queen? ❞

মেঘ কাঁদো কাঁদো মুখ করে তাকিয়ে আছে। আবির বিরক্ত হয়ে ঠান্ডা কন্ঠে হুমকি দিল,
” No problem. If you don’t take the flowers, I will give them to another girl. Will I?”

কথাটা বলতে দেরি হয়েছে কিন্তু আবিরের হাত থেকে মেঘের ফুল টেনে নিতে দেরি হয় নি। ফুলগুলো আলতোভাবে জড়িয়ে ধরে মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,

“ফুলও আমার আর আপনি সহ আপনার রাজ্যও আমার। আপনার মনের রাজ্যে কেউ উঁকিও দিতে পারবে না। এই আমি বলে রাখলাম। ”

মেঘ রাগে ফোঁস ফোঁস করছে, মাথা নিচু করে ঘন ঘন শ্বাস ফেলছে। আবির নিঃশব্দে হেসে নিজের দুই হাঁটুতে ভর দিয়ে মেঘের উরুতে মাথা রেখে মেঘের চোখের দিকে তাকালো। মুহুর্তেই মেঘের রাগ আর অভিমান উধাও হয়ে গেছে, মেঘের হৃদপিণ্ডের গতি অস্বাভাবিক, জোরালো হৃৎস্পন্দনের শব্দ বাহির থেকে শুনা যাচ্ছে। আনমনেই হাতের ফুলগুলো বুকের সঙ্গে চেপে ধরে আবিরের দিকে তাকালো। আবিরের নেশাক্ত হাসিতেই মন্ত্রমুগ্ধ মেঘ। আবির অত্যন্ত মায়াবী কন্ঠে বলল,

” মনের রাজ্যে উঁকি দেয়া তো দূর, আমার দিকে কেউ তাকানোর আগেই বলে দিব,
প্লিজ খালা, আমার দিকে তাকাবেন না। আমার ঘরে একটা পরী মতো বউ আছে। বউটা যেমন কিউট তেমন হিংসুটে৷”

আবিরের মুখে বউ শব্দটা শুনে মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। অজানা শিহরণে মন উড়ুউড়ু করছে।
বার বার কানে বাজছে,
“আমার ঘরে একটা পরীর মতো বউ আছে।” অদ্ভুত অনুভূতি মনকে রাঙিয়ে দিচ্ছে। লজ্জায় আবিরের চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়েছে অনেক আগেই তবুও বক্ষস্থলের ইতস্ততা কাটাতে পারছে না। আবির মেঘের উরু থেকে উঠে মেঘের ডানহাতটা নিজের কাছে টেনে নিল। আবিরের অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে মেঘের হাত সহ সম্পূর্ণ শরীর কম্পিত হচ্ছে। আবির হাতটাকে শক্ত করে ধরে মৃদুভাবে চুমু খেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

“আজ থেকে আমি শুধু তোর। আমার উপর তোর অধিকার সবচেয়ে বেশি। তুই যখন যা বলবি তাই হবে। খুশি?”

আবিরের চুমুতে মেঘের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠেছে। সেদিন অর্ধ ঘুমে থাকায় আবিরের কপালে দেয়া চুমুটা সেভাবে উপলব্ধি করতে পারে নি। তবে আজ মেঘ সম্পূর্ণ সজ্ঞানে আছে। মেঘ নির্বাক হয়ে বসে আছে, বহু চেষ্টা করেও গলা দিয়ে কথা বের করতে পারছে না। যেই আবির ভাইয়ের প্রণয়ের স্রোতে সর্বক্ষণ ভেসে যেতে চাই সেই আবিরের প্রেমিক সুলভ আচরণ, আবেগময় কথার কোনো প্রতিত্তোর করতে পারছে না। মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লো। চোখ নামাতেই নিজের কেনা লাল আর হলুদ গোলাপের দিকে নজর পরলো। সহসা মনে পড়ে গেছে নিজের করা পরিকল্পনার কথা। মেঘ গুরুতর কন্ঠে বলে উঠল,

” আপনি এটা কেন করলেন? আমি সকাল থেকে প্ল্যান করে ভাবিকে দিয়ে শাড়ি কিনিয়ে সেজেগুজে আসছি আর আপনি আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট করে দিয়েছেন। আপনি খুব পঁচা। ”

আবির মেঘের হাত ছেড়ে বসা থেকে উঠে সরাসরি মেঘের দুপাশের ব্রেঞ্চে হাত রেখে মেঘের দিকে ঝুঁকে দাঁড়ালো। মেঘ ঠোঁট উল্টে মনমরা হয়ে আবিরের দিকে চেয়ে আছে। আবির প্রশস্ত আঁখিতে তাকিয়ে নিরেট কন্ঠে বলল,

” আমার এতবছরের অনুভূতি, আসক্তি আর সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা আপনি কেবল কয়েক ঘন্টায় তছনছ করে দিয়েছেন। তবুও আমি চুপচাপ বসে দেখবো? আপনি ভাবলেন কিভাবে?”

মেঘ নিরেট দৃষ্টিতে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে শুধালো,
” আমি এখানে আসছি এটা আপনি কিভাবে জানেন?”

আবির মুচকি হেসে বলল,
“সকালে আপনার হাবভাব দেখেই সন্দেহ হয়েছিল। তানভিরকে কলও দিয়েছিলাম কিন্তু ও ফোন রিসিভ করে নি। ২ বেজে ৩৭ মিনিটে আপনি শাড়ি পড়ে বাসা থেকে বের হতেই আমার কানে খবর চলে গেছিলো। তানভিরকে কল দিতে দিতে অতঃপর জানতে পারলাম যে, আমার সন্দেহ ঠিক ছিল। তানভির বন্যাকে বলে ফেলছে মানে আপনার কানে কথা চলে গেছে। ৩:১৬ তে ফুলের দোকানে ফুল কিনছিলেন আর আমি তখন শপিং মলে আপনার শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং পাঞ্জাবি খোঁজতে ব্যস্ত। আপনি এখানে এসে বসেছেন ঠিক ৪:২২ এ। তখন আমি রেডি হয়ে বেড়িয়ে ফুল কিনতে যাচ্ছি। ফুল নিয়ে আসতে আসতে তাই একটু দেরি হয়ে গেছে।”

“আপনি এতকিছু কিভাবে জানেন?”

“ম্যাম, আপনাকে আগেই বলেছিলাম, আপনাকে ছাড় দিয়েছি কিন্তু ছেড়ে দেয় নি। তাছাড়া আপনি যার তার মনের মানুষ না। মনে রাখবেন, আবিরের পৃথিবী আপনি। আর সেই পৃথিবীকে আগলে রাখতে আবির সবকিছু করতে পারে। খান বাড়িত চারপাশ ঘিরে এমন কিছু ব্যক্তি আছে যারা নিজের কাজের পাশাপাশি সর্বক্ষণ বাসার দিকে নজর রাখে। খান বাড়িতে কখন কে আসছে, কে যাচ্ছে, কেনো আসছে সব আপডেট আমাকে পাঠায়৷ এমনকি এইযে আমি আপনি এখানে আছি, এখানেও আমার লোক আছে।”

মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,
“অ্যাহ! বললেই হলো। মজা করেন আমার সাথে?”

আবির মেঘের চোখে চোখ রেখে বলল,

“আমার ডানপাশে কিছুটা দূরে কালো টিশার্ট পড়া ছেলেটাকে দেখ, তার পেছন দিকে কফি কালার শার্টের ছেলে আর ঐদিকে বাইকে বসা ছেলেটাকে দেখ।”

মেঘ তিনজনকে এক পলক দেখে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করলো,
“তারা আপনার লোক?”

“হুমমমমম। বিশ্বাস হয় না?”
“না।”

“ওকে, ওয়েট।”

আবির ফোন বের করে মেসেজ পাঠাতেই ছেলেগুলো যে যার মতো চলে যাচ্ছে। মেঘ অবাক চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“ওনারা সত্যি আপনার লোক? আপনার কথায় সেকেন্ডের মধ্যে চলে গেছে। কিভাবে সম্ভব?”

“আপনার জন্য সব সম্ভব।”

মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
” তারা এখানে কেনো আসছিল? ”

“আমার অবর্তমানে কেউ যেন আমার স্প্যারোর দিকে চোখ তুলে তাকাতে না পারে তারজন্য।”

“তাই বলে তিনজন? আর ওনারা আপনার কি হয়?”

“দুজন ছোট ভাই, একজন ফ্রেন্ড। তিনজনের বাসা কাছাকাছি তাই বলেছিলাম আমি আসার আগ পর্যন্ত কেউ যেন আশেপাশে থাকে। এসে দেখি তিনজন ই উপস্থিত। ”

মেঘ নিজের কেনা ফুল গুলোর দিকে তাকিয়ে শীতল কন্ঠে বলল,
” ওনাদের জন্য আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল।”

আবির ব্রেঞ্চ থেকে মেঘের খুলে রাখা চুড়িগুলো তুলে মেঘের হাতে পড়াতে পড়াতে বলল,
” আর আপনার জন্য আপনার সব পরিকল্পনা নষ্ট হয়ে গেছে।”

“মানে?”

“কিছু না। চলুন।”

মেঘ নিজের ফুলগুলো আবিরের সামনে ধরে হিমশীতল কন্ঠে বলে উঠলো,
” I Love You ”

আবির ফুলগুলোর দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
“লাল ফুল গুলো সরিয়ে শুধু হলুদ গোলাপগুলো দেন।”
“কোনো?”
“লাল গোলাপ ছুঁতে চাই না তাই।”

মেঘ যথারীতি হলুদ গোলাপ গুলো আলাদা করে ধরতেই আবির ফুল গুলো হাতে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
“থ্যাংক ইউ।”

মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
“কেউ আই লাভ ইউ বললে প্রতিত্তোরে থ্যাংক ইউ বলে না, আই লাভ ইউ টু বলতে হয়। ”

আবির কথাটা শুনলো কি না কে জানে। কয়েকটা পিচ্চি ছেলেকে ডেকে লাল গোলাপ গুলো দেখিয়ে নিয়ে যেতে বলল। পরপর মেঘকে নিয়ে বাইক স্টার্ট দিল, নিরুদ্দেশের পথে ছুটলো। মেঘ দু একবার জিজ্ঞেস করেছে, কিন্তু আবির তেমন কিছুই বলে নি। সন্ধ্যে হয়ে গেছে, মেঘ চুপচাপ বাইকে বসে আছে। আবির বাইকের স্প্রীড কমিয়ে হঠাৎ ডেকে উঠল,
” ম্যাম…! ”
“জ্বি। ”
“এত চুপচাপ কেনো?”
“এমনিতেই।”

আবির রাস্তার পাশে বাইক থামিয়ে ঘাড় কাত করে মেঘকে খানিক দেখে নিলো। আবির মেঘের দু’হাত এনে নিজের পেটের উপর রেখে রাশভারি কন্ঠে বলল,
” আজ থেকে এই হাতের অবস্থান এখানে।”

মেঘ আনমনে হেসে আবিরের গা ঘেঁষে বসলো৷ পেছন থেকে আলতোভাবে আবিরের পেট আঁকড়ে ধরল। আবির যথারীতি আবারও বাইক স্টার্ট দিল, শহর থেকে বেড়িয়ে অনেকটা রাস্তা গিয়ে আবির বাইক থামালো। আশেপাশে কয়েকটা দোকান ছাড়া তেমন বাড়িঘর নেই। একদম কোলাহল শূন্য পরিবেশ। আবির মৃদু হেসে বলল,

” ৫ মিনিটের জন্য আপনার চোখ বেঁধে দিলে আপনি কি রাগ করবেন?”

“চোখ কেনো বাঁধবেন?”

“সেটা ৫ মিনিট পর বুঝবেন, প্লিজ।”

মেঘ আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। একে অপরিচিত জায়গা, তারউপর আশেপাশে মানুষও তেমন নেই। আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে বলল,

“ঠিক আছে। ”

আবির এক গাল হেসে মেঘের চোখ বেঁধে সঙ্গে সঙ্গে মেঘকে কোলে তুলে নিল। মেঘ আবিরের বুকে মাথা রেখে চুপ থেকে আবিরের হৃৎস্পন্দনের শব্দ শুনছে। ২-৩ মিনিট পর মেঘকে একটা জায়গায় নামালো।মেঘের চোখ তখনও বন্ধ। চোখ থেকে কাপড় সরতেই মেঘ আশ্চর্যান্বিত নয়নে তাকালো। এটা একটা বাসা, যার গেইটের উপরে লেখা,
“Sparrow’s Dreamhouse.”

আবির অনুচ্চ স্বরে বলল,
” ম্যাম, আপনার গিফট। ”

মেঘের বিষ্ময় যেন কমছেই না। আবির মেঘের হাত টা শক্ত করে ধরে দরজার সামনে দাঁড়ালো। আবির চোখের ইশারায় মেঘকে দরজা খুলতে বলল। মেঘ বাম হাতে আস্তে করে দরজা ধাক্কা দিতেই দরজা খুলে গেছে। অকস্মাৎ বাড়ির ভেতরে সাউন্ড বক্সে গান বাজতে শুরু করল,

”শোন বলি তোমায় না বলা
কথাগুলো আজ বলে দিতে চাই,
বল কি বলতে চাও,
সারাটি জীবন ধরে শুনে যেতে চাই

ভালবাসি আমি যে তোমায়
এই কথাটাই ছিল শুধু বলার
ভালবাসি আমিও তোমায়
সব কথা কি মুখে বলে দিতে হয়”

দরজা খুলামাত্র মেঘের চোখ পরে ড্রয়িং রুম সাথে বিশালাকৃতির সিঁড়ির দিকে যা গাদাঁ ফুলে সজ্জিত, ফ্লোর জুড়ে গাঁদা ফুলের পাপড়িতে ছেয়ে আছে। সিঁড়ির উপর জ্বলমল করছে আবির আর মেঘের একটা ছবি যেটা কোন এক রেস্টুরেন্টে তোলা। ছবি দেখে মনে হচ্ছে যেন দুজন দু’জনের চোখে চোখ রেখে নিজেদের অব্যক্ত অনুরক্তি জাহির করছে। মেঘ চারপাশে চোখ ঘুরাতেই এমন আরও কয়েকটা ছবি চোখে পড়লো। দেয়ালে ছবি লাগানো টা খান বাড়ির কেউ ই তেমন পছন্দ করে না, তাই শখেও কেউ কখনো নিজের ছবি ফ্রেমবন্দি করে নি। মেঘ অবাক চোখে ছবিগুলো দেখছে আর ঘটনাগুলো মনে করার চেষ্টা করছে। কারণ ছবিগুলোর প্রায় সবই মেঘের অগোচরে তোলা হয়েছে। আবির মোলায়েম কন্ঠে বলল,
“চিন্তা করিস না, ছবিগুলো সরিয়ে দিব। এগুলো শুধু স্পেশাল দিনের জন্য করিয়েছি।”

ছবিগুলোর থেকে মেঘের দৃষ্টি সরলো। আবির মেঘের হাতটা আর একটু শক্ত করে ধরে পা বাড়ালো। মেঘ আজ নির্বাক, এ জীবনের সেরা সারপ্রাইজটা পেয়েছে সে। বাকরুদ্ধ মেঘ এক হাতে আবিরের দেয়া গোলাপগুলো শক্ত করে ধরে আবিরের অভিমুখে চেয়ে তাকে অনুসরণ করল। সাউন্ডবক্সে তখন গান বাজছে,

“আকাশের ঐ নীল ঠিকানায়
মেঘেরা সাদা ডানা ছড়ায়
ও দেরি সেই ভালবাসা
এ মনে আজ পেয়েছে ঠাই

জড়াবো আদুরে
তোমাকে অনুভবে
আকাশের চেয়ে বেশী
তোমাকে ভালবাসি”

কিছুটা সামনে এগুতেই সিঁড়ি উপরে প্রায় ২০-৩০ জন হাতে ফুলের পাপড়ি সমেত উপস্থিত হলো। সবাই একসঙ্গে বলে উঠল,
“Welcome to your dreamhouse, Madam.”

আকস্মিক ঘটনায় মেঘ কিছুটা ভড়কালো, সঙ্গে সঙ্গে কেঁপে উঠল মেঘের ছোট্ট দেহ। মেঘ কয়েকজনকে মোটামোটি চিনে তবে বেশিরভাগই আবিরের অফিসের স্টাফ। মেঘ আনমনেই রাকিব ভাইয়া,রাসেল ভাইয়াদের খোঁজলো কিন্তু তারা এখানে নেই। আবিরের কর্মকাণ্ডে মেঘ পদে পদে আশ্চর্যের চূড়ায় পৌছে যাচ্ছে। মনের ভেতর চলমান অস্থিরতা এখন আরও বেশি কাজ করছে। আবির মেঘের হাত থেকে ফুলগুলো নিয়ে সিঁড়ির পাশে রেখে অকস্মাৎ মেঘকে কোলে তুলে নিল। ওমনি মেঘের নিঃশ্বাস আঁটকে গেছে, আতঙ্কিত হয়ে মেঘ অতর্কিতেই আবিরের পাঞ্জাবির কলার খামচে ধরলো, শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিল। আবির মুচকি হেসে সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো। মস্তিষ্ক ক্ষণিকের জন্য আবেগশূন্য হয়ে গেছে। গাঁদা ফুলের পাপড়ি মেঘের চোখে মুখে বারি খাচ্ছে, আকাশচুম্বী লজ্জা আর ইতস্তততায় মেঘ চোখ খুলতে পারছে না, ইচ্ছে করছে সবকিছু ছেড়ে ছুড়ে কোনো এক অন্ধকারাচ্ছন্ন ভূখন্ডে পদার্পণ করতে। আবির যেতে যেতে তার পিএসকে উদ্দেশ্য করে থমথমে কন্ঠে বলল,
“মিরাজ, সবার খাবারের ব্যবস্থা করো।”

“জ্বি ভাইয়া।”

মেঘের হুট করে নেয়া সিদ্ধান্তে আবিরের সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। না পারতেছিল মেঘকে আটকাতে আর না পারছিল নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে। তাই বাধ্য হয়ে অফিসের স্টাফদের দিয়েই সবকিছু গুছাতে হয়েছে। তাদের খুব ইচ্ছে ছিল মেঘকে ফুল ছিটিয়ে ওয়েলকাম করবে, তাই আবিরও তেমন আপত্তি করে নি। আবিরের নিষ্পলক দৃষ্টি আঁটকে আছে মেঘের লজ্জায় ললিত ধৃষ্টতায়। মেঘের চোখ তখনও বন্ধ, আবিরের উষ্ণ শ্বাস আঁচড়ে পড়ছে মেঘের গায়ে। আবির ছাদের দরজার পাশে এসে থামলো। মেঘকে নামিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
” চাইলে এবার তাকাতে পারেন।”

মেঘ মিটমিট করে তাকালো। সঙ্গে সঙ্গে মেঘের আঁখি যুগল প্রশস্ত হয়ে গেছে। সম্পূর্ণ ছাদ লাইটিং করা, রঙবেরঙের আলোতে সজ্জিত সবকিছু। রাকিব এগিয়ে এসে মৃদু হেসে বলল,
” সরি ভাবি, সময়ের অভাবে আজ ঠিকমতো সাজাতে পারি নি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাদের বাসরঘর আমি নিজের হাতে সাজাবো। এমনভাবে সাজাবো যেন বাসরঘর দেখতে দেখতেই রাত পেরিয়ে যায়।”

রাকিবের মুখে ভাবি ডাক শুনে মেঘ খুশি হবে নাকি বাকি কথার জন্য লজ্জা পাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। আবির শক্ত কন্ঠে ধমক দিল,
“শুধু শুধু আমার বউটাকে লজ্জা দিচ্ছিস কেনো?”

“ওহ হো। আমরা কিছু বললেই লজ্জা দিচ্ছি। আর তুই যে এখানে বাসর করার প্ল্যান করছিলি এটা বললে কি হবে!”

আবির চোখ রাঙিয়ে পরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
” বিয়ে করে রাকিবের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে, তুই কিছু মনে করিস না। চল ঐদিকে ।”

সাউন্ডবক্সে একই গান বার বার বাজতেছে,
“সাত সাগর আর তের নদী
পার হয়ে তুমি আসতে যদি
রূপকথার রাজকুমার হয়ে
আমায় তুমি ভালবাসতে যদি”

ছাদের একপাশে যেতেই মেঘ আরেক দফায় বিস্মিত হলো। লাইটিং করা ইংরেজি বড় বড় অক্ষরে লেখা,
” Marry Me?”

মেঘ দু’হাতে মুখ চেপে সেই লেখাটা দেখছে। রাসেল, লিমন, মোবারক ভাইয়া সহ আবিরের আরও ৪-৫ জন ফ্রেন্ড এখানে উপস্থিত। এই অপরূপ মুহুর্তের কথা মেঘ কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি। ছাদের এই কর্ণার টা কাঁচা ফুল দিয়ে এমন সাজানো যা দেখে মেঘের চোখ ই সরছে না। রাসেলরা সবাই আতশবাজিসহ আরও কিছু জিনিসপত্র নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
মেঘ আবিরকে দেখার জন্য আলতোভাবে চোখ ঘুরালো। আবির হাঁটু গেড়ে বসে মেঘের দিকে একটা আংটি ধরে ক্ষীণ স্বরে বলল,

“তুই আমার অবসন্ন হৃদয়ের
অস্ফুট প্রফুল্লতা,
আমার প্রণয়ের একমাত্র
পরিণীতা।”

আবিরের ধারালো ছুরির ন্যায় চাহনি। পুনরায় নেশাক্ত কন্ঠে বলল,
“Will you be my soulmate?”

মেঘ আবেগময় কন্ঠে ঝটপট বলল,
“Yes.”

আশেপাশে রাকিব,রাসেলদের দিকে তাকানোর মতো অবস্থা নেই মেঘের। সে এখন অন্য দুনিয়ায় আছে। আজকের এই দিনটা মেঘের কাছে স্বপ্নের মতো।
আবির হাত বাড়াতেই মেঘ নিজের ডানহাতটা আবিরের হাতের উপর রাখলো। আবির সেই হাত সরিয়ে মেঘের বামহাত সামনে এনে মৃদুগামী হস্তে খুব যত্ন নিয়ে আংটি টা পড়িয়ে দিল৷ মেঘ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, মনের ভেতর একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। গতবছর মেঘের জন্মদিনে আবির বামহাতের আঙ্গুলে আংটি পড়িয়ে দিয়েছিল বলে মিনহাজরা কত কি বলেছিল। মেঘও সেসব কিছু মেনে নিয়েছিল, ভেবে নিয়েছিল বিয়ের আংটি ডানহাতে পড়তে হয়,সেজন্য ই আজ ডানহাত বাড়িয়েছিল। আবির আংটি পড়িয়ে মেঘের হাতে চুমু খেয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,

“লোকে বলে, বামহাতের অনামিকা আঙুলের সঙ্গে নাকি হৃদয়ের সরাসরি যোগ রয়েছে। তাই বিয়ের আংটি বামহাতে পড়াতে হয়। ”

মেঘ আনমনে শক্ত কন্ঠে শুধালো,
” আপনি গতবছরও আমার বাম হাতে আংটি পড়িয়েছিলেন। তখন লোকের কথা জানতেন না?”

“জানতাম। আর জানতাম বলেই বাম হাতে পড়িয়েছিলাম। কারণ তুই আমার প্রেমিকা নস আমার বউ তুই।”

মেঘ অপলক দৃষ্টিতে আবিরের মুখের পানে তাকিয়ে আছে। কতটা শক্ত কন্ঠে আবির বার বার মেঘকে বউ বলে সম্বোধন করছে অথচ গত দুই বছরে এই মানুষটার মুখ থেকে একটা টু শব্দ পর্যন্ত বের হয় নি।

লিমন স্বাভাবিক কন্ঠে শুধালো,
“এখন কি আতশবাজি ফুটাতে পারি?”

আবির ঘাড় কাত করে সম্মতি দিল। পরপর মেঘের দিকে তাকিয়ে মেঘের হাতটা উপরে তুলে মৃদুস্বরে বলল,
“আংটিটা পছন্দ হয়েছে? ”

আংটির দিকে না তাকিয়েই মেঘ বলে দিল,
“আপনার দেয়া প্রতিটা জিনিস আমার কাছে উত্তম আর অমূল্য।”

আবির মুচকি হেসে বলল,
” একটু দেখে তো নে।”

মেঘ এবার আংটির দিকে তাকালো। স্বর্ণের আংটিটা খুব বেশি বড় না হলেও ডিজাইনটা খুব সুন্দর। আংটির ঠিক মাঝ বরাবর অত্যন্ত নিখুঁত ভাবে A লেখা। আবির শান্ত কন্ঠে বলল,
“আংটিটা সবসময় হাতে রাখবি।”

মেঘ তৎক্ষনাৎ আংটিতে চুমু খেয়ে বলে উঠল,
“আমি এই আংটি কখনো খুলবোই না।”

মেঘের কান্ড দেখে আবিরের ঠোঁট চেপে হাসছে। রাকিবরা ছাদের অন্যপাশে গিয়ে আতশবাজি ফুটাচ্ছে। বাজির শব্দে মেঘ সেদিকে তাকিয়ে উত্তেজিত কন্ঠে বলল,
“আমিও বাজি ফুটাবো।”

“ওকে। ”

মেঘ দু-একটা ফুটানোর চেষ্টা করেছে। অতঃপর দূরে সরে এসেছে। দাঁড়িয়ে দাড়িয়ে তাদের হৈ-হুল্লোড় দেখছে আর হাসছে। এখনও আরও অনেক বাজি ফুটানো বাকি আবির আচমকা মুখ ফুলিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
“তোরা এখন নিচে যা। আমার ওর সঙ্গে কথা আছে। ”

মোবারক হেসে বলল,
” শেষ করেই চলে যাব।”

” কয়টা বাজে দেখছিস? এক্ষুনি যা।”

তারাও আর কোনো কথা বলে নি। জিনিসপত্র নিয়ে নেমে যাচ্ছে। আবির ছাদের দরজা লাগাতে গেল। রাকিব আচমকা ঘুরে দরজায় উঁকি দিয়ে বলল,
” প্রয়োজনে রুম সাজিয়ে দিচ্ছি তবুও ছাদে বাসর করার প্ল্যান করিস না যেন!”
আবির রাগান্বিত কন্ঠে চেঁচাল,
” যাবি… ”

রাকিব হাসতে হাসতে নেমে যাচ্ছে। আবির ছাদের দরজা বন্ধ করে মেঘের কাছে এগিয়ে আসলো। মেঘ ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ওনারা কত আনন্দ করছিল। আপনি ওনাদের ওভাবে তাড়িয়ে দিলেন কেনো?”

আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“ওদের আনন্দের থেকেও তোর সাথে কথা বলাটা জরুরি। ”
মেঘ সূক্ষ্ম নেত্রে তাকিয়ে ভয়ে ভয়ে শুধালো,
“কি কথা?”

ভয়ে মেঘের বুক কাঁপছে। বিকেল থেকে এখন পর্যন্ত ঘটা প্রতিটা দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। আনমনে বলে উঠল,
” আপনি আবারও আমায় ছেড়ে চলে যাবেন না তো?”

আজকের এই স্পেশাল দিনে মেঘের মুখে এমন আজগুবি প্রশ্নে আবির খুব বিরক্ত হলো। কপালে কয়েকস্তর ভাঁজ ফেলে চোখ ছোট করে বলল,
” তোর চোখের পাতায় কি লাগছে? দেখি, চোখটা বন্ধ কর তো।”

মেঘ সঙ্গে সঙ্গে চোখ বন্ধ করে শুধালো,
“কি লাগছে?”

আবির এক সেকেন্ড দেরি না করে মেঘের লাল রঞ্জকে সুশোভিত ওষ্ঠে নিজের অধর ছোঁয়াল। অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে সহসা চোখ মেলল মেঘ। স্বাভাবিকের তুলনায় দু’চোখ তিনগুণ প্রশস্ত হয়ে গেছে। মেঘের হৃদয়ে তোলপাড় করা রঙবেরঙের অনুভূতিগুলো নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, শ্বাসনালীতে ভয়ানক ঝড় চলছে । আবিরের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির আমর্শে মেঘের শিরা-উপশিরার রক্ত সঞ্চালন পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আবিরের উষ্ণ শ্বাস মেঘের নাকে-মুখে লাগছে। মেঘ দু’হাতে আবিরের বুকের ধাক্কা দিয়ে দূরে সরানোর চেষ্টা করলো। সরাতে তো পারলোই উল্টো আবির মেঘের উদর আঁকড়ে ধরে মেঘের আরও ঘনিষ্ঠ হয়ে দাঁড়ালো। আবিরের ঘনিষ্ঠতায় মেঘের প্রশস্ত আঁখি আরও বেশি প্রশস্ত হলো৷ আবির অন্য হাত দিয়ে মেঘের দু’চোখ বন্ধ করে দিল। আবিরের নিগূঢ় সংস্পর্শে মেঘের গায়ে কাটা দিয়ে উঠছে। ঘামে জবজবে মেঘের শরীর বেয়ে অনর্গল পানি পরছে। নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হচ্ছে বারবার, মেঘের এলোমেলো নিঃশ্বাস, কোনোকিছুই যেন আবিরের থেকে ছাড়াতে পারলো না মেঘকে। এভাবে কত মিনিট কেটেছে জানা নেই। আবির মেঘের অধর থেকে অধর সরিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেঘকে। মেঘের কানের লতিতে আলতোভাবে ঠোঁট ছুুঁয়ে ফিসফিস করে বলল,

“এখন থেকে বাজে কথা বললে এভাবেই শাস্তি দিব। মনে থাকবে?”

মেঘ কন্ঠ খাদে নামিয়ে আস্তে করে বলল,
“হু।”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৯৪
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

অযাচিত পরিস্থিতিতে মেঘ সচকিত হয়ে আছে। নিষ্কলুষ মনে জমে থাকা ভয়, ভীতি আর অভিমানেরা অবিদিতে গুম হয়ে গেছে। আবির ভাইকে নিজের করে পাওয়ার যে উন্মাদনা এতদিন তাড়া করে বেড়াচ্ছিল সেই উন্মাদনার পরিসমাপ্তি ঘটেছে আজ। আবিরের অনুষঙ্গে নিজেকে হারাতে বসেছে। আবিরের অপলক দৃষ্টি, নেশাক্ত কন্ঠ, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা আর অনভিলাষিত ঘনিষ্ঠতা অবসহন করতে অনল্পে হিমসিম খেতে হচ্ছে। আবির মেঘকে ছেড়ে কিছুটা দূরে সরে দাঁড়িয়েছে ঠিকই তবে মেঘের মায়াবী আদলে নজর আঁটকে আছে, আবিরের অত্যুষ্ণ চাহনিতে মেঘের বুকের ভেতরটা লজ্জায় হাস ফাঁস করছে, অতর্কিতে চিবুক নামিয়ে নিলো। আবির সঙ্গে সঙ্গে দু আঙুলে পুনরায় মেঘের চিবুক উঠিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” তুই জানিস তোকে আজ কতটা সুন্দর লাগছে?”

মেঘ চোখ তুলে তাকিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“কতটা?”

” সমুদ্রের প্রভূত জলরাশি
যতটা সুন্দর ঠিক ততটা।
দেখতে প্রশান্ত হলেও
সঙ্গিন।”

মেঘ মলিন হাসলো। আবির পরপর শক্ত কন্ঠে শুধালো,
” তোকে শাস্তিটা কেনো দিয়েছি জানিস?”

“বাজে কথা বলেছি তাই।”

“জ্বি না। আপনি আমার সাজানো পরিকল্পনা নষ্ট করেছেন তারজন্য৷ ”

“আমি কি করেছি?”

আবির শ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল,
” ২ টা বছর ধৈর্য রাখতে পারলেন অথচ আর ২ টা দিন ধৈর্য রাখতে পারলেন না। আমি বলেছিলাম, আপনাকে আমি কোনো প্রকার প্রতিশ্রুতি দিব না,সরাসরি বিয়ে করব। মানে আজ আপনাকে বলব, কাল বিয়ে করব এমনটায় ভেবে রেখেছিলাম। আমার সবকিছু প্ল্যান করা, আজ থেকে দুদিন পর আপনাকে প্রপোজ করতাম, তার পরদিন গায়ে হলুদ আর সবশেষে বিয়ে। কিন্তু আপনি অধৈর্য হয়ে আজ ই চলে আসছেন। আপনাকে ফিরিয়ে দেয়ার সাধ্য আমার ছিল না, তাই নিজের সাজানো পরিকল্পনার কথা ভুলে আপনার ইচ্ছেকে প্রায়োরিটি দিলাম। আমার প্ল্যান ধ্বংস করার শাস্তি তো আপনাকে পেতেই হতো।”

মেঘের চোখ নামিয়ে নিয়েছে, এখন কথা বলতে একদম ইচ্ছে করছে না। এতদিন আত্মগোপনে থাকা অনুভূতিরা বার বার জানান দিচ্ছে, সম্মুখে দাঁড়ানো ব্যক্তির চোখে চোখ রাখলেই নিজের অস্তিত্ব বিলীন হতে বাধ্য। আবির মেঘের দিকে তাকিয়ে শক্ত কন্ঠে বলল,
” তুই আমায় ভালোবাসিস?”

মেঘ ক্ষীণ স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, অনেক ভালোবাসি। আর আপনি?”

আবির উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করল,
“কতটা ভালোবাসিস?”

“যতটা ভালোবাসলে আপনার হৃদয়ের প্রতিটা অনুনাদে আমার নাম শুনা যাবে ঠিক ততটা ভালোবাসি। ”

” আমার জন্য সব করতে পারবি?”

মেঘ কপাল কুঁচকে বলল,
“সব পারবো কিন্তু আপনাকে ছাড়তে পারবো না। ”

” আজ যদি আবির অথবা পরিবার দুটা থেকে যেকোনো একটাকে বেছে নিতে বলা হয়। তখন তুই কি করবি? বেছে নিতে পারবি আমাকে?”

মেঘ শীতল চোখে তাকিয়ে ভেজা কন্ঠে বলল,
” পারবো। ”

আবির মলিন হেসে শুধালো,
” যদি বলা হয় আবিরকে ছাড়তে হবে তখন?”

মেঘ অতর্কিতে আবিরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
” আমি আপনাকে ছাড়তে পারবো না, প্লিজ। আর যাই বলেন আমি সব মেনে নিব, বাসায় মেনে না নিলে সারাজীবন আপনার সাথে থেকে যাব তবুও কারো কথায় আপনাকে ছাড়তে পারবো না৷”

আবির মেঘের চোখ মুছে ধীর কন্ঠে বলল,
” কাঁদতে বারণ করেছিনা তোকে?”

মেঘ ভেজা কন্ঠে বলল,
” বাসায় কি কোনোভাবেই আমাদের মেনে নিবে না?”

আবির দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করল,
” শুধুমাত্র বাসায় মানানোর চেষ্টায় গত তিনবছর যাবৎ অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ভরসা৷ ওনারা আমাকে অনেক ভালোবাসেন, একজন দায়িত্বশীল ছেলে হিসেবে আমাকেও আজীবন ওনাদের পাশে থাকতে হবে। আমি স্বইচ্ছায় কোনোদিন আব্বু আম্মুর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করব না। তিনবছরে আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছি এখনও করছি। শুধুমাত্র ওনাদের চোখে যোগ্য হওয়ার জন্য প্রাইভেট কার কিনেছি, আলাদা কোম্পানি দাঁড় করিয়েছি, বাসা পর্যন্ত করেছি। ওনারা যোগ্যতা চাইলে আমি আজ জোর গলায় বলতে পারব, হ্যাঁ আমি তোর জন্য যোগ্য। তোকে পাওয়ার জন্য ওনারা যদি শর্ত দেন, আমি আব্বু-চাচ্চুর দেয়া যেকোনো শর্ত মেনে নিতে রাজি। তবুুও তোকে আমার লাগবে। কিন্তু ওনারা যদি আমাদের সম্পর্ক মেনে না নেয় বা তোকে ছাড়ার কথা বলে তখন আমি চুপ থাকতে পারবো না। পরিস্থিতি যদি এমন হয় যে বাসা থেকে বেড়িয়ে আসতে হয় আমি চুপচাপ বাসা থেকে বেড়িয়ে আসবো কিন্তু তোকেও তখন আমার সঙ্গে বেড়িয়ে আসতে হবে। বিশ্বাস কর, আমি তোকে কষ্টে রাখবো না। আর তোকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নও করব না। কারণ আমি জানি আমার থেকেও তোর অনেক বেশি আবেগ জড়িয়ে আছে ঐ বাসায়। কিন্তু কি করব বল? আমার যে তোকে লাগবেই লাগবে। বাসায় মেনে না নিলে হয়তো কয়েকটা দিন একটু দূরে থাকতে হবে তারপর আমি সব ঠিক করে দিব। জাস্ট কয়েকটা দিন। ফুপ্পির মতো ২৮ বছর পরিবার ছেড়ে থাকতে হবে না তোকে। আব্বু ছাড়া বাকি সবাইকে মানিয়ে নিতে পারবো। হয়তো আব্বু একটু ঝামেলা করবেন। তবে যাই হোক, আজ তোকে আমার সাথে থাকতে হবে। থাকবি তো?”

মেঘ ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
“থাকবো।”

প্রায় এক ঘন্টা সময় নিয়ে আবির মেঘকে বুঝিয়েছে। কি কি করতে হবে, কি বলতে হবে সব বুঝিয়ে দিয়েছে। ততক্ষণে এশার আজানের সময় হয়ে গেছে। আবির পকেট থেকে ফোন বের করে সময় দেখে নিল। বিকেল থেকে এই পর্যন্ত ২৪ টা কল আসছে। ফোন সাইলেন্ট থাকায় টের পায় নি, তানভির কলের পর কল দিচ্ছে। মেঘকে নিয়ে ফিরলে বাসায় যেতে হবে, এদিকে আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান তিনজন মিলে অনেকগুলো কল দিয়েছেন। দুপুরে মিটিং শেষে সিফাতের সঙ্গে আবিরের খুব রাগারাগি হয়েছে। আর একটুর জন্য হাতাহাতি হতে যাচ্ছিলো। সিফাতের চালচলন আবিরের একদম পছন্দ না, ছেলেটা যতই ভালো সাজার নাটক করুক না কেন, আবিরের সামনে বার বার ধরা পরেছে। কিন্তু আলী আহমদ খানের চোখে সিফাত খুবই ভদ্র ছেলে। আজ সকালেই আলী আহমদ খান ল্যাপটপে সিফাতকে ফ্যামিলি ফটো দেখাচ্ছিলেন। আবির অফিসে ঢুকতেই সিফাতের কন্ঠ কানে আসছে,

” মেঘ তে মাশাআল্লাহ অনেক সুন্দর হয়েছে। বিয়ে দেন নি কেনো এখনও? একদিন সময় করে মেঘকে দেখতে যাব সাথে সবার সাথে পরিচয়ও হয়ে যাবে।”

আলী আহমদ খান কথাটা তেমনভাবে গুরুত্ব না দিলেও আবিরের শরীর রাগে জ্বলছিল। আব্বুর সামনে কিছু বলতে পারছিল না আবার চুপ ও থাকতে পারছিল না। তারউপর মিটিং থেকে বের হতেই দেখল, সিফাতের ফোনের স্ক্রিনে আবিরদের ফ্যামিলি ফটোতে থাকা মেঘের ছবিটা বড় করে দেখছে। ঐ ছবি দেখে আবিরের মেজাজ তুঙ্গে। রাগে চিৎকার করতেই সিফাত ছবি কেটে দিয়েছে, ইকবাল খান দ্রুত ছুটে আসেন,ওনি কিছু না বুঝলেও আবিরের অগ্নিমূর্তি ধারণকৃত রূপ দেখে টেনে হিঁচড়ে আবিরকে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। আলী আহমদ খান তখনও নিশ্চুপ ছিলেন। সবকিছুতেই ওনার মনে হচ্ছিল, আবির সিফাতকে জব দিতে নিষেধ করেছিল আর সেই ক্ষোভেই সিফাতের সাথে রাগারাগি করে। তারউপর আলী আহমদ খান বলে বসেন, সিফাতকে বাসায় থাকার ব্যবস্থা করে দিবেন। এই কথা শুনে আবিরের রাগ তিনগুণ বেড়ে গেছিল। আলী আহমদ খানের সাথে রাগারাগি করে আবির তখনই অফিস থেকে বেড়িয়ে আসছিলো। নিজের অফিসে এসে কেবিনে বসার ১০ মিনিটের মধ্যে কল আসে, মেঘ শাড়ি পড়ে বাসা থেকে বেড়িয়েছে। একে আব্বুর উপর মেজাজ খারাপ, সবকিছু মিলিয়ে বিরক্ত তারউপর মেঘের আকস্মিক কর্মকাণ্ডে অনিচ্ছা সত্ত্বেও প্রেয়সীর কথা ভেবে বেড়িয়েছিল। আর এখনও হাসিমুখে মেঘকে সময় দিচ্ছে। তবে সেই বিকেল থেকেই ফোন সাইলেন্ট করে রেখেছে। আজ যা হবে খান বাড়িতেই হবে।

আবির মেঘের সাথে কথা শেষ করে মেঘকে নিয়ে নিচে আসলো। ততক্ষণে স্টাফদের প্রায় সবাই চলে গেছে। মিরাজ আর তার দু-তিনজন ফ্রেন্ড বসে আছে। আবিরদের নামতে দেখে শান্ত কন্ঠে বলল,
” ভাইয়া সবার খাওয়া শেষ। ওনারা যে যার মতো চলে গেছেন।”

আবির ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” আচ্ছা, কিন্তু রাকিবরা কোথায়?”

মিরাজ রাশভারি কন্ঠে বলল,
” রিয়া ভাবি কল দিয়েছিল, ওনি বোধহয় অসুস্থ। রাসেল ভাইয়াকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করে গেছেন, কল দিয়েছিলাম রিসিভ করেন নি। ”

“ওহ। রাকিবরা খেয়েছে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, সবার খাওয়া হয়েছে। ”

“তোমরা খেয়েছো?”

“না ভাইয়া, তোমরা খাওয়ার পর খাবো।”

আবির স্বাভাবিক কন্ঠে বলল,
” খেয়ে নিলেই পারতে। ”

আবির মেঘকে খাবার রেডি করে দিচ্ছে। আজকের সব খাবার রেস্টুরেন্ট থেকে আনানো৷ সন্ধ্যার দিকে মিরাজের ফ্রেন্ডরায় খাবার নিয়ে আসছে, সাথে ওয়ান টাইম প্লেট আর গ্লাসও নিয়ে আসছিল। মেঘকেও সেই প্লেটেই খাবার দিয়েছে আবির। মিরাজ আর ওর ফ্রেন্ডরা ছাদে গেছে। মেঘ জিজ্ঞেস করল,
“আপনি খাবেন না?”

“খেতে ইচ্ছে করছে না। যতক্ষণ না সবকিছু ঠিকঠাক হচ্ছে ততক্ষণ স্থির হতে পারছি না। ”

মেঘ আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে মোলায়েম কন্ঠে বলল,
” যা হবার হবে। সারাদিন খান নি, আগে খেয়ে নিন।
আমি খাইয়ে দেয়?”

আবির আড়চোখে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
” বাব্বাহ! বউ বউ ফিল এসে গেছে নাকি?”

মেঘ ভেঙচি কেটে বলল,
“দেখি, হা করেন। ”

আবির কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ খেয়ে নিল। খেতে খেতে তানভিরকে কল দিয়ে কথা বলে নিয়েছে। মিরাজকে আগেই বলেছিল আবির শার্ট আর প্যান্ট নিয়ে আসার জন্য। আবির পাঞ্জাবি, পায়জামা পাল্টে শার্ট প্যান্ট পড়ে মিরাজদের থেকে বিদায় নিয়ে রওনা দিল। আজ মিরাজরা এখানেই থাকবে আগামীকাল তানভির এসে সবকিছু গুছিয়ে রেখে যাবে। যাওয়ার আগে মেঘ হলুদ আর সাদা সবগুলো গোলাপ একসঙ্গে শপিং ব্যাগে করে নিয়ে গেছে৷ আসার সময় সময় কিছুটা দূরত্ব থাকলেও এখন বাইকে বসেই মেঘ পেছন থেকে আবিরকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে৷ আবির মুচকি হেসে নিজের একহাত মেঘের দু’হাতের উপর রেখে উদ্বেলহীন কন্ঠে বলল,
” বাসায় উল্টাপাল্টা কিছু বললে এভাবে জড়িয়ে ধরতে পারবেন তো?”

মেঘ আস্তে করে বলল,
“দেখা যাক। আপনি পারবেন?”

আবির মৃদু হেসে বলব,
” অবশ্যই, আমি একদম কোলে নিয়ে চলে আসবো।”

মেঘ মেকি স্বরে বলে উঠল,
“আমিও দেখব আপনার কেমন সাহস।”
“ওকে।”

আবির বাইক স্টার্ট দিল। মেঘ আবিরের প্রশস্ত পিঠে মাথা এলিয়ে আবিরের গায়ের গন্ধ উপলব্ধি করছে। অনেকটা পথ যাওয়ার পর মেঘ আচমকা ডাকল,

“আবির ভাই… ”

আবির তৎক্ষনাৎ ব্রেক কষল। বাইক থেকে নেমে মেঘের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গুরুতর কন্ঠে বলল,

” কথায় কথায় ভাই বলার অভ্যাস টা ত্যাগ করুন। আমি আপনার ভাই না, ওকে?”

মেঘ শান্ত স্বরে শুধালো,
“ভাই না ডাকলে কি ডাকব?”

“আবির ডাকবি।”

মেঘ চোখ বড় করে তাকিয়ে বলল,
“আমি পারব না।”

“কেনো?”

“স্বামীর নাম মুখে নিতে নেই আপনি জানেন না?”

আবির হাসতে হাসতে বলল,
” হায় রে কুসংস্কার। গত দুই বছরে আবির ভাই, আবির ভাই ডাকতে ডাকতে কান তব্দা করে ফেলছিল৷ এখন বলতেছিস স্বামীর নাম মুখে নিতে নেই। ”

মেঘ মুখ চেপে শক্ত কন্ঠে বলল,
“তখন আপনি আমার স্বামী ছিলেন না, চাচাতো ভাই ছিলেন। বুঝেছেন?”

“বুঝেছি। কিন্তু আর একবার যদি আবির ভাই বলেছিস তাহলে বামহাতে কানের নিচে এমন থা*প্পড় দিব, তিনদিন বেহুঁশ থাকবি।”

মেঘ হুঙ্কার দিয়ে উঠল,
” তাহলে ডাকব কি আমি?”

আবির নির্দ্বিধায় বলল,
“আহিয়ার আব্বু।”

মেঘ উদ্বেগপূর্ণ কন্ঠে প্রশ্ন করল,
” আহিয়া কে? ”

আবির মুচকি হেসে বলল,
“আমার মেয়ে।”

“হোয়াট? আপনার মেয়ে আসলো কোথা থেকে? ”

আবির দুষ্টামীর স্বরে বলল,
“মেয়ে আমার একার না, আমাদের দু’জনের মেয়ে আহিয়া৷”

“মেঘ নিজের পেটে হাত রেখে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“আমাদের মেয়ে মানে? আমার তো এখনও বিয়েই হয় নি। মেয়ে কোথা থেকে আসবে?”

আবির নিঃশব্দে হেসে মেঘের মাথায় আস্তে করে গাট্টা দিয়ে বলল,
“আরে বোকা মেয়ে, আমি আমাদের অনাগত সন্তানের কথা বলছি।”

মেঘ আহাম্মকের মতো তাকিয়ে বলল,
” ছিঃ আপনার কি লজ্জা লাগে না?”

“ওমা, লজ্জা লাগবে কেনো?”

“এইযে আজেবাজে কথা বলছেন। ”

” হবু সন্তানের কথা বউকে বলতে গেলে যদি লজ্জা পেয়ে হয় তাহলে এ নির্লজ্জময় জীবন আমি রাখবো না।”

মেঘ বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,
” ফাজলামি রেখে তাড়াতাড়ি বাসায় চলুন। আজ বাসায় যে কি হবে! দেখা যাবে আমার, আপনার জীবনই ঘূর্ণিঝড়ে উড়ে যাবে। তখন এই আহিয়া, আবিহা হাজার কেঁদেও তার বাপকে পাবে না। ”

আবির দু আঙুলে আলতোভাবে মেঘের নাক চেপে হেসে বলল,
“তারমানে আপনি মেনে নিচ্ছেন, আহিয়া আমার মেয়ে আর আপনি তার মা। ”

মেঘ ফোঁস করে উঠে আবিরের হাতে চিমটি কেটে বলল,
“আপনি কি যাবেন?”

আবির “উফফফ” করতে করতে বাইকে বসলো। বাইক স্টার্ট দিতে দিতে তপ্ত স্বরে বলল,
” অবোধ জামাইকে চিমটি কাটা মোটেই ভালো লক্ষণ না। ”

“আল্লাহ! বিয়ের খবর নাই আর ওনি জামাই জামাই করে বেহুঁশ হয়ে যাচ্ছেন। ”

আবির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
“বাসায় মানলে বিয়ে দুই তিনদিন পরে হবে আর বাসায় না মানলে রাতেই আপনাকে নিয়ে পালাবো।”

মেঘ আর কিছু না বলে আবারও আবিরকে জড়িয়ে ধরে বসলো। বুকের ভেতর চাপা কষ্টগুলো প্রকাশ করতে পারছে না, আজ বাসায় কি হতে চলেছে সেসব ভেবেই আঁতকে উঠছে বারবার। দীর্ঘসময় পর মেঘ আবিরের পিঠে মাথা রেখেই আস্তে করে ডাকল,
“এইযে…”

আবির নিরুত্তর। মেঘ আবারও ডাকল,
“এইযে শুনছেন…”

আবির এবারও নিরুত্তর। মেঘ গলা খাঁকারি দিয়ে মায়াবী কন্ঠে বলল,
” আহিয়ার আব্বু…”

“হুমমমম আহিয়ার আম্মু, বলো।”

মেঘ উদাসীন কন্ঠে শুধালো,
” আমার জন্য এতকিছু করলেন অথচ একবারের জন্যও I Love You বা ভালোবাসি বললেন না। কেনো?”

“ভালোবাসি না বললে কি ভালোবাসা যায় না? দুজন দু’জনের অনুভূতি বুঝতে পারাটা কি ভালোবাসা নয়? দু’জন দু’জনকে পাগলের মতো ভালোবাসতে চাইলে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা কি বলতেই হবে?”

মেঘ উত্তর খোঁজে পেল না৷ সত্যি ই তো, একজন আরেকজনের অনুভূতি বুঝা, পাশে থাকা, চাওয়া পাওয়ার মূল্যায়ন করা, দু’জন দু’জনকে সম্মান করা এগুলোই তো ভালোবাসার প্রতীক। মুখ ফোটে ভালোবাসি না বলেও বাবা মায়েরা আমৃত্যু সন্তানদের নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যান, স্বামী- স্ত্রী একে অপরের পরিপূরক হিসেবে সারাজীবন পাশে থাকেন, ভাই-বোনের সম্পর্কেও কেউ কাউকে ভালোবাসি বলে না অথচ কারো কোনো সমস্যা হলে সবার আগে ঝাঁপিয়ে পড়ে। তবে কেনো ভালোবাসি কিংবা I Love You শোনার এত প্রবণতা সবার মাঝে। প্রতিনিয়ত ‘ভালোবাসি’ বললেই কি সত্যিকারের ভালোবাসা খোঁজে পাওয়া যায়?
মেঘ আবিরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল৷ আর কিছু বলার বা শুনার ইচ্ছে নেই মেঘের। বাসার কাছাকাছি আসতে বেশ কিছুটা সময় লেগেছে। বাসা থেকে কিছুটা দূরে বাইক থামিয়ে দুজনেই নামল। পরপর কল দিল তানভিরকে। তানভির অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে কিছুক্ষণ হলো একটা কাজে গেছে। আসতে একটু সময় লাগবে। কয়েক ঘন্টা শাড়ি পড়ে হাঁটা চলা করায় শাড়ির যাচ্ছেতাই অবস্থা হয়ে গেছে। আবির মেঘের শাড়ির কুঁচি ঠিক করতে করতে বলল,

“একা যেতে পারবি নাকি তানভির আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করবি?”

“যেতে পারব।”

“শুন, কারো সঙ্গে কোনো কথা বলার প্রয়োজন নেই। সোজা নিজের রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে রেস্ট নিবি।”

“আচ্ছা। যাবো এখন ?”

“হুমমমম।”

মেঘ গোলাপগুলো হাতে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে যাচ্ছে। আবির নিষ্পলক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে। মেঘ কিছুদূর যেতেই আবির উচ্চস্বরে ডাকল,

“মাহদিবা খান মেঘ”

মেঘ সহসা থমকে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরল। আবির পূর্বের ন্যায় আবারও বলল,

” সাজ্জাদুল খান আবিরের মিসেস হবার প্রস্তুতি নিন। খুব শীঘ্রই আপনি আমার বেগম হচ্ছেন।”

মেঘ অবাক লোচনে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো। হাত নেড়ে বিদায় দিয়ে সামনে ঘুরলো। একপা বাড়াতেই আবির উদ্ধত কন্ঠে আবার বলল,

“I Love You Megh. I Love You Infinity. ”

মেঘ অতর্কিতে ঘুরে দাঁড়ালো, আশ্চর্য নয়নে তাকালো আবিরের মুখের দিকে। I love you শুনার অণুমাত্র ইচ্ছেও মেঘের ছিল না। অনাঙ্ক্ষিত কথাটা শুনে নিজের আবেগ আঁটকে রাখতে পারলো না। এক ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো আবিরকে। আহ্লাদী কন্ঠে বলল,
“I Love You Infinity.”

আবির মেঘের মুখটা তুলে কপাল বরাবর চুমু খেয়ে শান্ত স্বরে বলল,
” ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি
আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে। ”

মেঘের বিস্মিত আঁখি যুগল আবিরের চোখে নিবদ্ধ। ফাঁকা রাস্তা, কিছুটা দূরে থাকা ল্যামপোস্টের আলো আবিরের শ্যামলা চেহারায় পড়ছে মেঘ সেই মায়াময় আদলে তাকিয়ে থেকে আনমনে বলে উঠল,
” আপনি এত কিউট কেন?”

আবির মৃদু হেসে বলল,
” এখন কিন্তু শাস্তি দিব।”

মেঘ তৎক্ষনাৎ আবিরকে ছেড়ে কিছুটা সরে দাঁড়ালো। পরপর থমথমে কন্ঠে শুধালো,
“ভালোবাসি বলবেন না তো এখন বললেন কেনো?”

আবির তপ্ত স্বরে বলল,
” আমি তোর কোনো ইচ্ছে অপূর্ণ রাখব না তাই।”

মেঘ অত্যন্ত নমনীয় কন্ঠে বলল,
” আমার খুব ভয় হচ্ছে। ”

আবির হিজাবের উপর দিয়ে মেঘের দুগালে হাত রেখে চাপা স্বরে বলল,
” আমি আছি তো তোর পাশে। ভয় কিসের? আমি বেঁচে থাকতে তোর উপর একটা আঁচড়ও পড়তে দিব না। ”

মেঘ আবিরের থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেছে। আবির কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলো। মেঘের সামনে কিছু প্রকাশ করতে না পারলেও আবিরের বুকের ভেতর ভয়ংকর তোলপাড় চলছে। কি হবে বা হতে চলেছে সেসব ভেবেই গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মনে আতঙ্ক বাসা বেঁধেছে অনেক আগেই। তারউপর দুপুরে আব্বুর সাথে রাগারাগি করে অফিস থেকে বেড়িয়েছে, সারাদিন আব্বুর ফোনটা পর্যন্ত রিসিভ করে নি। মেঘ বাসায় ঢুকে গেছে। আবির পকেট থেকে ফোন বের করতেই দেখল আলী আহমদ খানের কল আসতেছে। আবির এবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে কলটা রিসিভ করল,আবির কিছু বলার আগেই আলী আহমদ খান উদ্বিগ্ন কন্ঠে বললেন,
“আবির, তুমি কি শোধরাবে না? কলের পর কল দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি অথচ তোমার কোনো খবর নেই। এত কিসের রাগ তোমার?”

আবির শান্তস্বরে বলল,
“বলুন।”

“আমি কি বলব? কি বলতে বাকি রাখছো তুমি? রাজশাহীর অফিসে সমস্যা হয়েছে। বিকেলের দিকে খুব মারামারি হয়েছে। এখনও পরিস্থিতি ভালো না। তোমার চাচ্চুর শরীর খারাপ অফিসেই আসে নি। এদিকে তুমি সারাদিন ধরে রাগ করে বসে আছো। বাধ্য হয়ে এখন আমাকেই যেতে হচ্ছে। ”

আবির উত্তেজিত কন্ঠেে বলল,
“আপনি যাচ্ছেন মানে? আপনাকে কোথাও যেতে হবে না। আমি এখনি আসছি। ”

আলী আহমদ খান রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,
” ব্যবসা যেহেতু আমায় সব দায়ও তো আমার ই। মরি আর বাঁচি ব্যবসায় করে যাবো। তোমরা তোমাদের রাগ নিয়ে থাকো।”

আবির কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
” আপনি কোথায় আছেন? ”

“বাসস্ট্যান্ডে।”

“আমি আসতেছি এখনি।”
“আসতে হবে না। ”
“আসতেছি আমি।”

এদিকে মেঘ শাড়ির আঁচলের নিচে ফুল আর আংটি পরিহিতা হাত লুকিয়ে বাসায় ঢুকলো। রান্নাঘরে মালিহা খান আর আকলিমা খান কাজ করছেন। আর কেউ নেই। এই সুযোগে মেঘ দ্রুত চলে যাচ্ছে। মালিহা খান অকস্মাৎ মেঘকে দেখে ডেকে উঠলেন,

” শাড়ি পরে কোথায় গিয়েছিলি তুই? এত রাত করে বাসায় আসছিস কেনো?”

মেঘ ছোট করে বলল,
“ঘুরতে গিয়েছিলাম।”

মেঘ আর কোনো কথা না বলে দ্রুত নিজের রুমে চলে গেছে। একদম শাওয়ার শেষ করে বিছানায় শুয়েছে। বন্যার কথা মনে হতেৎ সঙ্গে সঙ্গে বন্যাকে কল দিল। আজকের সব ঘটনা একে একে বলছে।

আবির দ্রুত বাসস্ট্যান্ড পৌছালো। আলী আহমদ খান ব্যাগ নিয়ে ব্রেঞ্চে বসে বসে চা খাচ্ছেন। আবির সামনে গিয়ে ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
” আব্বু, আপনি বাসায় যান, আমি যাচ্ছি।”

“এভাবে কিভাবে যাবে? বিকেল থেকে অনবরত কল দিচ্ছি তোমাকে, ইকবাল এমনকি মোজাম্মেলকে দিয়েও কল দেয়ালাম ৷ আর তুমি কি করলে? কল রিসিভ করার প্রয়োজন মনে করলে না। এখন এসে বলছো, তুমি যাবে৷ মজা করছো?”

“সরি আব্বু, আর এমন হবে না।”

আলী আহমদ খান রাগান্বিত কন্ঠে হুঙ্কার দিলেন,
” এখন সরি বলতে হবে না। যাও রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকো, প্রয়োজনে ৭ দিন বসে থাকো। আমি চলে যাচ্ছি, তোমাকে আর কেউ বিরক্ত করবে না। ”

আবির শীতল কন্ঠে বলল,
“সরি, আব্বু। আর এমন করবো না। রিয়েলি সরি। এই আমি কানে ধরছি..”

আলী আহমদ খান চায়ের কাপ রেখে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে আবিরের হাত আঁটকে বললেন,
” কানে ধরতে হবে না। বাবা মায়ের কাছে সন্তানের হাজারটা ভুলও কিছুই না। ”

আবির মলিন হেসে বলল,
“রাজশাহী আমি যাচ্ছি, আপনার এই শরীর নিয়ে এতদূর যেতে হবে না।”

“তুমি তো জামাকাপড় পর্যন্ত নিয়ে আসো নি। কিভাবে যাবে?”

“দু একটা জামাকাপড় কিনে নিব। সমস্যা নেই।”

“তোমার বাইক কি করবা?”

“তানভির এসে বাইক আর আপনাকে নিয়ে যাবে। কোনো সমস্যা নেই। আমি ওকে কল দিচ্ছি।”

“ঠিক আছে, যাও। কিন্তু আজকের ঘটনার মতো যদি ওখানেও কারো সাথে রাগারাগি করেছো আর আমার কানে খবর আসছে, তাহলে তুমি কানে ধরেও মাফ পাবে না। এই আমি বলে দিলাম।”

আবির ধীর কন্ঠে বলল,
“কারো সঙ্গে রাগারাগি করবো না কিন্তু আমি ফেরার পর আপনার সাথে আলাদাভাবে কথা বলতে চাই। ”

আলী আহমদ খান ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
“হ্যাঁ। কি বলবা এখনি বলো।”

আবির মৃদুস্বরে বলল,
” এখন না। রাজশাহী থেকে এসে বলল।”

“আচ্ছা। তোমার ইচ্ছে । ওখানে যদি বেশি সমস্যা হয় তাহলে জানিয়ো। মোজাম্মেল এর শরীর ভালো হলে ওকে পাঠাবো । ”

“আচ্ছা। ”

বাস ছাড়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। আবির টিকেট নিয়ে বাসে ওঠে বসেছে। তানভির এসেছে অনেকক্ষণ পর। আবির রাজশাহী যাচ্ছে দেখে তানভির থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে। বড় আব্বুর সামনে মুখ ফোটে কিছু বলতেও পারছে না। কিছুক্ষণের মধ্যে বাস ছেড়ে দিয়েছে। আলী আহমদ খান তানভিরের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“চলো, এখন।”

তানভির ভারী কন্ঠে বলল,
“জ্বি। ”

আবিরের বাস ছাড়ার কিছুক্ষণ পরেই আবির মেঘকে কল দিল। মেঘ বন্যার কল কেটে আবিরের কল রিসিভ করে চিন্তিত স্বরে জানতে চাইল,
“কোথায় আপনি? আর কখন আসবেন?”

আবির ধীর কন্ঠে বলতে শুরু করল,
” আমাকে ইমার্জেন্সি কাজে রাজশাহী যেতে হচ্ছে, বাস অলরেডি ছেড়ে দিয়েছে। তোকে যা বলি একটু শুন, হাতের আংটি টা খুলে কোথাও লুকিয়ে রেখে দে। আমি আসলে আবার পড়িয়ে দিব। আর এই ২-৩ দিন খুব বেশি সাবধানে থাকবি৷ প্রয়োজনে সারাদিন ঘুমাস, তবুও বাসার কারো মুখোমুখি হোস না। বাসায় কোনো মেহমান আসলে বা তোকে দেখার নাম করে কেউ আসলে ভুলেও সামনে যাস না। আর অবশ্যই আমাকে জানাবি। সামান্য কোনো বিষয়েও বাড়াবাড়ি করতে যাস না, সামান্য কোনো কারণে তোর গায়ে যেন কোনো আঁচড় না পড়ে। যেভাবে রেখে গেলাম তিনদিন পর যেন সেভাবেই পায়৷ একটা কথা মনে রাখিস, তোর কিছু হলে আমি সত্যি মরে যাব। আমি তোকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি।”

#চলবে