আমৃত্যু ভালোবাসি তোকে পর্ব-৯৭+৯৮

0
4483

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৯৭
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

” চোখ বেয়ে যদি এক ফোঁটা পানি পরে আর কিঞ্চিৎ মেকআপও নষ্ট হয় তাহলে তোর খবর ই আছে। দুই ঘন্টা রাস্তায় বসে থেকে তোকে সাজিয়ে নিয়ে আসছি, আমি কিন্তু আর পার্লারে নিয়ে যেতে পারব না। ”

মেঘ তানভিরের মুখের পানে চেয়ে মৃদু হাসার চেষ্টা করল। তানভির সামনে গিয়ে যেই ফ্লোর থেকে রি*ভ*ল*বার উঠাতে যাবে ওমনি আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন,
“এটা আমায় দাও, এইটুকু ছেলের হাতে এসব থাকতে হয় না। আজ থেকে এটা আমার কাছেই থাকবে।”

তানভির রি*ভ*লবা*র উঠিয়ে আবিরকে একপলক দেখে নিল। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সে এখন এই জগতে নেই। বড় আব্বুর কথামতো তানভির রি*ভল*বার বড় আব্বুর হাতে দিয়ে দিল।
মোজাম্মেল খান কপট দুষ্টামির স্বরে বললেন,
” ভাইজান, তুমি যেন কেন কিনছিলা? আর কত বছর বয়সে কিনছিলা?”

” আমি রাজনীতি করতাম অনেকের সাথে শত্রুতা ছিল তাই নিজের নিরাপত্তার জন্য কিনেছিলাম। বয়স যতই হোক সেটা বড় বিষয় না।”

মোজাম্মেল খান হেসে বললেন,
” তোমার নিরাপত্তার প্রয়োজন আছে আর আমার মেয়ের জামাইয়ের কি নিরাপত্তার প্রয়োজন নেই? আমার একমাত্র মেয়েকে দিয়ে দিচ্ছি, নিরাপদে রাখতে না পারলে বুঝাবো পরে।”

তানভির দুই ভাইয়ের কথা শুনে মুখ চেপে হাসছে। আবির তখনও মেঘকে জড়িয়েই বসে আছে। মোজাম্মেল খানের কন্ঠে আমার জামাই শব্দটা কানে বাজতেই আবিরের কান্না কমে এসেছে। আলী আহমদ খান চাপা স্বরে বললেন,

” আজ ই আমার ছেলেকে নিজের জামাই বলতে শুরু করে দিয়েছিস! ”

মোজাম্মেল খান স্ব শব্দে হেসে বললেন,
” আমার আরও আগে থেকেই জামাই ডাকা উচিত ছিল। শুধুমাত্র তোমার মন খারাপ হবে ভেবে এতদিন ডাকি নি। চ্যালেঞ্জে তো সেই কবেই জিতে গেছি আমি। ”

আলী আহমদ খান গুরুগম্ভীর কন্ঠে বললেন,
” চ্যালেঞ্জে জিতেছিস বলেই তো এতদিন এত খোঁচা দিয়েছিস আমায় আর আমি চুপচাপ সহ্য করেছি। কিন্তু তোকে আমি আগেই বলেছিলাম, চ্যালেঞ্জে তুই জিতলেও আমি হার মানবো না।দেখলি তো, আমি হার মানি নি আর মানবোও না। আর একটা কথা, খুশি হইতেছিস হ, তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই কিন্তু আমাকে আর খোঁচাতে আসিস না। দোয়া কর যেন তোর জিত হারে পরিণত না হয়। ”

আলী আহমদ খান পুনরায় গিয়ে সোফায় বসলেন, মোজাম্মেল খান পেছন পেছন যেতে যেতে শুধালেন,
” তুমি কি বলতেছো ভাইজান? বুঝিয়ে বলো।”

তানভির কিছু বলতে যাবে তখনি মীম, আদি, আইরিন, আরিফ, জান্নাত, আসিফদের হৈচৈ শুনতে পেল। আকলিমা খান, মাহমুদা খান, ইকবাল খান একসঙ্গে বাসায় ঢুকেন। ইকবাল খান প্রথমে ঢুকে আবির মেঘকে দেখেই গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন,

” আবির, আশেপাশে ছোট ভাই বোনেরা আছে। ”

মীমদের হৈ-হুল্লোড়ের শব্দ কানে ঢুকতেই আবির মেঘকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। জান্নাত, আসিফ, আরিফ মিটিমিটি হাসছে। তারাও যে দেখেছে চোখ মুখের ইশারায় সেটায় বুঝাচ্ছে। ওদের সবার হাতে বেশ কয়েকটা করে শপিং ব্যাগ। মালিহা খান সবার পেছনে ছিলেন, ওনি ভেতরে এসে আবিরের চোখে পানি দেখে এগিয়ে গেলেন, ছেলের চোখ মুছতে মুছতে ঠান্ডা কন্ঠে বললেন,
” কাঁদছিস কেনো?”

আলী আহমদ খান সবাইকে একপলক দেখে মালিহা খানকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
” তোমরা এত দেরি করে আসলে কেনো? আর কিছুক্ষণ আগে আসলেই ছেলের করুণ পরিণতি দেখতে পারতে। তখন তুমিও ছেলের মতো বসে বসে কান্না করতে।”

আবির শীতল কন্ঠে বলল,
” আম্মু, তুমিও কি জানতে? ”

“জানতাম, তবে এতকিছু জানতাম না। গতকাল সন্ধ্যার পর তোর আব্বু সবাইকে ডেকে হুট করে তোর আর মেঘের বিয়ের কথা বলে বসলেন। কারো কোনো আপত্তি আছে কি না জিজ্ঞেস করলেন, যেখানে তোর আব্বু নিজে থেকে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আর ঘরের মেয়ে ঘরে থাকবে এতে আমাদের তো খুশিই হওয়ার কথা। তারপরও আমার তোকে নিয়ে একটু ভয় ছিল, তুই রাজি হবি কি না! তখন তোর আব্বু বললো তোর মতামত জেনেই ওনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাই আমিও রাজি হয়ে যায়। তোর আব্বু সবাইকে শর্ত দেন, যেন তুই আসার আগ পর্যন্ত বাসার কেউ কোনোভাবে তোকে কিছু না জানায়। তুই তো জানিস, ওনার কথা অমান্য করা আমার পক্ষে সম্ভব না, তাই তোকে কিছু জানাতে পারি নি।”

মালিহা খান শ্বাস ছেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে আবিরকে আবারও জিজ্ঞেস করলেন,
” তুই মেঘকে বিয়ে করতে রাজি তো? নাকি অন্য কাউকে পছন্দ করিস?”

আবির শীতল চোখে মালিহা খানের মুখের পানে তাকিয়ে রইলো। মালিহা খান যে এসবের কিছুই জানেন না এটা বুঝতে সময় লাগল না। আবির কিছু বলার আগেই আলী আহমদ খান পকেট থেকে একটা ফোন বের করে টেবিলের উপর রাখতে রাখতে মেকি স্বরে বলে উঠলেন,
” যে ছেলে ৫১৪৬ মিনিটে ৫৭৩৮ বার কাউকে কল দিতে পারে তাকে তুমি জিজ্ঞেস করছ সে বিয়ে করতে রাজি আছে কি না! কি সুন্দর দৃশ্য! ”

মালিহা খান কপাল গুটালেন। মোজাম্মেল খানও আশ্চর্য নয়নে তাকালেন। আবির ভ্রু কুঁচকে এগিয়ে গেল সোফার কাছে, পিছু পিছু মেঘও এগিয়ে গেল। মালিহা খান চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
” কিসের ৫ হাজার কত মিনিট আর ৫ হাজার কত কলের কথা বলছেন। কি হয়েছে?”

আলী আহমদ খান ফোনটা হাতে নিয়ে সবাইকে দেখিয়ে বললেন,
” এই যে ফোনটা, এটা মেঘ মামনির ফোন। গত তিন-চারদিন যাবৎ আমার কাছে রেখেছিলাম। একবার ভেবেছিলাম বন্ধ করে রাখব কিন্তু ছেলেকে পরীক্ষা করতে ফোনটা ইচ্ছে করেই খুলে রেখেছিলাম। বিশ্বাস করবা না, মিনিটে ২-৩ বার করে কল দেয়। আর আমি ফোনের দিকে তাকিয়ে কেবল ভাবছিলাম, এই পাগল ছেলে আমার হতে পারে না। ”

সবার নজর আবিরের দিকে। আবির কিছুটা লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিয়েছে। মেঘ ফিসফিস করে বলল,
” আমি ভাবতেও পারি নি, আপনি এত কম কল দিবেন। অন্ততপক্ষে ১০ হাজার কল আশা করেছিলাম।”

আবির ভ্রু কুঁচকে ভারী কন্ঠে বলল,
” মুখ টা বন্ধ রাখুন নয়তো আপনার কপালে দুঃখ আছে।”

মালিহা খান উত্তেজিত কন্ঠে বললেন,
” আবির তাহলে মেঘকে আগে থেকেই পছন্দ করে।”

মোজাম্মেল খান ঠাট্টার স্বরে বললেন,
“ভাবি, আমি এই কথাটায় ভাইজানকে গত এক বছর যাবৎ বুঝাচ্ছিলাম। কিন্তু ওনি কিছুতেই বুঝতে চাইছিলেন না, ওনার একটায় কথা ওনার ছেলে এমন কাজ করতেই পারে না। ভাইজান কেমন মানুষ এটা তো আপনার অজানা নয়।”

আবির-মেঘ দুজনেই আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে আছে। বাকিরা সবাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। মালিহা খান অবাক চোখে তাকিয়ে বলে উঠলেন,
“এক বছর?”

মোজাম্মেল খান তপ্ত স্বরে বলতে শুরু করলেন,
” আমি এক বছরের আরও ৩-৪ মাস আগে জানতে পেরেছি। আমার এক বন্ধু একদিন আমাকে আবির আর মেঘের একটা ছবি পাঠিয়েছিল, সে আবিরকে চিনতে পারে নি। মেঘকে এক ছেলের সাথে দেখে আমাকে জানানোর জন্য ছবিটা পাঠিয়েছিল। ছবিটা দেখে আমার অবশ্য ঐরকম কিছু মনে হয় নি। কিন্তু মেয়ের বাবা যেহেতু তাই মনে একটু সন্দেহ ঢুকেছিল।যেখানে আবির বাসায় মেঘের সাথে ঠিকমতো কথা বলে না, যতটুকু বলে সেটাও বড় ভাইয়ের মতো, ফরমাল কথাবার্তা সেখানে আড়ালে সে আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই থেকে আমি পর্যবেক্ষণ শুরু করলাম, আবিরের হালচাল বুঝতে বেশি সময় লাগলো না। মেঘ, মীম দুজনের প্রতি আবির যথেষ্ট পসেসিভ কিন্তু মেঘের প্রতি একটু বেশিই। সারা দুনিয়ার খবরেও তার বিশেষ মনোযোগ নেই যেই মেঘের বিষয়ে কথা উঠে ওমনি সে মনোযোগী শ্রোতা হয়ে যায়। আজ পর্যন্ত আবির হাতে গুনা দু একদিন মেঘকে বাসা থেকে বাইকে নিয়ে বেড়িয়েছে অথচ সে প্রায় ই মেঘকে নিয়ে শহরে ঘুরে। দু-একবার আমি নিজের চোখে দেখেছি। তাদের রাস্তায় দেখে, আমি বাসায় এসে তাদের জন্য অপেক্ষা করতাম কিন্তু মেঘ আসলেও সাথে আবির থাকতো না। আমার বন্ধু, ছোট ভাই, বড় ভাই যারা আমার মেয়েকে চিনে তাদের সাথে দেখা হলেই বলতো, তোর মেয়েকে এখানে দেখেছি, ওখানে দেখেছি সাথে তোর ভাইপো ছিল। ভাইজানকে বলায় ওনি বিষয়টা পাত্তায় দেন নি উল্টো আমায় যা খুশি বলেছেন। ঐরকম শক্ত প্রমাণ ছিল না বলে আমিও অনেকদিন ভাইজানকে কিছু বলতে যায় নি। হঠাৎ একদিন আমি অফিস থেকে ফিরছিলাম, সন্ধ্যার পর হয়ে গেছিল। দেখলাম আমাদের বাসা থেকে কিছুটা দূরে মেঘ আবিরের বাইক থেকে নামছে। আমি আনমনেই সেখানে দাঁড়িয়ে পড়লাম। সামনেই বাসা এখানে নামার কারণ খোঁজে পেলাম না তবুও তাকিয়ে রইলাম। মেঘ বাসার গেইট পর্যন্ত ঢুকতেই আবির বাইক স্টার্ট দিয়ে চলে গেছে৷ আমাকে দেখেছে কি না জানি না কিন্তু সেদিন আমি আমার সন্দেহের সত্যি প্রমাণ পেয়ে গিয়েছিলাম । বাধ্য হয়ে ভাইজানকে বিস্তারিত ঘটনা খুলে বললাম কিন্তু ওনি পূর্বের ন্যায় একই আচরণ করলেন। ওনার চোখে ওনার ছেলে নিষ্পাপ। ওনার একটায় কথা আবির এমন ছেলে ই না। ”

আলী আহমদ খান এবার ঠান্ডা কন্ঠে বলতে শুরু করলেন,
” কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমি আবিরকে চিনতে বা বুঝতে ভুল করেছিলাম। আবিরের এত বছর বয়সে আমি কোনোদিনও কোনো বিষয়ে তাকে নিষেধাজ্ঞা দেয় নি। রাজনীতি করতে নিষেধ করেছিলাম কিন্তু সেটা আমার নিষেধাজ্ঞা ছিল না, আমি আবিরকে সবটা বুঝিয়ে বলেছিলাম তারপর সে নিজেই ছেড়ে দিয়েছিল। দেশের বাহিরে গেছে তার ইচ্ছায়, দেশে আসছে তার ইচ্ছায়, বাইক কিনা, বিজনেস স্টার্ট করা, ব্যাংক থেকে টাকা তুলা এছাড়াও বাকি যা কিছু করেছে তার কোনোকিছুতেই আমি আবিরকে নিষেধাজ্ঞা দেয় নি। আমি শুধু কারণ জানতে চেয়েছি। কোনো কিছু করতে বারণ করলেও কেনো বারণ করি সবসময় সেটায় বুঝাতে চাইতাম। হঠাৎ কোনো কারণে রাগ দেখালেও অফিসে বসে চা খেতে খেতে ছেলেকে ঠান্ডা মাথায় সব বুঝিয়ে বলতাম, এগুলো তোমরা জানো? না, জানো না।
ছেলেদের বয়স ২০-২৫ বা তার উপরে গেলেই বাবা ছেলের সম্পর্কে বিশাল ফাটল ধরে যায়। সেই ফাটলের কেন হয় তা জানা নেই। আমাদের সম্পর্কে আমি সেই ফাটলটা ধরাতে চায় নি। আমি সবসময় একজন দায়িত্বশীল, নিষ্ঠাবান আর ভালো বাবা হবার চেষ্টা করতাম। আমি নিজের নীতি নৈতিকতায় যতই কঠোর থাকি না কেন, আবিরের জন্য সবসময় নিজের বেস্টটায় করেছি। আমার ছেলে আমাকে তার বন্ধু ভাববে, তার মনের কথা বলবে, কাউকে ভালো লাগার কথা আমাকে জানাবে। আমি কি সেটা আশা করতে পারি না? আবিরের যখন যা প্রয়োজন ছিল সে নির্দ্বিধায় চেয়েছে, তাহলে মেঘকে কেনো চাইতে পারল না? আমার ছেলের ভালোবাসার কথা অন্য কারো মুখে কেনো শুনতে হলো আমায়? আমার বার বার মনে হতো আবির মেঘকে পছন্দ করলে নির্দ্বিধায় আমাকে বলবে। আমি আমার জায়গায় কনফিডেন্ট ছিলাম। ওটায় কি আমার ভুল ছিল?”

মাহমুদা খান, মালিহা খান, হালিমা খান সবাই নিশ্চুপ। মেঘ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আবির কন্ঠ দ্বিগুণ ভারি করে বলতে শুরু করল,

” সরি আব্বু। আপনি আপনার জায়গাতে ঠিক থাকলেও আমার মনে ভয় ছিল। একটা সময় পর্যন্ত আপনি সত্যি আমার বন্ধুর মতো ছিলেন, কখনো কিছু চাইতে গেলে বা বলতে গেলে দ্বিধা বোধ করি নি। এমনকি আম্মুর সাথেও এত কথা শেয়ার করি নি যত কথা আপনার সাথে শেয়ার করেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে বড় হচ্ছিলাম আর না চাইতেও দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছিল। ছোটখাটো কোনো বিষয় নিয়ে আপনাদের অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি টা মনে প্রতিনিয়ত দাগ কাটছিল। আপনাদের ব্যবসা, সমাজ আর পরিবারের মানসম্মান আপনাদের কাছে এটায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে বাড়ির সন্তানদের সঠিক মূল্যায়ন দিতে ভুলে যাচ্ছিলেন। আশেপাশের মানুষ কি বলল, সমাজ আপনাদের কতটা মূল্যায়ন করলো, কোথায় আপনাদের স্ট্যাটাস ভালো সেসব নিয়ে এতটায় ব্যস্ত হয়ে পরেছিলেন যে বাসায় কোন ছেলেটার মন খারাপ, কোন মেয়েটার মন খারাপ, ঠিক কি কারণে মন খারাপ সেটা জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করতেন না। ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়লো, মনের টান কমলো। তবুও বলব আপনি সত্যি একজন দায়িত্বশীল বাবা ছিলেন এবং আছেন৷ আমার পড়াশোনা চলাকালীন সময়ে আপনি সব ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিদিন আমায় কল দিয়েছেন, খোঁজ নিয়েছেন। আপনার আশেপাশে মানুষের ভিড় থাকলেও আমার কলটা রিসিভ করে বাবার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি বাবা হিসেবে বেস্ট ছিলেন আছেন এবং থাকবেন। কিন্তু ঐ যে বললাম বন্ধুর মতো, ঐ বন্ধুর মতো সম্পর্কটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। মন খুলে কিছু বলতে ভয় পেতাম। তবুও সাহস নিয়ে নিজেকে গোছাচ্ছিলাম, বাসায় মেঘেকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়ার জন্য যতটা সম্ভব মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। হঠাৎ দেশে ফেরার এক বছর আগে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে ফুপ্পির সাথে আমার পরিচয় হলো। ফুপ্পির সম্পর্কে, এই বাসার নিয়ম নীতি সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে আমি দিশা হারিয়ে ফেলেছিলাম। কি করব কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। যেখানে একমাত্র বোনের ভালোবাসার সম্পর্ক মেনে না নিয়ে ২৭ বছর সম্পর্ক ছিন্ন রাখতে পারেন সেখানে আমি কে? আপনার নিয়মনীতি আর মানসম্মানের জন্য আপনি সব করতে পারেন৷ মেঘকে না জোর করে আমার থেকে আলাদা করে দেন সেই ভয়ে বাসায় ফিরে মেঘের কথা আপনাদের বলা তো দূর মেঘের সাথেই
ঠিকমতো কথা বলতে সাহস পেতাম না। মেঘের থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখতাম, ওর চোখে চোখ রাখতে পারতাম না৷ প্রতিনিয়ত ভয় হতো,আপনাদের নিয়মনীতির ভিড়ে এই বুঝি আমি ও কে হারিয়ে ফেলব।”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
” তারমানে তোমার ফুপ্পির সাথে তোমার আগে থেকেই পরিচয় ছিল? অবশ্য এটা আমি আগেই সন্দেহ করেছিলাম। রাকিব তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড, তার বোনকে তানভিরের মাধ্যমে বাসায় আনিয়েছো। রাকিবের বোনের বিয়ের খবর তোমার অজানা থাকার কথা না আর সেখানে তার শ্বশুর শ্বাশুড়ির সাথে পরিচিত হওয়াটাও অস্বাভাবিক কিছু না। কিন্তু তুমি যেসব ভেবে ভয় পেয়েছিলে সেটা নিতান্তই তোমার ভুল ধারণা ছিল। তোমার ফুপ্পির ঘটনা আজ থেকে বহু বছর আগে, তখনকার পরিস্থিতি বর্তমানের মতো ছিল না। তখন সমাজ প্রেমের বিয়েকে এত সহজ ভাবে মেনে নিতোও না। কোনো বাড়ির মেয়ে পালিয়ে গেলে বা নিজের মতো বিয়ে করলে ঐ এলাকায় সেই মেয়ের আর তার পরিবারের নামে দুর্নাম ছড়িয়ে পড়তো। সমাজের চোখে সেই পরিবার বিষাক্ত হয়ে যেত। বর্তমানে যুগ পাল্টে গেছে, প্রেমের সম্পর্ক মেনে নিতে পরিবার আর আগের মতো দ্বিধা করে না। ”

ইকবাল খান শান্ত স্বরে বললেন,
” সব ই বুঝলাম কিন্তু তোমরা যেহেতু সব জানতে আর মেনেই নিয়েছিলে তাহলে এতদিন কেন কিছু বললে না।”

মোজাম্মেল খান ধীর কন্ঠে বললেন,
” বললাম না, আমি মানলেও ভাইজান মানতে চান নি।”

“তারপর কি হয়েছে? কাল ই বা হঠাৎ ভাইজান মেনে নিলেন কিভাবে?”

“কাল হঠাৎ মানলেন কেন এটা আমিও জানি না। কিন্তু ভাইজান এমনিতেই মেনে নেন নি এটা সিউর। একবছর আগে আমি যখন ভাইজানকে বিস্তারিত বলেছিলাম তখন ভাইজান বিশ্বাস করেন নি, তখন আমি বলেছিলাম যেন আবিরকে ওনি পরীক্ষা করেন। আবিরকে বিয়ের কথা বললে আবির কিভাবে রিয়েক্ট করে সেটায় বুঝতে চাইছিলাম। আবির স্পষ্টবাদী ছেলে তাই ভেবেছিলাম সে মেঘের কথা বলে দিবে কিন্তু সে বলল না। ভাইজান খাবার টেবিলে বসে আমার দিকে তখন অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাই আমিও আবিরকে রাগানোর জন্য অন্য মেয়ের কথা বলেছিলাম, যেন মনের কথা বলে দেয়। আবির এমনভাবে রিয়েক্ট করল, সাথে ১ বছরের জন্য বিয়ে স্থগিত করে দিল। সবার সামনে কিছু না বললেও ভাইজান আড়ালে আমায় যাচ্ছেতাই কথা শুনিয়েছে। আবির মেঘকে ঐ নজরে দেখে না, পছন্দ করে না হেনতেন আরও অনেক কিছু। তখন আমার ভেতরেও জেদ ঢুকে। আমিও ভাইজানের সাথে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম, আবির মেঘকে পছন্দ করে এটা আমি প্রমাণ করেই ছাড়বো। তারপর শুরু হলো মেঘের জন্য ছেলে দেখা। আমার খুব কাছের বন্ধু দেশে ফেরায় এমনিতেই তাকে আর তার বিবাহিত ছেলেকে বাসায় দাওয়াত দিলাম। আবিরকে শুনিয়ে বললাম মেঘকে দেখতে আসবে। ভেবেছিলাম আবির রিয়েক্ট করবে। কিন্তু না, আবির কোনো প্রকার রিয়েক্ট করল না, মুখ ফুটে কিছু বললও না। তানভির একায় রাগারাগি করল। ভাইজানের সামনে আবারও প্রমাণ হয়ে গেল আমি ভুল ওনি ঠিক। ভাইজানের কাছে ভুল প্রমাণিত হলেও বিকেলে যখন বন্ধু আর তার ছেলে বাসায় না আসায় আমি আমার সত্যতার প্রমাণ পেয়েছিলাম। দ্বিতীয়বার তানভির, আবিরকে না জানিয়ে ছেলে আনার সিদ্ধান্ত নেয়, সেবারও আবির কোনো না কোনোভাবে খবর পেয়ে গেছিল হয়তো খবর টা বাসা থেকেই কেউ দিয়েছিল। তখন ভাইজান আমাকে বলছিলেন, আমি ছেলে বাসায় এনে তারপর যেন ওনাকে জানায়। ওনার কথার আসল মিনিং এটায় ছিল, মেঘের বিয়ে ভাঙার ব্যাপারে আমি শুধু শুধু আবিরকে সন্দেহ করছি, আবির এসবের কিছুই জানে না, পারলে ওনার সামনে প্রমাণ করতাম নয়তো আবিরকে দোষারোপ না করতে। আমিও সেই কথা মাথায় রেখে ছেলে নিয়ে বাসায় আসলাম। হুট করে আবির বাসায় এসে চিৎকার করলো, নিজের ভালোবাসার কথা প্রকাশ না করে উল্টো ছয়মাস বিয়ে বন্ধের হুঙ্কার দিল। আমি মেনে নিয়েছিলাম, কারণ আমি সেদিন জিতে গিয়েছিলাম। ভাইজানের সামনে প্রমাণ করে দিয়েছিলাম মেঘের প্রতি আবিরের অন্যরকম টান আছে। কিন্তু ভাইজান মানতে পারলেন না। ওনি আমার কাছে হেরে গেছেন এটা ওনি মানতেই পারছিলেন না৷ আমার জেতার খুশি সহ্য করতে না পেরে ভাইজান আবিরের উপর ইচ্ছেমতো রাগ ঝাড়লেন, আবিরও রাগ করে বাসা ছেড়ে চলে গেল। দুতিনদিন পর ভাইজানের রাগ কিছুটা কমেছে, তখন নিজের হার মেনে নিয়ে আবিরকে বাসায় আনার চেষ্টা করেছেন। তবে এটা ঠিক ভাইজান বহুবার চেষ্টা করেছেন, আবির যেন মেঘের কথা ভাইজানকে জানায় তারজন্য ভাবি কে দিয়েও চেষ্টা করিয়েছেন৷ আবির বাহিরে যাওয়ার আগের দিন সকালেও ভাইজান আবিরকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আবির কিছু বলতে চায় কি না! কিন্তু আবির কিছু না বলেই চলে গিয়েছিল, এদিকে ভাইজান নিজের হার মন থেকে মানতে পারছিলেন না তাই প্রতিনিয়ত আমার সাথে ফোঁস ফোঁস করতেন৷”

#চলবে

#গল্পঃ_আমৃত্যু_ভালোবাসি_তোকে_
#পর্বঃ_৯৮
#লেখিকাঃ_সালমা_চৌধুরী_

খান বাড়িতে খনিকের নিস্তব্ধতা বিরাজমান। সবাই এতক্ষণ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে মোজাম্মেল খানের কথাগুলো শুনছিল৷ মেঘ আবিরের মুখের পানে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে, কিন্তু আবিরের অভিব্যক্তি ঠিক বুঝা যাচ্ছে না। ইকবাল খান আর মোজাম্মেল খান টুকটাক কথা বলছেন বাকিরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ডেকোরেশনের জন্য আসা ৩-৪ জন ছেলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ছাদে যাচ্ছে, সিঁড়ির কাছাকাছি যেতেই আলী আহমদ খান হুঙ্কার দিলেন,

” তোমাদের আর কতক্ষণ লাগবে? বাসায় মেহমান আসার সময় হয়ে গেছে অথচ তোমাদের কাজ ই শেষ হচ্ছে না।”

“বেশিক্ষণ লাগবে না আংকেল।”

” এই কথা সকাল থেকে শুনে আসছি। এমন তাড়াহুড়োতে কাজ করেছো যে বিয়ে বাড়িকে পুরো স্বাধীনতা দিবসের সাজে সাজিয়ে ফেলছো। শুধু লাল সবুজ দিয়ে কেউ বিয়ে বাড়ি সাজায়?”

“সরি, আংকেল। সত্যি বলতে, তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে আগে চেক করতে মনে ছিল না। এখন আর ভুল হবে না।”

” শুনো, আমার একমাত্র ছেলের বিয়ে বলে কথা৷ এমনভাবে সাজাবে যেন বাড়ির সাজ দেখেই এলাকার মানুষ তাক লেগে যায়। টাকা নিয়ে একদম ভেবো না।’

” জ্বি আংকেল। ”

ছেলেগুলো ছাদে চলে যাচ্ছে। মোজাম্মেল খান আচমকা ধীর কন্ঠে বললেন,

“ভাইজান, একটা কথা বলি?”

“হ্যাঁ”

মোজাম্মেল খান শীতল কন্ঠে বললেন,
“আমি একবছর যাবৎ ওদের বিয়ের কথা বলতেছি তবুও তুমি রাজি হলে না। হঠাৎ কি এমন হলো যে হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিলে তাও আবার আগামীকালই বিয়ে।”

আলী আহমদ খান মলিন হেসে বললেন,
“তোর ছেলের জন্য।”

“মানে?”

“তানভির বলছে, মেঘকে আবিরের কাছে বিয়ে না দিলে আবির নাকি ম* রে যাবে।”

সবাই অতর্কিতে আবিরের দিকে তাকালো। অথচ আবির রুষ্ট চোখে তানভিরের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে রাগান্বিত কন্ঠে বলল,
“শালা, ম*রে যাওয়ার কথা বলতে বলছি তোকে?”

তানভির ঠোঁট চেপে ডানহাতের দু আঙুলে কান ধরে বিড়বিড় করে বলল,
“সরি, মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেছিলো।”

“দূর, শালা।”

তানভির কপট রাগী স্বরে বলল,
“শালা না সম্বন্ধী।”

আবির ঠোঁট বেঁকিয়ে রাগী স্বরে বলল,
“তোকে আমি দেখে নিব।”

মাহমুদা খান বললেন,
“আবির, রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে খাওয়াদাওয়া করে নে। রেডি হতে হবে তো। ”

আবির ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল,
“এই ভরদুপুরে রেডি হয়ে কি করবো?”

আলী আহমদ খান মেঘকে ইশারা করে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“আমার বৌমার শহর ঘুরে গায়ে হলুদের ফটোশুট করার ইচ্ছে। যাও শাওয়ার নিয়ে ঝটপট রেডি হও।”

আবির মেঘের দিকে একবার তাকালো পরপর সবার দিকে এক নজর তাকিয়ে আচমকা মেঘকে কোলে তুলে নিল। আলী আহমদ খান সহ উপস্থিত সবাই আঁতকে উঠল। মেঘ অস্পষ্ট গলায় আর্তনাদ করে উঠল। আলী আহমদ খান তপ্ত স্বরে বললেন,
“তোমাকে রুমে গিয়ে শাওয়ার নিতে বলছি। তুমি ও কে কোলে নিয়েছো কেনো?”

আবির রাশভারি কন্ঠে বলল,
“আমি আপনাদের কাউকে বিশ্বাস করি না। কোন ভরসায় রেখে যাব এখানে? যদি আবার লুকিয়ে ফেলেন? আমি আর কোনো রিস্ক নিতে পারব না, সরি।”

আবির মেঘকে কোলে নিয়ে নিরুদ্বেগ ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে উঠছে। তানভির হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসছে। আলী আহমদ খান, মোজাম্মেল খান, ইকবাল খান স্তব্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে আছে। বাড়ির মহিলারাও থম মেরে দাঁড়িয়ে আছেন।


তিনদিন আগে-

সন্ধ্যার অনেক পরেও আলী আহমদ খান অফিসে নিজের কেবিনে বসে কাজ করছিলেন। মোজাম্মেল খান আজ অফিসে আসেন নি, আবির সিফাতের উপর রাগ করে দুপুরের দিকেই অফিস থেকে চলে গেছে। ইকবাল খান সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিলেন হঠাৎ বাসা থেকে কল আসছে, বাজার নিয়ে যেতে হবে তাই ওনিও সন্ধ্যার দিকে চলে গেছেন। সিফাত কাজ শেষ করে অনেকক্ষণ এমনিতেই বসে বসে আলী আহমদ খানের সাথে গল্প করছিলো। রাত বেশি হওয়ায় সিফাত কেও ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। সিফাত অফিস থেকে বের হবার ১০ মিনিটের মধ্যে রাকিব আর রাসেল আলী আহমদ খানের কেবিনের সামনে উপস্থিত হলো।।রাকিব সালাম দিয়ে মৃদুস্বরে বলল,

“আংকেল ভেতরে আসতে পারি?”

আলী আহমদ খান কপালে ভাজ ফেলে বললেন,
” আরে রাকিব যে, আসো ভেতরে আসো।”

রাসেলকে খানিক দেখে কিছুটা চিন্তিত স্বরে জানতে চাইলেন,
“কি ব্যাপার, তোমরা হঠাৎ আমার কাছে কি মনে করে?”

রাকিব পেছনে ঘুরে কিছুটা তপ্ত স্বরে ডাকল,
“এই তানভির, ভেতরে আয়।”

তানভির গুটি গুটি পায়ে রুমে এসে মাথা নিচু করে দাঁড়ালো। রাকিবদের সাথে তানভিরকে দেখে আলী আহমদ খান একটু বেশিই অবাক হলেন। তানভিরের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর কন্ঠে শুধালেন,
“কি হয়েছে?”

রাকিব শ্বাস ছেড়ে বুকে সাহস নিয়ে বলল,
” আংকেল, আপনার কাছে একটা রিকুয়েষ্ট ছিল।”

“বলো।”

“প্লিজ, না করবেন না।”

“ঠিক আছে, বলো।”

রাসেল এবার সাহস করে বলল,
” আংকেল আবির একজনকে খুব বেশি পছন্দ করে। তাকে বিয়ে করতে চাই, এখন আপনার সমর্থন প্রয়োজন। প্লিজ, না করবেন না।”

আলী আহমদ খান রাগী স্বরে বললেন,
” আবির তোমাদের পাঠিয়েছে?”

তানভির চটজলদি উত্তর দিল,
” না না। ভাইয়া কিছু জানে না। আমরা নিজে থেকে আসছি।”

রাকিব ঠান্ডা কন্ঠে বলতে শুরু করল,
” আংকেল এখানে আসার ব্যাপারে আবিরকে আমরা কিছুই জানায় নি। আবির জানলে কখনো আসতে দিতো না। কিন্তু চোখের সামনে আবিরের এত কষ্ট দেখে আমাদের সহ্য করতেও কষ্ট হয়। আবির আপনাকে খুব সম্মান করে, শুধুমাত্র আপনাদের কথা ভেবে নিজের মনের আবেগ প্রকাশ করতে পারে না। সত্যি বলতে আবির মেঘকে অনেক বেশি ভালোবাসে, মেঘকে বিয়ে করতে চায় কিন্তু আপনারা রাজি হবেন কি না সেই ভয়ে এতদিন আপনাদের কিছু করতে পারছিল না, আর না মেঘকে কিছু বলছে। এখন মেঘও আবিরকে খুব পছন্দ করে। আপনি ওদের সম্পর্কটা প্লিজ মেনে নিন।”

“এখন আমার কি করতে হবে?”

” আবির আজ বাসায় নিজের মনের কথা জানাবে মানে মেঘকে বিয়ে করার কথা বলবে। আপনি প্লিজ রাজি হয়ে যাবেন। একমাত্র আপনি বললে বাসার সবাই মেনে নিবে। ”

” যদি আমিই মেনে না নেয়। তখন?”

রাকিব আঁতকে উঠে বলল,
” আংকেল এমন কিছু করবেন না, প্লিজ।”

“কেনো করব না? আমার ছেলের জন্য বউ খোঁজার অধিকার কি আমার নেই? সে নিজে কিছু বলতে সাহস পাচ্ছে না বলে তোমাদের পাঠিয়েছে, আর তোমরাও আমাকে মানাতে চলে আসছো। শুনো তোমাদের বন্ধুকে বলে দিও আমি ওর সম্পর্ক মানবো না।”

তানভির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল,
” কেনো মানবেন না, বড় আব্বু?”

“আমার ইচ্ছে আমি ছেলেকে দেখেশুনে বিয়ে করাবো।তোমার কোনো আপত্তি আছে?”

“জ্বি।”

“কি ? ”

” বনু আর ভাইয়া দু’জন দু’জনকে ভালোবাসে সেখানে অন্য কাউকে দেখার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া আপনি ভাইয়ার জন্য অন্য কোনো মেয়ে দেখলেও বিশেষ কোনো লাভ হবে না কারণ ভাইয়া আমার বোন ছাড়া কারো দিকে তাকিয়েও দেখবে না।”

আলী আহমদ খান গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
” তানভির তুমি কি জানো না, খান বাড়িতে প্রেম নিষিদ্ধ? ”

” প্রেম নিষিদ্ধ বলেই ভাইয়া বনুর সাথে প্রেম করার চিন্তাও করে নি । সরাসরি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আপনি কি চান না ভাইয়া ভালো থাকুক?”

“হ্যাঁ চাই কিন্তু আমার নিয়মনীতি ভেঙে নয়।”

তানভির রাগে ফোঁস করে বলে ফেললো,
” কোন নিয়মনীতি ভাঙার কথা বলছেন? যেই নিয়মনীতি সন্তানের খুশি সহ্য করতে পারে না সেই নিয়মনীতি চিরতরে ভেঙে দেয়া উচিত। আপনাদের নিয়মনীতি কি সন্তানের জীবনের থেকেও বেশি দামী?”

” মানে?”

তানভির চুপ হয়ে গেছে।আলী আহমদ খান পুনরায় বললেন,
‘কি বলতে চাচ্ছো?’

তানভির গম্ভীর কন্ঠে বলল,
” মেঘকে না পেলে ভাইয়া সুসা*ইড করবে। ”

আলী আহমদ খান বসা থেকে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠলেন,
“হোয়াট?”

রাকিব শীতল কন্ঠে বলল,
“জ্বি আংকেল। আর বিষয়টা এখন মজার জায়গাতেও নেই। আবিরের সাথে আমি পার্সোনাললি অনেকবার কথা বলেছি তার ঘুরেফিরে এই এক কথায়। ”

প্রায় ৩০ মিনিটের মতো তানভির, রাসেল, রাকিব আর আলী আহমদ খানের আলাপচারিতা চলল। একদম শেষ পর্যায়ে আলী আহমদ খান শর্ত সাপেক্ষে আবিরদের সম্পর্কটা মোটামুটি ভাবে মেনে নিয়েছেন৷ রাকিবদের বিদায় দিয়ে তানভিরের সাথে আরও প্রায় ৪০ মিনিটের মতো কথা বলেছেন। সেখানে বসেই আবিরকে রাজশাহী পাঠানোর পরিকল্পনা করেন। আবিরকে একেবারে বাসে উঠিয়ে তারপর মাহমুদা খানের সাথে দেখা করতে যান। ওনার সাথে আলোচনা শেষ করে আলী আহমদ খান বাসায় ফিরে সরাসরি মেঘের রুমে যান। মেঘ তখন বিছানার বসে বসে আবিরের দেয়া আংটি টা দেখছিল আর আনমনে কত কি ভাবছিল। হঠাৎ আলী আহমদ খান রুমে ঢুকতেই মেঘ থতমত খেতে হাত পেছনে লুকানোর চেষ্টা করল কিন্তু আলী আহমদ খানের হুঙ্কারে সঙ্গে সঙ্গে হাত সামনে এনে আংটি দেখাতে বাধ্য হলো।

আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
” তুমি আবিরকে ভালোবাসো?”

মেঘ অবাক লোচনে তাকিয়ে আবিরের শিখিয়ে দেয়া কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলো কিন্তু আলী আহমদ খানের সামনে দাঁড়িয়ে মিথ্যা বলার মতো সাহস মেঘের নেই তাই বাধ্য হয়ে বলল,
“জ্বি ”

“বিয়ে করতে চাও?”

মেঘ আঁতকে উঠে শীতল চোখে তাকালো। কিছুক্ষণ নীরব থেকে ধীর কন্ঠে বলল,
“আপনারা রাজি থাকলে….”

আলী আহমদ খান গুরুভার কন্ঠে বলে উঠলেন,
” তুমি সত্যি সত্যি আবিরকে ভালোবাসলে আর বিয়ে করতে চাইলে আমি যা বলব তা মানতে হবে। যদি রাজি থাকো তাহলে তিনদিন পর ই তোমাদের বিয়ে দিয়ে দিব। বলো রাজি আছো?”

মেঘ আশ্চর্য নয়নে তাকিয়ে রইলো। আলী আহমদ পুনরায় বললেন,
” আবারও বলছি যদি আবিরকে নিজের করে পেতে চাও তাহলে আমার শর্ত মানতে হবে। আবিরকে চাও কি না?”

মেঘ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,
“চাই।”

“ঠিক আছে৷ তোমার ফোনটা আগামী তিন-চারদিন আমার কাছে জমা থাকবে। আর তুমি কোনো ভাবে আবিরের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টাও করবে না। আমার সিদ্ধান্ত ছাড়া বাসার বাহিরে পাও রাখবে না।”

মেঘ শক্ত কন্ঠে জানতে চাইল,
” এগুলো কোনো করতে হবে, বড় আব্বু?”

আলী আহমদ খান মেঘের মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদুস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
” তুমি আবিরের বউ হলে সম্পর্কে আমি তোমার কি হবো?”

আলী আহমদ খানের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে মেঘ বিস্ময় সমেত তাকিয়ে রইলো। মনের ভেতর উত্তর থাকা সত্ত্বেও দেয়ার মতো শক্তি পাচ্ছে না।

আলী আহমদ খান ভারী কন্ঠে বললেন,
” শ্বশুর আব্বু হবো তো নাকি?”

শ্বশুর আব্বু কথাটা শুনেই মেঘ লজ্জায় নুইয়ে পড়েছে। কান দিয়ে অনবরত উষ্ণ ভাপ বের হচ্ছে। আলী আহমদ খান মুচকি হেসে বললেন,
” আমার তো মেয়ে নেই তাই আমার অনেক দিনের ইচ্ছে ছিল, আমার ছেলের বউ মানে আবিরের বউ আমাকে আব্বাজান বলে ডাকবে। আজ আমি আমার ছেলের বউকে পেয়েছি তাই আজ থেকে তুমি আমায় আব্বাজান ডাকবে। ”

এই অনীস্পিত, শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে মেঘ কি করবে বুঝতে পারছে না। হঠাৎ কি ভেবে, ওড়না টেনে মাথায় দিয়ে তৎক্ষনাৎ পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। আলী আহমদ খান সালামি দিতে দিতে বললেন,
” আব্বাজান বলো শুনি একটু। ”

মেঘের বুকের ভেতর উতালপাতাল ঢেউ শুরু হয়ে গেছে। ইদানীং আবিরের সামনেও এতটা লজ্জা পায় না যতটা লজ্জা বড় আব্বুকে সামনে পাচ্ছে। মেঘ নিজের সাথে যুদ্ধ করে বুকে সাহস নিয়ে আস্তে করে বলল,
” আব্বাজান। ”

“মাশাআল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ। আমার মনের আশা আজ পূরণ হলো। এখন বলো, তুমি কি তোমার আব্বাজানের জিত দেখতে চাও না? তোমার আব্বু প্রতিনিয়ত আমার সাথে খোঁচাখুঁচি করে অথচ আমি কিছুই বলি না। তুমি যদি আমার কথা মানো তাহলে এবার আমিই জিতবো। তুমি কি চাও না আমি জিতি?”

“জ্বি চাই। ”

“ঠিক আছে, আমাদের মধ্যকার আলোচনা যেন তোমার আব্বুর কানে না যায়। এখন বলো তুমি কি আমার শর্তে রাজি আছো?”

“জ্বি। আমি সব শর্তে রাজি কিন্তু…. ”

আলী আহমদ খান জিজ্ঞেস করলেন,
“কিন্তু কি? কিছু লাগবে?”

মেঘ মাথা নিচু করে শক্ত কন্ঠে বলল,
” আমার শুধু আবির ভাইকেই লাগবে।”

“তোমার আবির ভাইকে তুমি ঠিক সময় পেয়ে যাবে, চিন্তা করো না।”

সেদিনের পর থেকে তানভির আর মেঘ দু’জনকে আলী আহমদ খান যা বলেন তারা তাই করে। মেঘকে নিয়ে শপিং এ যাওয়া, ফেসিয়াল করতে পার্লারে নিয়ে যাওয়া। এমনকি তানভির এলাকার স্পাইগুলোকে পর্যন্ত আবিরের কল ধরতে নিষেধ করে দিয়েছে।
সবই আলী আহমদ খানের কথায় করেছে। ওনার কথা না মানলে ওনি মেঘ আবিরের বিয়ে মানবে না এই আতঙ্কে তানভির সব মেনে নিয়েছে।
প্রথম দু’দিন বাসার কেউ ই কিছু জানতে পারে নি। কিন্তু একদিন সিফাত কাউকে না জানিয়ে বাসায় চলে আসায় কিছুটা এলোমেলো হয়ে গেছিলো। সিফাতের চালচলন খুব একটা সুবিধাজনক মনে হয় নি তাই আলী আহমদ খান পরিকল্পনা করে তানভিরকে দিয়ে মেঘকে বাহিরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সিফাত বাসা থেকে যাওয়ার পর থেকে বাসায় সিফাতকে নিয়ে টুকটাক আলোচনা শুরু হচ্ছিলো। মেঘের কানে এসব গেলে মেঘ কষ্ট পাবে তাই ওনি একদিনের মধ্যে সবকিছু রেডি করে বাসার সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে। মোজাম্মেল খান আগে থেকেই রাজি ছিলেন তাছাড়া মেঘদের ব্যাপারে ওনার সিদ্ধান্ত তেমন কার্যকর নয় সেজন্য আলী আহমদ খানের কথায় শেষ কথা ছিল।


বর্তমান-

#চলবে