মেঘলা আকাশে রংধনু হবো পর্ব-১০

0
318

#মেঘলা_আকাশে_রংধনু_হবো
#লেখনীতে_তাইয়েবা_বিনতে_কেয়া
#পর্ব_১০

হিয়া স্যারের ক্লাস করছে আর পাশে অনিল ঘুমিয়ে রয়েছে কি অদ্ভুত ছেলে পুরো ক্লাসে কি কেউ ঘুমিয়ে থাকে। হিয়া শাড়ি পড়ে রয়েছে তাই ফ্যানের বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ে অনির মুখে চলে যাচ্ছে। অনি ঘুম থেকে উঠে হিযার দিকে তাকায় আর বলে –

“- এই মেয়ে কি সমস্যা তোমার শাড়ির আঁচল কি ঠিক করে রাখতে পারো না। আর যোনো আমার মুখে শাড়ির আঁচল না আসে “।

হিয়া নিজের শাড়ির আঁচল সামলে নেয় এই ছেলে হৃদানের চেয়ে বেশি খারাপ আর রাগী কি করে কথা বলতে হয় কারো সাথে সেটা জানে না। অনি কথা বলে আবার মুখে রুমাল দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। জাহিদ মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে হৃদান বলে –

“- শোন সেই জমিন নিয়ে সব ঠিক আছে আমাকে ফাইল দেয় চেক করব “।

“- না জমিন নিয়ে একটু সমস্যা রয়েছে ফাহাদ হোসেন এই জমির উপর দশ তালা হাসপাতাল করতে চান কিন্তু সেই জমির মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে। সেখানে এতো তালা হাসপাতাল হলে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ভেঙে যেতে পারে।

হৃদান ওর কথা শুনে ফাহাদ এই শহরের গণ্যমান্য লোক কিন্তু তার পরিকল্পনা ভুল ছিলো। তবে ফাহাদ যে হোক হৃদান কাউকে ভয় পায় না হৃদান বলে –

“- তাহলে এই ফাইল বাতিল করে দেও “।

হিয়া অনেক সময় ধরে ক্লাস করে পরে কোচিং সেন্টার ছুটি দিয়ে যাবে কিন্তু ও কার সাথে যাবে। কোচিং থেকে বের হয়ে হিয়া একটু হাঁটতে থাকে তবে এই শহরে সে নতুন রাস্তা চিনে না সে কোথায় যাবে। আর তার কাছে ফোন নাই কাউকে কল দিবে হৃদান ওকে ফোন দেয় নাই। হিয়া হাঁটতে থাকে একটা বাইক নিয়ে একজন ছেলে একটা গাছের নিচে বসে রয়েছে। হিয়া একটু হেঁটে গিয়ে দাঁড়িয়ে যায় এরপর নিজের জুতার দিকে দেখে সেটা ছিঁড়ে গেছে। হিয়া জুতাটা মাটির মধ্যে ছুঁড়ে মারে আর বলে –

“- ধুর শালার জুতা এখুনি নষ্ট হতে হলো বাজে জুতা “।

বাইক নিয়ে যে ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে হলো অনি হিয়ার কাণ্ড দেখে সে হাসে অনেকদিন পর তার মুখে হাসি ফুটে উঠে। হিয়া দেখে সামনে একটা ছেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে তাকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার কথা ভাবে তাই হিয়া একটু কাছে গিয়ে বলে –

“- আচ্ছা চৌধুরী বাড়ি কি আপনি চিনেন এখান থেকে কতো দূরে হতে পারে “।

অনি মাথায় পগনে তার হেলমেট খুলে ফেলে আর হিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে –

“- হুম জায়গা আমার পরিচিত “।

হিয়ার যখন ওর মুখ দেখে শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে এইতো সেই ছেলে কোচিং সেন্টারে যে ওর সাথে বসে রয়েছে। কিন্তু ওর এখানে কি করে হিয়া বলে –

“- তুমি ওই ঘুমিয়ে থাকা ছেলেটা না “।

“- হুম আমি সেই অনিল কিন্তু তুমি কোথায় যেতে চাও চলো তোমাকে পৌঁছে দেয় “।

“-না দরকার নাই আমাকে রাস্তা বলে দেন আমি চলে যেতে পারব “।

“- এই শহরে মনে হচ্ছে নতুন তাই এখান থেকে চৌধুরী বাড়ির দূরত্ব অনেক সো বাইকে উঠে বসো পৌঁছে দেয় “।

হিয়া সত্যি এই কথা ভাবে যদি ঠিকানা বলে দেয় তাহলে ও যেতে পারবে না কারণ রাস্তা ঘাট কিছু চিনে না। আর ও কাছে টাকা নাই যে ভাড়া দিয়ে যাবে কিন্তু অনিল কি ভালো ছেলে হবে আজকাল ছেলেদের উপর বিশ্বাস করা যায় না। আর শহরের ছেলের উপর একদম না কিন্তু এখন বিশ্বাস করা ছাড়া আর কোনো উপায় নাই। হিয়া বলে –

“- ওকে চলুন “।

অনি ওকে বাইকে উঠিয়ে নেই পরে চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দেয় । হিয়া জিজ্ঞেস করে-

“- আচ্ছা আপনি কোচিং ঘুমিয়ে থাকেন কোনো পড়াশোনা করতে কি ভালো লাগে না আপনার “।

অনি ওর দিকে একটু তাকিয়ে দেখে এরপর বাইক চালাতে থাকে কিন্তু হিয়া আবার এই এক কথা জিজ্ঞেস করে তখন অনিল বলে –

“- হুম আমার পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না কিন্তু তবুও করতে হয়। আমার পরিবারের দরকার একটা ড্রিগি সেটার জন্য ভালো কলেজে এডমিশন দরকার “।

হিয়া একটু অবাক হয়ে শুনে যদি ভালো কলেজে এডমিশন হতে হয় তাহলে পড়াশোনা করতে হবে। হিয়া বলে –

“- ঘুমিয়ে থাকলে কি ভালো কলেজে চান্স পাবে “।

“- সেই বিষয়ে আমার ভাবতে হবে না আমার বাবার অনেক টাকা যদি কলেজে চান্স না পায় তাহলে ও টাকা দিয়ে এডমিট করিয়ে দিতে পারবে। তাই নিজের বাবার টাকা খরচ করতে চাই সেইজন্য ভালো করে পড়াশোনা করি না “।

হিয়া অদ্ভুত হয়ে কথা শুনে শহরের সব ছেলে কি এমন অদ্ভুত হয় মানে সবার কথা মাথায় উপর দিয়ে চলে যায়। সবার জীবনে শুধু টাকার দরকার রয়েছে সেটা না থাকলে জীবন বৃথা এর থেকে গ্রামের মানুষ ভালো সহজ সরল। তারা টাকার পিছনে ছুটে না নিজের যেইটুক রয়েছে তাই নিয়ে খুশি থাকতে ভালোবাসে। হিয়ার অনেক চিন্তার মগ্নে মধ্যে চৌধুরী বাড়ির সামনে এসে পৌঁছে যায়।

অনি ওর বাইক থামিয়ে চৌধুরী বাড়ির দিকে তাকায় অনেক দিন পর এই বাড়িতে আসা ওর। অনি বলে –

“- আপনার চৌধুরী বাড়িতে এসে পড়েছি নেমে যান “।

হিয়া বাইক থেকে নেমে যায় সত্যি চৌধুরী বাড়ির সামনে রয়েছে সে কিন্তু অনি কি করে চৌধুরী বাড়ি চিনতে পারে। হিয়া একটু কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে –

“- আচ্ছা আপনি চৌধুরী বাড়ি চিনতে পারলেন “।

“- চৌধুরী বাড়ির মালিক রায়হান চৌধুরী আর আমার বাবা বিজনেস পার্টনার ছোটবেলা অনেক এসেছি এই বাড়িতে কিন্তু এখন আর কোথাও যেতে ভালো লাগে না। তবে এই চৌধুরী বাড়ির মানুষ আমার খুব কাছের বিশেষ করে হৃদান। আচ্ছা হৃদান কি হয় তোমার “।

হৃদানের নাম শুনে হিয়া একটু ঘাবড়ে যায় সত্যি কথা বলতে পারবে না সে তাই হিয়া বলে –

“- হৃদান ভাই আমার কাজিন হন “।

অনি ছোটবেলা এই বাড়িতে এসেছে কিন্তু কখনো হিয়াকে দেখে নাই হয়তো কোনো কাজিন থাকতে পারে হৃদানের। এতো বছর ধরে এই বাড়িতে আসে না হৃদানের সাথে দেখা হয় না তাই জানে না অনিল বলে –

“- ওহ ভালো তাহলে আমি যায় “।

হিয়া ভিতরে চলে যায় অনি গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে যায়। হৃদানের আজকে অনেক কাজ রয়েছে অফিসে এতোদিন আসে নাই কতো কাজ পরে রয়েছে কিন্তু সব কাজের মধ্যে হিয়াকে নিয়ে আসার কথা ভুলে গেছে। আসলে হৃদান কখনো কারো স্কুল বা কলেজ থেকে নিয়ে আসে নাই তাই সব ভুলে গেছে। হৃদান ওর ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে বেশ অনেক সময় হয়ে গেছে।

সময় দেখে ওর হিয়ার কথা মনে পড়ে হিয়ার জন্য গাড়ি পাঠানো হয় নাই ওর কাছে টাকা ও নাই একা একা কি করে বাড়ি ফিরবে। হৃদান রাব্বিকে ফোন করে জানতে পারে কোচিং ছুটি হয়ে গেছে অনেক আগে কিন্তু এতোখন সময় হিয় কোথায় থাকতে পারে। হৃদান বাড়িতে ফোন দেয় কল রিসিভ করে তানিয়া।

হৃদান বলে –

“- তানিয়া হিয়া কি বাড়িতে এসে পৌঁছাতে পেরেছে “।

হিয়া একটু গেটের দিকে তাকিয়ে দেখে হিয়া সেখান দিয়ে আসছে তাই তানিয়া বলে –

“- হুম হিয়া এসে গেছে “।

হৃদান একটু শান্ত হয় এরপর হিয়াকে খাবার দিতে বলে আর ওর যত্ন নিতে বলে। হৃদানের নিজের উপর রাগ হয় কোনো ও হিয়াকে একা কোচিং রেখে আসতে গেলো যদি আজকে বাড়ি ফিরতে না পারতো তাহলে কি হতো আর ও কাছে একটা মোবাইল ও দেয় নাই কোনো। হৃদান অফিস থেকে বের হতে যাবে তখন ফাহাদ আসে কেবিনে ওর। ফাহাদ বলে –

“- আরে ম্যাজিস্ট্রেট স্যার উঠে পড়ছেন নাকি আমি কি আসতে দেরি করে ফেলছি “।

হৃদান ওকে দেখে আবার চেয়ারে বসে যায় কি কারণে এখানে এসেছে সেটা ও খুব ভালো করে যানে। হৃদান হেঁসে বলে –

“- আরে না কোথায় যাবো তা বলেন হঠাৎ করে আমার কেবিনে কোনো দরকার ছিলো “।

ফাহাদ একটু হাসি দিয়ে টেবিলে বসে ওর হাতে সেই হাসপাতালের ফাইল যেটা হৃদান খারিজ করে দিয়েছে। মূলত তার জন্য আসা ফাহাদ ওকে বলে –

“- আপনি আর আমি হলাম একে অপরের বন্ধু তাই একটু দেখা করতে এসেছি। এক বন্ধু যখন আরেক বন্ধুর থেকে কোনো সাহায্যে চাই তাহলে সেটা করতে হয় ভালো করে করলে তার জন্য উপহার থাকে। আর যদি কোনো সাহায্যে না করে তাহলে সেই বন্ধু দিয়ে কি দরকার বলুন তাকে পৃথিবী থেকে শেষ করে দেওয়া উত্তম “।

হৃদান ওর কথা শুনে কতো বড়ো সাহস ওর অফিসে ঢুকে ওকে হুমকি দেয় কিন্তু হৃদান খুব ভদ্রলোক কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করে না। হৃদান বলে –

“- আসলো বন্ধু জিনিস খুব অদ্ভুত জিনিস হয় কখন বন্ধু পাশে থাকে কখন পিঠে ছুরি বসায় কে জানে বলুন। বন্ধু যদি ভালো কাজ করে থাকে তাহলে আরেক বন্ধু পাশে থাকে আর যদি খারাপ কাজ করে তাহলে আরো বন্ধু তার সাথে খারাপ করে “।

“- ওহ তাই ভালো তাহলে আচ্ছা আমার জমিতে দশতালা বিল্ডিং হলো সবার উপকার হবে। হাসপাতালে কতো মানুষ চিকিৎসা পাবে গরিব দুঃখীর ভালো হবে কিন্তু আপনি সেই জমি খারিজ করে দিলেন স্যার “।

“- আপনার জমির মাটি পরীক্ষা করে দেখা গেছে সেখানে দশতালা বিল্ডিং করা যাবে না যদি করেন তাহলে যেকোনো দুর্যোগে ভেঙ্গে যেতে পারে। তাই খারিজ করে দিয়েছি সিম্পল বিষয় “।

ফাহাদ শুধু হৃদানের কথা শুনে যায় এইটা একটা সরকারি হাসপাতাল হতো তাই ও মনে করেছে একটা জমি কম দাম দিয়ে কিনে সেখানে হাসপাতাল হবে। কিন্তু ওর জন্য সব শেষ হয়ে দিতে পারে না ওই হাসপাতাল করলে সেখানের অনেক টাকা ও মারতে পারবে। ফাহাদ বলে –

“- দেখেন ম্যাজিস্ট্রেট স্যার আপনি কোনো এইসব ঝামেলায় জগাতে যান বলুন পরিবার পরিজন নিয়ে খুশি থাকুন। কখন কি হয়ে যায় তাদের কে বলতে পারে আসলে টাকা দিয়ে কতো কিছু করানো যায় “।

“- ওহ তাই নাকি ঠিক কথা পরিবারের কথা ভাবতে হয় তাহ মিস্টার ফাহাদ আপনার একটা মেয়ে রয়েছে কি যেনো নাম পুষ্প রাইট কতো সুন্দর প্রতিদিন কলেজ যায়। আপনারা বউ কিন্তু ভালো দেখতে আর টাকা দিয়ে কি হয় সেটা আমি খুব ভালো করে জানি। আর পরের বার আমাকে টাকার গরম দেখানোর আগে আমার বাবার নাম জেনে কেবিনে ঢুকবেন। কারণ এই শহরে টাকার আরেক নাম হলো রায়হান চৌধুরী আমার বাবা “।

ফাহাদ চলে যায় হৃদান কেবিন থেকে বেরিয়ে পরে আর তারপর হৃদান বাহিরে চলে যায়। হিয় একটু ওয়াশরুমে যায় নিজে ফ্রেশ হয়ে খুব খিদা লেগেছে তাই খাবার খেতে নিচে বসে। তখন রায়হান চৌধুরী এসে বসে –

“- আরে হিয়া কি খাবার খেতে এসেছো খুব খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই “।

“- আরে বাবা বসুন এখানে আপনি খান আমি পরে খেয়ে নিবো “।

হিয়া উঠে যেতে চাইলে রায়হান চৌধুরী ওকে বসিয়ে দেয় এরপর জুলেখা খাবার দেয়। হিয়া অনেক খিদা লেগেছে আর এতো খাবার কখনো খায় নাই সকালে এই হৃদানের সাথে ভালো করে খেতে পারে নাই। হৃদান সামনে থাকলে হিয়ার গলা দিয়ে ভাত যায় না এমনি খুব নরমাল থাকে বাট হঠাৎ দেখে ওর চোখে চোখ পড়লে ভয় করে হিয়ার।

হিয়া আর রায়হান চৌধুরীর খাওয়া শেষ করে হিয়া উপরে উঠে আসে ওয়াশরুমে গিয়ে ওজু করে নামাজ পরে। খেয়ে নামাজ পড়েছে কারণ যা খিদে পেয়েছে ওর না খেয়ে নামাজ পড়লে অজ্ঞান হয়ে যেতো। হৃদান বাড়িতে ঢুকে যায় হিয়ার রুমে দেখে হিয়া নামাজ পড়ছে।

#চলবে