পাতা বাহার পর্ব-০২

0
480

#পাতা_বাহার
লেখনী: #বেলা_শেখ
#পর্ব-২
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)

জৈষ্ঠের তপ্ত বিকেল। কাঠফাঁটা রোদে চারপাশ ঝলমলিয়ে উঠছে। রোদের দিকে তাকিয়ে থাকা দায়! জ্যৈষ্ঠের গরমে অতিষ্ঠ জনজীবন। যেখানে যাবে সেখানেই গরম। এমনকি বাড়িতে ফ্যানের নিচেও যেন শরীর ঠান্ডা হয় না। মনে হয় ফ্রিজে উঠে বসে থাকি। তবে যে বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন গাছ গাছালি আছে সেই বাড়ির পরিবেশ আবহাওয়া শীতলতম। অনেকটাই স্বস্তিদায়ক। অরুণ সরকারের বাড়ির আঙিনায় বিভিন্ন দেশি বিদেশি গাছ গাছালির সমাহার ! আমগাছ, কাঁঠাল গাছ, নিম গাছ, লিচু থেকে শুরু করে অর্কিড ,ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি। অরুণের বাবা একজন প্রকৃতি প্রেমী মানুষ ছিলেন। তার গেট করা দোতলা বাড়িটা তিনি নিজেই ডিজাইন করেছেন। মাঝখানে বাড়ি, বাড়ির চতুর্পাশে বড় বড় গাছ। দেশি বিদেশি ফুলের বাগানও রয়েছে । বিভিন্ন জায়গায় বসার জন্য ব্রেঞ্চ রয়েছে, অনেক গাছের ডালে দোলনা ঝুলানো। জমিন সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত। বাউন্ডারির দেয়াল জুড়ে লতা পাতার সমাহার, বিভিন্ন প্রজাতির পাতাবাহার, বাগান বিলাস , মাইক ফুল ইত্যাদি। বাড়ির দেয়াল বেয়েও বিভিন্ন লতা পাতা। বেলকনির গ্রিল জড়িয়ে বাগান বিলাস। সব মিলিয়ে মনে হবে যেন কোন পার্ক বা দর্শনীয় স্থান। এই গাছ গাছালি পাখির আবাসস্থল। বিভিন্ন পাখি বসবাস করে আসছে এই জায়গায়। সারাক্ষণ পাখির কিচিরমিচিরে মুখরিত থাকে পরিবেশ। ভোর দুপুরের দিকে ঘুমিয়েছিল। অরুণ, ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে এলেই বেড়িয়ে যায়। লম্বা ঘুম দিয়ে ভোর বিকেলের দিকে ঘুম থেকে উঠে হাই তুলে ‌। নিজের দিকে তাকাতেই নজরে আসে স্কুল ড্রেস এখনো গায়ে। ঘুমোনের ফলে কুঁচকে আছে। তার মনে পড়ে সে গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। রুমের আশেপাশে বাবাকে খুঁজে! না পেয়ে খুশিই হয়! বাবা নেই, অফিসে হয়তো! তাকে আর বকা খেতে হবে না। আর রাতে বাবা আসার আগেই সে ঘুমিয়ে পড়বে! ব্যস প্রবলেম সলভ। খুশি মনেই স্কুল ড্রেস নিজেই খুলে একটা হাফপ্যান্ট ও টি শার্ট পড়ে নেয়। এসব করতে সে অভ্যস্ত। আদর করে স্কুল ড্রেস খুলে চেঞ্জ করিয়ে দেওয়ার জন্য কেউ নেই কি না! অরুণ সরকার তো নিজের অফিস নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করে। ভোর হাত মুখ ধুয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ড্রয়িংরুমে আসমা বেগম ও তার কোলে আনিকা বসে চিপস খাচ্ছে। ভোর তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসি দেয়‌। এই আশায় যে হয়তো দাদু আনিকার মতো তাকেও কোলে নিয়ে একটু আদর করবে। আদর পাবে ভেবেই ভোর মিষ্টি হাসি দেয়।

আনিকা চিপস লুকিয়ে বলে,

-” আমার খাওয়ায় নজর দিচ্ছিস কেন?”

ভোরের অধরের হাসি গায়েব হয়ে যায়।
আসমা বেগম ভোরকে দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে,

-” সেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছ! এখন ওঠার সময় হলো! দুপুরে কিছুই তো খাওনি বোধহয় ! যাও গিয়ে খেয়ে নাও! আর শুনলাম স্কুলে মারামারি করেছে? তোমার দুষ্টুমি বেড়েই চলেছে। আর যেন না শুনি। যাও?”

ভোর মুখ গোমড়া করে রান্না ঘরের দিকে যায়। দাদু রুপম আনিকাকেই বেশি ভালো বাসে। তাকেও বাসে, তবে ওদের মতো নয়! ভাবতে ভাবতে রান্নাঘরে গিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাক দেয়,

-” খালা? ও খালা ? কোথায় তুমি? খালা?”

মিনু ঘরে শুয়ে ছিল। দুপুরের রান্না করে সকলকে খাবার পরিবেশন করে নিজেও খেয়ে দেয়ে বিছানায় বসে ছিল। আভারিকে আসমা বেগম আবার বাজারে পাঠিয়েছে। বসে থাকতে থাকতেই চোখটা লেগে যায়। হঠাৎ ভোরের ডাক শুনে ধরফরিয়ে ওঠে ‌। তারাতাড়ি উঠে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। তাদের ঘর রান্না ঘরের পাশেই।

ভোর মিনুকে দেখেই দৌড়ে কোমড় জড়িয়ে ধরে বলে,

-” খালা ক্ষিধে পেয়েছে আমার!”

মিনু হেসে তাকে কোলে নিয়ে গালে চুমু দেয়। ভোর অপর গাল এগিয়ে দেয়, মিনু সেথায়ও চুমু দেয়, এরপর কপাল থুতনি তেও চুমু দেয়। ভোর মিষ্টি হেসে মিনুর গালেও চুমু দিয়ে হেসে ওঠে। মিনুর চোখটা ছল ছল করে ওঠে। এবাড়ির কাজের লোক তারা। অথচ এই বাচ্চা ছেলেটা তাদের কতটা ভালোবাসা দেয়! নিঃসন্তান এক অভাগী মায়ের জখমে এক চিমটা মলম স্বরূপ।

-” কি খাইবে আব্বা?”

ভোর হেসে বলে,

-” নুডুলস দাও?”

-” আমি রাঁইধে দিবনি! আগে তুমি একটু ভাত খাও? মুরগির রাণ রাইখছি তোমার জইন্যে! খাইবে?”

ভোর মিষ্টি হেসে বলে,

-” খাব যদি তুমি খাইয়ে দাও!”

মিনু তার গাল টিপে বলে,

-” আইনতেছি! তুমি বইসো!”

বলেই রান্নাঘরের কেবিনেটের উপর বসিয়ে দিয়ে একটা প্লেটে অল্প ভাত মুরগির রাণ ও একটুকরো মাংসো নিল। গ্লাসে পানি ভরে ভালোকরে হাত ধুয়ে এসে ভোরের মুখে ভাতের লোকমা দিল। ভোর মুখে নিয়ে গল্প জুড়ে দিলো। স্কুলে কি কি হলো। কোন মিস কাকে বকা দিল! রোহানের সাথে কি কি হলো! পাতা মিস কিভাবে তাকে বকা খাওয়ার থেকে বাঁচালো! পাতা মিস তাকে আদরও করেছে! মিনু তার সব কথা শুনে হেসে মাথা নাড়ায়। ছেলেটা বড্ড আদুরে! আর আদর পাগল! যেই আদর করবে তার পিছন পিছন ঘুরবে আরো আদর পাবার জন্য! একজন অচেনা লোকও যদি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় সে তার কোলে চড়ে গল্প জুড়ে দিবে! মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আদর আদায় করে নেবে। মিনু ভেবে পায় না! এতো মিষ্টি একটা বাচ্চা রেখে কোনো মা কিভাবে থাকতে পারে! কতটা নিষ্ঠুর হলে এতো ভালো স্বামী বাচ্চা রেখে নিজের ক্যারিয়ারকে সুউচ্চ করতে ডিভোর্স দিয়ে বিদেশ ভুঁইয়া যেতে পারে! থাক তার এসব ভাবনা দিয়ে কাজ নেই! সে তো গরিব এক অশিক্ষিত গন্ড মূর্খ! ওসব ভাবনা তার মাথায় আনাও সাজে না‌।

-” আব্বা আরো কয়েকটা ভাত আনিই?”

ভোর মাথা নেড়ে পেটে হাত রেখে বলে,

-” খালা পেট ফুটবল হয়ে গেছে। আর খাবো না! তুমিই খাও!”

মিনু তাকে পানি খাইয়ে মুখ পুছে দিয়ে বলে,

-” কোনো হানে যাইবে না কিন্তু! তোমার হুজুর আইবে এল্লা পরেই! আবার ম্যাডামও আইবো পড়াইতে!”

ভোর মুখ গোমড়া করে বলে,

-” এত পড়াশোনা ভালো লাগে না!”

বলেই রান্না ঘর থেকে বেরিয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে না গিয়ে পাশ দিয়ে মেইন দরজা পেরিয়ে বাইরে যায়‌। পকেটে হাত দিয়ে সিটি বাজিয়ে হাঁটতে থাকে ‌। যদিও সিটি বাজছে না শুধু ফু ফু আওয়াজ বেরোচ্ছে। গেটের কাছে গিয়ে দারোয়ানকে ডাক দেয়!

-” ও মামা? মামা?”

দারোয়ান গোছের লোকটি চেয়ার থেকে তড়িঘড়ি করে উঠে ভোরের সামনে গিয়ে বলে,

-” ছোট স্যার! তুমি কি করো এখানে? যে রোদ! গরম তো! যাও ওইদিকে ছায়ায় যাও!”

ভোর পকেট থেকে হাত বের করে বলে,

-” তোমার গরম লাগছে না?”

-” লাগতেছেই তো!”

-” তাহলে তুমিও চলো! আমি দোলনায় দোল খাব! তুমি আস্তে আস্তে ধাক্কা দিবে ঠিকাছে?”

দারোয়ান লোকটি হেসে উঠলো। ভোর তার দাঁত দেখে। লাল হয়ে আছে।

-” মামা তোমার দাঁত ঠোঁট লাল হয়ে আছে কেন?”

লোকটি হেসে ভোরের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,

-” পান খাইছি তাই! তুমি ঘরে যাও স্যার। আমি ধাক্কা দিলে গেটে কে থাকবো?”

ভোর মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,

-” ওহ”

তখনই বড় গেটের একপাশে ছোট গেইট দিয়ে আভারি ঢুকে ‌ হাতে তার ব্যাগ। ভোরকে দেখেই হেসে বলে,

-” ভোর বাবা? তুমি এই গরমে এইখানে কি করো? চলো চলো!”

ভোর আভারির একহাত ধরে বলে,

-” ভারি কাক্কু আমার জন্য কি এনেছ?”

আভারি হেসে বলে,

-” তোমার জন্য দুইটা কোন আইসক্রিম আইনছি! খাইবা?”

ভোর মাথা নাড়ে‌। আভারি ব্যাগ থেকে আইসক্রিম দুটো বের করে ভোরের হাতে দেয়‌ ভোর একটা নিয়ে বলে,

-” ওইটা তুমি খালাকে দিও। খালা খাবে।”

বলেই বাড়ির একপাশে গাছের বাগানে ঢুকে। একটা সামনেই একটা বেঞ্চে বসে আইসক্রিম ছিঁড়ে খাওয়া শুরু করে। গলে গেছে খানিকটা। তার খাওয়ার মাঝেই আনিকা আসে। আনিকা তার থেকে এক বছরের ছোট। ভোরের পাঁচ, আনিকার চার আর রূপম সবে এক বছরের। সে মায়ের সাথে ব্যাংকে। রুবি তাকে সাথে নিয়েই অফিস করে। আনিকা আর ভোরের মধ্যে ছত্রিশ কা আখরা। একে অপরের পিছনে লেগেই থাকে। ভোর আনিকাকে দেখে ভেংচি কেটে বলে,

-” এই তুই আমার আইসক্রিমের দিকে চেয়ে আছিস কেন?”

আনিকা রেগে দ্রুত এগিয়ে এসে বলে,

-” তোর এই পঁচা আইসক্রিমের দিকে কেন চাইবো? আমার বাবা আমাকে অনেকগুলো বক্স এনে দিয়েছে আইসক্রিমের!”

বলেই খপ করে ভোরের হাত থেকে আইসক্রিম ফেলে দিয়ে দৌড় দিল। ভোর নিচে পড়ে থাকা আইসক্রিম দেখে ‘আনি’

বলে চিৎকার দিয়ে আনিকার পিছু নিল,

-” আনি’র বাচ্চা একবার তোকে ধরতে পাই! দেখিস কি করি?”

আনিকা দৌড় এদিক ওদিক যায়। ভোর তার অল্প দূড়েই। আনিকা দৌড়ানো অবস্থায় পিছের দিকে তাকালে গাছের সাথে বাড়ি খেয়ে নিচে ইটের টুকরোর উপরে পড়ে যায়। কনুই ছিলে যায় খানিকটা। ভোর হেসে ওঠে, আনিকা কেঁদে ওঠে। আসমা বেগম আনিকাকে খুঁজতে খুঁজতে এইদিকেই আসে। ভোর দৌড়ে পালিয়ে যায়। এই আনিকা আবার তার নামে না দোষ দেয়! আসমা বেগম এসে আনিকাকে এই অবস্থায় দেখে এগিয়ে এসে বলে,

-” আনি কিভাবে পড়লি? ব্যাথা পেয়েছিস বেশি?”
_____

বিকেলে কাঁচা বাজারে অনেক ভিড়। গিজ গিজ করছে লোকজন। ছেলে মেয়ে উভয়েই। আগেকার যুগে মেয়েদের বাজারে দেখা না গেলেও বর্তমান যুগে এটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। বলা চলে বাজারে মেয়েদের সংখ্যাও কম নয়। ক্রেতাদের সাথে বিক্রেতাদের দরদামে বাজার জমে উঠেছে। হাউকাউ শব্দে বাজার ভরপুর। পাতা ভিড় ঠেলে এক সবজির দোকানে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,

-” চাচা মরিচ কত করে ?”

আরো অনেক ক্রেতা থাকার দরুণ দোকানি ব্যস্ততার ভঙ্গিতে উত্তর দেয়,

-” ১৬০ টাকা কেজি আপা!”

পাতার কপালে ভাঁজ পড়ে সে ডাকলো চাচা অথচ এই ব্যাক্কেল লোক তাকে আপা ডাকছে! তারও দোষ দেয়া যায় না, ভিড়ে কতদিকে ধ্যান দেবে।

-” এতো কেন? আপনারা রাত পেরোতেই দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন । ১৩০ টাকা দেব! দিবেন?”

দোকানি পাতার দিকে চায়। বড় গোল জামার সাথে মাথায় স্কার্ফ ও কাঁধে ওড়না ঝুলছে। দেখে শিক্ষিতই মনে হচ্ছে।তাই তর্কে না জড়িয়ে বলল,

-” ১৫০ টাকা দিন আর নিয়ে যান!”

-” ১৩০ এর একটাকাও বেশি দেব না। দিলে বলুন নইলে অন্য দোকান দেখছি!”

দোকানি মরিচ পলিতে ভরে মিটারে মাপতে মাপতে বলে,

-” শুধু আপনারেই দিলাম । নইলে ১৬০ এর একটাকাও কম নিই না।”

পাতা হেসে দরদাম করে আরো বেশ কিছু সবজি কিনে মাছ হাটার দিকে চলে যায়।
সেখানেই নজরে আসে ওদের পারার শুকলা মন্ডলকে। লোকটার স্বভাব চরিত্র খারাপ। মেয়ে মানুষ দেখলেই যেন পিনিক উঠে। পাতা সেদিকে না গিয়ে অন্যদিকে যায়। এক দোকানি বড় বড় গলদা চিংড়ি মাছ বিক্রি করছে। পাতার চিংড়ি মাছ সবচেয়ে প্রিয়। লুবমানেরও পছন্দ বেশ।‌ পাতা ভাবলো চিংড়িই কেনা যাক। অনেক দিন হলো খাওয়া হয় না। বাবা আনে না তেমন চিংড়ি মাছ। পাতা কিনে নিল। মাছের পলি ব্যাগে ভরে পিছনে ঘুরবে এমন সময় অনুভব করে পিঠে কেউ হাত রেখেছে। শুধু রাখেনি বিশ্রী ভঙ্গিতে পিঠ বুলাচ্ছে। পাতার শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো। তড়িৎ বেগে সরে পিছনে ঘুরে লোকটিকে দেখে। চোয়াল শক্ত হয়ে আসে তার। লোকটি দাঁত বের করে হেসে বলে,

-” পাতা মামুনি মাছ কিনতে এসেছো?”

বলেই কাঁধে হাত রাখতে নিলে পাতা হাত ধরে একটু মোচর দিয়ে ঝটকা দিয়ে সরে দেয়।

-” না আংকেল গরু কিনতে এসেছি! কিন্তু গরু পছন্দ হয়নি! গরুর চরিত্রে ঢের সমস্যা! ভাবছি পাবলিক প্লেসে গনধোলাই খাওয়াবো! ভালো হবে না?”

শুকলা মন্ডল কটমট করে তাকায়। গরু যে কাকে বললো এটা বুঝতে বাকি রইল না। তবে পাবলিক প্লেসে গণধোলাই খাওয়ার শখ নেই তার । তাই চুপ করে পাশ কেটে চলে যেতে নয় পাতার পাশ ঘেঁষে। পাতা বুঝতে পেরে সামান্য উঁচু জুতো পড়া পায়ে বেশ জোরেই পারা দিয়ে খানিকটা মুচড়ে ব্যাগ নিয়ে ঝটপট কেটে পড়ে। শুকলার ‘ও মাগো’ বলে আর্তনাদ কানে বাজতেই একটু শান্তি ফিল আসে। তবে লোকটার হাত কেটে লঙ্কার গুড়া লাগালেই যেন মনের খোরাক মিটতো। ব্যাগ নিয়ে সবজি ও মাছের বাজার থেকে বেরিয়ে বাইক স্ট্যান্ডে গিয়ে নিজের বাইকে বাজারের ব্যাগ রেখে মাথায় হেলমেট পড়ে। আজ তার দিনটাই খারাপ গেলো। প্রথমে অরুণ সরকারের অপমান! এখন ওই শুকলার বাচ্চা! মায়ের কথা কি বলবে! সে তো এমনই! ভেবেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। বাইকে বসে চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট করতে নিলেই কেউ একজন ডাকছে। ডাকটা পরিচিত!

-” আরে পাতা যে! এই পাতা ?”

পাতা ঘার ঘুরিয়ে পাশে তাকাতেই সুট বুট পড়া সুদর্শন সুপুরুষ নজরে আসে। তার চোখজোড়া খানিক পুলকিত হয়। মন খারাপের রেশ কেটে অধরকোনে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।

-” আসসালামুয়ালাইকুম স্যার! কেমন আছেন?”

লোকটি এগিয়ে আসে। হাতে অনেক গুলো আইসক্রিম। চকবার, কোন, বাটি বিভিন্ন ফ্লেভারের। লোকটি পাতার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে সালামের জবাব দিয়ে বলে,

-” আলহামদুলিল্লাহ। তুমি কেমন আছো?”

পাতা লোকটির দিকে চায়। তার ভার্সিটির তারই ডিপার্টমেন্টের প্রফেসর; সুন্দর দেখতে ভদ্রলোকটি। তার ক্রাশ! না তার চেয়ে একটু বেশি। পাতার গ্র্যাজুয়েশন শেষ বছর হলো। তার পর আর দেখা হয় নি।

-” ভালো স্যার।”

লোকটি হেসে বলে,

-” বাজার করতে এসেছো? বাহ তুমি বাজারও করতে পারো!গুড! কি করছো আজকাল? কোনো চাকরি বাকরি? মাস্টার্স করবে না?”

-” সানশাইন ইংলিশ মিডিয়ামে জয়েন করেছি সাত আট মাস হবে। আর মাস্টার্স কোর্স দেখি!”

-” দেখবে কেন? ভর্তি হয়ে যাও! সাথে বি সি এসের প্রিপারেশন নাও! কোনো কোচিং সেন্টারে ভর্তি হতে পারো!

পাতা হেসে বলে,

-” কি যে বলেন না স্যার! বি সি এসে টেকার মতো ছাত্রী নাকি আমি! কোনো মত টেনে টুনে গ্র্যাজুয়েট হলাম! ওসব আমার দ্বারা হবে না। সানশাইনে চাকরি করি আর সাথে দেখি অন্য সেকশনে ভালো জব পাই কি না!”

লোকটি সিরিয়াস মুখে বলে,

-” চেষ্টা করলে সবই পারা যায়। তুমি চেষ্টা করার আগেই হার মেনে নিলে হবে?”

পাতা টপিক চেঞ্জ করতে বলে,

-” ওসব ছাড়ুন। আপনি এখানে?”

লোকটি হাতের আইসক্রিম দেখিয়ে বলে,

-” মেয়ে আর মেয়ের মায়ের জন্য আইসক্রিম নিলাম। নইলে দুজন ঘরেই ঢুকতে দেবে না!”

পাতা হাসলো অনেক কষ্ট করে। এই ফারদিন ইসলাম শুভ নামক প্রফেসরকে তার একটু ভালো লাগতো। প্রথম বর্ষ থেকেই। দ্বিতীয় বর্ষে উঠলে জানতে পারে স্যার বিবাহিত তখন তার বেচারা দিলটা টুট টুট করে ভেঙ্গে যায়। ভালোলাগা থেকে ভালোবাসা শুরু হওয়ার আগেই ছ্যাঁকা খেয়ে বাঁকা হয়ে যায়। এখন জানলো যে বাচ্চাও হয়েছে। আশ্চর্য হবে না কেন!এখন বউ বাচ্চার কথা শুনে যেন ছ্যাঁকা টা পুনরায় খেল। পাতা বলল,

-” স্যার আমাদের বাসায় চলুন? এই একটু পথ!”

শুভ নামক লোকটি হেসে বলল,

-” আজ না অন্যদিন। ভালো থেকো কেমন? আর আমার কথা মনে রেখ টার্গেট কিন্ত বি সি এস? আর মাস্টার্স কোর্স করতে পারো!”

পাতা হালকা হেসে মাথা নাড়ায় সাথে সালাম দেয়। শুভ সালামের উত্তর নিয়ে নিজের গাড়িতে ওঠে। পাতা দাঁড়িয়ে আছে। শুভ স্যারের গাড়ি যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে অবলোকন করে। তারপর নিজেও বাইকে উঠে নিজ গন্তব্যে রওয়ানা হয়।
________

আভারি আসমা বেগমের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে বাজারের ব্যাগটা নিয়ে রান্নাঘরে রাখে। মিনু গ্যাসের চুলায় নুডুলস রান্না করছে। আভারিকে দেখে বলে,

-” বড় ম্যাডামের সব আইনে দিছো ?”

আভারি মাথা নেড়ে হাতের কোন আইসক্রিমটা মিনুর দিকে বাড়িয়ে বলে,

-” নেও ধর। তোমার জন্যি!”

মিনু হাতের দিকে তাকিয়ে বলে,

-” ভোর আব্বার? ফ্রিজে রাইখে দেও!”

আভারি হেসে বলে,

-” তার জন্যিই আইনেছিলাম দুইটা। একটা নিইয়ে কয় ওইটা খালারে দেও সে খাইবো নে! পোলাটা তোমারে কত্ত ভালোবাসে!”

-” তোমার হিংসে হইতেছে? তোমারেও তো ভালো বাসে! ভারি কাক্কু ভারি কাক্কু কইয়ে তোমার পিছে পিছে ঘুর ঘুর করে যে!”

আভারি হেসে উঠলো সাথে মিনুও। তাদের মতো নিঃসন্তান দম্পতির জন্য এই ভোর যেন প্রবল খরায় এক পশলা বৃষ্টির মতো!
আর মা হীন ভোর এদের সান্নিধ্যেও যেন তার মাকে ভুলে থাকার চেষ্টায়। ভুলে থাকবে কি! মায়ের স্মৃতি যে তার আবছা আবছাও মনে পড়ে না। তারদুই বছর বয়সেই তার বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়। তারপর থেকে বাবার কাছেই থাকে। অরুণ সরকারের জীবন বলতে তার ছেলে! ছেলেকে বেশ আদর যত্নেই মানুষ করছে। তবুও ছোট বাচ্চা মাকে ছাড়া কিভাবে থাকে? ছোট থাকতে অরুণ সরকার ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই অফিসে যেত। ভোরকে কোলে নিয়েই সব কাজ করতো! তার স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়ার পর ভোর বাড়িতেই থাকে।‌ স্কুলে সহপাঠীদের মায়েদের আদর করতে দেখে মন খারাপ করে থাকে। চাচি মনিকে আনিকা ও ছোট রূপম দের আদর করতে দেখে অবিকল চেয়ে চেয়ে দেখবে। তারপর মিনুর কাছে গিয়ে আবদার করবে চাচিমনি যেভাবে ওদের আদর করছে তাকেও করতে। সবার কাছেই আদর পাওয়ার তার বড্ড লোভ। সে চায় সবাই তাকে আদর করুক। সবাই ভালোবাসুক। তাই যে তাকে ভালোবাসে তার সাথে লেগে থাকবে বারংবার আদরের আশায়! মিনু ও আভারির থেকে বাবা মায়ের মতো আদর ভালোবাসা পেয়ে যেন বারবার তাদের কাছেই আসে।

ভোর আনিকার ওখানে থেকে এক দৌড়ে বাড়ির ভিতরে এসে রান্না ঘরে ঢুকে হাঁটুতে ভর দিয়ে হাঁপাতে থাকে। তাকে দেখে আভারি বলে,

-” ভোর বাবা কি হইছে? এভাবে দৌড়ে আইলে কেন?”

মিনু গ্লাসে পানি ভরে ভোরকে খাইয়ে দেয়। ভোর এক চুমুক খেয়ে বলে,

-” কিছু না। এমনি দৌড় দিলাম। খালা হুজুর কখন আসবে?”

মিনু চোখ ছোট ছোট করে জবাব দেয়,

-” একটু পরেই।”

ভোর রান্না ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বলে,

-” আমি তাহলে রুমে গিয়ে প্যান্ট পাল্টে অযু করে নেই।”
_______

রাতে ড্রয়িং রুমে বসে টিভি দেখছে আসমা বেগম, আরিয়ান তার কোলে আনিকা। আভারি পাশে দাঁড়িয়ে। টিভিতে মটু পাতলু চলছে। বাচ্চা বাড়িতে থাকলে ছোট বড় সবাইকেই না চাইতেও কার্টুন দেখতে হবে। অন্য চ্যানেলে দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। কার্টুনের চ্যানেলে এড চলাকালীনও নয়‌। চ্যানেল পাল্টালেই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ! এরই মধ্যে কলিংবেল বেজে ওঠে। আভারি গিয়ে দরজা খুলে দিল। অরুণ ভিতরে প্রবেশ করে ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে ব্যাগটা টি টেবিলে রাখে। আসমা বেগম তাকে দেখে বলে,

-” আজ এতো তাড়াতাড়ি এলে?”

অরুণ স্বভাবসুলভ গম্ভীর গলায় হাসিহীন মুখে জবাব দেয়,

-” কাজ জলদি শেষ হলো তাই! ভোর কোথায় ছোট মা?”

আসমা বেগমের মুখটা গম্ভীর হয়ে যায়।

-” আর কোথায় থাকবে সে? সারাটা দিন কাজের লোকদের সাথে লেগে থাকবে। সেখানেই আছে হয়তো! ওদের সাথে থেকে থেকে উন্নতি হচ্ছে তোমার ছেলের। স্কুলে মারামারি করেছে বাড়িতেও বাদ রাখেনি!”

আভারি পাশেই দাঁড়িয়ে সব শুনে। মাথা নিচু করে নেয়! অরুণ খানিকটা বিরক্ত হয় আসমা বেগমের উপর। তার ছেলে যেখানে ভালোবাসা পায় সেখানেই ছুটে যায়। আভারি ও মিনু যে তার ছেলেকে অনেক ভালোবাসে তার কোনো শঙ্কা নেই। সে কন্ঠে সামান্য কঠোরতা এনে বলে,

-” ছোট মা আভারি ভাই মিনু আপাকে আমি চিনি। ভোরকে যথেষ্ট ভালোবাসে তারা।তার খারাপ চাইবে না। আর কি করেছে ভোর?”

আরিয়ান চুপ করে শুনছিল সব। ভেবছিল ভাইকে বলবে না। তবে মায়ের সাথে ওভাবে কথা বলায় আর চুপ থাকতে পারল না।

-” ভাই ওরাই তোর ছেলেকে ভালোবাসে। আমরা তো আর বাসি না, তাই না? থাক সেসব কথা ভোর কি করেছে জানিস? আমার মেয়েকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে পাথরের উপর। মেয়েটার হাতে পায়ে ছিলে কি অবস্থা হয়েছে ‌! মেয়েটা এখনো কাঁদছে!”

আভারি মাথা তোলে ,ভোর কখন করলো এসব ? তখন যে দৌড়ে এলো? অরুণ উঠে এসে আনিকাকে কোলে নিতে চায়। আনিকা আসে না। মুখ ফুলিয়ে থাকে। অরুণ তার হাতের ছিলে যাওয়া জখম দেখে জোরে ভোরকে ডাক দেয়। আভারিকে বলে,

-” ভোরকে ডেকে আনো? এখুনি! ভোর ? ভোর ?”

আভারি কি বলবে ভেবে পায় না। নিজের রুমে যায়। ভোর সেখানেই বসে হোম ওয়ার্ক করছে। মিনু রান্নাঘরের পাশে দাঁড়িয়ে সব অবলোকন করছে। ড্রয়িং রুমের সব কথাই শুনেছে। তার চোখ ভরে আছে অশ্রুতে। আভারি সেদিকে একপল চেয়ে রুমে গিয়ে দেখে ভোর চুপটি করে বসে আছে। তাকে দেখে, এসে হাত চেপে ধরে। সে ভয় পেয়ে গেছে। বাবা ওভাবে ডাকছে কেন? স্কুলের ঘটনায় এখনও রেগে আছে কি? আভারি তাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে যায়। ভোর তার হাত শক্ত করে ধরে। আভারি আসমা বেগমের দিকে চেয়ে হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। ভোর আভারির দিকে তাকিয়ে করুণ চোখে যার অর্থ এভাবে একা ছেড়ে দিলে সিংহের গুহায়।

অরুণ ভোরের সামনে দাঁড়িয়ে শক্ত গম্ভীর গলায় বলে,

-” আনিকাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছো কেন?”

ভোর চকিত দৃষ্টিতে আনিকার দিকে চায়। আনিকা ঠোঁট চেপে একটু হাসে। ভোর নির্লিপ্ত ভাবে তাকিয়ে, সে কখন ফেলে দিল? নিজেই তো দৌড়াতে পড়ে গেল। উপরন্তু তার আইসক্রিমও ফেলে দিয়েছিল। অরুণ ভোরের চুপ থাকায় যেন আরো রেগে যায়। টি টেবিলে আনিকার পড়ে থাকা প্লাস্টিকের স্কেল নিয়ে ভোরের বাহুতে একটা বাড়ি দেয়। স্কেল ফেটে যায় শব্দ করে। ভোর ব্যাথা পায় বেশ সাথে ভয়ে চুপসে যায়। তবুও সেখান থেকে নড়ে না। সেভাবেই দাঁড়িয়ে চোখ ভরে উঠে তার। আরিয়ান ভাইকে থামতে বলে। আসমা বেগমও মানা করে মারতে‌ বুঝিয়ে বললেই হবে! আভারি এগিয়ে আসে অরুণ হাত দিয়ে থামিয়ে ভাঙ্গা স্কেল দিয়েই আরো কয়েকটা বাড়ি দিয়ে ধমক দিয়ে বলে,

-” কেন ফেলে দিয়েছো বল? দিন দিন অভদ্র হয়ে যাচ্ছো! স্কুলে একজনের মাথা ফাটিয়ে এসেছো! ছোট বোনকে ফেলে দিয়ে কি করেছো? গুন্ডামি শিখছো? বেশি আদর করি বলে এখন মাথায় উঠে নাচছো?”

বলে ভাঙ্গা অর্ধেক স্কেলটা ফ্লোরে ছুড়ে ফেলে দেয়। ভোর কেঁপে ওঠে। চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রু বইতে থাকে। অরুণ গললো না সে অশ্রু দেখে। হাত উঠিয়ে আরেকটা চড় দিতে নিলে মিনু এসে সরিয়ে নেয়। সে আড়ালে দাঁড়িয়ে সব অবলোকন করছিল। ভোরকে যখন মারছিল তার বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছিল। আসমা বেগমের কথায় এতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলেও আর পারলো না। ভোরকে নিয়ে ঘরে যায়। আসমা বেগম মিনুর কান্ডে রেগে যায়,

-” দেখেছো কিভাবে নিয়ে গেল? যেন ভোর ওদেরই সন্তান। মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি!”

অরণ কিছু বলে না। ছোট ঢোক গিলে অফিস ব্যাগটা হাতে নিয়ে আনিকাকে বলে,

-” চাচ্চু স্যরি মামনি! তোমাকে অনেক গুলো খেলনা ও আইসক্রিম দিব ঠিকাছে?”

বলে তার গালে চুমু দিয়ে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে নিজের রুমে চলে যায়।
________

পাতারা তিন ভাই বোন। বড় বোন লতার বিয়ে হয়েছে দুটো বাচ্চাও হয়েছে। ভাই লুবমান তার চেয়ে দেড় বছরের বড়। অনার্স শেষ করে বেকার। খারাপ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে নেশায় জড়িয়ে পড়েছিল খানিকটা । পাতার বাবা বুঝতে পেরে রিহ্যাব সেন্টারে পাঠিয়েছিল। রিহ্যাব থেকে এসে এখন আর ওসবে নেই। বেকার ঘুরছে আর চাকরি খোঁজার চেষ্টায়। আর পাতা ছোট ,অনার্স শেষ করে ইংলিশ মিডিয়ামে শিক্ষকতা করছে। পাতার বাবা আতিকুর ইসলাম একজন ভূমি অফিসের সরকারি কর্মকর্তা। মা লাবনী আক্তার গৃহিণী। এই তাদের মধ্যবিত্তের সংসার।

রাতের খাবার খেতে বসেছে পাতা, পাতার বাবা, মা, ভাই। লাবনী সবার পাতে ভাত তরকারি দিয়ে নিজেও‌ বসে। পাতা নিজের পাতের দিকে চায়। প্লেটের একসাইটে অর্ধেক চিংড়ি! পাতা মায়ের দিকে চায় অর্ধেক দিলো কেন? মায়ের পাতেও অর্ধেক। লাবনী আক্তার খাওয়ায় ব্যাস্ত। পাতা হালকা নজর ঘুরিয়ে বাবা ভাইয়ের পাতে দেখে আড় চোখে। ব্যাপারটা খুবই ছ্যাবলামি! তবুও চায় সে। তাদের পাতে পুরো চিংড়ি। সে চিংড়ি কিনেছিল বড় বড়ই দশটা ছিল। তাহলে!সে আমতা আমতা করে বলল,

-” চিংড়ি অর্ধেক করেছো কেন মা?”

সবাই পাতার দিকে চায়। লাবনী মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,

-” পাঁচটা ফ্রিজে রেখেছি‌। আর পাঁচটা রেখেছিলাম। ছেলেটার চিংড়ি পছন্দ তা তো জানিসই। রান্না করার সাথে সাথেই আবদার করে খাবে! তখন একটা দিয়েছিলাম।”

পাতা আর কিছু বলে না। আতিকুর ইসলাম গম্ভীর মুখে ভাতের লোকমা তুলছে।বাবার সামনে পাতার সাহস হয় না এটা বলার, তো আরেকটা কি করলে? সে চুপচাপ খেতে লাগল। তার মা হয়তো জানেই না যে, তারও চিংড়ি বেশ পছন্দের। আর জানলেই বা কি!
লুবমান চিংড়ি অর্ধেক ভাগ করে একভাগ বোনের পাতে তুলে দেয়। পাতা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,
-” তোর পছন্দ তো! তুই খা! আমি খাব না। আমার ভালো লাগে না তেমন। মা’কে অর্ধেক নিতে দেখে বললাম।”

বলেই তুলে লুবমানের পাতে দিল। লুবমান পুনরায় তুলে বোনের পাতে দিয়ে বলে,

-” খা তো! আমি খেয়েছি। আর অর্ধেক আছেই তো!খেয়ে দেয়ে একটু মোটা হ।নইলে শশুর বাড়ি থেকে বলবে বাপের বাড়ির লোক হাওয়া খাইয়ে পেলেছে।এমনিতেই তো এইটুকুনই তুই।তার উপর মশার বডি ফু দিলেই উড়ে যাবি।”

পাতা হেসে বলে,

-” দে ফু? যদি না উড়ি তোর খবর আছে! আর আমি ওতটাও খাটো নই। পাঁচ ফুট আমি।”

-” খাওয়ার সময় এতো কথাবার্তা কিসের? চুপচাপ খাওয়া যায় না?”

দুই ভাইবোন চুপ করে যায় বাবার গম্ভীর আদেশে। আতিকুর ইসলাম গম্ভীর ও কঠোর একজন মানুষ। পরিবারের সকলেই ভয় পায় তাকে। তার কথাই শেষ কথা হয় এই ছোট্ট সংসারে। খাওয়া দাওয়া শেষে আতিকুর রহমান সোফায় বসে। লাবনী ,পাতা লুবমানকেও বসতে বলে। সবাই বিনা বাক্যে বসে পড়লো। আতিকুর ইসলাম বলেন,

-” পাতার জন্য যে প্রস্তাব এসেছিল ওরা মানা করে দিয়েছে!”

লাবনীর মুখটা হতাশা প্রকাশ করে। বলে,

-” কি বললো? কেন মানা করল?”

-” সেটা বলে নি ক্লিয়ার করে!”

-” ওরা রাজি হলেও আমি করতাম না বিয়ে। আব্বু আমি দেখতে শুনতে খুব খারাপ নই। আর না খোরা ,লুলা কানা হাবিজাবি।না কোনো প্রকারের বাজে রেকর্ড আছে।গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করে চাকরি করছি।না ডিভোর্সি ,তাহলে কেন একটা ডিভোর্সি লোককে বিয়ে করবো? সে যতোই বড়লোক বা ওয়েল সেটেলড হোক না কেন!

লুবমানও বোনের কথায় সায় জানালো।

-” পাতা ঠিক বলেছে আব্বু! সি ডিসার্ভ আ বেস্ট পারসন। ভালো প্রস্তাব আসলেই কথা আগাবে।”

পাতার বাবা স্ত্রীর দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকায়। লাবনী আক্তার ঢোক গিলে পাতাকে বলে,

-” তোর জন্য কোন রাজকুমার বসে আছে শুনি? যেই না চেহারা তার উপর সর্ট। বয়সও বেশি চব্বিশ পড়ে গেছে। আর লুবমান ভালো ঘরে পাঠাতে চাইলে হাড়ি হাড়ি টাকাও পাঠাতে হবে তাদের ঘরে! গয়নাগাটির তো কথাই নাই! এসব কই থেকে আসবো শুনি! সেবার না এসেছিল একটা বিসিএস ক্যাডার।আট লাখ টাকা সাথে দুই ভরি স্বর্ণ চাইলো! পারবো এতো টাকা দিতে আমরা?”

পাতার চোখ ভরে ওঠে। লুবমান চুপ করে বসে আছে। কি জবাব দেবে। আতিকুর রহমান উঠে হন করে রুমে চলে যায়। পাতা বাবার যাওয়া দেখে নিজেও উঠে রুমের দিকে অগ্রসর হয়।

চলবে…..