অতল গহ্বরে নীরবতা পর্ব-১৩+১৪

0
269

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১৩

রুমে এসে ব্যাগটা জায়গা মতো রেখে কাপড় নিয়ে শাওয়ার নিতে গেল আমায়রা। লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখলো অনুভব বসে আছে বিছানায়। আমায়রা মুচকি হেসে বলল,
“আজ এত তাড়াতাড়ি যে?”

অনুভব আমায়রার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ক্লাস ছিলো না। তা তোর পরীক্ষা কেমন হলো?”

আমায়রা টাওয়েল বারান্দায় নাড়িয়ে দিয়ে আবারো রুমে এসে বলল,
“ভালোই হয়েছে।”

অনুভব আমায়রা মাথায় হাত রেখে এলোমেলো চুলগুলো আরো এলোমেলো করে বলল,
“ভালো হলে ভালো। থাক তাহলে আমি ফ্রেশ হয়ে আসি একসঙ্গে খাবো।”

বলেই অনুভব চলে গেল। আমায়রা সেদিকে তাকিয়ে ফুস করে একটা নিশ্বাস ছেড়ে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। চোখ বুজে ফেলল। প্রচন্ড ঘুম পাচ্ছে তার। কিছুতে উঠে গিয়ে খেতে মন চাচ্ছে না। হুট করে তার ভাবনা এলো সে কেন রায়ানকে ধন্যবাদ বলল। আর রায়ানই বা কেন তার কথায় ছেলেটা মারলো।

তার এসব ভাবনার মাঝেই আমেনা বেগমের ডাক পড়লো। আমায়রা নিজের ভাবনাগুলো ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। ওড়নাটা ঠিক করে রুম ছাড়লো সে।

————————

রায়ান বাড়ি ফিরে দেখলো রাবেয়া বেগম সোফায় বসে টিভি দেখছেন। রায়ান হুট করেই মায়ের কাছে গিয়ে ধপ করে রাবেয়া বেগমের হাঁটুতে মাথা রেখে শুয়ে পরলো।

রাবেয়া বেগম মুচকি হেসে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“মাথা ব্যথা করছে!”

রায়ান চোখ বুজেই গম্ভীর গলায় বলল,
“হুম”

রাবেয়া বেগম পরম স্নেহে ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন।

এভাবে কতটা সময় কেটে গেছে জানা নেই রায়ানের। রাবেয়া বেগম এবার নিরবতা ভেঙে বলে উঠলেন,
“রুমে গিয়ে শাওয়ার নে। কিছু খেয়ে ঘুম দিস। কাল তো পরীক্ষা নেই?”

রায়ান অলস ভঙ্গিতে উঠে বসলো। মাথা একটু এদিক ওদিক ঘুরিয়ে চোখ খুলল। মুচকি হেসে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মু তোমার হাতে কি আছে বলো তো?”

রাবেয়া বেগম কপাল কুচকে বললেন,
“মানে?”

রায়ান বাচ্চাদের মতো মায়ের হাত নিয়ে নাড়িয়ে নাড়িয়ে খেলতে খেলতে বলল,
“জানো তো আম্মু তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই আমার মাথা ব্যথা যেন মুহূর্তের নাই হয়ে যায়।”

রাবেয়া বেগম রায়ানের কথায় আলতো হাসলেন। ছেলের এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করে বললেন,
“মায়েদের হাতে জাদু থাকে। এখন কথা না বাড়িয়ে যা তো ফ্রেশ হয়ে নে।”

রায়ান চলে গেল নিজ রুমে।

————————

আমায়রা এককাপ চা বানিয়ে নিজের রুমের সঙ্গে লাগোয়া ছোট বারান্দাটায় দাঁড়ালো। দুপুরের খাওয়া শেষ করে ঘন্টাখানেক ঘুমিয়ে এখন বেশ ফুরফুরে লাগছে তার। চুল গুলো মাঝে এখনো একটু ভেজা থাকায় হাত খোঁপা করা চুলগুলো খুলে দিলো এক হাত দিয়ে। কোমর অব্দি লম্বাচুলগুলো মুহুর্তেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে উড়তে লাগল মৃদু বাতাসে। আমায়রা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল,

খোলা জানালা দখিনের বাতাসে
ঢেকে যায় পর্দার আড়ালে
তখন তুমি এসে হেসে
বলে দাও, আছি তোমার পাশে

বহুদূর পথ ভীষণ আঁকাবাঁকা
পথ চলতে ভীষণ ভয়
তুমি এসে বলে দাও, আছি আমি পাশে
করোনা কিছুতেই ভয়

চায়ের শেষটুকু খেয়ে টবে লাগানো বাগান বিলাস ফুলে হাত বুলিয়ে ঠোঁট প্রসারিত করে হাসলো আমায়রা। তখনি ফোনটা বেজে উঠলো তার। আমায়রা চায়ের কাপটা নিয়ে রুমে বেড সাইট টেবিলে কাপটা রেখে ফোনটা হাতে নিলো। ইশরা কল করেছে। আমায়রা কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ইশরার অস্থির কন্ঠ ভেসে এলো,
“আমু বুকের ভিতরে আমার তোলপাড় শুরু হয়েছে। ক্ষণে ক্ষণে শ্বাস আটকে আসছে। মনে হচ্ছে আমি শ্বাসকষ্টের রুগী হয়ে যাচ্ছি। মাথা ভনভন করে ঘুরছে। কি করবো কি বলবো কিছুই বুঝতে পারছিনা রে দোস্ত।”

আমায়রা ইশরাকে শান্ত করতে নরম গলায় বলল,
“আগে একটু দম নে তারপর বল কি হয়েছে?”

ইশরার অস্থিরতা যেন তবুও কমছে না জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে সে। আমায়রা চুপ করে রইলো।

ইশরা দম নিয়ে বলতে লাগল,
“ফারহান ভাই আমাকে কল দিয়ে বলতেছে সে নাকি আমাকে ভালোবাসে।”

ইশরার কথায় আমায়রার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। চেঁচিয়ে বলে উঠলো,
“কিহ!”

ইশরা আস্তে করে বলল,
“হুম”

“কিন্তু উনি তো তোর চাচাতো ভাই হয়। আর রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে আঙ্কেল তো রাজনীতি দুই চোখে দেখতে পারে না। তাহলে কেমনে কি? ওও দাঁড়া তুইও কি ওনাকে ভালোবাসিস?”

ইশরা কিছু বলছে না। চুপ করে আছে। আমায়রার আর বুঝতে বাকি রইলো না। দুষ্টু হেসে বলল,
“ছি ছিহ নিজের চাচাতো ভাইরে ভালোবাসতে লজ্জা করে না তোর ইশু। কেমনে তুই পারলি এমনটা করতে।”

ইশরা ইতস্তত হয়ে আমতা আমতা করতে লাগল। আমায়রা নিজের হাসি দমাতে না পেরে হো হো করে হেসে দিলো। তার হাসির মাঝেই খট করে কল কেটে দিলো ইশরা। আমায়রা ফোনের দিকে তাকিয়ে আবার হাসতে লাগল।

———————

ঘড়িতে রাত একটা আফজাল মিয়া গুটি গুটি পায়ে প্রবেশ করলো বদ্ধ পোড়া বাড়িতে। চারপাশে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিছু দেখা বা বোঝা যাচ্ছে না তেমন একটা। ফতুয়ার পকেট থেকে বাটন ফোনটা বের করে লাইট জ্বালিয়ে সতর্কতার সাথে প্রবেশ করলো একটা গুপ্ত ঘরে।

ঘরটায় আলো চিকচিক করছে। চারটা কম্পিউটার রাখা চারজন ছেলে মন দিয়ে কিবোর্ডের বাটন চাপতে ব্যস্থ। চারপাশে তার আর কাগজের ছড়াছড়ি। আফজাল মিয়া গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“কাজ কতোদূর স্যার জানবার চাইছে। তার কেউ যেন বুঝতে না পারে এই জাগয়া স্যারের কারবারি চলতাছে। সাবধান কইয়া দিলাম।”

কম্পিউটার ছেড়ে একুশ কি বাইশ বছরের শ্যামবর্ণের ছেলে উঠে এসে আফজাল মিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“স্যারের নাম্বারটা কি একটু দেওয়া যাবে, স্যারের সঙ্গে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে আমাদের।”

আফজাল মিয়া নাকমুখ কুচকে বলল,
“না না দেওন যাইতো না। যা কথা আমারে কইতে হইবো।”

ছেলেটা আমতা আমতা করতে করতে বলল,
“না মানে আসলে আমাদের মনে হচ্ছে কাল থেকে কেউ আমাদের ট্র্যাকিং করছে।”

আফজাল মিয়া কপাল গুটিয়ে বলল,
“কি কইলা ট্রাকিং না ফ্যাকিং সেইডা আবার কি?”

আফজাল মিয়ার কথায় বেশ বিরক্ত হলো ছেলেটা। তবুও নিজেকে ঠিক রেখে বলল,
“আমাদের উপর নজর রাখছে।”

আফজাল মিয়া উত্তেজিত হয়ে বলল,
“কি কাইল থাইকা নজর রাখতাছে আর তুমি আমারে এহন কইতাছো। এখনি স্যাররে কওয়া লাগবো।”

আফজাল মিয়া কাঁপা হাতে নজরুল হককে কল দিলো । কল রিসিভ হচ্ছেনা। আফজাল মিয়া যেন ভয়ে আরো কাঁপতে লাগল। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে লাগল। তখনি কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা একটা লোক বলে উঠলো,
“সব একাউন্ট ইতিমধ্যে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।”

আফজাল মিয়া রেগে বলল,
“তাড়াতাড়ি যা করনের করো।”

আফজাল মিয়ার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“এখন আর কিছু করার নেই।”

আফজাল মিয়া মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পরলো।
———————

অনুভব বারান্দায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। আকাশে আজ বিশাল বড় চাঁদ। চাঁদের আলোতে চারিপাশ চকচক করছে। চাঁদের পাশের খন্ড খন্ড মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে মনে সুখে। কিন্তু সুখ নেই অনুভবের মনে। অনুভব গুনগুনিয়ে গাইতে লাগল,

আমার আসার সময় হলে
তুমি হাত ফসকে গেলে
তোমার যাওয়ার পায়তারা
আমি হই যে দিশেহারা ।

তুমি অন্য গ্রহের চাঁদ
আমার একলা থাকার ছাদ
তোমার ফেরার সম্ভাবনা
অমাবস্যায় জোছনা ।

অনুভবের চোখে কার্ণিশ বেয়ে দুফোঁটা নোনাজল গড়িয়ে পরলো। অনুভব চোখ বুজে ফেলল। চোখগুলো বেশ কদিন ধরে কথা শুনছে না। হুটহাট নোনাজল ছেড়ে দিচ্ছে। যা অনুভবের একদম বিরক্ত লাগছে। বুকের ভিতরের যন্ত্রনাগুলো যেন দলবদ্ধ হয়ে আন্দোলন শুরু করেছে। না আর সহ্য হচ্ছে না।

অনুভব ঘাড় বাঁকিয়ে নিজেকে ঠিক করে উঠে দাঁড়ালো। রুমে এসে ধপ করে বিছানায় শুয়ে পরলো। চোখ খিচে বন্ধ করলো। না যে করেই হোক না ঘুমাতে হবে। কয়বার ব্যর্থ হবে একবার না একবার তো ঘুমকে ধরা দিতেই হবে।

———————

রাবেয়া বেগম রায়ানের রুমে এসে দেখলেন রায়ান টেবিলে মাথা রেখে চোখ বুজে আছে। সামনে ল্যাপটপ খোলা, আশেপাশে বই ছড়ানো।

রাবেয়া বেগম এগিয়ে গিয়ে ছেলের মাথায় হাত রেখে বললেন,
“বিছানায় গিয়ে ঘুমাও আব্বু। এখানে কষ্ট হচ্ছে তো।”

রায়ান চোখ না খুলেই চেয়ার ছেড়ে উঠে ঝট করে বিছানায় গিয়ে উল্টো হয়ে শুয়ে পরলো।

রাবেয়া বেগম মৃদু হেসে বললেন,
“পাগল একটা।”

রায়ানের ল্যাপটপটা বন্ধ করে, বইখাতা গুছিয়ে রুমের লাইট অফ করে চলে গেলেন রাবেয়া বেগম।

রায়ানের রুম থেকে বের হতেই তাজওয়ার সাহেবের মুখোমুখি হলেন রাবেয়া বেগম। তাজওয়ার সাহেব রায়ানের রুমের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“ঘুমিয়েছে!”

“হুম”

“ওও তাহলে চলো ঘুমাবে। রাত তো হলো না।”
“হুম চলুন।”

#চলবে

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রতা
#পর্বঃ১৪

সকালের তীব্র রোদের ঝলকানিতে ঘুম ভেঙে গেল আমায়রার। আমায়রা উঠে বসলো। চোখমুখ ফুলে আছে। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে। আমায়রা এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে ঠিক করতে করতে ওয়াশরুমে গেল। আজ পরীক্ষা নেই তাই একটু দেড়ি দেড়ি করেই উঠেছে সে। গায়ের ওড়না ঠিক করে নিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো আমায়রা। আমেনা বেগম কাজ করছিলেন রান্না ঘরে। মেয়েকে আসতে দেখে খুনতি নাড়াতে নাড়াতে বললেন,
“খাবার টেবিলে রাখছি গিয়ে খা।”

আমায়রা বাধ্য মেয়ের মতো খাবার টেবিলের কাছে গিয়ে চেয়ার টেনে বসে পড়লো। রুটি ছিঁড়ে তাতে ভাঁজি নিয়ে মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে বলল,
“আম্মু ভাইয়া কোথায়?”

“কলেজ গেছে কিছুক্ষণ আগে।”

“ওও মা আমি আজ বিকালে একটু বের হবো।”
আমেনা বেগম কপাল কুচকে রান্নাঘরের দরজার সামনে এসে বলল,
“কোথায় যাবি?”

“ইশুর সাথে একটু পার্কে ঘুরতে যাবো। ভালো লাগছে না একটু ঘুরে আসি।ওর থেকে কিছু নোটও নিতে হবে। ”

“ওও যাস”

আমায়রা নাস্তা করে আবারো রুমে গেল। জানালার পর্দা সরিয়ে দিলো। রুমে হুড়মুড়িয়ে আলো প্রবেশ করলো। আমায়রা পড়ার টেবিলে বসলো।

—————————

বিশিষ্ট শিল্পপতি নজরুল হক মানুষের একাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা আত্স্বাত করার অপরাধে আটক হয়েছে মিরপুরের নিজ ভবন থেকে।

খবরের শিরোনাম দেখে মুচকি হাসলো এক যুবক। পায়ের উপর পা রেখে নাচাতে নাচাতে তার সহকারী আবিরকে বলল,
“খেলা জমে গেছে কি বলো আবির!”

আবির মুচকি হেসে বলল,
“জি, স্যার। এখন বুঝবে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার ফল।”

আবির আবারো বলে উঠলো,
“স্যার আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলেছি। ওই লোক আর বের হতে পারবে না জেল থেকে।”

যুবকটি চেয়ার ছেড়ে উঠে আবিরের পিঠ চাপড়ে বলল,
“এইজন্যই তো তোমাকে এত ভালোবাসি আবির।”

আবির খানিকটা কাচুমাচু করে বলল,
“স্যার আপনি যে গোপনে এতকিছু করছেন। আপনার পরিবার জানতে পারলে..!”

যুবকটি আবিরের কথা থামিয়ে দিয়ে বলল,
“আরে আবির পরিবার জানলেই তো সমস্যা। আমি কি আর হুটহাট মিশনে বের হতে পারবো। তাছাড়া সময় আসুক তখন না হয় বলবো।”

“কিন্তু স্যার আপনার ফ্যামিলি বিজনেসের কি হবে?”

যুবকটি মুচকি হেসে বলল,
“আমি কে সেটা হয় তো তুমি ভুলে যাচ্ছো, আবির!”

আবির মুখটা নামিয়ে বলল,
“না স্যার ভুলবো কেন।”

যুবকটি ইশরায় আবিরকে চলে যেতে বলল। আবির চলে গেল। আবারো চেয়ার বসে যুবকটি বাঁকা হাসলো। মনে মনে কষতে লাগল নতুন কিছু।

—————————

রাবেয়া বেগম দেয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখলেন সকাল বারোটা বাজে। রায়ানের কোনো খবর নেই। রুমের দরজা এখনো বন্ধ। রাবেয়া বেগম নাস্তা নিয়ে রায়ানের দরজায় গিয়ে ধাক্কা দিতে লাগলেন। রায়ান ভিতর থেকে ঘুম ঘুম কন্ঠে বলল,
“কি হয়েছে,আম্মু?বিরক্ত করছো কেন?”

রাবেয়া বেগম একরাশ বিরক্তি নিয়ে বললেন,
“কয়টা বাজে সেদিকে খেয়াল আছে। নাস্তা এনেছি খেয়ে উদ্ধার কর।”

রায়ান দরজা খুলে দিয়ে বলল,
“তুমি খুব বিরক্ত কর আম্মু।”

“হ এখন তো আমাকে বিরক্তিই লাগবে। যখন থাকবোনা তখন বুঝবি।”

মাকে একপাশ থেকে জড়িয়ে ধরে রায়ান বলল,
“হয়েছে হয়েছে আর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করতে হবেনা। আমি ঝট করে ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

বলেই ওয়াশরুমে চলে গেল রায়ান। রাবেয়া বেগম রুম গোছাতে লাগলেন।

রায়ান ফ্রেশ হয়ে সোফায় বসে নাস্তা করতে লাগল। রাবেয়া বেগম ওর পাশেই বসে আছেন। রায়ান খেতে খেতেই বলল,
“আম্মু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি!”

রাবেয়া বেগম ভ্রুকুচকে তাকালেন ছেলের দিকে। রায়ান ধীর কন্ঠে বলল,
“আম্মু তুমি যদি কোনোদিন জানতে পারো আমি তোমাদের কাছে কিছু লুকিয়েছি তাহলে কি তুমি রাগ করবে?”

রাবেয়া বেগম ছেলের প্রশ্ন শুনে একটু চমকে গেলেন। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে চিন্তিত গলায় বললেন,
“কেন এমন প্রশ্ন করছিস, রায়ান? তুই কি কিছু লুকাচ্ছিস আমাদের কাছ থেকে?”

রায়ান মুচকি হেসে মাথা নেড়ে বলল,
“না, তেমন কিছু নয়। ধরো, যদি ভবিষ্যতে এমন কিছু ঘটে।”

রাবেয়া বেগম একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললেন, “আব্বু, একটা কথা মনে রেখো,মা-বাবা সন্তানের থেকে বেশি কিছু চায় না, শুধু চায় তারা ভালো থাকুক। আমাদের কাছে লুকানোর মতো কোনো কিছু তোমার থাকবে কেন? আমরা সবকিছুতেই তোমার পাশে আছি।”

রায়ান মৃদু হাসলো, কিন্তু তার চোখে একটুখানি দ্বিধা যেন ফুটে উঠল।

রাবেয়া বেগম কিছু বলতে নিবেন তার আগেই কথা কাটাতে রায়ান বলল,
“নূর কোথায় দেখছিনা যে?”

“একটু ওই বাসায় গেছে তোর মামিমার শরীরটা একটু খারাপ করেছে তো তাই।”

রায়ান খাওয়া শেষ করে উঠে বলল,
“এককাপ কফি দেও তো আম্মু। পড়তে বসবো একটু।”

বলেই চেয়ার টেনে বসে পড়লো পড়ার টেবিলে।

রাবেয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে গেলেন প্লেট বাটি নিয়ে। রায়ান সেদিকে একপলক তাকিয়ে নাক থেকে চশমাটা একটু উপরে তুলে তাকালো বইয়ের দিকে। না পড়তে ভালো লাগছে না তার। ল্যাপটপ খুলে বসলো সে। দ্রুতগতিতে কিবোর্ড চাপতে লাগল।

রাবেয়া বেগম একটা সার্ভেন্ট দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন রায়ানের কফিটা। কপালে তার চিন্তার ভাঁজ পরেছে। রায়ান কি তাহলে কিছু লুকাচ্ছে তাদের কাছে। হাজারো প্রশ্ন মনের মাঝে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। যার উত্তর জানা নেই তার। না এই ব্যাপারে রায়ানের বাবাকে জানাবেন বলে ঠিক করলেন। লুতফা খালার ডাকে ভাবনায় ছেদ ঘটলো রাবেয়া বেগমের। লুতফা খালা এ বাসায় কাজ করেন বহুবছর যাবত। তার দুই মেয়েকেই বিয়ে দিয়ে এখন সে একা। লুতফা খালা রাবেয়া বেগমকে ডেকে বললেন,
“আপা ছোট আব্বুরে কফি দিয়া আইছি। এখন কি করতাম?”

রাবেয়া বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“চাল ধুয়ে তুলে দেও, লুতফা। আমি গিয়ে গোসলটা সেরে আসি।”

“আইছা আপা যান আমি করতাছি।”

রাবেয়া বেগম আনমনা ভাব নিয়েই নিজের রুমের দিকে পা বাড়ালেন।

চোখ ঘুরিয়ে রায়ানের রুমের দিকে তাকিয়ে ভ্রুকুচকালেন তিনি। রুমের দরজার সামনে নেহা ঘুর ঘুর করছে।

রাবেয়া বেগম নেহার কাছে গিয়ে বললেন,

“কিরে এখানে কি করছিস?”

রাবেয়া বেগমের গলা কানে আসতেই চমকে উঠলো নেহা।

নেহা ধরা পড়ে যাওয়ার মতো ভঙ্গিতে একটু হাসলো, তারপর বলল,
“ওই কিছু না বড় আম্মু। রায়ান ভাইয়ার সাথে একটু কথা ছিল।”

রাবেয়া বেগম চোখ সরু করে তাকালেন নেহার দিকে। বললেন,
“যা একটু পরে কথা বলিস । ও এখন পড়তে বসছে।”

নেহা মাথা নেড়ে দ্রুত পায়ে চলে গেল। যেন পালিয়ে গেলেই বাঁচে। রাবেয়া বেগম লক্ষ্য করলেন, রায়ানের রুমে তার এতো আগ্রহ কিসের? সন্দেহের একটা ছায়া তার মনে উঁকি দিতে লাগল।

রুমে ফিরে আবারো কাজকর্মে মন দিতে চাইলেন তিনি, কিন্তু মনটা বারবারই রায়ানের কথায় ফিরে যাচ্ছিল। সত্যিই কি কিছু লুকাচ্ছে তার ছেলে?

—————————

অনুভব বসে আছে টিচার্স রুমে তখনি একটা মেয়ে তার পাশের চেয়ারে এসে বসলো। মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
“অনুভব রাইট!”

অনুভব ফোনের স্কিন থেকে চোখ তুলে তাকালো পাশের মেয়েটার দিকে। মেয়েটা হাসি মুখেই তাকিয়ে আছে অনুভবের দিকে। অনুভব সম্মতিমূলক মাথা নাড়ালো। যে সেই অনুভব। মেয়েটার ঠোঁট যুগল যেন আরো প্রসারিত হলো। হাত বাড়িয়ে বলল,
“আমি সানজিদা ইসলাম।”

অনুভব হাত না মিলিয়েই বলল,
“কিছু কি বলবেন?”

অনুভবের এমন কথায় হতাশ হলো মেয়েটা। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তুই একদম আগের মতোই আছিস দেখছি অনুভব। আমাকে চিনতে পর্যন্ত পারছিনা। হায় রে হায়।”

অনুভবের কুচকে যাওয়া ভ্রু যেন আরো বেশি কুচকে গেল। চোখ ছোট ছোট করে তাকালো মেয়েটার দিকে। মেয়েটা একরাশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আরে আমি তর্নি রে। চিনতে পারছিস না বলদ।”

অনুভব অবাক হয়ে গেল। অবাক হয়ে বলল,
“তুই এখানে?”

“না আমার ভুত। কোথায় ভাবলাম এতদিন পর দেখা হলো আট বছর পর দেখা হলো কত কিছু বলবো। আর তুই তো চিন্তেই পারলি না।”

অনুভব যেন এখনো হতভম্ব হয়ে আছে।
“তুই এখানে কেমনে কি?”

“ছাগল, আমার বরের অফিস আমি আসবোনা।”

অনুভব যেন আরো একধাপ ঝটকা খেল। অবাক কন্ঠে বলে উঠলো,
“কে সেই মহা পুরুষ বইন যে তোর মতো বান্দররে বিয়ে করলো আমারেও দেখা।”

তখনি…..

#চলবে