অতল গহ্বরে নীরবতা পর্ব-৩৯+৪০

0
266

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ৩৯

হুট করে অনুভব বলে উঠলো,
“এই বিয়ে আমি হতে দিবোনা।”

সবাই ভ্রুকুচকে তাকালো অনুভবের দিকে। অনুভব পাত্রের দিকে তাকিয়ে বলল,
“মেয়ে দজ্জাল বিয়ে করলে আপনার একটাও দাড়ি থাকবেনা। সব মেয়ের হাতে চলে যাবে। আমি একজন টিচার হয়ে আপনার খারাপ চাইতে পারি বলুন।”

অনুভবের এমন সিরিয়াস মোমেন্টে এমন কথা শুনে সবাই অবাক। সবচেয়ে বেশি অবাক হলো সুরাইয়া। মনে মনে ভাবলো ব্যাটা কি পাগল টাগল হয়ে গেল নাকি?

অনুভবের কথায় পাত্রের বিষম উঠে গেল। কাশতে কাশতে জান যায় যায় অবস্থা। হুট করেই কাশতে কাশতে পাত্রের লম্বা দাড়ি উড়ে গিয়ে দূরে মেঝেতে পড়ে লুটোপুটি খেতে লাগল। অনুভব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। অবাকের চরম পর্যায়ে গিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“আবির?”

সুরাইয়া মাথা চাপড়াতে লাগল। আর মনে মনে আবিরের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করতে লাগল সে। এমন ভাবে কেউ ধরা খায়। কি চেয়েছিলো আর কি হলো!

আবির অপরাধী ন্যায় পাশে তাকালো। পাশেই রায়ান কটমট করে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে। কত কষ্ট করে দাড়ি,গোফ, ভুরি লাগিয়ে বুড়ো সেজে নিজের বউয়ের একমাত্র বড় ভাইকে তার মনের কথা টেনে হিচড়ে বের করতে সাহায্য করছিলো। আর এই শালা আবির সব ঘেটে আশিপদের সবজি দিয়ে ঘাটা খিচুড়ি বানিয়ে দিলো। তীব্র বেগে পা দিয়ে এক বারি বসালো আবিরের পায়ে। আবির কুকিয়ে উঠলো।

অনুভব ক্ষেপে গিয়ে বলল,
“এগুলোর মানে কি আবির? এখানে কি কোনো নাটকের সিন হচ্ছে নাকি? আর এই বয়স্ক লোক দুইজনই বা কারা?এমন ফাজলামির মানে কি?”

আমায়রা খামচে ধরলো রায়ানের বাহু। ফিসফিসিয়ে বলল,
“ভাইয়া প্রচন্ড রেগে গেছে। এখন কি হবে?”

রায়ান আমায়রার কম্পিত হাতের উপর হাত রেখে ওকে শান্ত করলো। আমায়রার থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়িয়ে। মুখের উপর থেকে সাদা দাড়ি, ভ্রু, গোফ সব খুলে ফেলল। পাঞ্জাবীর ভিতর থেকে নকল ভুরি টেনে বের করলো। অনুভব যেন আরো বড় ধাক্কা খেল। রায়ানকে সে এখানে আশা করেনি একদমই। অনুভব থমকানো গলায় বলে উঠলো,
“রায়ান তুমিও! সত্যিই তোমাদের আর কিছু বলার নেই। আমার সঙ্গে মজা পেয়েছো তোমরা?”

আমায়রা অপরাধী সুরে বলে উঠলো,
“ভাইয়া আমাদের মাফ করে দেও, আসলে..!”

অনুভব আমায়রার কাছের মাঝে থামিয়ে দিয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
“তুইও সবার সাথে মিলে আমাকে ধোকা দিলি। তুই জানিস না মজার ছলে দেওয়া ধোকা আমি কতটা অপছন্দ করি। ধোকা জিনিসটাই আমি সহ্য করতে পারিনা। আমি ভেবে ছিলাম মেয়েটার পরীক্ষা কয়েকদিন বাদে আর সবাই ওর বিয়ে নিয়ে তাড়া দিচ্ছে। আমার আটকানো উচিত। আমি ভালো বুঝে এলাম আর নিজেই, বাহ বাহ।”

বলেই অনুভব হনহন পায়ে চলে গেল সেখান থেকে। আমায়রা ও ওর পিছনে যেতে নিলে রায়ান ওর হাত ধরে থামিয়ে দিয়ে শান্ত সুরে বলল,
“আমি দেখছি তুমি থাকো এখানে।”

আমায়রাকে রেখে রায়ান সবকিছু আমায়রার কাছে দিয়ে চলে গেল। আমায়রা দম মেরে বসে রইলো সোফায়। সুরাইয়া গা এলিয়ে সোফায় বসে চোখ বুজলো। মাথাটা ধরেছে তার। এতো ঝামেলা বিরক্ত লাগছে। পুরো প্লানটা রায়ানেরই ছিলো। সেদিন সে গিয়েছিলো বন্যা আর রাকিবের সাথে রায়ানদের বাসায়। সেখানে গিয়েই তারা সবাই সুরাইয়াকে চুপচাপ হয়ে যাওয়ার কারণ জিজ্ঞাসা করতে থাকে। সুরাইয়া প্রথমে বলতে না চাইলেও সবার জোরাজোরিতে বাধ্য হয়ে অনুভবের কথা জানায় সবাইকে। তখনি রায়ান এসব বলে। সে রাজি ছিলোনা এতে। সে তো আশাই করেনি যে অনুভব এমন করে ছুটে আসবে। তাও এসেছে যে এই বেশি। এতেই খুশি সে। এতটুকু তো ভাবে তাকে নিয়ে মানুষটা। কথাগুলো ভাবতেই ভিতর থেকে এক দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে আসে সুরাইয়ার। আচ্ছা ভালোবাসা কি অপরাধ? সে যে সেই প্রথম দেখাতে গম্ভীর উজ্জল শ্যামবর্ণের পুরুষের মায়ায় পড়ে গেছে। মায়া কাটানো কি এতোই সহজ? আচ্ছা মানুষটা কি কখনোই তাকে বুঝবেনা?

চোখ বুজে এসবই ভাবছিলো সুরাইয়া। বন্যা ওর কাছে এসে ওর হাতে হাত রাখলো।

অন্যদিকে আবির আর রাকিব পরপর পানি খেয়েই চলছে। কি হবে না হবে এই টেনশনে দুইজন শেষ।

রায়ান বাসা থেকে বের হয়ে দেখলো অনুভব বাইক স্টার্ট দিচ্ছে। রায়ান দ্রুত গিয়ে অনুভবের পিছনে বসে পরলো। অনুভব থমথমে গলায় বলল,
“এখানে কি?”

রায়ান কিছু বলল না। অনুভব এবার বেশ বিরক্ত হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সমস্যা কি তোমার?”

রায়ান ধীর কন্ঠে বলল,
“ভাই আপনার সঙ্গে আমার জরুরি কিছু কথা আছে।”

অনুভব বিরক্ত মুখে বলল,
“জরুরি কথা? এতক্ষণ কি করছিলে? ওই নাটকীয়তা শেষ করে এখন কথা বলতে চাও?”

রায়ান শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“হ্যাঁ ভাই, কারণ যা বলার, সেটা একান্তে বলতেই হবে।”

অনুভব রায়ানের মুখের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্থির হলো। তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে, বলো। কিন্তু যদি আবার কোনো নাটক বা ফাজলামি করার চেষ্টা করো, আমি কিন্তু এইবার একেবারে সহ্য করবো না।”

রায়ান ছোট্ট করে মাথা ঝাঁকাল। বাইক চলতে শুরু করল, আর রায়ান অনুভবের পেছনে বসে নিজের কথা সাজাতে লাগল।

রাস্তার পাশে এক নিরিবিলি জায়গায় এসে বাইক থামালো অনুভব। বাইক থেকে নেমে সরাসরি রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“এবার বলো, কি জরুরি কথা?”

রায়ান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আর কতদিন নি পাওয়া জিনিসকে আঁকড়ে ধরে বাঁচবেন বলুন।”

অনুভব চুপ করে আছে কিছু বলছে না। রায়ান দম নিয়ে বলল,
“দেখুন আপনি যেই কষ্টে কষ্ট পাচ্ছেন সেই কষ্ট কিন্তু আপনি সুরাইয়াকেও দিচ্ছেন। আপনি যাকে ভালোবেসেছিলেন তাকে আপনি পাননি। এখন কি নিজেকে একবার সুযোগ দেওয়া যায় না। আপনাকে যে ভালোবাসে তাকে একবারের জন্য সুযোগ দিয়ে দেখুন না। জীবন তো আর কারো জন্য থেমে থাকে না।”

অনুভব রায়ানের কথা শুনে কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলো। মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই, কিন্তু চোখের গভীরে যেন একাধিক প্রশ্ন খেলা করছে। রায়ান তার হাত দিয়ে অনুভবের কাঁধে আলতো করে স্পর্শ করলো, তারপর বলল,
“ভাই, সুরাইয়ার চোখে আপনার জন্য যে অনুভূতি দেখেছি, তা আপনি দেখেও না দেখার ভান করছেন। কেন? নিজেকে কষ্ট দিয়ে কী লাভ বলুন?”

অনুভব মাথা নীচু করে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত পরে বলল,
“তুমি কি জানো, কাউকে ভীষণ ভালোবেসে তাকে হারানোর যন্ত্রণা কেমন? আমি দ্বিতীয়বার সেই যন্ত্রণার সম্মুখীন হতে চাই না। সুরাইয়াকে ভালোবাসতে গিয়ে যদি তাকে আবার হারাই, সেটা আমি সহ্য করতে পারবো না।”

রায়ান মৃদু হেসে বলল,
“ভাই, ভালোবাসা মানেই ঝুঁকি। কিন্তু এই ঝুঁকি না নিলে কি আপনি কখনো সত্যিকার সুখ পেতে পারবেন? হারানোর ভয়ে কি পাওয়ার সম্ভাবনাকে উপেক্ষা করা উচিত? সুরাইয়া আপনাকে বুঝতে পারে, আপনাকে নিজের মতো করেই ভালোবাসে। তাকে যদি এই সুযোগটা না দেন, তাহলে তো নিজের প্রতি এবং তার প্রতি অন্যায় করবেন।”

অনুভব ধীরে ধীরে মাথা তুললো। তার চোখে এক ধরনের দ্বিধা মিশ্রিত অসহায়ত্ব। রায়ান আবার বলল,
“আপনি চান তো সুরাইয়া সুখী হোক? তাহলে তার ভালোবাসাকে গ্রহণ করুন। সে আপনার পাশে থাকতে চায়, আপনার সমস্ত দুঃখের ভাগীদার হতে চায়। তাকে সেই সুযোগ দিন।”

অনুভব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“তুমি বুঝতে পারছো না, রায়ান। আমি ভেতরে ভেতরে একেবারে শূন্য হয়ে গেছি। আমি নিজের ভগ্ন হৃদয় নিয়ে সুরাইয়াকে কী দিতে পারবো?”

রায়ান দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“আপনার ভালোবাসা। সুরাইয়া আর কিছুই চায় না। শুধু আপনার হৃদয়ের সেই ছোট্ট জায়গাটুকু, যেখানে সে বাস করতে পারে। আপনি যা হারিয়েছেন তা ফিরে পাবেন না, কিন্তু যা আপনার সামনে অপেক্ষা করছে, তা হারাবেন না।”

অনুভব রায়ানের কথা শুনে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। মনে হলো, তার ভেতরের কঠিন দেওয়ালগুলো আস্তে আস্তে ভাঙতে শুরু করেছে। রায়ান তার কাঁধে চাপড় দিয়ে বলল,
“একটা সুযোগ দিন, ভাই। নিজের জন্য না হোক, সুরাইয়ার জন্য।”

অনুভব এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করলো। কয়েক মুহূর্ত পরে ধীরে ধীরে বলল,
“আমি ভাববো। কিন্তু জানি না, নিজেকে রাজি করাতে পারবো কিনা।”

রায়ান তার পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল,
“আপনি পারবেন। আপনি নিজেই নিজের ভিতরের শক্তিটা খুঁজে পাবেন।”

অনুভব তাকালো রায়ানে হাসি মাখা মুখের দিকে। রায়ান আবারো বলতে লাগলো,
“দেখুন আপনার কিছু হলেও এতদিনে কিন্তু সুরাইয়ার উপর একটা দুর্বলতা দেখা দিয়েছে তা না হলে আপনি কখনোই এমন ভাবে ছুটে আসতেন না সুরাইয়াকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে শুনে। আর আপনি কিন্তু আমাদের ভালো করে দেখেনওনি। মেকআপ করা ভালোই হয়েছিলো কিন্তু ভালো করে দেখলে আপনি ঠিকি চিনতে পারতেন। কিন্তু মনের অস্থিরতা পেরিয়ে আপনার মস্তিস্কে আমাদের খুটিয়ে দেখার ইচ্ছা জাগেনি।”

অনুভব নরম গলায় বলল,
“কিন্তু জোর করে কি আর ভালোবাসা যায়?”

রায়ান হেসে বলল,
“ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না। কিন্তু যে ভালোবাসা আপনার জন্য অপেক্ষা করছে, সেটা স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা যায়। সুরাইয়া তো জোর করছে না, বরং সে আপনার অনুভূতিকে সম্মান করে অপেক্ষা করছে। এতদিন চুপ করেই ছিলো। সে আপনাকে চারমাস আগে থেকে ভালোবাসে। তারপরেও সে আপনাকে সময় দিচ্ছে, কারণ সে জানে আপনার জন্য ভালোবাসা ধীরে ধীরে জাগবে।”

অনুভব কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“তবে যদি আমি তার আশা পূরণ করতে না পারি? যদি আমার ভেতরের এই শূন্যতা তাকে কষ্ট দেয়?”

রায়ান শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“তাহলে সেটা তার সিদ্ধান্ত হবে। কিন্তু আপনি তাকে সুযোগ না দিলে, সে আপনার ভালোবাসা পাওয়ার অধিকারটাও হারাবে। আমরা সবাই ত্রুটিপূর্ণ, ভাই। কিন্তু এই ত্রুটিগুলোর মাঝেও ভালোবাসা খুঁজে পাওয়া যায়। আপনার পেছনের কষ্টগুলো ভুলে যেতে সময় লাগবে, কিন্তু একবার শুরু করার চেষ্টা করুন।”

অনুভব গভীর শ্বাস নিল। মনে হচ্ছিল, তার ভেতরে একটা বড় যুদ্ধ চলছে। একদিকে তার হারানোর ভয়, অন্যদিকে সুরাইয়ার প্রতি অদ্ভুত এক টান।

অবশেষে অনুভব মৃদু কণ্ঠে বলল,
“ঠিক আছে, রায়ান। আমি ওর সঙ্গে কথা বলব। তবে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে পারছি না।”

রায়ান মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আপনার এই কথাটাই যথেষ্ট। ভালোবাসা কোনো প্রতিশ্রুতির গণ্ডি নয়, এটা একে অপরের পাশে থাকার অঙ্গীকার।”

রায়ানের কথায় অনুভবের মুখে এক ঝলক নরম ভাব ফুটে উঠল। তবে দ্রুত সে নিজেকে সামলে নিয়ে বাইকের স্টার্ট দিল। রায়ান তৃপ্তির হাসি নিয়ে অনুভবের পিছনে বসলো।

অনুভব রায়ানকে রাকিবদের বাসার সামনে রেখে চলে গেছে। ভিতরে আসেনি সে। রায়ানও জোর করেনি। যা যা করেছে আজ আরো বেশি করলে আবার হিতে বিপরীত হতে সময় লাগবেনা। কলিংবেল বাজতেই আবির কাঁপতে লাগলো। এই তো এসে গেছে এবার নির্ঘাত বিটকেলটা তাকে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় গিয়ে একবার করে চুবিয়ে আনবে তার কাশি দেওয়ার অপরাধে।

#চলবে

#অতল_গহ্বরে_নীরবতা
#লেখিকাঃশুভ্রতা_শুভ্রা
#পর্বঃ৪০

আবির দাঁত দিয়ে নখ কাটতে লাগলো। রায়ান এসে সোফায় বসলো। সুরাইয়া এখনো চোখ বুজেই আছে। রায়ান সামনে থাকা পানির গ্লাস থেকে পানি খেয়ে বসে রইলো। আমায়রার বেশ বিরক্ত লাগলো রায়ানের নিরবতা। অস্থির হয়ে বলে উঠলো,
“কি হলো কিছু বলছেন না যে? কি বলল ভাইয়া?”

রায়ান শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো আমায়রার দিকে। আমায়রার অস্থিরতা বুঝতে পেরে একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে রায়ান বলতে লাগলো,
“অনুভব ভাইকে বললাম সবকিছু বুঝিয়ে। উনার ভাবতে একটু সময় লাগবে।”

সবার মুখে যেন এক চিন্তার বলিরেখা ফুটে উঠলো। তখনি সুরাইয়া তাচ্ছিল্য মাখা হেসে বলল,
“এসব চিন্তা বাদ দেও তোমরা সবাই। এতো ভাবতে হবেনা আমাকে নিয়ে।”

বলেই উঠে দাঁড়ালো সে। সময় নষ্ট না করে টালমাটাল পায়ে এগিয়ে গেল নিজের রুমের দিকে। বন্যা ওর পিছনে যেতে নিবে তখনি রায়ান ঠান্ডা গলায় বলে উঠলো,
“যেও না ও একটু একা থাক।”

রাকিবও সম্মতি দিলো রায়ানের কথায়। বন্যা আর গেল না। সবাইকে দুপুরের খাবারের জন্য টেবিলে নিয়ে গেল। এমনিতেই বেশ দেড়ি হয়ে গেছে। দুপুর পেরিয়ে বিকাল হয়ে এসেছে। শীতের সময় ছোট দিন এমনিতেই। তার উপর সকাল থেকে যা হলো। বন্যা সুরাইয়াকে সময় করে খাইয়ে দিবে বলে সবাইকে খেতে দিলো।

খাওয়া দাওয়া শেষে রায়ান, আমায়রা আর আবির রাকিবদের বাসা থেকে। বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকেই আবিরকে কি যেন ইশারা করছে রায়ান। রায়ানের ইশারা কিছুতেই বুঝতে পারছেনা আবির। এদিকে তাদের সাথে আমায়রা থাকায় বলতেও পারছে না কিছু রায়ান। আবির শুধু বলদ মার্কা হাসি হাসছে। আর রায়ান দাঁতে দাঁত পিষে তাকিয়ে আছে তার দিকে। আমায়রা একটু সামনে এগোতেই রায়ান আবিরের হাত টেনে ধরলো। দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিসিয়ে বলল,
“হারাম*খোর দেখতেছিস ইশারা করতেছি বুঝোস না কেন? বউ নিয়ে একা সময় কাটাতে চাইছি বুঝোস না কেন, কাবাবে হাড্ডি না হলে তোর হয় না। এমনিতে এক অপরাধ করে বসে আছিস। তার উপরে আরেক অপরাধ। এই রায়ান তোকে…!”

রায়ানের পুরো কথা বলার আগেই ভো দৌড় দিলো আবির। আমায়রা আবিরকে হুট করে দৌঁড়াতে দেখে অবাক হলো। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“আবির ভাই এমন করে দৌড় দিলো কেন?”

রায়ান হাসার চেষ্টা করে বলল,
“আসলে ওর কি যেন গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে পড়ে গেছে তাই চলে গেল।”

আমায়রা চোখ ছোট ছোট করে তাকালো রায়ানের দিকে। রায়ান আমায়রার হাত ধরে টানতে টানতে বলল,
“চলো তো এখন।”

অন্যদিকে আবির এক দৌড় এসে থামলো একটা ক্যাফের সামনে। হাঁপাতে হাঁপাতে মনে মনে ভাবলো,
“আর কিছু সময় থাকলে মরার আগেই কবরখানায় রেখে আসতো তাকে। তখন কবরখানায় সংসার করতে হতো তাকে। ভাবা যায়। ভালো যে সময় মতো দৌড় দিছিলো। কেরে বিবাহিত মানুষের ইশারা সে কেমনে বুঝবে? সে বিবাহিত নাকি আজব তো!”

আবির দরজা ঠেলে ক্যাফের ভিতরে ঢুকতে নিবে তখনি রোজা দরজার কাছে ছিলো। পিছনে ঘুরে আবারো নিজের ফ্রেন্ডের কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছিলো। আবিরও রায়ানকে বকছিলো বলে খানিকটা অন্যমনস্ক ছিলো। হুট করে ঢুকে পড়ায় দরজার সামনে ধাক্কা খেয়ে পড়ে গেল রোজা। আবিরের ভাবনায় ছেদ ঘটলো কারো আর্তনাদ শুনে। নিচে তাকাতেই দেখলো একটা কলেজ ড্রেস পড়া মেয়ে মেঝেতে পড়ে মাথায় হাত ঘষছে ।

আবির গোল গোল চোখে তাকিয়ে রইলো। দ্রুত হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“সরি সরি আমি আসলে বুঝতে পারিনি। আপনার লাগেনি তো?”

রোজা হাত সরিয়ে ঝাঝালো কন্ঠে বলে উঠলো,
“না আমি তো মানুষ না। আমার কেন লাগবে?”

রোজার মুখ দেখতেই আবিরের চোখ যেন আরো বড় বড় হয়ে গেল। মাথায় হাত রেখে বলল,
“এমা এতো কাবিল স্যারের মাইয়া!”

রোজার বান্ধবীরা এসে রোজাকে টেনে তুললো। রোজা একহাত দিয়ে কোমর ঘষছে আরেকহাত দিয়ে কপাল ঘষছে। রোজা আবিরের দিকে বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে বলল,
“আপনি আর ধাক্কা খাওয়ার মতো কাউকে পেলেন না। আপনার চোখ নাকি চন্দ্রবিন্দু। সবসময় আমারেই আপনার চোখে পরে ধাক্কা দেওয়ার জন্য। অসভ্য, ফাজিল পোলাপান।”

আবির এবার চটে গেল। আঙুল তুলে বলতে লাগলো,
“এই মাইয়া মুখ সামলিয়ে কথা বলো। জানো আমি তোমার কত বড়। বড়দের সম্মান দিতে শেখায় নি তোমার বাবা। ওও আমি তো ভুলেই গেছিলাম তোমার বাবা ম্যাথ ছাড়া আর কিছুর শিক্ষা দিবে কেমনে?”

রোজা হিসহিসিয়ে উঠলো। সেও আঙুল তুলে বলল,
“একদম আজেবাজে কথা বলবেন না আমার বাবাকে নিয়ে। আপনি তো গাধা। কি মনে করেছেন আমি জানিনা কিছু?”

আবির দ্রুত রোজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ওর মুখ চেপে ধরে ফিসফিসিয়ে বলল,
“এই মাইয়া চুপ যা। আর কত বলবি। আমার মান সম্মানের লেবুর শরবত বানানো বাদ দে আল্লাহ রাস্তে।”

রোজার মুখ চেপে ধরায় সে যেন আরো তেতে উঠলো। একগাল থুতু দিলো আবিরের হাতে। আবির লাফিয়ে উঠলো। নাকমুখ কুচকে রোজাকে ছেড়ে দিয়ে হাত ঝাড়তে ঝাড়তে বলল,
“এই মাইয়া তো দেখি বড় হিটলার। আর হবেই বা না কেন কার মেয়ে দেখতে হবে না। টাকলা হিটলারের মাইয়া বলে কথা।”

রোজা তেড়ে এসে কিছু বলতে নিবে তার আগেই ওর বান্ধবীরা ওকে টেনে নিয়ে গেল। রাগে ফুসতে লাগলো রোজা। তার মাথায় কত বড় একটা আলু হয়ে গেল। আর এই পোলা তার পরেও তার সাথে এসে তর্ক করে। সাহস তো কম না শয়তান পোলা।

আবির পানি দিয়ে নিজের হাত ফেলে। তবুও বার বার হাতের দিকে তাকাচ্ছে আর নাক কুচকে ফেলছে। একটা ওয়েটার তার কাছে আসতেই আবির একটা কোল্ড কফি আনতে বললো।

ওয়েটার চলে গেল কফি আনতে। আবির মনে মনে বলতে লাগলো,
“ধাক্কা খাওয়ার আর মানুষ পাইলি না তুই। ওই বদ মাইয়া, টাকলা স্যারের বিচ্ছু মাইয়ার সাথেই তোকে ঝামেলায় জড়াতে হবে। আসলে তোর দোষ না। সব দোষ তোর ফাটা কপালের। ভালো কিছু তো নাই। শুধু ঝামেলাই আছে তোর ফাটা কপালে।”

আবিরের ভাবনার মাঝেই কফি চলে এলো। আবির শান্তি মতে কফি খেতে লাগলো। তখনি তার প্যান্টের পকেটে থাকা ফোন ভাইব্রেট হতে লাগলো। আবির চরম বিরক্ত হলো। কোথায় শান্তিতে একটু কফি খাবে তা না ফোন করে যতসব বিরক্ত করা। আবির পকেট হাতরে ফোনটা বের করে রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে বলা কথায় আবিরের মুখের রঙ পাল্টে গেল। গম্ভীর কন্ঠে শুধু বলল,
“আসছি আমি”

—————

রায়ান আমায়রাকে গাড়িতে করে একটা ছোট পার্কে নিয়ে আসলো। আমায়রাকে গাড়ি থেকে নামতে বললে আমায়রা জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে দেখলো তারা বাড়িতে আসেনি। আমায়রা কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
“এখানে নেমে কি করবো?আপনি না বাসায় যাবেন?”

রায়ান গাড়ির স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে আমায়রার দিকে তাকিয়ে হালকা হেসে বলল,
“বাসায় তো যাবোই, কিন্তু তার আগে একটু সময় নিতে চাই। তুমিও তো সকাল থেকে অনেক টেনশন করেছো। একটু শান্ত পরিবেশে আসলে খারাপ হবে না।”

আমায়রা সন্দিগ্ধ চোখে তাকালো, যেন বুঝতে চাইছে রায়ানের কোনো চালাকি আছে কি না। সে চুপচাপ গাড়ি থেকে নামল।

পার্কটা ছোট হলেও গাছপালায় ঘেরা, বাতাসে একটা মিষ্টি স্নিগ্ধতা। রায়ান আমায়রার পাশে এসে দাঁড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
“জানো, আমি যখন খুব ক্লান্ত বা বিভ্রান্ত বোধ করি, এখানে আসি। এটা আমার ‘থিংকিং স্পট’।”
রায়ানের কথায় আমায়রা তাকালো রায়ানের দিকে। সূর্য প্রায় ডুবে গেছে গেছে। লালচে আভায় রায়ানের মুচকি হাসি মাখা মুখটা যেন বেশ ভালো লাগছে আমায়রার কাছে। নিজের অজান্তেই সে পলকহীন ভাবে তাকিয়ে রইলো রায়ানের দিকে। হুট করেই রায়ান দুহাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে ফেলল। আমায়রা ভ্রুকুচকে তাকালো সেদিকে। রায়ান ঢং করে বলল,
“ওভাবে তাকিয়ো না বউ। আমার তো লজ্জা করে। নজর লেগে যাবে তো এভাবে তাকিয়ে থাকলে।”

রায়ানের এমন নাটকে বিরক্ত হলো আমায়রা। বিরক্তি নিয়েই বলল,
“আপনাকে তো নাটকের টিমে ভর্তি করানো উচিত। আপনার এসব নাটক বিরক্ত লাগে।”

আমায়রার কথায় রায়ান হাসতে হাসতে বলল,
“নাটকের টিমে ভর্তি করালে তো আর তোমার সাথে এমন সময় কাটানো হতো না। আমার অভিনয়ের গুণে হয়তো কোনো সুন্দরী নায়িকা আমার প্রেমে পড়ে যেতো।”

রায়ানের কথায় আমায়রার ভ্রু জোড়া উঁচু হয়ে গেল। সে কটাক্ষ করে বলল,
“সুন্দরী নায়িকা? ওদের তো দেখেছি, পয়সা থাকলেই প্রেমে পড়ে। আপনার নাটক তো তেমন প্রভাব ফেলবে না।”

রায়ান আবারও মুচকি হেসে আমায়রার দিকে তাকাল। এবার একটু গম্ভীর গলায় বলল,
“সত্যি, তুমি না বলতে জানতামই না। যদিও বা মেয়েরা আমাকে দেখলে এমনিতেই পাগল। নাটকের টিমে ভর্তিও হতে হবেনা গো বউউউ।”

আমায়রা দাঁতে দাঁত চেপে হেসে বলল,
“ওমা তাই নাকি তাহলে ও পাগল মেয়েদের কাছে গিয়েই নাটক করুন গিয়ে।”

রায়ান হুট করেই আমায়রাকে একপাশ করে জড়িয়ে ধরে বলল,
“না গো বউ তোমাকে ছাড়া ওদের কাছে গেলে আমি চুমু খাবো কাকে বলো তো বউউউউ!”

আমায়রা রায়ানের হাত সরানোর জন্য কাচুমাচু করে বলল,
“সরুন তো পার্কে এসে যতসব ঢং করছে। আর বেশি কথা বললে আপনার মুখ আমি সুপার গ্লু দিয়ে আটকে দিবো বলে দিলাম।”

রায়ান হেসে আমায়রার হাত ধরে বলল,
“সুপার গ্লু দিয়ে আটকে দিবে? আহা, আমার বউ তো এখন সুপারওম্যানও হয়ে গেল!”

আমায়রা বিরক্ত চোখে তাকিয়ে বলল,
“আপনার মজা শেষ হয়েছে? তাহলে এবার বাসায় চলেন। আর এসব বাজে কথা বলার দরকার নেই।”

রায়ান একটু সময় নিল। তারপর সুর গম্ভীর করে বলল,
“জানো, আজকের দিনের প্রতিটা মুহূর্ত আমি অনুভব করেছি। জীবনে অনেক কিছু আসে যায়, কিন্তু এমন কিছু মুহূর্ত থাকে যেগুলো সবকিছুর চেয়ে বেশি মূল্যবান। তোমার মতো সঙ্গী পেয়ে আমি নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি।”

রায়ানের হঠাৎ এভাবে গভীর কথা বলায় আমায়রা কিছুটা থমকে গেল। সে নিরব হয়ে রইল, পার্কের ঠান্ডা বাতাসে তার লম্বা চুলগুলো উড়ছিল। সূর্য তখন পুরোপুরি ডুবে গেছে, আকাশে শুধু ম্লান নীলচে আলো।

রায়ান আমায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “আমার এত কথা শুনে তুমি নিশ্চয়ই ভাবছো, আজ আমি খুব ইমোশনাল হয়ে গেছি, তাই না?”

আমায়রা একটু হেসে বলল,
“ভাবছি, কিন্তু ইমোশনাল হলে মাঝে মাঝে ভালো লাগে। তবে বেশি নাটক করবেন না, না হলে আমি…”

রায়ান কথার মাঝেই হেসে বলল,
“তুমি সুপার গ্লু নিয়ে আসবে, তাই তো?”

আমায়রা মুখ বাঁকালো রায়ানের কথায়। রায়ান হো হো করে হাসতে লাগলো আমায়রার মুখ বাঁকানো দেখে। আমায়রা গাল ফুলিয়ে হাঁটতে লাগলো। রায়ান হাসি থামিয়ে বলল,
“কিছু খাবে?”

আমায়রা মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আপনিই খান আমি খাবো না।”

#চলবে
(আসসালামু আলাইকুম। ভুলত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। বেশি বেশি রিয়েক্ট কমেন্ট করবেন।)